বিভাগ: ইসলামের আলো

পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রত্যেক মানুষের জীবনে পিতা-মাতার গুরুত্ব অপরিসীম। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনায় পিতাÑমাতা তিলে তিলে নিজের জীবন ও সামর্থ্যকে ক্ষয় করে এক সময় বার্ধক্যে উপনীত হন, কর্মক্ষম হাত পাগুলো নিশ্চল হয়ে পড়ে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন সন্তানের উপর। তাই সন্তান যখন সামর্থ্যবান হবে, তখন পিতাÑমাতার সার্বিক ভরণ-পোষণ তাদের দায়িত্ব ও আবশ্যকীয় কর্তব্য। আইনটি এ বিষয়ে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম আইন। বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক মুসলিম। ইসলামে ও পিতা-মাতার সার্বিক সেবাযতেœর প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত আইনটির পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ উপস্থাপন করা হবে। প্রবন্ধটি প্রণয়নে বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও সমালোচনামূলক গবেষণা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। এ মাধ্যমে অত্র আইনের অনুষঙ্গের ইসলামী দৃষ্টিকোণ অবগত হওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ক ইসলামী আইনের সাথে তুলনা করা সম্ভব হবে।
মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে তাঁর খলীফা হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন এবং তার জীবন পরিচালনার জন্য পথ দেখিয়েছেন। এজন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং তাদের মাধ্যমে মানব জতিকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। মানুষের পৃথিবীতে আগমনের মাধ্যম হলো তার পিতা-মাতা। পৃথিবীতে একজন মানব সন্তান আগমনের পূর্বে ও পরে পিতা-মাতা তার জন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করেন এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদের লালন পালন করেন। পিতা-মাতার মাধ্যমেই পৃথিবীতে মানুষের বিস্তার ও বংশ পরিক্রমা নির্ধারিত হয়। পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখার সৌভাগ্য মানুষ পিতা-মাতার মাধ্যমেই পেয়ে থাকে। তাই মানুষের জীবনে পিতা-মাতার স্থান ও অধিকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথেই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআনের বিভিন্ন স্থান আল্লাহর অধিকারের পাশাপাশি পিতা-মাতার অধিকারের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। সন্তানের নিকট থেকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সদাচরণ পাওয়া পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার। বিশেষভাবে তারা যখন বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হন এবং কর্মক্ষম থাকেন না, তখন তারা ভরণÑপোষণ ও সেবা-যতœ পাওয়ার জন্য সন্তানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। সন্তানের কর্তব্য, তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ- এর দায়িত্ব গ্রহণ করা, অসুস্থ হলে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং তাঁদেরকে সঙ্গ দেয়া এবং তাদের মনে কষ্ট পাবার মতো কোন ব্যবহার না করা।
সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩ শিরোনামে একটি আইন প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত আইনটি ২৭ অক্টোবর ২০১৩/১২ কার্তিক ১৪২০ তারিখ রবিবার রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের পর আইন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা হিসেবে বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রাণালয় কর্তৃক বাংলাদেশ ফরম ও প্রকাশনা অফিস কর্র্র্তৃক প্রকাশিত হয়েছে।
‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ’ আইনটি প্রণয়নের কারণ বা ব্যাখ্যা গেজেটে উল্লেখ করা হয়নি। তবে আইনে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীণ ও প্রয়োজনীয়; সেহেতু এতদ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল।’ মূলত বাংলাদেশের বর্তমান সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের স্খলনের কারণে পারিবারিক বন্ধন ও দায়িত্ববোধে শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়। পিতা-মাতাসহ সমাজের বৃদ্ধ ও প্রবীণ শ্রেণীর দায়িত্ব পালন ও তাঁদের প্রতি গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে প্রায়ই পিতা-মাতার প্রতি অসদারচণের সংবাদ পরিলক্ষিত হয়, এ দেশের নব্বই শতাংশ লোক মুসলিম হলেও পরিপূর্ণ ইসলামী শিক্ষার অনুপস্থিতিতে মুসলিম সমাজে ইসলামী অনুশাসনের যথাযথ চর্চা নেই এবং ইসলামের শিক্ষা, বিধি-বিধান ও আইন পরিপালনে শিথিলতা লক্ষণীয়। এ প্রেক্ষিতে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রণীত এটিই প্রথম আইন। সাধারণ মানুষের মধ্যে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। নিম্নে আইনটির পর্যালোচনা ও সীমাবদ্ধতাগুলো আলোচনা করা হলো:
“পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩” শিরোনামে আইনটি ২০১৩ সনের ৪৯নং আইন, যা সংসদ কর্তৃক গৃহীত ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মতি লাভ করেছে। উক্ত আইনে ধারা ২(ক) তে পিতা বলতে সন্তানের জনককে বুঝানো হয়েছে।
‘ভরণ-পোষণ’ বলতে খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং সঙ্গ প্রদানকে বুঝানো হয়েছে। ‘সন্তানের মাতা’ বলতে সন্তানের গর্ভধারিণী এবং ‘সন্তান’ বলতে পিতার ঔরসে ও মাতার গর্ভে জন্ম গ্রহণকারী সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যাকে বুঝানো হয়েছে। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩, বাংলাদেশ গেজেট, রেজিস্টার্ড নং ডি, এ-১ বাংলাদেশ সরকারী মুদ্রণালয় কর্তৃক মুদ্রিত ও বাংলাদেশ ফরম ও প্রকাশনা অফিস, তেজগাঁও, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত। আইন নং ৪৯, ধারাÑ২”
উল্লিখিত আইনে ভরণ-পোষণ অর্থ খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গ প্রদানকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। কিন্তু পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ, শ্রদ্ধাবোধ, কর্কশ ভাষায় কথা না বলা, কষ্ট না দেয়া, তাদের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখা, তাদের আনুগত্য স্বীকার করা ইত্যাদি বিষয়কে অন্তুর্ভুক্ত করা হয়নি। অনেক সময় শারীরিকভাবে কষ্টের মতোই মানসিক কষ্টও পীড়াদায়ক এবং নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে।
আইনের ২নং ধারার (ঘ) অনুচ্ছেদে ‘সন্তান’ বলতে পিতার ঔরসে এবং মাতার গর্ভে জন্ম নেয়া সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যাকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু ‘সক্ষম’ ও ‘সামর্থ্যবান’Ñএর কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। আমাদের সমাজে শিক্ষিত অনেক বেকার রয়েছেন, যারা যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। এ ছাড়া পিতা-মাতার সন্তান যদি বেকার থাকে অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরি না পায়, তাহলে এ আইনের আলোকে সে কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে তার বিকল্প কোন দিকনির্দেশনা দেয়া হয়নি। ‘সক্ষম’ ও ‘সামর্থ্যবান’-এর বয়স নির্ধারিত নেই এবং সংজ্ঞাও দেয়া হয়নি।
আইনটির ২নং ধারার আলোকে বলা যায়, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যাকে সমান ভাবে দায়িত্ব পুরুষ ও নারীর উপর সমানভাবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় আর্থিক সংগতি ও দায় দায়িত্ব পুরুষ ও নারীর উপর সমানভাবে প্রযোজ্য হতে দেখা যায় না। আর্থিক বিষয়ে সামর্থ্য ও দায়িত্ব পুত্র বা পুরুষগণ বেশি পালন করে থাকেন। কন্যা বা নারীগণ বিবাহ-পরবর্তী জীবনে স্বামীর সংসারের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অনেক সময় নারীদের কোন নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা থাকে না এবং আর্থিক সক্ষমতা সমান না হওয়া সত্ত্বেও সমান দায়িত্ব পাল কতটুকু সম্ভব তা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। যা উক্ত আইনে সুস্পষ্ট নয়।
‘পিতা ও মাতা’Ñএর সংজ্ঞায় ইসলামী ফিক্হ বিশ্বকোষ ‘আলÑমাওসূ‘আতুল ফিকইহয়্যাহতে বলা হয়েছে, পিতা এর অর্থ জন্মতাদা, যার বীর্য থেকে আরেকজন মানুষ জন্মগ্রহণ করে। এর আরবী প্রতিশব্দ হল ‘আব’। ‘আব’ শব্দটির কয়েকটি বহুবছন রয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ হলো ‘আবা’। পরিভাষায়, এমন ব্যক্তিকে পিতা বলা হয়, সরাসরি যার শরীয়তসম্মত স্ত্রীর সাথে যৌন সংসর্গের ভিত্তিতে আরেক মানুষ জন্মগ্রহণ করে। যে নারী অপরের সন্তানকে দুধ পান করায়, সাধারণত তার স্বামীকেও দুধপানকারীর পিতা বলা হয়। “আব্দুল মান্নান তালিব (প্রধান সম্পা.) আল-মাওসূ‘আতুল ফিকইহয়্যাহ, ইসলামের পরিবারিক আইন(ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিচার্স এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার, ২০১২), খ.১, পৃ.৯১”। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: মুহাম্মাদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রসূল এবং শেষ নবী। “আল-কুরআন, ৩৩:৪০”।
অভিধানে কোন কিছুর মূলকে উম্মুন বা মাতা বলা হয়। ‘উম্মুন’ অর্থ মাতা; জননী। আরবীতে শব্দটির বহুবচন ‘উম্মাহাত’ ও ‘উম্মাত’। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম শব্দটি মানজাতির জন্য এবং দ্বিতীয় শব্দটি জীবজন্তুর জন্য ব্যবহৃত হয়। ফকীহগণ বলেন, যে নারীর গর্ভ থেকে মানুষ জন্মলাভ করে তিনি সেই মানুষের প্রকৃত মাতা। আর যে নারীর সন্তান কাউকে জন্ম দেয় সেই নারীও রূপকার্থে তার মাতা। পিতার মা হলে তিনি দাদী এবং মায়ের মা হলে তিনি নানী। যে মহিলা কোন শিশুকে দুধ পান করান, অথচ তাকে গর্ভে ধারণ করেননি, তিনি তার দুধমাতা। “আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, পৃ.৮৪” পবিত্র কুরআনে এ শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আর আমি মূসা-এর মায়ের প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম যে, তাকে দুধ পান করাতে থাক। “অলÑকুরআন, ২৮:০৭”
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীগণকে মাতা বলে ফেলে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্মদান করেছেন। তারা তো অসমীচীন ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মার্জনাকারী ও ক্ষমাশীল। “আল-কুরআন, ৫৮:০২”। আরবীতে জন্মদাতা ও জন্মদাত্রীকে যাথাক্রমে ওয়ালিদ ও ওয়ালিদাহ বলা হয়। অতএব পিতা-মাতার সংজ্ঞা ক্ষেত্রে এ আইন ও ফকীহগণের মতামতের মধ্যে পার্থক্য নেই।
‘ভরণ-পোষণ’ শব্দটির আরবী প্রতিশব্দ হলো নাফাকাতুন। এর অর্থ হলো খরচ, ব্যয়, জীবন নির্বাহের ব্যয়, খোরপোষ। পরিভাষায়, ‘নাফাকাহ’ বা খোরপোষ হলো অপচয় ছাড়া যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ জীবনধারাণ করে। “আলÑমাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২, পৃ,১০৩”। অর্থাৎ যা জীবন ধারণের ভিত্তি। সুতরাং জীবন ধারণের মৌলিক চাহিদাসমূহ তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে? বল, ‘তোমরা যে সম্পদ ব্যয় করবে, তা পিতা-মাতা, আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য। আর যে কোন ভাল কাজ তোমরা কর, নিশ্চয় সে ব্যাপারে আল্লাহ সুপরিজ্ঞাত। “আল-কুরআন ০২:২১৫”। (অসমাপ্ত)

রামাদান মাসের ফযীলত আদায়ে সঠিক নিয়ম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত উসিলার শিরক ও লক্ষ্য করা যায় যেখানে এখনও অনেক মুসলিম বিশ্বাস করেন আল্লাহ তা’য়ালাকে পেতে হলে মাধ্যম ধরা লাগে, গবফরধ লাগে। এটা একটি শিরিকী বিশ্বাস, কুফুরী বিশ্বাস, কাফের মুশরিকদের বিশ্বাস যে আল্লাহকে পেতে হলে গবফরধ লাগবে, মাধ্যম লাগবে। মক্কার কাফের-মুশরেকরাও মূর্তির উপাসনা করতো এজন্যে যে, এ সকল মূর্তির মাধ্যমে তারা আল্লাহ তা’য়ালার নৈকট্য হাছিল করবে। সূরা আয যুমারের ৩ নং আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “জেনে রাখো! আল্লাহ তা’য়ালার জন্যেই একমাত্র ইবাদত। আর যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যেই তাদের (মূর্তিগুলোর) ইবাদত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহ তা’য়ালার নিকটবর্তী করে দিবে”। আল্লাহ তা’য়ালাকে পাবার জন্যে কোন মিডিয়ার প্রয়োজন নাই, তিনি সরাসরি দেখেন, সরাসরি শুনেন ও সরাসরি জানেন। আমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে আল্লাহ বলে ডাক দিব সাথে সাথে আল্লাহ তা’য়ালা আরশে আযীম থেকে বান্দাহ বলে জবাব দিবেন। সূরা মুমিন এর ৬০ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “আর তোমাদের বর বলছেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব”। সরাসারি আল্লাহর সাথে ঈড়হহবপঃরড়হ, মাঝখানে কোন পি. এস. আল্লাহ পাক রাখেন নাই। সূরা আল বাক্বারার ১৮৬ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “যখন আমার বান্দাহ আমার সম্পর্কে তোমাকে প্রশ্ন করে, আমি তার অতি নিকটে। আহ্বানকারী যখন আহ্বান করে তার আহ্বানে সাড়া দিই”। এখনও আমরা মুখ থেকে আল্লাহ শব্দ বের করি নাই অন্তরে শুধু কল্পনা করছি তখনও আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের নিকটে। সুতরাং এত নিকটে আল্লাহ তা’য়ালা থাকা সত্ত্বেও সেই আল্লাহ তা’য়ালাকে পাবার জন্যে, সে আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত করার জন্যে কোন মাধ্যম কোন উসিলার দরকার নাই। এ উসিলার ধারণা মক্কার কাফের-মুশরেকদের ধারণা। কিন্তু এ উসিলার পিছনে পড়ে আমাদের দেশের অসংখ্য মুসলিম লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন শুধু আল্লাহ তা’য়ালাকে পাবার জন্যে অথচ এটা একটি শিরকি কার্যক্রম।
তারপর শুভ-অশুভ কুলক্ষণে বিশ্বাস করা আমাদের দেশের কিছু মুসলিমদের চিরাচরিত অভ্যাস। শনিবারে, মঙ্গলবারে কোন ভাল কাজ করা যাবে না, এ দিনগুলো ভাল না, অমুক দিন বিয়ে-সাদি করা যাবে না, অমুক মাসে এটা করা যাবে না, জন্ম মাসে এটা করা যাবে না, অমুক দিন গাছ কাটা যাবে না, অমুক দিন ওটা করা যাবে না, এভাবে অসংখ্য বিষয় রয়েছে, এ সবই শির্কী বিশ্বাস। গণকের কাছে যাওয়া, গণকের বিশ্বাসও মুশরিকদের একটা কাজ। আমাদের দেশের অনেক মুসলিম এখনও গণকে, রাশিতে বিশ্বাস করেন, বিভিন্ন তারকাপূজারীদের কথাবার্তা বিশ্বাস করেন। শুধু তাই না, এদেশের অসংখ্য মুসলিমদের গলায়, হাতে, কোমরে তাবিজ-তুমার পাওয়া যায়। এই তাবিজ-তুমার গলায়, হাতে, কোমরে নিয়ে রামাদান মাসে যত রোযা পালন করেন, যত তারাবীহ্ আদায় করেন, যত লাইলাতুল ক্বদর করেন কিছুই আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে ফায়দা আসবে না। কোরআনুল কারীম দিয়েও তাবিজ ব্যবহার করা যাবে না। কোরআন আল্লাহ তা’য়ালা তাবিজ-তুমারের জন্যে নাযিল করেন নাই। নবী (সাঃ) এর পুরো জিন্দিগীতে তাঁর হাত মোবারক দিয়ে বা কোন সাহাবীর হাত দিয়ে একটি কোরআনের আয়াতও লিখে কাউকে দেন নাই যে, তুমি এ আয়াতটি হাতে বেঁধে রাখো, গলায় বেঁধে রাখো, গলায় ঝুলে রাখো, কোমরে বেঁধে রাখো। এ রকম তথ্য কোন একটা জাল হাদিসেও আসে নাই। তাহলে যে কোরআনুল কারীমকে নবী (সাঃ), সাহাবায়ে কেরাম এ কাজে ব্যবহার করেন নাই সে কোরআনকে এ কাজে ব্যবহার করা শিরক। এরপর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সেজদা করা শিরক। আমাদের দেশে অনেক কবরের কাছে গেলে দেখা যায় মানুষ ঐ কবরে সেজদা করছে। মান্নত করছে বিভিন্ন কবরের উদ্দেশ্যে, মাজারের উদ্দেশ্যে। সন্তান চাচ্ছে, বিপদ আপদ থেকে মুক্তি চাচ্ছে, এটা সেটা চাচ্ছে, এ সবই শির্কী কার্যক্রম। এ শির্কী কার্যক্রম যাদের মাঝে আক্বীদাগত ও আমলগত থাকবে তারা যতই সিয়াম, ক্বিয়াম, লাইলাতুল ক্বদরে ইবাদত করুক নবী (সাঃ) বলেন, আল্লাহ পাক তাদের কোন গুনাহ মাফ করবেন না।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলোঃ এহতেছাবের সাথে সিয়াম (রোজা) পালন করতে হবে। কোরআন ও সুন্নায় এহতেছাব তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথম অর্থটি হলো, আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি এবং রহমত পাবার উদ্দেশ্যে যে কোন ইবাদত, যে কোন আমল করতে হবে, অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকা যাবে না। এটাকে বলা হয় এহতেছাব। সূরা আল বাকারার ২০৭ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “মানুষের মধ্যে এমনও কিছু মানুষ আছে যারা আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেদেরকে তাঁর কাছে বিক্রি করে দেয়। আল্লাহ পাক এ ধরনের বান্দাদের প্রতি স্নেহশীল”।
নিজের যত কষ্ট হোক, নিজের কষ্টকে কষ্ট মনে না করে আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমের সামনে নিজেকে মাথা নত করে দেয়া। সূরা আল বাকারার ২১৮নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে, যারা হিজরত করেছে ও যারা আল্লাহ তা’য়ালার রাস্তায় জিহাদ করেছে এ মানুষগুলো আল্লাহ তা’য়ালার রহমতের প্রত্যাশা করে। এ মানুষগুলোর প্রতি আল্লাহ তা’য়ালা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। তাহলে ঈমান আনা, হিজরত করা, জিহাদ করা, আমলে সালেহ করা, সিয়াম পালন করা, কিয়াম করা, লাইলাতুল ক্বাদর করা, সমস্ত ইবাদত করতে হবে আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে, অন্য কোন উদ্দেশ্যে করা যাবে না, এটার নাম হলো এহতেছাব। এহতেছাবের আরেকটা অর্থ হলো আল্লাহ তা’য়ালাকে একমাত্র সাহায্যকারী হিসাবে যথেষ্ট মনে করা। সূরা আল আনফালের ৬৪ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “হে নবী, আপনার জন্যে এবং আপনাকে যেসকল মু’মীনেরা অনুসরণ করেন তাদের সকলের জন্যে আমি আল্লাহ তা’য়ালাই যথেষ্ট”। এ আয়াত থেকে বুঝা যায় মু’মীনদের মধ্যে সবাই নবীর অনুসরণ করেন না, এজন্যে বলা হয়েছে মু’মীনদের মধ্য থেকে যারা আপনার অনুসরণ করে তাদের জন্যে আমি আল্লাহ তা’য়ালাই যথেষ্ট। তাই আল্লাহ তা’য়ালাকে যথেষ্ট মনে করা এটি হলো এহতেছাব। সূরা আত্ তাওবার ১২৯নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “যদি তারা আপনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আপনি বলুন, আমার জন্যে আল্লাহ তা’য়ালাই যথেষ্ট”। এহতেছাবের আরেকটা অর্থ হলো কষ্টের মধ্যে, বিপদের মধ্যে সবর ধৈর্যধারণ করা। রামাদান মাসের সিয়াম পালন করা এটা কিন্তু স্বাভাবিকভাবে একটা কষ্টের বিষয়। কিন্তু ঈমানের কারণে আমাদের কাছে কষ্ট লাগে না, বরং মজা লাগে, ভাল লাগে। কিন্তু যাদের ঈমানের দুর্বলতা আছে, ঈমানে গন্ডগোল আছে তাদের জন্যে কিন্তু এ রোযা পালন করা, এ ক্বিয়াম করা, এ লাইলাতুল ক্বাদর করা অনেক কষ্টকর। এজন্যে রামাদান আসার পরে প্রথম ৪/৫ দিন তারাবীহ এর নামাযে আমাদের দেশের মসজিদগুলিতে জায়গা হয় না। কিন্তু ৫/৭ দিন অতিবাহিত হবার পর দেখা যায় মসজিদগুলি আস্তে আস্তে খালি হতে থাকে। আবার দেখা যায় রমাদানের শেষের দিকে ২৬/২৭ তারিখে তারা মসজিদে আসেন। মাঝখান দিয়ে থাকতে না পারার কারণ হলো এহতেছাব নাই, সবর নাই, কষ্টের মাঝেও এ ইবাদত করার মত ধৈর্য নাই। এই সবরের নাম হলো এহতেছাব। সূরা বাক্বারার ১৫৩নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “হে মু’মিনগণ, ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ তা’য়ালার কাছে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন”। সূরা বাক্বারার ১৫৫ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। অতএব, (হে নবী) তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও”।
তৃতীয় শর্তটি শুধু সিয়ামের সাথে সম্পৃক্ত নয় এটা সকল ইবাদত কবুল হওয়ার জন্যে শর্ত আর তা হলো হালাল রিযিক তথা হালাল উপার্জন। রিযিক হালাল না করে, সুদ-ঘুষ না ছেড়ে রামাদান মাসে সিয়াম, কিয়াম ও লাইলাতুল ক্বাদর করলে তা কোন কাজে আসবে না। পরিবার পরিজনের জন্যে যে আয় করা হচ্ছে এবং যা ব্যয় করা হচ্ছে তা বৈধ পন্থায় অর্জিত হচ্ছে কিনা তা দেখতে হবে। ঈদের সময় কেনাকাটার জন্যে যে টাকা পয়সা খরচ করা হচ্ছে সেসব টাকা পয়সা কোন পন্থায় অর্জিত হচ্ছে তা দেখতে হবে। এটা না করে রামাদান মাসে যত সিয়াম, ক্বিয়াম, লাইলাতুল ক্বদর, হাজার হাজার মানুষকে ইফতার করানো হোক না কেন, যাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করা হোক না কেন আল্লাহ তা’য়ালা এর মাধ্যমে বিন্দুমাত্র ফায়দা দিবেন না। সহীহ আল মুসলিমের হাদিসে নবী (সাঃ) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেনঃ “আল্লাহ তা’য়ালা পূতপবিত্র, হালাল রিযিক ছাড়া কোন ব্যক্তির ইবাদত তিনি কবুল করেন না”। হালাল রিযিক অন্বেষণ করা থেকে কোন নবী রাসূলকেও আল্লাহ তা’য়ালা মুক্তি দেন নাই। সূরা আল মুমিনুনের ৫১ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “হে রাসূল! হালাল রিযিক খাও, তারপর আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত করো”। যেসব নবী রাসূল মা’সুম বেগুনাহ, যাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুনাহসমূহ আল্লাহ তা’য়ালা ক্ষমা করে দিয়েছেন তাদেরকেও হালাল রিযিক খাওয়ার জন্যে আল্লাহ তা’য়ালা নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশ আগে হালাল রুজির ব্যবস্থা করে তারপর আমলে সালেহ তথা ভাল আমল করতে হবে। এজন্যে নবী রাসূলেরা প্রত্যেকে কেউ কামারের পেশা, কেউ কুমারের পেশা, কেউ দর্জির পেশা, কেউ ছাগল চরানোর পেশা, ইত্যাদি সব পেশা নবী রাসূলরা গ্রহণ করে হালাল রিযিকের ব্যবস্থা করে আল্লাহ তা’য়ালার দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। সহীহ আল মুসলিমে বর্ণিত হাদিস, নবী (সাঃ) বলেন, “কোন মোসাফির মরুভূমির রাস্তা দিয়ে হাটছেন, তার জামা-কাপড় ময়লা, তার দাড়ি উস্ক খোস্ক হয়ে আছে, এমন অবস্থায় আছে যে, সে আল্লাহ তা’য়ালাকে আল্লাহ বলে ডাক দিবার আগেই আল্লাহ তা’য়ালা বলেন বান্দাহ আমি হাজির। এ রকম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে থাকা সত্ত্বেও নবী (সাঃ) বলছেন, “এ লোক বলছেন, হে আমার রব! হে আমার রব! কিন্তু তার খাবার হারাম, তার পানীয় হারাম, তার গেজা হারাম, কেমন করে আল্লাহ তা’য়ালা তার ডাকে সাড়া দিবেন”? এরকম দোয়া কবুলের ঘনিষ্টতম মুহূর্তে থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তা’য়ালা তার ডাকে সাড়া দেন না। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হাদিস হযরত ইউসুফ বিন আসবাত (রাহঃ) বলেন, কোন যুবক যখন ইবাদতে মনোনিবেশ করে, তখন শয়তান নিজের সহকর্মীদেরকে বলে, খোঁজ নাও লোকটি কী খায়! সে যদি হারাম খায়, তাহলে সে যত ইচ্ছা ইবাদত করে ক্লান্ত হোক, বাধা দিও না। কেননা সে নিজেই নিজের ইবাদত ধ্বংসের জন্যে যথেষ্ট। হারাম খাওয়া অব্যাহত রেখে ইবাদত তার কোন কাজে আসবে না।” সুতরাং এ রামাদান মাসের ফযিলত, রহমত, বরকত, মাগফিরাত লাভ করতে হলে আমাদের রিযিক হালাল করতে হবে। প্রয়োজনে হালাল রিযিকের মাধ্যমে আমাদের যতটুকু খাবার অর্জিত হয় তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে, হারাম বর্জন করতে হবে।
প্রসঙ্গত : রামাদান মাসের কিয়ামুল লাইল তথা তারাবীহ নামাযের রাকাতের সংখ্যা নিয়ে আমাদের সমাজে কিছু বিতর্ক লক্ষ্য করা যায়। এ বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার বড় কারণ হলো তারাবীহ নামায সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকা। ক্বিয়ামুল লাইল বা তারাবীহ এর নামায নবী (সাঃ) রাত্রির প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগে আদায় করতেন। নবী (সাঃ) এশার নামাজের পরে রামাদান মাসে অল্প কিছুক্ষণ সময় ঘুমাতেন, এরপর উঠে তিনি ক্বিয়ামে রমাদান/ক্বিয়ামুল লাইল তথা তারাবীহ এর নামাজ আদায় শুরু করতেন। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ আল মুসলিমে বর্ণিত যে হাদিসটি ইমাম বুখারী (রাহঃ) তারাবীহ নামাযের অধ্যায়ে বর্ণনা করেন, হযরত আবু সালামাহ ইবনু আব্দুর রহমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) রামাদানে ও রামাদানের বাইরে জীবনে কোন দিন ১১ রাকাতের বেশী ক্বিয়ামুল লাইল নামাজ আদায় করেন নাই। কিন্তু নবী (সাঃ) এর এ ১১ রাকাত কেমন ছিল, কত সুন্দর ছিল সে সম্পর্কে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন, “নবী (সাঃ) এর এ নামাজ কত সুন্দর ও কত লম্বা হতো সে সম্পর্কে তুমি আমাকে প্রশ্ন করো না”। অর্থাৎ নবী (সাঃ) এর এ ১১ রাকাত নামায এত লম্বা সময় ধরে আদায় করতেন যা শেষ হতে প্রায় ফজর ওয়াক্ত হয়ে যেত। এশার নামাজের ১ বা ২ ঘণ্টা পরে শুরু করতেন, শেষ হতে ফজরের ওয়াক্ত হয়ে যেত, সাহরীর সময়ের শেষ দিকে চলে যেত, তিনি ফজরের পূর্ব মুহূর্তে তাড়াতাড়ি সাহরী খেতেন। এর আগ পর্যন্ত নবী (সাঃ) ক্বিয়ামে রামাদান আদায় করতেন। সাহাবায়ে কেরামের সময় এশার পরে ক্বিয়ামে রমাদান শুরু হয়ে সেই ফজর পর্যন্ত সারা রাত চলতো এই ক্বিয়ামে রমাদান। এরপর তাবেয়ীনের কেরামের আমলেও এ রকম তারাবীহ নামাযে দাড়িয়ে থাকতে থাকতে কষ্ট হতো। হাদিসের মধ্যে এসেছে এত লম্বা কেরাত পড়া হতো যে তাঁরা স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন না, তখন অনেকে হাতের মধ্যে লাঠি নিয়ে তার উপর ভর করে দাঁড়িয়ে এ তারাবীর নামাজ আদায় করতেন।
পরবর্তীতে মক্কা মোকাররমায় যে সকল সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন, তাবেয়ীনে কেরাম ছিলেন তাঁরা চিন্তা করলেন এভাবে আট রাকাতে এ রকম লম্বা কেরাতে দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর। আট রাকাতে যদি ৬ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাহলে প্রতি রাকাতে প্রায় ৪৫ মিনিট। তাই তাঁরা গবেষণা (ইজতেহাদ) করলেন যে, নবী (সাঃ) তো আমাদেরকে বলেন নাই যে আমি আট রাকাত তারাবীহ এর নামাজ পড়ি তোমদেরকেও আট রাকাত পড়তে হবে। নবী (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি রমাদান মাসে ক্বিয়াম (তারাবীহ) করবে, কয় রাকাত পড়বে তা নির্দিষ্ট করেন নাই। তখন সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা এর রাকাতের সংখ্যা বাড়িয়ে দিই, ৬ ঘণ্টাই তারাবীহ হবে, তবে ৬ ঘণ্টায় ৮ রাকাতের পরিবর্তে ২০ রাকাত তারাবীহ পড়বো। মক্কা মোকাররামার সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীনে কেরাম তাঁরা এই তারাবীহ এর আট রাকাতকে বৃদ্ধি করে ২০ রাকাতে করে নিলেন যাতে ১ রাকাতে ৪৫ মিনিটের পরিবর্তে ১ রাকাতে ২০ মিনিট দাঁড়াবেন বা ২৫ মিনিট দাঁড়াবেন যাতে এর রাকাতের সংখ্যা বেড়ে যায় মাঝখানে একটু উঠানামা করলে দাঁড়াতে কষ্টটা কম হবে। এজন্যে মক্কা মোকাররামায় তারাবীহকে পরবর্তীতে ২০ রাকাতে বাড়ানো হলো। আর মদীনা মুনাওয়ারাতে যে সকল সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ীনে কেরাম ছিলেন তাঁরা বললেন না, ২০ রাকাতেও কষ্ট হয়। তাই মদীনা মুনাওয়ারাতে এটাকে ৪০ রাকাতে বৃদ্ধি করা হলো। ইমাম মালেক (রাহঃ) মাসজিদে নববীর যখন ইমাম ছিলেন তখন তিনি ৩৮ রাকাত তারাবীহ পড়াতেন এবং ৩ রাকাত বিতর পড়াতেন, অর্থাৎ মাসজিদে নববীতে সর্বমোট ৪১ রাকাত তারাবীহ ও বিতর পড়াতেন। তাই তারাবীহ এর নামাজ ৮ রাকাত থেকে শুরু করে ৩৮ রাকাত বা ৪০ রাকাত পর্যন্ত পড়ার হাদীস পাওয়া যায়। অর্থাৎ ক্বিয়ামে রামাদান (তারাবীহ) কত রাকাত হবে এটা নবী (সাঃ) নির্দিষ্ট করেন নাই, আল্লাহ তা’য়ালা ও নির্দিষ্ট করেন নাই।
কয় রাকাত তারাবীহ আদায় করা হলো এটা মুখ্য বিষয় না, মুখ্য বিষয় হলো তিনি কতক্ষণ সময় ধরে তারাবীহ আদায় করলেন। তিনি কি ক্বিয়ামে রামাদান ৫ ঘণ্টা যাবৎ আদায় করলেন, ৩ ঘণ্টা যাবৎ আদায় করলেন নাকি ২ ঘণ্টা যাবৎ আদায় করলেন? এটাই হলো আল্লাহ তা’য়ালার নিকট মুখ্য বিষয়। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায় ঐটা বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিষ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করেন যা শয়তানের ওয়াছওয়াছা, শয়তানের কাজ। এটা কোন জরুরী কোন বিষয় না যে, তারাবীহ ৮ রাকাত হবে নাকি ২০ রাকাত হবে। কিন্তু তারাবীহ ৪০ রাকাত হবে এটা নিয়ে কেউ বিতর্ক করেন না, কথাবার্তাও বলেন না, এবং এটা আমরা অনেকে শুনিও নাই যে তারাবীহ ৪০ রাকাত পড়া যায়, অথচ মাসজিদে নববীতে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীনে কেরাম ৪০ রাকাত পর্যন্ত তারাবীহ আদায় করেছেন। তাহলে ২০ রাকাত কেন আমরা ৪০ রাকাত তারাবীহ ও পড়তে পারি। কিন্তু শর্ত হলো আমরা যেভাবে দ্রুতগতিতে তারাবীহ পড়ি এভাবে পড়া যাবে না। তারাবীর নামাজ আদায় করতে হবে কোরআনে কারীমের তেলাওয়াত সহীহ তাজবীদ সহকারে স্পষ্ট করে উচ্চারণের মাধ্যমে। আমাদের দেশে যেভাবে দ্রুতগতিতে তারাবীর নামাজ আদায় করা হয়, কিছুই বুঝা যায় না কী তেলাওয়াত হচ্ছে? একটা শব্দ, একটা বাক্য সুন্দর করে বুঝা যাচ্ছে না, যেখানে টানার কখা সেখানে টান নাই, যেখানে টানার দরকার নাই সেখানে লম্বা টান। আমাদের দেশে তারাবীর নামাযের তেলাওয়াতের মধ্যে শেষে লম্বা টান শুনা যায়, মাঝখানে আর কোন লম্বা টান শুনা যায় না, অথচ মাঝখানে ৪ আলিফ, ৩ আলিফের অনেক টান আছে কিন্তু এ টান আর শোনা যায় না। শেষে ৭ আলিফ, ১০ আলিফ পর্যন্ত একটা লম্বা টান দিয়ে রুকুতে চলে যায়। আমাদের দেশে যে হাফেজ সাহেব যত তাড়াতাড়ি তারাবীহ পড়াতে পারেন ঐ হাফেজ সাহেবের পদবীও তত বেশী যে ওনি খুব ভাল হাফেজ, একেবারে আধা ঘণ্টায় তারাবীহ শেষ করে ফেলেন, খুব গরম হাফেজ। অথচ তিনি কোরআনুল কারীমকে ধ্বংস করলেন, ইসলামকে ধ্বংস করলেন। এজন্যে তারাবীহ নামাজের ক্ষেত্রে কত রাকাত পড়া হচ্ছে, কত পারা তেলাওয়াত হয়েছে এটা মুখ্য বিষয় না, মুখ্য বিষয় হলো কতক্ষণ সময় ধরে এই কিয়ামে রামাদান আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আদায় করা হলো, এটাই হলো আল্লাহ তা’য়ালার নিকট মুখ্য বিষয়।
নবী (সাঃ) ক্বিয়ামে রামাদানের শুধু ফযিলত বর্ণনা করতেন, নির্দেশ দিতেন না। কারণ তিনি নির্দেশ দিলে সেটা আদায় করা উম্মতের জন্যে ওয়াজিব হয়ে যাবে এ আশংকায়। নবী (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে নিয়মিত জামায়াতের সাথে তারাবীহ এর নামায আদায় করতেন না। কারণ তিনি আশংকা করতেন আল্লাহ তা’য়ালা যদি আমার এ উম্মতের উপর ক্বিয়ামে রামাদানকে ফরজ করে দেন তাহলে আদায় করা উম্মতের কষ্ট হবে।
রাসূল (সাঃ) হলেন উম্মতের জন্যে রাহমাতুল্লিল আলামীন, রাউফুর রাহীম। তিনি সর্বদা চিন্তা করতেন এ উম্মতের জন্যে দ্বীনকে/ শরীয়তকে কত সহজ করা যায়, কত হালকা করা যায়। যেসকল শ্রমিক ভায়েরা রামাদান মাসে রোজা রেখে দিনের বেলায় কাজ করেন, রিকশা চালান, ইট ভাঙ্গেন, কঠিন পরিশ্রমের কাজ করেন, আল্লাহ তা’য়ালা যদি এ রকম উম্মতের জন্যেও যদি ক্বিয়ামে রামাদান (তারাবীহ) আদায় করা ফরজ করে দেন তাহলে উম্মতের কষ্ট হবে। দিনের বেলায় কষ্ট করে রোজা রেখে রাতের বেলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারাবীহ আদায় করা তাদের জন্যে কষ্টকর। এজন্যে নবী (সাঃ) নিয়মিত সাহাবাদেরকে নিয়ে জামায়াতের সাথে তারাবীহ এর নামাজ আদায় করেন নাই। জামে আত তিরমীযিতে পাওয়া যায় মাত্র ৩ দিন বা ৪ দিন নবী (সাঃ) মাসজিদে নববীতে সাহাবাদেরকে নিয়ে জামায়াতের সাথে তারাবীহ আদায় করেছিলেন। (সমাপ্ত)

রামাদান মাসের ফযীলত আদায়ে সঠিক নিয়ম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
এখানে আমাদের মৌলিক সমস্যা হয় দুটি বিষয়ের ঈমানের ক্ষেত্রে, একটা হলো আল্লাহ তা’য়ালার ক্ষেত্রে, আরেকটা হলো তাক্বদীরের ক্ষেত্রে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলিম আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি ও তাক্বদীরের প্রতি ঈমানের মর্মার্থ বুঝেন না বা জানেন না। অমুসলিমদেরও আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস আছে। একজন অমুসলিমকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় আপনাকে সৃষ্টি করেছেন কে? উত্তরে তিনি যে নামেই বলুক, তিনি কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালাকেই বুঝাবেন। তাহলে তিনিও আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করেন। তাহলে ঐ ব্যক্তি ঈমানদার না কেন? আমরা তাকে মু’মিন বলি না কেন? তাই বুঝা গেল তাদের ঈমান আর আমাদের ঈমান এক জিনিস না। তাদের ঈমান হলো আল্লাহ তা’য়ালা আছেন এটা তারা বিশ্বাস করেন, কিন্তু আমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করি তাওহীদের ভিত্তিতে। তাদের ও আমাদের আল্লাহ তা’য়ালার প্রতি ঈমানের ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো তাওহীদ। আমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করি একত্ববাদের ভিত্তিতে, আর তারা আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করেন বহুত্ববাদের ভিত্তিতে। যেমন হিন্দু সমাজ আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করেন, পাশাপাশি সরস্বতীর, দুর্গার, শ্রীকৃষ্ণের, কালির, ইত্যাদিসহ বিভিন্ন দেব-দেবী ও মা’বুদের পূজা করেন। কিন্তু আমরা এ সবগুলোকে বাদ দিয়ে খালেছভাবে কেবল আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত করি। সূরা ফতিহার ৪ নং আয়াতে নামাযের প্রতি রাকাতে সে ঘোষণাই আমরা দিই, “(হে আল্লাহ) আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমার কাছেই সাহায্য চাই”, তাদের ও আমাদের মাঝে ঈমানের পার্থক্য হলো এই জায়গায়। এজন্যে নবী (সাঃ) আরেকটি হাদিসে বলেনঃ “ইসলাম ৫টি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তন্মধ্যে প্রথমটি হলো আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া সত্যিকারের আর কোন মা’বুদ নাই এবং মোহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহ তা’য়ালার রাসূল”। তাই এই স্বীকৃতিটা দিতে হবে তাওহীদের ভিত্তিতে, আল্লাহ তা’য়ালার একত্ববাদের ভিত্তিতে, শিরক মুক্ত হয়ে, তাঁর কোন শরীক নেই এই ভিত্তিতে।
একজন হিন্দু যেমন বিশ্বাস করেন আল্লাহ তা’য়ালা সমস্ত জ্ঞানের মালিক, কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালা নিজে জ্ঞান বন্টন করেন না, স্বরস্বতিকে দায়িত্ব দিয়েছেন জ্ঞান বন্টন করার জন্যে। সুতরাং জ্ঞান পাবার জন্যে আল্লাহ তা’য়ালার কাছে সরাসরি যাওয়ার দরকার নেই, সরস্বতির কাছে গেলেই জ্ঞান পাওয়া যাবে। তাই হিন্দুরা আল্লাহ তা’য়ালাকে বাদ দিয়ে সরস্বতির পূজা করেন জ্ঞান লাভ করার জন্যে। তারা বিশ্বাস করেন সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করেন আল্লাহ তা’য়ালা, কিন্তু সম্পদ দিবার ক্ষমতা আল্লাহ তা’য়ালা দুর্গাকে দিয়েছেন। তাই তারা আল্লাহ তা’য়ালাকে বাদ দিয়ে দুর্গার পূজা করেন সম্পদ লাভের জন্যে। এভাবে তাদের বিশ্বাস বিভিন্ন দেব-দেবীকে বিভিন্ন ক্ষমতা ও দায়িত্ব আল্লাহ তা’য়ালা দিয়েছেন যার কারণে তারা সে সকল দেব দেবীর পূজা করেন। এসব দেব-দেবী কিন্তু কোন খারাপ মানুষের নামে দেব দেবী না, হয় কোন ফেরেশতার নামে, হয় কোন নবী রাসূলের নামে, হয় কোন অলী আওলিয়ার নামে। এ রকম মূর্তির ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে যে আল্লাহ তা’য়ালার কিছু ক্ষমতা, কিছু দায়িত্ব তাদেরকে দেয়া হয়েছে সুতরাং এদেরকে ধরলে, এদের পূজা করলে, এদের কাছে গেলে ঐ সকল জিনিস পাওয়া যাবে।
একইভাবে আমরা মুসলিম সমাজেও দেখি কিছু মুসলিম বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তা’য়ালার কিছু ক্ষমতা, কিছু তাঁর নবী রাসূল (সাঃ) কে দিয়েছেন, কিছু অলী আউলিয়াদেরকে দিয়েছেন, কিছু বিশেষ বিশেষ বান্দাদেরকে দিয়েছেন, কিছু ফেরেশতাদেরকে দিয়েছেন, কিছু জিবরাঈলকে দিয়েছেন, কিছু মালাকুল মাউতকে দিয়েছেন ইত্যাদি। এ বিশ্বাস সম্পূর্ণ শিরক যেটা ঐ হিন্দু সমাজের বিশ্বাসের সাথে মিলে যায়। তাই কোন জায়গায় যদি শুনা যায় যে, এখানে আল্লাহ তা’য়ালার একজন অলীর কবর আছে, শুধু তাই না কুকুর একটা জবাই করে যদি কবর দিয়ে লিখে দেয়া হয় অমুক শাহ্ এর মাজার, অমুক আউলিয়ার মাজার, তখন মুসলিমেরা ওখানে টাকা ফালাচ্ছে, তারপর নজর-নেওয়াজ, মান্নত, গরু, ছাগল, খাসী, ইত্যাদি নিয়ে দৌড়া-দৌড়ি শুরু করে দেয়। কেন দৌড়াচ্ছে? মূল উদ্দেশ্য হলো ঐ কবরে যে কুকুর, যে মানুষ, যে অলী শায়িত আছেন ঐ কবরওয়ালাকে ঐ মানুষটাকে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন, নাউযুবিল্লাহ। তাই সেখানে টাকা-পয়সা, গরু-ছাগল, মান্নত করলে ঐ কবরওয়ালা আমাকে দিতে পারবেন। সে মরার পরও কবরে বসে বসে এগুলো ঈড়হঃৎড়ষ করছেন, আল্লাহ তা’য়ালার নিয়ে সে বসে আছেন। একজন হিন্দুর যে মানের ঈমান, ঠিক একই মানের ঈমান হয়ে গেছে আমাদের কিছু মুসলিমের। তাহলে এ আক্বীদার অধিকারী, এ বিশ্বাসের অধিকারী মুসলিম রামাদান মাসে যত রোজা, যত তারাবীহ্, যত লাইলাতুল ক্বদর পালন করুক না কেন নবী (সাঃ) বলেন, এ রকম মুসলিম কোন ধরনের ফায়দা, কোন ধরনের সাওয়াব পাবেন না। এজন্যেই নবী (সাঃ) হাদিসে শর্ত দিয়েছেন ঈমান ও এহতেছাবের। আগে ঈমান ঠিক করতে হবে। রোজার চেয়ে ঈমানের গুরুত্ব বেশী। রোজার কারণে যদি কেউ জাহান্নামে যায়, সে জাহান্নামে স্থায়ীভাবে থাকবে না, এক সময় জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করার পর তিনি জান্নাতে যাবেন। কিন্তু ঈমানের কারণে যদি জাহান্নামে যায় তাহলে এ লোক জান্নাতে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। তাই সিয়াম, ক্বিয়াম, লাইলাতুল ক্বদরের চেয়ে ও ঈমানের গুরুত্ব বেশী। তাই আগে ঈমান শিখতে হবে, ঈমান জানতে হবে।
মক্কায় রাসূল (সাঃ) যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতেন আবু জেহেল, আবু লাহাবেরাও আল্লাহ তা’য়ালাকে বিশ্বাস করতো। কিন্তু তারা বিশ্বাস করতো আল্লাহ তা’য়ালার কিছু ক্ষমতা, কিছু কিছু মানুষকে দিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালার ঘরে তাওয়াফ করার সময় আমরা বলি, “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাকা।” আল্লাহ তা’য়ালা এই তালবিয়্যাহ আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু সহীহ মুসলিমে এসেছে মক্কার মুশরেকেরা, আবু জেহেল, আবু লাহাবেরা যখন আল্লাহ তা’য়ালার ঘর তাওয়াফ করতো তখন তারা বলতো “লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা ইল্লা শারিকান হুয়া লাকা তামলিকুহু ওমা মালাকা” অর্থাৎ “হে আল্লাহ! তোমার ঘরে আমরা হাজির। তোমার সাথে কোন শরীক নাই, তবে ঐ সমস্ত শরীক আছে যাদেরকে তুমি নিজেই ক্ষমতাবান বানিয়েছ”। মক্কার কাফের-মুশরেকরাও কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন, কিন্তু তাঁর সাথে আরো কয়েকজনকে শরীক করে নিয়েছেন। তাদের মতে, আমরা কিন্তু কোন শরীক বানাই নাই, আমাদের কোন দোষ নাই, আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই তাদেরকে শরীক বানিয়েছেন, তাঁর কিছু ক্ষমতা, কিছু কার্যকলাপ পরিচালনা করার জন্যে তাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন। এ রকম বিশ্বাস ওয়ালা মুসলিম রামাদান মাসে সিয়াম, ক্বিয়াম, লাইলাতুল ক্বদরে ইবাদত করলে কোন ফায়দা হবে না। কেননা নবী (সাঃ) শর্ত দিয়েছেন ঈমান ও এহতেছাব। এজন্যে ঈমানের সাথে কোন শিরক মিশ্রিত রাখা যাবে না, র্শিক থেকে মুক্ত থাকতে হবে। সূরা আন্ নিসার ৪৮ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। র্শিক ছাড়া অন্যান্য পাপ আল্লাহ তা’য়ালা ইচ্ছা করলে যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহ তা’য়ালার সাথে শিরক করে সে অবশ্যই মহা পাপ রচনা করে”। সূরা আল মায়েদায় আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “ যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’য়ালার সাথে কাউকে শরীক করবে, আল্লাহ তা’য়ালা তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম”। আল্লাহ তা’য়ালার স্পষ্ট ঘোষণা শিরক করলে সে গুনাহ আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন না । শিরক বাদে যত গুনাহই হোক আল্লাহ তা’য়ালা ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। (অসমাপ্ত)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সিয়াম-সাধনার মাসে মুমিনের করণীয়

আতিকুর রহমান নগরী

প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য চেষ্টা করতে হয়। চেষ্টা-সাধনা ছাড়া কোন কিছু অর্জন করা সম্ভব হয় না। ঠিক তেমনিভাবে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্যও প্রয়োজন যথাসাধ্য প্রচেষ্টা। এজন্য মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে কতিপয় কাজ নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং কেবল তাঁর ইবাদতের আদেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি বিশেষ ইবাদত হ’ল রামাযানের সিয়াম, যা আল্লাহ তাঁর বান্দার উপর ফরয করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হল, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমশীল হতে
পার’ (বাক্বারাহ ১৮৩)। রমজানের সিয়াম আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর বান্দাদের জন্য একটি বিশেষ নেয়ামত। আর তা পালনের অফুরন্ত প্রতিদানও মহান আল্লাহর নিকটে রয়েছে। হাদীছে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেন, ‘সিয়াম স্বতন্ত্র, তা আমারই জন্য। আর আমিই তার প্রতিদান দিব’। তাই রহমত, বরকত ও মাগফিরাতে পরিপূর্ণ এ মাসে আমাদের কিছু করণীয় রয়েছে। মাহে রমজানের কার্যাবলীকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন- ১. আত্মিক কার্যাবলী ২. বাহ্যিক কার্যাবলী। নিম্নে এগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হল- ১. আত্মিক কার্যাবলী : (ক) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাক্সক্ষা : প্রত্যেক ছায়েমের উচিত শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য সিয়াম পালন করা। কারণ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য
করা না হ’লে তা কবুল হবে না। রমজানের সিয়াম পালন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সাধনা। কেননা এ ইবাদতে লোক দেখানোর অহেতুক অভিলাষ থাকে না। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করার মাধ্যমেই বান্দা তার কাক্সিক্ষত পুরস্কার লাভ করতে পারে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, করার জন্য একদিন সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ
জাহান্নামকে তার নিকট হত একশত বছরের পথ দূরে সরিয়ে দিবেন’। (খ) আত্মশুদ্ধি অর্জনের প্রচেষ্টা : রমজান মাস হচেছ আত্মশুদ্ধি অর্জনের মাস। সকল পাপাচার- অনাচার দূরে ঠেলে দিয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করার মাধ্যমে নেকী অর্জনের মাস। কেননা মাহে রামযানের মূল আবেদনই হল সর্বোত্তমভাবে আল্লাহমুখী হওয়া। তাই প্রত্যেক ঈমানদারের অবশ্য কর্তব্য হ’ল এ মাসে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহভীতি অর্জনের চেষ্টায় লিপ্ত হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে যেন তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পার’ (বাক্বারাহ ১৮৩)। রমজান মাস হচ্ছে অধিক নেকী অর্জনের মাস। তাই প্রত্যেক ঈমানদারের উচিত এ মাসে বেশী বেশী নফল গালাত আদায় করা এবং পুণ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। কেননা মানবজাতি শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ইবাদতে অত্যন্ত গাফেল থাকে; কিন্তু এ মাসে শয়তান মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে না। কারণ আল্লাহ এ মাসে শয়তানকে শৃংখলাবদ্ধ করে রাখেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘রমজানের আগমন ঘটলে জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা সমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়’। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অবশ্যই কর্তব্য এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এ মাসে বেশী বেশী নফল সালাত আদায় করা ও নিজের জন্য জান্নাতের দ্বার খুলে নেয়া। পবিত্র কুরআন হচ্ছে মানব জাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে শ্রেষ্ঠ উপহার। এটি নাযিল হয়েছে রমজান মাসে। ফলে রমজান মাস বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি রমজান মাসে কুরআন অবতীর্ণ করেছি মানব জাতির হিদায়াতের জন্য ’ (বাক্বারাহ ১৮৫) । তাই কুরআন নাযিলের মাস হিসাবে সকলের উচিত এ মাসে বেশী বেশী কুরআন তেলাওয়াত করা।
রজব-শাবান থেকে মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে বরকত কামনা করে আমরা মুসলিম উম্মাহর ইবাদতের বসন্তকাল পবিত্র মাহে রমজানে পৌছেছি। ফরজ-নফল ইবাদতে মনোনিবেশের পাশাপাশি সেহরি-ইফতারও আমরা সেই পালনকর্তার হুকুম পালনার্থে তাঁর দেয়া রিযিক দ্বারা সেরে থাকি। সাহরি ও ইফতার রমজানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ সাহরি ও ইফতার রমজানের আবহ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এটি এক বিশেষ নিয়ামত। এটি পালন শুধু কর্তব্য নয়, আনন্দও বটে। এতে আল্লাহর প্রতি বান্দাহর আনুগত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। সাহরি ও ইফতারের আনুগত্যের এ দৃষ্টান্ত সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে সাহরি ও ইফতার কোনোটিই মানুষের মনগড়া বিধান নয়। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এর যথেষ্ট তাকিদ রয়েছে। সাহরি খাওয়া প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা রাতের অন্ধকার প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত পানাহার কর।’ (বাকারা-১৮৭) সাহরি চৈন্তিক দৃষ্টিতেই কেবল গুরুত্বের দাবি রাখে না, বরং তা আল্লাহর রাসূল (সা.) এর সুন্নত। এতে বরকত রয়েছে, রয়েছে অনেক ফজিলতও। সাহরি খাওয়া সম্পর্কে হযরত রাসূলে করিম (সা.) বলেন, ‘তোমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরি খাওয়ার মধ্যে রয়েছে বরকত।’ হোক না সামান্য একটু পানি, রুটি, খেজুর কিংবা শরবত। তবুও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এ মহান সুন্নত থেকে বিমুখ না হওয়ার তাকিদ এসেছে। এমনকি
কেউ যদি যেকোনো কারণে সময়মত উঠে সাহরি না খেতে পারে তার জন্যও রাসূল (সা.)-এর বাণী, ‘তোমাদের কেউ যখন ফজরের আজান শোনে, আর এ সময় তার হাতে খাদ্যের পাত্র থাকে, সে যেন আজানের কারণে খাদ্যগ্রহণ বন্ধ না করে, যতক্ষণ না সে স্বীয় প্রয়োজন পূর্ণ করে।’ (আবু দাউদ) রোজাদারদের প্রতি আল্লাহতায়ালা কঠিন কোনো নীতি গ্রহণ করেননি। বরং রোজাদারদের যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য তিনি দেরি করে সাহরি এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করার নির্দেশ করেছেন। ইফতার রোজাদারের জন্য একটি আনন্দঘন মুহূর্ত। ইসলামি পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, কামাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থেকে সূর্যাস্তের পর কিছু খেয়ে বা পান করে রোজা সমাপ্ত করার নামই ইফতার। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করা সুন্নত। এর আগমুহূর্তে খাবার সামনে নিয়ে বসে থাকাও মুস্তাহাব। তবে সময় হয়ে গেলে দেরি না করে দ্রুত ইফতার গ্রহণ করাই উত্তম। খেজুর বা খোরমা দিয়ে ইফতার করা সুন্নত। না হলে অন্য কোনো ধরনের মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য বা শুধু পানি দিয়ে হলেও ইফতার করা যায়। এর ফজিলত ও তাকিদ দিয়ে রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ দ্রুততার সীমা রক্ষা করে ইফতার করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।’ অন্য হাদিসে তিনি বলেন, মানুষ ততদিন কল্যাণের পথে থাকবে, যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে।’ (বুখারি)
সাহরি দেরিতে করা উত্তম। নবী করিম (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামেরও এমনটিই আদত-অভ্যাস ছিল। যদি কেউ আগেভাগে সাহরি খেয়ে ফেলে তবে সে নিজের পক্ষ থেকেই রোজার সময় বাড়িয়ে নিল। এতে তার অনেক কষ্টও হতে পারে। অবশ্য আল্লাহতায়ালা এমনটি নির্দেশ দেননি। তার এ মনগড়া অভ্যাসের জন্য সে গুনাহগার হবে। ইফতারের এ বিধান ইসলাম ধর্মেরই অনন্য বৈশিষ্ট্য। ইফতারের এ আনন্দ, তৃপ্তি ও পরম সুখ অনুভব অন্য যেকোনো ধর্মের জন্য ঈর্ষণীয় ব্যাপার। ইফতারে ভ্রাতৃত্ববোধ, অন্তরনিঃসৃত ভালোবাসার ছোঁয়া এবং আধ্যাত্মিক ভাবের যে প্রতিফলন ঘটে, তা
সত্যিই প্রশংসনীয়। ইসলামে রোজার জন্য ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটা সময়সীমা বাধা আছে। কেউ যদি বেশি ফজিলত পাবার আশায় বিলম্বে ইফতার করে, তবে সে ভুল করবে। কেননা বিলম্ব করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ইফতার করে ইহুদি-খ্রিস্টানরা। এজন্য তারা বঞ্চিত হয়েছে ইফতারের বরকত ও আল্লাহর রহমত থেকে। কেননা সাহরির মতো ইফতারেরও অনেক ফজিলত রয়েছে, এমনকি অন্যকে ইফতার করানোর মধ্যেও রয়েছে সীমাহীন পুণ্য। ইফতারের আগমুহূর্তে আল্লাহতায়ালা মানুষের দোয়া কবুল করেন। তাই এ সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করে উভয় জাহানের কল্যাণ অর্জনের বিকল্প নেই।

রামাদ্বান দ্বারপ্রান্তে যা যা করণীয়

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

প্রকৃত মু’মিন আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও সর্বাত্মকভাবে তাঁর আনুগত্যে নিজের জীবন অতিবাহিত করে। শেষ নিঃশ্বাস অবধি এ ধারা অব্যাহত রাখে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন: (হে নবী) ইয়াক্বীন (মৃতু) আসা পর্যন্ত আল্লাহর বন্দেগীতে অব্যাহত থাকুন। এছাড়াও আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিশেষ বিশেষ কিছু সময় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ করে দান করেছেন, যাতে করে সে সময়গুলোতে একটু অতিরিক্ত নেক আমল করে আমাদের ছওয়াবের পরিমাণকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার সুযোগ গ্রহণ করতে পারি। নেকী অর্জনের এমনি ধরনের এক গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম হচ্ছে রামাদ্বানুল মোবারক। এ গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমটি পদার্পণ করছে আমাদের দারপ্রান্তে। মহা সম্মানিত এ মেহমানকে স্বাগত জানাতে আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। প্রিয় নবী (সাঃ) প্রায় দু’মাস পূর্ব থেকে এ মেহমানকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিতেন। রজব মাস এলেই তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকতেন: “হে আল্লাহ আমাদেরকে রজব ও শাবানের মধ্যে বরকত দান করুন, আর রামাদ্বান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন।”-(তাবারানী)
জীবনে আরেকটি রামাদ্বান পাওয়া কতই না সৌভাগ্যের ব্যাপার। গত বছর অনেকে রামাদ্বানে আমাদের আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে রমাদ্বান রেখেছিলাম। আজ আমাদের মাঝে অনেকেই নেই। আগামী রমাদ্বান আমাদের পাওয়ার সৌভাগ্য হবে কি? এটা আল্লাহই ভালো জানেন। আর যদি আল্লাহপাকের একান্ত দয়ায় পেয়ে যাই, তাহলে তার জন্য আমরা কি প্রস্তুতি গ্রহণ করছি? প্রিয় নবী (সাঃ) একবার শাবানের শেষ প্রান্তে এসে বিশেষভাবে সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রামাদ্বানের গুরুত্ব, ফযীলত ও আমল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিলেন :
“হে জনতা! একটি পবিত্র মাস তোমাদের দ্বারপ্রান্তে সমাগত। এমন মাস যাতে রয়েছে লাইলাতুল ক্বাদর। হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ মাসটির দিনে রোযা রাখাকে আল্লাহ ফরয করে দিয়েছেন। আর রাতের বেলায় ইবাদত বন্দেগী করাকে অতি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছেন। কেউ এ মাসে যে কোন ভাল কাজ করলে তার সওয়াব হবে অন্য মাসের ফরযের সমান।আর একটি ফরয আঞ্জাম দিলে তার সওয়াব হবে অন্য মাসের ৭০টি ফরযের সওয়াব। এটি হচ্ছে সবরের মাস। আর সবরের পুরস্কার হচ্ছে জান্নাত। এটি সমবেদনার মাস। এ মাসে রিযিক বাড়িয়ে দেয়া হয়। কেউ এ মাসে রোযাদারকে ইফতার করালে তা তার গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়া ও জাহান্নাম থেকে তার গর্দান মুক্ত হওয়ার কারণ হয়ে যাবে। এবং রোযাদারের সমপরিমাণ সওয়াব হবে, তবে এতে রোজাদারের তার নিজের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা। সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের সবার যে রোযাদারকে ইফতার করানোর সক্ষমতা নেই। তিনি বললেন, এমন বিপুল সওয়াব সে ব্যক্তিকেও দান করা হবে, যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে দুধ, খেজুর এমনকি শুধু পানি দিয়ে হলেও ইফতার আপ্যায়ন করাবে। যে ব্যক্তি তৃষ্ণার্ত রোজাদারকে ইফতারের সময় পানি পান করাবে, আল্লাহ তাআলা তাকে আমার হাওযে (কাওছার) থেকে এমন পানীয় পান করাবেন, যার ফলে জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত সে আর কোনদিন তৃষ্ণার্ত হবে না। কেউ যদি এ মাসে তার ক্রীতদাস (এমনকি কর্মচারী/চাকর)-এর কাজ কমিয়ে দেয় আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেবেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেবেন। এ মাসের প্রথম হচ্ছে রহমত। মধ্যখানে রয়েছে মাগফিরাত। আর শেষ দিকে রয়েছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি। এ মাসটিতে তোমরা ৪টি কাজে বেশি বেশি অভ্যস্ত হতে সচেষ্ট হও। প্রথম দুটোর মাধ্যমে তোমাদের প্রভু সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। আর শেষ দুটো না করে তোমাদের কোন উপায় নেই। যে দু’অভ্যাস দিয়ে তোমাদের প্রভুকে সন্তুষ্ট করবে তা হচ্ছে ১. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহের সাক্ষ্য দেয়া আর ২. আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করতে থাকা। আর যে দুটো না করে তোমাদের কোন উপায় নেই তা হচ্ছে ৩. আল্লাহর কাছে জান্নাতের আবেদন করতে থাকা এবং ৪. জাহান্নাম থেকে পানাহ চাইতে থাকা। (সাহাবী সালমানের বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন বায়হাকী ও ইবনে খোযাইমা)
এমন মহান একটি মাস আমাদের দ্বারে সমাগত। এ মাসের অফুরন্ত ফায়দা নেয়ার জন্য আমাদেরকে প্রস্তুতি নিতে হবে। পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দুনিয়াবী ব্যস্ততা যতদূর পারা যায় কিছু কমিয়ে দিতে হবে। নবী কারীম (সাঃ) রামাদ্বান এলে প্রাত্যহিক সাংসারিক ও দুনিয়াবী ঝামেলা কমিয়ে দিতেন, যাতে বেশি বেশি করে ইবাদত করার সুযোগ পাওয়া যায়। সলফে সালেহীনও তা-ই করেছেন। ইমাম যুহরী (রঃ) বলেছেন, “রামাদ্বান আসা মানেই হলো বেশি বেশি তেলাওয়াতে কুরআন ও অন্যকে খাওয়ানোর প্রচেষ্টা।” অনেকেই মসজিদে বসে থাকতেন আর বলতেন, রোজাকে পাহারা দেই, বাইরে গিয়ে কারো গীবত চর্চায় ব্যস্ত হওয়া থেকে। রোযা আসলে আমরাও কিছুটা প্রস্তুতি নেই। তবে, আমাদের প্রস্তুতি কিছুটা ভিন্ন ধরনের। আমাদের অনেকেই দেখা যায়, রোজার প্রারম্ভে খাদ্য সম্ভারের সমাহারে ঘর ভর্তি করে নেয়া। এমনকি দোকানপাট পর্যন্ত খালি হয়ে যায়। সারা দিনের অভুক্ত থাকার বদলা নেয়ার জন্য ইফতারে রাতের বেলায় এবং সেহরীতে দ্বিগুণ তিনগুণ উদরস্থ করার মানসিকতা। রামাদ্বান এসেছে খাওয়া কমাতে, অথচ আমাদের কেনাকাটা দেখলে মনে হয় রামাদ্বান যেন এসেছে খাবার বাড়িয়ে দিতে। আর এ সুযোগে আমাদের দেশে তো ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে গরীবের নাভিশ্বাস সৃষ্টি করে দেয়। রামাদ্বান আসে মু’মিনকে ঘুমকমিয়ে সদা তৎপর হতে সাহায্য করতে। অথচ অনেকেই দিনের অর্ধবেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে অলসভাবে কাটিয়ে দেন। মূল্যবান সময়গুলো যদি ঘুমেই কেটে যায়, তাহলে কি পাবো রামাদ্বানের নেয়ামত থেকে। তাই, আসুন আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করি, কিভাবে আগত রামাদ্বানের সদ্ব্যবহার করে আমাদের নেকীর পরিমাণ বাড়িয়ে নিতে পারি। আল্লাহপাক আমাদেরকে তাওফিক দান করুন।
রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের সুবাস নিয়ে বছর ঘুরে আবারো আমাদের নিকট এসেছে মাহে রামাদ্বান। বেশি বেশি করে ইবাদাত করা আর গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার আর একটা সুযোগ পেয়েছি আমরা। এরপর আর একটা সুযোগ কি আসবে আমাদের জীবনে? এমনতো হতে পারে যে এটা আমাদের জীবনের শেষ রামাদ্বান। তাহলে আসুন পরিকল্পনা গ্রহণ করি কিভাবে এবারের রামাদ্বানে সর্বোচ্চ ফায়দা অর্জন করতে পারি। অন্তরে আগ্রহ সৃষ্টি হওয়ার জন্য প্রথমে আবারো চোখ বুলিয়ে নেই রোজা ও রামাদ্বানের ফযীলত ও গুরুত্ব সংক্রান্ত কিছু হাদীসের উপর। রাসুলে কারিম (সাঃ) এরশাদ করেছেন, আদম সন্তান প্রতিটি ভাল কাজের প্রতিদান দশগুণ থেকে সাত শতগুণ পর্যন্ত বর্ধিত হয়। আল্লাহতাআলা বলেছেন, “তবে রোজা, সেটা তো আমার উদ্দেশ্যে নিবেদিত। তার প্রতিদান আমি নিজেই দিব। আমার (সন্তুষ্ট হাসিলের) উদ্দেশ্যে রোজাদার পানাহার থেকে বিরত থেকেছে… রোযাদারের মুখ থেকে নির্গত দুর্গন্ধ আল্লাহপাকের নিকট মিশকের সুগন্ধের চেয়েও প্রিয়-(বুখারী)। একমাসের সিয়াম সাধনের মত এক নাগাড়ে এত দীর্ঘ ইবাদাতের সুযোগ আমাদের জীবনে আর দ্বিতীয়টি নেই। দিনের বেলায় সিয়াম সাধনা। আর রাতের বেলায় কেয়ামুল্লাইল অর্থাৎ নামাযে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় কুরআন তেলাওয়াতের সুযোগ নিয়ে রামাদ্বান আসে বার বার আমাদের কাছে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) বর্ণনা করেন “রাসূল করিম সাঃ) ইরশাদ করেছেন রোযা এবং আল কুরআন উভয়ে বান্দার জন্য কেয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। রোযা বলবে হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো থেকে নিবৃত্ত রেখেছি। আল কুরআন বলবে হে প্রভু, আমি তাকে রাতের বেলা ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। উভয়ে বলবে, হে প্রভু তার ব্যাপারে আমাদের সুপারিশ কবুল করুন। আল্লাহপাক তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করে নিবেন”-(আহমদ)। আবু সাইদ আল খুদরী (রাঃ) বর্ণনা করেন, “কেউ যদি আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি রোযা সম্পন্ন করে, সে একটি দিনের কারণে আল্লাহ তার চেহারা থেকে জাহান্নামে’র আগুনকে সত্তর বছর দূরে নিয়ে যান”।-(আহমদ) সহুল বিন সা’দ (রাঃ) বর্ণনা করেন, “রাসূল কারিম (সাঃ) এরশাদ করেছেন, জান্নাতে একটি বিশেষ ফটক রয়েছে, তার নাম হচ্ছে রাইয়ান। সেখানে থেকে ডাক দেয়া হবে। রোজাদারগণ কোথায়? সর্বশেষ রোযাদারের প্রবেশ সম্পন্ন হলে ফটকটি বন্ধ করে দেয়া হবে।-(বুখারী ও মুসলিম)।
আল্লাহর কাছ থেকে কতনা অবারিত সুসংবাদের সুবাস নিয়ে হাযির হয় রামাদ্বান প্রতিবার আমাদের কাছে। আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, একবার রামাদ্বান মাসের আগমন হলে নবীজি আমাদের লক্ষ্য করে বলেন, “বরকতময় একটি মাস তোমাদের নিকট এসে গেছে, যে মাসে সিয়াম সাধনা তোমাদের উপর ফরয করে দেয়া হয়েছে। এ মাসটিতে জান্নাতের প্রবেশ দ্বারগুলো খুলে রাখা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলোকে বন্ধ করে রাখা হয়, শয়তানগুলোকে শিকল দিয়ে বন্দি করে রাখা হয়। এ মাসে রয়েছে এমন একটি রাত যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত, সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত”।-(আহমদ, নাসাঈ, বায়হাকি) অন্য হাদীসে এসেছে, রামাদ্বানের আগমন ঘটার সাথে সাথে একজন ফেরেশতা ডাকতে থাকে হে সুকর্ম সন্ধানী, সুসংবাদ গ্রহণ করো। আর হে দুষ্কৃতি সন্ধানী বিরত হও। রামাদ্বান শেষ হওয়া পর্যন্ত এ ডাক চলতে থাকে-(তিরমিযী, ইব্ন্ মাজাহ, ইবন্ খোযাইমাহ)।
রামাদ্বানের উদ্দেশ্য ও তাহা হাসিলের উপায়? সিয়াম সাধনার প্রক্রিয়া, প্রবৃত্তির চাহিদা ও রিপু দমনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে যে আত্ম সংশোধনের সৃষ্টি হয় তা একজন মু’মিনকে মুত্তাক্কী পর্যায়ে উন্নত করে। আর এই তাক্কওয়া অর্জন সিয়াম সাধনার প্রকৃত উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা সূরা আল বাক্কারার ১৮৩ নং আয়াতে রোজার নির্দেশ করে বলেছেন, “আশা করা যায় এর মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে তাক্কওয়া সৃষ্টি হবে”। বছরের পর বছর যদি আমরা রোজা রাখতেই থাকি কিন্তু আমাদের মধ্যে তাক্কওয়া অর্জন হয়না তাহলে রোজার মূল উদ্দেশ্য থেকে আমরা বঞ্চিতই থেকে যাব। আংশিক ছওয়াব পেলেও আমরা পুরো ছওয়াব থেকে বঞ্চিত থাকবো। শুধু পানাহার আর সহবাস থেকে বিরত থাকলেই প্রকৃত রোযা হয়না। প্রকৃত রোজা হচ্ছে নিজের নফস্ ও শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় পরিচালিত করা। যাবতীয় গুনাহ বা অন্যায়ের কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেন, যে মিথ্যা কথা, অন্যায় কাজ ও জাহেলী তৎপরতা থেকে নিজেকে বিরত রাখেনা, আল্লাহর কোন দরকারই নেই সে শুধু খানাপিনা থেকে বিরত থাকবে। (বুখারী) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, কিছু রোজাদার এমন রয়েছে যে ক্ষুধা আর তৃষ্ণা ছাড়া তাদের রোজার আর কিছুই নেই-(আহমদ)। এমনকি নিজে তো মিথ্যা, অন্যায় এবং এ জাতীয় গুনাহ থেকে বিরত থাকবেই, অন্য কেউও যদি তাকে অন্যায়ভাবে প্ররোচিত করে, সেখানেও তাকে আত্মসংযমের পরাকাষ্ঠা দেখাতে হবে। তিনি এরশাদ করেছেন আরেকটি হাদীসে, ‘তোমাদের কেউ যেদিন রোযা রাখে সেদিন যে কোন মন্দ কথা উচ্চারণ না করে, গালমন্দ না করে, আর কেউ যদি তাকে অন্যায় কথা বলে বা গালমন্দ করে সে যেন বলে দেয় আমি রোজাদার-(বুখারী)। এ আত্মসংযমই হচ্ছে রোযার মূল শিক্ষা। সাহাবায়ে কেরাম এভাবেই রোজার মর্ম উপলব্ধি করেছিলেন। হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “তুমি যখন রোজা রাখবে, তখন যেন তোমার কর্ণ ও চক্ষু রোজা রাখে, তোমার কণ্ঠও যেন রোজা রাখে মিথ্যা এবং যাবতীয় গুনাহ থেকে। প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকো। রোজার দিনটিতে তুমি ভাবগম্ভীর ও প্রশান্ত থাকার চেষ্টা কর। রোজার দিনটি এবং রোজা ছাড়া দিনটি যেন তোমার একই রকম না হয়ে যায়”।
মোদ্দাকথায়, দেহ এবং আত্মা উভয়ে মিলে যে রোযা রাখে সেটাই হচ্ছে প্রকৃত রোজা। সে রোজার মাধ্যমেই আল্লাহর কাছ থেকে অর্জিত হবে অফুরন্ত মাগফিরাতের সুসংবাদ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রামাদ্বান মাসের রোজা রাখে তার সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। তিনি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রামাদ্বান মাসে রাতে ইবাদতে মশগুল থাকে, তার সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।-(বুখারী/মুসলিম)
ঈমান ও ইহতিসাব দ্বারা বুঝানো হয়েছে-রোজাকে আল্লাহ যে ফরয করেছেন তার সতেজ উপলব্ধি সহকারে তা পালন করা। আল্লাহর কাছ থেকে অফুরন্ত পুরস্কারের প্রবল আকাংখা সহকারে পালন করা। রিয়া বা প্রদর্শনেচ্ছার কুমন্ত্রণা থেকে দূরে থাকা। শুধু গৎ বাঁধা অভ্যেস হিসেবে নয়, বা সবাই যেহেতু রোজা রাখবে কাজেই আমারও না রেখে গতি নেই। অথবা পেট উপোষ রাখলে স্বাস্থ্যবিদদের দৃষ্টিতে অনেক ফায়দা আছে- এসব কিছুর কারণে নয়, সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর হুকুম পালনের পরাকাষ্ঠা নিয়ে। সিয়াম সাধনার এ নির্ভেজাল রূপটির নাম হচ্ছে ঈমান ও ইহতিসাব। ক্বিয়ামুল্লাইল অর্থাৎ তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদও অনুরূপভাবে ঈমান ও ইহতিসাবের সহিত আদায় করতে হবে। ঘন ঘন করে কতকগুলো রুকু সিজদা দিয়ে অনেকগুলো রাকয়াতের ফিরিস্তি তৈরী করা ক্বিয়ামুল্লাইলের সার্থকতা নয়। সার্থকতা হচ্ছে খুশু খুযুসহ ভাবগম্ভীর পরিবেশে দীর্ঘ ক্বিয়ামে লম্বা কিরাত ও সময় নিয়ে ধীর স্থিরভাবে রুকু সিজদা করে আল্লাহর সাথে সম্পর্কোন্নয়নের সুযোগ গ্রহণ করা। খতম তারাবীহ হলেই হবে না। কুরআনকে অবশ্যই তাজবীদ সহকারে হৃদয়ঙ্গম করে তিলাওয়াত করতে হবে। চাই খতম হোক আর না হোক। রকেটের গতিতে কুরআন খতম এবং খতম তারাবীর এ নি®প্রাণ রেওয়াজ অনেকের কাছে একটা ঠুনকো রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ক্বিয়ামুল্লাইলের প্রাণ এবং আল্লাহর কালামের তেলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য তাতে হারিয়ে গেছে। মযলুম তেলাওয়াতের শিকার এ কুরআন কিয়ামতের দিন সুপারিশ করা তো দূরে, বরং তেলাওয়াতকারীর বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে পাল্টা অভিযোগ দায়ের করে বসবে।
আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের প্রত্যাশায় রামাদ্বানের রোযা, তারাবীহ, তাহাজ্জুদ এবং কুরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি আরেকটি নেক আমলকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আদায় করতে হবে। আর সেটি হচ্ছে দান খয়রাত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এ আমলটিকে রামাদ্বানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থদ্বয়ে হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, “নবীজী (সাঃ) ছিলেন সবচেযে বেশি দানশীল”। আর রামাদ্বান মাস এলে হযরত জিবরাঈল (আঃ) যখন তাঁর সাথে দেখা করতে আসতেন, তাঁকে নিয়ে কুরআন পাঠের অনুশীলন করতেন, তখন তিনি আরও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ) রামাদ্বানের প্রতিটি রাতেই নবীজি (আঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন। কুরআন পাঠের অনুশীলন করতেন। জিবরাঈল (আঃ)র সাথে সাক্ষাতের সময়গুলোতে তিনি মেঘবাহী বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। অন্য রেওয়াতে এসেছে, কেউ কিছু চাওয়ামাত্র তিনি তা দান করে দিতেন-(আহমদ), কারণ জান্নাতের আকাক্সক্ষা থাকলে অবশ্যই আল্লাহর রাস্তায় অবারিতভাবে দান করতে হবে। আলী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, “জান্নাতে এমন কিছু প্রাসাদ রয়েছে যেগুলো এত সুন্দর করে তৈরী করা হয়েছে যে সেগুলোর বাইরে থেকে ভিতরের সবকিছু দেখা যাবে এবং ভিতর থেকে বাইরের সবকিছু দেখা যাবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, কাদের জন্য সে সুযোগ হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)? তিনি বললেন, ঐসব লোকদের জন্য যারা মিষ্টভাষী, অন্যদেরকে আহার সরবরাহ করে, সর্বদা রোজা পালন করে আর রাতের অন্ধকারে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে নামাযে দাঁড়িয়ে যায়”। (আহমদ/ইবনে হাব্বান/বায়হাকী)
রামাদ্বানে উপরোল্লিখিত নেক আমলগুলোর পাশাপাশি আরোও যে আমলটার সুযোগ বেশি করে নিতে হবে সেটা হচ্ছে তাওবা এবং ইস্তেগফার। রোযা ও অন্যান্য নেক আমলের কারণে এ মাসে বান্দার প্রতি আল্লাহর করুণা অনেক বেড়ে যায়। বান্দাও এ মাসে তুলনামূলকভাবে গুনাহ কম করে এবং বেশি করে নেক আমলের কারণে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলে অনেকখানি এগিয়ে যায়। আর এটাই মোক্ষম সময় আল্লাহর কাছে তাওবাহ করার, গুনাহসমূহ ছেড়ে দেয়ার খাঁটি অঙ্গীকার করে অতীতের গুনাহের জন্য আল্লাহর মাফ চাওয়ার। রামাদ্বানের প্রথম বিশ দিনের তুলনায় শেষের দশ দিনের আমলকে আরও বাড়িয়ে দিতে হবে। দশ দিনের ঐ বিশেষ সুযোগের মধ্যেই নিহিত রয়েছে হাজার মাসের চেয়েও সেরা লাইলাতুল ক্বদরে রাতটি। যা লুকিয়ে রয়েছে পাঁচটি বেজোড় রাতের যে কোন একটি রাতে। তাই ঐ পাঁচটি রাতের আমল অবশ্যই অন্য রাতের চেয়ে বেশি হওয়া উচিত। আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রামাদ্বানের শেষ দশটি দিন এলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কোমরে কাপড় বেঁধে নামতেন, রাতে ইবাদতে মশগুল হয়ে েেতন, পরিবারের অন্যান্যদেরকেও জাগিয়ে দিতেন।-(বুখারী/মুসলিম)
অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, তিনি এ দশদিনে এত বেশি আমল করতেন যা তিনি অন্যান্য সময় করতেন না।-(মুসলিম) লাইলাতুল ক্বাদরকে পাওয়ার জন্যই এ দশদিনে ইতিফাক করতেন এবং এত আমল করতেন। তিনি এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিছাবের সাথে লাইলাতুল ক্বদরে ইবাদত করবে তার অতীত গুনাহগুলো মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী/মুসলিম) আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমি যদি লাইলাতুল ক্বাদর পাই তাহলে কোন দোয়া বেশি পড়বো? বিললেন, বলো, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী।-(তিরমিযী) অর্থাৎ হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে আপনি খুবই পছন্দ করেন, অতএব আমাকে মাফ করে দিন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রামাদ্বানের এই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।

টেকসই উন্নয়নে বহির্বিশ্বের অংশীদারিত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
টেকসই উন্নয়নের মূলনীতি : টেকসই উন্নয়ন মূলত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা এমডিজি’র মতো জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত একটি উন্নয়ন পরিক্রমা, যা ২০১৫ সালের পর এমডিজি-র স্থলে প্রতিস্থাপিত হয়। ৩-১৪ জুন ১৯৯২ ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০-২২ জুন ২০১২ অনুষ্ঠিত হয়। রিও+২০ (জরড়+২০) বা আর্থ সামিট ২০১২ (ঊধৎঃয ঝঁসসরঃ ২০১২) সম্মেলন, যার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল বিশ্ব টেকসই উন্নয়ন সম্মেলন বা ডড়ৎষফ ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঈড়হভবৎবহপবং (ডঝউঈ) এ সম্মেলনে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং (ঝউএং) গ্রহণ করা হয়। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক কনফারেন্স-এ (রিও+২০) ৭৯ জন সরকার প্রধানসহ ১৯১ টি জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্র অংশগ্রহণ করে। কনফারেন্স এর ফলাফল সংবলিত দলিল ‘দি ফিউচার উই ওয়ান্ট’ এ টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরা হয় এবং কীভাবে তা অর্জন করা যায় সে বিষয়েও আলোকপাত করা হয়। ১ জানুয়ারী ২০১৬ থেকে বাস্তবায়ন শুরু হওয়া এসডিজি (ঝউএঝ) র লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২০৩০ সাল। ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য পুরোপুরি দূর করা এবং এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য নতুন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের খসড়া রোডম্যাপ ২ আগষ্ট ২০১৫ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশ দীর্ঘ তিন বছরের আলোচনা পর্যালোচনা শেষে ১৭ টি লক্ষ্য সামনে রেখে ৩০ পৃষ্ঠার এ খসড়া গ্রহণ করে। এর নামকরণ করা হয় ঞৎধহংভড়ৎসরহম ড়ঁৎ ডড়ৎষফ: ঞযব ২০৩০ অমবহফধ ভড়ৎ ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ. ২৫-২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত টেকসই উন্নয়ন শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের শীর্ষ নেতারা চরম দারিদ্র্যমুক্ত পরিবেশ সুরক্ষিত ও নিরাপদে বসবাসে উপযোগী বিশ্ব তৈরির উপরিউক্ত এজেন্ডা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে। ২০৩০ লক্ষ্যভেদী টেকসই উন্নয়নের রোডম্যাপ প্রধান লক্ষ্য ১৭টি: সূচক ৪৭টি ও সহযোগী লক্ষ্য ১৬৯টি। নিম্নে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপন করা হলো:
বেকারত্বের মতো দিকগুলো থেকে সমাজের প্রত্যেকের সুরক্ষা, সকলের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। মৌলিক সেবাসমূহ তথা শ্রম, ভূমি প্রযুক্তিতে স্বল্প পুঁজির লোকদের সম সুযোগ নিশ্চিতকরণে এবং তাদের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য যেসব সামাজিক নীতিমালা সহায়তা করে সেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্টন নিশ্চিত করা। প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্যকরভাবে বেড়ে উঠার জন্য পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা, ক্ষুধা দূর করা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পুষ্টি বাড়ানো এবং টেকসই কৃষি পদ্ধতির প্রচলন। সব বয়সী মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনমান নিশ্চিত করা এবং মরণঘাতী রোগ থেকে মুক্তা থাকা। সবার জন্য ন্যায্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সকলের জন্য সব বয়সে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। লিঙ্গসমতা অর্জন এবং সব নারী ও বালিকার ক্ষমতায়ন করা। সবার জন্য পানি ও পয়ঃব্যবস্থার প্রাপ্যতা ও তার টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন ও উৎপাদনশীল এবং যথোপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। সবার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন ও উৎপাদনশীল এবং যথোপযুক্ত কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করা। অবকাঠামো নির্মাণ, সবার জন্য ও টেকসই শিল্পায়ন গড়ে তোলা এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা। দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তদেশীয় বৈষম্য হ্রাস করা, বিশেষ করে দ্রুত ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল ভোগের জন্য দরিদ্রদের সহায়তায় প্রদান করা। নগর ও মানব বসতির স্থানগুলো সবার জন্য, নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হয়। টেকসই ভোগ ও উৎপাদন ব্যবস্থা প্যাটান নিশ্চিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। ভূপৃষ্টের জীবন পৃথিবীর ইকোসিষ্টেম সুরক্ষা পূর্ণবহাল করা এবং এর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা, টেকসইভাবে বন ব্যবস্থাপনা করা, মরুকরণ রোধ, ভূমিক্ষয়রোধ করা এবং জীব বৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন বন্ধ করা। টেকসই উন্নয়নের জন্য শন্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তি মূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, সবার ন্যায়বিচারের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সর্বস্তরে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অংশীদারিত্ব বাস্তবায়ন কৌশলগুলো আরো কার্যকর করা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব পুনর্জাগরিত করা।
জাতীয় টেইসই উন্নয়ন কৌশলপত্র : ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (ঘঊঈ) এক সভায় টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিবেশ নিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রথমবারে মতো ১০ বছর মেয়াদি জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্র (ঘধঃরড়হধষ ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঝঃৎধঃবমু-ঘঝউঝ) নামের একটি উন্নয়ন দলিল অনুমোদন দেয়া হয়। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অবস্থিক জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন শীর্ষক সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব সদস্য এ ধরণের টেকসই উন্নয়ন কৌশল অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এ কৌশল গ্রহণ করেছে। এ কৌশলপত্রের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১০-২০২১ সাল পর্যন্ত। দেশের উন্নয়ন যাতে স্থিতিশীল হয় সে জন্য এ কৌশলপত্র একটি রোডম্যাপ। কৌশলপত্রের মূল লক্ষ্য টেসকই উন্নয়ন। এতে দেশের সব খাতের সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
উৎপাদনশীল সম্পদের দীর্ঘস্থায়ী টেকসহিতা চ্যালেঞ্জার সমাধানসহ কৌশলপত্রে বিবৃত রূপকল্প অর্জনের জন্য এন এসডিএস (২০১০-২০২১) তিনটি পারস্পরিভাবে সম্পৃক্ত ক্ষেত্রসহ পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার ক্ষেত্র চিহ্নিত করে। কৌশলগত অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ক্ষেত্রগুলোতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অব্যহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অগ্রাধিকার মূলক খতগুলোর উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। যে তিনটি পারস্পরিকভাবে যুক্ত বিষয়াবলি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকাগুলো টেকসই উন্নয়নে সহায়তা দান করবে সেগুলো হলো, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, ও জলাবায়ূ, সুশাসন এবং জেন্ডার। কৌশলগত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য শীর্ষ সংস্থা হিসেবে কাজ করবে টেকসই উন্নয়ন পরিবীক্ষণ পরিষদ (এসডিএমসি)।
অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি : পরিবেশগত টেকসহিত্বের প্রশ্নে কোন আপস ছাড়াই মধ্যম আয়ের মর্যাদায় অর্থনীতির রূপান্তরসহ উন্নতর জীবন মান দ্রুত দারিদ্র্য নিরসন ও কর্মসৃজন নিশ্চিত করার জন্য ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধিতে প্রধান উন্নয়ন কৌশল হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। অবকাঠামো কর্মসূচি, মানব সম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং তথ্য প্রযুুক্তিতে সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এবং বিনিয়োগ প্রণোদনা বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নসহ পিপিপি প্রবর্ধনে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে, শিক্ষা ও দক্ষতা শিক্ষণের মানসহ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বৈদেশিক কর্ম সংস্থানের প্রসার, জাতীয় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সবুজ প্রবৃদ্ধি প্রবর্ধনের মাধ্যমে অব্যাহত ও ত্বরান্বিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।
অগ্রাধিকারমূলক খাত সমূহের উন্নয়ন : দেশের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারমূলক খাতসমূহের মধ্যে রয়েছে, কৃষি শিল্প, জ্বালানি, পরিবহন ও মানব সম্পদ উন্নয়ন। এ খাতগুলোর জন্য সুপারিশকৃত কৌশল অর্থনীতিকে সঠিক নির্দেশনা দানের উপর জোর দেয়া হয়েছে, কেননা এ খাতগুলোই আগামীতে সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি থাকবে এবং দেশের টেসকই উন্নয়নে সহায়তা করবে।
নগর পরিবেশ : দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে যেহেতু দ্রুত নগরায়ন অপ্রতিরোধ্য, সুতরাং টেকসই নগর উন্নয়নের ওপর নানাদিক থেকেই দেশের টেকসই উন্নয়ন নির্ভরশীল। এই অংশে নগরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে পাঁচটি প্রধান বিষয়ে সমাধান অন্বেষন করা হয়েছে। সেগুলো হলো, নগর,গৃহায়ন , পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন, দূষণ ব্যবস্থাপনা, নগর পরিবহন এবং নগর ঝুঁকি হ্রাস।
সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা : টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের স্বার্থে সকল নাগরিকের অনুকূলে মানসম্মত ও নূন্যতম মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবার অধিকার এবং সেই সাথে সেবা ও ইউলিটি সেবা তাদের জন্য সহজলভ্য করা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনী, নারীদের অগ্রগতি ও অধিকার, শিশুদের অগ্রগতি ও অধিকার, বয়োবৃদ্ধ এবং অসমর্থ মানুষের জন্য বিশেষ সেবা দান, কর্মসংস্থানের সুযোগের বিস্তৃতি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও সুবিধাবলিতে অ্যাকসেস বৃদ্ধি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এগুলো সামাজিক উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। বস্তুত সামাজিক উন্নয়ন টেকসই উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তিসমূহের অন্যতম।
পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা : এই কৌশলগত অগ্রাধিকার প্রাপ্ত এলাকার প্রাথমিক উদ্দেশ্যবলির অন্যতম হলো, প্রাকৃতিক সম্পদের দক্ষ ব্যবহারসমূহ এর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন যথাযথ গুরুত্ব দান সহ মানব, ইকোসিষ্টেম ও সম্পদের জন্য পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, পানি সম্পদ, বন ও জীববৈচিত্র্য ভূমি ও মাটি উপকূলীয় ও সামুদ্রিক সম্পদ এবং প্রাকৃতিক দূযোর্গ ও জলবায়ূ পরিবর্তন এর আওতাভূক্ত।
পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এলাকা : জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্রের কৌশলগত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকাগুলোতে সহায়তা দিতে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত এই এলাকাগুলি হলো, সুশাসন, জেন্ডার, এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, ও জলবায়ু পরিবর্তন। এটি প্রতীয়মান হয় যে, জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা উপেক্ষা করে সামগ্রিক ভাবে টেসই উন্নয়ন কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়। (অসমাপ্ত)

শাবানের মধ্যরাত

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

আমাদের সামনে এসে গেছে অতি ফযীলতের একটি মাস মাহে শা’বান। প্রিয় নবীজী এ মাসেও দোয়া করতেন, যেভাবে রজব মাসে দোয়া করতেন: ‘‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রজব ওয়া শা’বান ওয়া বাল্লিগনা রামাদ্বান।’’ অর্থ: হে আল্লাহ আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করে দিন। আর আমাদেরকে রামাদ্বান পাওয়ার তাওফিক দিন। আমীন।
শা’বান মাসে তিনি অনেকগুলো নফল রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা:) বর্ণনা করেন: “আমি প্রিয় নবী (স:)কে রমাদ্বান ছাড়া আর কোন পূর্ণ মাসের রোযা রাখতে দেখিনি। আর শাবান মাস ছাড়া আর কোন মাসে এত অধিক পরিমাণ নফল রোজা রাখতে দেখিনি”।-(বোখারী ও মুসলিম) সাহাবী উসামা বিন যায়েদ (রা:) বর্ণনা করেন: আমি প্রিয় নবীজী (স:) কে জিজ্ঞেস করলাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ! (স:) শাবান মাসে আপনি যত নফল রোয়া রাখেন অন্য কোন মাসে আপনাকে এত নফল রোজা রাখতে দেখিনা। প্রিয় নবীজী (স:) এরশাদ করলেন: রজব ও রামাদ্বান, এ দুটো মাসের মাঝখানের এ মাসটি সম্পর্কে অনেকেই আসলে গাফেল হয়ে থাকেন। এ মাসে মানুষের আমলের (বার্ষিক রিপোর্ট) আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আমি চাই আমার আমল যখন পেশ করা হয় আমি যেন তখন রোজার হালতে থাকি।-(আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে খোযাইমা)। তবে শাবান মাসের ১৫ তারিখে শুধু একটি রোজা রাখার ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না। আর আমাদের সামনে আসছে মধ্য শাবানের রাতটি। যা অনেক দেশে শবে বরাত নামে পরিচিত। এ রাতের ফযীলত ও আমল সম্পর্কে অন্যান্য বৎসরের মত এবারও আপনাদের খেদমতে কিছু বিস্তারিত আলোচনা পেশ করতে চাই। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দিন। আমীন
প্রত্যেক মুসলমানই অবগত আছেন ইসলামী শরীয়তের মূল উৎস দু’টি কুরআন ও হাদীস। কুরআন ও হাদীসে যে ইবাদতের যতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে একটু বেশি বা কম গুরুত্ব দেয়ার কোন অধিকার কোন মুসলিমের নেই। শবে বরাত নামক বিষয়টি কুরআন করীমে আদৌ উল্লেখ করা হয়নি। এটাই হচ্ছে উম্মতের মুহাক্বিক আলিম ও ইমামদের মতামত। কেউ কেউ দাবী করে থাকেন সূরা আদ্-দোখানে “লাইলাতুম্ মুবারাকাহ’’- বরকতময় রাত বলতে, শবে বরাতকেই বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে তাফ্সীরে ইবনে কাছীর, কুরতুবী ইত্যাদির রেফারেন্সও দেয়া হয়্ আসুন আমরা চেক করে দেখি নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থ সমূহে এ ব্যাপারে কি বলা হয়েছে। লিখার কলেবর যাতে বৃদ্ধি না হয়ে যায়, সে জন্য যথাসম্ভব তাফ্সীরের সার সংক্ষেপ পেশ করা হচ্ছে: ইমাম ইবনে কাছীর (র:) বলেন, বরকতময় রাত বলতে সূরা দোকানে শবে ক্বদরকে বোঝানো হয়েছে। কারণ এখানে কুরআন নাযিলের কথা বলা হয়েছে। আর সেটা তো সূরা ক্বদর এ স্পষ্ট করেই বলা আছে। আর কুরআন রামাদ্বান মাসেই নাযিল হয়েছে সেটাও সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে সূরা বাকারায়। তিনি আরো বলেন, কেউ যদি বলে, বরকতময় রাত বলতে মধ্য শাবানের রাত বুঝানো হয়েছে যেমনটি ইকরিমা কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, তাহলে সে প্রকৃত সত্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করলো। শবে বরাতে মানুষের হায়াত, মাউত ও রিযকের বার্ষিক ফায়সালা হওয়া সংক্রান্ত যে হাদীসটি উসমান বিন মুহাম্মদ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন, হাদীসটি মুরসাল। অর্থাৎ হাদীসের প্রথম বর্ণনাকারী হিসেবে যে সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স:) থেকে হাদীসটি শুনেছেন তার কোন উল্লেখ নেই। ফলে এমন দুর্বল হাদীস দিয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসের অকাট্য বক্তব্যকে খন্ডন করা যায় না। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন- তাফসীর ইবনে কাছীর, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা-৩১৬১)।
ইমাম কুরতুবী ঃ ইমাম কুরতুবী বলেন, বরকতময় রাত্রি বলতে ক্বদরের রাতকে বোঝানো হয়েছে। যদিও কেউ বা বলেছেন সেটা হচ্ছে মধ্য শাবানের রাত। ইকরিমাও বলেছেন সেটি হচ্ছে মধ্য শাবানের রাত। তবে, প্রথম মতটি অধিকতর শুদ্ধ। কেননা, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, আমি এ কুরআনকে লাইলাতুল ক্বদর এ নাযিল করেছি। এ প্রসঙ্গে মানুষের হায়াত, মাউত, রিযক ইত্যাদির ফায়সালা শবে বরাতে সম্পন্ন করা হয় বলে যে রেওয়ায়েত এসেচে, সেটাকে তিনি অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেন। তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন, সহীহ শুদ্ধ কথা হচ্ছে এ রাতটি লাইলাতুল ক্বদর।
অত:পর তিনি প্রখ্যাত ফকীহ কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবীর উদ্ধৃতি পেশ করেন, ‘‘জমহুর আলিমদের মতামত হচ্ছে এ রাতটি লাইলাতুল ক্বদর। কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন এটা মধ্য শাবানের রাত। এ কথাটি একেবারেই বাতিল। কারণ আল্লাহ স্বয়ং তার অকাট্য বাণী কুরআনে বলেছেন, রামাদ্বান হচ্ছে ঐ মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে। যেথায় তিনি মাস উল্লেখ করে দিয়েছেন। আর বরকতময় রাত বলে লাইলাতুল ক্বদরকে উল্লেখ করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ রাতটাকে রামাদ্বান থেকে সরিয়ে অন্য মাসে নিয়ে যায়, সে মূলত আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে বসে। মধ্য শাবানের রাতটির ফযীলত এবং এ রাতে হায়াত, মাউতের ফায়সালা সংক্রান্ত কোন একটি হাদীসও সহীহ এবং নির্ভরযোগ্য নয়। কাজেই কেউ যেন সেগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত না করে। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: তাফসীরে কুরতুবী ১৬শ’ খন্ড, পৃষ্ঠা: ১২৬-১২৮)। ইমাম তাবারী তাফসীরে তাবারীতে বরকতময় রাতের তাফসীরে উল্লেখ করেন: কাতাদাহ (র:) বর্ণিত এ রাতটি লাইলাতুল ক্বদর এর রাত। প্রতি বৎসরের শাবানের মতামতটিও উল্লেখ করেন। পরিশেষে তিনি মন্তব্য করেন : লাইলাতুল ক্বদর এর মতটিই শুদ্ধ ও সহীহ। কারণ এখানে কুরআন নাযিলের কথা বলা হয়েছে। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : তাফসীরে তাবারী ১১ খন্ড, পৃষ্ঠা: ২২১-২২৩)।
তাফসীরে আদওয়াউল বায়ান ঃ আল্লামা মুহাম্মদ আল আমীন আশ শিনকীতী (র:) সূরা দোখানের বরকতময় রাতের তাফসীরে বলেন, এটি হচ্ছে রামাদ্বান মাসের ক্বদরের রাত। মধ্য শাবানের রাত হিসেবে সেটিকে বোঝানো হয়েছে মনে করা, যেমনটি ইকরিমা কর্তৃক বর্ণিত রেওয়াতে বলা হয়েছে, একটি মিথ্যা দাবী ছাড়া আর কিছু নয়। কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী এ দাবীটি নি:সন্দেহে হকের বিপরীত যে কোন কথাই বাতিল। কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী যে হাদীসগুলো কেউ কেউ বর্ণনা করে থাকেন, যাতে বলা হয় এ রাতটি হচ্ছে মধ্য শাবানের রাত, সে হাদীসগুলোর কোন ভিত্তি নেই। সেগুলোর কোনটার সনদই সহীহ নয়। ইবনুল আরাবী সহ অনেক মুহাক্বীক আইম্মায়ে কেরাম এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে বলেছেন- বড়ই আফসোস ঐসব মুসলমানদের জন্য যারা কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধীতা করে কুরআন বা সহীহ হাদীসের দলিল ছাড়াই। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: আদওয়াউল বায়ান, ৭ম খন্ড, পৃ: ৩১৯)। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মুফতী শফী (র:) এ বিষয়ে মা’আরেফুল কুরআনে বলেন, বরকতময় রাত বলতে অধিকাংশ তাফসীরবিদদের মতে এখানে শবে ক্বদর বোঝানো হয়েছে যা রামাদ্বান মাসের শেষ দশকে হয়। কেউ কেউ আলোচ্য আয়াতে বরকতের রাত্রির অর্থ নিয়েছেন শবে বরাত। কিন্তু এটা শুদ্ধ নয়। কেননা, এখানে সর্বাগ্রে কুরআন অবতরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর কুরআন যে রামাদ্বান মাসে নাযিল হয়েছে, তা কুরআনের বর্ণনা দ্বারাই প্রমাণিত। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: মা’আরিফুল কুরআন, পৃষ্ঠা: ১২৩৫)।
প্রিয় পাঠক, লক্ষ্য করুন প্রতিটি তাফসীরেই ইকরিমা কর্তৃক বর্ণিত শবে বরাতের বর্ণানাটিকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আর কুরআনের অন্যান্য আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত করা হয়েছে এটি হচ্ছে লাইলাতুল ক্বদর। কুরআন দিয়েই কুরআনের তাফসীর গ্রহণ করার সুযোগ থাকলে সেটাই গ্রহণ করতে হবে। এটাই ওলামায়ে উম্মতের এজমাহ। তারপরও কি এ বিষয়ে আর কোন বিতর্কের অবকাশ থাকে? কুরআনে শবে বরাতের কোন উল্লেখ নেই, এ বক্তব্যটি সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এবার আমরা দেখি হাদীস শরীফে কি আছে। শবে বরাত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসগুলো দু’প্রকার: প্রথমত: শবে বরাতে কত রাকাত নামায পড়তে হবে, সূরা ইখরাস, আয়াতুল কুরসী প্রতি রাতে কতবার পড়তে হবে ইত্যাদি এবং সে আমলগুলোর বিস্তারিত ছওয়াবের ফিরিস্তি সংক্রান্ত হাদীসগুলো একেবারেই জাল এবং বানোয়াট। আর দ্বিতীয় প্রকার হাদীস হলো এ রাতের ফযীলত, ইবাদতের গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয়ে। এসব হাদীসগুলোর কোনটাই সহীহ হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। বরং সবগুলোই দ্বায়ীফ (দুর্বল)। তবে সবগুলোই মাউদু (জাল বা বানোয়াট নয়)
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। ছিহাহ্ ছিত্তা (ছয়টি গ্রন্থের) সবগুলো হাদীসই কি সহীহ? হাদীস বিশারদগণ প্রায় একমত যে বুখারী ও মুসলিম এ দুটো গ্রন্থের সবগুলো হাদীসই সহীহ পর্যায়ের। কোন দ্বায়ীফ (দুর্বল) হাদীসের অবকাশ নেই এ দুটো গ্রন্থে। আর বাকী ৪টি গ্রন্থের অধিকাংশ হাদীসগুলো সহীহ। তবে, বেশ কিছু সংখ্যক দ্বায়ীফ (দুর্বল) হাদীসও রয়েছে সেগুলোর মধ্যে। শবে বরাত সংক্রান্ত কোন একটি হাদীসও বুখারী ও মুসলিম গ্রন্থদ্বয়ে আসেনি। আর বাকি ৪টি গ্রন্থে বা অন্যান্য আরও কিছু গ্রন্থে এ সংক্রান্ত যে হাদীসগুলো এসেছে, তার একটিও সহীহ হাদীসের মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। শবে বরাত সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস হাদীস বিশারদদের মন্তব্য সহকারে উল্লেখ করা হলো : ১) আলী (রা:)’র বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (স:) এরশাদ করেছেন, ১৫ই শাবানের রাতে তোমরা বেশি বেশি করে ইবাদত করো এবং দিনের বেলায় রোযা রাখ। এ রাতে আল্লাহ তা’আলা সূর্যাস্তের সাথে সাথেই দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। বলতে থাকেন ঃ কে আছ আমার কাছে গুনাহ মাফ চাইতে। আমি তাকে মাফ করতে প্রস্তুত। কে আছ ‘রিযক চাইতে’! আমি তোকে রিযক দিতে প্রস্তুত। কে আছ বিপদগ্রস্ত! আমি তাকে বিপদমুক্ত করতে প্রস্তুত। কে আছ… এভাবে (বিভিন্ন প্রয়োজনের নাম নিয়ে) ডাকা হতে থাকে সুবহে সাদেক পর্যন্ত।” ইবনে মাজাহ কর্তৃক হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।
এ হাদীসটি যে আদৌ সহীহ নয় সে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ইমাম হাফেয শিহাবুদ্দিন যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন হাদীসটির সনদ দ্বায়ীফ (দুর্বল)। কারণ অনির্ভরযোগ্য। এমন কি ইমাম আহমদ বিজন হাম্বল এবং প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ইবনু মাঈন তার মাজাহ, মন্তব্য ও সম্পাদনা, মুহাম্মদ ফুয়াদ আব্দুল বারী, পৃ: ৪৪৪)।
২) আয়েশা (রা:) বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি এক রাতে দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ (স:) আমার পাশে নেই। আমি উনার সন্ধানে বের হলাম। দেখি যে তিনি জান্নাতুল বাকী (কবর স্থানে) অবস্থান করছেন। ঊর্ধ্বাকাশের পানে তার মন্তক ফেরানো। আমাকে দেখে বললেন, আয়েশা, তুমি কি আশংকা করেছিলে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (স:) তোমার প্রতি অবিচার করছেন। আয়েশা (রা:) বললেন, এমন ধারণা করিনি, তবে মনে করেছিলাম, আপনার অন্য কোন বিবির সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন কিনা! রাসূলুল্লাহ (স:) বললেন, আল্লাহ তা’আলা ১৫ই শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসে এবং কালব গোত্রের সমুদয় বকরীর সকল পশমের পরিমাণ মানুষকে মাফ করে দেন। (তিরমিযী/ ইবানে মাজাহ)। ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করে নিজেই মন্তব্য করেছেন, আয়েশা (রা:) বর্ণিত এ হাদীসটি হাজ্জাজ বিন আরতাআহ্ ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেছেন বলে জানা নেই।
ইমাম বোখারী বলেছেন, এ হাদীসটি দ্বায়ীফ (দুর্বল)। হাজ্জাজ বিন আরতাআহ্ বর্ণনা করেছেন ইয়াহ্ইয়া বিন আবি কাছীর থেকে। অথচ হাজ্জাজ ইয়াহ্ইয়া থেকে আদৌ হাদীস শুনেননি। ইমাম বোখারী আরও বলেছেন, এমন কি ইয়াহ্ইয়া বিন আবি কাছীর ও ওরওয়া থেকে আদৌ কোন হাদীস শুনেননি। (দেখুন জামে তিরমিযী, ছাওম অধ্যায়, মধ্য শাবানের রাত, পৃ: ১৬৮-১৬৫)।
৩) আবু মুছা আশআরী (রা:) থেকে বর্ণিত: রাসুলুল্লাহ (স:) বলেছেন, ১৫ই শাবানের রাতে আল্লাহ তা’আলা নীচে নেমে আসেন, বরং সকল মাফলুককেই মাফ করে দেন। তবে মুশরিক এবং মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টিকারীকে মাফ করেন না- (ইবনে মাজাহ)। এ হাদীসটির ব্যাপারে হাফেয শিহাবুদ্দীন তাঁর যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, এর সনদ দ্বাইফ (দুর্বল) একজন রাবী (বর্ণনাকারী) আব্দুল্লাহ বিন লাহইয়াআহ নির্ভরযোগ্য নন। আরেকজন রাবী ওয়ালিদ বিন মুসলিম তাদলীছকারী (সনদের মধ্যে হেরফের করতে অভ্যস্ত) হিসেবে পরিচিত। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ আছ্ছিন্দী বলেছেন, এ হাদীসের আরেকজন রাবী আদ্দাহ্হাক কখনো আবু মুছা থেকে হাদীস শুনেননি। শবে বরাত সংক্রান্ত বিষয়ে বর্ণিত সবগুলো হাদীসের সনদের মধ্যেই এ জাতীয় দুর্বলতা বিদ্যামান থাকার কারণে একটি হাদীস ও সহীহর’র মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। লিখার কলেবর বৃদ্ধি হওয়ার আশংকায় আমরা বাকি হাদীসগুলো বা তদসংক্রান্ত মন্তব্য উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকছি।
এবার প্রশ্ন আসে দ্বায়ীফ (দুর্বল) হাদীসের ভিত্তিতে কোন আমল করা যায় কি না? অধিকাংশ মুহাদ্দীসের মতে দ্বায়ীফ হাদীসের কোন আমলা করা শরীয়তে জায়েয নেই। অধিকাংশ ফোকাহা ও আইম্মায়ে কেরাম দ্বায়ীফ (দুর্বল) হাদীস দ্বারা শর্ত সাপেক্ষে আমল করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন। সেগুলো নিম্নরূপ:  খুব বেশি দ্বায়ীফ (দুর্বল) পর্যায়ের না হওয়া,  শুধুমাত্র ফাযায়েল অধ্যায়ের হওয়া,  আমল করার সময় সহীহভাবে প্রমাণিত হওয়ার সুস্পষ্ট ধারণা না রাখা,  কুরআন ও সহীহ হাদীসের কোন বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া। বরং কুরআন বা সহীহ হাদীসের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল হওয়া। উক্ত মূলনীতিগুলোর আলোকে শবে বরাতের আমল করা যেতে পারে অনেক ওলামায়ে কেরাম মতামত দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন আসে আমল করতে হলে কিভাবে করা যাবে।
প্রথমত: ব্যক্তিগতভাবে কিছু ইবাদত বন্দেগী করা যেতে পারে। সেজন্য মসজিদে সমবেত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করার জন্য ওয়ায, নসীহত, যিকির ইত্যাদির আয়োজন করা যাবে না (দেখুন-ফাতাওয়া শামীয়া, ইমাম বিন আবেদীন, পৃ: ৬৪২)। কারণ রাসূলুল্লাহ (স:) এবং সাহাবায়ে কিরামগণ এমনটি করেননি। তাই সে ত্বরীকার বাইরে ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতা আবিষ্কার করলে সেটা হয়ে যাবে বিদ্আত।
দ্বিতীয়ত: হায়াত, মাউত, রিযক ইত্যাদির ফায়সালা এ রাতে হয়, এটা বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ, এসব ফায়সালা লাইলাতুল ক্বদরে হয়, তা সুস্পষ্টভাবে কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
তৃতীয়ত: আমাদের দেশে আলোকসজ্জা ও আতশবাজীর যে তামাশা করা হয়, তা স্স্পুষ্ট বিদ্আত। সে ধারণা থেকেই কোন কোন এলাকায় এ রাতের নাম হচ্ছে বাতির রাত। এসব ধারণা ইসলামী শরীয়তে হিন্দুদের দিওয়ালী অনুষ্ঠান থেকে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (র:)। হালুয়া, রুটি, বিলি বন্টনের কার্যক্রমও বিদআত (দেখুন-ফাতওয়া শামীয়া, ইমাম বিন আবেদীন পৃ : ৬৪২)। ইবাদতের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। এসব অনেক আমল শিয়াদের কাছ থেকে উপমহাদেশের মুসলমানরা গ্রহণ করেছেন বলে মুফতি রশীদ আহমদ লুধিয়ানী উল্লেখ করেছেন (দেখুন সাত মাসায়েল : শবে বরাতে শিয়াদের ভ্রষ্টতা, পৃ: ৩৯-৪২)।
চতুর্থত : নফল ইবাদতের জন্য সারা রাত মসজিদে এসে জেগে থাকা রাসূল (স:) এর সুন্নাত বিরোধী। তিনি নফল ইবাদত ঘরে করতে এবং ফরয নামায জামাআতের সাথে মসজিদে আদায় করতে তাগিদ করেছেন। আর সারারাত জেগে থেকে ইবাদত করাটাও সুন্নাত বিরোধী। প্রিয় নবীজী (স:) সব রাতেই কিছু অংশ ইবাদত করতেন, আর কিছু অংশ ঘুমাতেন। ওনার জীবনে এমন কোন রাতের খবর পাওয়া যায়না, যাতে তিনি একদম না ঘুমিয়ে সারা রাত জেগে ইবাদত করেছেন।
পঞ্চমত : শবে বরাতের দিনের বেলায় রোযা রাখার হাদীস একেবারেই দুর্বল। এর ভিত্তিতে আমল করা যায় না বলে পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম ও ফকীহ মুফতী মাওলানা তাকী উসমানী সাহেবের সুস্পষ্ট ফাতওয়া রয়েছে। শবে বরাতে কবর জিয়ারত সহ ইত্যাদি অনেকগুলো আমলের কোন সহীহ দলিল না থাকার কারণে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও ফকীহ মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানী হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (র:)’র সাথে বহু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (র:) শেষের দিকে কিছু কিছু বিষয় অবশ্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
ষষ্ঠত : শবে বরাতের রোজার পক্ষে যেহেতু কোন মজবুত দলিল নেই, তাই যারা নফল রোজা রাখতে চান তারা আইয়ামে বীদ্বের তিনটি রোজা ১৩, ১৪ ও ১৫ রাখতে পারেন। এর পক্ষে সহীহ হাদীসের দলিল রয়েছে। শুধু একটি না রেখে এ তিনটি বা তার চেয়েও বেশি রোজা রাখতে পারলে আরও ভাল। কারণ, শাবান মাসে রাসূলুল্লাহ (স:) সবচেয়ে বেশি পরিমাণ নফল রোজা রেখেছেন। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সহীহ হাদীসের উপর আমল করার তাওফিক দিন-আমীন।

পবিত্র শাবান মাসের ফজিলত ও ইবাদত

হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী

ই সলাম ধর্মে চন্দ্রমাসের মধ্যে শাবান মাস হলো বিশেষ ফজিলত পূর্ণ। এ মাসে রয়েছে লাইলাতুল বরাতের মতো অত্যন্ত বরকতময় রজনী। যাকে বলা হয় মাহে রমজানের আগমনী বার্তা। শাবান মাস মূলত পবিত্র মাহে রমজানের প্রস্তুতির মাস। প্রতিবারের মতো শাবান মাস মুসলমানদের কাছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহিমান্বিত রমজান মাসের সওগাত নিয়ে আসে। রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি বেশি নফল রোজা, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও নামাজ আদায় করে মাহে রমজানের পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন।
উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘নবী করিম (সা.) কখনো নফল রোজা রাখতে শুরু করলে আমরা বলাবলি করতাম, তিনি বিরতি দেবেন না। আর রোজার বিরতি দিলে আমরা বলতাম যে তিনি মনে হয় এখন আর নফল রোজা রাখবেন না। আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পূর্ণ এক মাস রোজা পালন করতে দেখিনি। কিন্তু শাবান মাসে তিনি বেশি নফল রোজা রেখেছেন।’ (মুসলিম)। অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘শাবান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.) এত অধিকহারে নফল রোজা আদায় করতেন না।’ (বুখারি)
নবী করিম (সা.) হিজরি সালের শাবান মাসের গুরুত্ব, মাহাত্ম্য ও তাৎপর্যের বিবেচনায় এ মাসে অধিক হারে নফল ইবাদত-বন্দেগি করতেন। মাহে রমজানের মর্যাদা রক্ষা এবং হক আদায়ের অনুশীলনের জন্য রাসুলূল্লাহ (সা.) শাবান মাসে বেশিবেশি রোজা রাখতেন। এ সম্পর্কে হযরত আনাস (রা.) বলেছেন, নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আপনার কাছে মাহে রমজানের পর কোন্ মাসের রোজা উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘রমজান মাসের সম্মান প্রদর্শনকল্পে শাবানের রোজা উত্তম।’ (তিরমিযি)। মাহে রমজানে দীর্ঘ ৩০টি রোজা পালনের কঠিন কর্মসাধনা সহজ ও নির্বঘেœ আদায় করার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে শাবান মাসের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে ‘রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় মাসের একটি হলো শাবান। এ মাসে নফল রোজা আদায় করেই তিনি মাহে রমজানের রোজা পালন করতেন।’(আবু দাউদ)।
মানব জীবনের সব কালিমা দূর করার বিশেষত্ব নিয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের মাস রমজানুল মোবারক আসে শাবান মাসের সমাপ্তির পরই। তাই এ গুরুত্ববহ মাস সারাবিশ্বের মুসলমানদের সুদীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায়। তাই আসন্ন মাহে রমজানের মূল সিয়াম শুরু করার আগে শাবান মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কিছু নফল রোজা রাখা দরকার, যাতে করে মাহে রমজানের রোজা পালন সহজ হয় এবং লক্ষ্যও ঠিকমতো অর্জিত হয়। যারা শাবান মাসে নফল রোজা রাখতে চান, তাদের মধ্যভাগেই শেষ করে ফেলা উচিত। শাবান মাসের অর্ধেকের পর বেশি রোজা আর না রাখাই ভালো। মাহে রমজানের প্রস্তুতিকল্পে ইসলামে শাবান মাসকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়।
হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে যে ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের চাঁদের কথা অধিক যতেœর সঙ্গে স্মরণ রাখতেন, যা অন্য মাসের বেলায় হতো না।’ (মুসনাদে আহমাদ)। দেখা যায়, বেশ কয়েকটি হাদিসে শাবান মাসের মাহাত্ম্য সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ বিধৃত হয়েছে। হযরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে শাবান মাসে অন্যান্য মাস অপেক্ষা বেশি নফল রোজা রাখতে দেখি।’ এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এ মাস অনেকেই খেয়াল করেনা। এটি এমন একটি মাস, যে মাসে মানুষের সব কর্মকান্ড আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করা হয়। তাই আমি চাই এমন সময়ে আমার কর্মকান্ডের খতিয়ান আল্লাহর কাছে উপস্থাপন করা হোক, যখন আমি রোজা অবস্থায় রয়েছি।’ (নাসাঈ ও আবু দাউদ)।
একটি হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যখন মধ্য শাবানের রাত আগমন করে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের দিকে মনোযোগ দেন এবং মুমিনবান্দাদের ক্ষমা করেন, আর হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থায় ছেড়ে দেন (যতক্ষণ না তারা তওবা করে সুপথে ফিরে আসে)’ (বায়হাকি)।
হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রজনীতে তার সৃষ্টির (বান্দাদের) প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেন, তবে তারা ব্যতীত যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করে এবং অপরকে ক্ষতি সাধনের বাসনা পোষণ করে।’ (ইবনে হিব্বান)।
শাবান মাসে শবে বরাত নামে বিশেষ একটি রজনী আছে, যে রজনীতে বান্দার সারা বছরের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় এবং আগামী এক বছরের জন্য বান্দার হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত ইত্যাদির নতুন বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। যে কারণে শাবান মাসকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ মাসে মুসলমানদের আমল-আখলাক যেন সুন্দর হয়, রাসূলুল্লাহ (সা.) সেদিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।
শাবান মাসে ভারসাম্যপূর্ণ নেক আমলের তাগিদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সাধ্যানুযায়ী আমল করবে, কেননা আল্লাহর কাছে প্রিয় আমল তা-ই যা সর্বদা পালন করা হয়।’ (বুখারি)। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রায় গোটা শাবানে নফল রোজা পালন করতেন এবং অন্যদেরও বিশেষভাবে আমল করার উৎসাহ দিতেন। তাই বলা হয়, ‘রজব মাসে শস্য বপন করা হয়, শাবান মাসে ফসল কাটা হয় এবং রমজান মাসে ফসল কর্তন করা হয়।’
শাবান মাসের ফজিলত সম্পর্কে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমজান আমার উম্মতের মাস।’ শাবান মাসকে রমজান মাসের প্রস্তুতি ও সোপান মনে করে রাসূলুল্লাহ (সা.) বিশেষ দোয়া করতেন এবং অন্যদের তা শিক্ষা দিতেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে শাবান মাসের মর্যাদা এতই বেশি যে, যখন তিনি এ মাসে উপনীত হতেন, তখন মাহে রমজানকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে আল্লাহর কাছে অধিক হারে এই বলে প্রার্থনা করতেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রজব ও শাবান মাসের বিশেষ বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিন।’ (মুসনাদে আহমাদ)। মহানবী (সা.)-এর এ দোয়ার মাধ্যমে সবার কাছে শাবান মাসের ফজিলত প্রতীয়মান হয়।
অতএব, পরম করুণাময় আল্লাহর অশেষ দয়া ও ক্ষমার দৃষ্টি লাভের আকাক্সক্ষায় শাবান মাসব্যাপী অন্যান্য মাসের তুলনায় অধিক পরিমাণে ইবাদত-বন্দেগি ও মধ্য শাবানের রজনীতে তওবা- ইস্তেগফার করে অতীতের সব গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুমহান আদর্শ অনুসরণে নিজেদের জীবন পরিচালনার দৃঢ় প্রত্যয় ও শপথ গ্রহণ করা উচিত। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন ছুম্মা আমিন।

ইসলামে সম্পদ উপার্জনে সফলতা-ব্যর্থতা প্রসঙ্গ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

প্রত্যেক ব্যক্তির জীবিকার জন্য প্রয়োজন কর্মের। প্রতিটি মানুষই তার যোগ্যতানুযায়ী কাজ করে। সকল মানুষেরই জন্মগতভাবে কমবেশি কর্মদক্ষতা ও প্রতিভা আছে। আল্লাহ্ প্রদত্ত এ যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতাকে অকর্মণ্য, নিষ্ক্রিয় ও অকেজো করে রাখার অধিকার কারো নেই। নবী-রাসূলগণকেও জীবিকা নির্বাহ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। মানুষের একান্ত প্রয়োজনীয় বস্তুসমূহ অর্থ ছাড়া অর্জন করা যায় না। অর্থসম্পদ উপার্জনে ইসলাম সকল মানুষকে উৎসাহিত করে। উপার্জনকারী ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। জীবন এবং সম্পদ একটি অপরটির পরিপূরক। সম্পদ ছাড়া যেমন জীবনধারণ সম্ভব নয়, তেমনি প্রাণহীন ব্যক্তির জন্য অর্থেরও কোন মূল্য নেই। অর্থসম্পদ মানুষের কল্যাণের জন্য কিন্তু এ সম্পদই আবার কখনোও কখানোও অকল্যাণের কারণ হয়ে থাকে। বিত্ত-বৈভব যেমন মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে অনুরূপভাবে তা আবার মানুষের ক্ষতিকর কাজেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইসলাম ছাড়া সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে যে সকল রীতিনীতি অনুসৃত হচ্ছে, তার সবগুলোই সম্পদ সঠিক ব্যবহার ও সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সকল মানুষের সার্বিক কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পেরেছে এমনটি জোর দিয়ে বলা যায় না। অত্র প্রবন্ধে সম্পদ-এর পরিচয়, সম্পদ উপার্জনের বিভিন্ন পন্থা বিশেষত বৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন ও অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সম্পদ-এর পরিচয় : জাস্টিনিয়ান তাঁর ইনস্টিটিউটস্ এ রেসকে (জবং) দ্বিতীয় শ্রেণীর আইন হিসেবে অভিহিত করেছেন। রেস শব্দটির প্রতিশব্দ হলো বস্তু। এর দু’টি অর্থ রয়েছে। সাধারণ অর্থে যে সকল বস্তু দৃষ্টিগোচর হয় সেগুলোই রেস; যেমন: টেবিল, চেয়ার, বাড়ি, একখন্ড জমি ইত্যাদি। তবে আইনবিদদের মতে রাস্তায় চলার অধিকার ও দেনা ইত্যাদিও বস্তুর মধ্যে গণ্য। এ প্রসঙ্গে রোমান আইনে সম্পদ শব্দের অর্থ (গবধহরহমং ড়ভ ঃযব ঃবৎস ‘চৎড়ঢ়বৎঃু’) সকল আইনগত অধিকার, মালিকী অধিকার, সর্বজন স্বীকৃত মালিকী অধিকার ইত্যাদি।
সম্পদ উপার্জনের বিভিন্ন পন্থা : সাধারণভাবে উপার্জনের অনেক প্রকার থাকতে পারে, তবে মৌলিক দিক থেকে মানুষের উপার্জনকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। ক. বৈধ পন্থায় উপার্জন এবং খ. অবৈধ পন্থায় উপার্জন। নিম্নে এসম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো-
বৈধ পস্থায় উপার্জন : বৈধ পন্থায় উপার্জনের জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম শর্ত হলো, বান্দার হালাল উপার্জন। কেননা রিযিক যদি হালাল পন্থায় উপার্জিত না হয় তাহলে তার কোনো দুআ কিংবা ইবাদত কোনটাই কবুল হয় না। আল্লাহ্ আমাদেরকে হালাল রিযিক দিয়ে জীবনধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘আমি তোমাদের জন্য যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু তোমরা ভক্ষণ কর।’’ আর বৈধ পেশায় নিয়োজিত থেকে সম্পদ উপার্জনের জন্য পবিত্রতম ও হালাল বস্তুর খোঁজ করার নির্দেশও আল্লাহ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! জুমুআর দিন যখন সালাতের জন্য আহবান করা হয় হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর। সালাত শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে যাতে তোমরা সফলকাম হও। যখন তারা দেখল ব্যবসায় ও কৌতুক, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ান অবস্থায় রেখে তার দিকে ছুটে গেল। বল, আল্লাহর নিকট যা আছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসায় অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।’’
এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: ‘‘পৃথিবী মিষ্ট ও শ্যামল। এখানে যে ব্যক্তি হালাল সম্পদ উপার্জন করবে এবং ন্যায়সংগত পথে তা ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং তাকে জান্নাত দান করবেন। আর যে ব্যক্তি হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন করবে এবং অন্যায় পথে ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে অপমানজনক স্থানে নির্বাসিত করবেন। আর যারা হারাম সম্পদ হস্তগতকারী, কিয়ামতের দিন তারা আগুনে জ্বলবে।’’ এভাবে আরো অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং হালাল পন্থায় উপার্জনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিুে বৈধ পন্থায় উপার্জনের কতিপয় মাধ্যম উপস্থাপন করা হলো-
চাকরি : সম্পদ উপার্জনের জন্য মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করে তা আহরণ করতে হয়। আল্লাহ্ বনী ইসরাঈলের জন্য যেমন মান্না “ ‘মান্না’ এক ধরনের সুস্বাদু খাবার, যা শিশিরের মত গাছের পাতায় ও ঘাসের উপর জমে থাকত। আল্লাহ্ বিশেষভাবে তা বনী ইসরাঈলের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। ‘সালওয়া’ পাখির গোশ্ত জাতীয় এক প্রকার খাদ্য, যা আল্লাহ্ বনী ইসরাঈলের জন্য বিশেষভাবে প্রেরণ করেছিলেন।” নাযিল করতেন তেমনটি এ যুগে আর হবার সম্ভবনা নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন : ‘আর আমি তোমাদের উপর মেঘের ছায়া দিলাম এবং তোমাদের প্রতি নাযিল করলাম ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’। তোমরা সে পবিত্র বস্তু থেকে আহার কর, যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছি। মুসলিম উম্মাহকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্পদ উপার্জনের শিক্ষা রসূলুল্লাহ্ (স.) দিয়েছেন। এজন্য মানুষকে পরিশ্রমের জন্য নিত্য নতুন উপায় বের করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। তন্মধ্যে একটি হলো চাকরি করা এবং নিজের পরিশ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করে তা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা। চাকুরীর ক্ষেত্র হালাল হতে হবে। হারাম কোনো কাজে চাকরি নিয়ে তার দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করলে তা কখনই হালাল হবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আর মানুষ প্রচেষ্টা ছাড়া কিছুই অর্জন করতে পারে না।’’ আর এই যে মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়। আর এই যে, তার প্রচেষ্টার ফল শীঘ্রই তাকে দেখানো হবে। তারপর তাকে পূর্ণ প্রতিফল প্রদান করা হবে।’’ এ আয়াতের প্রেক্ষিতে রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: ‘‘নিজ হাতের উপার্জন মানুষের উত্তম খাদ্য। আর সন্তান মানুষের নিজ হাতের উপার্জনের অন্তর্ভূক্ত।’’
কৃষি কাজ : সাওয়াব লাভের জন্য যেমন সৎ কাজ ও সাধনা জরুরী, তেমনি সম্পদ লাভের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ জরুরী। এ জন্য নিজের ভাগ্যকে নিজে গড়ার লক্ষ্যে মানুষকে কষ্ট করে রিযিকের ব্যবস্থা করতে হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: নিশ্চয় আল্লাহ কোন কওমের অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’’
উপার্জনের অন্য আরেকটি মাধ্যম হলো কৃষি কাজ। আদম আ. এ কৃষি কাজ করেছেন। এটি একটি উন্নত পেশা। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: ‘‘হে আমাদের রব! নিশ্চয় আমি আমার কিছু বংশধরদেরকে নিয়ে ফসলহীন উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের নিকট বসতি স্থাপন করলাম, হে আমাদের রব, যাতে তারা সালাত কায়েম করে। সুতরাং কিছু মানুষের হৃদয় আপনি তাদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং তাদেরকে রিযিক প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, আশা করা যায় তারা শুকরিয়া আদায় করবে।’’
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা বলেন: ‘‘তিনি সেই সত্তা, যিনি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন, যাতে রয়েছে তোমাদের জন্য পানীয় এবং তা থেকে হয় উদ্ভিদ, যাতে তোমরা জন্তু চরাও। তার মাধ্যমে তিনি তোমাদের জন্য উৎপন্ন করেন ফসল, যায়তুন, খেজুর গাছ, আঙ্গুর এবং সকল ফল-ফলাদি। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে’’।
এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘কোন মুসলমান যখন কোন কিছু রোপণ করে অতঃপর তা থেকে কোন মানুষ অথবা কোন চতুষ্পদ জন্তু কোন কিছু ভক্ষণ করে তা রোপণকারীর জন্য সদকার সমতুল্য সাওয়াব হয়।’’
আবূ আইউব আল-আনসারী (রা.) বলেন, রসূল (স.) বলেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি কোন বৃক্ষ রোপণ করলো আল্লাহ্ তার জন্য একটি প্রতিদান নির্ধারণ করে রেখেছেন সে গাছ থেকে ফল বের হোক বা না হোক।’’
হাদীসের অপর এক বর্ণনায় কৃষি কাজকে সদকায়ে জারিয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, আনাস (রা.) বলেন; রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: সাতটি বিষয়ে আমলের প্রতিদান মৃত ব্যক্তির কবরেও প্রদান করা হবে। তা হল, জ্ঞান শিক্ষা দেয়া, নদী ও কূপ খনন করা, খেজুর গাছ গালানো, মসজিদ নির্মাণ করা, বই-পুস্তক রেখে যাওয়া এবং এমন সন্তান দুনিয়ায় রেখে যাওয়া যে সন্তান ঐ ব্যক্তির ইন্তিকালের পর তার জন্য দুআ করবে।’’ এভাবে কুরআন ও হাদীসে কৃষিকাজকে একটি উন্নত পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
শ্রম : সম্পদ উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে শ্রম। কুরআন মাজীদেও এ মাধ্যমটির উল্লেখ করা হয়েছে। এটাকে অবলম্বন করে মানুষ কোন রকম পুঁজি ছাড়াই নিজের জীবিকা অর্জন করতে পারে। কুরআনে দু’জন নবীকে শ্রমিক-মালিক হিসেবে পেশ করা হয়েছে। মূসা (আ.) মহরের বিনিময়ে তাঁর স্ত্রীর বকরী চরিয়েছিলেন বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তাআলা শুআইব (আ.) এর বক্তব্যের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন: ‘‘আমার একান্ত ইচ্ছা, আমার এই কন্যা দু’টির একটিকে বিবাহ দেব তোমার সাথে এ শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার কাজ করে দেবে, আর যদি দশ বছর পুরো করে দাও, তবে সেটা হবে তোমার অনুগ্রহ।’’
এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় ইব্নে কাছীর (র.) বলেন, মূসা বললেন: আমার ও আপনার মাঝে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হল যে, আট বছর ও দশ বছর এ দু’টির যে কোন একটি সময় আমি পূরণ করব। আর এটা আমার ইচ্ছাধীন। আট বছর পূরণ করার পর আমার উপর আপনি অতিরিক্ত পরিশ্রম চাপিয়ে দিতে পারবেন না।’’ আর আমাদের এ পারস্পরিক আলোচনায় আল্লাহকে আমরা সাক্ষী হিসেবে স্বীকার করছি। তিনিই আমাদের কার্যনির্বাহী। আমার পক্ষে আট বছরের স্থানে দশ বছর মজুরী করা যদিও মুবাহ, তা পূর্ণ করা জরুরী নয়। (অসমাপ্ত)

সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলামে নির্দেশনা

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
সন্ত্রাস প্রতিরোধে তরুণ বয়সে মুহাম্মদ (সা.) যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তার বাস্তবায়ন তার সমগ্র জীবনে পরিলক্ষিত হয়। তিনি নবুওয়াত পাওয়ার পরেও এই প্রতিজ্ঞার কথা ভুলেননি। তিনি নবুওয়াত প্রাপ্তির পর কোন একদিন বলেন: “আজও যদি কোন উৎপীড়িত ব্যক্তি “হে ফুযুল প্রতিজ্ঞার ব্যক্তিবর্গ’ বলে ডাক দেয়, আমি অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দেব। কারণ, ইসলাম এসেছে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং উৎপীড়িত, অত্যাচারিতকে সাহায্য করতে। এভাবে মহানবী (সা.) মক্কানগরী থেকে অন্যায়, অত্যাচার ও সন্ত্রাস দূর করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং পরবর্তী সময়ের জন্য সন্ত্রাস প্রতিরোধের আদর্শ রেখে গিয়েছেন।
রাসূল (সা.) নবুওয়াত লাভের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অহীভিত্তিক ফর্মূলা অনুযায়ী বিশ্বকে গড়ে তোলার জন্য সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত করেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস কোন সাফল্যজনক পদ্ধতি হতে পারে না। বিশেষ করে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদ যদি সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়ে-যেমনটি মহানবী (সা.) এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবে হয়েছিল, তাহলে সন্ত্রাস নির্মূলে সন্ত্রাসী নির্মূলের নির্বুদ্ধিতাগত নীতির ফলে পুরো সমাজটাকেই প্রায় নির্মূল করে ফেলতে হবে। আবার সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করার কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বসে থাকলে সন্ত্রাস ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে। উভয় অবস্থায়েই সমাজের সর্বনাশ অনিবার্য। তাই মহানবী (সা.) সন্ত্রাস প্রতিরোধে মধ্যপন্থা গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করে তথায় শান্তি স্থাপনের চেষ্টায় মহানবী (সা.) তাঁর সমগ্র নবুওয়াতী জীবন ব্যয় করেছিলেন। সন্ত্রাস প্রতিরোধ বা নির্মূলে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পদক্ষেপ অগণিত। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো-
নবুওয়াতের দ্বাদশ বছর হজ্ব উপলক্ষে মক্কায় আগত লোকদের মধ্যে ১২ জন রাসূল (সা.) এর সাথে আকাবা নামক স্থানে সাক্ষাৎ করলে তারা তাঁর নিকট ইসলাম গ্রহণ পূর্বক অনৈসলামিক কার্যকলাপ পরিত্যাগ করার অঙ্গীকার করলেন। এই অঙ্গীকার গ্রহণ অনুষ্ঠানকে আকাবার প্রথম বাইয়াত বলা হয়। এই বাইআতে সাহাবাগণ যে বিষয়গুলোর উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তার বিবরণ দিয়ে বাই’আতের অন্যতম সদস্য উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) বলেন : “আমরা রাসূল (সা.) এর সাথে অঙ্গীকার করেছিলাম যে, আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার (শরীক) করবো না, চুরি-ডাকাতি করবো না, ব্যভিচার করবো না, সন্তান হত্যা করবো না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাবো না এবং ন্যায়সঙ্গত ব্যাপারে রাসূল সা. এর অবাধ্যতা করবো না। অতঃপর রাসূল (সা.) বললেন: “এসব অঙ্গীকার পূরণ করলে তোমাদের জন্য জান্নাত রয়েছে। আর এর কোন একটি ভঙ্গ করলে তোমাদের পরিণতি আল্লাহর হাতে ন্যস্ত থাকবে। ইচ্ছে করলে মাফ করে দিবেন, ইচ্ছা করলে তিনি শাস্তি দিবেন। এই প্রতিজ্ঞার বিষয়াবলীর সবগুলোই প্রত্যক্ষভাবে সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত। তাই মহানবী (সা.) সন্ত্রাস প্রতিরোধে সর্বপ্রথম তার সাহাবাদেরকে সকল সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন, যার ফলে পরবর্তীকালে মক্কা-মদীনাসহ সমগ্র ইসলামী বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল হয়েছিলো।
কাফির-মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মহানবী (সা.) মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় স্থায়ীভাবে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে মদীনায় বসবাসকারী অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বিশেষত ইয়াহুদীদের সাথে তিনি শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন, যা ইতিহাসে মদীনার সনদ (ঈযধৎঃবৎ ড়ভ গধফরহধ) নামে খ্যাত। নবী করীম (সা.) এর পক্ষ থেকে কুরাইশী, মদীনাবাসী, তাদের অধীনস্থ এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্টদের এবং জিহাদে অংশগ্রহণকারী মু‘মিন ও মুসলিমদের মধ্যে সম্পাদিত এ অঙ্গীকারনামায় সন্ত্রাস প্রতিরোধক যে ধারাগুলো ছিলো তা নিম্নরূপ: যারা বাড়াবাড়ি করবে, সকল সত্যানিষ্ঠ মুসলিম তাদের বিরোধিতা করবে। ঈমানদারদের মধ্যে যারা জুলুম অত্যাচার, পাপ, দাঙ্গা-হাঙ্গমা বা ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করবে, সকল মু‘মিন তাদের বিরোধিতা করবে। মু‘মিনরা সম্মিলিতভাবে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে থাকবে। অন্যায়কারী কোন মু‘মিনের সন্তান হলেও এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হবে না। কোন ব্যক্তি যদি কোন মু‘মিনকে হত্যা করে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে এর পরিবর্তে তার কাছ থেকে কিসাস আদায় করা হবে। অর্থাৎ হত্যার অপরাধে অপরাধী হওয়ায় তাকেও হত্যা করা হবে। তবে যদি নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনকে হত্যাকারী ক্ষতিপূরণ দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে কিসাস করা হবে না। কোন হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী বা বিদ’আতীকে সাহায্য করা মু‘মিনের জন্য বৈধ বিবেচিত হবে না। অশান্তি সৃষ্টিকারী কোন ব্যক্তিকে কেউ আশ্রয় দিতে পারবে না। যদি কেউ আশ্রয় দেয় বা সাহায্য করে, তাহলে কিয়ামতের দিন তার উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হবে। ইহলৌকিক জীবনে তার ফরজ ও নফল ইবাদাত কোনটাই কবুল হবে না।
সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী (সা.) সন্ত্রাসীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। কারণ তিনি জানতেন সন্ত্রাসকে অঙ্কুরেই নির্মূল করা না হলে তা ক্রমেই সমাজ-রাষ্ট্র ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌছবে। তখন ইচ্ছা হলেই তা আর নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। যেমন অবস্থা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে দেখা যাচ্ছে। তাই দূরদর্শী বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.) আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে সন্ত্রাসকেই সমূলেই নির্মূল করেছিলেন। নিম্নের ঘটনাটি এর উজ্জল দৃষ্টান্ত: “উকল বা উরাইনা গোত্রের কিছু লোক (ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে) মদীনায় এলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল। নবী (সা.) তাদেরকে (সদকার) উটের নিকট যাওয়ার এবং পেশাব ও দুধ পান করার নির্দেশ দিলেন। তারা সেখানে চলে গেল। অতঃপর তারা যখন (উটের পেশাব ও দুধ পান করে) সুস্থ হলো তখন নবী (সা.) এর রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এ সংবাদ দিনের প্রথম ভাগেই (তাঁর নিকট) এসে পৌছল। তারপর তিনি তাদের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য লোক পাঠালেন। বেলা বাড়লে তাদেরকে পাকড়াও করে আনা হলো। অতঃপর তাঁর আদেশে তাদের হাত পা কেটে দেয়া হলো। উত্তপ্ত শলাকা দিয়ে তাদের চোখ ফুটিয়ে দেয়া হলো এবং গরম পাথুরে ভূমিতে তাদের নিক্ষেপ করা হলো। এমতাবস্থায় তারা পানি প্রার্থনা করছিল কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি। আবূ কিলাবাহ (র.) বলেন, এরা চুরি করেছিল, হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল, ঈমান আনার পর কুফরী করেছিল এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল”।
দেশ থেকে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাস নির্মূলের প্রয়োজনের মহানবী (সা.) কখনও সন্ত্রাসীদেরকে গোষ্ঠীসহ উৎখাত করেছিলেন। ইয়াহুদী গোত্র বানূ নাযীর মহানবী (সা.) কে সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পর মহানবী (সা.) তাদেরকে তাদের আবাসস্থল থেকে উৎখাত করে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়ার মাধ্যমে মদীনাকে সন্ত্রাসমুক্ত করেন। ঘটনাটির বিবরণ হলো: “সাহাবী আমর ইবনে উমায়্যা আদ-দামরী (রা.) বানূ ‘আমিরের দু’জন লোককে ভুলবশত শত্র“পক্ষ মনে করে হত্যা করেন। প্রকৃত ব্যাপার হল, বানূ ‘আমিরের সাথে মহানবী (সা.) এর মৈত্রীচুক্তি ছিল। ফলে মহানবী (সা.) তাদেরকে ‘রক্তপণ’ দিতে মনস্থ করেন। আর এ কাজে সহযোগিতা ও মধ্যস্থতা করার জন্য তিনি ইয়াহুদীদের সবচেয়ে বড় গোত্র বানূ নাযিরের নিকট যান। তাদের ব্যবসা ছিল মদীনা থেকে দুই মাইল দূরে উপকণ্ঠে। বানূ ‘আমিরের সাথে বানূ নাযীরেরও মৈত্রীচুক্তি ছিল। বানূ নাযিরের লোকজন মহানবী সা. কে দেখে আনন্দ প্রকাশ করে বরং তাঁর সাথে প্রথমত খুবই ভাল ব্যবহার করে। তারা এ ব্যাপারে তাঁকে সহযোগিতার পূর্ণ আশ্বাস দেয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে। মহানবী (সা.) তাদের একটি দেয়াল ঘেঁষে বসে ছিলেন, তাঁর সাথে আবূ বকর, ওমর ও আলী (রা.) প্রমুখ দশজন সাহাবীও ছিলেন। বানূ নাযীরের লোকজন নিজেদের মধ্যে সলা-পরামর্শ করতে লাগলেন যে, এমন মোক্ষম সুযোগ আমরা আর কখনো পাব না। আমাদের কেউ যদি ঘরের ছাদে উঠে তাঁর মাথার উপর একটি ভারী পাথর ছেড়ে দেয় তাবে আমরা চিরতরে তার হাত থেকে নি®কৃতি পাব। আমার ইবন জাহহাশ ইবন কা’ব নামে তাদের এক লোক বলল, আমি এ কাজের জন্য প্রস্তুত। এই বলে সে ঠিকই মহানবী (সা.) এর উপর পাথর ছেড়ে দেয়ার জন্য সবার অলক্ষ্যে ঘরের ছাদে উঠে গেল। তখনই মহান আল্লাহ মহানবী (সা.) কে ওহী মারফত এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দেন। সাথে সাথে মহানবী (সা.) সেখান থেকে উঠে পড়েন এবং কাউকে কিছু না বলে সোজা মদীনায় চলে আসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা সাহাবীগণও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তাঁর সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। অতঃপর মদীনা থেকে আগত এক ব্যক্তিকে পেয়ে তাকে মহানবী (সা.) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি বলল, আমি তাঁকে মদীনায় প্রবেশ করতে দেখেছি। অতঃপর তাঁরা মদীনায় এসে মহানবী সা. এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি তাদেরকে ইয়াহুদীদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানালেন এবং সকলকে রণপ্রস্তুতি নিয়ে তাদের মুকাবিলা করার জন্য বের হবার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) কে মদীনার দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে তিনি সেনা সমভিব্যবহারে বানু নাযীরের বসতিতে পৌঁছেন। সেখানে পৌঁছে তিনি তাদেরকে চর্তুদিকে থেকে অবরোধ করেন। ছয়দিন অবরোধ করার পর তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য তাদের খেজুর গাছ কেটে ফেলেন এবং বাগান জ্বালিয়ে দেন।” তখন মহানবী (সা.) এর সমর্থনে আয়াত নাযিল হয়। তোমরা যে খেজুর বৃক্ষগুলো কর্তন করেছ এবং যেগুলো কান্ডের উপর স্থির রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে; তা এজন্য যে, আল্লাহ পাপচারীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন”। (অসমাপ্ত)