বিভাগ: সম্পাদকীয়

সড়কে শৃঙ্খলার বিকল্প নেই

দেশের ছয় জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে শনিবার সকালের মধ্যে অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় বাস উল্টে ১৬ জন এবং রংপুরে বিআরটিসির বাসে ট্রাকের ধাক্কায় ছয়জন নিহত হয়েছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বাস খাদে পড়ে নিহত হয়েছে দুজন। এ ছাড়া নাটোর, গোপালগঞ্জ ও সাভারের আমিনবাজারে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের এসব ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনায় আরো অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্বের দুর্ঘটনাপ্রবণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। এখানে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন প্রাণ হারায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) মনে করে, গণপরিবহনের যে মান থাকার কথা, তা নেই। গণপরিবহন করপোরেট কালচার নিয়ে এগোলে, চালক ও বাস মানসম্পন্ন হলে, বাস চলাচলের জন্য স্পেশাল লেন থাকলে এ ধরনের দুর্ঘটনা হয় না। বাংলাদেশে চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই, মুনাফা বাড়ানোর জন্য চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো হয়। অত্যধিক ক্লান্তি ও গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে যাওয়ার কারণেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। আবার বেপরোয়া গতি, প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানো, গাড়ি চালাতে চালাতে মোবাইল ফোনে কথা বলাসহ বহু অনিয়ম ঘটে রাস্তায়। যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, বর্তমানে সারা দেশে নিবন্ধিত ৩১ লাখ যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনিবন্ধিত, ভুয়া নম্বরধারী ও অযান্ত্রিক যান মিলে প্রায় ৫০ লাখ যানবাহন রাস্তায় চলছে; যার ৭২ শতাংশের ফিটনেস নেই। এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। অন্যদিকে সারা দেশে ৭০ লাখ চালকের মধ্যে বিআরটিএর লাইসেন্স আছে মাত্র ১৬ লাখ চালকের হাতে। লাইসেন্সহীন অদক্ষ চালকের হাতে, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের হাতেও গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া হয়। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনা, হতাহতের সংখ্যা। রাস্তায় মৃত্যুর মিছিল লেগেই আছে। যাদের এসব নিয়ন্ত্রণ করার কথা তারাও যেন উদাসীন।
আমরা এমন অনিরাপদ সড়ক চাই না। প্রতিদিনের অপমৃত্যুও আমাদের কাম্য নয়। যেকোনো মূল্যে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। দক্ষ ও যোগ্য চালক ছাড়া কারো হাতে লাইসেন্স তুলে দেওয়া যাবে না। গাড়ির ফিটনেসের ব্যাপারে কোনো আপস করা যাবে না। সড়কে নজরদারি জোরদার করতে হবে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল কমিয়ে আনতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কোনো বিকল্প নেই। আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান

মিয়ানমারে হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ এক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। নারী, শিশুসহ প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা অত্যন্ত কষ্টকর জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশ তার সাধ্যমতো রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও অসহায় রোহিঙ্গাদের বাঁচিয়ে রাখতে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) মিয়ানমারের কাছে জানতে চেয়েছেন, কোন প্রেক্ষাপটে এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি দেশটির ওপর আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার সম্পর্কেও মিয়ানমারকে অভিমত জানাতে বলা হয়েছে। এ জন্য ২৭ জুলাই পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১-এর বিচারক ও প্রসিকিউটরদের ‘স্ট্যাটাস কনফারেন্সে’ গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মিয়ানমারকে এসব জানাতে বলা হয়।
শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা বংশপরম্পরায় মিয়ানমারে বসবাস করলেও প্রায় চার দশক আগে মিয়ানমার তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়। এর পর থেকেই তাদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে দেশটির সামরিক বাহিনী। এমন নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৯৭৮, ১৯৯২ ও ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। প্রথম দিকে কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত নিলেও পরবর্তীকালে তাদের ফেরত না নেওয়ার জন্য মিয়ানমার নানা রকম কৌশল করতে থাকে। গত বছর রোহিঙ্গাদের ওপর বড় ধরনের হামলা শুরু হলে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই হামলাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞের প্রকৃষ্ট উদাহরণ’ হিসেবে দেখছে। অনেক বিশ্বনেতা একে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজনমত এই জঘন্য হামলার উপযুক্ত বিচার চায়। সেভাবেই আইসিসির সামনে বিষয়টি উপস্থাপিত হয় এবং আইসিসি বিচারপূর্ব প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে থাকে। এখানে কিছু সমস্যাও রয়েছে। বাংলাদেশ আইসিসির সদস্য হলেও মিয়ানমার তা নয়। তাই প্রশ্ন উঠেছে, আইসিসি মিয়ানমারের ওপর বিচারিক এখতিয়ার রাখে কি না। এ ব্যাপারে মিয়ানমারের অভিমত আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে। আদালত যদি মনে করেন যে তাঁর সদস্য দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সদস্য নয় এমন দেশের ক্ষেত্রেও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যাবে, তাহলে সেটি হবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ এবং বিশ্বে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক। অনুরূপ বর্বরতায় সদস্য নয় এমন যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে আইসিসির বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে।
বিশ্বমানবতার স্বার্থেই গণহত্যা বা জাতিগত নিধনযজ্ঞের মতো প্রতিটি ঘটনা বিচারের আওতায় আসা জরুরি, তা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই হোক না কেন। মিয়ানমার যা করেছে, সারা পৃথিবীর কাছেই তা এখন স্পষ্ট। আমরা আশা করি, এ ব্যাপারে আইসিসি সঠিক পথেই এগিয়ে যাবে।

প্রকৃত রূপ

রুহুল আমিন আপ্পু

মানুষ বলিবো কারে?
মৌলবাদী গিঁটি ধারি বাঁধিছে এক দড়ে।

ধর্মের নামে চলে কর্তৃত্বের অধিকার,
মধ্যে পড়ে নির্দোষ ব্যক্তি খেয়ে যায় মার।

জঙ্গি হানা আজি বিশ্বে গেছে ছেয়ে,
তারা যে সত্যিই কোন ধর্মের দেখেছো কী চেয়ে?

আপাত দৃষ্টিতে করিওনা তারে বিচার,
কোনো ধার্মিক ব্যক্তির নয় এরূপ আচার।

ধর্ম তাদের মুখ্য বুলি নেপথ্যে অন্য কিছু,
যদি করতে চাও সত্যের সন্ধান নাও তাদেরি পিছু।

সমীক্ষা সঠিক নয় যখন সেটা সার্বজনীন,
ধরা মারা কাটা শেখায়নি গো আমাদের দ্বীন।

পর্যটনের স্বার্থে সড়ক সংস্কার

অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা যেমন এখানে ছুটে আসে, তেমনি দেশের অভ্যন্তর থেকেও পর্যটকরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যায়। বাংলাদেশের পর্যটনের লীলাভূমি বলা হয়ে থাকে সিলেটকে। সিলেটের পর্যটন স্পটগুলো বরাবর পর্যটকদের আকৃষ্ট করেছে। ঈদ ও অন্যান্য ছুটির সময় এসব স্পটে পর্যটকদের ভিড় দেখা যায়। কিন্তু এবারের ঈদের ছুটিতে সিলেটে গত বছরের তুলনায় পর্যটকদের উপস্থিতি অর্ধেকেরও কম বলে জানা গেছে। এতে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িতরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সিলেটের জাফলং প্রকৃতিকন্যা নামে পরিচিত। সিলেটের সুন্দরবন নামে খ্যাত রাতারগুল জলাবন। বিছানাকান্দি নামের পর্যটন স্পট সম্পর্কেও পর্যটকদের আগ্রহ আছে। বৃহত্তর সিলেটের ভোলাগঞ্জ, হাকালুকি হাওর ও টাঙ্গুয়ার হাওর জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। পাহাড়, হাওর, সমতলভূমি, চা-বাগান নিয়ে সিলেট আগ্রহ সৃষ্টি করলেও এবার ঈদের ছুটিতে সেখানে পর্যটকদের ভিড় নেই শুধু বেহাল সড়কের কারণে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অবস্থা অনেক দিন থেকেই খারাপ। অন্যদিকে সিলেট থেকে বিভিন্ন পর্যটন স্পটে যাওয়ার সড়কগুলোর অবস্থাও নাজুক। দীর্ঘদিন থকে ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে সিলেট-জাফলং, সিলেট-রাতারগুল, সিলেট-বিছানাকান্দি সড়কসহ অন্যান্য সড়ক। সংস্কারের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একেবারেই উদাসীন বলে মনে হয়। এর প্রভাব পড়েছে এবার পর্যটনশিল্পে।
বর্তমান বিশ্বে পর্যটনশিল্পকে অদৃশ্য রপ্তানিপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পর্যটন এমন এক শিল্প, যেখানে আয়ের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তৃতীয় বিশ্বের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে পর্যটনশিল্প বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। অথচ সবারই জানা পৃথিবীর অনেক দেশ শুধু পর্যটনশিল্পের ওপর নির্ভর করে থাকে। ২০১১ সালে লোনলি প্লানেট নামের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, বিদেশি পর্যটকদের জন্য পৃথিবীর সেরা দেশ হওয়ার সব সম্ভাবনা বাংলাদেশের আছে। সেই সম্ভাবনার কতটুকু কাজে লাগাতে পেরেছি আমরা?
পর্যটনশিল্পের বিকাশের জন্য সবার আগে প্রয়োজন অবকাঠামো। পর্যটন স্পটে যাওয়ার জন্য সড়ক অবকাঠামো যদি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তাহলে সেখানে পর্যটক খুঁজে পাওয়া যাবে না। পর্যটন স্পটের অর্থনীতিও নির্ভর করে পর্যটকদের ওপর। কিন্তু সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সুন্দর না হলে সেখানে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যাবে না। বিষয়টি অনুধাবন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোর বেহাল সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নেবে বলে আমরা মনে করি।

শিক্ষা ব্যবস্থায় নীতিমালা

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সমন্বয় নেই। অনেক দিন ধরেই এ দশা চলছে। আশির দশকের মাঝামাঝি শিক্ষাক্রম ও শিক্ষার মাধ্যমসংক্রান্ত জটিলতা প্রকট হতে শুরু করে। এখন তা বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ শিক্ষার বেসরকারীকরণ। ওই সময় শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের যাত্রা শুরু হয়, তাদের শিক্ষাক্রম আবার এ দেশীয় নয়। আগেও কিছু প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার সুযোগ ছিল, তবে তারা একই শিক্ষাক্রম মেনে চলত। স্কুল-কলেজগুলো ছিল সম্পূর্ণ সরকারি অথবা আধা সরকারি; সম্পূর্ণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছিল হাতে গোনা। এখন মফস্বলেও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ক্রমে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও মাদরাসার সংখ্যা বাড়ছে; শহরে এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরই আধিক্য।
শহরে মধ্যবিত্তের পকেট কেটে বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলো চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দরিদ্র বা নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তানের প্রবেশাধিকার নেই। কারণ তাদের মা-বাবার পকেটের আকৃতি এসব প্রতিষ্ঠানের চাহিদার সমানুপাতিক নয়। তাদের ভরসা সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম। মফস্বলে বা গ্রামাঞ্চলে শহরের আদলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়। যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেখানে গড়ে উঠেছে সেগুলো কোচিং সেন্টারের বেশি কিছু নয়। এসবের বাইরে যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে সেগুলো সরকারি না হলেও প্রচলিত অর্থে ‘বেসরকারি’ নয়। স্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সহায়তায়, কিছুসংখ্যক উদ্যোক্তা-শিক্ষকের চেষ্টায় সেগুলো চলে। তাঁরা বেশি সময় এই ‘বেসরকারি’ অবস্থায় থাকতেও চান না। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রায়ই সরকারি সহায়তার দাবিতে রাজপথে নামেন। তাঁদের কাম্য এ সরকারি সহায়তার নাম এমপিও (মান্থলি পে-অর্ডার)। ২০১০ সালের পর থেকে এমপিও প্রদান বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয় আশ্বাস দিয়েছে। তার পরই জারি করা হয়েছে এমপিও নীতিমালা ২০১৮।
নীতিমালা অবশ্যই থাকা উচিত। কিন্তু তার প্রয়োগ সহজ ও যুক্তিসংগত হতে হবে। নীতিমালা যদি এমপিওভুক্তির প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। সদ্য জারি করা নীতিমালা নিয়ে এ শঙ্কাই করছে শিক্ষক-কর্মচারী মহল। বর্তমানে সরকারের তালিকাভুক্ত নন-এমপিও স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা পাঁচ হাজার ২৪২টি; শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ৮০ হাজারের বেশি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা প্রায় বিনা বেতনে কাজ করছেন। নতুন নীতিমালার কারণে যাঁদের এমপিওভুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তাঁরা বিপাকে পড়বেন। শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হয় না, সেটিকে হতে হয় বাস্তবানুগ, না হলে কাজে আসে না। যেসব শিক্ষক-কর্মচারীকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তাঁরা যেন প্রতারিত না হন, বঞ্চিত না হন। নতুন নীতিমালা অনুসরণ করার সময় বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে আশা করি। জাতির ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সরকারীকরণ বা এমপিওভুক্তিকরণ যৌক্তিক হারে অব্যাহত রাখাই উত্তম।

দুর্বৃত্তপনা রোধ করুন

ঈদের ছুটিতে ঢাকাসহ সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। খুনখারাবির একাধিক ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন এলাকায়। রাজধানীতে একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। দায়িত্ব পালনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৈথিল্যের কারণে এবার ঈদের ছুটির সময় খুনখারাবির ঘটনা বেশি ঘটেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যে সময় দেশের আইন-শৃৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সবচেয়ে বেশি সতর্ক অবস্থায় থাকার কথা, সেই সময়ই এ ধরনের ঘটনাগুলো সাধারণের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়া এলাকায় খুন হয়েছে শিশু নিনাদ, যার নাম রেখেছিলেন দেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। ঈদের দিন দুপুরে বাড়ির পাশের ফাঁকা জায়গায় দাঁড় করানো তালাবদ্ধ ভ্যান থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। যাত্রাবাড়ীতে স্বামীর মারধরের পর এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকায় ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া। ঈদের ছুটির আগে বৃহস্পতিবার ভোরে সীমান্ত স্কয়ারের কাছে এক জার্মান তরুণীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে প্রাইভেট কার আরোহী ছিনতাইকারীরা। ঈদের ছুটির তিন দিনে পাহাড়ে জনসংহতি সমিতির তিন সদস্যকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গত রবিবার ভোরে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার একটি গজারি বন থেকে এক শিশুর গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ঈদের ছুটিতে নাটোর, নোয়াখালী, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ী, ঝালকাঠি, জামালপুর, গাজীপুর ও পঞ্চগড় জেলায় ৯ জন খুন হয়েছে। আরো তিন জেলায় তিনটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার রাজধানীর বাড্ডায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন্ স্থানে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির খবর সবার জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আরেকটি সাধারণ নির্বাচন যতই এগিয়ে আসবে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ততই অবনতি হতে পারে বলে অভিজ্ঞমহল থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছিল। সেই আশঙ্কাই যেন সত্যে প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। যেকোনো নির্বাচনের সময় দেশের অভ্যন্তরে দুর্বৃত্তরা সক্রিয় হতে শুরু করে। একটি বিশেষ মহলও এ সময় তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। এমনিতেই দেশের অভ্যন্তরে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো নতুন করে সংগঠিত হতে শুরু করেছে। এর পাশাপাশি সন্ত্রাসীরাও শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এখন মাদক নিয়ন্ত্রণ ও মাদক কারবারিদের দমনে বেশি মনোনিবেশ করছে। এই ফাঁকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো আবার সক্রিয় হতে চাইছে বলে ধারণা করা যেতে পারে। এ ছাড়া আমাদের দেশে ব্যক্তি ও গোষ্ঠী পর্যায়ের দ্বন্দ্বও অনেক সময় খুনখারাবির মতো ঘটনায় রূপ নেয়। কাজেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 

ঈদ উদযাপন

ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষ হয়েছে। অনেক ভোগান্তি সয়ে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে বাড়ি গিয়েছিল অসংখ্য মানুষ। সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে চাকরিতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের অনেকে ফিরেছেন। আবার অনেকে একা ফিরেছেন। পরিবার-পরিজন ফেরেনি, তাই গতকালও শহরগুলো ফাঁকা ছিল। বাকিরাও ফিরতি যাত্রা শুরু করেছে। আজ থেকে আবার ভিড় বাড়তে শুরু করবে রাজধানী ও অন্যান্য শহরে। তবে পুরোপুরি কর্মব্যস্ত হতে দিন কয়েক লেগে যাবে।
গতকাল সরকারি-বেসরকারি সব দপ্তরই খুলেছে। কর্মচারীদের ধারণা, এ সপ্তাহে সরকারি দপ্তরে উপস্থিতি কমই থাকবে। আগামী সপ্তাহের আগে অফিসপাড়া পুরো সচল হবে না।
কর্মজীবী মানুষ শহরে ফিরেছে বটে, তবে এ শহরের চেনা চেহারায় ফিরতে কয়েক দিন লাগবে। এবার ছুটি ছিল তিন দিন। বেশ কয়েক বছর ঈদের ছুটি ছিল চার দিন। আগে-পিছে সাপ্তাহিক ছুটিও ছিল। ফলে সাত-আট দিন ছুটি কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। এবার শুক্র ও শনিবার ঈদের ছুটির মধ্যে পড়ে যাওয়ায় কার্যত ছুটি ছিল এক দিন। তাই আনন্দ উদযাপন অসম্পন্ন রেখেই ফিরতে হচ্ছে লোকজনকে। এ কারণে কিছু আক্ষেপ রয়েছে তাদের মধ্যে।
বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, ঈদের ছুটি (উৎসব ছুটি) বাড়িয়ে দেওয়া হোক। অনেক দেশেই লম্বা উৎসব ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। সারা বছরের ছুটির সঙ্গে তা সমন্বয় করে নেওয়া যেতে পারে। এমনিতেই আগে-পিছে শুক্র-শনিবার পড়ে গেলে সাত-আট দিনের ছুটি পড়ে যায়। সপ্তাহখানেকের ছুটি নির্ধারিত থাকলে প্রস্তুতি নিতে সুবিধা হতো। রেল-সড়ক-নৌপথ সব পথের পরিবহনের ওপর চাপ কম পড়ত। ভাড়া-সন্ত্রাস বন্ধ হতো। দুর্ঘটনার হার কমত। সর্বোপরি প্রশান্ত চিত্তে কাজে যোগ দেওয়া যেত। সরকার বিষয়টি অগ্রাহ্য করেনি, তবে কার্যকর সিদ্ধান্তও নিতে পারেনি।
ঈদের ছুটি দীর্ঘ হলে অনেকে অন্যত্র বেড়াতে যাওয়ার চিন্তাও করতে পারত। পর্যটনশিল্পের কিছুটা হলেও লাভ হতো। ঈদ মুসলমান সম্প্রদায়ের বিশাল ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসবের আবহ ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য তৈরি করা সম্ভব হলে আন্ত সম্প্রদায় যোগাযোগ ও সহমর্মিতা বাড়ত আর তা দেশের ভাবমূর্তিকেই উজ্জ্বল করত। সমাজের স্বাস্থ্য ও মানসিকতার উন্নতি হতো। এখন যে সে রকম যোগাযোগ বা সৌহার্দ্য-বিনিময় হয় না, তা নয়। তবে তা ব্যক্তিপর্যায়ে সীমিত, ব্যাপক অর্থে সামাজিক হয়ে ওঠেনি। ঈদ উৎসব হয়ে উঠুক সবার জন্য, এ কথা ইদানীং বলছে অনেকে। আমাদের সবার সে চেষ্টা থাকা দরকার। আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাটিকেও সবার আনন্দ উদযাপনের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাষ্ট্রের।

 

পবিত্র ঈদুল-ফিতর

প্রতিবছরের মতো আবারও এসেছে ঈদ-উল-ফিতর, মুসলমানদের সবচেয়ে বড় আনন্দ-উৎসব। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর এসেছে খুশির এই উপলক্ষটি। ঘরে ঘরে, জনে জনে আনন্দ ও খুশির বার্তা বয়ে এনেছে এই ঈদ। দিনটি ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলকে এক কাতারে শামিল করার চেতনায় উজ্জীবিত করে, কল্যাণের পথে ত্যাগ ও তিতিক্ষার মূলমন্ত্রে দীক্ষিত করে। ঈদের আগে রোজার একটি মাস সংযম ও আত্মত্যাগের মাস। রোজার কঠোর অনুশীলন ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি এবং গরিব-দুঃখী-অনাহারীদের কষ্ট অনুভবের প্রেরণা দেয়। এ সময় গরিব-দুস্থদের ঈদের আনন্দে শরিক করার জন্য রয়েছে ফিতরা ও জাকাতের ব্যবস্থা, যা বিত্তবান প্রতিটি মুসলমানের জন্য অবশ্যই প্রদেয়। ঈদের নামাজের ভেতর দিয়ে ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করা হয়। নতুন পোশাক পরে সকালে ঈদগাহে নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কর্মসূচী। ধনী-দরিদ্র সবাই এই দিন আনন্দে মেতে ওঠে।
ঈদুল ফিতরের মূল তাৎপর্য বিভেদমুক্ত জীবনের উপলব্ধি। ভুল-ভ্রান্তি, পাপ-পঙ্কিলতা মানুষের জীবনে কমবেশি আসে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ চান মানুষ পাপ ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে সৎপথে ফিরে আসুক। সম্প্রীতির আনন্দধারায় সিক্ত হয়ে উন্নত জীবন লাভ করুক। ঈদ-উল-ফিতর মানুষকে এই শিক্ষা দেয়।
দিবসটির উৎসব তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে সমাজের ধনী-দরিদ্রের সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে। শ্রেণীবৈষম্য বিসর্জনের মধ্য দিয়েই এ আনন্দ সার্থক হয়ে ওঠে। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারও ঈদ উদযাপিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মানুষ ব্যাপকভাবে ঈদের কেনাকাটা করছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ঈদের বাজারে কেনাকাটা অনেক বেশি। শহরের মানুষ গ্রামমুখী হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
এবার ঈদে ঘরেফেরা মানুষের দুর্ভোগ কমবে বলে সরকারী উচ্চপর্যায় থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। আশা করা যায়, সে আশ্বাস সফল হবে। ঈদের ছুটিতে রাজধানী শহর থেকে লাখ লাখ মানুষ গ্রামের বাড়িতে যায় পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে। অনেক যাত্রীকে বিড়ম্বনার মধ্য দিয়ে ঘরে ফিরতে হয়। ঈদের উৎসব শেষে আবার অগণিত মানুষ ফিরে আসবে শহরে, কর্মস্থলে। যাওয়া-আসার সময় বহু মানুষকে পড়তে হয় নানা বিড়ম্বনায়। ঈদ উপলক্ষে ঘরে ফেরার যে আনন্দ হওয়ার কথা এসব বিড়ম্বনার কারণে বহু জনের সে আনন্দ অনেকটা কমে যায়। যেসব মানুষ নাড়ির টানে গ্রামে ঈদ করতে গেছেন তারা যদি পুনরায় নিরাপদে কর্মস্থলে ফিরতে পারেন তবেই তাদের ছুটিতে ঘরে ফেরার আনন্দ পূর্ণতা পাবে।
নানা ভোগান্তি আর কষ্টের পরও আপনজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার অনুভূতিই আলাদা। ঈদ বিভেদ-বৈষম্যহীন, ভ্রাতৃচেতনায় ঋদ্ধ এক নির্মল আনন্দ-উৎসব-বিনোদনের উপলক্ষ। এই উৎসবের দিনে সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে হবে আনন্দ। রমজান আমাদের চিত্তশুদ্ধির যে শিক্ষা দিয়েছে, সেই শিক্ষার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তি ও শ্রেয়োবোধের চেতনায় স্থিত হতে হবে। ঈদ-উল-ফিতর উদযাপনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব সকল প্রকার হিংসা, হানাহানিমুক্ত হোক। জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসের বিভীষিকা দূর হোক।

প্রধানমন্ত্রীর জি-৭ সফর

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রমেই বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসীন হয়ে আসছে। যা বাঙালী জাতির জন্য গৌরব। আনন্দ ও জাগরণের এক মহাদিগন্ত উন্মোচন করছে। বিশ্ববাসী তার নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে চলছে, যেভাবে দেশবাসীও। বাংলাদেশ এখন বিশ্ব দরবারে রোল মডেল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্ব মঞ্চে শেখ হাসিনা ক্রমশ নেতৃত্বের অবস্থানকে দৃঢ়তার করে তুলছেন।
সদ্যসমাপ্ত শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি সেভেনের শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নিয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন। সম্মেলনে শেখ হাসিনা যে সব প্রস্তাব রেখেছেন, তা বিশ্ববাসীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্র মহাসমুদ্র ও উপসাগরের তলদেশে অবস্থিত বিভিন্ন মূল্যবান সম্পদ আহরণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন উন্নত দেশগুলোও এক্ষেত্রে সকলের পরিচয় দিতে পারছে, তা নয়। অবশ্য এটা অনস্বীকার্য যে, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে মহাসমুদ্র ও মহাসমুদ্রের তলদেশে কী কী খনিজসম্পদ আছে, এরকম অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও বিজ্ঞানীদের অজানা। যা স্পষ্ট করে সমুদ্র সম্পদ আহরণ সহজ সাধ্য নয়। সমুদ্র দূষণ মুক্ত করা যে সঙ্গত শেখ হাসিনা সে বিষয়টিকেও সামনে এনেছেন। তাই সমুদ্র ও উপকূলীয় প্রতিবেশের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষায় বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ এবং জি সেভেন দেশগুলোর মধ্যে যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি এমনটাই স্পষ্ট করেছেন যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় এবং সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও সমুদ্র ব্যবস্থাপনায় উল্লিখিত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ এবং জি-সেভেন দেশগুলো যৌথভাবে উদ্যোগ নিলে সব দেশের উপকৃত হবার সম্ভাবনা বাড়ে। প্লাস্টিক বর্জ্যরে কারণে সাগর-মহাসাগরের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে উল্লিখিত অধিবেশনে প্লাস্টিকের পরিবর্তে পাটজাতীয় প্রাকৃতিক তন্তু ব্যবহারে মনোযোগী না হলে পরিবেশ দূষণের কারণে বহুমুখী সমস্যা সৃষ্টি হবে বলে শেখ হাসিনা নেতৃবৃন্দকে উপলব্ধি করাতে সক্ষম হয়েছেন। কানাডায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও জার্মানির সমন্বিত জোট জি-সেভেনে এক সময় রাশিয়া ছিল-জি-এইট হিসেবে। ২০১৪ সালে রাশিয়াকে বাদ দেয়া হয় ক্রিমিয়া অভিযানের অজুহাতে। ট্রাম্প রাশিয়াকে ফেরত আনতে চাইলেও তিনটি দেশ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। শেখ হাসিনা সাত দেশের নেতাদের উপস্থিতিতে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর অব্যাহত চাপ প্রয়োগ ও উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবাসনের প্রতি ধনী দেশগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমনটাও বলেছেন যে, মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিলেও দীর্ঘদিন এই উদ্বাস্তুদের লালন পালন করা দুুরূহ। তিনি মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়নে দেশটির ওপর চাপ প্রয়োগে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে জি-সেভেনের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাতে দেশগুলো সক্রিয় ভূমিকা নেবে বলে আশা করা যায়। বর্তমানে সব দেশই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বহুমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। জি-সেভেন সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য ততটা সফল না হলেও বাংলাদেশ তার সাম্প্রতিক উদ্বেগের বিষয়গুলো তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। শেখ হাসিনা বিশ্ববাসীর কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

 

মহিমান্বিত রজনী আজ

পবিত্র রমজান মাস বিশ্বের মুসলমানদের জন্য বিশেষ রহমত ও বরকতের মাস। রমজান মাসের এক বিশেষ রাত লাইলাতুল ক্বদর বা শব-ই-ক্বদর, মহিমান্বিত রজনী। পবিত্র শব-ই-কদরে কোরান শরীফ নাজিল হয়েছিল। বিভিন্ন হাদিসের ভিত্তিতে এমনটি বিশ্বাস করা হয় যে, রমজান মাসের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে মহিমান্বিত এই রাত অর্থাৎ শব-ই-ক্বদর নিহিত রয়েছে। আর সে কারণেই ধর্মপ্রাণ মানুষ রোজার মাসের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোতে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হন। তবে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, ২৬ রমজান রাত অর্থাৎ ২৭ রমজানের রাতটিই সেই পুণ্য রজনী, যে রাতের সংবাদ মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) দিয়েছেন। মুমিন মুসলমানদের জন্য এ রাতটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই রাতে যিনি নিজেকে যত বেশি ইবাদত-বন্দেগীতে নিয়োজিত রাখবেন তিনি তত বেশি সওয়াব হাসিল করবেন। ফজিলতের দিক থেকে এ রাতকে হাজার রাতের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। লাইলাতুল ক্বদরের মহিমা ও তাৎপর্য সম্পর্কে বিশ্বের সকল মুসলমানই অবহিত। অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞান ও শিক্ষাচর্চার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই রাতে মানব সম্প্রদায়কে বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। আমাদের নবী হযরত মুহম্মদ (সা.) জন্মেছিলেন আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগে। আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীর কাছে এই বলে কোরান নাজিল করেছিলেন, ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।’ ‘পড়ো’ কথাটির ভেতর দিয়েই শুরু হয়েছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান তথা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে সভ্যতার নতুন জয়যাত্রা। জাহেলিয়াত বা অন্ধকার থেকে আলোর যুগে উত্তরণ, জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে আত্মোপলব্ধি, কুসংস্কার ও গোঁড়ামি থেকে মানুষের মুক্তি এটাই তো ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী। সেদিক থেকে দেখলে বলতে হবে পবিত্র শব-ই-ক্বদরের রাতটি শুধু মুসলমানদের জন্যই নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্যই তাৎপর্যমণ্ডিত এবং একই সঙ্গে এটাও বলতে হয় যে, রাসূলে করিম হযরত মুহম্মদকে (সা.) মহান আল্লাহ তা’য়ালা সমগ্র মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। আর সে কারণেই তিনি রহমাতুল্লিল আলামিন। গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্য তিনি রহমতস্বরূপ। রহমত ও বরকতময় পবিত্র শব-ই-ক্বদরের এই রাতটি মুসলমানদের জন্য বাড়তি পাওয়া। মহিমান্বিত এই রাতে বরাবরের মতো বিশ্বের মুসলমানগণ মহান আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদতে নিমগ্ন হবেন। মহিমান্বিত এই রাতে আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষ মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার প্রতিজ্ঞা করতে পারলেই সার্থক হবে এই রাতের ইবাদত। মহান আল্লাহ তা’য়ালা সবাইকে ইসলামের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করার তওফিক দান করুন।