বিভাগ: সম্পাদকীয়

বিকল্প বাজার তৈরি জরুরী

বাংলাদেশের বাজার অনেকটাই আমদানিনির্ভর বলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে এখানে তার প্রভাব পড়ে। এটাই স্বাভাবিক। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো জিনিসের দাম কমে গেলে এখানকার বাজারেও তার প্রভাব পড়ার কথা। কিন্তু দেখা যায়, দাম কমানোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কম। বরং যত দিন পারা যায়, বর্ধিত দামে পণ্য বেচাকেনাতেই তাদের আগ্রহ। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত সব সময়ই দেওয়া হয়। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ তৈরি হয়েছে তেলের দামের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। তেল আমদানির জন্য বর্ধিত দামে ডিও খুলতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে তেলের দাম লিটারে দুই টাকা বাড়ানোর জন্য ট্যারিফ কমিশনের কাছে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু বেশি দামে আমদানি করা তেল দেশে এসে পৌঁছানোর আগেই যদি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়, সেটা কোনোভাবেই যৌক্তিক হবে না। অথচ ট্যারিফ কমিশনে দাম বাড়ানোর আবেদন করেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাইরের বাজার থেকে নতুন দামে কেনা তেল দেশে আসার পর ট্যারিফ কমিশন দাম নির্ধারণ করে দিলে সেই দামেই তা বিক্রি হবে। এটাই নিয়ম হওয়া উচিত। কিন্তু দেশের বাজারে ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্তই যেন শেষ কথা হয়ে উঠেছে। ভোক্তাদের জিম্মি করে এভাবে দিনের পর দিন জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো হয়েছে।
বাজার নিয়ে স্বস্তিতে নেই ভোক্তারা। চালের বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। মাঝারি মানের সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬৪ টাকায়। একেবারে কম দামের চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৩ থেকে ৪৬ টাকা দরে। অথচ এখন চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। উৎপাদন ভালো হয়েছে। সরবরাহ প্রচুর। তার পরও পরিবহন সমস্যার অজুহাত তুলে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চালের দাম। আসলে ভোক্তাদের অসহায়ত্বকেই যেন পুঁজি করেছে ব্যবসায়ীরা। দেখারও যেন কেউ নেই। বাজারে কোনো নজরদারি নেই। বিকল্প বাজার তৈরির চেষ্টা তো হলোই না। ফলে সাধারণ মানুষের সমস্যা যাচ্ছে না। বাজার নিয়ে তাদের চিন্তিত থাকতেই হচ্ছে। নির্বাচনের বছরে হয়তো এভাবেই ক্রেতাদের জিম্মি করে অনৈতিকভাবে লাভবান হবে ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এতে সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামবে।
এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের জীবন যাপন সহজ করতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

গ্রামীণ উন্নয়নে পদক্ষেপ

ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এ্যাগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ)-এর ৪১তম পরিচালনা পর্ষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী গিয়েছিলেন ইতালির রোমে। সেখানে মূল বক্তা হিসেবে তিনি দেশের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। দারিদ্র্য বিমোচন তথা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য শুধু শহর-নগর নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বিনিয়োগ একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা ছাড়া এটি অর্জন করাও সম্ভব নয়। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এবং ইফাদ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ছয়টি জেলার দুস্থ মানুষের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণে ৯২ দশমিক ০৩ মিলিয়ন ডলার বা ৯ কোটি ২০ লাখ ৩০ হাজার টাকার একটি ঋণ চুক্তিও সম্পাদন করেছে। এর আওতায় ২০১৮-২০২৪ পর্যন্ত গৃহীত প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে জেলাগুলোয় ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উপকৃত হবে বলে আশা করা যায়। বর্তমানে দেশে প্রায় ২৪ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে গেছে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৪ সালের মধ্যে এই হার ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা। এর আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত উন্নয়ন ফোরামের ২০১৮ সালের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর প্রতি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যথাসময়ে অর্থছাড়সহ সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন, যা হবে জাতিসংঘ নির্দেশিত এসডিজি অর্জনে সহায়ক।
সরকার ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে সর্বাগ্রে মনোনিবেশ করে খাদ্য উৎপাদনে। পরিকল্পিত কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের প্রেরিত রেমিটেন্সের সুবাদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ইতোমধ্যে ৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্পে দেশের সুখ্যাতি বিশ্বজোড়া। আয়ও অসামান্য। এ খাতে কয়েক লাখ নারীর কর্মসৃজন হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে বিশ্বে। প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কর্মসূচীসহ নারী এবং শিশু মৃত্যুর হার প্রতিরোধেও বাংলাদেশের সাফল্য প্রশংসনীয়।
সেটা অতিক্রম করতে হলে ইউএনডিপি উল্লিখিত ৬৬ শতাংশ কর্মক্ষম জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। অদক্ষ জনশক্তিকে রূপান্তর করতে হবে দক্ষ জনশক্তিতে। জোর দিতে হবে কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণের ওপর। বাড়াতে হবে শিক্ষার মান। জ্ঞান-বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের দিকে নজর দিতে হবে। সর্বোপরি কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য জোর দিতে হবে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের ওপর। বর্তমানে কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে বৈচিত্র্য ও বহুমুখিতা কম। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জন এবং তা অব্যাহত রাখতে হলে সুশাসনসহ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।

বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ধারা

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে এসেছে। লক্ষ্য রয়েছে, ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশের কাতারে যাওয়া। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং সামনে থাকা কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো কিভাবে মোকাবেলা করা যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা আরো দুই শ কোটির মতো বেড়ে যেতে পারে। সেই হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যাও ২০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাদের খাদ্যচাহিদা বাড়বে, অন্যদিকে তাদের আবাসিক ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে কমবে কৃষিজমি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। উপকূলের একটি বিরাট অংশ সাগরে তলিয়ে যেতে পারে। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্ববাসের প্রবণতা দিন দিনই বাড়ছে এবং তা আরো বাড়তে থাকবে। দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলেও একদিকে বাড়বে বন্যার প্রকোপ, অন্যদিকে বাড়বে খরার প্রবণতা। এসব এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে নেমে আসবে এক বিপর্যয়কর অবস্থা। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাড়বে নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিও। সে অবস্থায় স্থিতিশীল উন্নয়ন কতটা ভিত্তি পাবে?
২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলেও বাংলাদেশকে এই চ্যালেঞ্জগুলো সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। সংগত কারণেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের এই বাস্তবতা তুলে ধরেছেন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে। ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (আইএফএডি) পরিচালনা পরিষদের ৪১তম সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে মঙ্গলবার মূল বক্তা হিসেবে তিনি স্থিতিশীল উন্নয়নে করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করেন। তিনি বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। উন্নয়ন সহযোগীরাও সাধ্যমতো আশ্বস্ত করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে। আইএফএডি বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তিও করেছে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যাপ্রবণ ছয়টি জেলার ২৫টি উপজেলার তিন লাখ তিন হাজার পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জেলাগুলো হচ্ছে গাইবান্ধা, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুর। ছয় বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে ব্যয় হবে ৯ কোটি ২৪ লাখ ডলার, এর মধ্যে ছয় কোটি ৩২ লাখ ডলার দেবে আইএফএডি। এই প্রকল্প নিঃসন্দেহে সংশ্লিষ্ট এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অনুরূপ আরো অনেক প্রকল্প দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও নিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের কৃষি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিজমির ক্রমসংকোচন বন্ধ করতে হবে। গ্রামাঞ্চলেও সমতলে আবাসন বৃদ্ধির বদলে উল্লম্ব বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষা, বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা বাড়াতে হবে, যাতে কৃষি খাতে থাকা ছদ্ম-বেকারত্ব কমিয়ে আনা যায়। কৃষির আধুনিকায়নের ওপরও জোর দিতে হবে।
স্থিতিশীল উন্নয়নের লক্ষ্যে আশু, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি এই তিন রকম পরিকল্পনা নিয়েই এগোতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের জনজীবন রক্ষায় টেকসই আবাসনসহ সেখানকার কৃষিজমি রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায়ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা আশা করি, বর্তমান সরকারের সময় উন্নয়নের যে ধারার সূচনা হয়েছে, তাকে টেকসই ও কার্যকর রূপ দেওয়ার জন্য সম্ভাব্য সব কিছুই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করা হবে।

 

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদ্যোগ

মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে নিয়ে বাংলাদেশ এক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। নিকট ভবিষ্যতে এই চ্যালেঞ্জ আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেই নানা মহল থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডাব্লিউএফপি) নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিজলির বক্তব্যেও তেমন আশঙ্কার কথাই উঠে এসেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনায় তিনি জানিয়েছেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা রোহিঙ্গাদের প্রয়োজন মেটাতে কাজ করে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে দাতাদের আগ্রহ ক্রমেই কমছে। তাঁর এই বক্তব্য থেকে ধারণা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে তাদের ভরণ-পোষণের দায় মূলত বাংলাদেশকেই নিতে হবে। দুই দেশের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হলেও কবে নাগাদ সেই প্রক্রিয়া শুরু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। প্রস্তুতির নামে মিয়ানমার যে ক্রমাগত সময়ক্ষেপণের চেষ্টা করতে পারে, তেমন আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ। আবার মিয়ানমারের পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো না হলে বা নিরাপদ না হলে রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরে যেতেও চাইবে না। সে ক্ষেত্রে তাদের জোর করেও পাঠানো যাবে না। সব দিক বিবেচনায় এ সংকট সহজে কাটবে বলে মনে হয় না। তাই বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির কথা ভাবতেই হবে।
ক্রমেই এগিয়ে আসছে বর্ষাকাল। পাহাড়গুলো ন্যাড়া করে যে অসংখ্য খুপরিঘর বানানো হয়েছে, সেগুলো পাহাড়ধসের শিকার হতে পারে। আবার নিচু জমিতে স্থাপিত খুপরিঘরগুলো বন্যায় ডুবে যেতে পারে। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা আবারও আশ্রয় সংকটে পড়তে পারে। তখন দেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা বেড়ে যেতে পারে। বর্ষায় তাদের স্বাস্থ্যসেবার সংকট আরো প্রবল হতে পারে। অবৈধ পথে বাংলাদেশের পাসপোর্ট সংগ্রহের ঘটনাও ঘটছে। তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সংকট ক্রমে বাড়তে পারে। এ রকম অবস্থায় প্রত্যাবাসন দ্রুততর করার কোনো বিকল্প নেই। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে মিয়ানমারকেই। সেখানে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দিতে হবে। সম্মানজনক পুনর্বাসনে জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এখনো মিয়ানমার সরকারের আগ্রহের যথেষ্ট ঘাটতি আছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তাই যথাযথ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরো বাড়ানো জরুরি। আমরা মনে করি, বিশ্বসম্প্রদায় সেভাবেই এই সংকট মোকাবেলায় উদ্যোগী হবে।

 

প্রশ্ন ফাঁসের হোতাদের আটক করুন

অনেক চেষ্টা করেও চলমান এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব হয়নি। ফাঁসকারীরা রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হচ্ছিল ফেসবুক পেজে। শনিবার অভিযান চালিয়ে রাজধানী থেকে প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত তিন ভাইসহ ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা, ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রটি মূলত মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমোতে গ্রুপ ওপেন করে অ্যাডমিন পরিচালনা করত। যেদিন যে পরীক্ষা হবে, সেই পরীক্ষার ভিত্তিতে গ্রুপ খোলা হতো। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত তিন ভাই চাঁদপুর থেকে ঢাকায় এসে প্রশ্ন ফাঁসের কারবারে জড়িত হয়। প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সঙ্গে মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থীরা যেমন জড়িত, তেমনি স্কুলপড়ুয়া কিশোররাও এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়েছে। আবার এমন একজনকে পাওয়া গেছে, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র নবম শ্রেণি। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতরা এটাকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছিল। প্রশ্ন সংগ্রহ করে তারা তাদের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে বিজ্ঞাপন দিয়ে তা বিক্রি করত। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই প্রশ্ন তারা পেত কোথায়? প্রশ্ন ফাঁস রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট গাফিলতি আছে, এমন সন্দেহের অবকাশ আছে। বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে। গত ৪ ফেব্র“য়ারি প্রশ্ন ফাঁসকারীকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে প্রশ্ন ফাঁস খতিয়ে দেখতে মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিবকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু কমিটির আহ্বায়ক এই অফিস আদেশ হাতে পান এক সপ্তাহ পরে।
প্রশ্ন ফাঁস রোধ করতে হলে প্রথমেই কোথা থেকে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, তার মূলে হাত দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস রোধে ইন্টারনেট সেবা প্রায় বন্ধ করে দেওয়ার মতো হঠকারী সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত সরকারের জনপ্রিয়তা নষ্ট করার জন্যই যে নেওয়া হয়েছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হচ্ছে, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে ভয়ংকর সব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রশ্ন ফাঁসে ব্যবহৃত ৩০০ মোবাইল ফোন নম্বর চিহ্নিত করে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব ফোনের মালিককে গ্রেপ্তার করতে পারলে অবশ্যই প্রশ্ন ফাঁস রোধ সম্ভব। এদের দ্রুত বিচার করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রম বাজার বৃদ্ধির পদক্ষেপ

বিদেশে যেসব বাংলাদেশি কাজ করেন, তাঁদের একটি বড় অংশই রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সৌদি আরবে। কয়েক বছরে তেলের বাজারে ব্যাপক দরপতন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধবিবাদে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতি অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের মধ্যেই বেকারত্বের হার বেড়ে গেছে। এর ফলে দেশগুলো বিদেশি শ্রমিক নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। অনেক খাতে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশিসহ বিদেশি শ্রমিকরা কাজও হারাচ্ছেন। তার ধাক্কা বাংলাদেশের শ্রমবাজারেও পড়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে এবং সে অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সৌদি আরবের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও একসময় প্রচুর বাংলাদেশির কর্মসংস্থান ছিল। কয়েক বছরের যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের কারণে ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়ার অর্থনীতি আজ প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত। দেশগুলো থেকে দলে দলে মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে অন্যান্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এসব দেশে বর্তমানে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই বললেই চলে। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমানে সৌদি আরবে বেকারত্বের হার ১২ দশমিক ৮ শতাংশ, ওমানে ১২ শতাংশ, কুয়েতে ২ দশমিক ২ শতাংশ। তাই এসব দেশও স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে অনেক খাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এতে দেশগুলোতে নতুন করে বাংলাদেশি কর্মীদের যাওয়া যেমন কমে গেছে, তেমনি যাঁরা সেখানে কর্মরত ছিলেন তাঁরাও বেকার হয়ে পড়ছেন। প্রবাসী আয়ের ওপরও তার প্রভাব পড়ছে। তাই বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিকল্প উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা করা প্রয়োজন। অদক্ষ কর্মীর বদলে চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন পেশায় দক্ষ কর্মী প্রেরণের ওপর জোর দিতে হবে। এ জন্য দেশে পেশাভিত্তিক দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে। নতুন নতুন শ্রমবাজার খোলার ওপর জোর দিতে হবে। অনেক দেশেই এখনো বিদেশি কর্মীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সেসব দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বাজার সৃষ্টির ওপর জোর দিতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো অনেকাংশেই প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তাই এই খাতের উন্নয়নে আমাদের আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে। তাই বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ ও সহজ করতে হবে। অনেক বেশি বিকল্প খুঁজতে হবে।

 

রোহিঙ্গা সমস্যা দ্রুত সমাধান হউক

মিয়ানমারে জাতিগত নিধনযজ্ঞের কারণে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা কয়েক লাখ রোহিঙ্গা আজ চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি বাংলাদেশও আজ এক কঠিন অবস্থা মোকাবেলা করছে। মানবতার এমন করুণ পরিণতিতে বিশ্বসম্প্রদায়ও আজ যারপরনাই উদ্বিগ্ন। আর সেই উদ্বেগ প্রকাশ করতেই গত শুক্রবার ঢাকায় এসেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকেও রোহিঙ্গা সংকটই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। তা না হলে এই সংকট নানামুখী ডালপালা বিস্তার করতে পারে। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশও একমত প্রকাশ করেছে। উভয় পক্ষই মনে করে, এই মানবিক বিপর্যয় মিয়ানমার সৃষ্টি করেছে, তাই এর সমাধানে মিয়ানমারকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। সংকট সমাধানে ব্রিটেনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতারও আশ্বাস দেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার হিসাবেই নতুন-পুরনো মিলিয়ে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির একটি দেশের পক্ষে দীর্ঘদিন এদের ভরণ-পোষণ চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব, জীবনমান রক্ষার তো প্রশ্নই ওঠে না। সামনে বর্ষাকাল। পাহাড়ধসে প্রতিবছরই বহু মানুষের মৃত্যু হয়। পাহাড়ের ওপর খুপরি বানিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের অবস্থা তখন আরো বিপর্যয়কর হয়ে উঠবে। তাদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিও এরই মধ্যে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। মানবপাচারকারীরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই শুধু ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীই নন, আরো অনেক বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকেও অনুরূপ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে তা নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি অদূর ভবিষ্যতে মিয়ানমার, বাংলাদেশসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাপক অশান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। তবে তা করতে হবে নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে। আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। আর সেই কাজগুলো করার দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের। উভয় দেশ সেভাবেই এই সংকটের সমাধান চায়। বাংলাদেশ থেকে বিমানযোগে ব্রিটেনে সরাসরি পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, শিগগিরই এই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। তিনি আশা করেন, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রিটেনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। আমরাও চাই কমনওয়েলথভুক্ত দেশ দুটির সম্পর্ক আরো জোরদার হোক এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে উভয় দেশই লাভবান হোক।

 

প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকারের চেষ্টার অন্ত নেই। সরকারের চেষ্টার সর্বশেষ উদাহরণ হতে পারে আশুগঞ্জ হাসপাতাল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম হাসপাতালটি উদ্বোধন করেছেন। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেওয়ার পর ২০১২ সাল থেকে উপজেলা পরিষদ ভবনের একটি কক্ষে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রম চালু করা হয়। জমি অধিগ্রহণের পর ২০১৪ সালের শেষার্ধে হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। উদ্বোধন হলো ২০১৮ সালে এসে। হাসপাতালটি ৫০ শয্যার। এখানে অপারেশন থিয়েটার আছে। ল্যাবরেটরি আছে। একজন আবাসিক চিকিৎসক, তিনজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, তিনজন মেডিক্যাল অফিসার, ডেন্টাল সার্জনসহ প্রয়োজনীয় সব পদই আছে। কিন্তু তাতে উপজেলাবাসীর কষ্ট লাঘব হবে এমন কথা বলা যাচ্ছে না। হাসপাতালে আছে অনেক কিছু আবার অনেক কিছুই নেই। একজন আবাসিক চিকিৎসকের পদ থাকলেও চিকিৎসক নেই। তিনজন জুনিয়র কনসালট্যান্টের একজনও নেই। নেই ডেন্টাল সার্জন। মেডিক্যাল অফিসার তিনজনের মধ্যে দুজন থাকলেও তাঁরা প্রেষণে রাজধানীতে রয়েছেন। মিডওয়াইফ নার্সের চারটি পদের মধ্যে তিনটি শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী কম আছে। অপারেশন থিয়েটার থাকলেও নেই কোনো যন্ত্রপাতি। এক্স-রে মেশিন আছে, নেই আল্ট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি মেশিন। সবচেয়ে বড় কথা, ৫০ শয্যার হাসপাতালে ৩১ শয্যার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
এ অবস্থায় আশুগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালটি এলাকার রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে কী করে? প্রথম কথা হচ্ছে, যেকোনো হাসপাতালে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসকের পদায়ন ও তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকরা যদি হাসপাতালে না থাকেন, তাহলে চিকিৎসাসেবা কার কাছ থেকে পাওয়া যাবে। এর সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালে করা না গেলে, তা এলাকার মানুষের কোন কাজ লাগবে? উদ্বোধনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালে একটি অ্যাম্বুল্যান্স দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এখন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাও নিশ্চিত করতে হবে। পদের বিপরীতে চিকিৎসকদের পদায়ন যেমন দরকার, তেমনি সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকাও জরুরি। আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট মহল জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে। আশুগঞ্জের মানুষের কাছে সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হোক।

 

পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়ন

ঢাকায় তিন দিনব্যাপী ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পর্যটনমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এটি ১০ম সম্মেলন। সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সম্মেলন থেকে ঢাকাকে ‘ইসলামিক ট্যুরিজম সিটি’ ঘোষণা করা হয়। ওআইসিভুক্ত দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে আগামীতে বৃহত্তর পরিসরে সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়াতে এই সম্মেলনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। অর্থনৈতিক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরস্পরের কাছাকাছি আসা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে এ সম্মেলন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। সম্মেলনের রীতি অনুযায়ী বিদায়ী চেয়ারপার্সন আহমেদ বথু বক্তৃতার পর পরই পরবর্তী দুই বছরের জন্য আইসিটিএমের চেয়ারপার্সনশিপ বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আকম শাহজাহান কামালের কাছে হস্তান্তর করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যগণ, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা, কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ৩০টি রাষ্ট্রের ১৫ জন পর্যটনমন্ত্রী এবং প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাপী পর্যটন একটি দ্রুত বিকাশমান খাত যা বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পর্যটন শিল্প অন্যতম ক্ষেত্র যেখানে একসঙ্গে কাজ করার বড় সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে অর্থনৈতিক খাত হিসেবে উন্নত করতে তাঁর সরকার বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। সেই লক্ষ্যে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। কক্সবাজারকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে আমাদের দেশে সম্পদের অভাব নেই। সুদীর্ঘ মেরিন ড্রাইভসহ বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল সুন্দরবন বাংলাদেশে অবস্থিত। রয়েছে সাগরকন্যা কুয়াকাটা, যা অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এসব স্থান পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে পারে। জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে শত শত নদী যা ছবির মতো সুন্দর। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রয়েছে শত শত সবুজ চা বাগান যা অবকাশ যাপনের চোখ জুড়ানো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। রয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও প্রতœ-সমৃদ্ধ স্থানসমূহ। পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে দরকার প্রশিক্ষিত জনবল। রক্ষা করতে হবে পর্যটন এলাকাগুলো। বর্তমান বিশ্বে পর্যটনের যে বিশাল বাজার তা ধরে রাখা গেলে বদলে যেতে পারে আমাদের অর্থনীতি।

পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ

বাংলাদেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, তা দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ হয় না। ফলে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশে আমদানি করা পেঁয়াজের বড় অংশই আসে ভারত থেকে। ফলে ভারতে পেঁয়াজের দাম ওঠানামা করলে বাংলাদেশের বাজারে তার প্রভাব পড়বে এটাই স্বাভাবিক। ভারত সরকার মৌসুমের শুরুতে পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য বা এমইপি নির্ধারণ করে দেওয়ার পর বাংলাদেশের বাজারে তার প্রভাব পড়ে। ভারতে পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য বাড়িয়ে প্রতি মেট্রিক টন ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করা হলে বাংলাদেশের খোলাবাজারেও বেড়ে যায় পেঁয়াজের দাম। কিন্তু ভারত সরকার পেঁয়াজের ন্যূনতম দাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর তার কোনো প্রভাব পড়েনি বাজারে। বরং দাম আরো বেড়েছে। ভারতে ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য প্রত্যাহারের কোনো প্রভাব দেশের বাজারে পড়েনি। বরং ব্যবসায়ীদের অজুহাতে দাম বেড়েছে। অনিবার্যভাবেই তার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। ভোক্তাদের অভিযোগ, মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে এত দিন ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভারত পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করার পর থেকেই দেশের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। পরে এই দাম কমিয়ে যখন ৭০০ ডলার করা হয় তখনো তার কোনো প্রভাব বাজারে ছিল না। এখন ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য একেবারে তুলে নেওয়ার পরও তার কোনো প্রভাব বাজারে পড়ছে না। উল্টো পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের এবারের অজুহাত, বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। যে কারণে পেঁয়াজের দাম কমছে না।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে, আমদানি করা পণ্যের দাম কোথাও বেড়েছে জানতে পারলেই দেশের বাজারে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটে। ব্যবসায়ীদের আরেকটি প্রবণতা হচ্ছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতির কথা বলে মাঝেমধ্যেই বাজার অস্থিতিশীল করে তোলা হয়। যেমনটি এখন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর পেঁয়াজের চাহিদা কমবেশি ২২ লাখ টন বলে ধরে নেওয়া হয়। গত বছর দেশে উৎপাদিত হয় ১৮ লাখ টন পেঁয়াজ। উৎপাদনে এই চার লাখ টনের ঘাটতিকেই বড় করে দেখিয়ে আবার বাজার অস্থিতিশীল করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা এবারও লক্ষ করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিই পারে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে।