বিভাগ: ইসলামের আলো

জিলহজ্ব মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমল সমূহ যা জানা খুবই প্রয়োজন

ডাঃ হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফল্লাহ মানসুর

পবিত্র রমজান মাসের পর গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সময় হলো জিলহজ মাসের প্রথম ১০দিন। এই দিনগুলোর ইবাদত করা আল্লাহ তায়ালার নিকট অতি প্রিয়।সহিহ বোখারির বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ভালো আমলের জন্য আল্লাহর নিকট এই দিনগুলোর চেয়ে প্রিয় কোনো দিন নেই; সাহাবারা প্রশ্ন করলেন ইয়া-রাসুলাল্লাহ (সঃ)- এমনকি আল্লাহর রাহে জিহাদও এই দিনসমূহের ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়? জবাবে ইরশাদ হলো- না, অন্য সময়ে আল্লাহর রাহে জিহাদও এই দশকের ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। অবশ্য যে ব্যক্তি জান ও মাল নিয়ে আল্লাহর রাহে জিহাদ করতে বের হয়েছেন এবং তার কোনোটি নিয়েই ফিরতে পারেননি, তার কথা ভিন্ন।
অতএব যারা কুরবানি করার সামর্থ্য রাখে অথবা সামর্থ রাখে না; তাদের সবার জন্য জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন অতি গুরুত্বের সাথে অতিবাহিত করা প্রয়োজন । কুরবানি করার আগ পর্যন্ত যে বিধি-নিষেধ রয়েছে যা পালন করার মধ্যে রয়েছে অনেক সাওয়াব। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে কোরআন-হাদিসে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া এই ইবাদত সম্পর্কে আমাদের সমাজের খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষই ধারণা রাখেন। চলুন জেনে নিই জিলহজ মাসের প্রথম দশকের উল্লেখযোগ্য ১০টি আমল যথা –
১. সামর্থ্যবান হলে হজ পালন করা। -সূরা আল ইমরান: ৯৭
২. কোরবানি করা। -সূরা কাউসার ও তিরমিজি
৩. অধিক পরিমাণে আল্লাহতায়ালার নামের জিকির করা। -সূরা হজ্ব : ২৮
বর্ণিত আয়াতে অবশ্য নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নামের জিকির করার কথা বর্ণিত হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসিরবিদ উলামায়ে কেরামের অভিমত হলো- ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’ বলতে জিলহজের প্রথম দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে।
৪. বেশি বেশি পরিমাণে নেক আমল করা ও দান-সাদাকাহ করা। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম
৫. সকল ধরনের পাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম
৬. কোরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির এই দশদিন- নখ, চুলসহ শরীর থেকে কোনো কিছু কর্তন না করা। -সহিহ মুসলিম
সেজন্য জিলহজ মাস আসার আগে জিলক্বদ মাসের শেষের দিকে যেমন-
ক.মাথার চুল কাটা কিংবা মাথা ন্যাড়া করা।
খ.হাত ও পায়ের নখ কাটা।
গ.মোচ ছেঁটে ছোট করা ইত্যাদি
৭. বেশি বেশি তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠ করা। যেমন- আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ। – আবু দাউদ
৮. আরাফার দিন ফজর হতে আইয়ামে তাশরিকে (ঈদের দিন ও তার পরে আরো তিন দিন) প্রতি নামাজের পর উল্লেখিত তাকবিরটি পাঠ করা। -আবু দাউদ
৯. আরাফার দিনে রোজা রাখা। সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি মনে করি, তার বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা এক বছর পূর্বের ও এক বছর পরের গুনাহ মাফ করে দিবেন।
আরাফার দিন ছাড়াও ঈদের দিন ছাড়া প্রথম দশকের বাকি দিনগুলোতেও রোজা রাখাকে মোস্তাহাব বলেছেন ইমাম নববি (রহ.)। কেননা নফল রোজাও নেক আমলের শামিল। হাদিসে এই দশকে সাধারণভাবে নেক আমলের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য হাদিসে স্বতন্ত্র নির্দেশ থাকায় আরাফার দিনের রোজা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
১০. ঈদের দিনের যাবতীয় সুন্নতসমূহ পালনে সচেষ্ট হওয়া যেমন-
ক. উত্তমরূপে গোসল করা।
খ. সাধ্যমত নতুন জামা পরে ঈদগাহে আসা।
গ. আতর ও সুরমা লাগানো।
ঘ. তালবিয়া পাঠ করতে করতে ঈদগাহে আসা।
ঙ. আত্মীয় সজনসহ সকলের সাথে কুশল বিনিময় করা।
চ. পশু কুরবানী থাকলে নামাজ শেষে কুরবানী করা।
ছ. খালিমুখে নামাজ পড়তে আসা, নামাজ শেষে কুরবানীর গোসত দিয়ে খাবার শুরু করা।
প্রিয় পাঠক! জিলহজ মাস তো কতোবারই এসেছে আমাদের জীবনে। কিন্তু আমরা কী পেরেছি জিলহজ মাসের এসব আমলসমূহ পালন করতে? কে জানে আগামী জিলহজ মাস আমাদের জীবনে আসবে কি-না? সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিন্তু এখনই। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে জিলহজ মাসের সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রেখে কুরআন- হাদিসের ওপর আমল করা এবং শরীয়তের বিধি-নিষেধগেুলোর প্রতি যতœবান হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ইসলামের আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তার আইন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার লংঘন ও নির্বাসনের একটি সমীক্ষা : মানবাধিকার সংরক্ষণের এক মহান উদ্দেশ্য নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা হলেও বর্তমানে বিশ্বের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ এর মানবাধিকার বিষয়ক ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জিং অধ্যায় বলে মনে করেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদ আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইতালী ও চীনকে ‘ভেটো’ প্রয়োগের নিরংকুশ ক্ষমতা প্রদান করে নিজেই মানবাধিকার লংঘনের নজীর স্থাপন করেছে। পৃথিবীর পরাশক্তিসমূহ বিশেষতঃ আমেরিকা ও ব্রিটেন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে শাসন-শোষণ ও বঞ্চনার করুণ শিকারে পরিণত করেছে। অথচ এরাই জাতিসংঘ ও মানবাধিকার কমিশন নিয়ন্ত্রণ করে। আর পুতুলসম জাতিসংঘেরও এমন কোন সংস্থা বা মেকানিজম নেই যা দেশে দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে কিংবা আইন দ্বারা তা মানতে বাধ্য করতে পারে। ফলে জাতিসংঘের ছাত্রছায়ায়, কোন কোন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে বৃহৎ শক্তিবর্গ বিশেষত আমেরিকা ও তার মিত্র শক্তি দুর্বল দেশসমূহে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার সনদকে পদতলে পিষ্ট করে আফগাস্তিান ও ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনীর নগ্ন আগ্রাসন, গণহত্যা, স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা হরণ, সিরিয়া, ইরান ও সৌদি আরবের প্রতি মার্কিন হুমকি, বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় সার্ব বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা, ফিলিস্তীনে ইসরাইলী আগ্রাসান ও দমন-পীড়ন, আলবেনিয়ায় গণহত্যা, স্বাধীনতাকামী কাশ্মীর মিন্দানাওয়ে মুসলিম নিধন, মায়ানমারে মুসলিমদের ওপর জেল-জুলুম ও নির্যাতন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি ও কোন কোন দেশে ঘন-ঘন সামরিক শাসন জারী, আমেরিকায় মুসলিম ও নিগ্রোদের প্রতি বৈরী আচরণ, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে নাগরিক অধিকার হরণ, দেশে দেশে বোমাতংক এবং সামাজিক নৈরাজ্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অস্থিতিশীল বিশ্ব পরিস্থিতি আজ জাতিসংঘের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতিকেও আজ বিপর্যয়কর অবস্থার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। ফলে মনে হয়, গুটি কয়েক রাষ্ট্রকে ভেটো প্রয়োগ ক্ষমতা প্রদান করে জাতিসংঘ এসব রাষ্ট্রকে তার সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ হতে ফায়দা লুটার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। পক্ষান্তরে এই ব্যবস্থা বিশ্বের কোটি কোটি শান্তিকামী মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে মুসলিম বিশ্ব ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা, আদর্শিক অসচেতনতা, সামাজিক পশ্চাদপদতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনগ্রসরতা প্রভৃতি সমস্যায় জর্জরিত। সর্বোপরি মুসলিম বিশ্বের মাঝে ঐক্য ও সংহতির অভাব আজ সুস্পষ্ট। ফলে তারা জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ হতে পুরোপুরি ফায়দা উঠাতে পারছে না। এমতাবস্থায় উপরোক্ত দুর্বলতাসমূহ কাটিয়ে উঠে মুসলিম উম্মাহ যদি কেবল মহান আল্লাহ প্রদত্ত এবং মহানবী (সা.) প্রদর্শিত শাশ্বত জীবন ব্যবস্থা ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণ করে এবং মহানবী (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদীনার জনকল্যাণমূলক আদর্শ রাষ্ট্রের মডেলে মানবাধিকারের শিক্ষা ও নীতিমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগে গ্রহণ করে তা হলে বিশ্ববাসীকে মানবাধিকারের গ্যারান্টি দিতে সক্ষম হবে। “আব্দুল কাদের, ড.আ.ক.ম, প্রাগুক্ত, পৃ.৫৬”। সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার এই উদারণ রাসূল (সা.) এর জীবনের শুরু থেকেই আজীবন নানাভাবে দেখা গিয়েছিল। পরবর্তীকালে যখন তিনি গোটা আরব জাহানের নেতা হয়ে উঠলেন তখন তিনি কি সমাজজীবনে, কি পারিবারিক জীবনে, কি রাষ্ট্রীয় তথা নাগরিক জীবনে, কি বিশ্ব নাগরিক হিসাবে- সর্বক্ষেত্রে মানুষের মূল্য-মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকারের যে সর্বজনীন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন আজ পর্যন্ত সারা বিশ্বের ইতিহাসে তা বিরল, অভূতপূর্ব। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নীতি-দর্শনের কয়েকটি দিকের উপর আলোকপাত করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠবে।
মানবাধিকার ও ইসলামী নীতিমালা (ওংষধসরপ চৎরহপরঢ়ষবং)
১। নিরাপদ জীবন-যাপনের অধিকার : মুহাম্মদ (সা.) মানুষের জীবনের অধিকার ও জান-মালের নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। নরহত্যা যেখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল সেখানে নরহত্যাকে জঘন্য অপরাধ হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, “সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ হচ্ছে, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করা এবং মানুষকে হত্যা করা। “আল-হাদী, উদ্ধৃত, গ.ঊৎংযধফঁষ ইধৎর, ঐঁসধহ জরমযঃং রহ ওংষধস রিঃয ঝঢ়বপরধষ জবভবৎহপব ঃড় ডড়সবহ জরমযঃ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঐঁসধহ জরমযঃং রহ ওংষধস শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধ, ১৯৯৪, ঢাকা : পৃ. ১৮”।
মহানবী (সা.) আলো বলেছেনÑ “কোন যিম্মীকে (মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিককে) হত্যাকারী জান্নাতের সুগন্ধ পর্যন্ত পাবে না। যদিও জান্নাতের সুগন্ধ অনেক দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়। “বুখারী, ইমাম, আস-সহীহ, মো. আব্দুল করিম খান সংকলিত, ঢাকা : বাংলাদেশ লাইব্রেরী ১৯৯৬, পৃ. ৩৩০, হাদীস নং ১২৭৭”। বিদায় হজ্বের ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী (সা.Ñ বলেছেন, “হে মানবজাতি! নিশ্চয় তোমাদের জীবন, সম্পদ এবং সম্ভ্রম তোমাদের প্রভুর সম্মুখে উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত পবিত্র”। “আহমদ, মুহাম্মদ শফিক ও মু. রুহুল আমীন, ইসলামে মানবাধিকার : নাগরিক ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, যুক্তসংখ্যা ৪৭, ৪৮, ৪৯, অক্টোবর ৯৩- জুন, পৃ. ১৫৮”। মহানবী (সা.) আত্মহত্যাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং আত্মহত্যাকারী তার নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দেয়ার শাস্তি হিসাবে আত্মহত্যার অনুরূপ পন্থায় দোযখে শাস্তি ভোগ করবে বলে হুঁশিয়ার বার্তা দিয়েছেন। “বুখারী, ইমাম, আস-সহীহ, মো. আব্দুল করিম খান সংকলিত, প্রাগুক্ত, হাদীস নং ১২৫১-১২৫৩”।
২। বিবাহ ও পারিবারিক জীবনযাপনের অধিকার : মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন দর্শনে সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তিকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। ইসলামে বিবাহ সমভাবে একটি অধিকার ও ধর্মীয় দায়িত্ব। রাসূল (সা.) বলেছেÑ “বিবাহ আমার সুন্নত, যে আমার সুন্নতের প্রতি অনাসক্ত সে আমার আদর্শভুক্ত নয়। “প্রাগুক্ত”। কৌমার্যব্রতকে প্রত্যাখান করে তিনি বলেছেন : “ইসলামে সন্ন্যাসবাদ ও বৈরাগ্য প্রথার অনুমোদন নেই। “প্রাগুক্ত”। প্রকৃপক্ষে ইসলামে ‘বিবাহ’ কেবল জৈবিকা চাহিদা পূরণের পন্থাই নয় বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, সমঝোতা, সমবেদনা ও নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। রাসূল (সা.) প্রবর্তিত বিবাহব্যবস্থা এমন একটি সামাজিক চুক্তি যাতে নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্মত বা অসম্মত হবার সমান অধিকার স্বীকৃত। তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যাপারেও ইসলামে নারী ও পুরুষকে সমান অধিকার প্রদান করা হয়েছে। “প্রাগুক্ত”।
বিবাহের পাশাপাশি পারিবারিক জীবনকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যেহেতু স্বামী-স্ত্রীই হল পরিবারের মূল ভিত্তি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের উপরই প্রাথমিকভাবে পারিবারিক জীবনের শান্তি ও সুখ নির্ভরশীল তাই পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক কেমন হবে এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়ে কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছেÑ “তাঁরা (স্ত্রীগণ) তোমাদের (স্বামীদের) ভূষণ আর তোমরা তাদের ভূষণ। “আল-কুরআন, ২ : ১৮৭”।
৩। সম্পদের মালিকানা : রাসূল (সা.) প্রবর্তিত ইসলামী অর্থব্যবস্থা সমাজবাদ বা পুঁজিবাদ কোনটিকেই সমর্থন করে না এখানে সীমিত পরিসরে ব্যক্তির জন্য সম্পত্তির মালিকানা স্বীকৃত। তবে তা এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে, ব্যক্তি এখানে সম্পদ উপার্জনের লাগামহীন স্বাধীনতা লাভ করে না। ইসলামী সমাজে সকল সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আল্লাহর। মানুষ দায়িত্বপ্রাপ্ত (ঞৎঁংঃবব) হিসাবে এর অর্জন, ভোগ ও বণ্টনের অধিকার লাভ করে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- “তাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে”। “আল-কুরআন, ৭০ : ২৪, ২৫”। দান-খয়রাত, সদকা, যাকাত, ফিতরা প্রভৃতির মাধ্যমে বর্ধিত সম্পদের বিলি-বণ্টন করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক অবস্থার কথা কেবল বলাই যায়নি, রাসূল (সা.) তাঁর জীবনে কার্যকরভাবে তা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ইসলামে সমাজে পুঁজিপতি ও শ্রমিকের সম্পর্ক শোষণ বা সংঘর্ষ নির্ভর নয় বরং পারস্পরিক কল্যাণমূলক ও ভ্রাতৃত্বসূলভ। রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে সত্তার হাতে আমার জীবন তার শপথ করে বলছি, কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারে না, যে পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তা অন্য ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করে”। “আহমদ, মুহাম্মদ শফিক ও মুহাম্মদ রুহুল আমীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৫”।
৪। দাসত্বের গোলক ধাঁধা থেকে স্বাধিকার : দাসত্বের পরাধীনতা মানবেতিহাসের এক চরম অমানবিক ও অবমাননাকর অধ্যায়। এর প্রচলন ছিল বিশ্বব্যাপী এবং ১৮৯০ সালে ব্রাসেলসে দাস-ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ কনফারেন্সের আগ পর্যন্ত বিশ্বের কোথাও এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধাচরণ করা হয়নি। “মানব প্রকৃতি অপরিবর্তনীয়”Ñ এ দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে প্লেটো ও এরিস্টোটল থেকে শুরু করে আঠারো শতকের অধিকাংশ দার্শনিক দাসপ্রথাকে সমর্থন করেছেন। দাস প্রথা সম্পর্কে এরিস্টোটলের মতামত উল্লেখ করে অনফঁষষধয কধহহড়ঁস বলেছেন- ”ওহ যরং ড়ঢ়রহরড়হ, সধহশরহফ পড়হংরংঃবফ ড়ভ ঃড়ি পধঃবমড়ৎরবং ঃযব ভৎবব ধহফ ঃযব ংষধাবং ধহফ ঃড় যরস ংড়সব ঢ়বড়ঢ়ষব বিৎব ংষধাবং নু ঃযবরৎ াবৎু হধঃঁৎব. ”কধহহড়ঁস, অনফঁষষধয রংষধস রং ঃযব ভরৎংঃ অহঃর-ঝষধাবৎু জবষরমরড়হং ঝুংঃবস ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ. ঞযব ওংষধসরপ জবারবি ঔড়ঁৎহধষ. ডড়ৎশরহম ঝঁৎাবৎু, ঊহমষধহফ, ঔঁষু-অঁমঁংঃ ১৯৬৬, চ. ৩৭. গ্রীক, রোমান, পারসিক প্রভৃতি প্রাচীন সভ্যতাসমূহে ইহুদী, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও সনাতন হিন্দু ধর্মে এমনকি আধুনিক ইউরোপ ও আমেরিকাতেও প্রথমদিকে দাস প্রথা স্বীকৃত প্রথার মর্যাদা পায়। ‘‘আহমদ, মুহাম্মদ শফিক ও মুহাম্মদ রুহুল আমীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০’’ এ থেকে অনুমিত হয় যে, এ প্রথাটির নৈতিকতা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রাথমিক কৃতিত্ব মহানবী সা. এরই প্রাপ্য।
মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মদ (সা.) সেই সপ্তম শতাব্দীতেই এ প্রথার বিরোধিতা ও এর বিলুপ্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। তাঁর দর্শন ছিল, সমগ্র মানব জাতি একজন নারী ও পুরুষ থেকে উদ্ভূত, সুতরাং জন্মগতভাবে সকল মানুষ সমান ও স্বাধীন।
তিনিই সর্বপ্রথম দাসমুক্ত করেন এবং দাসমুক্ত করাকে বিশেষ সওয়াবের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করলে সাহাবীদের মাঝে দাস মুক্তির হিড়িক পড়ে যায়। স্বয়ং নবী (সা.) ৬৭ জন, আবূ বকর (রা.) অসংখ্য, ওমর (রা.) এক হাজার, আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ত্রিশ হাজার দাস-দাসীকে মুক্তি দান করেন। মানুষে মানুষে এই সমতা বিধানের মহত্তম আদর্শ দেখে মুগ্ধ হয়ে উৎ. অযসধফ এড়ষধিংয তাঁর ”ঞযব জবষরমরড়হ ড়ভ ওংষধস” গ্রন্থে বলেন, ”ঊয়ঁধষরঃু ড়ভ ৎরমযঃ ধিং ঃযব ফরংঃরহমঁরংযরহম ভবধঃঁৎব ড়ভ ঃযব ওংষধসরপ ঈড়সসড়হবিধষঃয. অ পড়হাবৎঃ ভৎড়স ধহ যঁসনষব পষধহ বহলড়ুবফ ঃযব ংধসব ৎরমযঃং ধহফ ঢ়ৎরারষবমবং ধং ড়হব যিড়ফ নবষড়হমবফ ঃড় ঃযব হড়নষবংঃ কড়ৎধংরংয. ‘‘রহমান, মুহাম্মদ মতিউর, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯.
বর্তমানে দাসত্ব তথা দাস প্রথা উচ্ছেদ করার কথা সভ্য সমাজ মুখে বললেও এটিকে তারা বাস্তবে জিইয়ে রেখেছে। আমিরিকা তার সভ্যতা বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে, বহুতল বিশিষ্ট অট্টালিকা, সুরম্য জনপদ, প্রশস্ত সড়ক, বিশালাকার শিল্প-কারখানা ইত্যাদি নির্মাণে আফ্রিকা থেকে বহুসংখ্যক দাস আমদানি করে। সে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে এবং কিছুটা ভিন্ন আকারে। ১৭৭৬ সনের ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণার কথা বলতে গিয়ে ঈষধঁফব গ. খরমযঃভড়ড়ফ বলেন- ”ইষধপশ ৎবসধরহবফ ংষধাবং ঁহঃরষ ধনড়ঁঃ ৮০ ুবধৎং ষধঃবৎ, ড়িসবহ ফরফ হড়ঃ ৎবপরবাব ঃযব ৎরমযঃ ঃড় াড়ঃব ঁহরঃষ ১১২ ুবধৎং ষধঃবৎ ধহফ ঃযব ড়িৎশরহম পষধংং ফরফ হড়ঃ মবঃ ঃযব ষবমধষ ৎরমযঃ ঃড় ড়ৎমধহরহংব ধহফ পড়ষষবপঃরাবষু নধৎমধরহ ১৫০ ুবধৎং ষধঃবৎ. ‘‘প্রাগুক্ত’’
প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ইড়ংড়িৎঃয তাঁর ”গড়যধসসবফ ধহফ গড়যধসধফধহরংস” গ্রন্থে বলেন- ”ওঃ ৎবপড়মহরংবফ রহফরারফঁধষ ধহফ ঢ়ঁনষরপ ষরনবৎঃু, ংবপঁৎবফ ঃযব ঢ়বৎংড়হ ধহফ ঢ়ৎড়ঢ়বৎঃু ড়ভ ঃযব ংঁনলবপঃং ধহফ ঢ়ড়ংঃবৎবফ ঃযব মৎড়ঃিয ড়ভ ধষষ পরারপ ারৎঃঁবং. ওঃ পড়সসঁহরপধঃবফ ধষষ ঃযব ঢ়ৎরারষবমবং ড়ভ ঃযব পড়হয়ঁবৎরহম পষধংং ঃড় ঃযড়ংব ড়ভ ঃযব পড়হয়ঁবৎবফ যিড় পড়হভড়ৎসবফ ড়ভ রঃং ৎবষরমরড়হ, ধহফ ধষষ ঃযব ঢ়ৎড়ঃবপঃরড়হ ড়ভ পরঃরুবহংযরঢ় ঃড় ঃযড়ংব যিড় ফরফ হড়ঃ, ওঃ ঢ়ঁঃ ধহবহফ ঃড় ড়ষফ পঁংঃড়সং ঃযধঃ ৎিবৎব ড়ভ রসসড়ৎধষ ধহফ পৎরসরহধষ পযধৎপঃবৎ. ওঃ ধনড়ষরংযবফ ঃযব রহযঁসধহ পড়ংঃড়স ড়ভ নঁৎুরহয ঃযব রহভধহঃ ফধঁমযঃবৎং ধষরাব, ধহফ ঃড়ড়শ বভভবপঃরাব সবধংঁৎবং ভড়ৎ ঃযব ংঁঢ়ঢ়ৎবংংরড়হ ড়ভ ঃযব ংধষাব- ঃৎধভভরপ. ‘‘প্রাগুক্ত’’ (অসমাপ্ত)

ইসলামের আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তার আইন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আমেরিকার ঞযব উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব এর ১৩ বছর পর ১৭৮৯ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সের বিপ্লবীরা স্বৈরাচারী রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তারা ইত:পূর্বে যেইসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল সেগুলোকে অন্তর্ভূক্ত করে ১৭৮৯ সালের ২৬ আগষ্ট “উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ জরমযঃং ড়ভ সধহ ধহফ ড়ভ ঃযব পরঃরুবহ” নামক ঐতিহাসিকক ঘোষণাপত্র সম্পাদন করে। এতে বলা হয়Ñ গবহ ধৎব নড়ৎহ ধহফ ৎবসধরহ ভৎবব ধহফ বয়ঁধষ রহ ৎরমযঃং.” “উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ জরমযঃং ড়ভ গধহ ধহফ ড়ভ ঃযব ঈরঃরুবহ, অৎঃরপষব-১”। এতে স্বাধীনতা, সম্পত্তি, নিরাপত্তা, অন্যায়ের প্রতিবাদ, বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রভৃতি অধিকারের উল্লেখ ছিল। “ওনরফ, অৎঃরপষব-২. আমেরিকা ও ফ্রান্সের মানবাধিকারের এই প্রভাব ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে পুরো ইউরোপীয় মহাদেশকে গ্রাস করে ফেলে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সংবিধানে মানবাধিকার বিষয়টি স্থান করে নেয়। “ইধৎর, উৎ. ঊৎংযধফঁষ, ওনরফ, চ-২৩-২৪ ক্রমে মানবাধিকারের এই আন্দোলন এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃতি লাভ করে।
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা. কর্তৃক গৃহিত বাস্তব পদক্ষেপ :
১। হিলফুল ফুযুলের প্রতিষ্ঠা : মহানবী (সা.) এর আবির্ভাব ঘটে আরব দেশে এক বেদুঈন অঞ্চলে, যেখানে অতীতে কখনো নগর জীবনের নান্দনিকতা ও সভ্যতার ছোঁয়া লাগেনি। “অষ-অমমধফ অননধং গধযসঁফ অঃযৎ-ধষ অৎধন ঋরধষ- ঐধফধৎধঃ-ধষ টৎঁ নলুধয ঊমুঢ়ঃ : উধৎ ধষ-গধ-ৎরভ. চ-৫-৬” । এখানকার জাহিলী পরিবেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত সমাজে জাহিলিয়্যাত ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। মহানবীর (সা.) আগমনের সমসাময়িককালে মক্কার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব ছিল আবু জাহল, আবু লাহাব, উতবাহ, শায়বাহ প্রমুখের হাতে। মানবাধিকার সম্পর্কে তাদের স্বচ্ছ ধারণা ছিল না বলে প্রতিনিয়ত তাদের হাতে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত ও পর্যুদস্ত হচ্ছিল। এমনি এক বৈরী পরিবেশে আবির্ভূত হওয়ার পর মহানবী (সা.) লক্ষ্য করেন যে, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বহু সন্তান পিতৃহারা হয়, অগণিত নারী হয় স্বামী কিংবা পুত্রহারা। মানবাধিকার চরমভাবে লংঘিত হয় এই যুদ্ধ-বিগ্রহে। অসহায়-দুস্থ-দুর্গত লোকজন বঞ্চিত হয় তাদের প্রাপ্য অধিকার হতে, ইয়াতীম-নি:স্ব বিধবাও বঞ্চিত হয় তাদের ন্যায্য পাওনা হতে। অত্যাচারীদের দোর্দন্ড প্রতাপ দুর্বল অসহায় লোকদের সদা সন্ত্রস্ত করে রাখে। সুতরাং এই বিপর্যয়কর অবস্থা হতে উত্তরণের জন্য মাত্র ১৭ বছর বয়সে মহানবী (সা.) মানবাধিকারের কতিপয় ধারা সংযোজনপূর্বক ‘হিলফুল ফুযূল’ গঠন করেন, যার মূল বক্তব্য ছিল- সমাজ হতে অশান্তি দূর করা, পথিকদের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভাবগ্রস্তদের সাহায্য-সহযোগিতা করা, মজলুমের সাহায্যে এগিয়ে আসা এবং কোন অত্যাচারীকে মক্কায় আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়া। “আব্দুল, কাদের, ড. আ.ক.ম, সীরাতু সায়্যিদিল মুরসালীন, চট্টগ্রাম : ইসলামিয়া লাইব্রেরী, ২০০১. পৃ. ৩৫-৩৬”।
২। বায়আতুল আকাবার শপথ : হিজরতের অব্যবহিত পূর্বে মহানবী (সা.) হজ্ব উপলক্ষে ইয়াছরিব হতে মক্কায় আগত খাযরাজ গোত্রীয় লোকদেরকে আল-আকাবা নামক স্থানে যে বায়আত বা আনুগত্যের শপথ করান তাতে মানবাধিকারের মৌলিক কতিপয় ধারা লক্ষ্য করা যায়। মহানবী (সা.) বলেনÑ “তোমরা আমার হাতে এ বিষয়ে আনুগত্যের শপথ (বায়আত) কর যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যেনা-ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, কারো বিরুদ্ধে মনগড়া কোন মিথ্যা অপবাদ দিবে না”। “অনঁ-অনফঁষষধয ওংসধরষ ইঁশযধর, অং ঝধযরয উরষযর : কঁঃঁন কযধহধ জধংরফরুধয. ১৯৭৭ ঠঙখ-১, চ-৭. মহানবী (সা.) এর উক্ত বাণীতে ধর্ম পালনের অধিকার, সম্পদের অধিকার মান-মর্যাদাও সম্ভ্রমের অধিকার এবং জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
৩। মদীনা সনদের প্রবর্তন : ৬২২ খ্রি. মহানবী (সা.) যখন মক্কা হতে ইয়াছরিব তথা মদীনায় হিজরত করেন তখন মদীনায় তিন শ্রেণীর জনগোষ্ঠী বাস করতোÑ এক: একনিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায় দুই : মদীনার আদি মুশরিক তথা পৌত্তলিক সম্প্রদায় এবং তিন : মদীনার ইয়াহুদী সম্প্রদায়।
এ ধরণের একটি বহু জাতিক ও বহুধর্ম ভিত্তিক অঞ্চলে হিজরত করে মদীনার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রধান হিসাবে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে মহানবী (সা.) হিজরতের প্রথম বর্ষে একটি লিখিত সনদ জারী করেন। ইতিহাসে এটি ‘মদীনা সনদ’ নামে প্রসিদ্ধ। “আব্দুল কাদের, ড.আ.ক.ম, আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা ও মহানবী সা. জনকল্যাণমূলক আদর্শ রাষ্ট্র, ঢাকা : বি.আই.সি.এস, সীরাত সংকলন, ২০০২, পৃ. ২২-২৩”। আরবী ভাষায় জারীকৃত এই সনদে ৫৩টি ধারা বিদ্যমান ছিল, যার অনেকগুলো ধারাই ছিল মানবাধিকার বিষয়ক। এতে উল্লেখ করা হয় যে, মদীনায় বসবাসকারী সকল ইয়াহুদী এবং ইয়াছরিব ও কুরাইশের সকল মুসলিম জনগোষ্ঠী একটি স্বতন্ত্র জাতি এবং সকলে সমান নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ভোগ করবে। পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকবে এবং কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা যাবে না, কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে প্রচলিত প্রথা ও ন্যায়বিচার মোতাবেক রক্তপণ আদায় করতে হবে, কেউ বন্দী হলে ন্যায়বিচার মোতাবেক তাকে মুক্ত করতে হবে, দুর্বল ও অসহায়কে আশ্রয় দেয়া হবে এবং সর্বতোভাবে তাদের রক্ষা করা হবে, ঋণগ্রস্তদের ঋণের বোঝা লাঘব করা হবে, অত্যাচারী, পাপিষ্ঠ এবং সমাজে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সকলে অবস্থান গ্রহণ করবে, তারা কারো সন্তান কিংবা নিকটাত্মীয় হলেও। কোন অন্যায়কারীকে সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে না এবং কোন প্রকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। কেউ কারো অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, মহানবী (সা.) এর পূর্বানুমতি গ্রহণ ব্যতীত কেউ যুদ্ধে জড়িত হতে পারবে না, একজনের অপকর্মের জন্য অন্যজনকে দায়ী করা যাবে না, ইয়াহুদীদের মিত্ররাও সমান নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ভোগ করবে, বহি:শত্র“ দ্বারা মদীনা আক্রান্ত হলে একে রক্ষা করার জন্য সকলে সম্মিলিত প্রায়াস চালাবে। “আব্দুল, কাদের, ড.আ.ক.ম, মদীনা সনদ : একটি পর্যালোচনা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল অব ল, ১৯৯১, খ. ৪, পৃ. ২৫৭-২৬১”। এভাবে মদীনা সনদের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও গোত্রের মানুষের পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা বিধানের নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই প্রথম। সমাজের সকল শ্রেণীর নাগরিকের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম ও ধর্মীয় অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান এবং পরমত সহিষ্ণুতা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্প্রীতির উপর ভিত্তি করে রচিত মদীনা সনদ বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান বা শাসনতান্ত্রিক সরকারের মর্যাদা লাভ করে। “ঐধসরফঁষষধয, উৎ. গঁযধসফ, ঞযব ঋরৎংঃ ডৎরঃঃবহ ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ রহ ঃযব ড়িৎষফ, খধযড়ৎব : ঝযধয গঁযধসধফ অংযৎধভ, ১৯৮১, চ.৪”
৪। বিদায় হজ্বের অমোঘ ভাষণ : বিদায় হজ্বে প্রদত্ত মহানবী (সা.) এর ঐতিহাসিক ভাষণ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত। কোন আন্দোলন কিংবা সংগ্রামের মুখে নয়, কোন চাপের কাছে নত স্বীকার করে নেয়, সম্পূর্ণ নবুওয়তী দায়িত্ব ও কর্তব্যের খাতিরে স্বত:স্ফূর্তভাবে প্রদত্ত এই ভাষণে তিনি মানবাধিকার বিষয়ে যে সুস্পষ্ট বক্তব্য রাখেন তা অবিস্মরণীয়। তিনি বলেন, ‘আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর তোমাদের নিকট পবিত্র অনুরূপভাবে তোমাদের জীবন এবং সম্পদ ও পবিত্র’। “ঐধৎঁহ অনফঁং ঝধষধস (বফ) ঞধযলরন ংরৎধঃ ওনহ- ঐরংযধস, কঁধিরঃ : উধৎ-ধষ ইঁযঁঃয ধঃ ওংষধসরুধয, ১৯৮৪, চ, ৩২৫”।
রাসূল (সা.) আরো বলেন, কারো নিকট কোন সম্পদ গচ্ছিত থাকলে তা প্রকৃত মালিকের নিকট অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। জাহিলী যুগের সমস্ত সুদ প্রথা রহিত করা হল, কিন্তু মূলধন ফেরত পারবে।” “ওনরফ, চ.৩২৬”। “সম্মতি ও সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা অবৈধ। “ওনরফ, চ.৩২৭”। “জাহিলী যুগের সকল রক্তের প্রতিশোধ রহিত করা হল”। “ওনরফ, চ.৩২৬”। ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি মৃত্যুদন্ড, আর অনিচ্ছাকৃতভাবে হত্যার শাস্তি হল একশত উট রক্তপণ আদায়। “অষ-ঔধযরু-অসৎরহন ইধযৎ, করঃধন-অষ-ইধুধঃ ধিষ ঞধনুুধহ, ইধরৎঁঃ : উধৎ ধষ ঋরৎশৎ, ১৯৬৮, ঠড়ষ-১, চঁৎঃ-২, ৫৩”। মহানবী (সা.) কর্তৃক মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং (১৯৪৮) এর ৩, ৬ ও ১৭ নং অনুচ্ছেদে এবং সংবিধানের ৩২, ৪২, ৪২ (১) নং অনুচ্ছেদেও স্থান পেয়েছে।
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, “তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার রয়েছে। আবার তোমাদের উপরও তোমাদের স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হল তোমাদের বিছানায় তোমরা ছাড়া অন্য কেউ যেন না যায় এবং তারা যেন কোন অশ্লীল কাজ সম্পাদন না করে; তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর নির্দেশে তোদের সাথে দাম্পত্যের সম্পর্ক স্থান করে তাদেরকে নিজেদের জন্য বৈধ করেছ। “ঐধৎঁহ, অনফঁং ঝধষধস, ওনরফ, চ.৩২৬”। স্বামী-স্ত্রীর মানবাধিকার বিষয়টি জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপবষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং এর ১৬নং অনুচ্ছেদে এবং ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়াবহবহঃ ড়ভ ঈরারষ ধহফ চড়ষরঃরপধষ জরমযঃং (ওঈঈচজ) এর ২৩নং অনুচ্ছেদ স্থান লাভ করে।
মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সীমারেখা নির্ধারণ করে মহানবী (সা.) বলেন “এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। আর মুসলিম জাতি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।
অতএব, পারস্পরিক সম্মতি ও সন্তুষ্টি ব্যতীত কোন মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা বৈধ নয়”। “ওনরফ, চ.৩২৭”। মহানবী (সা.) আরো বলেন, “তোমাদের রব এক এবং তোমাদের পিতা এক। সকলকে আদম থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে আর আদম (আ.)কে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। “অষ-ঔধযরু-অসৎরহন ইধযৎ, শরঃধন- অষ-ইধুধহ ধিষ ঞধনুুধহ. চ. ১৬”। এভাবে ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধকে অনেক ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে। ঋুুবব বলেন, ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা কেবল প্রচার-প্রোপাগান্ডার মধ্যেই সীমিত নয়; বাস্তব জীবনেও তা অনুসরণের তাগিত দেয়া হয়। বস্তুত ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ইসলামের চিরন্তন সোনালী অধ্যায়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংগ। “ঋুুবব, অংধষভ, অ.অ., ঙঁঃ ষরহবং ড়ভ গড়যধসসধফধহ খধ,ি খড়হফড়হ : ঙীভড়ৎফ টহরাবৎংরঃু চৎবংং, ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ, চ.১৩.”। জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং-এর ১নং অনুচ্ছেদে মানুষের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বসূলভ আচরণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
দাস-দাসীদের সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, “তোমরা দাস-দাসীদের ব্যাপারে সাবধান থাকবে। তারা তোমাদেরই ভাই। তোমরা যা খাবে তাদেরকেও তা খেতে দেবে, তোমরা যা পরবে, তাদেরকেই তা পরতে দেবে। তাদের ্পর কোন প্রকার নির্যাতন চালাবে না, তাদের মনে আঘাত দিবে না।” “ইঁশযধৎর, অনঁ অনফঁষষধয ওংসধরষ, ওনরফ, ঠড়ষ, ১, চ, ৯ ”। শুধু তাই নয়, মহানবী সা. স্বীয় দাস যায়েদকে মুক্ত করে দিয়ে নিজের প্রতিপাল্য হিসেবে গ্রহণ করে দাসদেরকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছেন। জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং- এর ৪নং অনুচ্ছেদে এবং ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ড়ভ পরারষ ধহফ ঢ়ড়ষরঃরপধষ জরমযঃং (ওঈঈচজ) এর ৮নং অনুচ্ছেদেও দাসত্বের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
বংশ কৌলিণ্য ও বর্ণবাদ বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেন, “কোন অনারব ব্যক্তির ওপর কোন আরববাসীর এবং কোন কৃষ্ণাঙ্গের উপর কোন স্বেতাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের একমাত্র মাপকাঠি হল তাকওয়া।” “অষ-ঔধযরু-অসৎরহন ইধযৎ, শরঃধন- অষ- ইধুধহ ধিষ ঞধনুুধহ, চ-৫৪”। উক্ত বক্তব্যে মহানবী (সা.) বংশ কৌলিন্য বর্ণবাদ প্রথাকে স্থান দেননি।
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঞযব উবপষধৎধঃরড়হ ড়হ ঃযব ঊষবসরহধঃরড়হ ড়ভ ধষষ ভড়ৎসং ড়ভ জধপরধষ উরংপৎরসরহধঃরড়হ এর অনুচ্ছেদ-এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য হল মানব মর্যাদার বিরুদ্ধে একটি অপরাধ এবং তা টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ঈযধৎঃবৎ ঃযব ঁহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং এর পরিপন্থী এবং জাতিসমূহের বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানের পথে বাধা স্বরূপ। “বেরা মন্ডল ও মো. শাহজাহান মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১-১১২”।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে মানবাধিকার : বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ঘোষিত ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং- এর উত্তরাধিকার লালন করছে। বিশ শতকের প্রথম থেকেই মানব সভ্যতা অত্যন্ত অসহায়ভাবে দুটো ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে। মানবাধিকারের ললাটে কালিমা লেপন করে এতে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ নারী-পুরুষ- শিশু বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। অতঃপর ভার্সাই চুক্তি ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তুপের উপর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। “আহমদ, ড. এ.বি. এম শামসুদ্দীন, মদীনা সনদের আলোকে মানবাধিকার ঘোষণা, তা.বি.পৃ. ৮০”। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একনায়কত্ব ও ফ্যাসিবাদের ভয়াবহতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলার প্রেক্ষাপটে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ভয়াবহতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলার প্রেক্ষাপটে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সৃষ্টিকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম মানবাধিকারের প্রতি বিশ্বসমাজের উৎকণ্ঠা প্রকাশ পায়। ফলে নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি আন্তর্জাতিক চেতনা সৃষ্টি হয়। যার ফলশ্র“তিতে ১৯৪৫ সালে সানফ্রান্সিসকো শহরে জাতিসংঘের সনদ প্রণয়নকালে এর স্থপতিগণ মৌলিক মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও মানুষের মর্যাদার প্রতি তাঁদের আস্থা ব্যক্ত করেন। “রেবা মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮-৩১”।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সভায় ৩০টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত যে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয় তার ৩ থেকে ২১ পর্যন্ত অনুচ্ছেদসমূহে ১৯টি নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার স্থান পেয়েছে এবং এর ২২ থেকে ২৭ পর্যন্ত অনুচ্ছেদসমূহে ৬টি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। মানবাধিকারের এই সর্বজনীন ঘোষণা গৃহীত হওয়ার পর স্বাধীনতা প্রাপ্ত প্রায় সকল রাষ্ট্রের সংবিধানে উক্ত ঘোষণাপত্রে বর্ণিত মানবাধিকার সমূহ মর্যাদা সহকারে স্থান পেয়েছে। জাতিসংঘ তার সদস্য রাষ্ট্রসমূহের জন্য মানবাধিকারের এই সনদ অনুসরণ বাধ্যতামূলক করে নি। কিন্তু এটি অনুমোদন লাভ করার পর সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে এতে স্বেচ্ছামূলক করে নি। কিন্তু এটি অনুমোদন লাভ করার পর সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে এতে স্বেচ্ছামূলক স্বাক্ষর প্রদানপূর্বক নিজ নিজ দেশে তা বাস্তবায়নের আহবান জানানো হয়। কোন দেশ এই সনদ কতটুকু অনুসরণ করছে তা পর্যবেক্ষণ ও এ সম্পর্কিত রিপোর্ট প্রদানের জন্য জাতিসংঘ একটি স্থায়ী মানবাধিকার কমিশন গঠন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই কমিশনের শাখা রয়েছে যার মাধ্যমে জাতিসংঘ তার সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মানবাধিকার বিষয়ক যাবতীয় রিপোর্ট অবহিত হয়। (অসমাপ্ত)

হযরত শাহজালাল (রহ.)’র ভক্ত ও উত্তরাধিকারী হিসেবে আমাদের করণীয়

রুহুল ফারুক

উপমহাদেশের অন্যতম মুবাল্লিগ, মুত্তাকী, ওলিকূল শিরমণি মহান দরবেশ হযরত শাহজালাল মজররদ ইয়ামেনী (রহ.) ১৩০৩ খৃষ্টাব্দে শুভাগমন করেন। ২৬ শাওয়াল ৭০৩ হিজরীতে দ্বীনের ঝান্ডা তুলেন ও সিলেট ফতেহ, বিজয় করেন। (দলিল : শিলালিপি, বিশ্বপর্যটক ইবনে বতুতার সফর নামা)
মহান ওলির আগমনের পর থেকে ধনী-গরীব, সাদা-কালো, নারী-পুরুষ, হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, সুখী-দুখী, শ্রমিক- মেহনতি, নবাব, রাজা, বাদশাহ, উজির, নাজির রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, কর্মকর্তা, কর্মচারী সহ সর্বস্তরের মানুষ দরগাহ শরীফে আসেন। এই মহান ওলির প্রতি মানুষের এত আকর্ষণের কারণ চুম্বক যেভাবে লোহাকে নিজের দিকে টানে, উনার মাঝে এরূপ অনেক গুণাবলী থাকায় মানুষ আকৃষ্ট হয়। বিশেষ করে আল্লাহর মাহবুব বান্দা হিসেবে রহমত প্রাপ্ত হয়েছেন। যার ফলে বিগত ৭১৫ বৎসরে উনার জীবন ও কর্মের প্রভাবে, আল্লাহর রহমতে সিলেট তথা বাংলাদেশে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ সহ-অবস্থান, সহ মর্মীতা বজায় রেখে জীবন যাপন করেছেন। দ্বীন আল ইসলামের প্রচার, প্রসার, হয়েছে, মসজিদ, মাদরাসা হয়েছে। হযরত শাহজালাল (রহ.) নামে (১) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (২) হযরত শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লি. (৩) হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর (৪) শাহজালাল সার কারখানা (৫) মাসিক শাহজালাল (গভ: রেজি: নং ১০৪) (৬) হযরত শাহজালাল (রহ.) নামে অনেক মসজিদ ও মাদরাসা, (৭) হযরত শাহজালাল (রহ.) নামে অনেক আবাসিক এলাকা (৮) হযরত শাহজালাল (রহ.) নামে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্টান (৯) হযরত শাহজালাল (রহ.) কে নিয়ে গবেষণা ও তিনটি থিসিস হয়েছে, আরোও হচ্ছে, শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে আমরা হযরত শাহজালাল (রহ.) জীবনের বিভিন্ন দিকগুলি জানার চেষ্টা করি তাহলে শিক্ষা গ্রহণ, বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
১। আল্লাহর মহব্বত (দলিল: সুরা : বাকারা : আয়াত ১৬৫) :
পৃথিবীতে বনী আদমের সন্তানরা, তথা যে কোন মানুষ যে কোন কাজ করার সময় একটি উদ্দেশ্য- লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করেন, একটি স্বার্থ থাকে, একটি আকর্ষণ থাকে, একটি চাওয়া পাওয়া থাকে। হযরত শাহজালাল (রহ.) জীবনের এই চাওয়া পাওয়া, এই আকর্ষণ, এই স্বার্থ এই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল আল্লাহর মহব্বত। (দলিল : সূরা বাকারা : আয়াত : ১৬৫)। আল্লাহর মহব্বতে নবী রাসূলগণ কাজ করে গেছেন। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, আল্লাহর হাবীব হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর মহব্বতে কাজ করে গেছেন, খলিফায়ে রাশেদীন, তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়ীন, উলামায়ে দ্বীন, পীর মাশায়েখগণ আল্লাহর মহব্বতে কাজ করে গেছেন। হযরত শাহজালাল (রহ.) সুদুর ইয়েমেনের সানা শহরে জন্ম গ্রহণ করে মুর্শিদ হযরত সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.) এর নির্দেশে আল্লাহর মহব্বতে বাড়ি-ঘর, এলাকা, দেশ, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে দ্বীন-আল ইসলামের (দলিল : সুরা : আল-ইমরান : আয়াত : ১৯) কাজে আত্মানিয়োগ করেন। সুতরাং যে আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন; যার কাছে জীবনের সময়সীমা শেষ হলে, মৃত্যু হলে আবার ফিরে যাব সেই আল্লাহর মহব্বতে নিজের সকল কাজ করি; নিজের জীবনকে সফল করি।
২। আল্লাহর রাসূল হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর মহব্বত : (দলিল : সূরা : তওবা ২৪)
হযরত শাহজালাল (রহ.) আখেরী নবী ও রাসূল, আল্লাহর হাবীব হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.)’র প্রতি গভীর মহব্বত রাখতেন। সুতরাং আমরা এই ওলির ভক্ত, অনুসারী ও উত্তরাধীকারী হিসেবে হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর প্রতি মহব্বত রাখি, অনুগত্য করি, ছুন্নতের আমল করি, ছুন্নতের পাবন্দি হই।
৩। হক্্কুল্লাহ (দলিল : সূরা : নুর : আয়াত : ৬২, সূরা হুজুরাত : আয়াত : ১৪) :
হযরত শাহজালাল (রহ.)’র জীবন, কর্ম ও মিশনের প্রধান দুটি দিক ছিল (১) হক্্কুল্লাহ (২) হক্্কুল এবাদ। অর্থাৎ তিনি আল্লাহর রাস্তায় কাজ করেছেন। আল্লাহর হক আদায় করেছেন। আল্লাহর দেয়া দ্বীন আল ইসলামের জন্য সারা জীবন সাধনা করেছেন। বিশেষ করে ঈমান এনে ঈমানের হক আদায় করেছেন।
উল্লেখ্য যে, যিনি ঈমান আনলেন তিনিই মোমীন (দলিল : সূরা হুজুরাত : আয়াত : ১৫)। সুতরাং আল্লাহর উপর ঈমান আনার সাথে সাথেই একজন মোমীন আল্লাহর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে যান। অর্থাৎ আল্লাহ খালিক সৃষ্টিকর্তা এবং মোমীন মাখলুক (সৃষ্ট জীব) হিসাবেÑ
আক্্দ হয় চুক্তিপত্র (ধমৎববসবহঃ), অঙ্গীকার বদ্ধ হন। (দলিল : সূরা : মরিয়ম : আয়াত : ৯)
বাইয়্যাত (ক্রয়-বিক্রয় = ঝধষব – ঢ়ঁৎপযধংব) হয়। (দলিল : সূরা : ফাতহ : আয়াত : ১০)
এই ক্ষেত্রে হযরত শাহজালাল (রহ.) ঈমানের পরীক্ষায় যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে সারাজীবন পালন করে নিজেকে এক মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন; আসুন আমরাও আল্লাহর উপর ঈমানের ভিত্তিতে, আল্লাহর মহব্বতে, হযরত শাহজালাল (রহ.) এর ভক্ত হিসেবে দ্বীন আল ইসলামের ৫টি মৌলিক বিধিমালা পালন করি।
ফরজ ঈমানের বিধিমালা (দলিল : সূরা বাকারা : আয়াত ২, ৩, ৪, ২৮৫, ২০৮, ৬২, ২৫৬), (সূরা আল-ইমরান : আয়াত : ৮৪, ১৭৯, সূরা : নূর : আয়াত : ৬২, সূরা : তাগাবুন : আয়াত : ৮)
ফরজ সালাতের বিধিমালা (দলিল : সূরা বাকারা আয়াত : ৪৩, ৪৫, ১১০, ২৩৮)
ফরজ সাওমের বিধিমালা (দলিল : সূরা বাকারা : আয়াত : ১৮৩, ১৮৫)
ফরজ যাকাতের বিধিমালা (দলিল : সূরা তাওবা : আয়াত : ৬০, সূরা রুম : আয়াত: ৩৯)
ফরজ হজ্বের বিধান (দলিল : সূরা বাকারা : আয়াত ১৯৫, ১৯৬, ১৯৭, ১৫৮)
আসুন এই বিধিমালা অনুসরণ করে আমরা নিজেদেরকে কামিলিয়াতের দরজায় নিয়ে যাই।
হক্্কুল এবাদ (দলিল : সূরা : আল- ইমরান : আয়াত : ১১০) :
হযরত শাহজালাল (রহ.) হক্্কুল এবাদ তথা মানুষের হক আদায় করেছেন, আল্লাহর সৃষ্ট জীবের হক আদায় করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি মানুষের কল্যাণের জন্যই, মানুষের সেবার জন্যই দেশ থেকে দেশান্তরে গেছেন। এ সম্পর্কে আল-কোরআনে আল্লাহপাক নির্দেশ দিচ্ছেন “এবং তোমাদের মধ্যে এরূপ উম্মত হওয়া উচিত যারা কল্যাণের দিকে আহবান করে এবং ভাল কাজের আদেশ করে ও মন্দ কাজে নিষেধ করে আর তারাই সুফল প্রাপ্ত হবে।” [সূরা : আল-ইমরান : আয়াত ১০৪]। এই আয়াতের আলোকেই হযরত শাহজালাল (রহ.) পূর্ণ জীবন কাজ করেছেন এবং সুফলপ্রাপ্ত হয়েছেন বিধায় ৭১৫ বছর পরও সিলেট সহ সারা বাংলাদেশে উনার প্রতি শ্রদ্ধা, স্মরণ, অনুসরণ ও প্রভাব বিস্তার করছে। এ বিষয়ে একটি জ্বলন্ত উদাহরণ আজও সিলেটে প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত আছে, তা হচ্ছে একজন কাঠুরিয়ার মেয়ের বিবাহের আয়োজন এবং যে টিলা থেকে তিনি কাঠ কেটে এনেছিলেন তা সিলেটের এয়ারপোর্ট রোডে মালনীছড়া ও লাক্কারতুড়া চা বাগানের মধ্যস্থানে অবস্থিত যা সরকারীভাবে নির্ধারিত।
৫। দাওয়াত (দলিল : সূরা : নাহল : আয়াত ১২৫)
হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সবাই আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। হযরত শাহজালাল (রহ.) নায়েবে রাসূল হিসাবে সারা জীবন দাওয়াত দিয়েছেন। (দলিল : সূরা হা-মীম সিজদাহ : আয়াত : ৩৩; সুরা ইউসুফ : আয়াত : ১০৮)। আসুন আমরা ভক্ত হিসেবে দাওয়াতের কাজ করি।
৬। জীবনের নিয়ত : (দলিল : সূরা : আনআ’ম : আয়াত : ১৬২)
হযরত শাহজালাল (রহ.) এর জীবনের নিয়ত ছিল আল্লাহর মহব্বত অর্জন করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাই আসুন আমরাও উনার ভক্ত, অনুসারী হিসাবে জীবনের নিয়ত করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করি, রেজা-ই- এলাহী (খড়াব ড়ভ উরারহব) অর্জন করি। দলিল (সূরা আন-আম : আয়াত :১৬২,৭৯, সূরা বাকারা : আয়াত ১৬৫, ২০৭, সূরা লাইল : আয়াত ২০-২১, সূরা ইয়াসিন : আয়াত : ২৩, সূরা যারিয়াত : আয়াত ৫৬, সূরা : যুমার : আয়াত: ১১)
৭। সফল মোমীন (দলিল : সূরা : আল-মুমিনুন : আয়াত : ১-১১) :
হযরত শাহজালাল (রহ.) ছিলেন একজন সফল মোমীন, আসুন আমরা উনার ভক্ত, অনুসারী হিসাবে সফল মোমীন হওয়ার জন্য কোরআনের আয়াত ও নির্দেশনা পালন করি। (দলিল : সূরা : মুমিনুন : আয়াত : ১-১১, সূরা : নুর : আয়াত ৫১, সূরা হুজুরাত : আয়াত ১০, ১১, ১৫, সুরা : আনফাল : আয়াত ২, ৬, ৪, ৭৪, সূরা : তাওবা : আয়াত : ৭১, সুরা : রা’দ : আয়াত : ২৮)
৮। তাকওয়া > মুত্তাকী (দলিল : সূরা বাকারা : আয়াত ২-৪)
হযরত শাহজালাল (রহ.) নিঃসন্দেহে একজন তাকওয়াবান, মুত্তাকী ছিলেন। আধ্যাত্মিক সাধনায় যারা অগ্রবর্তী, সফলকাম, তারা তাকওয়ার পথ অবলম্বন করেন। তাকওয়া ছাড়া কামিলিয়াত হাসিল করা সম্ভব নয়। কারণ তাকওয়া আরবী শব্দ ওয়াকয়া থেকে এর উৎপত্তি। আভিধানিক অর্থে আত্মসুদ্ধি, বিরত থাকা, নিজেকে সকলপ্রকার ক্ষতি থেকে রক্ষা করা, সাবধান হওয়া, শয়তানের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য ও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে কাজ করে, আল্লাহর শাস্তি পাওয়াকে ভয় করা অর্থাৎ গুনাহ করলে আল্লাহর আজাব বা শাস্তি পেতে হবে এরই ভয় করা। বিধায় যারা আল্লাহর আশিক তারা তাকওয়ার তরিকা অবলম্বন করেন। এজন্য হযরত শাহজালাল (রহ.) একজন উঁচুদরের মুত্তাকী ছিলেন। বিশেষ করে জানা যায় উনি মৃত্যুর আগে নসিহত করে গেছেন যে তোমরা তাকওয়ার পথ অবলম্বন কর। দলিল : সূরা : তাওবা : আয়াত : ১১৯, সূরা হাশর : আয়াত ১৮, সূরা নুর : আয়াত ৫২, সূরা ইমরান : আয়াত ১০২, সূরা মূলক : আয়াত ১২, সূরা মায়েদা : আয়াত ২, সূরা নাহল আয়াত ১২৮, সূরা হুজুরাত আয়াত ১৩।
৯। ইতা’য়াত (দলিল : সূরা নিছা : আয়াত : ৫৯) :
ইতা’য়াত আরবী শব্দ এর অর্থ আনুগত্য করা; এর বিপরীত শব্দ মাছিয়াত অর্থ অমান্য করা। হযরত শাহজালালাল (রহ.) আল্লাহর এবং আল্লাহর রাসূলের মহব্বতে আনুগত্য করেছেন; দ্বীনের কাজ করেছেন। আসুন আমরাও তার ভক্ত হিসাবে ইতা’য়াত করি; মাছিয়াত থেকে বেঁচে থাকি।
(দলিল : সূরা : আল-ইমরান : আয়াত : ১৩২, সূরা নুর : আয়াত : ৫২, সূরা নিছা : আয়াত : ১৩, ৮০, ৬৯)
১০। লিবাস-উত-তাকওয়া : (দলিল : সূরা : নুর : আয়াত : ৩০) :
হযরত শাহজালাল (রহ.) আধ্যাত্মিক জগতে উন্নতী করায় অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে লিবাস-উত-তাকওয়া। প্রচলিত ভাবে লিবাছ বলতে পোষাক বুঝায়; যা দৃশ্যমান বা জাহেরী এবং লিবাস-উত-তাকওয়া অদৃশ্য বা বাতেনী এই জাহেরী লিবাস এবং বাতেনী লিবাস দুটিরই সম্পর্ক গভীরভাবে একত্রিত। এই লিবাস মানুষের ও পশুর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে; সুতরাং মানুষ হিসেবে নিজের মান, সম্মান, কল্যাণ, উন্নতির জন্য, লাজ-লজ্জা নিবারণের লিবাস ও লিবাস উত-তাকওয়ার পথ অবলম্বন করি। (দলিল : সূরা : নুর : আয়াত : ৩৯, ৫৯, ১৯, ৬০, সূরা : আরাফ : আয়াত : ২৬, সূরা : আহযাব : আয়াত : ৫৯, ৫৩, ৩২, ৩৩।)
উপসংহার : এই মহান ওলি, মুত্তাকী হযরত শাহজালাল (রহ.) এর আমি এক নগণ্য ভক্ত ও অনুসারী হিসাবে হযরতের নামে প্রকাশিত মাসিক শাহজালাল পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক হিসাবে বিনীত অনুরোধ, আপনারা উপরোক্ত বিষয়গুলি নিজের লাভের জন্য, নিজের কল্যাণের জন্য, নিজের শান্তি, উন্নতি, ছোয়াবের জন্য পড়–ন, আমল করুন। (দলিল : সূরা : তাহরিম : আয়াত : ৬) [আমীন]
লেখক : সম্পাদক, মাসিক শাহজালাল।

ইসলামের আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তার আইন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ১৯৪৮-এর প্রস্তাবনাতে মানবাধিকারকে মানুষের সহজাত ও হস্তান্তরযোগ্য অধিকার হিসাবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে, দ…ৎবপড়মহরঃরড়হ ড়ভ ঃযব রহযবৎবহঃ ফরমহরঃু ড়ভ ঃযব বয়ঁধষ ধহফ রহধষরবহধনষব ৎরমযঃং ড়ভ ধষষ সবসনবৎং ড়ভ ঃযব যঁসধহ ভধসরষু রং ঃযব ভড়ঁহফধঃরড়হ ড়ভ ভৎববফড়স, লঁংঃরপব ধহফ ঢ়বধপব রহ ঃযব ড়িৎষফ’’ ”গ. গড়ংশড়রিঃং, ঐঁসধহ জরমযঃং ধহফ ঃযব ড়িৎষফ ড়ৎফবৎ টঝঅ : ঙপপধহধ ঢ়ঁনষরপধঃরড়হ, ঘবি ণড়ৎশ, অঢ়ঢ়বহফরী ১. চ. ১৯৯” ঞযব ঝড়পরধষ ড়িৎশ উরপঃরড়হধৎু- এর মতে দদঐঁসধহ জরমযঃং ধৎব ঃযব ড়ঢ়ঢ়ড়ৎঃঁহরঃু ঃড় নব ধপপড়ৎফবফ ঃযব ংধসব ঢ়ৎবৎড়মধঃরাবং ধহফ ড়নষরমধঃরড়হং রহ ঝড়পরধষ ভঁষভরষষসবহঃ ধং ধৎব ধপপড়ৎফবফ ঃড় ধষষ ড়ঃযবৎং রিঃযড়ঁঃ ফরংঃরহপঃরড়হ ধং ঃড় ৎধপব, ংবী, ষধহমঁধমব ড়ৎ ৎবষরমরড়হ’’ দদজড়নবৎঃ খ. ইধৎশবৎ, ঞযব ঝড়পরধষ ডড়ৎশ উরপঃরড়হধৎু, ঘধংি চৎবংং. ৩ফ বফরঃরধ, ১৯৯৫, চ-১৭৩’’।
মানবাধিকার কেবল মানুষের মৌল-মানবিক চাহিদা (ইধংরপ যঁসধহ হববফং) এর পূরণই নয় বরং তা হচ্ছে মানুষের সামগ্রিক উন্নয়ন, প্রতিভার বিকাশ, চিন্তা (ঃযড়ঁমযঃং), বিশ্বাস (নবষরবাব), ও সৃজনশীলতার লালন। বলা হয়েছে “ঐঁসধহ ৎরমযঃং ধৎব পড়হপবৎহবফ রিঃয ঃযব ফরমহরঃু ড়ভ ঃযব রহফরারফঁধষ-ঃযব ষবাবষ ড়ভ ংবষভ-বংঃববস ধহফ ংবপধৎবং ঢ়বৎংড়হধষ রফবহঃরঃু ধহফ ঢ়ৎড়সড়ঃবং যঁসধহ পড়সসঁহরঃু “হাসান, ড. মোস্তফা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫”। সমকালীন বিশ্বে মানবাধিকার এর এই ধারণা বিকাশ লাভ করেছে প্রধানত পশ্চিমা বিশ্বের রাষ্ট্র ও সমাজনীতি এবং বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিকতাবাদের আন্তঃরাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে জাতিসংঘের উদ্যোগে”।
মানবাধিকার ও তার পরিধি : মানবাধিকার বলতে মানুষের সেই সব স্বার্থকে বুঝায় যা অধিকারের নৈতিক বা আইনগত নিয়মনীতি দ্বারা সংরক্ষিত হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, রাষ্ট্র কর্তৃক এর নাগরিকদের জন্য স্বীকৃত ও প্রদত্ত কতিপয় সুযোগ-সুবিধাকে মানবাধিকার বলে যেগুলো ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য অপরিহার্য। “রেবা মন্ডল ও মো. শাহজাহান মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ১”। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব হওয়ার কারণে তার পক্ষে বিচ্ছিন্ন জীবন-যাপন সম্ভব নয়। তাই সামাজিক জীবনের উন্নতি ও অগ্রগতির ও বলিষ্ঠতার জন্য সমাজের এক সদস্যের প্রতি অন্য সদস্যের অনেকগুলো দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকে। এই দায়িত্বই হচ্ছে মূলত অধিকার। সুতরাং মানুষের প্রতি মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহই হল মানবাধিকার। জাতিসংঘ প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী মানবাধিকার হল মানুষের এমন কতগুলো জন্মগত অধিকার অনস্বীকার্য চাহিদা, যা মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তি ও বিবেককে পরিপূর্ণরূপে বিকশিত করার জন্য অতীব প্রয়োজন এবং সেগুলো মানুষের আত্মিক চাহিদা মেটায়। “জাতিসংঘ মানবধাকিার পঞ্চাশটি প্রশ্ন ও উত্তর ঢাকা : জাতিসংঘ তথ্য কেন্দ্র, পৃ. ০৫”। মূলত মানব পরিবারের সকল সদস্যের জন্য সর্বজনীন, সহজাত, হস্তান্তরযোগ্য ও অলংঘনীয় অধিকার হল মানবাধিকার। এসব অধিকার তিনভাগে বিভক্ত-
এক : অর্থনৈতিক অধিকার, যথা- ভাত, কাপড়, বাসস্থান, চিকিৎসা, জীবিকা অর্জন, সম্পত্তির মালিকানা লাভ ও সংরক্ষণ, জীবন ধারণের জন্য ন্যূনতম অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, যোগ্যতানুযায়ী কর্মসংস্থান এবং ধনীদের সম্পদে গরীব অনাথ ও নিরন্ন মানুষের অধিকার প্রভৃতি।
দুই : সামাজিক অধিকার, যথা- জাতি-ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে সমঅধিকার, মতামত প্রকাশ, জান-মালের নিরাপত্তা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, রাজনৈতিক তথা-নাগরিক অধিকার, সভা-সমিতি, সংগঠন ও জনমত গঠনের অধিকার, অবাধে ধর্ম-কর্ম সম্পাদনের অধিকার, আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার লাভের অধিকার এবং বিবাহ-তালাক ইত্যাদির অধিকার।
তিন : নৈতিক অধিকার, যথা-অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা, শ্লীলতার প্রসার ও অশ্লীলতা প্রতিরোধ, সৎকর্মের বিকাশ ও অসৎকর্মের বিনাশ, পিতা-মাতা ও বয়ো: জ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, ছোটদের প্রতি ¯েœহ মমতা প্রদর্শন, সমাজের দরিদ্র, অসহায়, বিধবা, ইয়াতীম, অধিকার বঞ্চিত- মজলুম মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন, অতিথি- মুসাফিরদের আদর-আপ্যায়ন এবং সকল মানুষের প্রতি সৌজন্য আচরণ ইত্যাদি। “রহমান, মুহাম্মদ মতিউর, ইসলামে মৌলিক মানবাধিকার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩”। বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার বলতে সেই সব অধিকারকে বুঝায় যা ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণায় (ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং) উল্লেখ করা হয়েছে। ৩০টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত এই ঘোষণায় ২৫টি মানবাধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯টি নাগরিক ও রাজনৈতিক এবং ৬টি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক। “আব্দুল কাদের, ড. আ.ক.ম. মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) প্রেক্ষিত বর্তমান বিশ্ব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৯”।
বিশ্বপ্রেক্ষিত ও মানবাধিকার : ১৮শ শতকের ফরাসী দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাঁ রুশো বলেন, গধহ রং নড়ৎহ ভৎবব, নঁঃ বাবৎুযিবৎব যব রং রহ পযধরহ, অর্থাৎ, মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, কিন্তু সর্বত্রই সে শৃংখলাবদ্ধ। “প্রাগুক্ত”। যুগে যুগে দূর্বল শ্রেণীর মানুষের ওপর সবলদের নিয়ন্ত্রণ এবং মুষ্টিমেয় শাসক শ্রেণী কর্তৃক বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর উপর শাসন-শোষণের বন্ধনকে সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে বহুবিধ নিয়ম-নীতি আরোপের কারণে সাধারণ মানুষ তাদের প্রকৃতি ও স্বভাবের সাথে জড়িত অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিল। ফলে মানবিক বিকাশের স্বাভাবিক ধারা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই মানুষকে সংগ্রাম করতে হয় শৃংখল মুক্তি তথা মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য।
“রাষ্ট্রের উৎপত্তির পূর্বেই কি অধিকারের জন্ম হয়েছে না কি রাষ্ট্রই অধিকার সৃষ্টি করেছে” রাজনীতি বিজ্ঞানের এটি বিতর্কিত বিষয়। ঔড়যহ খরপশব এর মতে, মানুষ স্বভাবতই কিছু অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার অধিকারসহ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার মানুষের অস্তিত্বের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। “প্রাগুক্ত”। আধুনিক রাষ্ট্রের উদ্ভবের আগে প্রাক-রাষ্ট্রীয় যুগেও মানুষ কিছু প্রাকৃতিক অধিকার (ঘধঃঁৎধষ জরমযঃং) ভোগ করতো। পরবর্তীকালে রাষ্ট্র কেবল সেই সব অধিকারকে অনুমোদন, সংরক্ষণ ও ভোগের নিশ্চিয়তা দিয়েছে মাত্র। পক্ষান্তরে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রাকৃতিক অধিকার ভোগ করার এই ধারণার প্রতি তেমন গুরুত্ব দেন না। তাঁদের মতে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে মানুষের পক্ষে কোন অধিকার ভোগ করা সম্ভব নয়। কেননা, রাষ্ট্র অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা না দিলে সে অধিকার অর্থহীন। সুতরাং রাষ্ট্র তথা নাগরিকদের জন্য বহুবিধ রাষ্ট্রীয় আইনই অধিকার সৃষ্টি করে এবং তা ভোগ করার নিশ্চয়তা দেয়। “রহমান, মুহাম্মদ হাবীবুর, অধিকার, কর্তব্য ও উন্নয়ন’ মানবাধিকার ও উন্নয়ন সমীক্ষা, ঢাকা: ১৯৯১, পৃ. ৬৩-৬৪”। বস্তুত মানবাধিকার ব্যক্তির মর্যাদা সম্মানের সাথে জড়িত একটি বিষয় যা মানব সমাজের নৈতিক মানদন্ডকে প্রকাশ করে। অতএব এটি কেবল ব্যক্তির কর্মক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নয়, গোটা বিশ্ব সমাজের মান-মর্যাদা বৃদ্ধির জন্যও প্রয়োজন। সুতরাং একে সমুন্নত রাখার দায়িত্ব কেবল ব্যক্তির নয়, বিশ্বসমাজেরও। আর প্রতিটি রাষ্ট্র বিশ্বসমাজের এক একটি অঙ্গ হওয়ার কারণে এই মহান দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপরও বর্তায়।
মানবাধিকার আইন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : মানবাধিকারের ধারণা যেহেতু মানুষ অতি প্রাচীনকাল থেকেই পোষণ করে আসছে, তাই এটি সংরক্ষণের বিষয়েও বিশ্বসমাজ তাদের চিন্তায় ত্র“টি করেনি। অদ্যাবধি প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রাচীনতম লিপিবদ্ধ আইন হল ব্যাবিলনের রাজা হাবুরাবী কর্তৃক প্রণীত “ব্যাবিলনীয় কোড” বা ‘হামুরাবী কোড’ “প্রণয়নকাল-আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২১৩০-২০৮৮ সাল)। লিখিত আইনের সূচনা হিসাবে এই কোড বিশেষ মূল্য বহন করে। এতে মানবাধিকার সংরক্ষণের কথা পাওয়া যায়। এছাড়াও প্রাচীন গ্রীস ও রোমের সরকার পরিচালনা, নির্বাচন, বিচার ব্যবস্থা প্রভৃতি ক্ষেত্রেও নাগরিকদের অংশগ্রহণের অধিকার প্রয়োগের প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। “বেরা মন্ডল ও মো. শাহজাহান মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫”। খ্রিস্টীয় ৭ম শতকে মানুষের অধিকার সংরক্ষণে ইসলাম অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, মহানবী (সা.) এর সুন্নাহ ও হাদীস এবং “মদীনা সনদ” ও “বিদায় হজ্বে” প্রদত্ত মহানবী (সা.) এর ভাষণ মানবাধিকার তথা মানুষের অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করেছে।
কিন্তু পরবর্তীতে মানুষ যখন ইসলাম এবং মহানবী (সা.) এর শিক্ষা ও আদর্শ হতে বিচ্যুত হয় এবং মানুষ যখন শাসক শ্রেণী হতে তাদের প্রাপ্য অধিকার হতে বঞ্চিত হয়, তখন তারা অধিকার আদায়ে সোচ্চার ও প্রতিবাদী হয়েছে এবং আন্দোলনের মাধ্যমে শাসক শ্রেণীকে বাধ্য করেছে তাদের প্রাপ্য অধিকার করতে। ফলে শাসক শ্রেণী ও জনগণের মাঝে সম্পাদিত হয়েছে বিভিন্ন চুক্তি ও দলীল, যাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে মানুষের অধিকার। ১১৮৮ খ্রিস্টাব্দে আইবেরিয়ান-ব-দ্বীপে সামন্ত প্রভু ও অভিজাত ব্যক্তিদের এক সভায় রাজা আলফসনের নিকট থেকে অভিজাত শ্রেণী ব্যক্তি স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা, জীবনের মর্যাদা, বাসস্থান ও সম্পদের অলংঘনীয়তা প্রভৃতি কিছু অধিকার আদায় করে নেয়। “প্রাগুক্ত”। হাঙ্গেরীর রাজা দ্বিতীয় এন্ড্রু ১২২২ খ্রিস্টাব্দে ‘স্বর্ণ আদেশ’ দ্বারা ঘোষণা দেন, তিনি আমীর ওমারা ও অভিজাত শ্রেণীর জন্য বেশ কিছু অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করবেন। তিনি অধিকারসমূহের এক দীর্ঘ তালিকা প্রণয়ন করেন এবং তা কার্যকর করার পদ্ধতিও ঘোষণা করেন। “প্রাগুক্ত”।
ইংল্যান্ডে মানবাধিকার বিকাশের ক্ষেত্রে ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা জন কর্তৃক সম্পাদিত গধমহধ ঈধৎঃধ কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলীল হিসাবে গণ্য করা হয়। প্রাথমিকভাবে এই চুক্তি রাজা ও ব্যারনদের মাঝে সম্পাদিত হলেও ৬৩টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত এই দলীলকে পরবর্তীতে ঈযধৎঃবৎ ড়ভ ঊহমষরংয খরনবৎঃরবং এবং বর্তমানে মানবাধিকার ও মুক্ত সরকারের ইতিহাসে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। “ইধৎর, উৎ. গ. ঊৎংযধফঁষ, ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়হপবৎহ ভড়ৎ ঃযব চৎড়সড়ঃরড়হ ধহফ চৎড়ঃবপঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং, উযধশধ : উযধশ টহরাবৎংরঃু ঝঃঁফরবং চধৎঃ ঋ, ঠঙখ ওও (র) চ- ২১” সপ্তদশ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা কর্তৃক নাগরিকদের সনাতন অধিকার খর্ব করার প্রতিবাদে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয় তারই ফলশ্র“তিতে প্রণীত হয় ১৬২৮ সালে ঞযব চবঃরঃরড়হ ড়ভ জরমযঃং ও ১৬৮৯ ঞযব ইরষষ ড়ভ জরমযঃং নামক দুটি গুরুত্বপূর্ণ দলীল। মানবাধিকার সম্বলিত এ দু’টি দলীল একদিকে যেমন রাজার একচ্ছত্র আধিপত্য ও ক্ষমতাকে খর্ব করেছে, অপরদিকে পার্লামেন্ট ও আদালতের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে এই প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করা হয়েছে। খড়ৎফ ঈযধঃযধহ উক্ত গধমহধ ঈধৎঃধ, ঞযব চরঃরঃরড়হ ড়ভ জরমযঃং ঞযব ইরষষ ড়ভ জরমযঃং এই তিনটি দলীলকে ঞযব ইরনষব ড়ভ ঃযব ঊহমষরংয ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ নামে অভিহিত করেছেন। “রেবা মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬-৭”। ১৮শ শতকের বিভিন্ন দার্শনিকের লেখা ও রচনায় এবং ১৬৮৮ সালের ইংলিশ বিপ্লব ও এর ফসল ১৬৮৯ সালের ঞযব ইরষষ ড়ভ জরমযঃং উত্তর আমেরিকা ও ফ্রান্সে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রেরণা যোগাতে প্রভূতভাবে সাহায্য করে। ব্রিটিশ কলোনী আমেরিকায় ব্রিটিশ রাজার শাসন-শোষণ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমেরিকানদের জয় লাভের ফলে আমেরিকাবাসী ১৭৭৬ সালের ১২ জুন ভার্জিনিয়াতে একটি ইরষষ ড়ভ জরমযঃং গ্রহণ করে, যার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়; “অষষ সবহ ধৎব নু হধঃঁৎব ভঁষষু ভৎবব ধহফ ওহফবঢ়বহবহঃ, ধহফ যধাব পবৎঃধরহ ওহযবৎবহঃ ৎরমযঃং, হধসবষু, ঃযব বহলড়ুসবহঃ ড়ভ ষরভব ধহফ ষরনবৎঃু, রিষষ ঃযব সবধহং ড়ভ ধপয়ঁরৎরহম ধহফ ঢ়ড়ংংবংংরহম ঢ়ৎড়ঢ়বৎঃু ধহফ ড়নঃধরহহরহম যধঢ়ঢ়রহবংং.” ২৫ এর মাত্র ২১ দিন পর ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকার ১৩টি কলোনীকে নিয়ে ঞযব উবপষধৎৎধঃরড়হ ড়ভ রহফবঢ়বহফবহপব তথা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণাপত্রের মুখবন্ধে মানবাধিকার প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়Ñ “ডব যড়ষফ ঃযবংব ঃৎঁঃযং ঃড় নব ংবষভ-বারফবহঃ, ঃযধঃ ধষষ সবহ ধৎব পৎবধঃবফ বয়ঁধষ, ঃযধঃ ঃযবু ধৎব বহফড়বিফ নু ঃযবরৎ ঈৎবধঃড়ৎ রিঃয পবৎঃধরহ রহ ধষরবহধনষব ৎরমযঃং, ঃযধঃ ধসড়হম ঃযবংব ৎরমযঃং ধৎব ষরভব, ষরনবৎঃু ধহফ ঢ়ঁৎংঁরঃ ড়ভ যধঢ়ঢ়রহবংং.” এতে আরো বলা হয়, এই সব অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য জনগণ যে সরকার তৈরি করে সেই সরকার যদি এই সব অধিকার খর্ব করে তবে সেই সরকার উৎখাত করে নতুন সরকার গঠন করা জনগণেরই অধিকার। “ইধৎর, উৎ. গ. ঊৎংযধফঁষ, ওনরফ, চ-২২,” । (অসমাপ্ত)

ইসলামের আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তার আইন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

সমগ্র বিশ্বব্যাপী আজ চলছে দানবীয় রাজত্ব। শৃংখলিত মানবতা প্রহর গুণছে মুক্তির। কিন্তু মুক্তি পরিবর্তে সৃষ্টি হচ্ছে নব নব সংকট। বাড়ছে অশান্তি। মরছে বনী আদম। ধ্বংস হচ্ছে জনপদ। ঠিক এমনি এক সমস্যা সংকুল পরিবেশে অজ্ঞানতা, অমানবিকতা, নির্লজ্জতা ও হিংস্রতার অক্টোপাশে আবদ্ধ মানব সভ্যতাকে রাহুমুক্ত করার এবং নতুন জীবনদানের অঙ্গীকার নিয়ে আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে এ পৃথিবীতে এসেছিলেন বিশ্ব মানবতার মহান শিক্ষক মুহাম্মাদুর রাসূল (সা.)। তাঁর সম্পাদিত মহাবিপ্লব সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে আজও এক বিস্ময়। সমগ্র বিশ্বের অকৃত্রিম দরদীবন্ধু ও অভিভাবক- এ মহান ব্যক্তিত্বের অতুলনীয় দর্শনের স্পর্শে অভিভূত হয়েছিল সমকালীন সমাজ ও পৃথিবী। কুরআনের ভাষায় তার সূর্যের মত উজ্জ্বল এবং চন্দ্রের মত স্নিগ্ধ আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে স্থান-কাল নির্বিশেষে গোটা মানবসভ্যতা। অথচ পবিত্র কুরআনে মানুষ হিসেবে মানুষের অধিকার সংরক্ষণ করে বহু আয়াত নাযিল হয়েছে। মহানবী (সা.) এর হাদীসে রয়েছে, মানবাধিকারের অসংখ্য উদাহরণ। ইসলামে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ প্রবন্ধে মানবাধিকারের পরিচয়, পরিধি, মহানবী (স.) এর গৃহীত পদক্ষেপ এবং বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকারের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে।
মানবাধিকার ও প্রাসঙ্গিক কথা : আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকার একটি বহুল আলোচিত বিষয়। মানবাধিকার বলতে সরলার্থে মানুষের সহজাত অধিকারই মানবাধিকার হিসেবে পরিচিত। যে সব মানবিক অধিকার ব্যতীত মানুষ পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে মর্যাদাসহ জীবনধারণ করতে পারে না, মানবিক গুণাবলি ও বৃত্তির প্রকাশ ও বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয় না সাধারণত সেগুলোই মানবাধিকার হিসেবে গণ্য। “রহমান, মুহাম্মদ মতিউর, “ইসলামে মৌলিক মানবাধিকার” ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, এপ্রিল-জুন, ২০০৩, পৃ. ৩৩”। যুগে-যুগে দেশে-দেশে বিত্তবান, ক্ষমতাধর শাসক শ্রেণী কর্তৃক দুর্বল, ক্ষমতাহীন, বিত্তহীন জনগোষ্ঠী শোষিত ও নির্যাতিত হয়ে আসছে। এ শোষিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত নিপীড়িত মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে আল্লাহ অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেন যাঁদের প্রত্যেকেই দানবরূপী শাসক শ্রেণী কর্তৃক অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। আল্লাহর নবীগণের সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পরও স্বৈরাচারী, দাম্ভিক শাসক শ্রেণী সাধারণ জনগণের মৌলিক অধিকারে কুঠারাঘাত করছে, বিশ্বমানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করছে, নির্বাসিত করেছে শান্তি-সমৃদ্ধিকে। তাই চরম উপেক্ষিত, বঞ্চিত ও শোষিত মানুষগুলো বাধ্য হয়ে তাদের মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।
মানবাধিকার সম্পর্কে তদানীন্তনকালের ব্যাবিলনের রাজা হামুরাবী সর্বপ্রথম খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ২১৩০-২০৮৮ সালে ‘ব্যাবিলনীয় কোড বা ‘হামুরাবী কোড’ এর মাধ্যমে মানবাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টিকে আইনগত রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন। “রেবা মন্ডল ও মো. শাহজাহান মন্ডল, মানবাধিকার আইন-সংবিধান ইসলাম, চট্টগ্রাম: ১৯৯৯, পৃ. ৪”। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে মহানবী (সা.) মানুষকে আল্লাহর খলীফা অভিধায় অভিহিত করে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন অতঃপর তিনি আল-কুরআনের নির্দেশনা এবং স্বীয় বাণী, কর্ম ও অনুমোদনের মাধ্যমে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, বিশ্বেও ইতিহাসে তা বিরল। “ড. আ.ক.ম আব্দুল কাদের, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (স.) প্রেক্ষিত বর্তমান বিশ্ব, আত্-তাকবীর, চট্টগ্রাম: সীরাতুন্নবী সংখ্যা ৮, ২০০২, পৃ. ৪৭”।
মানবাধিকার ও শাব্দিক পরিচিত : ‘মানবাধিকার’ শব্দটি অধুনাবিশ্ব প্রেক্ষাপটে বহুল আলোচিত বিষয়। এটা একটি যৌগিক শব্দ যার ইংরেজী পরিভাষা হল “ঐঁসধহ জরমযঃং”. “ঐঁসধহ ৎরমযঃং” – এর পরিচয়ে কোথাও বলা হয়েছে- ঙহব ড়ভ ঃযব নধংরপ ৎরমযঃং ঃযধঃ বাবৎুড়হব যধং ঃড় নব ঃৎবধঃবফ ভধরৎষু ধহফ হড়ঃ রহ পৎঁধষ ধিু, বংঢ়বপরধষষু নু ঃযবরৎ মড়াবৎসসবহঃ দদঅ.ঝ ঐড়ৎহনু, ঙঢঋঙজউ অউঠঅঘঈঊউ খঊঅজঘঊজ’ঝ উওঈঞওঙঘঅজণ. খড়হফড়হ: ঙীভড়ৎফ টহরাবৎংরঃু চৎবংং, ঝরীঃু ৎফ, ২০০২, ঢ়. ৬৩৫’’ এটি মূলত ফরাসী শব্দ হতে উৎপন্ন। অর্থ হল- মানুষের অধিকার “আব্দুন নূর, বিশ্বমানবাধিকার ঘোষণা, ইসলাম ও গণতন্ত্র, ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক ফোরাম কর্তৃক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ১৯৯৪ সালে আয়োজিত সেমিনারে পঠিত প্রবন্ধ, পৃ. ১”। ঞযড়সধং চধরহব সর্বপ্রথম ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদ কর্তৃক ১৭৮৯ সালে গৃহীত জরমযঃং ড়ভ গধহ ঘোষণার জন্য উৎড়রঃং ফব খ’যড়সব শব্দটি ব্যবহার করেন যা গৎং. ঊষপধহড়ৎ জড়ড়ংবাবষঃ- এর প্রস্তাব অনুযায়ী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর গৃহীত ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং এ ঐঁসধহ জরমযঃং বা মানবাধিকার পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়। “ঞযড়সধং ড. ডরষংড়হ, অ ইবফৎড়পশ ঈড়হংবহংঁং ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃ’ং ওহ ঐ. ঐবহশরহ (বফ). ঐঁসধহ উরমহরঃু: ঞযব ওহঃবৎহধঃরড়হধষুধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃ: ১৯৭৯, চ.৪৮’’ যার আরবী পরিভাষা “ইক্ব বা হুকুক” যা কুরআন-সুন্নাহে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। মানবাধিকার পরিভাষাটি কখনো ইধংরপ ঐঁসধহ জরমযঃং, কখনো ঋঁহফধসবহঃধষ জরমযঃং আবার কখনো ইরৎঃয জরমযঃং ড়ভ ঐঁসধহ নবরহম ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করা হয়। “ড.আ.ক.ম. আব্দুল কাদের, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮”।
মানবাধিকার-এর বিকাশ : মানুষকে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতি, ধন-সম্পদ, জেন্ডার নির্বিশেষে সমভাবে দেখে তার সহজাত ও ¯্রষ্টা প্রদত্ত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করাই হচ্ছে ‘মানব মর্যাদা’। মানুষের অস্তিত্ব ও স্বকীয়তা রক্ষা, সহজাত ক্ষমতা ও প্রতিভার সৃজনশীল বিকাশ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন-যাপনের অধিকারকে সমুন্নত রাখার জন্য একান্তভাবে প্রয়োজনীয় কতিপয় অধিকার স্বত্বই হচ্ছে মানবাধিকার। “হাসান, ড. মোস্তফার, মানবাধিকার ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) একটি পর্যালোচনা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৪৭ বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, এপ্রিল- জুন, ২০০৮, পৃ. ৪৪”। মানুষের এই অধিকার তার জন্মগত এবং মানবিক মূল্য মর্যাদার সাথে সংশ্লিষ্ট। ঊহপুপষড়ঢ়ধবফরধ ইৎরঃধহহরপধ- তে মানবাধিকারকে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত মানুষের জন্মগত অধিকার দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, “জরমযঃং ঃযড়ঁমযঃ ঃড় নবষড়হম ঃড় ঃযব রহফরারফঁধষ ঁহফবৎ হধঃঁৎধষ ষধি ধং ধ ঈড়হংবয়ঁবহপব ড়ভ যরং নবরহম যঁসধহ’’ দদঞযব ঘবি ঊহপুপষড়ঢ়ঁবফরধ ইৎরঃঁহহরপধ, টঝঅ: ঋঁহফবফ রহ ১৭৬৮, ১৫ঃয বফরঃরস, ঠঙখ-৫, চ, ২০০’’। (সমাপ্ত)

পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
দ্বিতীয়ত, পিতা মাতা যখন বার্ধক্যে উপনীত হন তখন তাদের মেজাজ কিছুটা খিটখিটে হয়ে যেতে পারে এবং বয়সের কারণে তাদের আচরণে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে থাকলে তা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। তাদের কথা খুশীমনে মেনে নেয়া। তাদের কোন কথায় বিরক্ত হয়ে জবাবে উহ্ শব্দটি উচ্চারণ না করা অথবা তাদের সাথে এমন আচরণ না করা যাতে তারা উহ্ শব্দটি উচ্চারণ করেন। ধমকের সুরে বা উচ্চ কণ্ঠে বা কর্কশ ভাষায় তাদের সাথে কথা না বলা। আমাদের শৈশবকালের কথা স্মরণ করা যে, তারা আমাদের প্রতি কীরূপ অনুগ্রহ করেছেন।
তৃতীয়ত: পিতা মাতার মান সম্মানের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। কথা বলার সময় তাদের সম্মানের প্রতি খেয়াল রাখা। বয়সের শেষ পর্যায়ে এসে যখন তারা দুর্বল হয়ে পড়েন তখন তাদের প্রতি বিশেষভাবে নজর দেয়া। বয়সের কারণে তাদের মান অভিমান অনুধাবন করা এবং বিরক্ত হয়ে তাদের সম্মুখে এমন কথা না বলা যা তাদের মান সম্মানের পরিপন্থি হয়।
চতুর্থত: আচার আচরণ ও ব্যবহারে তাদের সাথে বিনয়ী ও কোমল স্বভাবের আচরণ প্রকাশ করতে হবে। আনুগত্যের সাথে মাথা অবনত রাখা, তাদের নির্দেশ মনযোগ দিয়ে শ্রবণ করা এবং পালন করা। বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের খেদমতে নিয়োজিত থাকা; কিন্তু এক্ষেত্রে বিরক্তি, অহমিকা বা অনুগ্রহ প্রকাশ না পাওয়া উচিত। কেননা এ রকম সেবা ও পরিচর্যা আমাদের নিকট তাঁদের প্রাপ্য। তাদের সেবা ও পরিচর্যা করার সুযোগ লাভে আল্লাহর শোকর আদায় করা উচিত।
আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: আর আমি মানুষকে তার পিতা মাতার সাথে সদ্বব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছে। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়। আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে। পিতা মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরীক স্থাপন করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে জ্ঞাত করবো। “আল কুরআন ৩৯:১৪-১৫।”
উপরোক্ত আয়াতের বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, প্রথমত আল্লাহ তা’আলা উক্ত আয়াতে সন্তানের জন্য মায়ের কষ্টের বর্ণনা, বিশেষ করে তাকে কত কষ্টে তার মা গর্ভে ধারণ করেছেন তা বর্ণনা, সন্তানের প্রতি মায়ের অনুগ্রহ, সন্তানকে দুধ পান করানো ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আয়াতে আমার প্রতি ও তোমার পিতা মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও’ দ্বারা আল্লাহর কৃতজ্ঞতার পরপরই পিতা মাতার কৃতজ্ঞাতার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত: আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতা প্রকাশ পায় এমন কোন নির্দেশ পিতা মাতা প্রদান করলে তার আনুগত্য করা যাবে না। তবে পৃথিবীতে তাদের সাথে সদ্ভাব রেখে সহঅবস্থানের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলার নির্দেশিত প্রতিটি কাজের মধ্যেই সওয়াব ও কল্যাণ রয়েছে। আল্লাহর অনুগত্যের মাধ্যমেই তার নৈকট্য অর্জন করা যায়। এত সব আমলের মধ্যে পিতা মাতার প্রতি সদাচরণকে রাসূলুল্লাহ (স.) আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল বলে ঘোষণা করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন আমি নবী (স.) কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বলেন: পিতা মাতার সাথে সদাচার। আমি বললাম তারপর কোনটি? তিনি বললেন: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি আমাকে এসব বিষয়ে বললেন। আমি আরো জিজ্ঞেস করলে তিনি অবশ্যই আমাকে আরো বলতেন। “ইমাম বুখারী, আস-সহীহ (অনুবাদ ও সম্পাদনা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৯৫ ঢাকা) অধ্যায়: শিষ্টাচার, অনুচ্ছেদ: আল বিররি ওয়াস সিলাহ, হাদীস নং-৫৪৩২,খ,৯.পৃ.৩৮৯, ইমাম বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং ১ পৃ.৩৩।”
পিতা মাতার সাথে কোমল ব্যবহার এবং নম্র ভাষায় বিনয়ী হয়ে কথা বলার নির্দেশ দেওয়ার কারণ হলো বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলে তারা অনেক সময় স্বাভাবিক আচরণ নাও করতে পারেন। তখন তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেতে পারে বা কোন বিষয়ে অধৈর্য হয়ে পড়তে পারেন। সেই অবস্থায়ও সন্তানকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং কোমল ভাষায় কথা বলতে হবে।
তায়সালা ইবনে মায়্যাস রহ. বলেন, আমি যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত ছিলাম। আমি কিছু পাপকাজ করে বসি, যা আমার মতে কবীরা গুনাহর শামিল। আমি তা ইবনে উমার রা. এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, তা কী? আমি বললাম, এই ব্যাপার। তিনি বললেন, এগুলো কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত নয়। কবীরা গুনাহ নয়টি: (১) আল্লাহর সাথে শরীক করা, (২) নরহত্যা, (৩) জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন, (৪) সতী সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে যিনার মিথ্যা অপবাদ রটানো, (৫) সুদ খাওয়া, (৬) ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা, (৭) মসজিদে ধর্মদ্রোহী কাজ করা, (৮) ধর্ম নিয়ে উপহাস করা, (৯) সন্তানের অসদাচরণ যা পিতা মাতার কান্নার কারণ হয়। ইবনে উমার রা. আমাকে বলেন, তুমি কি জাহান্নাম থেকে দূরে থাকতে ও জান্নাতে প্রবেশ করতে চাও? আমি বললাম আল্লাহর শপথ! আমি তাই চাই। তিনি বলেন, তোমার পিতা মাতা কি জীবিত আছেন? আমি বললাম, আমার মা জীবিত আছেন। তিনি বলেন আল্লাহর শপথ! তুমি তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বললেও ভরণ পোষণ করলে তুমি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদি করীরা গুনাহসমূহ থেকে বিরত থাকো। “ইমাম বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: পিতা মাতার সাথে নম্র ভাষায় কথা বলা, প্রগুক্ত হাদীস নং ৮পৃ.৩৫।”
পিতা মাতা সন্তানের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমতস্বরূপ। সন্তানের জন্য পিতা মাতার দু’আ কবুল হয়। তাই তাদের দু’আ নিতে হবে এবং বদদু’আ থেকে বাঁচতে হবে। বদদু‘আ থেকে বাঁচার উপায় হলো তাদের প্রতি অসদাচরণ না করা। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: তিনটি দু‘আ অবশ্যই কবুল হয়, এতে কোন সন্দেহ নেই। (১) মজলুম বা নির্যাতিতের দু‘আ, (২) মুসাফিরের দু‘আ এবং (৩) সন্তানের জন্য পিতা মাতার দু‘আ। “ইমাম বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ অনুচ্ছেদ: দা’ওয়াতিল ওয়ালিদাইন, প্রাগুপ্ত হাদীস নং ৩২.পৃ.৪৪।”
ইসলাম পিতা মাতার প্রতি আচরণকে এতই গুরুত্ব প্রদান করেছে যে, তাদের মৃত্যুর পরও তাদের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর তা হলো, তাদের জন্য দু‘আ করা, তাদের বৈধ ওসিয়ত পূর্ণ করা, তাদের বন্ধু-বান্ধবগণের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের দিক থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে এমন আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা।
উসাইদ (রা.) বলেন, আমরা নবী (স.) এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার কোন অবকাশ আছে কি? তিনি বলনে: হ্যাঁ, চারটি উপায় আছে। (১) তাদের জন্য দু‘আ করা, (২) তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, (৩) তাদের প্রতিশ্র“তিসমূহ পূর্ণ করা এবং (৪) তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করা, যারা তাদের মাধ্যমে তোমার আত্মীয়। “ইমাম বুখারী, আল-আদাবুদ মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: বিররিল ওয়ালিদাইনি বা‘দা মাওতিহিমা, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৩৫, পৃ. ৪৬”।
ও.আই.সি-এর উদ্যোগে ১৯৯০ সালের ৩১ জুলাই থেকে ৫ আগষ্ট পর্যন্ত ৬ দিন ব্যাপী ও.আই.সি. ভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের পররষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন মিসরের রাজধানী কায়রোতে অনুষ্টিত হয়। সম্মেলনের সর্বশেষ দিন ৫ আগষ্ট ঞযব ঈধরৎড় উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং ওহ ওংষধস” সর্বসম্মত মতের ভিত্তিতে অনুমোদন করা হয়। উক্ত ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ ৭ এ সন্তান ও পিতা-মাতার অধিকার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ: ৭ (ক) জন্ম গ্রহণের প্রাক্কালে, প্রত্যেক শিশুর তার পিতা-মাতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ হতে যথাযথ পরিচর্যা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত যতœ এবং নৈতিক তত্ত্বাবধান পাবার অধিকার রয়েছে। ভ্রƒণ এবং মা অবশ্যই সুরক্ষিত এবং বিশেষ যতেœ থাকবে। (খ) পিতা-মাতার বা দায়িত্বপ্রাপ্তদের অধিকার রয়েছে যে, তাদের ইচ্ছানুযায়ী সন্তানকে শিক্ষা প্রদান এবং ভবিষ্যতের জন্য গঠন করা নৈতিক মূল্যবোধ এবং শরী‘আহ- এর মূলনীতির আলোকে। (গ) পিতা-মাতা উভয়ই সন্তান-এর নিকট হতে অনুরূপ অধিকার রয়েছে এবং আত্মীয়দেরও তাদের পরম্পরের নিকট হতে শরী‘আহ্-এর আলোকে অধিকার রয়েছে।
ও.আই.সি.-ভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সম্মেলনে শিশুদের অধিকার বর্ণনা করা হয়েছে এবং সন্তানের পক্ষ থেকে পিতা-মাতার জন্যও অনুরূপ অধিকার রয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শিশুদের জন্য অধিকার রয়েছে তার পিতা-মাতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের করা হয়েছে। শিশুদের জন্য অধিকার রয়েছে তার পিতা-মাতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিকট হতে, অনুরূপভাবে পিতা-মাতার জন্যও তাদের নিকট হতে অধিকার রয়েছে। কেননা বিদ্যমান আইনে শুধু আর্থিক দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে পৃথক পৃথক ৬ মাস বা ১ বছর কারাদন্ড অথবা আর্থিকনন্ড কিংবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আইনের ৫নং ধারার (১) উপধারায় “উক্ত অপরাধের জন্য ছয় মাস থেকে এক বছরের কারাদন্ড বা এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবে” সংযুক্ত করা যেতে পারে।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইনটির শিরোনাম “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ ও সদাচরণ আইন” করা যেতে পারে, সদাচরণ এর সংজ্ঞায় “শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান প্রদর্শন, আনুগত্য করা, শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্ট না দেওয়া, উচ্চ স্বরে ও কর্কশ ভাষায় কথা না বলা, যে কোন কথা বা কাজ দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কষ্ট না দেওয়া, তাদের প্রতি অবহেলা না করা”Ñ যে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
বিদ্যমান আইনের ৩নং ধরার ৪নং উপধারা এর সাথে নিম্নোক্তভাবে সংযুক্ত করা যেতে পারে, ৩ (৪) “অথবা কোন সন্তান তার পিতা-মাতার প্রতি এমন আচরণ করবে না, যাতে পিতা বা মাতা বা উভয়ে স্বেচ্ছায় সন্তানের বাসস্থান থেকে আলাদা হয়ে যেতে বাধ্য হন।” বিদ্যমান আইনের ৩নং ধারায় ৭নং উপধারায় বর্ণিত “সন্তান তার মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হইতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা বা উভয়কে প্রদান করবে” এর সাথে অন্য একটি উপধারা যুক্ত করে ‘যুক্তিসঙ্গত’ পরিমাণ অর্থ এর ব্যাখ্যা দেয়া যায় এভাবে যে, “যা দ্বারা তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যয় বহনের ন্যূনতম অর্থ সংকুলান হয়”। যে সকল পিতা-মাতার সন্তান নেই বা সন্তানের কর্মসংস্থান নেই বা সন্তান আয় রোজগার করতে অক্ষম বা বিকলাঙ্গ তাদের ভরণÑপোষণের দায়িত্ব সরকার কর্তৃক গ্রহণ করার জন্য বিধি প্রণয়ন করা।
সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার সকল স্তরের পাঠ্যসূচিতে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব, নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণের ধর্মীয় নির্দেশনা, পরকালীন জবাবদিহিতা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং উল্লিখিত বিষয়সমূহ সরকারের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ও বেসরকারি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার করার মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধিকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ। বিদ্যমান আইনের ৬নং ধারার আমলযোগ্যতা, জামিন যোগ্যতা ও আপোষযোগ্যতার ক্ষেত্রে নমনীয়তা পরিহার করে আরো কঠোরতা আরোপ করা এবং বিচারিক আদালতের পরিধি ১ম শ্রেণী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সীমাবদ্ধ না রেখে এর পরিধি বৃদ্ধি করা।
বিদ্যমান আইনের ৩নং ধারার উপধারা (৩) এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ সহায়ক আইন প্রণয়ন করা। যথা: সরকারি স্বায়ত্বশাসিত বা বেসরকারি কর্মক্ষেত্রসমূহের কর্মরতদের মধ্যে ক্ষেত্র অনুযায়ী তাদের পিতা-মাতার সঙ্গে বসবাস বা চিকিৎসার সুবিধার্থে তাদের অনুকূল বিভাগ, জেলা, থানা বা কর্মস্থলে পদায়ন (চড়ংঃরহম)-এর বিধি প্রণয়ন করা।
সন্তানের জন্য পিতা-মাতার হলেন আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহ। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে সন্তানের লালন-পালন ও তাদেরকে প্রকৃত মানুষ হিসাবে গড়ে উঠার ক্ষেত্রে পিতা-মাতার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘পিতা-মাতার গুরুত্ব ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার গুরুত্ব অনেক বেশি। তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা, বিনয়ী আচরণ ও তাদের জন্য ব্যয় করার বিষয়ে ইসলাম দিক নির্দেশনা রয়েছে। বিশেষভাবে বৃদ্ধ বয়সে তাদের প্রতি ভালো আচরণ, সেবা-যতœ, সময় দান করা এবং আল্লাহ্র নিকট তাদের জন্য দু‘আ করার শিক্ষা ইসলাম প্রদান করেছে। তবে ইসলাম তাদের প্রতি সদ্ব্যবহারের জন্য আইন নির্দিষ্ট করে দেয়নি। রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে প্রয়োজন অনুযায়ী পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ বাস্তবায়নের জন্য শরী‘আহ্সম্মত পদ্ধতিতে কুরআন ও সুন্নহ্র ভিত্তিতে বিধান প্রণয়ন করতে পারবে। ইসলামে নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। মূলত পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ যতটা না আইনগত তার চেয়ে বেশি নৈতিক ও ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্যবোধ-এর সাথে সম্পৃক্ত। মৌলিক অবক্ষয়ে জর্জরিত ও নৈতিক স্খলনে পতিত কোন সমাজে আইন দিয়ে নৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য জনসাধারণকে বাধ্য করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমাজের সর্বস্তরের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অনুশীলন সামাজিক সচেতনতা। তাই আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের নৈতিক, ধমীয় মূল্যবোধ ও জবাবদিহিতার অনুশীলন প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যবস্থার সকল স্তরে বিষয়টি পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্তকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা খুবই জরুরী। পাশাপাশি এ বিষয়ে আইনটি আরো সময়োপযোগী ও কার্যকর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তাহলে সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত হবে, নির্বিঘœ হবে তাদের অধিকার প্রাপ্তি। (সমাপ্ত)

পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের)
আইনের ৫নং ধারার ১নং উপধারায় পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ না করার দন্ড বর্ণনা করা হয়েছে। কোন সন্তান কর্তৃক ধারা ৩ এর যে কোন উপধারার বিধান কিংবা ৪নং বিধান লংঙ্ঘন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে বা উক্ত অর্থদন্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদন্ড ভোগের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের ৫নং-এর ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, কোন সন্তানের স্ত্রী বা ক্ষেত্র অনুযায়ী স্বামী কিংবা পুত্র কন্যা বা অন্য কোন নিকটাত্মীয়, পিতা-মাতা বা দাদাদাদী বা নানানানী ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধা প্রদান করেন অথবা অসহযোগিতা করেন তিনিও অনুরূপ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন বলে গণ্য হবে এবং উপধারা (১) এ উল্লিখিত দন্ডে দন্ডিত হবেন। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৫”।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন অনুযায়ী পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ না দিলে অনূর্ধ্ব ১ লক্ষ টাকার অর্থদন্ড বা অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। শাস্তি প্রয়োগের দ্বারা অপরাধের জাগতিক প্রায়শ্চিত্ত হতে পারে; কিন্তু তাতে পিতা-মাতার অসহায়ত্বের প্রতিবিধানের কোন ব্যবস্থা নেই।
ইসলামে পিতা-মাতার অবাধ্যতাকে বড় পাপ ও কবীরা গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পিতা-মাতার অবাধ্যতার জন্য কোন শাস্তির বিধান রাখা হয়নি। তবে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী শাস্তির বিধান প্রণয়ন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে আলিমদের সমন্বয়ে গঠিত শরী‘আহ্ কাউন্সিল কুরআন ও সুন্নাহ্র আলোকে তা প্রণয়নের পরামর্শ দিতে পারেন।
পিতা-মাতার অবাধ্য হলে তারা কষ্ট পাবেন। তাদের কষ্ট দেয়া হারাম। এজন্য তাদের বৈধ আদেশ যা শরী‘আহ্ পরিপন্থী নয় তা মান্য করা সন্তানের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু তাদের আনুগত্য করতে গিয়ে যদি আল্লাহর অবাধ্যতার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তা পালন করা যাবে না।
আবু বকরা (রা.) বলেন রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন: আমি কি তোমাদেরকে কবীরা গুনাহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মকগুলো সম্পর্কে অবহিত করবো না? কথাটি তিনি তিনবার বললেন। উত্তরে সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বলেন: আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্যাচরণ করা। তিনি হেলান দেয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসে বললেন: এবং মিথ্যা বলা। তিনি এ কথাটি বারবার বলছিলেন। আমি মনে মনে বললাম, আহা! তিনি যদি ক্ষান্ত হতেন। “ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, হাদীস নং-৫৪৩৮”।
ইসালামে আনুগত্য প্রাপ্তির অধিকার শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ আল্লাহর নির্দেশেরই আনুগত্য। তাই পিতা-মাতার অবাধ্যতা প্রকারান্তরে আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘনেরই নামান্তর। পিতা-মাতার বদদোয়া সন্তানের জন্য দুনিয়াতেই কার্যকর হয়ে যায়। আবু বাকরাহ রা. থেকে বর্ণিত, নবী (স.) বলেছেন: পিতা-মাতার আবাধ্যতা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তি দুনিয়াতে অন্যান্য পাপের চেয়ে দ্রুত অপরাধীর উপর কার্যকর হয়। পরকালের শাস্তি তো আছেই। ইমাম বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: উকুবাতি উক্কূকিল ওয়ালিদাইন, হাদীস নং-২৯, পৃ.৪৩”।
পিতা-মাতাকে কাঁদানোর অর্থ তাদের সাথে অন্যায় আচরণ করে তাদের মনে কষ্ট দিয়ে তাঁদের কাঁদানো। পবিত্র কুরআনে তাই তাঁদের সম্মুখে উহ্ শব্দটি উচ্চারণ করতে বারণ করা হয়েছে। তায়সালা (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি ইবনে উমার (রা.) কে বলতে শুনেছেন: পিতা-মাতাকে কাঁদানো তাদের অবাধ্যাচরণ ও কবীরা গুনাহ সমূহের শামিল। “ইমামা বুখারী, আলÑআদাবুল মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: বুকা-ইল ওয়ালিদাইন, হাদীস নং-৩১, পৃ.৪৩”।
আইনের ৬নং ধারায় উল্লিখিত অপরাধকে আমলযোগ্য (ঈড়মহরুধনষব) জামিনযোগ্য (নধরষধহষব) এবং আপোষযোগ্য (ঈড়সঢ়ড়ঁহফধনষব) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আইনের ৬নং ধারায় উক্ত অপরাধের আমলযোগ্যতা, জামিনযোগ্যতা ও আপোষযোগ্যতার বিষয়ে বলা হয়েছে। এ আইনের অধীন অপরাধ আমলযোগ্য (ঈড়হমহরুধনষব), জামিনযোগ্য (নধরষধনষব) ও আপোষযোগ্য (ঈড়সঢ়ড়ঁহফধনষব) হবে। এতে লক্ষণীয় যে, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের বিষয়টি নমনীয়ভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আরো কিছুটা কঠোরতা আরোপ করা প্রয়োজন ছিল।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত অপরাধের বিচার কার্য পরিচালনার বিষয়ে ৭নং ধারার ১ উপধারায় বল হয়েছে ঈড়ফব ড়ভ ঈৎরসরহধষ চৎড়পবফঁৎব ১৮৯৮ (ধপঃ ড়ভ ১৮৯৮) এ যা কিছু থাকুক না কেন এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ প্রথম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রাপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারযোগ্য হবে। একই ধারার ২নং উপধারায় বলা হয়েছে যে, এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত কোন আদালত তা আমলে গ্রহণ করবে না। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৭”।
আইনের ৭নং ধারার ২নং উপধারায় বলা হয়েছৈ, কোন আদালত এ আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ব্যতীত আমলে গ্রহণ করবেন না। অর্থাৎ আইনী প্রতিকারের জন্য লিখিত অভিযোগের শর্তারোপ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পিতা-মাতার প্রতি অসদাচরণের অধিকাংশ পিতা-মাতা তা নীরবে সহ্য করেন বা মনোঃকষ্ট নিয়ে জীবন অতিবিহিত করেন। লিখিত অভিযোগ দায়ের করে আইনী প্রতিকার পাওয়ার মানসিকতা অধিকাংশ পিতা-মাতার থাকে না। সেক্ষেত্রে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের যেসব কর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাতৃ ও শিশুদের খোঁজ খবর নেন, তাদেরকে প্রতি তিন মাস অন্তর নিজস্ব এলাকার প্রধানদের অবস্থা সস্পর্কে প্রতিবেদন দেয়ার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। তা হলে সরকারের কাছে অতি সহজেই প্রবীণদের সার্বিক অবস্থার একটা রির্পোট সংগৃহীত হবে এবং সে মতে পদক্ষেপ ও প্রতিকার বিধান করতে সুবিধা হবে। তা ছাড়া ইউনিয়ন, পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার ও কাউন্সিলরদের এই দায়িত্বে নিয়োজিত করা যেতে পারে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে পারে।
আলোচ্য আইনে বিষয়টি আপোষ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আইনের ৮নং ধারার ১ উপধারায় বলা হয়েছে, এ আইনের অধীন প্রাপ্ত অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার কিংবা ক্ষেত্রমত, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর কিংবা অন্য যে কোন উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট আদালত প্রেরণ করতে পারবে। ৮নং ধারার ২ উপধারায় বলা হয়েছে, উক্ত আইনের অধীন কোন অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য প্রেরিত হলে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেয়র, মেম্বার বা কাউন্সিলর উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ প্রদান করবেন এবং বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন এবং এরূপ নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগ উপযুক্ত আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে। “পিতাÑমাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৮”। ৯নং ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি গেজেটের মাধ্যমে এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার বিধি প্রণয়ন করতে পারবে।
আইনের ৮নং ধারার ১নং উপধারায় উক্ত বিষয়ে অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার কিংবা ক্ষেত্রমত সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর অথবা অন্য যে কোন উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট প্রেরণ করার কথা বলা হয়েছে। এখানে চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র বা কাউন্সিলর একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান হলেও ‘অন্য কোন উপযুক্ত ব্যক্তি’র বিষয়টি স্পষ্ট নয়। গ্রামের মোড়ল বা মাতব্বরগণ অনেক সময় গ্রামের সালিশ পরিচালনা করে থাকেন; কিন্তু তাদের যোগ্যতা, জ্ঞান, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়। তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ পাওয়া যায়। পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে তাদেরকে দায়িত্ব প্রদান করলে তারা কতটুকু সঠিক ও গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তি করতে পারবেন তা নিশ্চত নয়। তা ছাড়া আইনের ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, কোন অভিযোগ আপোষ নিষ্পত্তির জন্য প্রেরিত হলে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেয়র, মেম্বার বা কাউন্সিলর উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে তা নিষ্পত্তি করবেন, যা আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত বলে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে আদালতের সমপর্যায়ের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।
ইসলামের বিধান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পর ‘উলিল আমর’- এর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং তাদের আনুগত্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:- হে ঈমানদারগণ! তোমার আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর তাদের তারপর যদি তোমার কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি প্রত্যার্পণ কর। যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর ও পরিণতির দিক থেকে উত্তম। “আল-কুরআন, ৪:৫৯”।
উলিল-আমর’ আভিধানিক অর্থে সে সমস্ত লোককে বলা হয়, যাদের হাতে কোন বিষয়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত থাকে। সে কারণেই ইবনে আব্বাস রা. মুজাহিদ ও হাসান বসরী রহ. প্রমুখ মুফাসসিরগণ আলিম ও ফকীহ সম্প্রদায়কে ‘উলিলÑআমর’ সাব্যস্ত করেছেন। তাঁদের হাতেই দীনা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত। মুফাসসিরীনের অপর একদল, যাদের মধ্যে আবু হুরায়রা (রা.) প্রমুখ সাহাবায়ে কিরামও রয়েছেন, তারা বলেছেন যে, ‘উলিল-আমর’- এর অর্থ হচ্ছে, সে সমস্ত লোক যাদের হাতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত। এছাড়া তফসীরে ইবনে কাসীর এবং তফসীরে মাযহারীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ শব্দটির দ্বারা (আলিম ও শাসক) উভয় শ্রেণীকেই বোঝায়। কারণ, নির্দেশ দানের বিষয়টি তাঁদের উভয়ের সাথেই সম্পর্কিত। “মুফতী মুহাম্মদ শাফী, তাফসীর মা‘আরেফুল ক্বোরআন, পৃ.২৬০”।
মাতা-পিতার ভরণÑপোষণ আইন, ২০১৩ পর্র্যালোচনায় বলা যায়, সন্তান ও পিতা-মাতার সম্পর্ক খুবই আন্তরিক ও গভীর। ধর্মীয় দিক থেকে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার ও সদাচরণ- এর প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছৈ। আইনী প্রতিকারের মাধ্যমে শ্রদ্ধাবোধ, মর্যাদা ও সদাচরণ আদায় করার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। মূলত পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক এমন নয় যে, পিতা-মাতা তার ভরণ-পোষণ ও সদাচরণ প্রাপ্তি মামলা বা অভিযোগ দাখিল করে তা সন্তানের নিকট থেকে আদায় করবেন। বিষয়টি যতটুকু না আইনী তার চেয়ে অনেক বেশি নৈতিক ও মূল্যবোধ সম্পর্কিত। বাংলাদেশে ইতঃপূর্বে এমন আইন ছিল না। বর্তমান সমাজের অবক্ষয়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের স্থলনের ফলে এ জাতীয় বিষয়ে আইন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে আইনটি প্রণয়ন করা হয়। সমাজের সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষার অনুশীলন ও চর্চা, নৈতিকতা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধসহ চরিত্র বিরাজমান থাকলে এ আইন প্রণয়নের প্রয়োজন হতো না। তাই পিতা মাতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা, তাদের প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব এবং ইহকালীন ও পরকালীন প্রতিদান ও শাস্তি এবং সার্বিক মূল্যায়ন সমাজের প্রত্যেক স্তরে বিকাশ প্রয়োজন। এর পাশাপাশি আইনটিকে আরো গঠনমূলক ও কার্যকর করার মাধ্যমে পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব বোধ সৃষ্টি করা সম্ভব।
আল্লাহ তা’আলার ইবাদতের পরপরই পিতা মাতার প্রতি সদ্ব্যব্যহারের প্রতি পবিত্র কুরআনে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পিতা মাতার মাধ্যমেই মানুষ পৃথিবীতে আগমন করে এ কারণে সন্তানের জীবনে পিতা মাতার অবদান অতুলনীয়। হাক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক আদায়ের পর বান্দার হকের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বান্দার হকের মধ্যে পিতা মাতার হক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পিতা মাতার মর্যাদা অনেক উঁচু, যা পবিত্র কুরআনের বর্ণনা থেকে হৃদয়ঙ্গম করা যায়। কেননা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহর অধিকারের পাশাপাশি পিতা মাতার অধিকারের বিষয়ে বলা হয়েছে এবং আল্লাহ তা’আলার কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি পিতা মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পিতা মাতার মর্যাদা ও সদাচরণের বিষয়ে আলোচনা করা হলো:
পিতা মাতার প্রতি আচরণ ও ব্যবহারে বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা;য়ালা বলেন: তোমার রব ফয়সালা করে দিয়েছেন তোমরা তাঁর ইবাদত ছাড়া অন্য কারোর ইবাদাত কর না, পিতা মাতার সাথে ভালো ব্যবহার কর। যদি তোমাদের কাছে তাদের কোনো একজন বা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় থাকে, তাহলে তাদেরকে “উহ” পর্যন্তও বল না এবং তাদেরকে ধমকের জবাব দিও না বরং তাদের সাথে সম্মান ও মর্যাদার সাথে কথা বল। আর দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাক এবং দু’আ করতে থাকো এই বলে “ হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর,যেমন তারা (দয়া, মায়া, মমতা সহকারে) শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন। আল কুরআনুল কারীমের উপরোক্ত আয়াত দুটি থেকে এ বিষয়ে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:
প্রথমত, আল্লাহ তা’আলার হক আদায়ের পর মানুষের উপর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো পিতা মাতার প্রতি সদাচরণ করা। কেননা পবিত্র কুরআনে আল্লাহর একত্বের পর সর্বপ্রথম নির্দেশই পিতা মাতার সাথে ভালো ব্যবহার এর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। (অসমাপ্ত)

পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
‘নাফাকাতুন’ পরিভাষাটির সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি পরিভাষা হলো ‘আল-‘আতা’ অর্থাৎ বৃত্তি, অনুদান। রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান হতদারদের জন্য বায়তুলমাল থেকে যা নির্ধারণ করেন তাকে আলÑ‘আতা বা বৃত্তি বলা হয়। ‘নাফাকাহ’ ও ‘আতা’Ñ এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে ‘নাফকাহ’ শরী‘আহ কর্তৃক র্ধায হয়, আর ‘বৃত্তি’ রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কর্তৃক ধার্য হয়। “আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২, পৃ.১০৪”। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে আল্লাহ তাকেযা দান করেছেন তা হতে দান করবে। “আলÑকুরআন, ৬৫:০৭”। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: পিতার কর্তব্য যথাবিধি তাদের ভরণ-পোষণ করা। “আলÑকুরআন, ০২:২৩৩”।
আইনের ৩নং ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতাÑমাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোন পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে তারা আলোচনার মাধ্যমে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিশ্চিত করবেন এবং তা নিশ্চিত করার জন্য সন্তানদেরকে তাদের পিতা-মাতার সাথে একসঙ্গে এবং একস্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৩”।
আইনের ৩নং ধারার (৪) এ বলা হয়েছে, পিতা-মাতাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধ নিবাসে বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না কিংবা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না। ধারা ৩ (৪) নং উপধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তান তাঁর পিতাÑমাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করবে। ৩নং ধারার (৬)নং উপধারায় বলা হয়েছে, পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে সন্তান থেকে পৃথক বসবাস করলে সেক্ষেত্রে তাদের সাথে নিয়মিত সাক্ষাৎ করতে হবে।
আইনের ৩নং ধারা এর (৭) নং উপধারায় বলা হয়েছে যে, পিতা-মাতা সন্তানদের সাথে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে সে ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তান তার মাসিক বা বাৎসরিক আয় হতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা বা ক্ষেত্র হিসেবে উভয়কে নিয়মিতভাবে প্রদান করবে।
উল্লিখিত আইনের ৩ নং ধারায় ১ থেকে ৭ পর্যন্ত মোট সাতটি উপধারায় ভরণ-পোষণের বিস্তারিত দিক নির্দেশনা ও ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। যথা পিতা-মাতা ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা, একাধিক সন্তানের ক্ষেত্রে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা, বৃদ্ধ নিবাসে বসবাসে বাধ্য না করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করা এবং মাসিক আয় থেকে অর্থ প্রদান করা।
৩নং উপধারায় পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চত করার জন্য সন্তানকে পিতাÑমাতার সাথে একইসঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙ্গে একক পরিবার প্রথা গড়ে ওঠছে। কর্মসংস্থানের তাগিদে গ্রাম অঞ্চল থেকে মানুষ শহরমুখী হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে এ দিক নির্দেশনা অনুপস্থিত। এছাড়া কর্মজীবী সন্তানদের তাদের পিতাÑমাতার সাথে একই স্থানে বসবাস করার বিধান বাধ্যতামূলক করা হলে তা নতুন জটিলতা তৈরি করবে। উপেক্ষা নয়; সম্মান ও সহানুভূতি বজায় রেখে পিতাÑমাতাকে তাদের পছন্দনীয় আবাসস্থলেই রাখা বেশি কল্যাণজনক হবে।
৭নং উপধারায় বলা হয়েছে, পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে সন্তানের সাথে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে সে ক্ষেত্রে সন্তান তার দৈনন্দিন আয় রোজগার বা মাসিক আয় বা বার্ষিক আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা-মাতাকে প্রদান করবে। এ ধারায় ‘যুক্তিসঙ্গত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে; কিন্তু এর সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। ২নং ধারায় ‘ভরণ-পোষণ’ বলতে খাওয়-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধার কথা বলা হয়েছে। ৭নং উপধারায় বর্ণিত ‘যুক্তিসঙ্গত’ অর্থ দ্বারা ২নং ধরার ‘ভরণ-পোষণ’ সম্পন্ন হবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ দ্বারা ভরণ-পোষণ সম্ভব না হলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে অথবা সন্তানের আয় দ্বারা তার নিজেরই খরচ সংকুলান না হলে অথবা সন্তান নিজেই যদি পিতা-মাতার উপর বোঝা হয়ে থাকেন তাহলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, এর দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করা হয়নি।
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমি মানুষদের এই মর্মে নির্দেশ দিয়েছি যে, তারা যেন পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে। তার মা কষ্ট করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্ট করেই তাকে প্রসব করেছে। তাকে গর্ভে ধারণ ও দুধপান করাতে ত্রিশ মাস লেগেছে। এমন কি যখন সে পূর্ণ যৌবনে পৌঁছেছে এবং তারপর চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হয়েছে তখন বলেছে: “হে আমার রব, তুমি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে যেসব নিয়ামত দান করেছো আমাকে তার শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক দাও। আর এমন সৎ কাজ করার তাওফীক দাও যা তুমি পছন্দ করো। আমার জন্য আমার সন্তানদেরকে সৎ বানিয়ে আমি তোমার কাছে তাওবা করছি। আমি নির্দেশের অনুগত (মুসলিম) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। “আল-কুরআন, ৪৬;১৫”।
আলোচ্য আয়াতে ওসিয়ত শব্দের অর্থ তাকীদপূর্ণ নির্দেশ এবং ইহসান অর্থ সদ্ব্যবহার। এর মধ্যে সেবা-যতœ, আনুগত্য, সম্মান ও সস্ত্রম প্রদর্শনও অন্তর্ভুক্ত। ‘কুরহুন’ শব্দের অর্থ সে কষ্ট যা মানুষ কোন কারণবশত সহ্য করে থাকে অথবা যে কষ্ট সহ্য করতে অন্য কেউ বাধ্য করে। এ বাক্যটি প্রথম বাক্যেরই তাকীদ। “মুফতী মুহাম্মদ শাফী রহ. তাফসীরে মা‘আরেফুল কুরআন, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (মদীনা মুনাওওয়ারাহ: বাদশাহ ফাহাদ মুদ্রণ প্রকল্প, ১৪১৩ হি.), পৃ. ১২৪৯”। অর্থাৎ পিতা-মাতার সেবা-যতœ ও আনুগত্য জরুরী হবার কারণ এই যে, তারা তোমাদের জন্য অনেক কষ্টই সহ্য করেছেন। এই আয়াতে আরেকটি বিষয়ের প্রতি ইংগিত রয়েছে, তা হলো মাতার হক পিতার অপেক্ষা বেশি, যা আমরা হাদীস থেকে প্রমাণ পাই। আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স.) এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার উত্তম সাহচর্যের অধিকতর হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে পুনরায় বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরেও তোমার মা। সে বলল, অত:পর কে? তিনি বললেন, অত:পর তোমার পিতা। “ইমাম বুখারী, আল জামি‘ আস সহীহ, কিতাবুল আদব, বাবু মান আহাক্কান নাসি বিহুসনিস সুহবাহ, হাদীস নং ৫৬২৬”।
পিতা-মাতার সেবা করা এবং তাদের অনুগত হওয়ার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, যার মাধ্যমে জান্নাতের পথ সুগম হয়। অন্যদিকে তাদের অধিকার পদদলিত কিংবা অবহেলিত হলে তাদের অসন্তুষ্টির কারণে জাহান্নামের রাস্তাও খুলে যেতে পারে। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ। তাদের আনুগত্য করলে আল্লাহর নির্দেশ পালন করা হয়। এর জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে অনেক কল্যাণ ও সওয়াব রয়েছে। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের ইহকালীন ও পরকালীন উভয় গুরুত্ব রয়েছে। এ জন্য রাসূলুল্লাহ (স.) এর একটি হাদীসে এসেছে, ইবনে উমার (রা.) বলেন, (কারো প্রতি তার) পিতা সন্তুষ্ট থাকলে প্রভুও তার প্রদি সন্তষ্ট থাকেন এবং তার পিতা অসন্তুষ্ট থাকলে প্রভুও অসন্তষ্ট থাকেন। “ ইমাম বুখারী. আল-আদাবুল মুফরাদ, অনুবাদ: মুহাম্মদ মূসা (ঢাকা: আহসান পাবলিকেশন্স, ২০০১), অনুচ্ছেদ: কওলুহু তা‘য়ালা: ওওয়াস-সাইনাল ইনসারনা বি ওয়লিদাইহি ইহসানা, পৃ.৩৩, হাদীস নং ২”।
আইনের ৪ নং ধারায় পিতার অবর্তমানে দাদাদাদীকে এবং মাতার অবর্তমানে নানানানীকে ভরণÑপোষণের কথা বলা হয়েছে এবং তাদের এই ভরণ-পোষণ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ হিসেবে গণ্য হবে। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৪”।
আইনের ৪নং ধারায় পিতার অবর্তমানে দাদাদাদীকে এবং মাতার অবর্তমানে নানানানীকে ভরণ-পোষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোন সন্তানের পিতা ও দাদা একইসাথে বর্তমান থাকাবস্থায় পিতা অক্ষম বা অবসর জীবনযাপন করলে কিংবা পিতা আয় করতে সক্ষম না হলে উক্ত সন্তানের উপরই তার পিতা ও দাদার দায়িত্ব একই সাথে বর্তাব্ েকিনা তা বলা হয়নি। আর যদি এ অবস্থায় পিতা ও দাদার দায়িত্ব বর্তায় তাহলে তার উপর একাধিক দায়িত্ব বর্তাবে। তা পালনে সে সক্ষম না হলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তা উল্লেখ করা হয়নি।
জমহুর ফকীহ (হানাফী, শাফিঈ, হাম্বলী)Ñএর মতে, পৌত্র ও পৌত্রির উপর দাদার ভরণ-পোষণ দেয় ওয়াজিব। তিনি পিতার দিক থেকে (দাদা) হোন কিংবা মাতার দিক থেকে (নানা)। ওয়ারিস সহ বা না হন এবং অন্য ধর্মের অনুসারী হলেও। যেমন পৌত্র মুসলিম ও দাদা কাফির অথবা দাদা মুসলিম ও পৌত্র কাফির। কেননা আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আর পৃথিবীতে তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।’ “আলÑকুরআন, ৩১:১৫”। তাদের প্রয়োজন পূরণ করা সদ্ভাবে জীবনযাপনের অংশ। হাদীসে এসেছে, ‘নিশ্চই তোমাদের সন্তানগণ তোমাদের সর্বোত্তম উপার্জন। সুতরাং তোমাদের সন্তানদের উপার্জন ভক্ষন করো। “আবু দাউদ (সম্পা.ইজ্জত উবাইদ দা‘আস) খ.৩, পৃ.৮০১, ইবনে মাজাহ (সম্পা.আলা হালাবী)( খ.২, পৃ.৭৬৯, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা-এর হাদীস থেকে উদ্ধৃত করেন। আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১, পৃ.৯৮”। উপরন্ত, দাদা পিতার সাথে সংযুক্ত, যদিও তিনি পিতা শব্দের আওতাভুক্ত নন। আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১, পৃ.৯৮”। (অসমাপ্ত)

 

পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রত্যেক মানুষের জীবনে পিতা-মাতার গুরুত্ব অপরিসীম। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনায় পিতাÑমাতা তিলে তিলে নিজের জীবন ও সামর্থ্যকে ক্ষয় করে এক সময় বার্ধক্যে উপনীত হন, কর্মক্ষম হাত পাগুলো নিশ্চল হয়ে পড়ে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন সন্তানের উপর। তাই সন্তান যখন সামর্থ্যবান হবে, তখন পিতাÑমাতার সার্বিক ভরণ-পোষণ তাদের দায়িত্ব ও আবশ্যকীয় কর্তব্য। আইনটি এ বিষয়ে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম আইন। বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক মুসলিম। ইসলামে ও পিতা-মাতার সার্বিক সেবাযতেœর প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত আইনটির পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ উপস্থাপন করা হবে। প্রবন্ধটি প্রণয়নে বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও সমালোচনামূলক গবেষণা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। এ মাধ্যমে অত্র আইনের অনুষঙ্গের ইসলামী দৃষ্টিকোণ অবগত হওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ক ইসলামী আইনের সাথে তুলনা করা সম্ভব হবে।
মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে তাঁর খলীফা হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন এবং তার জীবন পরিচালনার জন্য পথ দেখিয়েছেন। এজন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং তাদের মাধ্যমে মানব জতিকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। মানুষের পৃথিবীতে আগমনের মাধ্যম হলো তার পিতা-মাতা। পৃথিবীতে একজন মানব সন্তান আগমনের পূর্বে ও পরে পিতা-মাতা তার জন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করেন এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদের লালন পালন করেন। পিতা-মাতার মাধ্যমেই পৃথিবীতে মানুষের বিস্তার ও বংশ পরিক্রমা নির্ধারিত হয়। পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখার সৌভাগ্য মানুষ পিতা-মাতার মাধ্যমেই পেয়ে থাকে। তাই মানুষের জীবনে পিতা-মাতার স্থান ও অধিকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথেই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআনের বিভিন্ন স্থান আল্লাহর অধিকারের পাশাপাশি পিতা-মাতার অধিকারের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। সন্তানের নিকট থেকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সদাচরণ পাওয়া পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার। বিশেষভাবে তারা যখন বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হন এবং কর্মক্ষম থাকেন না, তখন তারা ভরণÑপোষণ ও সেবা-যতœ পাওয়ার জন্য সন্তানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। সন্তানের কর্তব্য, তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ- এর দায়িত্ব গ্রহণ করা, অসুস্থ হলে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং তাঁদেরকে সঙ্গ দেয়া এবং তাদের মনে কষ্ট পাবার মতো কোন ব্যবহার না করা।
সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩ শিরোনামে একটি আইন প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত আইনটি ২৭ অক্টোবর ২০১৩/১২ কার্তিক ১৪২০ তারিখ রবিবার রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের পর আইন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা হিসেবে বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রাণালয় কর্তৃক বাংলাদেশ ফরম ও প্রকাশনা অফিস কর্র্র্তৃক প্রকাশিত হয়েছে।
‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ’ আইনটি প্রণয়নের কারণ বা ব্যাখ্যা গেজেটে উল্লেখ করা হয়নি। তবে আইনে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীণ ও প্রয়োজনীয়; সেহেতু এতদ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল।’ মূলত বাংলাদেশের বর্তমান সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের স্খলনের কারণে পারিবারিক বন্ধন ও দায়িত্ববোধে শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়। পিতা-মাতাসহ সমাজের বৃদ্ধ ও প্রবীণ শ্রেণীর দায়িত্ব পালন ও তাঁদের প্রতি গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে প্রায়ই পিতা-মাতার প্রতি অসদারচণের সংবাদ পরিলক্ষিত হয়, এ দেশের নব্বই শতাংশ লোক মুসলিম হলেও পরিপূর্ণ ইসলামী শিক্ষার অনুপস্থিতিতে মুসলিম সমাজে ইসলামী অনুশাসনের যথাযথ চর্চা নেই এবং ইসলামের শিক্ষা, বিধি-বিধান ও আইন পরিপালনে শিথিলতা লক্ষণীয়। এ প্রেক্ষিতে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রণীত এটিই প্রথম আইন। সাধারণ মানুষের মধ্যে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। নিম্নে আইনটির পর্যালোচনা ও সীমাবদ্ধতাগুলো আলোচনা করা হলো:
“পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩” শিরোনামে আইনটি ২০১৩ সনের ৪৯নং আইন, যা সংসদ কর্তৃক গৃহীত ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মতি লাভ করেছে। উক্ত আইনে ধারা ২(ক) তে পিতা বলতে সন্তানের জনককে বুঝানো হয়েছে।
‘ভরণ-পোষণ’ বলতে খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং সঙ্গ প্রদানকে বুঝানো হয়েছে। ‘সন্তানের মাতা’ বলতে সন্তানের গর্ভধারিণী এবং ‘সন্তান’ বলতে পিতার ঔরসে ও মাতার গর্ভে জন্ম গ্রহণকারী সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যাকে বুঝানো হয়েছে। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩, বাংলাদেশ গেজেট, রেজিস্টার্ড নং ডি, এ-১ বাংলাদেশ সরকারী মুদ্রণালয় কর্তৃক মুদ্রিত ও বাংলাদেশ ফরম ও প্রকাশনা অফিস, তেজগাঁও, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত। আইন নং ৪৯, ধারাÑ২”
উল্লিখিত আইনে ভরণ-পোষণ অর্থ খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গ প্রদানকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। কিন্তু পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ, শ্রদ্ধাবোধ, কর্কশ ভাষায় কথা না বলা, কষ্ট না দেয়া, তাদের মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রাখা, তাদের আনুগত্য স্বীকার করা ইত্যাদি বিষয়কে অন্তুর্ভুক্ত করা হয়নি। অনেক সময় শারীরিকভাবে কষ্টের মতোই মানসিক কষ্টও পীড়াদায়ক এবং নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে।
আইনের ২নং ধারার (ঘ) অনুচ্ছেদে ‘সন্তান’ বলতে পিতার ঔরসে এবং মাতার গর্ভে জন্ম নেয়া সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যাকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু ‘সক্ষম’ ও ‘সামর্থ্যবান’Ñএর কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। আমাদের সমাজে শিক্ষিত অনেক বেকার রয়েছেন, যারা যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। এ ছাড়া পিতা-মাতার সন্তান যদি বেকার থাকে অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরি না পায়, তাহলে এ আইনের আলোকে সে কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে তার বিকল্প কোন দিকনির্দেশনা দেয়া হয়নি। ‘সক্ষম’ ও ‘সামর্থ্যবান’-এর বয়স নির্ধারিত নেই এবং সংজ্ঞাও দেয়া হয়নি।
আইনটির ২নং ধারার আলোকে বলা যায়, পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যাকে সমান ভাবে দায়িত্ব পুরুষ ও নারীর উপর সমানভাবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় আর্থিক সংগতি ও দায় দায়িত্ব পুরুষ ও নারীর উপর সমানভাবে প্রযোজ্য হতে দেখা যায় না। আর্থিক বিষয়ে সামর্থ্য ও দায়িত্ব পুত্র বা পুরুষগণ বেশি পালন করে থাকেন। কন্যা বা নারীগণ বিবাহ-পরবর্তী জীবনে স্বামীর সংসারের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অনেক সময় নারীদের কোন নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা থাকে না এবং আর্থিক সক্ষমতা সমান না হওয়া সত্ত্বেও সমান দায়িত্ব পাল কতটুকু সম্ভব তা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। যা উক্ত আইনে সুস্পষ্ট নয়।
‘পিতা ও মাতা’Ñএর সংজ্ঞায় ইসলামী ফিক্হ বিশ্বকোষ ‘আলÑমাওসূ‘আতুল ফিকইহয়্যাহতে বলা হয়েছে, পিতা এর অর্থ জন্মতাদা, যার বীর্য থেকে আরেকজন মানুষ জন্মগ্রহণ করে। এর আরবী প্রতিশব্দ হল ‘আব’। ‘আব’ শব্দটির কয়েকটি বহুবছন রয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ হলো ‘আবা’। পরিভাষায়, এমন ব্যক্তিকে পিতা বলা হয়, সরাসরি যার শরীয়তসম্মত স্ত্রীর সাথে যৌন সংসর্গের ভিত্তিতে আরেক মানুষ জন্মগ্রহণ করে। যে নারী অপরের সন্তানকে দুধ পান করায়, সাধারণত তার স্বামীকেও দুধপানকারীর পিতা বলা হয়। “আব্দুল মান্নান তালিব (প্রধান সম্পা.) আল-মাওসূ‘আতুল ফিকইহয়্যাহ, ইসলামের পরিবারিক আইন(ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিচার্স এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার, ২০১২), খ.১, পৃ.৯১”। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: মুহাম্মাদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রসূল এবং শেষ নবী। “আল-কুরআন, ৩৩:৪০”।
অভিধানে কোন কিছুর মূলকে উম্মুন বা মাতা বলা হয়। ‘উম্মুন’ অর্থ মাতা; জননী। আরবীতে শব্দটির বহুবচন ‘উম্মাহাত’ ও ‘উম্মাত’। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম শব্দটি মানজাতির জন্য এবং দ্বিতীয় শব্দটি জীবজন্তুর জন্য ব্যবহৃত হয়। ফকীহগণ বলেন, যে নারীর গর্ভ থেকে মানুষ জন্মলাভ করে তিনি সেই মানুষের প্রকৃত মাতা। আর যে নারীর সন্তান কাউকে জন্ম দেয় সেই নারীও রূপকার্থে তার মাতা। পিতার মা হলে তিনি দাদী এবং মায়ের মা হলে তিনি নানী। যে মহিলা কোন শিশুকে দুধ পান করান, অথচ তাকে গর্ভে ধারণ করেননি, তিনি তার দুধমাতা। “আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, পৃ.৮৪” পবিত্র কুরআনে এ শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আর আমি মূসা-এর মায়ের প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম যে, তাকে দুধ পান করাতে থাক। “অলÑকুরআন, ২৮:০৭”
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীগণকে মাতা বলে ফেলে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্মদান করেছেন। তারা তো অসমীচীন ও ভিত্তিহীন কথাই বলে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মার্জনাকারী ও ক্ষমাশীল। “আল-কুরআন, ৫৮:০২”। আরবীতে জন্মদাতা ও জন্মদাত্রীকে যাথাক্রমে ওয়ালিদ ও ওয়ালিদাহ বলা হয়। অতএব পিতা-মাতার সংজ্ঞা ক্ষেত্রে এ আইন ও ফকীহগণের মতামতের মধ্যে পার্থক্য নেই।
‘ভরণ-পোষণ’ শব্দটির আরবী প্রতিশব্দ হলো নাফাকাতুন। এর অর্থ হলো খরচ, ব্যয়, জীবন নির্বাহের ব্যয়, খোরপোষ। পরিভাষায়, ‘নাফাকাহ’ বা খোরপোষ হলো অপচয় ছাড়া যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ জীবনধারাণ করে। “আলÑমাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২, পৃ,১০৩”। অর্থাৎ যা জীবন ধারণের ভিত্তি। সুতরাং জীবন ধারণের মৌলিক চাহিদাসমূহ তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে? বল, ‘তোমরা যে সম্পদ ব্যয় করবে, তা পিতা-মাতা, আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য। আর যে কোন ভাল কাজ তোমরা কর, নিশ্চয় সে ব্যাপারে আল্লাহ সুপরিজ্ঞাত। “আল-কুরআন ০২:২১৫”। (অসমাপ্ত)