বিভাগ: সম্পাদকীয়

নির্বাচনী হাওয়া বইছে

দেশে নির্বাচনী হাওয়া ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের বাকি আছে আট মাসের মতো। নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে কারা নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তার তালিকা চাওয়া হয়েছে। জোটের বাইরেও কয়েকটি দলের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা চলছে। তার আগে মে-জুন নাগাদ অনুষ্ঠিত হতে পারে পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। এটিকেও অনেকে জাতীয় নির্বাচনের মাঠ রিহার্সাল হিসেবে দেখছেন। নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোর জন্য সরকারের মতামত চেয়ে নোট পাঠিয়েছে। আশা করা যায়, কিছুদিনের মধ্যেই সেসব নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, এখনো পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ ধরেই এগোচ্ছে। সাধারণ মানুষেরও প্রত্যাশা এই নির্বাচনমুখী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অক্ষুণœ থাক। বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করায় সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা দেশে ও বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিল। যদিও সেই নির্বাচনে বিজয়ী দলের মেয়াদ পূর্ণ করার ক্ষেত্রে তা বড় কোনো বাধা হয়নি, তবু উভয় পক্ষকেই সেই নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করতে হবে। এর ফলে দেশে যে সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে সাধারণ মানুষকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। তাই তারা চায়, আগামী নির্বাচন নিয়ে যেন কোনোভাবেই সে রকম পরিস্থিতি তৈরি না হয়। এর মধ্যে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া একটি দুর্নীতি মামলার রায়ে কারাভোগ করছেন। বিএনপি নেতৃত্ব আশা করছে, তিনি শিগগিরই জামিনে মুক্তি পাবেন। তবে তারা এমনটাও ভাবছে, কোনো কারণে খালেদা জিয়া মুক্ত না হলে, সে ক্ষেত্রে তারা আন্দোলন ও নির্বাচন একসঙ্গে চালিয়ে যাবে। বিএনপির এমন চিন্তাভাবনাকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল ইতিবাচকভাবেই দেখছে। আবার কারাগারে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক করার অনুমতি দেওয়ার মধ্যে সরকারের সদিচ্ছাও দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্বে মাঠের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও সরকার বিএনপিকে প্রয়োজনীয় ছাড় দেবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেছেন।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে পরমতসহিষ্ণুতা অত্যন্ত জরুরি। দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে চলেছে। আমরা চাই, রাজনৈতিকভাবেও দেশ এগিয়ে যাক। দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র আরো দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হোক। সে ক্ষেত্রে আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে একটি বড় মাপকাঠি। নির্বাচনে বিরোধী দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন সরকারের ওপর বর্তায়, তেমনি বিরোধী দলগুলোকেও যেকোনো ছুতোয় নির্বাচন বর্জনের ঐতিহ্য থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা চাই, সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হোক।

তরুণদের মধ্যে অপরাধ বাড়ছে

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজন তরুণ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে গেছে। কোথাও বন্ধুদের হাতে খুন হচ্ছে স্কুল বা কলেজগামী শিক্ষার্থীরা। উঠতি বয়সী তরুণরা অবলীলায় খুন-খারাবির মতো ঘটনায় জড়িত হয়ে পড়ছে। কিছুদিন আগে হোলি উৎসবে ডেকে নিয়ে দ্বাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়েছে। উঠতি বয়সীরা কেন ভয়ংকর সব অপরাধের সঙ্গে জড়াচ্ছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, সামান্য কারণেই ঘটছে এসব খুন-খারাবির ঘটনা। কোথাও খুনের নেপথ্যে রয়েছে কিশোর প্রেম। কোথাও এলাকার সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব। কোথাও নিছকই বীরত্ব দেখাতে গিয়ে খুনের মতো জঘন্য ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর বয়সীরা।
সমাজ নিয়ে যাঁদের চিন্তা-ভাবনা, তাঁরা বলছেন, আজকের দিনে এমন অনেক পরিবার আছে, যেখানে মা ও বাবা কর্মজীবী। নিজেদের ক্যারিয়ার দেখতে গিয়ে অনেকেই ছেলেমেয়েদের দিকে ঠিকমতো দৃষ্টি দিতে পারেন না। অন্যদিকে যৌথ পরিবার প্রথা উঠে গেছে অনেক আগেই। এমন অনেক পরিবারই পাওয়া যাবে, যেখানে পারিবারিক অনুশাসন বলতে কিছু নেই। যেখানে মা-বাবা দুজনই দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরের বাইরে থাকেন, সেখানে উঠতি বয়সীদের দেখার কেউ নেই। এই সময়ে সহজলভ্য প্রযুক্তি একজন কিশোর বয়সীকে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে, তা কেউ বলতে পারে না। আগের দিনে পাড়া-মহল্লায় সামাজিক অনুশাসন ছিল। আজকের দিনের নাগরিক জীবন থেকে সামাজিক অনুশাসন উধাও হয়ে গেছে। ফলে একধরনের স্বাধীনতাবোধ থেকেও তরুণ মনন স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে চাইছে। বেয়াড়া হয়ে ওঠার বয়সে বেপরোয়া হয়ে ওঠার সব রসদই কিশোর ও তরুণদের হাতের নাগালে। ফল দাঁড়াচ্ছে এই যে স্বভাবে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে তারা। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই এখন বাণিজ্যপ্রধান। সেখানেও মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়া হয় না। বাড়িতে কোনো অনুশাসন নেই। পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন ও মূল্যবোধের অভাবেও বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। হাত বাড়ালেই মিলছে ভয়ংকর মাদক। সঠিক পথনির্দেশনারও যেন কেউ নেই। যে সময়ে একজন কিশোর বা তরুণের মনোজগৎ তৈরি হয়, সেই সময়ে সে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় হতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ জগতের সঙ্গে। এসব কারণেই পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠছে গ্যাং গ্রুপ। রাজধানীতে এমন কিশোর গ্যাংয়ের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে অনেক কিশোর।
এ অবস্থা থেকে ফিরতে না পারলে সমাজের যে ভয়াবহ ক্ষতি হবে, তা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু এ থেকে মুক্তির উপায় কী? হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধগুলো নতুন করে ফিরিয়ে আনতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ নতুন করে তৈরি করতে না পারলে সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা অসম্ভব হবে। রোধ করা যাবে না তরুণ বয়সীদের অপরাধপ্রবণতা।

 

সিলেটে জঙ্গিদের অপতৎপরতা

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনার পর সিলেট আবার আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ধর্মের নামে কিছু জঙ্গি মনোভাবের লোকের অধর্মপরায়ণতা সুফি-সাধকদের আশীর্বাদধন্য পুণ্যভূমিখ্যাত সিলেটকে আবারও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একসময় ফতোয়াবাজির কারণে সিলেট প্রায়ই জাতীয় সংবাদপত্রের শিরোনাম হতো। সালিস-ফতোয়াবাজির ওই ধারা স্তিমিত হলেও গত দুই দশকে জঙ্গি মানসিকতার বিস্তার ঘটেছে।
সিলেটে আগেও অনেকবার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মৌলবাদী গোষ্ঠীর হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাদের হুমকির কারণে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও কবি শামসুর রাহমান সিলেটে যেতে পারেননি। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও উগ্রতার নতুন সংস্করণ জঙ্গিবাদ। গত দুই দশকে অনেক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০০১ সালে নির্বাচনী জনসভার দিনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই সিলেটে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি)। ২০০৪ সালে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর হামলা, মহানগর আওয়ামী লীগের সভায় গ্রেনেড হামলা, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভায় বোমা হামলা এবং ২০০৫ সালে সিটি মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর বোমা হামলার ঘটনা ঘটে।
সিলেটের সামাজিক-সাংস্কৃতিক মহলের অভিমত, অনুকূল আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও ভৌগোলিক পরিবেশ থাকায় বাড়ছে জঙ্গি তৎপরতা। সিলেটের মানুষ ধর্মপ্রাণ। এ বিষয়টিকে কাজে লাগাচ্ছে জঙ্গিরা। অনেক মাজার থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সিলেটে আসে। তাদের ভিড়ে মিশে সহজেই বিচরণ করতে পারে তারা। সিলেটে অনেক প্রবাসী আছে। তাদের বাড়িঘর ভাড়া নিয়ে জঙ্গিরা আস্তানা গড়ে তুলছে। তাদের কেউ কেউ জঙ্গিদের অর্থায়ন করে বলে অভিযোগ রয়েছে। কারো কারো সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সিলেট সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অস্ত্র-বিস্ফোরক আনা সহজ। বিভিন্ন এলাকায় গভীর বন ও পাহাড়-টিলা রয়েছে, যেখানে গাঢাকা দিয়ে থাকা, গোপন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো সহজ। একসময় সিলেটের প্রচুর মাদরাসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যুদ্ধ করতে আফগানিস্তানে গিয়েছিলেন। দেশে আসার পর তাঁদের নজরদারিতে রাখা হয়নি।
জঙ্গিবাদ মৌলবাদী মানসিকতারই একটি রূপ। সশস্ত্র কিছু গ্রুপকে নির্মূল করার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু মৌলবাদী চিন্তা ও জঙ্গিবাদের সহায়ক সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকটি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এটিকে গুরুত্ব না নিলে জঙ্গিবাদের অনুকূল পরিবেশ থেকেই যাবে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য যা ঊষর ভূমি, জঙ্গিবাদের জন্য তা-ই উর্বর ভূমি। আদর্শিক রাজনীতির চর্চা ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ছাড়া এই বালাই থেকে মুক্তি নেই। জঙ্গিবাদকে যেমন আইন ও প্রশাসনের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে, তেমনি মতাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক উপায়েও মোকাবেলা করতে হবে।

৭ মার্চই বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা

আজ অমলিন সেই ৭ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের জনসভায় বাঙালীর স্বপ্নের বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ একই সঙ্গে তিনি সাত কোটি বাঙালীকে মুক্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তাঁর এই ভাষণকে বিশ্বের ইতিহাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণের অন্যতম বলে গণ্য করা হয়। এই ভাষণই বাঙালী জাতিকে প্রস্তুত করেছিল মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও তা প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামে শরিক হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন; কিন্তু পাকিস্তানী শাসকদের সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক আলোচনার পথ থেকে পিছিয়ে যাননি। এটা নিঃসন্দেহে তাঁর বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে। কিন্তু পাকিস্তানী হানাদাররা বাঙালীকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র করে। একদিকে আলোচনা চলেছে, অন্যদিকে তারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অস্ত্র আনা অব্যাহত রেখেছে। তারা কখনই এ দেশের মানুষের ন্যায্য দাবি মেনে নিতে চায়নি। তারা চেয়েছিল বাংলার মানুষকে চিরকাল গোলাম করে রাখতে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে তারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গের মানুষের ন্যায্য দাবি কখনই মেনে নেয়নি। এখানকার মানুষকে তারা সমান অধিকার কখনই দেয়নি। বরং শুরু থেকেই ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের যাঁতাকলে বেঁধেছে এখানকার মানুষকে। প্রথমে তারা আঘাত হেনেছে বাংলাভাষার ওপর। তারা উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার কথা ঘোষণা করেছিল। ১৯৪৮ সাল থেকেই পাকিস্তানী শাসকদের এ ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের মানুষ প্রতিবাদ জানায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে প্রাণ দিতে হয় এদেশের মানুষকে। বরকত, সালাম, রফিক, জব্বারসহ অনেককে ভাষার জন্য জীবন দিতে হয়। কিন্তু আন্দোলন থেমে থাকেনি। বরং পাকিস্তানীদের অন্যায় শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে এখানকার গণতান্ত্রিক আন্দোলন স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয় এবং তা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে।
বস্তুত ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, তার একটি বিশাল ও রক্তক্ষয়ী পটভূমি রয়েছে। ১৯৪৭ সালের পর ২৩ বছরের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তা ধীরে ধীরে গড়ে উঠে। এজন্য এ দেশের মানুষকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে, অনেক আত্মত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মানুষ শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে শান্তিপূর্ণভাবে-নিয়মতান্ত্রিক পথে সমস্যা সমাধানের। কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে বিশ্বাসঘাতক পাকিস্তানী হানাদাররা সব ন্যায়নীতি লঙ্ঘন করে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর। সেদিন ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ এ দেশের মানুষ হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ নয় মাসের নিরন্তর মুক্তির লড়াইয়ের পর বিজয়ী হয় জাতি। তাই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের গুরুত্ব আজও অম্লান। মূলত ৭ মার্চের ভাষণই ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা এবং একই সঙ্গে স্বাধীনতা অর্জনের নির্দেশিত পথ।

অধ্যাপকের উপর হামলা মর্মান্তিক

অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, একজন জনপ্রিয় লেখক এবং একজন মুক্তমনা মানুষ। আদর্শ শিক্ষার প্রসারে তিনি যেমন নিবেদিতপ্রাণ, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। শিক্ষা যে মুখস্থ করার বিষয় নয়, তাকে যে সৃষ্টিশীলভাবে প্রয়োগ করতে হয়, তা তিনি নানাভাবে তুলে ধরেছেন এবং শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি সেভাবে তাদের গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। শুধু নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে তিনি সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে যেকোনো স্থানে যেকোনো উদ্যোগে ডাক পেলেই তিনি ছুটে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি সদালাপী, হাসিখুশি ও অমায়িক একজন মানুষ। এমন একজন মানুষের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে যে বা যারা ছুরি নিয়ে হামলা চালাতে পারে, তাকে বা তাদের কি মানুষ বিবেচনা করা যায়!
প্রায় দুই দশক ধরে কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠী অধ্যাপক জাফর ইকবালকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। চিঠি বা টেলিফোনে হুমকির পাশাপাশি তাঁকে গালাগালও করা হয়েছে। হুমকিদাতাদের চেতনার স্তর বিবেচনা করে তিনি সেসব উপেক্ষা করেছেন। তা সত্ত্বেও পত্রপত্রিকায় সেসব হুমকির কথা এসেছে। নিয়মানুযায়ী তিনিও কিছু পুলিশকে জানিয়েছেন। সব বিবেচনায় তাঁকে সশস্ত্র পুলিশ প্রহরা দেওয়া হয়েছিল। হামলার সময় পুলিশ তাঁর পাশেই ছিল। কিন্তু হামলা ঠেকানো যায়নি। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে তিনি তখন একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দৌড়ে এসে বহিরাগত হামলাকারীকে ধরে ফেলেছেন এবং পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। এটাও কম নয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে নিরাপত্তার আরো উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল না কি? এর আগেও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের কক্ষে ঢুকে শিক্ষককে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। তার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তায় এত ঘাটতি কেন? কিভাবে অস্ত্র নিয়ে বহিরাগত যুবক ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারল? প্রশাসনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা নতুন করে ভাবতে হবে।
এই হামলা শুধু অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলা নয় এটি সৎ চিন্তা, আদর্শবোধ, সুকুমার চর্চা, তথা সভ্যতার পথে এগিয়ে চলার ওপর অপশক্তির আঘাত। এর আগেও অনেক শিক্ষাবিদ ও মুক্তচিন্তার মানুষের ওপর অন্ধকারের শক্তি একইভাবে হামলা করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ড. আবু তাহের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদসহ অনেককেই হারিয়েছি আমরা। অন্ধকারের শক্তির এই আঘাত চলতেই থাকবে, যদি না রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের দমনে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আরো অনেক শিক্ষাবিদকেই একই ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর এই বর্বর ও কাপুরুষোচিত হামলার আমরা নিন্দা জানাই। হামলাকারীসহ এই হামলার পেছনে যারা ছিল, তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোরও দাবি জানাচ্ছি।

মশার উৎপাত রোধ জরুরী

মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ নগরীর জনজীবন। ঘরে-বাইরে, এমনকি যানবাহনেও মশার হাত থেকে নিস্তার নেই। এগিয়ে আসছে বর্ষা মৌসুম। সে সময় যেখানে-সেখানে পানি জমে থাকবে, মশার বংশবিস্তার কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। সিটি করপোরেশনের অধিকতর সেবা কি পাচ্ছে নগরবাসী? মশার উৎপাতে সেই প্রশ্নই আবার নতুন করে উঠে এসেছে। অন্য শহরগুলোর অবস্থাও খুব ভালো নয়।
মশা নিয়ে ভয়ের কারণ শুধু কামড়ের যন্ত্রণা নয়, মশাবাহিত রোগব্যাধির ভয়ই বেশি। ডেঙ্গুতে প্রতিবছর বহু মানুষের মৃত্যু হয়। কয়েক বছর ধরে চিকুনগুনিয়ার উৎপাত রীতিমতো এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। জ্বর সারলেও বহু মানুষকে বহুদিন ধরে ব্যথায় কাবু থাকতে হয়। শিশু, বয়স্ক, দুর্বল অনেক রোগীর মৃত্যুও হয়। ম্যালেরিয়া নতুন শক্তিতে ফিরে আসছে। ফাইলেরিয়া অঞ্চল বিশেষে এখনো বড় সমস্যা হয়ে আছে। আবার মশাবাহিত কিছু রোগ দুনিয়াব্যাপী নতুন নতুন আতঙ্কের কারণ হচ্ছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে ইবোলা। কে জানে কবে আবার বাংলাদেশেও ইবোলার খড়গ নেমে আসবে। তাই মশা নিয়ন্ত্রণে সারা দুনিয়াই বিশেষ তৎপরতা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে, বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে মশা নিয়ন্ত্রণে এত উদাসীনতা কেন? জানা যায়, এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন বা নগর কর্তৃপক্ষগুলোর লোকবল খুবই কম। ওষুধ ছিটানোর যন্ত্র কম, তারও বেশির ভাগ অকেজো। ওষুধও কার্যকর নয়। অভিযোগ আছে, ছিটানো ওষুধে মশার কিছুই হয় না। জনস্বাস্থ্য কি এসব কর্তৃপক্ষের কাছে কোনোই গুরুত্ব বহন করে না?
মশা পানি ছাড়া বংশবিস্তার করতে পারে না। নগরে মশার বংশবিস্তার বেশি হওয়ার কারণ যত্রতত্র নালা-নর্দমা, খানাখন্দে পানি জমে থাকা। টায়ার, পরিত্যক্ত পাত্র বা কৌটা, ডাবের খোসা, এমনকি পলিথিনেও পানি জমে থাকলে সেগুলোতেও মশা বংশবিস্তার করতে পারে। সে কারণেই বর্ষায় মশার উপদ্রব চরমে ওঠে। তাই বর্ষা শুরুর আগেই মশা নিধনে ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। নগরীর ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। নিয়মিত ওষুধ ছিটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনকে যেমন উদ্যোগ নিতে হবে, তেমনি নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। পানি জমতে পারে এমন পরিত্যক্ত বস্তু বাড়ির আনাচকানাচে থাকলে সেগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। পানি জমে এমন খানাখন্দ ভরাট করে ফেলতে হবে। ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। এ কাজেও সিটি করপোরেশন নাগরিকদের সংগঠিত ও সচেতন করার উদ্যোগ নিতে পারে।

 

রোহিঙ্গা সমস্যা দূর করতে হবে

মিয়ানমার সীমান্তে ফের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকার সীমান্তে মিয়ানমার হঠাৎ করেই ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও সেনা মোতায়েন শুরু করে। সেখানে নো ম্যানস ল্যান্ডে থাকা সাত হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঢুকে যাওয়ার জন্য ভয়ভীতি দেখাতে থাকে। ফাঁকা গুলিও বর্ষণ করে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবিকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তৈরি থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে, তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে এবং শিগগিরই প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে, সেখানে মিয়ানমারের এমন আচরণ মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। আমরা আশা করি, মিয়ানমার যুক্তিসংগত আচরণ করবে এবং উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া ভণ্ডুল করার মতো কোনো অপরিণামদর্শী কাজ থেকে বিরত থাকবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মিয়ানমারের সর্বশেষ সেনা সমাবেশের ঘটনাকে তেমনি কোনো টালবাহানার ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, দেশটির সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের একটি বড় অংশই চায় না রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যাক। বিশ্বে কোণঠাসা হয়ে পড়ায় তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হলেও এখন নানা রকম ছুতা তৈরির চেষ্টা করছে। সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা তেমনই একটি অপকৌশল মাত্র। বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। শেষ সময় পর্যন্ত চূড়ান্ত ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। কোনোভাবেই তাদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া চলবে না। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তা এক মারাত্মক আঘাতস্বরূপ। তা ছাড়া উদ্ভূত পরিস্থিতি স্থানীয় সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি করছে। এই অবস্থা যত দীর্ঘায়িত হবে ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে। অন্যদিকে আসন্ন বর্ষায় রোহিঙ্গাদের জন্য যে বিপর্যয়কর অবস্থা নেমে আসবে, তাকে সামাল দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করতে হবে। আর সে জন্য মিয়ানমারের সদিচ্ছা সবচেয়ে জরুরি। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। মিয়ানমার যাতে অজুহাত সৃষ্টি করে চুক্তি বাস্তবায়ন থেকে সরে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সকল দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন

চলতি বছরকে বলা হচ্ছে নির্বাচনের বছর। দেশের সব শ্রেণির মানুষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দৃষ্টি একাদশ সংসদ নির্বাচনের দিকে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অংশগ্রহণ না করায় অনেক প্রশ্ন ওঠে। আগামী নির্বাচন যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে বিষয়ে সরকারি দলও সমান সতর্ক। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, সব দলের অংশগ্রহণে এবারের নির্বাচন হতে হবে। তিনিও চান নির্বাচন যেন কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।
নির্বাচন কিভাবে গ্রহণযোগ্য করা যায়, তা নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাদের। অন্যদিকে দলের চেয়ারপারসন আদালতের রায়ে দণ্ডিত হওয়ায় নতুন এক বাস্তবতা দলটির সামনে এসে পড়েছে। এ অবস্থায় দলটি মনে করছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া আগামী নির্বাচন কোনোভাবেই অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ হবে না। জাতিসংঘ কমনওয়েলথ ও ইউরোপীয় কমিশনকে এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছে বিএনপি। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে, বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করছে তারা। যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতও জোর দিয়ে বলেছেন, আগামী দিনে বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় উভয় দেশ।
এ কথা অনস্বীকার্য, অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো দেশের উন্নয়ন গতিশীল হতে পারে না; দীর্ঘস্থায়ী হয় না। জবাবদিহিমূলক সরকার গঠনেরও পূর্বশর্ত হচ্ছে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবশ্যই অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য সব রাজনৈতিক দলকে এখন থেকেই সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে। নির্বাচনে জয়-পরাজয় আছে। সবাই জয়ী হওয়ার জন্যই নির্বাচনে অংশ নিয়ে থাকে। কিন্তু জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতেই নির্ধারিত হয় জয়-পরাজয়। কাজেই জয়ের জন্য নির্বাচনের মাঠে অবতীর্ণ হলেও পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা অবশ্যই সব দলের মধ্যে থাকতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি দলকেও অন্য রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি নির্বাচন কমিশনকেও নিরপেক্ষ ও কঠোর হতে হবে। সবার সহযোগিতা ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা যাবে না।

 

 

প্রশ্ন ফাঁস রোধে বিকল্প ব্যবস্থা

পরীক্ষায় পাসের হার কিংবা শিক্ষার মান নয়, মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। প্রাথমিক সমাপনী থেকে শুরু করে এমন কোনো পরীক্ষা নেই, যেখানে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছে না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলতে গেলে গলদঘর্ম। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব হয়নি। এসএসসিতে প্রায় প্রতিটি পরীক্ষায়ই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁসের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে। বিকাশ নম্বরে টাকা লেনদেন হয়েছে। পরীক্ষা চলাকালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অন্তত ১৫৩ জন গ্রেপ্তার হওয়ার পরও রহস্য উদ্ঘাটনে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি আছে বলে মনে হয় না। প্রযুক্তি ও জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে ছয়টি গ্রুপের অর্ধশতাধিক অ্যাডমিনকে নজরদারিতে রাখার কথা জানানো হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে। কিন্তু এরই মধ্যে আগামী এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন দেওয়ার আগাম ঘোষণা দিয়েছে শতাধিক গ্রুপ, যাদের হোতাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা গোয়েন্দা তৎপরতা দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব হবে না। এর জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। এইচএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেশ কিছু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রশ্ন ফাঁস হলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে এবার বাড়তি সেট রাখা হবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা শতাধিক কেন্দ্রও বাতিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সর্বোপরি ট্রেজারিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। এবার প্রশ্নপত্রের একাধিক সেটও ছাপার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগে চার সেট প্রশ্ন করে লটারির মাধ্যমে দুই সেট প্রশ্ন ছাপা হতো। এবার চার সেটই ছাপা হবে। এতে মন্ত্রণালয়ের হাতে একাধিক বিকল্প থাকবে। অন্যদিকে প্রশ্ন প্রণয়ন, গ্র“ফ দেখা থেকে শুরু করে ছাপা ও বিতরণ পর্যন্ত যে দীর্ঘ কার্যক্রম, তা পরিচালনায় সিআইডির পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, অটোমেটিক মেশিনে প্রশ্নপত্র ছাপানো। যেখানে ছাপা শুরু হওয়া থেকে শুরু করে প্যাকেট হওয়া পর্যন্ত কোথাও মানুষের হাতের স্পর্শ থাকবে না। একই সঙ্গে প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে ছাপার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর গোয়েন্দা সংস্থাকে দেওয়ার জন্যও বলা হয়েছে। একবার ব্যবহারযোগ্য বাক্সে প্রশ্নপত্র প্যাকেট করা হলে তা দ্বিতীয়বার বন্ধ করার কোনো উপায় থাকবে না।
প্রশ্ন ফাঁস এখন একটি বড় সামাজিক ব্যাধির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করতে না পারলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কাজেই প্রশ্ন ফাঁস রোধে সম্ভব সব ব্যবস্থা নিতে হবে। যেকোনো মূল্যে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনারোধে পদক্ষেপ চাই

আমাদের জাতীয় চরিত্রে অস্থির, অসহিষ্ণু এক প্রবণতা গেড়ে বসেছে। যুক্তি-অধিকারের ভিত্তিতে নয়, অর্থের জোরে, ক্ষমতার জোরে, গায়ের জোরে অগ্রবর্তী হওয়াই এ প্রবণতার বৈশিষ্ট্য। সামনের জন বা পাশের জন তাতে মুখ থুবড়ে পড়লেই কী! গা-জোরি প্রবণতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায় সড়কে-মহাসড়কে, বিশেষ করে রাজধানীর গলি-অ্যাভিনিউতে। বাস-টেম্পো প্রভৃতি যাত্রী ওঠানোর জন্য বা আগে যাওয়ার জন্য রীতিমতো মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হয়। গায়ে মল্লযুদ্ধজনিত ‘ক্ষত’ নিয়েই অহর্নিশ চলছে গাড়িগুলো। অসহিষ্ণু এই প্রবণতার প্রত্যক্ষ ফল দুর্ঘটনা; প্রতিদিনই ঘটছে, আহত বা নিহত হচ্ছে মানুষ। সোমবার দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও প্রায় ১০০ জন আহত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের এক দুর্ঘটনায়ই ১০ জন নিহত হয়েছে। ওই ঘটনায় আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক লোক। ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। প্রত্যক্ষদর্শী ও যাত্রীদের অভিযোগ, বাসচালকের বেপরোয়া মানসিকতার কারণে ঘটনাটি ঘটেছে। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে চালক পেছন থেকে একটি কাভার্ড ভ্যানকে ধাক্কা দিলে বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। কিছু আগে বাসটির চালক কাঁচপুরে একটি রিকশাকে ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে আসে। সোমবার আরো ৯ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত হয়েছে।
রাজধানী সহ দেশে প্রত্যন্তঞ্চলে প্রতিদিন কত দুর্ঘটনা ঘটে তার হিসাব নেই। বড় কিছু না ঘটলে অর্থাৎ কেউ আহত বা নিহত না হলে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলতে চাই না আমরা। দিন দিন বাড়ছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে প্রাণহানি। আগের বছরের তুলনায় ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ২২ শতাংশ বেশি হয়েছে। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অভিমত, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ নিয়ন্ত্রণহীন গতি। এ জন্য চালকরাই দায়ী। ৫৩ শতাংশ ঘটনার কারণ অতিরিক্ত গতি এবং ৩৭ শতাংশ ঘটনার কারণ বেপরোয়া মানসিকতা। বাকি ১০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে অন্যান্য কারণে। দুর্ঘটনাগুলোর ৪৩ শতাংশই ঘটছে মহাসড়কে। বিভিন্ন গবেষণার ফলে দেখা যায়, শুধু বেপরোয়া মানসিকতাই নয়, চালকদের প্রশিক্ষণও যথাযথ নয়, সড়কে গাড়ি চালনার আইন সম্পর্কেও তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। দায়িত্ববোধের বালাই নেই অধিকাংশের মধ্যে। এ অবস্থায়ই তারা লাইসেন্স বাগিয়ে নিচ্ছে ‘ম্যানেজ’ করে। লাইসেন্স পাওয়ার পদ্ধতি খুবই দুর্বল। এর সুযোগ যেমন চালকরা নিচ্ছে, তেমনি ফায়দা লুটে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগও নেই। যাত্রীবীমা করে ইনস্যুরেন্স কম্পানিগুলো টাকা নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা পায় না। এসব নিয়ে তো কম কথা হচ্ছে না, কম লেখালেখি হচ্ছে না। তার পরও সড়ক আইনের প্রয়োগ চোখে পড়ে না। আইনের প্রয়োগহীনতা চালকদের বেপরোয়া হওয়ার আরো সুযোগ করে দিচ্ছে। কবে এসবের অবসান হবে, সড়কে-মহাসড়কে কবে বন্ধ হবে বলিদান?