বিভাগ: সম্পাদকীয়

শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে

দেশে বেকারের সংখ্যা অনেক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৮০ হাজার। অন্য হিসাবে দেখা যায়, যাদের নির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই, এমন মানুষের সংখ্যা চার কোটি ৫৬ লাখ। তারাও বেকার। তাদের মধ্যে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই এক কোটির বেশি, যাঁরা হন্যে হয়ে নানা জায়গায় চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না। বেকারত্বের অসহনীয় অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে অনেক তরুণ ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন। আর তা করতে গিয়ে নানা ধরনের প্রতারকের খপ্পরে পড়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়, অনেককে জীবনও দিতে হয়। আবার উল্টো চিত্রও আছে। দেশে এমন অনেক চাকরিদাতা আছেন, যাঁরা তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী লোক পান না। তখন বিদেশিদের নিয়ে আসতে হয়। বাংলাদেশে এখনো লাখ লাখ বিদেশি কাজ করছেন।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলসের উপাচার্য প্রকৌশলী অধ্যাপক মাসউদ আহমেদ এর মতে, তাঁদের ছাত্রদের পাস করার আগেই চাকরি প্রস্তুত থাকে। এমনকি দু-এক বিষয়ে ফেল করা ছাত্রদেরও চাকরি হয়ে যায়। বরং চাহিদার তুলনায় তাঁরা খুব কমসংখ্যক ছাত্রকেই তৈরি করতে পারছেন। একই ধরনের কথা বললেন কয়েকটি পলিটেকনিক ও বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান। উল্টো চিত্র সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েও অনেকে চাকরি পাচ্ছেন না। শুধু শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছেন। যেসব সংস্থা বিদেশে কর্মী পাঠায়, সেসব রিক্রুটিং এজেন্সির কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, তাঁরা অনেক দেশের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত লোক পাঠাতে অনেক সময়ই ব্যর্থ হন। বিভিন্ন দেশে সুনির্দিষ্ট ৩০টি কাজের জন্য লোকের চাহিদা আসে, কিন্তু দক্ষ লোক পাওয়া যায় না। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, এমন হলে ভবিষ্যতে এসব দেশ বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়া বন্ধও করে দিতে পারে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংস্থা বায়রার সভাপতি জানান, সরকারিভাবে বিভিন্ন জেলায় ৬০টির মতো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। আবার উদ্যম আছে এমন অনেক তরুণ চাকরির অপেক্ষা না করে এমন অনেক কিছু করছেন, যাতে শুধু তাঁদের নয়, আরো অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্স কাজের যে মার্কেট রয়েছে সেখানেও বাংলাদেশের প্রায় সাত লাখ তরুণ-তরুণী কাজ করছেন। তাঁরা ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভালো রোজগারও করছেন।
আমাদের নীতিনির্ধারকদের কর্মসংস্থানের দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার স্থান। কত সংখ্যক শিক্ষার্থী সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, আর কত সংখ্যক শিক্ষার্থী পেশা অনুযায়ী বিশেষায়িত শিক্ষা নেবে, তা ঠিক করতে হবে। সে অনুযায়ী বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে শিক্ষিত বেকারের ক্রমবৃদ্ধি একসময় বিপদও ডেকে আনতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা আইন জরুরী

বর্তমান সরকার যেসব বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তার একটি হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তি। এ খাতে দেশ যথেষ্ট এগিয়ে গেছে। মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট। সহজলভ্য তথ্য-প্রযুক্তির সুফল পেতে শুরু করেছে মানুষ। দ্রুত সম্প্রসারণশীল এ মাধ্যম আবার ব্যবহৃত হচ্ছে মন্দ কাজেও। বাড়ছে সাইবার ক্রাইম বা তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ। প্রতারণার ফাঁদ পাতা হচ্ছে। সামাজিক নানা অপরাধের সঙ্গে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা। জঙ্গি কর্মকাণ্ড সংগঠিত ও সংঘটিত করার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তি। এসব থেকে মুক্তি পেতে দেশে সত্যিকারার্থে একটি সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট থাকা প্রয়োজন, এটা মানতে হবে। কিন্তু এমন একটি আইন করতে গিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে তা গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১, ২৫, ২৮, ৩২ ও ৪৩ ধারা নিয়ে সম্পাদক পরিষদ তাদের আপত্তি ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছে তিন মন্ত্রীকে। গত বৃহস্পতিবার আইনমন্ত্রী, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠকে বসে সম্পাদক পরিষদ। আপত্তিগুলো ‘অনেকাংশে যৌক্তিক’ উল্লেখ করে আগামী ২২ এপ্রিল সংসদীয় কমিটির সভায় সেগুলো উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।
গত ২৯ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা যে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’-এর খসড়া অনুমোদন করে, তা গত ৯ এপ্রিল সংসদে উত্থাপন করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী। খসড়া আইনটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। খসড়া আইনটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর থেকেই বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে পড়ে। প্রস্তাবিত আইনটির ৩২ ধারার সমালোচনাও হয়েছে। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, আইনটি পাস হলে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হবে। ওই ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী, এমন দাবি গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মীদের।
তবে এটিও ঠিক যে দেশে একটি সাইবার নিরাপত্তা আইন থাকা দরকার। অন্যথায় সাইবার অপরাধ রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সে ক্ষেত্রে আইনটি এমন হওয়া উচিত, যাতে তা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না করে।

শ্রম বাজার সৃষ্টিতে উদ্যোগ নিন

কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় আমাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক কম। ফলে বেকারত্বের হার এখনো অনেক বেশি। দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত বেকারত্বের অভিশাপ থেকে তরুণসমাজকে মুক্তি দিতে বিদেশি শ্রমবাজারের ওপর আমাদের নির্ভর করতেই হবে। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সমৃদ্ধ শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্ব অনেক বেশি। অথচ পাঁচ বছর ধরে দেশটির দরজা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ ছিল। অব্যাহত কূটনৈতিক তৎপরতায় অবশেষে সেই দুয়ার খুলেছে। ১৯টি ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশি কর্মী নিতে সম্মত হয়েছে দেশটি। এ ব্যাপারে গত বুধবার দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে এবং তা তখন থেকেই কার্যকর করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অবশ্যই একটি স্বস্তিদায়ক খবর।
বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনেকেই মরিয়া হয়ে ওঠে এটি কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। অনেকে অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমানোরও চেষ্টা করে। কয়েক বছর আগে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে নৌকায় করে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে গিয়ে অনেকের মৃত্যুও হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যাহত চেষ্টায় পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। এর মধ্যে দেশেও শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এখনো মানবপাচারকারী ও প্রতারকদের দৌরাত্ম্য যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। তাদের খপ্পরে পড়ে অনেক পরিবারই সর্বস্বান্ত হচ্ছে। সেদিক থেকে বিদেশ গমনেচ্ছু তরুণদের কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনশক্তি রপ্তানি আবার শুরুর খবরটি। এখন সঠিক পদ্ধতি ও পন্থায় কর্মী পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কেউ যাতে এমন কিছু করার সুযোগ না পায়, যা আবারও দুয়ার বন্ধ হওয়ার কারণ সৃষ্টি করে।
সারা দুনিয়ায়ই প্রযুক্তির কল্যাণে কর্মপরিবেশ ও পদ্ধতি বদলে যাচ্ছে। কায়িক শ্রমের সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। মাটি কাটা ও পরিবহনের কাজও এখন যন্ত্রে হচ্ছে। ন্যূনতম কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা থাকলেই শুধু বিদেশের শ্রমবাজারগুলোতে বিদ্যমান প্রতিযোগিতায় আমাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হবে। তাই আমাদের আরো বেশি করে দক্ষ জনসম্পদ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকবে। সাম্প্রতিক সময়ে এ ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলও ফলতে শুরু করেছে। কিন্তু এর পরও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ৯ বছর আগে যেখানে দেশে কারিগরি শিক্ষার হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ, সেখানে ২০১৬ সালে এই হার দাঁড়ায় ১১ শতাংশে। এই ধারা আরো বেগবান করতে হবে। একই সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে আরো বেশি উদ্যোগ নিতে হবে। বিদ্যমান বাজারগুলোতে যাতে আরো বেশি করে কর্মী পাঠানো যায় সেই চেষ্টা যেমন করতে হবে, একইভাবে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টিতে আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে। আমরা চাই, বেকারত্বের অভিশাপ পুরোপুরি দূর হয়ে যাক।

জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ

বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিশ্বের যে কয়েকটি দেশ রয়েছে চরম ঝুঁকিতে, তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। অথচ সরকার, দাতা দেশ ও সংস্থা কর্তৃক বরাদ্দ তহবিল নিয়ে বছরের পর বছর ধরে এ খাতে চলছে প্রায় অবাধ লুটপাট, তহবিল তছরুপ, ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি সর্বোপরি সমন্বয়হীনতা। জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় সরকার গত আট বছরে বরাদ্দ দিয়েছে আট হাজার ২০০ কোটি টাকা। বাস্তবে সুফল মিলেছে সামান্যই। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটি) থেকে বিভিন্ন জেলায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ৪৫০টির মতো প্রকল্প। সরেজমিন অনুসন্ধানে অধিকাংশের হদিস পাওয়া যায়নি। জলবায়ু তহবিলের টাকায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পে সাইনবোর্ড টাঙানো বাধ্যতামূলক হলেও প্রায় কোথাও এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর বাইরে জলবায়ু তহবিলের টাকা ব্যবহার নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী বিবেচনায় অনুমোদন, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকির এলাকায় প্রকল্প বরাদ্দ, আদৌ কোন নজরদারি না থাকা, অনুমোদিত প্রকল্প পরিবর্তন, নিম্নমানের কাজ, অযথা মেয়াদ বাড়ানো ইত্যাদি তো আছেই। বিসিসিটির নিজস্ব লোকবল মাত্র ৭০ জন। এর মধ্যে শূন্যপদের সংখ্যা ১২টি। সীমিত জনবল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সর্বত্র নজরদারি সম্ভব নয়। এর বাইরেও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) কার্যালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যয়ন বিভাগ, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পগুলোর নিরীক্ষা করার কথা থাকলেও বাস্তবে এর অগ্রগতি নেই বললেই চলে। প্রকল্প এলাকার জনপ্রতিনিধি ও মানুষজনের মতে, নিয়মিত নজরদারি ও মনিটরিংয়ের কথা তাদের জানা নেই। ফলে যথেচ্ছ লুটপাট চলছেই।
আগামীতে দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধিসহ তীব্র খরার পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়া ও জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এ্যারোনটিকস এ্যান্ড স্পেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা) ও ন্যাশনাল ওসেনিক এ্যান্ড এ্যাটমোসফেরিক এ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) ক্লাইমেট ডাটা সেন্টার চলতি বছর সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থা দুটির মতে, উষ্ণমন্ডলীয় সমুদ্রস্রোত এল নিনোর প্রভাবে এবার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তাপমাত্রা বাড়বে, যা ৪৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা খরাকবলিত হতে পারে। ফলে পানির অভাবে কৃষি জমি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাবে। ফলে ধান উৎপাদন হবে ব্যাহত। দেখা দেবে সুপেয় পানির অভাব।
বাংলাদেশ অবশ্য এ বিষয়ে সজাগ ও সচেতন। প্রধানমন্ত্রী গত বছর ওয়ান প্ল্যানেট সামিটে যোগ দিতে গিয়েছিলেন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় অভিন্ন প্রচেষ্টা নির্ধারণের লক্ষ্য এগিয়ে নিতে সরকারী-বেসরকারী অর্থায়নের কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই সম্মেলন। ২০১৫ সালে বিশ্বের ১৮৮টি দেশের ঐকমত্যে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির দুই বছরের মাথায় বৈশ্বিক তহবিলের বর্তমান অবস্থা এবং তা বাড়িয়ে তোলার লক্ষ্যে উন্নত দেশগুলোর দেয়া প্রতিশ্র“তি পূরণের তাগিদ দিয়ে শেষ হয়।
ঋণদাতা সংস্থাটি সাগর পৃষ্ঠের বাড়ন্ত উচ্চতা থেকে সুরক্ষায় ১৫০টি উন্নয়নশীল শহরের যথাযথ অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা দেবে। তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের চট্টগ্রামও। এটি একটি আশাব্যঞ্জক খবর বৈকি। সে অবস্থায় জলবায়ু তহবিলের অর্থ ব্যয়ে লুটপাট তথা নয়-ছয় কাম্য নয় কোন অবস্থাতেই।

রোহিঙ্গা সমস্যা দ্রুত নিষ্পত্তি চাই

সামরিক শাসন যে শাসকদের স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনাকে বিকৃত করে তুলতে পারে এবং হিতাহিত জ্ঞানের ভান্ডারকে যে করতে পারে অস্বাভাবিক, তারই নিদর্শন হিসেবে মিয়ানমারকে উল্লেখ করা যেতে পারে। সামরিক শাসন ও শাসকের আচরণের ভয়াবহতা যে কি হতে পারে তা হাড়ে হাড়ে টের পায় সে দেশের বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীসহ সাধারণ জনগণ। সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত রোহিঙ্গারা। জান্তারা সেখানে গণহত্যা, লুটতরাজ, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিকান্ডসহ সব ধরনের অপকর্ম চালিয়েছে। তাদের ঘরবাড়িই শুধু নয়, নিজ মাতৃভূমি ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। সেদেশের জান্তা শাসকদের বৈষম্যমূলক, মানবতাবিরোধী অমানবিক, নির্মম বিকৃত আচরণের বহির্প্রকাশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা। নিজ দেশের সামরিক শাসক ও তাদের প্ররোচিত রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন দীর্ঘদিন আগেই রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার, ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে একপর্যায়ে সকল অধিকারই লুণ্ঠন করে। এটা শুধু একদিনে হয়নি। সেই সত্তর দশক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারের জান্তারা রোহিঙ্গাদের নির্মম নির্যাতন শেষে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ সেই থেকে তাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। সর্বশেষ গত বছরের আগস্ট থেকে আসা রোহিঙ্গাদের ঢল এখনও থামেনি। পুরনো-নতুন মিলিয়ে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ এক হাজার দুইশ’ জন। এরা টেকনাফ, উখিয়ার বিভিন্ন শিবিরে এমনকি বাইরেও অবস্থান করছে। শিবিরে তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের নিয়ে বাংলাদেশও চরম সঙ্কট মোকাবেলা করছে। আসন্ন বর্ষায় পাহাড় ধস, বন্যাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে। অথচ তাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে নানা রকম চতুরতার আশ্রয় যে নেয়া হচ্ছে তা স্পষ্ট। প্রত্যাবাসনের চুক্তি সইÑএর চার মাস পরও একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যায়নি। বরং সদ্য রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনকারী মিয়ানমারের সফরকারী সমাজকল্যাণমন্ত্রী প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে যে শর্তারোপ করেছেন তা কতটা বাস্তবসম্মত এবং মর্যাদাপূর্ণ রোহিঙ্গাদের ভাষ্যেই পরিষ্কার। এই শর্ত কঠিন ও সমস্যা বাড়াবে। মন্ত্রী ব্যাখ্যা করেছেনÑ রাখাইনে ফিরে যাওয়ার পর মিয়ানমারের নাগরিকত্বের জন্য আবেদনের সুযোগ পাবে। তবে তাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নির্দেশিত আইন অনুযায়ী। কিন্তু যে রোহিঙ্গারা হাজার বছর ধরে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে বসবাস করে আসছে, তারা কেন আবার নতুন করে নাগরিকত্ব পরীক্ষা দেবে? সঙ্গত কারণেই রোহিঙ্গারা আপত্তি জানিয়েছেন। বংশ পরম্পরায় যারা সেদেশে বসবাস করে আসছে, তারা কেন স্বীকারোক্তিতে সই দিয়ে নাগরিকত্ব নিতে যাবেন। কোফি আনান কমিশন পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদানের সুপারিশ করেছিলেন। তারপরও আপত্তি সামরিক জান্তাদের। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার, মৌলিক অধিকার সবই ছিল। তাদের সেই সব অধিকার কেড়ে নিয়েই তো সমস্যার সৃষ্টি করা হয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নাগরিকত্ব নিয়ে ছলচাতুরি পূর্ণ আচরণসহ টালবাহানা করছে। বিশ্ব সম্প্রদায়কে এক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা পালনের জন্য বাংলাদেশ বার বার আবেদন জানিয়ে আসছে। দেশটির উপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত না থাকলে তারা নানা কৌশলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘ করার চেষ্টা করবে।

ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত চাই

পবিত্র রমজান মাসে বাংলাদেশের বাজারের চেনা ছবি হচ্ছে, এই মাস শুরুর আগে থেকেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে শবেবরাতের আগে ও পরে জিনিসপত্রের দাম ভোক্তার ক্রয়সীমার বাইরে চলে যায়। অথচ বিশ্বের কোথাও এমনটি দেখা যায় না। বরং প্রায় সব মুসলিম দেশেই রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমে যায়। স্বস্তিতে থাকে ভোক্তারা। ব্যতিক্রম বোধ হয় বাংলাদেশ। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অজুহাতের কমতি থাকে না। বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে না, প্রতিবছর রোজার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমন নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটে না। মাছ-মাংস থেকে শুরু করে পাঁচ-ছয়টি পণ্যের দাম সিন্ডিকেট করে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত লাভের আশায় পণ্যের দাম বাড়াতে অনেক সময় উৎপাদন বন্ধ রাখার কৌশলও নেওয়া হয় বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। রোজায় পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি অসাধু গোষ্ঠী জড়িত রয়েছেন। এসব ব্যবসায়ীর সঙ্গে সরকারের অসাধু কর্মকর্তারাও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থাপনা মোটেই সুসংগঠিত নয়। এর সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীকে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে দেখা যায়। কোনো কোনো সময় বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেও পণ্যের দাম বাড়ানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয় রোজা সামনে রেখে। মূল্যবৃদ্ধির এ প্রবণতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভোক্তারা। বাংলাদেশের বাজারে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কথা শোনা যায়, যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া সব পদক্ষেপই যেন ব্যর্থ হয়ে যায়। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রাইস কন্ট্রোলিং আইন আছে। রমজান সংযম পালনের মাস হলেও এই মাসেই যেন সবচেয়ে বেশি অসংযমী হয়ে ওঠে ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকার পরও আমাদের দেশে নানা অজুহাতে কিছু পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় কৃত্রিম সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ করা গেছে। আবার এই রমজান মাসেই ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য বাজারে বিক্রি করা হয়। এ অবস্থায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় বিকল্প হতে পারে সরকারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা। টিসিবিকে সক্রিয় করা গেলে বাজার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে অনেকের ধারণা।
রোজা আসছে, এরপর ঈদ। রোজা ও ঈদে পণ্যমূল্য যাতে ভোক্তাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে সে জন্য সরকারকে এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়ন্ত্রিত বাজার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।

ব্যাংক ঋণ সমস্যা রোধ

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করেছে। এই যোগ্যতা রক্ষা করতে হলে এবং ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যেতে হলে দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আর বিনিয়োগের কাক্সিক্ষত গতি নিশ্চিত করার জন্য সবার আগে প্রয়োজন বিনিয়োগ সহায়ক ব্যাংকিং খাত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের ব্যাংকিং খাত এখনো সে অবস্থান থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। ব্যাংকগুলো, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ঋণের নামে চলছে লুটপাট। ব্যাংকের লোকজনের যোগসাজশে ভুয়া কাগজে ভুয়া ঠিকানায় ঋণ চলে যাচ্ছে, যেগুলো পরে আর আদায় করা যায় না। শুধুই বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এই লোকসান পূরণ করা হয় সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ দিয়ে। সম্প্রতি বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও এই প্রবণতা বেড়েছে। এসব লোকসান মোকাবেলায় ব্যাংকগুলো প্রদত্ত ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর সেটি দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট করছে। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তারা বিপদগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রকৃত উদ্যোক্তারা ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা রকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ব্যাংকিং খাতের এমন নৈরাজ্য দূর করা না গেলে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি কোনোক্রমেই উন্নত হবে না। সে সত্যটিই তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ব্যাংক মালিকদের প্রতি ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে বা ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
ব্যাংকঋণের অতিরিক্ত সুদের হার নিয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে বরাবরই আপত্তি জানানো হয়েছে। এ নিয়ে ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনেক আলোচনাও হয়েছে। সর্বশেষ গত ১ এপ্রিল ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে আলোচনার সূত্র ধরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানান, মালিকরা তাঁকে কথা দিয়েছেন যে এক মাসের মধ্যেই ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা হবে। এ জন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে বেশ কিছু সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। আগে সরকারি আমানতের ২৫ শতাংশ রাখা হতো বেসরকারি ব্যাংকে। এখন থেকে বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ রাখা হবে। পাশাপাশি নগদ সংরক্ষণ অনুপাত বা সিআরআর ৬.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫.৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলো ফেরত পাবে। এতে তাদের তারল্য সংকট অনেকটাই কমে যাবে। তার পরও ব্যাংকগুলো এখন পর্যন্ত ঋণের সুদের হার কমায়নি। কবে কমানো হবে, সে ঘোষণাও দেয়নি। ফলে ব্যাংক ব্যবসার সততা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
আমরা চাই, দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি এগিয়ে নেওয়ার জন্য সব দিক থেকেই অনুকূল পরিবেশ তৈরি হোক এবং ঋণের সুদের হার দ্রুত কমিয়ে আনা হোক। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে। সর্বোপরি ব্যাংকিং তৎপরতার ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি আরো জোরদার করতে হবে।

শুভ হউক নববর্ষ

জীর্ণ পুরাতন ভেসে যায়। আসে নতুনের আবাহন। ধ্বনিত হয়, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা।’ চিরায়ত বাঙালীর জীবনের এক প্রাণস্পর্শী দিনের শুরু আজ ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। নতুনের কেতন উড়িয়ে বৈশাখ দেয় ডাক, খোলো খোলো দ্বার। বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল সবখানেই চির নতুনের আবাহন জেগে উঠছে ভোরের রাঙা সূর্যালোকে। বিদায় নিয়েছে পুরনো বছর ১৪২৪। এসেছে নতুন বছর ১৪২৫। বাঙালীর নববর্ষ। এবারের নববর্ষ এক নয়া বাস্তবতায় এসেছে। বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করার যে হীন চক্রান্ত চলে বিদায়ী বছরে, তাকে মোকাবেলা করে এগোতে হবে নববর্ষে। নতুন বর্ষ এসেছে ধ্বংসের বিপরীতে সৃজনের গান নিয়ে। নববর্ষের এ দিনটাকে বাঙালী জাতি অর্জন করেছে প্রতিকূল পরিস্থিতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে। আর স্বাধীন স্বদেশে বৈশাখীর আবাহনের অনুষ্ঠানে গ্রেনেড হামলায় বহু মানুষকে হতাহত করেছিল জঙ্গীরা।
স্বাগত নববর্ষ, ১৪২৫। আবহমানকাল ধরে বাঙালীর প্রিয় দিন। নববর্ষ হোক উত্থানের। নতুন বর্ষে জঙ্গীবাদ সন্ত্রাসবাদ হোক নির্মূল। নাশকতা, সহিংসতা হোক বন্ধ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক সম্পন্ন। স্বদেশ হোক নৈরাজ্যমুক্ত। পহেলা বৈশাখ বাঙালীর নববর্ষ। বৈশাখ বাঙালীর জীবনে কী গ্রামে কী শহরে এক নতুন সমারোহ নিয়ে আসে। হালখাতার পাতা খুলে যেমন তার বাণিজ্যের পুণ্যাহ উৎসব, তেমনি সাধারণ জীবনযাত্রায়ও একটা প্রাণচাঞ্চল্যÑ ধ্বনিত হয় ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’
বৈশাখ মানে গ্রীষ্ম ঋতুর শুরু। উজ্জ্বল রৌদ্রময় দিন। তেমনি আবার কালবৈশাখীর ভয়াল রূপ। জীবন সংগ্রামের দীক্ষা লাভের নানা রূপের সংমিশ্রণ নববর্ষের সূচনালগ্ন। এই সূচনালগ্নে নতুন ভাবনা-চিন্তায় কতটা এগিয়েছি আমরা তারও খতিয়ান করা দরকার। নতুন বছরে পদার্পণ। এর অর্থই হলো নতুনের সঙ্গী হওয়া। সামনের দিনগুলোকে বিনির্মাণের তাগিদ। আমাদের উদ্যম, আমাদের অধ্যবসায় সব নিয়োজিত হোক জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে। উৎসবের আনন্দ নতুন সঙ্কল্পে দীক্ষিত জাতির ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় নতুন শক্তির প্রেরণা হোক। এজন্য সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গত বাংলা বছরটিতে দেশ এগিয়েছে নানা ক্ষেত্রে। সব মিলিয়ে বলা যায় সরকার সফলতার একটি বছর পার করল। তবে সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব-নিকাশ করলে ১৪২৪ সালটি সরকারের সফলতার পাল্লাই ভারি।
বাংলা নববর্ষ সুর সঙ্গীতের, মেলা-মিলনের, আনন্দ ও উৎসবের, সাহস ও সঙ্কল্পের প্রেরণা জোগায়। দুঃখ-গ্লানি, অতীতের ব্যর্থতা পেছনে ফেলে তাই এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেয়ার দিনও পহেলা বৈশাখ। দেশের কল্যাণে সবাই এক কাতারে শামিল হয়ে এগিয়ে যাওয়ার অগ্নিশপথ নেয়ার দিনও এটি। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও বৈশাখের চেতনায় সবাই উজ্জীবিত হোক। নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে সবাই উদীপ্ত হোক। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। স্বাগতম ১৪২৫।

 

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন

প্রাণভয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে নিয়ে সত্যিকার অর্থেই বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে বাংলাদেশ। শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে দেশটির সরকার, বিশেষ করে সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নিয়েছিল। গত বছর ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী স্রোতের মতো আসতে থাকে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে বর্বরোচিত হামলা শুরু করে, তা বিশ্ব ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ঘটনা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ঘটনার নিন্দা করেছে। জাতিসংঘ একে ‘জাতিগত নিধনে’র প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অনেক বিশ্বনেতা একে গণহত্যা বলেছেন। বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চেষ্টা করেছে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে। এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের পক্ষ থেকে তেমন ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। সম্প্রতি হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে উঠেছে বিষয়টি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌঁসুলি একটি রুল চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, মিয়ানমার থেকে যেভাবে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে বিতাড়িত করা হয়েছে, তার বিচার করার এখতিয়ার হেগের আদালতের আছে কি না। আইসিসি এই বিচার করার এখতিয়ার রাখে এমন রুল পাওয়া গেলে রোহিঙ্গা বিতাড়নের ঘটনার তদন্ত করার পথ তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় মিয়ানমারকে বিচারের মুখোমুখি করার পথ খুলবে।
গত বছরের আগস্ট মাস থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে তা যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জেনেভা কনভেনশন ও জেনোসাইড কনভেনশন অনুযায়ী গণহত্যা বলতে সমষ্টির বিনাশ ও বিনাশের অভিপ্রায়কে বোঝায়। এই গণহত্যা বলতে বোঝায় এমন কর্মকাণ্ড, যার মাধ্যমে একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয় এবং এ সংক্রান্ত অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়। ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজল্যুশন ২৬০(৩) গণহত্যাকে এমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধ করতে সব রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। সংজ্ঞা অনুযায়ী, গণহত্যা শুধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ ক্ষেত্রে জাতিগত, গোষ্ঠীগত বা ধর্মগত নিধনের উদ্দেশ্যে যদি একটি লোককেও হত্যা করা হয় সেটাও গণহত্যা। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে তা সত্যিকার অর্থেই মানবতাবিরোধী অপরাধ।
এখন বাংলাদেশকে এই অপরাধের বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরবরাহ করতে হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রাখাও প্রয়োজন। সব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে রেখে পদক্ষেপ নিতে হবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা

 

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল-২০১৮’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে সোমবার রাতে। বিল উত্থাপনের আগে বিরোধীদলীয় একজন সদস্য জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিলটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। প্রস্তাবিত এ আইনের বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। সমাজে-সাহিত্য অঙ্গনে-গণমাধ্যমে বিস্তর কথাবার্তা হয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ বিষয়ে বিরূপ সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়। বলা হয়েছিল, ৫৭ ধারার ফাঁড়া যাতে আর না থাকে সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু খসড়ার ৩২ ধারা নিয়ে পুরনো শঙ্কা-সংশয় নতুন করে হাজির হয়। প্রতিবাদও করা হয়েছে। তখন সরকারপক্ষ বলেছিল, পর্যালোচনা করে শঙ্কা-সংশয় দূর করা হবে। কিন্তু সেই ৩২ ধারা রেখেই বিলটি উত্থাপন করা হলো।
৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা তথ্য-প্রযুক্তি আইন থেকে বাদ দেওয়া হলেও সেসব ধারার বিষয়বস্তু আরো বিশদে এ আইনে (৩২ ধারা) যুক্ত করা হয়। এ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করলে বা করতে সহায়তা করলে তিনি কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে অভিযুক্ত হবেন। এ জন্য তিনি অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। এতে বিরূপ সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সাংবাদিক মহল ক্ষুব্ধ হয়। তারা আন্দোলনও করে। পূর্ব অভিজ্ঞতার নিরিখে সবাই আশঙ্কা ব্যক্ত করেন যে এতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হবে। এর অপপ্রয়োগ হবে। বিলে জন-আপত্তির মূল বিষয়টিই রয়ে গেছে। এজাতীয় ধারা বাকবাধীনতা হরণ করার নামান্তর। এটি নাগরিকের ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশার লোকের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। ৩৯/খ ধারা নিয়েও আপত্তি রয়েছে। কয়েকটি অপরাধে জামিন না দেওয়ার বিধি সংযোজিত হয়েছে, যা নাগরিকের আইনি অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ বলেই গণ্য। পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতাবিষয়ক ধারাটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে।
আইনের অপপ্রয়োগের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় ‘বিধিবলে বলীয়ান’ হওয়ার সুযোগ থাকলে নাগরিকদের হেনস্তার হাত থেকে রক্ষার উপায় থাকবে না। ‘৩২’ ধারায় ‘৫৭’ ধারা ঢুকিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য জনবান্ধব হবে বলে আশা করা যায় না। ‘নিরাপত্তা’র জন্য এজাতীয় ধারা আবশ্যক নয়।