বিভাগ: সম্পাদকীয়

জাতীয় শোক দিবস আজ

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বিপথগামী কিছু সেনা সদস্যের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিন দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। শোকসন্তপ্ত জাতি আজ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধুকে বিশেষভাবে স্মরণ করছে। যাঁর গৌরবময় নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সেই মহান নেতাকে সপরিবারে হত্যা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক ঘটনা। ঘাতক দল ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে তাঁর নাম ইতিহাস থেকে চিরতরে মুছে ফেলবে। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন সফল হয়নি। যে বাড়িতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হয়েছেন সেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি এখন জাতির অন্যতম আবেগময় স্মৃতিচিহ্নে পরিণত হয়েছে। আর তিনি বাঙালী জাতির প্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
ঘাতকরা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার যে পথ সৃষ্টি হয়েছিল সেখান থেকে দেশকে সরিয়ে বিপরীতমুখী করার উদ্দেশ্য ছিল তাদের বড় একটি লক্ষ্য। তাদের লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলিয়ে দেয়া। মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর অবদানকে খাটো করা এবং যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্যে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেটা নস্যাত করে দেয়া। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে শুরু হয় এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। একটা পর্যায় দেশে এসেছিল যখন বঙ্গবন্ধুর নামটাও জাতীয় প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হতে পারত না। ইতিহাস থেকে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়কের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। তরুণদের দীর্ঘকাল জানতে দেয়া হয়নি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুকে শুধু অস্বীকার করাই নয়, নানাভাবে তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। তাঁর অবদানকে নানাভাবে খাটো করা, এমনকি অস্বীকারও করা হয়েছে। কিন্তু কুচক্রীদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। এ দেশের ইতিহাসের সঙ্গে যাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত- দেশের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় যাঁর স্থান, কোন হুকুম বা ফরমান দিয়ে তাঁর নাম মুছে ফেলা যায় না। তাঁর অবদানকে খাটো করা যায় না। দেশকে তিনি ভালবেসেছেন অকৃত্রিমভাবে, দেশের মানুষও তাঁকে দিয়েছে হৃদয় উজাড় করা ভালবাসা। তাই খুনী, ঘাতকচক্র ও তাদের পৃষ্ঠপোষকের সব চক্রান্ত, চেষ্টা, তৎপরতা ব্যর্থ হয়ে গেছে।
বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে আজ না থাকলেও মানুষের হৃদয়জুড়ে তাঁর অবস্থান। তাঁর হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। ঘাতকদের দন্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে। তবে এখনও কয়েক ঘাতক পালিয়ে রয়েছে নানা দেশে। তাদের অতিদ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে দন্ডাদেশ কার্যকরের ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা সবার দাবি। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন সোনার বাংলা গড়ার। সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার মাধ্যমেই তাঁর প্রতি সর্বোৎকৃষ্ট শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব। সে কাজটাই এখন করতে হবে।

সড়ক ও মহাসড়ক সংস্কার হোক

সামনে ঈদুল আজহা। কয়েক দিন পরই শুরু হতে যাচ্ছে ঈদ যাত্রা। সড়কপথে চলাচলকারী বাসের টিকিট বিক্রি শেষ। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ঘরে ঘরে প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। কিন্তু এবারও দেশের কয়েকটি মহাসড়ক ঈদ যাত্রায় আনন্দের অন্তরায় হতে পারে—এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, ঈদের আগেই সব মহাসড়ক চলাচলের উপযোগী হবে। সড়ক, মহাসড়ক বরাবরই মৃত্যুফাঁদ হিসেবে পরিচিত। বর্ষার সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও জমে থাকে পানি। সংস্কারকাজ চলতে থাকায় কোথাও কোথাও সড়ক সংকুচিত হয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, বর্ষা মৌসুমে দেশের সড়ক, মহাসড়কগুলো গর্ত আর খানাখন্দে ভরে যায়। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় বিস্তর লেখালেখিও হয়। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। তার আগে সেই সড়কে দুর্ঘটনায় হয়তো প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
এমন কিছু সড়ক, মহাসড়কের সাম্প্রতিক অবস্থার যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে ঘরমুখো মানুষের মনে আশঙ্কা দেখা দেওয়া অমূলক নয়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দিয়ে রাজধানী থেকে উত্তরবঙ্গে ১৬টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। এই মহাসড়কে এখনো চলছে চার লেনের কাজ। চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ফোর লেনে গাড়ি চলাচল করলেও সড়কের ওই অংশের দুই পাশে এখনো পিচ ঢালাই হয়নি। ফলে আসন্ন ঈদ যাত্রা নিয়ে চরম ভোগান্তির কারণ হতে পারে এই অংশ। ওদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেট মহাসড়কে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা সেতু টোল প্লাজার পশ্চিম পাশের অংশটি খানাখন্দে ভরা। ফলে প্রতিবছরের মতো এবারও ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে এ পথে চলাচলকারীদের। কাঁচপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সেতুর নির্মাণকাজ চলার কারণে মহাসড়কের একাংশ কেটে ফেলা হয়েছে। ফলে এখন থেকেই যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ভোগান্তির জায়গা গাজীপুর অংশে। চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গীর তুরাগ সেতু পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার অংশে পানি জমে দুই পাশে তৈরি হয়ে আছে বিশাল নালা। এতে ঈদ যাত্রায় দুর্ভোগ আরো বাড়বে। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কেরও বেশ কিছু এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় অনেক গর্ত। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক এখন বেহাল।
এ অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় দ্রুত সড়ক সংস্কার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংস্কারকাজ চলছে কিন্তু কাজের গতি বাড়াতে হবে। বর্ষায় নষ্ট হয়ে যাওয়া সড়ক-মহাসড়ক অবিলম্বে মেরামত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মহাসড়কের পাশে অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে হবে। অবৈধ হাটবাজার, বিশেষ করে কোরবানির পশুর হাট যেন যানজটের কারণ না হয় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সড়ক-মহাসড়ক চলাচলের উপযোগী করতে জরুরি ব্যবস্থা নেবে।

কবিরাজি চিকিৎসা বেহাল

 

আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিতে অক্ষম দেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছে এখনো নানা ধরনের টোটকা চিকিৎসাই ভরসা। কিন্তু প্রচলিত সেসব চিকিৎসাপদ্ধতির নামে বেশির ভাগ স্থানেই চলে ব্যাপক প্রতারণা। কবিরাজির নামে এমন অনেকে এসব প্রতারণা করছে, যাদের কবিরাজি সম্পর্কেও কোনো জ্ঞান নেই। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের রাজার বাজারে দুলাল চন্দ্র পাল নামে এক ব্যক্তি নিজেই ওষুধ তৈরি ও বিক্রি করেন। প্রায় সর্বরোগের এই ওষুধ বানানোর পদ্ধতিও বিচিত্র। তিনি বিভিন্ন লতাপাতা সংগ্রহ করে কয়েকটি ড্রামের মধ্যে সেগুলো ভিজিয়ে রাখেন। সেই পচা পানি বোতলে ভরে তিনি বিক্রি করেন। জানা যায়, বিভিন্ন জায়গায় তাঁর ‘দালাল’ ধরনের কিছু লোক রয়েছে, তারাই রোগী ধরে দুলাল চন্দ্রের কাছে পাঠায়।
কবিরাজি ওষুধেরও কিছু ভিত্তি রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে ভেষজগুণ অনুসন্ধান করে বিভিন্ন ওষুধ তৈরি করা হয়েছে। সেগুলো সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেই কেউ কবিরাজি চিকিৎসা করতে পারেন। অথচ দেশের আনাচকানাচে এমন বহু ওষুধ বিক্রেতা পাওয়া যায়, যাদের কবিরাজি ওষুধ সম্পর্কেও কোনো জ্ঞান নেই বললেই চলে। অথচ এরা জীবাণুঘটিত রোগসহ প্রায় সব রোগেরই ওষুধ বিক্রি করে। এর ক্ষতি বহুবিধ। যিনি অসুস্থ, এই ওষুধে তাঁর রোগ সারে না, বরং রোগ আরো খারাপ পর্যায়ে চলে যায়। একসময় রোগটি চিকিৎসার আওতার বাইরে চলে যায় এবং রোগী মারা যান। দ্বিতীয়ত, যে পদ্ধতিতে ওষুধ বানানো হয় তা স্বাস্থ্যসম্মত না হওয়ায় এই ‘ওষুধ’ নতুন নতুন রোগ সৃষ্টি করে। যেমন কুমিল্লার সিভিল সার্জনের মতে, লতাপাতা ভেজানো এই পচা পানি খেয়ে পেটের পীড়া, লিভারের অসুখ, হেপাটাইটিসসহ আরো অনেক রোগ হতে পারে। তার পরও দুলাল চন্দ্ররা নিয়মিতভাবে মানুষকে ঠকিয়েই চলেছে।
এ ধরনের অপচিকিৎসা ঠেকাতে হলে আধুনিক চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের কাছে আরো সহজলভ্য করতে হবে। ইউনিয়নভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর আধুনিকায়ন ও সেবা সম্প্রসারণ এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অভিযোগ আছে, এসব ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায়ই চিকিৎসক থাকেন না। রোগীরা এখানে এসে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যান। ফলে তাঁরা হাতুড়ে চিকিৎসকদের কাছে যান। এটি রোধ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ

বাংলাদেশে দুর্ঘটনার হার খুব বেশি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্রতিবছর মারা যায় প্রায় ১২ হাজার মানুষ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবেও এই সংখ্যা ১১ থেকে ১২ হাজারের মধ্যে। এত বেশি দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য প্রধানত দায়ী করা হয় অবৈধ ও অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি, প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানো, গাড়ির ফিটনেস না থাকা এবং সংশ্লিষ্ট আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতাকে। সম্প্রতি রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার জের ধরে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। সপ্তাহজুড়ে চলে তাদের তীব্র বিক্ষোভ। আর তাতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলে বড় ধাক্কা লাগে। শুরু হয় সড়কের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ। পুলিশের পক্ষ থেকে ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করা হয়েছে। বহু যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং জরিমানা আদায় করা হয়েছে। রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং, গতি নিয়ন্ত্রক স্থাপনসহ আরো কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধিরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সারা দেশে এক লাখ দক্ষ চালক তৈরির একটি কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ৬০ হাজার এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিসি) ৪০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেবে।
দক্ষ চালক তৈরির এই উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তা সত্ত্বেও বলতে হবে, এটি প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। বর্তমানে ৪০ লাখের মতো গাড়ি চলাচল করে রাস্তায়। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই। যাদের লাইসেন্স আছে তাদেরও বেশির ভাগের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। অন্য চালকের কাছ থেকে কোনো রকমে স্টিয়ারিং ধরতে শিখেই লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়েছে। ফলে রাস্তার নিয়ম-কানুন কিংবা আইন সম্পর্কেও তাদের ধারণা কম। নতুন উদ্যোগে চালক তৈরির জন্য চার মাসে ৩৬০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। এতে সড়কে চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় সব বিষয়েই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কিন্তু যেভাবে প্রতিদিন সড়কে নতুন নতুন গাড়ি নামছে, তাতে আগামী পাঁচ বছরে আরো কয়েক লাখ গাড়ি রাস্তায় নামবে। প্রয়োজন হবে কয়েক লাখ চালকের। বাকি চালক আসবে কোত্থেকে? নিশ্চয়ই আগের পদ্ধতিতে। তাহলে সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি?
আমরা মনে করি, দক্ষ চালক তৈরির এই উদ্যোগ আরো সম্প্রসারণ করতে হবে। প্রতিবছর চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষিত চালক তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি যেসব ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আছে, তাদের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে এবং সেগুলোতে যাতে মানসম্মত প্রশিক্ষণ চলে তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুরনো চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক ওরিয়েন্টেশন কোর্সের ব্যবস্থা করতে হবে। লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া নিখুঁত করার পাশাপাশি সড়কে আইনের বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে তদারকি

যেকোনো অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে অনৈতিক মুনাফা অর্জন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রায় সব ঋতুতেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো হয়। উৎসবের সময় এলেও জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে হঠাৎ করেই বাড়তে শুরু করেছে ডিমের দাম। অথচ প্রান্তিক খামারি বা উৎপাদনকারীরা এর সুফল পাচ্ছে না। যখন খুচরা বিক্রেতারা হালিতে আট টাকা লাভে ডিম বিক্রি করছে, সেখানে একজন খামারি বা প্রান্তিক উৎপাদনকারীকে মাত্র ৫০ পয়সা লাভে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারি বাজারের চেয়ে খুচরা বাজারে ডিমের দাম অনেক বেশি। পাইকারি বাজারে ৩০ টাকা হালি দরে বিক্রি হওয়া ডিম খুচরা বিক্রেতারা বিক্রি করছে ৩৮ টাকা দরে। এ কথা ঠিক যে ডিমের উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে। ফলে খামারিদের অনেকেই ডিম উৎপাদন থেকে সরে এসেছে। এতে ডিমের উৎপাদন কমেছে। কিন্তু এতে এমন কিছু ঘটেনি যে বাজারে ডিমের দাম এতটা বেড়ে যাবে। আসলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণেই ডিমের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। শুধু ডিম নয়, ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়েছে বাজারে। সামনে ঈদ। এই সময় নতুন করে মসলার বাজার অস্থির হতে পারে বলে অনেকের ধারণা।
যেকোনো ছুতায় বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেওয়া যেন ব্যবসায়ীদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এটাই যেন অলিখিত নিয়ম এখন। পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে পৃথিবীর সব দেশেই খুচরা পর্যায়ের বাজারেও কিছু নিয়ম-কানুন আছে। কিন্তু আমাদের এখানে তা নেই। নিয়মিত তদারকি হয় না। বাজারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই। ফলে মাঝেমধ্যেই বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ক্রেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলে বা গণমাধ্যমে অস্থিতিশীল বাজারের তথ্য প্রকাশ পেলে নীতিনির্ধারকদের কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। কিন্তু বাজারে এর কোনো প্রতিফলন পড়ে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের বাজারে নীতিনৈতিকতার কোনো বালাই নেই। সুযোগ বুঝে এখানে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কখনো কখনো তৈরি করা হয় কৃত্রিম সংকট। এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ ক্রেতাদের। নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে ভোক্তাদের শুধুই ঠকতে হয় ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে। বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি ও নজরদারি থাকলে এমনটি ঘটার সুযোগ থাকত না। সময়ে-অসময়ে সুযোগ বুঝে পণ্যের দাম বাড়ানোর এই অশুভ তৎপরতা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মাল্টিমিডিয়া ক্লাস চালু হোক

 

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য বর্তমান সরকারের। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক করে সাজানোর পরিকল্পনায় এরই মধ্যে দেশের ৩৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের যাবতীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করেও তার সুফল পাওয়া যায়নি। খরচ হয়ে গেছে হাজার কোটি টাকা। আরো প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলমান। অনেক প্রতিষ্ঠানে সরঞ্জাম এখনো প্যাকেটবন্দি, নষ্ট হওয়ার পর মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা ও স্পিকারের সমন্বয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম গড়ে তোলা হবে। কঠিন ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলো ছবি, এনিমেশন ও ভিডিও ক্লিপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরা হবে। উদ্দেশ্য হচ্ছে পাঠের বিষয়কে শিক্ষার্থীদের কাছে আনন্দময় করে তোলা। এই কার্যক্রম চালানোর জন্য উপকরণের পাশাপাশি যোগ্য শিক্ষকও প্রয়োজন। তবে সবার আগে দরকার বিদ্যুৎ সংযোগ। সেই সঙ্গে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, যাঁরা নিজেদের তৈরি করা কনটেন্ট দিয়ে কার্যকরভাবে শ্রেণিপাঠ পরিচালনা করবেন। কিন্তু বাস্তবে উল্টো ফল ফলতে শুরু করেছে। একদিকে প্রযুক্তিভীতি, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে দেশ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরাও পর্যাপ্ত সুযোগ না পেয়ে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ভুলে যেতে বসেছেন। অনেক স্থানে মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম ব্যবহার করাই হচ্ছে না। কিশোরগঞ্জ জেলার এক হাজার ৭৫২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক হাজার ৩৬৫টিতেই মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম নেই। বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে, সেখানে ইন্টারনেটের ধীরগতিই হচ্ছে প্রধান প্রতিবন্ধক। আবার সব ধরনের সরঞ্জাম থাকার পরও অনেক বিদ্যালয়ে অবকাঠামো না থাকায় মাল্টিমিডিয়া বা ডিজিটাল ক্লাসরুম করা যায়নি। অন্যদিকে ক্লাসরুম ও মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম থাকার পরও দেশের অনেক স্থানে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ সেখানে নেই উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক। এদিকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন আছে। সরকারিভাবে মাত্র ১৪ দিনে আইসিটির প্রশিক্ষণ দিয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনা কতটা সম্ভব, এটাও বড় প্রশ্ন। এমনও দেখা গেছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জামের প্যাকেটই খোলা হয়নি। কোথাও কোথাও ল্যাপটপ ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যক্তিগত কাজে। কোথাও সব সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে, মেরামত করা হয়নি। কোথাও পাঠদান চলছে দায়সারাভাবে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় নিশ্চয় আছে। সার্বিকভাবে সব স্কুলে গিয়ে অবস্থা দেখতে হবে। কোথায় মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম দেওয়া যাবে তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখতে হবে। সবার আগে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও অবকাঠামো। অবকাঠামো ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু সরঞ্জাম সরবরাহ করে কোনো লাভ হবে না। আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে দৃষ্টি দেবে।

প্রবাসী বীমা কার্যক্রম শুরু হোক

কর্মসংস্থানের জন্য যারা বিদেশে যায়, তাদের বেশির ভাগ সাধারণ কর্মী হিসেবে যায়। অনেক ঝক্কি সয়ে যেতে হয়। ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল বিক্রি করে নিজের ও পরিবারের সচ্ছলতার জন্য বিদেশে যায় তারা। তার পরও অনেকের ভাগ্যোন্নয়ন হয় না। চাকরি না পেয়ে বা ছাঁটাই হয়ে অনেকে দেশে ফিরে আসে। কেউ দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে ফিরে আসে। তাদের বাকি জীবন পরিজনদের নিয়ে দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যে কাটে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ বিষয়ে সামগ্রিক ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেই বলেই ভাগ্যান্বেষী অনেক মানুষকে ভাগ্যহত হতে হয়; তাদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
দুঃসহ পরিস্থিতিতে যাতে তাদের আর পড়তে না হয়, দুর্বিষহ জীবন যাতে আর কাটাতে না হয় সে জন্য একটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদেশগামী কর্মীদের বীমার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বীমা থাকলে বিদেশে গিয়ে আহত বা নিহত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পাওয়া যাবে। নিয়োগ পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত হলে পাওয়া যাবে চার লাখ টাকা। প্রবাসে কেউ বেকার হলে তাকে সর্বোচ্চ তিন মাস ২৫ হাজার টাকা করে বেকার ভাতা দেওয়া হবে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ, আরো আগেই নেওয়া উচিত ছিল। বীমাসংক্রান্ত খসড়াটি প্রণয়ন করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় খসড়াটি অনুমোদন করেছে।
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত খসড়া নীতিমালা বীমাসংক্রান্ত সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ ‘সেন্ট্রাল রেটিং কমিটির’ পরবর্তী বৈঠকে পেশ করা হবে। সেখানে অনুমোদিত হলে বীমা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ‘প্রবাসী কর্মী বীমা নীতিমালা’ নামে এটি কার্যকর হবে। বয়স-নির্বিশেষে সব বীমাগ্রহীতার জন্য অভিন্ন প্রিমিয়াম হার থাকবে। বীমা চলাকালে বীমাকারীর মৃত্যু হলে তার উত্তরাধিকারী বীমার অঙ্কের শতভাগ (পাঁচ লাখ টাকা) পাবে। প্রবাসে দুর্ঘটনায় উভয় চোখ বা হাত বা পা হারালে বীমার অঙ্কের শতভাগ পাওয়া যাবে। দুর্ঘটনায় স্থায়ী ও আংশিক শারীরিক ক্ষতির জন্যও নীতিমালায় নির্ধারিত হারে বীমা সুবিধা পাবে প্রবাসীরা। বীমাগ্রহীতা নিয়োগ পাওয়ার পর স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত হলেও বীমার সুবিধা পাবে। কত মাসের মধ্যে চাকরিচ্যুত হয়েছে তা বিবেচনায় নিয়ে বীমা সুবিধার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়লে বা অসদাচরণ ও অনৈতিক কাজের দায়ে চাকরি গেলে অথবা অদক্ষতা, অবৈধ নিয়োগ বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে চাকরি নেওয়ার কারণে ছাঁটাই হলে এ সুবিধা মিলবে না।
এমন উদ্যোগ খুবই জরুরি ছিল। শুভ উদ্যোগ। সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ। নীতিমালা চালু হলে শুধু প্রবাসী কর্মীরাই সুরক্ষিত হবে না, প্রবাসে কর্মসংস্থানের বিষয়ে মানুষের আগ্রহও বাড়বে। নীতিমালা দ্রুত কার্যকর হবে এ আশাই করি।

সড়ক আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

সড়কে দুর্ঘটনা নয়, একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে শুধু আন্দোলনকারী শিশুদের নয়, এমন দাবি অনেক বিশিষ্টজনদেরও। লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, বেপরোয়া গতি, প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানো, কোনো শৃঙ্খলা না মানা এমনই অনেক কারণে সড়কে এ রকম হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এ জন্য আইনের দুর্বলতাকেই প্রধানত দায়ী করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার মন্ত্রিসভায় নতুন সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। সংসদের আগামী অধিবেশনে এটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সড়কে চলা নৈরাজ্যের ধারাবাহিকতায় রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি সপ্তাহব্যাপী তারা চালকের লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেসসহ কাগজপত্র চেক করে, গাড়িগুলোকে লেন মেনে শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে চলাচলে বাধ্য করে। এ পরিস্থিতিতে পুলিশও গত রবিবার থেকে ট্রাফিক সপ্তাহ পালন শুরু করে। কিন্তুসড়কে বিশৃঙ্খল অবস্থাই দেখা গেছে। এমনকি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে গাড়ি চালাতেও দেখা গেছে অনেককে। জানা যায়, হঠাৎ করেই বিআরটিএ কার্যালয়ে ফিটনেস সংগ্রহের জন্য গাড়ির ভিড় জমে গেছে। কিন্তু সেখানে দালালদেরও সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। ফলে ফিটনেস না থাকলেও অনেক গাড়ি হয়তো ফিটনেস সনদ পেয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে শৃঙ্খলা না ফেরার প্রধান কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সদিচ্ছার অভাব। অভিযোগ আছে, টাকা দিলে গাড়ি চালাতে না জানলেও বিআরটিএ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়। প্রশিক্ষণ নেওয়া বা পরীক্ষা দেওয়ারও প্রয়োজন হয় না। একইভাবে ফিটনেস সনদ নিতে গাড়ি দেখানোরও প্রয়োজন হয় না। একই অবস্থা সড়কেও। গাড়ি কালো ধোঁয়া ছাড়ছে, ইন্ডিকেটর লাইট নেই কিংবা জ্বলছে না, বেপরোয়া গতিতে চলছে, দুই গাড়িতে প্রতিযোগিতা করছে দেখার কেউ নেই। ট্রাফিক পুলিশকে অন্যদিকে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। ‘লাইনম্যান’ দিয়ে তোলা আদায়ের অভিযোগও আছে। এ অবস্থায় নতুন আইন করে কতটুকু লাভ হবে, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ প্রকাশ করছেন। ছয় বছর আগে গাড়িতে ডিজিটাল নাম্বার প্লেট প্রদান শুরু হয়েছে, অথচ এখনো অনেক গাড়িতে সেই পুরনো টিনের প্লেটই দেখা যায়। ডিজিটাল প্লেটে একটি আরএফআইডি ট্যাগ থাকে, যার সাহায্যে গাড়িগুলোর অবস্থান জানা যায়। সে জন্য আরএফআইডি চেকপোস্ট স্থাপন জরুরি। সারা দেশের মধ্যে শুধু রাজধানীতে এমন মাত্র ১২টি পোস্ট স্থাপিত হয়েছে বলে জানা যায়। গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার জন্য স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক ব্যবস্থা শুধু বিআরটিএর মিরপুর কেন্দ্রে রয়েছে। কিন্তু সেটিরও ব্যবহার সীমিত বলে জানা যায়। এখানে মনে হয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থাই অটোমেশনের বিরোধী। বাড়তি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই এমন বিরোধিতা বলে মনে করা হয়। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে নতুন আইন কি পারবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে?
আমরা চাই, নতুন আইনে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক এবং রাস্তায় তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হোক। আইন বাস্তবায়নে কারো গাফিলতি থাকলে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হোক।

পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ চাই

সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা। এই ঈদে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যে যার সাধ্যমতো পশু কোরবানি করবে। পশুর মাংস নিজেরা খাবে, গরিব-দুঃখী কিংবা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিতরণ করবে। এ সময় পেঁয়াজ, আদা-রসুন ও অন্য কিছু মসলার চাহিদা কিছুটা বেড়ে যায়। আর প্রতিবছর এ সুযোগই নেয় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। কোরবানির ঈদের আগে আগে নানা রকম কারসাজি করে এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। গত এক-দেড় মাসে পেঁয়াজের দাম বাড়তে বাড়তে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। রমজান মাসের পর দেশি জাতের পেঁয়াজের দাম ছিল ৩৫ টাকা, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে। আর আমদানি করা পেঁয়াজের দাম হয়েছে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা। অথচ গত সপ্তাহেও যে দামে এই পেঁয়াজের এলসি করা হয়েছে, তাতে কেজিপ্রতি আমদানিমূল্য হবে সর্বোচ্চ ২১ টাকা। এসব পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
দাম বাড়ানোর পেছনে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কথাও শোনা যায়। বিগত রমজান মাস শুরু হওয়ার আগে আগে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রমজান মাসের শুরুতে বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা ও বাড়তি মনিটরিং চালু করায় ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয় দাম কমাতে। তখনই দেশি পেঁয়াজের দাম নেমে আসে কেজিপ্রতি ৩৫ টাকায় এবং বিদেশি পেঁয়াজ ২০ থেকে ২৫ টাকায়। সম্প্রতি ভারতের বাজারেও পেঁয়াজের দাম সামান্য বেড়েছে। সেই বাড়তি দামে আমদানি করা হলেও কেজিপ্রতি মূল্য পড়বে ২১ টাকার মতো। সেই পেঁয়াজ ৪০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ার পেছনে কোনো যুক্তিই থাকতে পারে না। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট নানা ধরনের কারসাজি করে ক্রমাগতভাবে দাম বাড়িয়ে চলেছে। তাঁদের মতে, সরকার চাইলে এসব কারসাজি নিয়ন্ত্রণ করা মোটেও কঠিন কাজ নয়। কিন্তু সেই চাওয়াতেই যেন ঘাটতি রয়েছে।
আমরা চাই অবিলম্বে পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেওয়া হোক। সরকারি সংস্থা টিসিবিকে দ্রুত সক্রিয় করতে হবে। প্রয়োজনে টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানিরও উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি খোলাবাজারে পেঁয়াজসহ জরুরি কিছু পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের বাজার যেহেতু কোনো নিয়ম-নৈতিকতা মেনে চলে না, তাই এখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ বাড়াতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অনৈতিক মুনাফাখোরদের শাস্তি দিতে হবে। আমরা আশা করি, ঈদুল আজহায়ও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

যানবাহন চলাচলে শৃংখলা

নিরাপদ সড়কের দাবিতে সপ্তম দিনের মতো শনিবারও রাজপথে নামে শিক্ষার্থীরা। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সব দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলা হলেও তারা পথ ছেড়ে যায়নি। এদিকে রাজধানীতে গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে। নিরাপত্তার অজুহাতে ছেড়ে যাচ্ছে না দূরপাল্লার বাস। বিপাকে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। প্রতিদিন যাদের কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়, তাদের ভোগান্তি চরমে। শুক্রবার সকাল থেকে বন্ধ থাকার পর রাতে চলেছিল দূরপাল্লার বাস। শনিবার সকাল থেকে আবার বন্ধ হয়ে যায় সড়ক যোগাযোগ। বাস মালিক সমিতির সভাপতি বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই বাস চলাচল করবে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাল্টায় পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের এই অঘোষিত ধর্মঘটে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বাস টার্মিনালগুলোতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে বাসের দেখা পাননি। বিদেশগামী যাত্রীদের বিমানবন্দরে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়েছে। অসুস্থদের জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতেও গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত ভাড়া। অভিযোগ উঠেছে, যাত্রীবাহী বাস না থাকায় রাইড শেয়ারিংয়ের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। চলমান আন্দোলনের মধ্যেই শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়েছেন। শনিবার গাজীপুরে কাভার্ড ভ্যান চাপায় কলেজছাত্রী নিহত হয়েছেন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের শিশু-কিশোররা পথে নেমে গত কয়েক দিনে আলোর দিশা দেখিয়েছে। তাদের দাবি পূরণে সম্মত হয়েছে সরকার। এরই মধ্যে দিয়া ও করিমের পরিবারকে অনুদান হিসেবে ২০ লাখ টাকা করে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। রমিজ উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে বিআরটিসির পাঁচটি বাস দেওয়া হয়েছে। সব স্কুলের সামনে গতিরোধক করে দেওয়া হবে। অনেক দিন ধরে আটকে থাকা সড়ক পরিবহন আইন মন্ত্রিসভায় উঠছে। এরপর শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু তার পরও শিক্ষার্থীরা শনিবার রাজপথে নেমে আসে। এদিকে পরিবহন শ্রমিকরা কোথাও কোথাও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। এ অবস্থায় উভয় পক্ষের মুখোমুখি হওয়া এবং সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা করা যেতেই পারে। বিশেষ করে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে অঘোষিত ধর্মঘটে যাওয়ার বিষয়টি জনমনে নানা গুঞ্জন ছড়াচ্ছে। শিশু-কিশোররা অসংগঠিত। এই সুযোগটি নিতে পারে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। তার ইঙ্গিতও মিলতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তুলে নিয়ে যাওয়া এমনকি নিহত হওয়ার খবর পর্যন্ত ছড়ানো হচ্ছে। এই সুযোগে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যেকোনো স্থানে অঘটন ঘটিয়ে ফেললে তার দায় কে নেবে? এরই মধ্যে পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়েছে। অনভিপ্রেত এসব ঘটনা একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। বিশেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাস করে না এই আন্দোলনে তাদের সম্পৃক্তি থেকে দূরে থাকতে হবে। দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ফিরে যেতে হবে শ্রেণিকক্ষে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের। অন্যদিকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদেরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। দ্রুত এই অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে সামনে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।