বিভাগ: ইসলামের আলো

ইসলামে মানব সম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
১. কুরআন অধ্যয়ন : কুরআন হচ্ছে মুমিনের গাইড লাইন, জীবন বিধান। এর মধ্যে আল্লাহ তাআলা মানুষের করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছেন। সুন্দর চরিত্র গড়ে তোলার জন্য সবার আগে তাই কুরআন অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। কুরআন অধ্যয়ন বলতে শুধু দেখে তিলাওয়াত বুঝায় না। বরং কুরআন অধ্যয়ন হলো এর মমার্থ, তাৎপর্য, তাৎপর্য ও গুরুত্ব অনুধাবন করে পড়া। শুধু দেখে দেখে কুরআন তেলাওয়াত করলে চরিত্রের উপর তার সর্বব্যাপক প্রভাব পড়বে না। তাই সুন্দর চরিত্র গড়ে তুলতে হলে বুঝে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। বুঝে কুরআন তিলাওয়াত না করে শুধু দেখে তিলাওয়াত করলে সওয়াব পাওয়া যাবে, কিন্তু তাতে কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য সাধিত হবে না। কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য হল, কুরআনকে চরিত্রে পরিণত করা। যেমন আল্লাহর রাসূল (সা.) এর ইন্তিকালের পর সাহাবীগণ যখন তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলেন, আয়িশা (রা.) বিনা দ্বিধায় বলে দিলেন। অর্থাৎ তোমরা যে কুরআন পড় সে কুরআনই তাঁর চরিত্র। একজন ব্যক্তি যদি দাবি আদায় করে আল-কুরআন তিলাওয়াত করেন, তাহলে কুরআনই তাকে পথ দেখিয়ে দেবে। আর কুরআন মাজীদের শিক্ষা ব্যক্তির আত্মিক-আচরণিক ও বৈষয়িক উন্নতিতে সন্দেহাতীতভাবে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে সক্ষম হবে।
২. হাদীস অধ্যয়ন : আল-কুরআনের ব্যাখা হলো হাদীস। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা যে কোনো হুকুমের মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) সে মূলনীতি বাস্তবায়নের পথনির্দেশ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে থেকে কোনো কথা বা তত্ত্ব হাদীসের মাধ্যমে পেশ করেননি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন। আর তিনি (মুহাম্মাদ সা.) নিজে প্রবৃত্তি থেকে কোনো কথা বলেন না। তাঁর নিকট প্রেরিত ওহী ছাড়া এগুলো আর কিছু নয়। অন্যত্র সকল মানুষকে আল্লাহ তাআলা আদেশ দিয়েছেন। রাসূল তোমাদেরকে যা দেন (অর্থাৎ যা করতে নির্দেশ দেন) তা গ্রহণ করো আর যা থেকে তিনি বিরত থাকতে বলেন, তা থেকে বিরত থাকো। তাই কুরআন মাজীদের বিধি ও অনুশাসন সঠিকভাবে মেনে চলার জন্য হাদীস অধ্যয়ন করতে হবে। হাদীস অধ্যয়নও ব্যক্তির সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
৩. সত্য বলা : সত্য কথা বলা সুন্দর চরিত্রের শ্রেষ্ঠতম প্রকাশ। সত্যবাদী হওয়া ছাড়া মুমিন হওয়া যায় না। ইসলাম সত্য, বাকী সবকিছু মিথ্যা। এখন কেউ যদি সত্যকে ধারণ করে সে ধারণ করবে ইসলামকে। আর কেউ যদি মিথ্যা বলার অভ্যাস করে, সে অবশ্যই ইসলাম বর্জনকারী হবে। সত্য মানুষকে সততার পথে পরিচালিত করে, আর মিথ্যা পাপের পথে পরিচালিত করে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- নিশ্চয়ই সত্য মানুষকে সততার পথ দেখায়, আর সততা জান্নাতের পথ দেখায় এমনকি কোন ব্যক্তি সত্য বলতে বলতে আল্লাহর নিকট সিদ্দীক বা পরম সত্যবাদী হিসাবে লিখিত হয়, আর মিথ্যা মানুষকে পাপাচারের পথ দেখায়, আর পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়, এমনকি কোন ব্যক্তি মিথ্যা বলতে বলতে আল্লাহর নিকট কাযযাব বা চরম মিথ্যাবাদী হিসাবে লিখিত হয়। সত্যবাদীগণ আল্লাহ তাআলার পরম সন্তোষ ও সাফল্য লাভ করে থাকেন। যেমন, আল্লাহ বলেন, এটা তো সেদিন, যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সত্যবাদিতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য রয়েছে এমন জান্নাত যার নিচ দিয়ে ঝর্ণাসমূহ বয়ে যায়, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটাই তো মহাসাফল্য। সত্য বলার অভ্যাস মানুষের ব্যক্তিত্বকে এমন উন্নত করবে যে, সে সকলের বিশ্বাসভাজন হবে।
৪. সবর : সবর বা ধৈর্য ধারণ করা সুন্দর চরিত্রের একটি অনিবার্য দিক। ধৈর্যধারণ ছাড়া সুন্দর চরিত্র সার্থক ও অর্থবহ হয় না। সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হতে হলে তাই ধৈর্যের অনুশীলন করতে হবে। কুরআন মাজীদে এসেছে, আল্লাহ তা’আলা ভালোবাসেন ধৈর্যশীলদের। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আছেন ধৈর্যশীলদের সাথে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সবর বা ধৈর্যের বিনিময় হলো জান্নাত। ধৈর্যশীল মানুষ নিঃসন্দেহে অনন্য গুণের অধিকারী। মানবকে সম্পদে পরিণত করার অন্যতম মৌলিক এ গুণটি অর্জন করা ইসলাম মুমিনের জন্য আবশ্যিক করেছে।
৫. কৃতজ্ঞতা : আল্লাহ তাআলা মানুষকে অসংখ্য নিআমাত দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার এ নিআমতসমূহের বিনিময়ে তাঁর আদেশ পালন করা হলো কৃতজ্ঞতা জানানো। আল্লাহ তাআলার আদেশ মেনে চললে মানুষ কোনো খারাপ কাজ করতে পারবে না। ফলে তার চরিত্র সুন্দর হবে। আল্লাহ তাঁর নিআমত আরো অধিকাহারে শোকরকারীকে দান করবেন। যেমন তিনি বলেছেন, যদি তোমরা শোকর করো, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের নিআমত বাড়িয়ে দেববো। যারা আল্লাহ তাআলার নিআমতের শোকর করে তাদের পক্ষেই অন্যান্যদের উপকার স্বীকার করা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সম্ভব। কৃতজ্ঞ মানুষকে আল্লাহ তাআলা যেমন ভালবাসেন তেমনি মানুষও কৃতজ্ঞ মানুষের জন্য আরও কিছু করার আগ্রহ পোষণ করে থাকেন। ইসলামের শিক্ষা মানুষকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে অভ্যস্ত করে তোলে। এতে ব্যক্তি সর্বজনপ্রিয় ও শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠে।
৬. আমানত সুরক্ষা : মানুষের নৈতিক উন্নয়নের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ আমানতদারিতা। আমানতদারিতা এক মহান নৈতিক গুণ। এ গুণ মানুষের কাছে মানুষকে বিশ্বাসভাজন ও ভালোবাসার পাত্র করে তুলে। মানুষ অবলীলায় তার কথা শোনে। তার কাছে তাদের সম্পদ এমনকি সম্মান পর্যন্ত আমানত রাখতে দ্বিধাবোধ করে না। ঈমান ও আমানতদারিতা অবিচ্ছেদ্য বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার আমানতদারিতা নেই তার ঈমান নেই। আল্লাহ তাআলা আমানত সুরক্ষাকে ফরয করেছেন। কুরআন মাজীদে এসেছে, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দিতে। মানবসম্পদ উন্নয়নে গৃহীত বিপুল কর্মসূচি, বিস্তারিত কর্মশালা দিয়ে ব্যক্তির ভেতর আমানতদারিতা তৈরির নিরন্তর চেষ্টা পরিচালনা করতে দেখা যায়। অথচ ঈমান ও ইসলামের শিক্ষা ব্যক্তিকে আখিরাতে জবাবদিহিতার চেতনায় স্বভাবতই আমানতদার করে তুলে।
৭. ওয়াদা পালন : ওয়াদা এক ধরনের আমানত। কাউকে কথা দিলে তা রাখতে হয়। ওয়াদা করলে তা পালন করতে হয়। আল্লাহ তাআলা ওয়াদালঙ্ঘনকারীকে ভালোবাসেন না। তিনি ওয়াদা পালনের আদেশ দিয়ে বলেন, মুমিনগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ করো। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে ওয়াদা রক্ষা করেছেন। তাঁর সাহাবীগণ এ ব্যাপারে তাঁকে পুরোপুুরি অনুসরণ করেছেন। ওয়াদা পালন প্রতিশ্র“তি রক্ষা মানবিক উন্নয়নের অন্যতম দৃষ্টান্ত। ঈমান আনার সাথে সাথে ব্যক্তি প্রতিশ্র“তি পালনেও প্রত্যয় গ্রহণ করে।
৮. হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকা : সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হওয়ার প্রধান উপায় হলো হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করা। হিংসা, অহঙ্কার, ঘৃণা, নিজেকে বড় এবং অন্যকে নীচ মনে করার হীনমানসিকতা সুন্দর চরিত্রের সম্পূর্ণ বিরোধী বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) হিংসা-অহঙ্কারকে পুণ্য ধ্বংসের কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা আগুন যেমন কাঠ ভস্মীভূত করে, হিংসা-বিদ্বেষও তেমনি সৎ আমল নষ্ট করে। হিংসা-বিদ্বেষ মানবিক গুণ বিরোধী। এটি মানুষকে দাম্ভিক করে। এমন ব্যক্তি কোন কাজে সফল হতে পারে না। মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তাই হিংসা-বিদ্বেষ থেকে ব্যক্তিকে মুক্ত করার কথা বলা হয়ে থাকে। ঈমান এমন একটি অনন্য প্রশিক্ষণ, যা মানুষকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে রেখে সকলের নিকট প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় করে তুলে।
৯. ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা : মানবসম্পদ ধ্বংসের ক্ষেত্রে ধূমপান ও মাদকাসক্তির কুপ্রভাব অত্যন্ত কার্যকর। ইসলাম তাই ধূমপান ও মাদকাসক্তি ত্যাগের নির্দেশনা দিয়েছে। ধূমপানে অর্থ-সম্পদের অপচয় হয়, ব্যক্তির নিজের ও অন্যের ক্ষতি হয়। আল্লাহ তাআলা এসবই হারাম ঘোষণা করে বলেছেন: আর কোনোক্রমেই অপচয় করবে না। নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।
অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা মাদক সেবনকে সরাসরি হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী এবং ভাগ্য নির্ধারক তীর অবশ্যই শয়তানের অপবিত্র ও ঘৃণ্য কাজের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই তোমরা তা বর্জন করো, তাহলে তোমরা কল্যাণ লাভ করবে। বিভিন্ন সংস্থা এবং দেশ এমনকি আন্তর্জাতিক নানা সংঘ ধূমপান ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেও তেমন কোন সুফল অর্জন করতে পারেনি। ফলে এর ক্ষতি থেকে মানবজাতিকে সঠিকভাবে রক্ষা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অথচ ইসলামের ঘোষণা ও শিক্ষা এক্ষেত্রে মুমিনকে ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে প্রকৃতার্থেই দূরে রাখতে সক্ষম।
১০. কথা ও কাজে মিল রাখা : কথায়-কাজে মিল রাখা সুন্দর চরিত্র অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা কথা-কাজের অমিলকে হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা তোমরা করো না? আল্লাহর নিকট এটা অত্যন্ত অপ্রিয় যে, তোমরা যা বলো তা করো না। মানবসম্পদের প্রকৃত উন্নয়ন সাধনের জন্য কথা ও কাজের মিল থাকা আবশ্যক। কারণ কথা ও কাজের বৈপরীত্য থাকলে মানুষকে প্রকৃত মানুষ বলা চলে না। এমন মানুষকে কেউ ভালোবাসে না। বিশ্বাসও করে না। কথা ও কাজের মিল প্রতিষ্ঠাকে ঈমানের অনিবার্য শর্ত করে দিয়ে ইসলামে মানবসম্পদ উন্নয়নের ঈমানী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
উপসংহার : বস্তুত মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন, মানবিক ও নৈতিক গুণে বিভূষিত হওয়া, মানুষকে আত্মিক ও বাহ্যিক দিক থেকে সত্যিকার গুণ ও আচরণে সমৃদ্ধ সম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত সকল চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। সে কারণে তথাকথিত সভ্য সমাজে, অফিসে, দেশে, পরিবারে মানুষের কাছে মানুষের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মানুষই মানুষের সম্পদ, সম্মান ও জীবনের হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। মানুষের আচরণ স্বার্থপরতা, হীনতা ও পাশবিকতায় ভরে ওঠেছে। এ অবস্থা নির্মূল করে মানুষকে সত্যিকারার্থে সম্পদে পরিণত করার জন্য ইসলামী আদর্শ ও শিক্ষার অনুশীলন অনিবার্যÑআলোচ্য নিবন্ধে উপস্থাপিত তথ্য, প্রমাণ ও বিশ্লেষণ এ বিষয়টির অবিসংবাদিত প্রমাণ। এ কারণে মানবসম্পদের চিরস্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সর্বক্ষেত্রে ইসলামের অনুশীলন অনিবার্য। (সমাপ্ত)

ইসলামে মানব সম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
কর্তব্য পালন : ইসলাম সাধারণভাবে সকল মানুষকে কর্তব্যপরায়ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সকলের জন্য অর্পিত কর্তব্য পালন আবশ্যিক করেছে এবং এ ক্ষেত্রে যে কোন অবহেলাকে আল্লাহ তাআলার নিকট জবাবদিহিতার বিষয় বলে সতর্ক করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব, ইমাম বা নেতা, যিনি জনগণের ওপর দায়িত্ববান-তিনি তার অধীনদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবেন। আর ব্যক্তি, যে তার পরিবারের সদস্যদের দায়িত্বশীল- সে তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী দায়িত্বশীল তার স্বামীর পরিবারের সদস্যদের ও সন্তান-সন্ততির। সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আর দাস ব্যক্তি তার মনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল এবং সে এই সম্পদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। কাজেই সতর্ক হও! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে (পরকালে আল্লাহর নিকট) জিজ্ঞাসিত হবে। ইসলাম একন্তভাবে মানুষকে এ শিক্ষা দিয়েছে, কেউ কারো বোঝা বহন করবে না।
আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন, যারা সরল-সঠিক পথে পরিচালিত হবে নিশ্চয় তারা তাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যই সঠিক পথে পরিচালিত হবে। আর যারা ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হবে তারা ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হবে তাদের নিজেদের ধ্বংসের জন্যই। কেউ কারো কাজের দায় বহন করবে না। আর আমি রাসূল পাঠিয়ে সতর্ক করা ছাড়া কাউকে শাস্তি দেই না। ইসলামের এ নীতি একান্তভাবে দায়িত্ব সচেতন করে এবং দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে। এ নীতি মানুষকে এমনভাবে ভাবতে শেখায় যে, কেউ অন্য কারো কবরে যাবে না। কেউ অন্য কারো কাজের জবাবদিহিতা করবে না। সাধারণভাবে কেউ অন্য কারো কাজের সুফল বা দায় ভোগ করবে না। বরং প্রত্যেককে নিজ নিজ কাজের সুফল বা কুফল ভোগ করতে হবে। এ শিক্ষার ফলে মানুষ নিজেকে দায়িত্বশীল, কর্তব্যপরায়ণ হিসেবে গড়ে তোলে। এটি তার ব্যক্তি সত্তার উন্নতি বিধান করে।
যোগ্যতা অর্জন ও দক্ষতা বৃদ্ধি : ইসলাম মানুষে মানুষে মানবিক কোন ব্যবধান বা বৈষম্য স্বীকার করেনি। মানবিক মর্যাদায় সাধারণভাবে সকলকে সমান মর্যাদা ও গুরুত্ব প্রদান করেছে। মানুষের উৎস ও বিস্তার সম্পর্কে বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা এ বিষয়টি নির্দেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন, যিনি সৃষ্টি করেছেন সে ব্যক্তি থেকে তার জোড়া, আর তাদের দুজন থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন অসংখ্য পুরুষ ও নারী। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অন্যের নিকট কিছু চাও। আর তোমরা আত্মীয়দের (হক আদায় ও সম্পর্ক অটুট রাখার) ব্যাপারে সতর্ক হও। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে মানবজাতি! সাবধান! নিশ্চয় তোমাদের রব একজন, তোমাদের পিতাও একজন। সতর্ক হও! কোন আরবের উপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোন অনারবের উপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোন কালোর উপর সাদার কিংবা সাদার উপর কালোর তাকওয়া ব্যতীত কোন মর্যাদা নেই। সাধারণভাবে সকল মানুষকে এভাবে সমান ঘোষণার পর কুরআন ও হাদীসে মানুষের উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বের জন্য বিশেষ যোগ্যতা অর্জনের তাগিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।
পরকালীন সফলতা-ব্যর্থতার মাপকাঠি : নিঃসন্দেহে মানবসম্পদ উন্নয়নে ইসলামের সবচেয়ে বড় প্রেরণা এর পরকাল বিষয়ক মূল্যবোধ ও নীতিমালা। দুনিয়াতে একজন লোক যদি আর্থিক বা শারীরিক কিংবা সামাজিক দিক থেকে গ্রহণীয় হয় অথবা কেউ যদি সকল দিক থেকে অগ্রহণযোগ্য হয় তাহলে দুনিয়ার বিচারে লোকটির জীবন সফল হয়েছে বা ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। কিন্তু আখিরাতে ব্যক্তির সফলতা নির্ভর করে একান্তভাবে ব্যক্তির সঠিক বিশ্বাস, সৎকর্ম, সৎচিন্তা ও সৎ জীবনযাপনের উপর। এর অর্থ হল ব্যক্তি যদি সমাজের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য বা সমাজে সম্মানিত হওয়ার জন্য এমন কোন কাজ করে ইসলামের দৃষ্টিতে যা সম্মানজনক নয় তাহলে আখিরাতে তার জন্য কিছুই থাকবে না। আবার বাহ্যত অসম্মানজনক বা নিপীড়নমূলক প্রমাণ হলেও আখিরাতে হয়তো কাজটি অত্যন্ত সম্মানের হতে পারে। এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দুনিয়ায় লাভ-লোকসানের বিবেচনা ছাড়া একজন মানুষ আখিরাতে সফল হওয়ার জন্য ভেতরে-বাহিরে সৎ জীবন-যাপন করার চেষ্টা করে। কাউকে দেখানোর কারো মনোঃতুষ্টির আকাক্সক্ষা সে একেবারেই পোষণ করে না। সে দুনিয়াকে ততটুকুই গুরুত্ব প্রদান করে যতটুকু গুরুত্ব প্রদানের নির্দেশ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন : তোমরা কি আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের উপকরণ অত্যন্ত কম। অন্যত্র তিনি বলেন, আখিরাত তো নিশ্চয় শ্রেষ্ঠতম পর্যায় এবং মর্যাদায় মহত্তম। দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার্থে আল্লাহ তাআলা বলেন, আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর, তবে তোমার দুনিয়ার অংশ ভুলে যেয়ো না।
আখিরাতের বিশ্বাস মানুষকে কেবল সৎকাজ করতেই উদ্বুদ্ধ করে না; বরং কাজটি একান্তভাবে আল্লাহ তাআলার জন্য করতে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে সৎকাজ করা হলে তা পুরস্কারযোগ্য হয় না। তাও শাস্তিযোগ্য আমলে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : কিয়ামাতের দিন মানুষের মধ্যে প্রথম যার বিচার হবে সে হবে একজন শহীদ। তাকে আল্লাহর দরবারে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর নিআমতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও তা স্মরণ করবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি দুনিয়াতে এর বিনিময়ে কী কাজ করেছো? সে উত্তর দেবে- আমি তোমার পথে যুদ্ধ করেছি; এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি এ জন্যে যুদ্ধ করেছো যেনো তোমাকে বীরপুরুষ বলা হয়। আর তা তোমাকে বলা হয়েছে। এরপর তার ব্যাপারে ফেরেশতাগণকে আদেশ করা হবে। তারা তাকে উপুড় করে টেনে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
দ্বিতীয়ত যার বিচার হবে সে হবে একজন আলিম। সে নিজে শিক্ষা লাভ করেছে, অপরকে তা শিখিয়েছে এবং কুরআন পড়েছে। তাকে আল্লাহর দরবারে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর নিআমতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও তা স্মরণ করবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি দুনিয়াতে এর বিনিময় কী কাজ করেছো? সে উত্তর দেবে, দুনিয়াতে আমি শিক্ষা লাভ করেছি, অন্যকে শিখিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করছি। আল্লাহ বলবেন- তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি এ জন্যে জ্ঞান অর্জন করেছিলে যেনো তোমাকে জ্ঞানী বলা হয়। কুরআন মাজীদ এ জন্যে তিলাওয়াত করেছি যেনো তোমাকে কারী বলা হয়। আর তোমাকে তা বলা হয়েছে। এরপর তার ব্যাপারে ফেরেশতাগণকে আদেশ করা হবে। তারা তাকে উপুড় করে টেনে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
তৃতীয়ত যার বিচার হবে সে হবে একজন সম্পদশালী ব্যক্তি। আল্লাহ তাকে সচ্ছল করেছেন এবং বিপুল সম্পদ দিয়েছেন। তাকে আল্লাহর দরবারে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর নিআমতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও তা স্মরণ করবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি দুনিয়াতে এর বিনিময়ে কী কাজ করেছো? সে উত্তর দেবে, যে পথে খরচ করলে তুমি খুশি হও, সে জাতীয় সব পথেই তোমার সন্তুষ্টির জন্য আমি খরচ করেছি। আল্লাহ বলবেনÑ তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমিতো এগুলো এ জন্যে করেছো যেনো তোমাকে দানবীর বলা হয়। আর তোমাকে তা বলা হয়েছে। এরপর তার ব্যাপারে ফেরেশতাকে আদেশ করা হবে। তারা তাকে উপুর করে টেনে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত সংক্ষেপে কিন্তু স্পষ্টভাষায় ঘোষণা করেছেন, কাজেই ধ্বংস সেই সকল সালাত আদায়কারীর জন্য, যারা তাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন, যারা লোক দেখানোর জন্য সালাত আদায় করে। বস্তুত আখিরাতে সফলতা লাভই মুমিনের মূল লক্ষ্য। এ কারণে ইসলামে বিশ্বাসী একজন লোক দুনিয়ার সকল কাজই আল্লাহর সন্তুষ্টি জন্য করেন। যে কারণে তার মধ্যে লোক দেখানোর বিষয়টি একেবারেই থাকে না। ফলে মানসিক দিক থেকে তিনি পরম উৎকর্ষ লাভ করতে সক্ষম হন। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ বা প্রেম তাকে কোনক্রমেই মন্দ কাজে নিয়োজিত করতে পারে না।
নৈতিক উন্নয়ন : নৈতিক উন্নয়ন ছাড়া যে কোন উন্নয়নই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি প্রেরিত হয়েছি সুমহান নৈতিক গুণাবলির পূর্ণতা সাধনের জন্য। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন কাজ অধিকাংশ লোককে জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তিনি উত্তরে বলেছেন, কিয়ামাতের দিন যে জিনিসটি মুমিনের পাল্লায় সবচেয়ে ভারি হবে তা হল ‘তাকওয়া ও উত্তম চরিত্র। রাসূলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন, কিয়ামতের দিন যে জিনিসটি মুমিনের পাল্লায় সবচেয়ে ভারি হবে তা হল উত্তম চরিত্র। নাওয়াস ইবনে সামআন আল-আনসারী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা. কে বির সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তরে বলেছেন, ‘সুন্দর ব্যবহারই পুণ্য। তিনি সত্যিকার ও পূর্ণ মুমিন হিসেবে সে ব্যক্তিকেই অভিহিত করেছেন যার চরিত্র সুন্দর। তিনি বলেছেন, চরিত্রের বিচারে যে উত্তম মুমিনদের মধ্যে সেই পূর্ণ ঈমানের অধিকারী। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে ছিলাম। এমন সময় জনৈক আনসারী ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ (রা.) কে সালাম করলেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ মুমিনদের মধ্যে সর্বোত্তম কে? তিনি জবাব দিলেন, তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো সেই ব্যক্তি যার চরিত্র সর্বোত্তম। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা মুমিনের অসংখ্য নৈতিক গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন : নিশ্চয় মুমিনগণ সফল, যারা তাদের সালাতে ভীত ও বিনয়ী, যারা নিজেদেরকে অর্থহীন কাজ থেকে বিরত রাখে, যারা যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে কর্মতৎপর হয় এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গ হিফাযত করে। বস্তুত ইসলাম যে বিষয়গুলোকে চরিত্রের সুন্দর দিক এবং অবশ্য অর্জনীয় গুণ হিসেবে ঘোষণা করে সেগুলোকে আত্মার গুণ হিসেবে আত্মস্থ করা, নৈতিক বৈশিষ্ট্যের পরিণত করা এবং জীবনাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা গেলে স্বভাবতই মানুষ সম্পদে পরিণত হবে। যে সম্পদ দুনিয়ায় ব্যক্তির নিজের এবং অপরাপর সকলের কল্যাণ ও মুক্তি নিশ্চিত করবে। প্রসঙ্গত নৈতিক উন্নয়নে ইসলামের কিছু নির্দেশনা উল্লেখ করা যায়। যেমন- (অসমাপ্ত)

ইসলামে মানব সম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
জ্ঞান অর্জন ঃ মুমিন হওয়ার জন্য জ্ঞান অর্জনকে ইসলাম প্রথম শর্ত হিসেবে গণ্য করেছে। আল্লাহ তাআলা প্রথম মানুষ আদম (আ.) কে সৃষ্টির পর সবার আগে বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান দান করেছেন এবং এ জ্ঞানের পরীক্ষাতেই আদম (আ.) এর মাধ্যমে ফেরেশতাদের উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। কুরআন মজীদে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আল্লাহ আদমকে প্রতিটি বিষয়ের নাম শেখালেন। এরপর তা ফেরেশতাদের সামনে পেশ করলেন এবং বললেন, ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক, তাহলে আমাদের এগুলোর নামসমূহ জানাও।’ ফেরেশতাগণ বললেন, আপনি মহাপবিত্র। আপনি আমাদের যা শেখান, তা ছাড়া আমাদের কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয় আপনি মহাজ্ঞানী, মহা প্রজ্ঞাময়।’ আল্লাহ বললেন,‘হে আদম! তুমি তাদেরকে বিষয়গুলোর নাম জানিয়ে দাও।’এরপর যখন আদম তাদেরকে বিষয়গুলোর নাম জানিয়ে দিলেন, আল্লাহ তাআলা বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, নিশ্চয় আমি আকাশসমূহ ও পৃথিবীর অদৃশ্য সম্পর্কে জানি? আর আমি খুব ভালভাবেই জানি যা তোমরা প্রকাশ কর এবং যা গোপন রাখ। যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলীস ছাড়া সকলেই সিজদা করল। ইবলীস অবাধ্য হল ও অহঙ্কার করল এবং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন রিসালাত লাভ করলেন তখন তাঁর উপর প্রথম যে ওহী নাযিল হল তাও জ্ঞানার্জন বিষয়ক। হিরাগুহায় ধ্যানমগ্ন রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রথম ওহী লাভ করলেন, পড়–ন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন; যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত হতে। পড়–ন এবং আপনার প্রতিপালক মহাসম্মানিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন তা, যা সে জানত না। জ্ঞানকে মর্যাদা ও কল্যাণের বাহন বর্ণনাকরে আল-কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।” অন্যত্র বলা হয়েছে, তিনি যাকে ইচ্ছা হিকমাত দান করেন। আর যাকে হিকমাত দেয়া হয় তাকে বিপুল কল্যাণ দান করা হয়। আর জ্ঞানীরা ছাড়া কেউ তো উপদেশ গ্রহণ করে না। আল্লাহ তাআলা সাধারণভাবে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি উচ্চতর গবেষণারও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অতএব হে চক্ষুষ্মান মানুষেরা! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো। জ্ঞানের প্রতি আল্লাহ তাআলার এমন গুরুত্বারোপের পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (সা.) জ্ঞান অর্জনকে ফরয ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রতিজন মুসলিমের উপর ফরয। জ্ঞানীকে তিনি নবী-রাসূলগণের উত্তরসূরী আখ্যায়িত করে বলেছেন, আলিমগণ নবীগণের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ উত্তরাধিকার হিসেবে দীনার বা দিরহাম রেখে যাননি। তারা উত্তরাধিকার রেখে গেছেন শুধু জ্ঞান। তাই যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করেছে সে অর্জন করেছে উত্তরাধিকারের পুরো অংশ। জ্ঞানার্জনের কাজকে তিনি আল্লাহর পথে জিহাদের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণে বের হয়েছে, সে আল্লাহর পথে রয়েছে, যতক্ষণ না সে প্রত্যাবর্তন করে। এভাবে ইসলাম জ্ঞানার্জন ও গবেষণার কাজকে বাধ্যতামূলক রেখে মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এতে এমন বিধান রাখা হয় যে, একজন মানুষ মুসলিম হলে তাকে অবশ্যই শিক্ষিত হতে হয়। শিক্ষিত হওয়া ছাড়া মুসলিম হওয়ার বিষয়টি বিধিগতভাবে অসম্ভব বলে গণ্য হয়।
জীবিকা অর্জন : আল্লাহ তাআলার ইবাদত যেমন ফরয, ইসলামে জীবিকা উপার্জনকে তেমন ফরজ করা হয়েছে। কুরআন মাজীদে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, এরপর যখন সালাত আদায় শেষ হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে, আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করবে এবং আল্লাহর বেশি বেশি যিকর করবে, এতে তোমরা সফল হবে। আবার জীবিকা উপার্জনের ক্ষেত্রেও হালা-হারামের সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে এমন প্রবলভাবে যে, ইবাদত কবুল হবে কি না, ব্যক্তি জান্নাতে যাবে কি না তা একান্তভাবে জীবিকা উপার্জনের পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল রাখা হয়েছে। ফলে ইসলামে একজন ব্যক্তি কেবল জীবিকাই উপার্জন করে না বরং হালাল উপায় অবলম্বন করে বৈধভাবে জীবিকা উপার্জন করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হালাল উপার্জন অন্বেষণ করা ফরযের পরে ফরয। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, তোমরা উত্তম ও পবিত্র বস্তু আহার করো, যা আমি তোমাদের জীবিকারূপে দিয়েছি এবং কৃতজ্ঞতা আদায় করো আল্লাহর, যদি তোমরা একান্তই তাঁর ইবাদাত করো। আল্লাহর রাসূল (সা.) এ প্রেক্ষাপটেই বলেছেন, হারাম সম্পদে তৈরি গোশত ও রক্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং হারাম সম্পদে তৈরি প্রতি টুকরো গোশত ও প্রতি ফোটা রক্তের জন্যে নরকই যথোপযুক্ত আবাস।
স্বনির্ভরতা অর্জন : ইসলামে কেউ কারো গলগ্রহ হয়ে থাকাকে সমর্থন করা হয়নি। ব্যক্তি নিজে উপার্জন করবে, নিজের আয়ের উপর নির্ভর করবে। অন্য কারো আয়ে ভাগ বসাবে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, পবিত্রতম উপার্জন হলো মানুষের নিজের হাতের পরিশ্রম এবং প্রত্যেক বিশুদ্ধ ব্যবসায় (এর উপার্জন)। স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য কাজ করতে হলে কেউ যেন তাতে দ্বিধা না করে, লজ্জিতবোধ না করে তা নিশ্চিত করার জন্য ইসলামের শ্রম ও শ্রমিককে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। নানাভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা শ্রম পছন্দ করেন। শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে তিনি বলেছেন, যারা তোমাদের কাজ করে জীবিকা উপার্জন করে, সে শ্রমিক তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তাই যাদের কাছে এমন লোক আছে তাদেরকে যেন তা-ই খেতে দেয় যা তারা নিজেরা খায়, তাদেরকে যেন তা-ই পরতে দেয়, যা তারা নিজেরা পরে। তোমরা তাদেরকে তাদের সামর্থ্যরে বাইরে কোনো কাজ করতে বাধ্য করবে না। যদি তাদেরকে তোমরা কোনো কঠিন কাজ করতে দাও, তা হলে তোমরা তাদের সহযোগিতা করবে। শ্রমিককে যেন তার প্রাপ্য মজুরির জন্য নিয়োগকর্তার পেছনে ঘুরতে না হয় এবং শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিয়ে নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকের মধ্যে যেন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তা নিশ্চিত করার জন্য আল্লাহর রাসূল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, শ্রমিককে তার ঘাম শুকানোর আগেই পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দাও। অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে রাফি’ ইবনু খাদীজ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কে একদা জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন প্রকারের উপার্জন উত্তম ও পবিত্রতম? তিনি বলেছেন, ব্যক্তির নিজের শ্রমের উপার্জন ও সৎ ব্যবসায়লব্ধ মুনাফা। আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল (সা.) নানাভাবে মানুষকে কাজ করায় উৎসাহ দিয়েছেন। ভিক্ষাবৃত্তির প্রতি অনীহা তৈরির জন্য রাসূল (সা.) বলেছেন, নিচের হাতের চেয়ে উপরের হাত উত্তম। আল্লাহ তা’আলার হুকুম আর আল্লাহর রাসূলের এ নির্দেশনা মেনে ব্যক্তি যদি স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে অনিবার্যরূপে তাঁর ব্যক্তিত্ব, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে। এভাবে উন্নয়ন ঘটবে মানবের। অদক্ষ-অক্ষম বোঝার পরিবর্তে ব্যক্তি উন্নত সম্পদে পরিণত হবে। (অসমাপ্ত)

ইসলামে মানব সম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

মানুষ মহান আল্লাহর সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্টি। এই মানুষকে কেন্দ্র করেই সমগ্র সৃষ্টিজগতের সকল আয়োজন। আধুনিককালে মানুষের জীবন কীভাবে আরো ফলপ্রসূ করা যায় তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ এই মানুষের উন্নয়ন সাধন করে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিয়োজিত করতে হলে প্রয়োজন যথার্থ কৌশল প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন। আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য একমাত্র জীবনব্যবস্থা ইসলাম মানবসম্পদ উন্নয়নে কী কী নির্দেশনা দিয়েছে তা এই প্রবন্ধে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নের পরিচয়, এ ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা বাস্তবায়নে জ্ঞান অর্জন, জীবিকা অর্জন, স্বনির্ভরতা অর্জন, কর্তব্য পালন, যোগ্যতা অর্জন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে ইসলামের গুরুত্বারোপ ও কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা আরোপ বিষয়ে অত্র প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নে পরকালীন চেতনা ও নৈতিকতার গুরুত্বকে দলীলসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রবন্ধের শেষাংশে নৈতিক উন্নয়নে ইসলামের নির্দেশনাসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধটি মূলত কুরআন ও হাদীসের বর্ণনাভিত্তিক একটি প্রাথমিক উপস্থাপনা।
মানবসম্পদ উন্নয়ন আধুনিক উন্নয়ন চিন্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ ধারণা। বিশ শতকের শেষ দশকে এ ধারণার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে। বর্তমানে উন্নয়ন চিন্তার ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়ন ধারণাটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে এবং সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা অন্য যে উন্নয়নের কথাই বলা হোক, সকল উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মানবসম্পদ। একে ঘিরে এবং এর জন্যই সকল উন্নয়ন প্রচেষ্টা। টেকসই উন্নয়ন, সমন্বিত উন্নয়ন ধারণা, সামগ্রিক উন্নতি বা সর্বাত্মক সুষম উন্নয়ন, সকল ক্ষেত্রে মানুষের সুখ-সুবিধাই মূল বিবেচ্য হয়ে থাকে। মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া প্রাকৃতিক, নৈসর্গিক বা পরিবেশগত কোনো সুবিধা গ্রহণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। বর্তমাান উন্নয়ন ধারায় প্রথমে তাই মানবসম্পদ উন্ননে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণকে আবশ্যিক বলে গণ্য করা হয়। ইসলাম গোড়া থেকেই মানবসম্পদ উন্নয়নকে সামগ্রিক উন্নয়নের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হিসেবে গণ্য করেছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম মানবকে সত্যিকারার্থে শ্রেষ্ঠতম সম্পদ বলে ঘোষণা করেছে এবং এর উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বিধি-ব্যবস্থাসমূহ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মানব সম্পদ উন্নয়ন ধারণাটির বিকাশ ও বিস্তারে যে পরিমাণ গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে এবং গুরুত্ব প্রদানের প্রেক্ষাপটে যে ফল লাভ হচ্ছে তা নিতান্তই অপ্রতুল। এতে মানুষের বৈষয়িক উন্নয়ন কিছুটা হয়তো হচ্ছে, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ, সহানুভূতি, সহযোগিতা ও ভালোবাসা বস্তুগত অর্জনের কাছে প্রতিনিয়ত মার খেয়ে যাচ্ছে। মানবিক বিপর্যয়ের চালচিত্র প্রতিদিনই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশ পাচ্ছে, যা মানবসম্পদ উন্নয়ন ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এমতাবস্থায় মানবসম্পদ উন্নয়নে ইসলামের ভূমিকা বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন একান্ত আবশ্যক। এ বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন মানবসম্পদ উন্নয়নে আধুনিক প্রচেষ্টার ব্যর্থতা এবং সফলভাবে মানবসম্পদ উন্নয়নের পথ নির্দেশ করবে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিচিতি : উন্নয়ন একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রক্রিয়া, যা সমগ্র সমাজকে অন্তর্ভূক্ত করে। এতে একটি সমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ভৌত কাঠামো, পাশাপাশি সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ ব্যবস্থা ও জীবন ধারণা পদ্ধতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধিত হয়। উন্নয়ন একটি ব্যাপক ধারণা, যা একটি সমাজকে বর্তমান অবস্থান থেকে অধিকতর কাম্য অবস্থানের উদ্দেশ্যে পরিচালিত করে এবং এই কাম্য লক্ষ্যটি নির্ধারিত হয় ঐ সমাজের জনগণের ইতিহাস অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান হতে। উন্নয়নের মূল কেন্দ্রবিন্দু মানুষ। এটি একটি পথ মাত্র, চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। যে উন্নয়নে মানুষের জীবন উন্নত হয় না বা যাতে মানুষের অংশগ্রহণ থাকে না, সে উন্নয়ন উন্নয়নই নয়। এ বোধই মানবসম্পদ উন্নয়ন ধারণার জনক, যার মূল কথা মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জন্য উন্নয়ন এবং মানুষের দ্বারা উন্নয়ন। উন্নয়ন সম্পর্কিত নতুন এ ধারণাটির উদ্ভবের ফলে মানবিক দিকটি যথেষ্ট গুরুত্ব লাভ করে। বৈশ্বিকরণ প্রক্রিয়া জোরেসোরে উচ্চারিত হওয়ার সময়ও স্থিতিশীল ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের সাথে মানব উন্নয়নকে আবশ্যিকভাবে যুক্ত করা হয়। কারণ মানব উন্নয়ন ধারণা সৃষ্টিশীলতা ও বিকাশকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। সাধারণ কথায়, মানবসম্পদ উন্নয়নকে বলা হয়, চবড়ঢ়ষব ঈবহঃৎব উবাবষড়ঢ়সবহঃ অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যবস্থা হবে সম্পূর্ণ মানবকেন্দ্রিক; মানুষ নিজেরা নিজেদের দৈহিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন ঘটাবে এবং নিজেরাই তার ফল ভোগ করবে। শিক্ষাবিদ-গবেষকগণের কেউ কেউ মানবসম্পদ উন্নয়নকে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেখেছেন যা কর্ম-কৃতিত্ব (ঔড়ন চবৎভড়ৎসধহপব) বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। তারা বলেছেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন হলো কর্ম-কৃতিত্ব উন্নয়ন বৃদ্ধির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ে সংগঠিত শিক্ষা অভিজ্ঞতা।
মানবসম্পদ উন্নয়নে ইসলামের পদক্ষেপসমূহ ঃ ইসলামে মানব উন্নয়ন আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক উন্নয়নের মূল বিষয়। কুরআন মাজীদের মৌলিক বিষয় হলো মুসলিমের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত সমৃদ্ধি ও কল্যাণের জন্য মানব উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ গঠন। এ উন্নয়নের জন্য ইসলাম মানুষের দৈহিক আকৃতিতে মানুষ হওয়ার সাথে সাথে মানবিক ঔদার্য ও মানসিক সৌন্দর্যের অধিকারী হওয়ার উপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। ইসলাম ঘোষণা করেছে, আল্লাহ তা’য়ালার সৃষ্টি হিসেবে মানুষ সম্মানিত এবং শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তা’লাই মানুষকে এ শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি তোমাদেরকে দুনিয়ার প্রতিনিধি বানিয়েছেন’।
তিনি অন্যত্র বলেছেন: নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি, তাদেরকে স্থলভাগে ও সাগরে চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে পবিত্র জীবিকা দিয়েছি এবং আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। তবে মানুষের এ শ্রেষ্ঠত্বকে আল্লাহ তা’য়ালা স্থায়ী ও অক্ষয় করে দেননি। বরং মানুষের আচরণিক ও আত্মিক উন্নয়ন করা ও না করার উপর এর ভিত্তি স্থাপন করেছেন। কেউ যদি আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশনা মেনে নিজের আচরণ ও মানসিকতা উন্নত করে তাহলে সে তার শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণœ রাখতে পারবে। আর যদি এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয় তাহলে নীচ থেকে নীচতর স্তরে নেমে যাবে। ‘‘আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে বলেছেন: নিশ্চয় আমি মানুষকে সুন্দরতম করে সৃষ্টি করেছি। এরপর আমি তাকে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে দিয়েছি’’। মানুষের মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুণœ রাখার পথ হিসেবে আচরণিক ও আত্মিক উন্নয়ন অনিবার্য করে ইসলামে মানবসম্পদ উন্নয়ন চেষ্টা নৈতিকভাবে সকলের জন্য বিধিবদ্ধ উপায়ে আবশ্যিক করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আবশ্যিক হয়েছে জ্ঞান অর্জন, হালাল জীবিকা উপার্জন ও গ্রহণ, স্বনির্ভরতা অর্জন, কর্তব্য পালন, যোগ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ, আখিরাতে সফলতা- ব্যর্থতাকে মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ এবং বিশেষভাবে নৈতিক উন্নয়ন। (অসমাপ্ত)

বিধবা নারীর সর্বোচ্চ মর্যাদা ও অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
ইজ্জত-আবরু নিয়ে জীবন-যাপনের অধিকার ঃ ইসলাম বিধবা নারীকে ইজ্জত-আবরু নিয়ে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। কোন নারীর স্বামী মৃত্যুবরণ করলে স্বাভাবিকভাবে সে অসহায় বোধ করে ও নিরাপত্তাহীন দিন কাটায়। এ সুযোগে অনেকেই তাদেরকে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করে, তাদেরকে বিয়ের প্রলোভন দেখায় ও অশোভনীয় আচরণ করে থাকে। ইসলাম এহেন আচরণ করতে নিষেধ করেছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘‘আর যদি তোমরা আকারে-ইঙ্গিতে সে নারীর বিয়ের পয়গাম দাও, কিংবা নিজেদের মনে কোন আকাক্সক্ষা লুকিয়ে রাখ, তবে তাতে ও কোন পাপ নেই, আল্লাহ জানেন যে, তোমরা অবশ্যই সে নারীর কথা উল্লেখ করবে। কিন্তু তাদের সাথে বিয়ে করার গোপন প্রতিশ্র“তি দিয়ে রেখো না। অবশ্য শরীয়তের নির্ধারিত প্রথা অনুযায়ী কোন কথা সাব্যস্ত করে নেবে। আর নির্ধারিত ইদ্দত সমাপ্তি পর্যায়ে না যাওয়া অবধি বিয়ে করার কোন ইচ্ছে কর না। আর এ কথা জেনে রেখো যে, তোমাদের মনে যে কথা রয়েছে, আল্লাহর তা জানা আছে। কাজেই তাকে ভয় করতে থাক। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ ক্ষমাকারী ও ধৈর্যশীল। এ প্রসঙ্গে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আব্বাস রা. বলেন: যদি কোন ব্যক্তি ইদ্দত পালনকারী কোন মহিলাকে বলে যে, আমার বিবাহ করার ইচ্ছা আছে। আমি কোন সতী মহিলাকে পেতে ইচ্ছা পোষণ করি। কাসিম (র.) বলেন, এই আয়াতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, যেন কোন ব্যক্তি বলল, তুমি আমার কাছে খুবই সম্মানিত এবং আমি তোমাকে পছন্দ করি। আল্লাহ তোমার জন্য কল্যাণ বর্ষণ করুন। অথবা এই ধরনের উক্তি। আতা (র.) বলেন, বিবাহের ইচ্ছা ইশারায় ব্যক্ত করা উচিত, খোলাখুলি এই ধরনের কোন কথা বলা ঠিক নয়। কেউ এ ধরনের কথা বলতে পারে যে, আমার এ সকল গুণের প্রয়েজন আছে। আর আপনার জন্য সুখবর, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য আপনি পুনঃবিবাহর উপযুক্ত। সে মহিলা ও বলতে পারে, আপনি যা বলেছেন, তা আমি শুনেছি কিন্তু এর বেশি ওয়াদা করা ঠিক নয়। তার অভিভাবকদের ও অজ্ঞাতে কোন প্রকার ওয়াদা দেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু যদি কেউ ইদ্দতের মাঝে কাউকে বিবাহের কোন প্রকার ওয়াদা করে এবং ইদ্দত শেষে সে ব্যক্তি যদি তাকে বিবাহ করে তবে সেই বিবাহ বিচ্ছেদ করতে হবে না। ইসলাম বিধবাদের সম্ভ্রমের নিরাপত্তা প্রদান করেছে। জাহিলী যুগের ন্যায় পিতার মৃত্যুর পর তার পুত্র কর্তৃক বিধবা স্ত্রীদের বিবাহ নিষেধ করেছে। এ প্রসঙ্গে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ‘‘বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত. তিনি বলেন, আমার মামা আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। (রাবী হুশাইম তার বর্ণিত রিওয়ায়েতে বারা ইবনু আযিব (রা.) এর মামার নাম হারিছ ইবনু আমর উল্লেখ করেছেন।) রাসূলুল্লাহ (স.) তার জন্য একটি ঝাগুা তৈরি করে দিয়েছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন রাসূলুল্লাহ (স.) আমাকে এক ব্যক্তির কাছে পাঠিয়েছেন, যে তার পিতার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে বিবাহ করেছে। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন তাকে হত্যা করি।
অর্থনৈতিক অধিকার ঃ ইসলামী আইন বিধবা নারীদের যে সকল অধিকার দিয়েছে, তার মধ্যে অর্থনৈতিক অধিকার অন্যতম। ইসলাম প্রত্যেক বিবাহিতা নারীর মোহরের অধিকার দিয়েছে। “ম্হোর আরবী শব্দ, অর্থ-স্বেচ্ছাকৃত দান। মুসলিম আইন অনুসারে বিবাহের চুক্তিকালে বর কর্তৃক কন্যাকে যে অর্থ দেয়া হয় তাউ মোহর এবং তা স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তিরূপে গণ্য হয়। ইসলাম পূর্বকলে মোহর ওয়ালীর হাতে অর্থাৎ পিতা, ভাই বা যে আত্মীয়ের অভিভাবকত্বে কন্যা থাকত তার হাতে প্রদান করা হত। মোহরের পরিমাণ স্বামীর আর্থিক স্বচ্ছলতার ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে। ইসলামে মোহর দু ভাবে নির্ধারণ করা হয়। ইসলামী আইনে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে বিবাহের সময়ই সন্তষ্টচিত্তে মোহর পরিশোধের নির্দেশনা প্রদান করেছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, আর তেমরা স্ত্রীদের কে তাদের মোহর খুশিমনে দিয়ে দাও।
এ প্রসঙ্গে ইমাম বুখারি (রহ.) উল্লেখ করেন, ‘‘আর অধিক মোহর এবং সর্বনিম্ন মোহর কত?- এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, “এবং তোমাদের যদি তাদের একজনকে অগাধ অর্থ দিয়ে থাক, তবুও তা থেকে কিছু গ্রহন করো না ” এবং আল্লাহ তাআলা আরো বলেন “অথবা তোমরা তাদের মোহরের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দাও”। সাহল (রা.) বলেছেন নবী সা এক ব্যক্তিকে বললেন, যদি একটি লোহার আংটিও হয় তবে মোহর হিসাবে যোগাড় করে দাও। “বুখারী, আস-সহীহ,অধ্যায়: আন-নিকাহ, পরিচ্ছেদ: আল্লাহর বাণী:- আর যদি বিবাহে মোহর নির্ধারণ না হয়ে থাকে এবং স্বামী মৃত্যুবরণ করে, তাহলে ঐ বিধবাকে মহরের মিছল “মোহরে মিছিল হচ্ছে যে বিয়েতে মোহরের পরিমাণ যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হয় না; বরং স্ত্রী আর্থিক অবস্থা, পারিবারিক মর্যাদা, স্ত্রী বোন অথবা পিতার পরিবারের অন্যান্য কন্যা যথা: ফুফুর মোহরের অনুপাত এবং গুণাগুণ অনুসারে যে মোহর প্রদান করা হয়। যে সব ক্ষেত্রে বিয়েতে লেনদেন নির্দিষ্ট করা হয় না, সে সব ক্ষেত্রে এই মোহর মিছলই নির্ধারণ হবে। মোহর পরিশোধ সম্পর্কে হাফিয ইবনে কাসীর (রা.) উল্লেখ করেছেন, “স্ত্রীর সম্মতি সাপেক্ষে স্বামীগণ মোহর বিবাহের পরও পরিশোধ করতে পারে। কিন্তু মোহর পরিশোধের পূর্বেই যদি স্বামী মৃত্যুবরণ করে, তবে স্ত্রীর নিকট স্বামী মোহর বাবদ ঋণী হয়ে থাকবে। তাই স্ত্রী তার ঋণ আদায়ের জন্য স্বামীর সম্পত্তি আটক করার অধিকার রাখে। এ প্রসঙ্গে মুসলিম আইন গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, “কোন মৃত মুসলমানের উত্তরাধিকারীরা দেনমোহরের ঋণের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী নয়। মৃতের কাছে প্রাপ্য অন্যান্য ঋণের মত দেন মোহর ঋণেও উত্তরাধিকারীর মৃতের সম্পত্তিতে প্রাপ্য অংশের আনুপাতিক হারে প্রত্যেক উত্তরাধিকারী দায়ী হবে। কোন মহিলার স্বামীর সম্পত্তি তার দখলে থাকলে স্বামীর অন্যান্য উত্তরাধিকারীরা তাদের নিজ নিজ অংশের দখল উদ্ধার করতে পারবে। একজন মুসলমান এক বিধবা এক পুুুত্র ও দু কন্যা রেখে মারা যায়। বিধবা ৩২০০ টাকার দেনমোহর ঋণ পাবার অধিকারী। পুত্রের প্রাপ্য অংশ হল ৭/১৬ এবং সে ৭/১৬ এর ৩২০০ = ১৪০০ টাকা দিতে বাধ্য, এবং বিধবার দখলে স্বামীর সম্পত্তি থাকলে পুত্র ১৪০০ টাকা পরিশোধ করে বিধবার থেকে নিজ অংশ নিবে। প্রত্যেক কন্যার প্রাপ্য অংশ হল ৭/৩২ এবং সে বিধবাকে ৭/৩২ এর ৩২০০= ৭০০ টাকা প্রদান করার পর নিজ অংশ পাবে।
ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়কে মিরাস প্রাপ্তির অধিকার দিয়েছে এবং তাদের জন্য আল্লাহ কর্তৃক নির্ধরিত অংশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অংশ রয়েছে , ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের অংশ রয়েছে, সন্তানের সম্পত্তিতে মায়ের অংশ রয়েছে, তদ্রƒপ মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে ও স্ত্রীর নির্ধারিত অংশ রয়েছে। পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অংশ- সন্তানের সম্পত্তিতে মাতার অংশ- স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অংশ-ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের অংশ- এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, স্ত্রীদের জন্য এক-চতুর্থাংশ হবে ঐ সম্পত্তির, যা তোমরা ছেড়ে যাও যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্য হবে ঐ সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ। আলোচ্য আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (স.) এর সাথে বেরিয়ে আল-আসওয়াফ নামক স্থানে এক আনসারী মহিলার নিকট উপস্থিত হই। তখন ঐ মহিলা তার দুটি মেয়েকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (স.) এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এরা সাবিত ইবনু কায়িস রা.-এ কন্যা। এদের বাবা আপনার সাথে ওহুদের যৃদ্ধে গিয়ে শাহাদত বরণ করেছেন। এদের চাচা এদের সমস্ত সম্পদ আত্মসাৎ করে নিয়ে গেছে। এদের জন্য কোন কিছু রাখেনি। সম্পদ ছাড়া তো এদের বিয়ে দেওয়া যাবে না। (অর্থাৎ সহায়- সম্পত্তিহীন এ মেয়েদেরকে কেউ বিয়ে করবে না।) রাসূলুল্লাহ (স.) বললেন: আল্লাহ এ ব্যাপারে ফয়সালা করবেন। তখন মিরাসের আয়াত নাযিল হয়। মিরাসের আয়াত নাযিল হলে রাসূলুল্লাহ (স.) মেয়েদের চাচার কাছে লোক পাঠিয়ে বলেন : সাবিতের মেয়েদের তার সম্পদের তিন ভাগের দু‘ভাগ দিয়ে দাও এবং তাদের মাকে আট ভাগের এক ভাগ দাও। আর বাকী অংশ তোমার। ইমাম আবূ দাউদ (রহ.) বলেন, বর্ণনাকারী বিশর ভুল করেছেন। আসলে মেয়ে দু’টি সা’দ ইবনু রবী (রা.) এর কন্যা। কারণ সাবিত ইবনু কায়িস (রা.) শহীদ হন ইয়ামামার যুদ্ধে।
মতামত প্রকাশের অধিকার ঃ ইসলাম একটি সহজাত ধর্ম। কোন নারীর স্বামী মৃত্যুবরণ করলে স্বভাবতই সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং নিজের মতামত প্রকাশের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এই সুযোগে অনেকেই তাদেরকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। তাই ইসলাম বিধবাদের অধিকার সমুন্নত রাখার জন্য তাদের মতামতের উপর গুরুত্ব দিয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা নারী ইদ্দত পালনের মাধ্যমে তার গর্ভে সন্তানের অস্তিত্ব নিশ্চিত করে থাকে। কিন্তু বিধবা নারীর ঐ সময়ের মনসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে ইসলাম ইদ্দত পালনের স্থান নির্বাচনে তার মতামতের উপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, অতঃপর যদি সে স্ত্রী নিজ থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে সে নারী নিজের ব্যাপারে কোন উত্তম ব্যবস্থা করে, তবে তাতে তোমাদের উপর কোন পাপ নেই।
বিধবা নারীর পুনরায় বিবাহের প্রস্তাব আসলে তার মতামত ব্যতীত বিবাহ শুদ্ধ হবে না। ইসলামী আইনে বিবাহের প্রস্তাবে নারী যদি চুপ থাকে, তাহলে তার সম্মতি রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু বিধবা নারীর পুনরায় বিবাহের প্রস্তাব আসলে তার মৌখিক সম্মতি প্রয়োজন। কেননা অনেক ক্ষেত্রে তাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ও তার সম্পত্তি গ্রাস করার জন্য ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবাহ দেওয়া হয়ে থাকে। তাই বিধবা নারীর অধিকার রয়েছে মৌখিকভাবে তার মতামত প্রকাশ করার। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করা রয়েছে, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) বলেছেন : পূর্ব বিবাহিতা তার (নিজের বিবাহের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে) নিজের ব্যাপারে অভিভাবকের তুলনায় অধিক হক্বদার। কুমারীকে তার থেকে তার সম্মতি নিতে হবে, তার নিরবতাই তা সম্মতি। বিধবা নারীকে জোর জবরদস্তি করে বিবাহ দিলে, সে বিবাহ ভঙ্গ করার অধিকার তার রয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, খানসা বিনতে খিযাম (রা.) থেকে বর্ণিত। তার পিতা তাকে বিবাহ দিলেন তিনি ছিলেন সায়্যিব (বিবাহিত নারী), তিনি তা অপছন্দ করলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (স.) এ নিকট গেলেন তিনি এ বিবাহ ভেঙ্গে দিলেন। (অসমাপ্ত)

বিধবা নারীর সর্বোচ্চ মর্যাদা ও অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। এ বিধানে মানবজাতির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সকল করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। এখানে জন্মের পর পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, আবার কারো জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটলেও তার বিধি-বিধান আলোচনা করা হয়েছে। বিবাহিত ব্যক্তির মৃত্যুর কারণে তার স্ত্রী বিধবা হয়ে যায়। আর ইসলামের বিধানানুযায়ী সে স্ত্রীর উপর বিভিন্ন দায়িত্ব ও কর্তব্য চলে আসে। আর এ কর্তব্য পালনের মাধ্যমে সে নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পারে, পাশাপাশি সমাজকেও তার অবস্থান পরিষ্কার করতে পারে। আর এভাবে সে তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি তার অধিকারগুলো আদায় করতে পারে। আর তা না হলে এ স্বামীহারা এ স্ত্রী তার জীবন, সম্ভ্রম, ভরণ-পোষণ ও তার সম্পদ প্রাপ্তির নিরাপত্তাহীনতায় সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। পরিবার সমাজ তার কাছে অপরিচিত মনে হতে থাকে, সে সবার করুণার পাত্র হয়ে যায়। বিভিন্ন ধর্মীয় আইন তাদের অধিকারের নামে যে সকল বিধি বিধান আরোপ করে, তাতে একজন বিধবা তার স্বকীয়তা হারায়, তার অধিকার থেকে সে হয় বঞ্চিত, তার মর্যাদা হয় ভূলুন্ঠিত আর সমাজে নেমে আসে বিপর্যয়। যার কারণে সমাজে বৃদ্ধি পায় অপরাধ, মানবসমাজ সংক্রমিত হয় নতুন নতুন মরণ ব্যাধিতে আর বৃদ্ধি পায় হাহাকার ও বঞ্চনা। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে সৃষ্টি করার পাশাপাশি তাদের অধিকার ও অক্ষুন্ন রাখার জন্য দিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন। যার মাধ্যমে সমাজ থেকে বঞ্চিতদের হাহাকার দূর হবে, বঞ্চিতরা ফিরে পাবে তাদের প্রাপ্য অধিকার, আর সমাজ হয়ে উঠবে ভারসাম্যপূর্ণ। আর আল্লাহ তা’আলা মানব জাতির মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার জন্য তাদের বিভিন্নভাবে পরীক্ষা দিয়ে থাকেন। আর বিধবাদের মাধ্যমে ও তিনি আমাদের পরীক্ষা করেন। কেননা এর মাধ্যমে এদিকে বিধবা নিজে অসহায়ত্ববোধ করে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অনীহা প্রকাশ করে, আর অপর দিকে সমাজ তার অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে তার প্রতি অনুকম্পা প্রর্দশন করে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। জন্মের পর যে বিষয়টি অনিবার্য তা হল মৃত্যু। এই মৃত্যুর মাধ্যমে পুত্র তার পিতা, বোন তার ভাই আর স্ত্রী তার স্বামীকে হারিয়ে থাকে। আর এই হারানোর বেদনা সকলকেই কম-বেশি ক্ষত-বিক্ষত করে তোলে। আর তাই বলে তো জীবন থেমে থাকে না। জীবন হচ্ছে স্রোতের মতো, জীবনীশক্তি থাকলে সে চলতেই থাকবে। মানব জীবনে যত দুঃখ কষ্ট আসুক না কেন, তাকে তা পাড়ি দেওয়ার মতো ক্ষমতা আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। আর রাতের অন্ধকার যতই গভীর হোক না কেন, দিনের আলো অনিবার্য। ঠিক তেমনি ভাবে কোন নারীর স্বামী মৃত্যুবরণ করলে সে গভীর রাতের মতো দুঃখ কষ্টে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, কাছের মানুষ তার অচেনা হয়ে পড়ে, সে ভাবতে থাকে তার জীবনে হয়ত বা আর সূর্য্যরে ন্যায় আলো আসবে না। কিন্তু রাত দিনের মালিক তো আল্লাহ। আর আল্লাহর বিধানের কোন পরিবর্তন ঘটে না। আল্লাহ তাআলা রাত দিনের যেমন বিধি বিধান দিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে মানব জীবনে প্রতিটি অধ্যায়ের সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। তাইতো ইসলামকে বলা হয়ে থাকে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এখানে যেভাবে স্বামী-স্ত্রীর বন্ধনের কথা বলা হয়েছে তদ্রƒপ এ বন্ধন কোন কারণে ছিন্ন হলেও তার সমাধান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানব জাতি তার বিধান লঙ্ঘন করার কারণে পৃথীবিতে দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। তাই বিধবা মহিলাগণ লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার স্বীকার। শুধুমাত্র ইসলামী বিধানই দিতে পারে তাদের মুক্তি, মর্যাদা ও অধিকার।
ইসলামী আইনে বিধবাদের মর্যাদা ঃ ইসলাম বিধবা নারীদের দিয়েছে মর্যাদা, সম্মান ও অধিকার। যদি কোন বিধবা পুনরায় বিবাহ না করে তার ইজ্জত-আবরু রক্ষা করে তার মৃত স্বামীর স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, ইসলাম তাকেও স্বাগত জানায় এবং তার জন্য বিশেষ মর্যাদা ঘোষণা করে। এ প্রসঙ্গে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আউফ বিন মালিক আশজায়ী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, আমি এবং কষ্ট মেহনতের কারনে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া মহিলা কিয়ামতের দিন দুই আঙ্গুলের মত নিকটবর্তী হব। রাসূলুল্লাহ (স.) তর্জনী ও মধ্যমা পাশাপাশি করে দেখালেন। বংশীয় ও কৌলিন্য ও সৌন্দর্যের অধিকারিনী যে বিধবা নারী প্রয়োজন থাকা সত্বেও ইয়াতিম সন্তানের লালন পালনের উদ্দেশ্যে দ্বিতীবার স্বামী গ্রহণ থেকে বিরত রেখেছে। এ প্রসঙ্গে আরো বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আমিই ঐ ব্যক্তি যার জন্য সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজা খোলা হবে। কিন্তু এক মহিলা এসে আমার আগে জান্নাতে যেতে চাইবে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করবো যে, তোমার কি হল? তুমি কে? তখন সে বলবে আমি ঐ মহিলা যে স্বীয় ইয়াতিম বাচ্চার লালন-পালনের জন্য নিজেকে আটকে রেখেছি (বিবাহ করা থেকে)। অপর এক হাদীসে বিধবা ও ইয়াতিমদের যারা সাহায্য সহযোগিতা করে, তাদের কে মুজাহিদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেছেন: বিধবা ও মিসকিনের জন্য খাদ্য জোগাড় করতে চেষ্টারত ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের মতো অথবা রাতে সালাতে দন্ডায়মান ও দিনে সিয়াম পালনকারীর মত।
ইসলামী আইনে বিধবাদের অধিকার ঃ বৈধব হচ্ছে জীবনের অনাকাক্সিক্ষত একটি পরিণতি। এই পরিণতি অত্যন্ত দুঃখের। মানব জীবনের এই অবস্থাতে সে অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়ে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ নারীর জীবন যেখানে পুরুষের উপর নির্ভরশীল, সেখানে বিধবাবস্থা নারীর জীবনে দূর্যোগ নিয়ে আসে। ইসলাম পূর্ব আরবে বিধবাদের সাথে অমানবিক আচরণ করা হত। কোন নারী বিধবা হলে তাকে তার স্বামীর সম্পত্তি থেকে অংশ দেয়া হত না; বরং তাকেই সম্পত্তি হিসাবে গণ্য করে তা উত্তরাধিকারীরা তার সম্পত্তি ও তাকে ভোগ করত। তাকে নির্জন ঘরে এক বছর যাবৎ আবদ্ধ করে রাখা হত এবং বছর শেষে পশু-পাখির বিষ্ঠা নিক্ষেপের মাধ্যমে বের হয়ে আসতে হত। ইসলাম বিধবাদের এই করুণ অবস্থা থেকে মুক্ত করে তাদের দিয়েছে সম্মান ও অধিকার।
ভর-পোষণের অধিকার ঃ ইসলাম বিধবাদের ভরণ-পোষণের অধিকার দিয়েছে। বিধবা নারী তার স্বামীর সম্পত্তি থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকার রাখে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- ‘‘আর যখন তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে তখন স্ত্রীদের ঘর থেকে বের না করে এক বছর পর্যন্ত তাদের খরচের ব্যাপারে ওসিয়ত করা যাবে। ‘‘আর যদি বিধবা নারীর নিজের ও সন্তানের ভর-পোষণের কোন অবলম্বন না থাকে, তাহলে রাষ্ট্র তাদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করবে। রাষ্ট্র তাদের আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের অভাব অনটন দূর করবে। এ প্রসঙ্গে হাদীসে উল্লেখ রয়েছে, আসলাম (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর সঙ্গে বাজারে বের হলাম। সেখানে একজন যুবতি মহিলা তার সাথে সাক্ষাৎ করে বলল, হে আমিরুল মু‘মিনীন, আমার স্বামী ছোট একটা বাচ্চা রেখে ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহর কসম, তাদের আহারের জন্য পাকানোর মত কোন বকরীর খুরাও নেই এবং নেই কোন ফসলের ব্যবস্থা ও দুধেল উঠ, বকরী। ভীষণ অভাবে তারা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে আমার আশঙ্কা হচ্ছে। অথচ আমি হলাম খুফাফ ইবনু আয়মা গিফারীর কন্যা। আমার পিতা নবী (স.) এর সঙ্গে হুদায়বিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ কথা শুনে উমর (রা.) তাঁকে অতিক্রম না করে পার্শ্বে দাঁড়ালেন। এরপর বললেন, তোমার গোত্রকে ধন্যবাদ। তারা তো আমার খুবই নিকটের মানুষ। এরপর তিনি বাড়ীতে এসে আস্তাবলে বাধা উঠের থেকে একটি মোটা তাজা উঠ এনে দুই বস্তা খাদ্য এবং এর মধ্যে কিছু নগদ অর্থ ও বস্ত্র রেখে এগুলো উক্ত উঠের পিঠে উঠিয়ে দিয়ে মহিলার হাতে লাগাম দিয়ে বললেন, তুমি এটি টেনে নিয়ে যাও। এগুলো শেষ হওয়ার পূর্বেই হয়ত আল্লাহ তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন। তখন এক ব্যক্তি বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি তাকে খুব বেশী দিলেন। উমর রা. বললেন, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক। আল্লাহর কসম, আমি দেখেছি এ মহিলার আব্বা ও ভাই র্দীঘদিন পর্যন্ত একটি দূর্গ অবরোধ করে রেখেছিলেন এবং পরে তাও জয়ও করেছিলেন। এরপর ঐ দূর্গ থেকে অর্জিত তাদের অংশ থেকে আমরাও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের দাবি করি (এবং কিছু অংশ আমরা নিজেরা গ্রহণ করি এবং কিছু অংশ তাদেরকে দেই।) (অসমাপ্ত)

কিশোর অপরাধ প্রতিকারে ইসলাম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যেখান-সেখান থেকে এবং যার তার নিকট হতে শিক্ষা  গ্রহণ সমীচীন নয়। প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, পাঠ্যক্রম, শিক্ষা  পদ্ধতি  এবং শিক্ষকের মান কাক্সিক্ষত না হলে শিশু-কিশোররা বিপথগামী হতে পারে। ইসলাম জ্ঞানার্জনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং শিক্ষা লাভকে সকলের মৌলিক ও অনিবার্য কর্তব্য বলে ঘোষণা করেছে। উত্তম শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদেরকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। আল-কুরআনে অনেকগুলো আয়াতে শিক্ষার বিষয়, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও শিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমি তোমাদের থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসূল পাঠিয়েছি। যিনি তোমাদেরকে আমার আয়াত পড়ে শুনান, তোমাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ ও বিকশিত করেন তোমাদেরকে আল-কিতাব (আল-কুরআন) ও হিকমাহ (সুন্নাহ) শিক্ষা দেন। আর যা তোমরা জানানো, সেগুলো শিক্ষা দেন।
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, (তারা) এমন কেন করলো না যে, তাদের  প্রত্যেক দল থেকেই কিছু কিছু লোক বের হতো, যাতে করে তারা দীন সম্পর্কে জ্ঞানানুশীলন করতো, অতঃপর যখন তারা নিজ নিজ জাতির কাছে ফিরে আসতো, তখন তাদের জাতিকে তারা সতর্ক করতো, যাতে করে তারা (ইসলাম বিরোধী কাজ থেকে) বিরত থাকতে পারে। এই আয়াতটিকে ইমাম কুরতুবী রহ. জ্ঞান শিক্ষার মৌলিক দলীল হিসেবে অভিহিত করেছেন। আলোচ্য আয়াতে ইলম শিক্ষার প্রকৃতি, পাঠ্যসূচী  এবং শিক্ষা লাভের পর শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব কী হবে তা বলে দেয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে মানবতার জন্য কল্যাণকর ও উপকারী জ্ঞান শিক্ষা প্রদানের নির্দেশনা হাদীসেও এসেছে। রাসুলুল্লাহ স. বলেছেন, মানুষেরা তোমাদের অনুসরণ করবে এবং দীনের মর্ম জ্ঞান উপলব্ধি করার জন্য বিশ্বের দিক দিগন্ত থেকে তোমাদের কাছে ছুটে আসবে। তারা যখন তোমাদের কাছে আসবে, তোমার তাদেরকে কল্যাণকর উপদেশ (শিক্ষা) দিবে।
অতএব, আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূলুল্লাহ (স.) প্রদর্শিত দিক নির্দেশনা অনুযায়ী শিশু-কিশোরদের উপযোগী কারিকুলাম বা পাঠ্যসূচী, উন্নত শিক্ষণ পদ্ধতি, শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত শিক্ষা সহায়ক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে পারলে কিশোর-কিশোরীদের অপরাধ প্রবণতা থেকে দূরে রাখা যাবে এবং তারা নৈতিক মানসম্পন্ন দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত হবে।
রাষ্ট্র বা সরকার সমাজের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোন ভূখন্ডের অধিবাসীরা তাদের সামাজিক জীবনের আইন-শৃংখলা, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সাধনের জন্য একটি নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। সরকার বিভিন্ন রকম আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রে বসবাসরত নাগরিকদের আচরণকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চালায়। বিধায় শিশু-কিশোরদের সামাজিক বিকাশ রাষ্ট্র দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিত হয়। দৈহিক ও মানসিকভাােব সুস্থ শিশু-কিশোর একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আজকের শিশু আগামী দিনে দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাদের একটি অংশ অবক্ষয়ের শিকার হয়ে অপরাধে লিপ্ত হোক এবং সমাজকে কলুষিত করুক এটি কারো কাম্য নয়। তাই কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এক্ষেত্রে সরকার শিশু-কিশোরদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন সব শিশু-কিশোরের জন্য শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ অবধারিত করা এবং পাঠ্যসূচীতে নৈতিকতার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। শিশু-কিশোরদের চিত্তবিনোদনের জন্য শিশু পার্ক, শিশু সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রচার-প্রসার ও খেলার মাঠ গড়ে তোলা এবং গণমাধ্যমে অশ্লীলদৃশ্য প্রদর্শন আইন করে বন্ধ করা। অনাথ, অসহায়, প্রতিবন্ধী ও শিশু কিশোরদের লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং তাদেরকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ গ্রহণ করা। এছাড়াও রাষ্ট্রের সার্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে সৎকাজের আদেশ দান এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে অন্যায় অপকর্ম প্রতিরোধ করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে কিশোর অপরাধ একটি জটিল ও মারাত্মক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে কিশোর অপরাধ প্রবণতার কারণগুলোকে পর্যালোচনা করলে যে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল পাওয়া যায় তা হলো, শিশু-কিশোররা বংশগতির মাধ্যমে উত্তরাধিকার সূত্রে অপরাধ প্রবণতা লাভ করে না, যেমন কিছু রোগ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়। কিশোর অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেকগুলো কারণ সম্পৃক্ত। যেমন পারিবারিক ভাঙন, গৃহের খারাপ পরিবেশ, অসৎ সঙ্গ, পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা, গণমাধ্যমে কুপ্রভাব ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ বা মনের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করা ইত্যাদি। তবে প্রবৃত্তির অনুসরণে মনের চাহিদানুযায়ী যা ইচ্ছা তা করাই কিশোর অপরাধের মূল কারণ। কেননা মনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভাল-মন্দ প্রতিটি কর্ম সম্পাদিত হয়। আর অন্যান্য কারণগুলো মনকে প্রভাবিত করে। মানুষের  মনের সঠিকতার উপর নির্ভর করে আচরণের সঠিকতা। মন যখন ঈমান, যথার্থ  ‘ইলম, ‘ইবাদত ও নৈতিক গুণাবলী দ্বারা সুশোভিত হবে, তখন ব্যক্তির সমস্ত কাজকর্ম সুন্দর হবে। সন্তানের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা পালন করতে পারে তার পরিবার। কেননা শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশ তার পিতা-মাতা ও অভিভাবকের সুশিক্ষা, সচ্চরিত্র এবং লালন-পালন সংক্রান্ত সার্বিক ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল। সমাজ থেকে কিশোর অপরাধ প্রতিকারে ইসলাম দু’ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তা হলো প্রতিরোধের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করা এবং অপরাধ সংঘটনের পর শিষ্টাচারমূলক শাস্তি প্রয়োগে কিশোর-কিশোরীকে সংশোধন করা।
অতএব, সমাজ থেকে কিশোর অপরাধ প্রতিকার করতে হলে ইসলামের বিধি-বিধানকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে মেনে চলা ও কার্যকর করা একান্ত কর্তব্য। একমাত্র ইসলামী বিধি-বিধানই হতে পারে কিশোর অপরাধ প্রতিকারের সর্বোত্তম পন্থা আর সেদিকেই প্রত্যাবর্তনের আহবান জানিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, এই হচ্ছে আমার অবলম্বিত সরল-সঠিক পথ। অতএব, তোমরা তারই অনুসরণ কর। এছাড়া অন্যান্য যেসব পথ রয়েছে, তা অনুসরণ করবে না। করলে তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে ভিন্নতর পথে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তোমাদের এই উপদেশ দিয়েছেন। আশা করা যায়, তোমরা বিভ্রান্তি থেকে বাঁচতে পারবে। (সমাপ্ত)

দারিদ্র্যতার কারণ ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাখিয়াছি মর্মন্তদ শাস্তি। আর মানুষ অকল্যাণ কামনা করে; যেইভাবে কল্যাণ কামনা করে; মানুষ তো অতি মাত্রায় ত্বরাপ্রিয়’’। ‘‘আল-কুরআন, ১৭:১০-১১’’।
বস্তুতান্ত্রিক নাস্তিকতা মানবজাতির জন্য ইহলৌকিক ও পারলৌকিক অকল্যাণকর, যা ইসলাম পছন্দ করে না; কিন্তু পাশ্চাত্য জগৎ ও অন্যান্য দেশে এমন কি মুসলিম দেশেও তাদের অনুসারীরা সে দিকেই ধেয়ে চলেছে। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘মহাকালের শপথ, মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু উহারা নহে, যাহারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়’’। ‘‘আল-কুরআন, ১০৩:১-৩।’’
দরিদ্র ও দারিদ্র্য সম্পর্কে ইসলাম ঃ ১. মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য: বৈষয়িক দরিদ্র ও দারিদ্র্য বিষয়ে ইসলামী ধারণা প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমাদের জেনে নেয়া প্রয়োজন আল্লাহ্ কেন মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আমি সৃষ্টি করিয়াছি জিন এবং মানুষকে এই জন্য যে, তাহারা আমারই ইবাদত করিবে। আমি উহাদের নিকট হইতে জীবিকা চাহি না এবং ইহাও চাহি না যে, উহারা আমার আহার্য যোগাইবে। আল্লাহই তো রিয্ক দান করেন এবং তিনি প্রবল, পরাক্রান্ত’’। ‘‘আল-কুরআন, ৫১:৫৬-৫৮।’’
আল্লাহ্ প্রতিটি প্রাণীর জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি বলেন: ‘‘সালাত সমাপ্ত হইলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়িবে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করিবে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করিবে যাহাতে তোমরা সফলকাম হও’’। ‘‘আল-কুরআন, ৬২:১০।’’ তিনি আরোও বলেন: ‘‘তোমরা কি দেখ না, আল্লাহ্ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে সমস্তই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁহার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করিয়াছেন? মানুষের মধ্যে কেহ কেহ অজ্ঞতাবশত আল্লাহ্ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে, তাহাদের না আছে পথনির্দেশক আর না আছে কোন দীপ্তিমান কিতাব’’। ‘‘আল-কুরআন, ৩১:২০।’’ আল্লাহ্ মানুষকে নির্দেশ করেন: ‘‘তিনিই তো তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম করিয়া দিয়াছেন; অতএব তোমরা উহার দিগ-দিগন্তে বিচরণ কর এবং তাঁহার প্রদত্ত জীবনোপকরণ হইতে আহার্য গ্রহণ কর; পুনরুত্থান তো তাঁহারই নিকট’’। ‘‘আল-কুরআন, ৬৭:১৫।’’ অতঃপর আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আল্লাহ্ যাহা তোমাকে দিয়াছেন তা দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া হইতে তোমার অংশ ভুলিও না; তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিতে চাহিও না। আল্লাহ্ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না’’। ‘‘আল-কুরআন, ২৮:৭৭।’’ এ ভাবে পৃথিবীতে রিয্ক অন্বেষণ, শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন ও অপরের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করে আখিরাতে সফলকাম হওয়ার জন্য আল্লাহর ইবাদত্ করার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ্ মানুষ সৃষ্টি করেছেন।
২. দরিদ্র ও দারিদ্র্যের ইসলামী ধারণা: ইসলামী জীবন দর্শনে দারিদ্র্যকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: (ক) আধ্যাত্মিক দারিদ্র্য এবং (খ) বস্তুগত দারিদ্র্য। ইসলাম যদিও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় তবুও এ বিষয় উপেক্ষা করেনি যে, মানুষের জন্য সে পরিমাণ পার্থিব সম্পদ অর্জন করা প্রয়োজন, যে পরিমাণ সম্পদ না থাকলে আল্লাহ্র ইবাদতে সম্পদের ঘাটতি জনিত উদ্বেগ উৎকন্ঠার কারণে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। আল্লাহ্ বলেন: “আল্লাহ্ যাহা তোমাকে দিয়াছেন তদ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া হইতে তোমার অংশ ভুলিও না”। “আল-কুরআন, ২৮:৭৭” অর্থাৎ সে পরিমাণ অর্জিত বস্তুগত সম্পদও পৃথিবীতে পার্থিব চিন্তামুক্ত মনে পারলৌকিক কল্যাণ ও সাফল্য লাভে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনে তাঁর ইবাদতের পথ সুগম করার জন্যই ব্যয় করতে হবে। আমরা এখানে এ দু’প্রকার দারিদ্র্য নিয়ে আলোচনা করব।
ক. আধ্যাত্মিক দারিদ্র্য: ইসলামের দৃষ্টিতে এই দুনিয়ায় সীমিত কালের জীবন যাপনের মুখ্য উদ্দেশ্যই হলো পারলৌকিক অনন্ত জীবনের মুক্তির পাথেয় সঞ্চয় করা। মানব জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যই হলো আল্লাহ্ সৃষ্ট এই সীমাহীন বিশ্বজগতের জ্ঞান আহরণ করা, যাতে তারা আল্লাহ্র দরবারে পৌঁছতে পারে এবং সেখানে তারা সেই সব প্রিয় মহামানবদের সান্নিধ্য লাভ করতে পারে যারা আল্লাহ্র সীমাহীন সৌন্দর্যের সাক্ষ্য দানে যথোপযুক্ত। এই অবস্থান লাভই তাদের জন্য সৌভাগ্যের চূড়ান্ত পর্যায় এবং এটাই আল্লাহ্র পক্ষ থেকে তাদের জন্য মহাপুরস্কার-জান্নাত বা বেহেশ্ত। পরকালে এই অবস্থান লাভের জন্যই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং সেখানেই তারা অনন্তকাল অবস্থান করবে।
এ দুনিয়ায় মানুষ দু’টি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল: একটি আত্মার বিকাশের পক্ষে যা কিছু ক্ষতিকর সে সকল কারণ থেকে আত্মরক্ষা করা এবং আত্মার বিকাশের ও পরিপূর্ণতার সহায়ক বিষয়গুলো ও নির্ধারণ করা। অপরটি দেহের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো থেকে আত্মরক্ষা করা ও দেহের সুস্থতা রক্ষার পন্থাগুলো অবলম্বন করা। আল্লাহ্ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান ও তাঁর পরিচয় লাভ করা এবং তাঁকে ভালবাসাই আত্মার আহার। এ বিষয়ে মানুষ যত বেশি যতœবান হবে ততই আত্মা পরিপুষ্ট হবে এবং তা তার জন্য ইহলৌকি ও পারলৌকিক মঙ্গল। অপরদিকে দেহের পরিপুষ্টি ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজন খাদ্য ও প্রয়োজনবোধে চিকিৎসা। মনে রাখা দরকার, দেহ নশ্বর কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর। আত্মার জন্যই দেহের প্রয়োজন এবং এ দুনিয়াতেই আত্মার পরিপুষ্টির কর্ষণ করতে হবে।
“দুনিয়ার মোহমায়ার অন্ত নাই। তবে মনে করিও না যে, দুনিয়ার যাবতীয় পদার্থই মন্দ এবং ক্ষতিকর; বরং দুনিয়ায় এমন কতগুলি বস্তু আছে যাহা বস্তুতঃ পারলৌকিক পদার্থ। যেমন, সৎজ্ঞান ও সৎকর্ম। এইগুলি দুনিয়ার অন্তর্গত হইলেও ইহা দুনিয়ার পদার্থের মধ্যে পরিগণিত নহে। এই দুইটি বস্তু মানবাত্মার সহিত পরকাল পর্যন্ত যাইবে”। “ইমাম গাযালী, হুজ্জাতুল ইসলাম, কিমিয়ায়ে সাআদাত, ঢাকা: অনুবাদক: মাওলানা নূরুর রহমান, এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ১৯৯৫, খ. ১, পৃ. ৮৬-৯৩”
দুনিয়ার ধনদৌলত ব্যবহার সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন: “দেখ, তোমরাই তো তাহারা যাহাদিগকে আল্লাহ্র পথে ব্যয় করিতে বলা হইয়াছে অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা করিতেছ। যাহারা কার্পণ্য করে তাহারা তো কার্পণ্য করে নিজেদেরই প্রতি। আল্লাহ্ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে স্থলবর্তী করিবেন; তাহারা তোমাদের মত হইবে না”। “আল-কুরআন, ৪৭:৩৮” এই পৃথিবীতে সত্য-জ্ঞানচক্ষু উন্মিলনের তাগিদ দিয়ে আল্লাহ্ আলো বলেন: “আর যে ব্যক্তি এইখানে অন্ধ সে আখিরাতেও অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট”। “আল-কুরআন, ১৭:৭২” আল্লাহ্ প্রদত্ত পরম সত্য-জ্ঞানহীন লোক ইহকালে আত্মা বিনষ্টকারী বলে ইহকাল ও পরকাল উভয়কালেই দরিদ্র, পার্থিব ধন-সম্পত্তি তার যাই থাক না কেন। মানুষের এই আধ্যাত্মিক দারিদ্র্যের প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ্ বলেন: “যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করিবেন; তাহারা তোমাদের মত হইবে না”। “আল-কুরআন, ৪৭:৩৮” আল্লাহ্ পুণ্যাত্মার বিকাশপ্রাপ্ত, আধ্যাত্মিক চর্চা ও জ্ঞান সমৃদ্ধ সম্ভ্রান্ত জাতির উপরই আস্থা রাখেন এবং তাদের পছন্দ করেন পারলৌকিক সম্পদহীন আড়ম্বরপূর্ণ পার্থিব জীবন যাপনকারী আত্মিক দরিদ্রের উপর নয়। তাই আল্লাহ্ বলেন: “যাহারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের চেয়ে ভালবাসে মানুষকে নিবৃত্ত করে আল্লাহ্র পথ হইতে এবং আল্লাহ্র পথ বক্র করিতে চাহে; উহারাই তো ঘোর বিভ্রান্তিতে রহিয়াছে”। “আল-কুরআন, ১৪:৩”
খ. বস্তুগত দরিদ্র ও দারিদ্র্য: ইসলামের দৃষ্টিতে বস্তুগত দরিদ্র ও দারিদ্র্য বিষয়ে আলোচনার আগে আমাদের সংসার বিরাগী বা যুহ্দ এবং আসলেও যারা বস্তুগতভাবে দারিদ্র্য তাদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে।
প্রকৃত সংসার বিরাগী বা যুহ্দ: এ বিষয়ে ইমাম গাযালী র.-এর ভাষ্য হলো: “যে ব্যক্তি বদান্যতা বা দানশীলতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে অথবা পারলৌকিক সৌভাগ্য অন্বেষণ ভিন্ন অপরকোন পার্থিব উদ্দেশ্যে সংসার ত্যাগ করিয়াছে, তাহাকে প্রকৃত যাহিদ বা সংসার বিরাগী বলা যাইবে না। আবার, কেবল পারলৌকিক শান্তির বিনিময়ে ইহকাল বিক্রয় করা তত্ত্বজ্ঞানী মহাপুরুষগণের নিকট নিতান্ত দুর্বল তুচ্ছ ধরনের ‘যুহদ’ বা বৈরাগ্য। পূর্ণ ও প্রকৃত যাহিদ সেই ব্যক্তিকেই বলা যাইতে পারে, যিনি ইহলোকের ভোগ-বিলাসের প্রতি যেমন অমনোযোগী, তদ্রƒপ পরলোকের চিরস্থায়ী ভোগ-বিলাস এবং সুখ-শান্তি হইতেও অমনোযোগী। অর্থাৎ তিনি পার্থিব সুখ-শান্তির বিনিময়ে পারলৌকিক শান্তি ভোগ করিতেও অনিচ্ছুক। …..ইহলোকের বিনিময়ে ইন্দ্রিয়ভোগ্য বেহেশ্ত পাইতে ইচ্ছুক না হইয়া উভয় জগতের বিনিময়ে কেবলমাত্র আল্লাহ্ তাআলাকে পাইতে চান এবং তাঁহারই দর্শন ও পরিচয়লব্ধ আনন্দে পরিতৃপ্ত থাকিতে উৎসুক হন। একমাত্র আল্লাহ তাআলার সত্তা ব্যতীত অন্য সমস্ত পদার্থই তাঁহাদের দৃষ্টিতে নিতান্ত তুচ্ছ এবং নগণ্য বলিয়া প্রতিপন্ন হয়। আল্লাহ্ তাআলার তত্ত্বজ্ঞানে যাহারা পরিপক্কতা লাভ করিয়াছেন কেবল তাহারাই এই শ্রেণীর ‘যাহিদ’ হইতে পারেন। এই শ্রেণীর সংসার বিরাগী লোক সাংসারিক ধনৈশ্বর্য হইতে পলায়ন না করিলেও ক্ষতি নাই; বরং তাঁহারা মাল-আসবাব পাইলেই গ্রহণ করিয়া থাকেন এবং নিজের জন্য কিছু না রাখিয়া যথাসময়ে যথাস্থানে ব্যয় করিয়া ফেলেন এবং উপযুক্ত প্রাপককে দান করিয়া থাকেন”। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৬-১৫৭”। এ ধরনের ‘যাহিদ’-এর দৃষ্টান্ত উসমান রা. ও আয়েশা রা.। বিপুল ধন-ভান্ডার হাতে পেয়েও উসমান রা. সমস্ত ধন উপযুক্ত প্রাপকের হাতে তুলে দিয়ে নিজে নিতান্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন। আয়েশা রা. লক্ষ মুদ্রা হাতে পেয়ে সমস্ত মুদ্রাই দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দিয়েছেন এবং রোযা ইফতারের পর নিজের আহারের জন্য একটি মুদ্রাও গোশ্ত ক্রয়ে ব্যয় করেন নি। (অসমাপ্ত)

দারিদ্র্যতার কারণ ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

দরিদ্র ও দারিদ্র্য বর্তমান বিশ্বে একটি অন্যতম আলোচিত বিষয়। এ বিষয়ে পাশ্চাত্যের বস্তুগত ধারণার সাথে ইসলামী ধারণার কোন মিল নেই। ইসলাম ইহকাল এবং পরকালের কল্যাণে ধন-সম্পদ অর্জন ও ব্যয় করতে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু পাশ্চাত্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দর্শনে পারলৌকিক বিষয়াদি তেমন প্রাসঙ্গিক বলে ধরা হয় না। যুগে যুগে মুসলমানদের মধ্যে এমনও দেখা গেছে এবং এখনো হয়তো বা তেমন মুসলমান খুঁজে পাওয়া যাবে যারা পারলৌকিক কল্যাণ কামনায় বা কেবল আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য ইহলোকে বিত্তশালী হওয়া প্রয়োজন মনে করেন না। এরা প্রচুর বিত্ত-বৈভবের অধিকারী হয়েও জৌলুস-হীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত। আল্লাহ্ তাআলার ইবাদতে বিঘœ ঘটতে পারে বিবেচনা করে ইহলৌকিক ভোগ-বিলাস তাঁরা এড়িয়ে চলেন। যেটুকু বৈষয়িক সম্পদ হাতে না রাখলে আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদতে মনের একাগ্রতা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সে সামান্যটুকু হাতে রেখেই তাঁরা তুষ্ট। বৈষয়িকভাবে তাঁরা নিতান্তই দরিদ্র জীবন যাপন করলেও আত্মার পরিপুষ্টি ও সমৃদ্ধিতে তাঁরা অনেক মহান এবং উন্নত। এই উন্নত ও মহান আত্মা তাঁরা মহান আল্লাহ্র প্রতি নিবেদন করেন। কিন্তু তাই বলে ইসলাম দারিদ্র্যকে আদর্শায়িত করে না, যেমন হালাল পথে অর্জিত ধনও প্রয়োজনাতিরিক্ত নিজ অধিকারে রাখাকে প্রশ্রয় দেয় না। শরীয়তের বিধান অনুসারে উত্তরাধিকার বিধি ও যাকাত প্রদানের মাধ্যমে হালাল সম্পদের সুসমবণ্টনে ইসলাম বিশ্বাসী। ইসলাম দারিদ্র্যকে ভালবাসে, তবে দারিদ্র্যকে কামনা করেনা। এ নিবন্ধে দরিদ্র ও দারিদ্র্যকে প্রথমত পশ্চিমা বৈষয়িক দৃষ্টিকোণ এবং দ্বিতীয়ত ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে এটাই দেখাতে চেষ্টা করা হয়েছে যে, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে দরিদ্র ও দারিদ্র্যের প্রতি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিই উত্তম। নিবন্ধটি সাজানো হয়েছে এভাবে-দরিদ্র ও দারিদ্র্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা, দরিদ্র ও দারিদ্র্য সম্পর্কে ইসলাম, ইসলামের দৃষ্টিতে দারিদ্র্যের কারণ।
আমরা সচরাচর দরিদ্র ও দারিদ্র্য শব্দ দুটি পশ্চিমা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে থাকি। এই বিবেচনায় বস্তুগত দারিদ্র্যই প্রাধান্য পেয়ে থাকে যা মূলত বস্তুগত সম্পদের মালিকানা ও ভোগ বিলাসের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইসলাম দরিদ্র ও দারিদ্র্যকে কেবল সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে দরিদ্রকে মূলতঃ দু’ভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে: (১) বৈষয়িক বা বস্তুগত দরিদ্র এবং (২) আধ্যাত্মিক দারিদ্র্য। দ্বিতীয় প্রকারের দরিদ্র যা ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সাথে সম্পৃক্ত তা পশ্চিমা অর্থনৈতিক আলোচনায় তেমন একটা প্রাধান্য পায় না। এমন কি বস্তুগত দরিদ্র নিরসনের উপায় অবলম্বনের ক্ষেত্রেও যে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক বিধিবিধান মেনে চলতে হয়, তার উপরও পশ্চিমা অর্থনীতি তেমন গুরুত্ব আরোপ করে না। আল্লাহ বলেন: “তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না”। “আল-কুরআন, ৪;২৯” ইসলাম এ ক্ষেত্রে মানবজাতিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়, কারণ ইহকালই শেষ কথা নয়। ইহকালের কর্মকান্ডের জন্য প্রত্যেককে পরকালে জবাবদিহি করতে হবে। তাই ইহকাল ও পরকালে কল্যাণকর এমন আর্থিক জীবন যাপনের প্রতি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে আল্লাহ বলেন: “মানুষের মধ্যে যাহারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদিগকে ইহকালেই দাও বস্তুত পরকালে তাহাদের জন্য কোন অংশ নাই। আর তাহাদের মধ্যে যাহারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দাও এবং আখিরাতে কল্যাণ দাও এবং আমাদিগকে অগ্নির শাস্তি হইতে রক্ষা কর-তাহারা যা অর্জন করিয়াছে তাহার প্রাপ্য অংশ তাহাদেরই। বস্তুতঃ আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।” “আল-কুরআন, ২:২০০-২০২” অধিকন্তু আল্লাহ আরো বলেন: “পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতীত আর কিছুই নয় এবং যাহারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাহাদের জন্য আখিরাতের আবাসই শ্রেয়; তোমরা কি অনুধাবন কর না?” “আল-কুরআন, ৬:৩২” কেননা “জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে”। “আল-কুরআন, ৩:১৮৫” “এবং তোমাদের মৃত্যু হইলে অথবা তোমরা নিহত হইলে আল্লাহরই নিকট তোমাদিগকে একত্র করা হইবে।” “আল-কুরআন, ৩:১৫৮” আল্লাহ বলেন: “শুধু আমাকে ভয় কর”। “আল-কুরআন, ৫:৩” সুতরাং এ আল্লাহভীতিই পার্থিব জীবনে ও পারলৌকিক জীবনে কল্যাণ ও সাফল্য অর্জনের প্রধান নিয়ামক। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই আমাদেরকে দরিদ্র ও দারিদ্র্যের সংজ্ঞা নিরূপণ করতে হবে, পশ্চিমা নীতি-আদর্শহীন বস্তুগত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়।
দরিদ্র ও দারিদ্র্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা ঃ ১. দরিদ্র ও দারিদ্র্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা: পাশ্চাত্যের বস্তুতান্ত্রিক ধারণা অনুযায়ী দারিদ্র্যের পরিমাপ কি কেবল জনপ্রতি প্রয়োজনীয় কেলরি (ঈধষড়ৎরব) গ্রহণের মাত্রার ভিত্তিতে শরীর ঠিক রেখে বেঁচে থাকাটাই জরুরি বুঝতে হবে? নাকি জীবনের সাথে যুক্ত অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ইত্যাদিরও প্রয়োজন আছে? এ ছাড়াও যে বিষয়টি অধিক বিবেচনার দাবি রাখে তা হলো দারিদ্র্যের ধারণাটি কি দেশ কালের প্রেক্ষিতে ‘অবিমিশ্র’ (অনংড়ষঁঃব), ‘আপেক্ষিক’ (জবষধঃরাব), নাকি ‘পরিবর্তনশীল’ (উুহধসরপ)? অর্থাৎ দরিদ্র কি এমন একটি প্রপঞ্চ (চযবহড়সবহড়হ) যা সামাজিক ও ঐতিহাসিক পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা নির্ধারিত, নাকি এমন একটি অবস্থান যা কতিপয় সর্বকালীন স্থির সূচক (ঝঃধঃরপ ওহফবী) দ্বারা নির্ধারিত।
যে আর্থিক অবস্থাকে প্রায় শতবর্ষ পূর্বে দারিদ্র্য বলা হত না, আজকের সমাজব্যবস্থায় তাকে দারিদ্র্য বলতে কেউ দ্বিধা করবে না। সমাজে যদি কমবেশি সকলেই একই জীবনযাত্রার মান ভোগ করে তবে সেখানে কেউ কাউকে দরিদ্র বলার সুযোগ থাকে না। সে সমাজে কেউ নিজেকে দরিদ্র ভাবারও কারণ থাকে না। অপরদিকে, কোন দেশ বা সমাজের ভেতরে কিংবা বাইরের কোন দেশে যদি ধন বৈষম্য থাকে এবং সমাজের একটি অংশ অপর অংশের তুলনায় অধিক বিত্তশালী বা ধনী হয়, তাহলে তুলনামূলকভাবে দরিদ্র অংশটির অবস্থান নির্ধারিত হয়ে যায়। অর্থাৎ দারিদ্র্যের অনুভূতি সমাজে বা বিভিন্ন দেশের মধ্যে ধন বৈষম্যের মাত্রার উপর নির্ভরশীল।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “দারিদ্র্য সীমারেখা (ঢ়ড়াবৎঃু ষরহব) হয়েছে প্রতি বয়স্ক মানুষের জন্য বার্ষিক ১০,৮৩০ ডলার এবং চারজনের একটি পরিবারের বার্ষিক ২২,০৫০ ডলার আয়ের নিরিখে”। “মিতবাক, দিন বদলায়, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২৩ তম সংখ্যা, ২৩ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০” অপরদিকে, ইধহমষধফবংয, রিঃয ধ ২০০০ মৎড়ংং হধঃরড়হধষ রহপড়সব ঢ়বৎ পধঢ়রঃধ ড়ভ লঁংঃ $৩৮০ যিরপয ধঃ ঢ়ঁৎপযধংরহম ঢ়ড়বিৎ ঢ়ধৎরঃু নবপড়সবং $১,৬০৫০ ঢ়বৎ পধঢ়রঃধ ধহফ রিঃয ধ (পঁৎৎবহঃ ঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ ড়ভ ১৬০ সরষষরড়হ) ধহফ রিঃয ২৯% ড়ভ ঃযব ঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ ষরাব ড়হ ষবংং ঃযধহ $১ ধ ফধু (ড়ৎ ষবংং ঃযধহ $৩৬৫ ঢ়বৎ ুবধৎ) ধহফ ৭৮% ষরাব ড়হ ষবংং ঃযধহ $২ ধ ফধু (ড়ৎ ষবংং ঃযধহ $৭৩০ ঢ়বৎ ুবধৎ)। “ঞড়ফধৎড়, গরপযধবষ চ. ধহফ ঝঃবঢ়যবহ ঈ. ঝসরঃয, ঊপড়হড়সরপ উবাবষড়ঢ়সবহঃ, উবষযর: ঊরমযঃ ঊফঁপধঃরড়হ, চঁনষরংযবফ নু চবধৎংড়হ ঊফঁপধঃরড়হ (ঝরহমধঢ়ড়ৎব) চঃব., ওহফরধহ ইৎধহপয,শ ২০০৮, ঢ়. ৫০৩” এ হিসেবের ভিত্তিতে আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশে গড়ে চার সদস্য বিশিষ্ট প্রায় চার কোটি পরিবারের প্রতিটির বাৎসরিক আয় প্রায় ৬,৬০০ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে মোট পরিবার সংখ্যার ২৯% অর্থাৎ ১.১৬ কোটি পরিবারের (জনপ্রতি দৈনিক ১ মার্কিন ডলারের কম হিসেবে) বার্ষিক আয় ১,৪৬০ মার্কিন ডলারের কম এবং ৭৮% অর্থাৎ ৩.১২ কোটি পরিবারের (জনপ্রতি দৈনিক ২ মার্কিন ডলারের কম হিসেবে) বার্ষিক আয় ২,৯২০ মার্কিন ডলার। এ হিসেব থেকে এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, মার্কিন মুল্লুকের যে সকল বয়স্ক সদস্য দারিদ্র্য সীমায় অবস্থান করছে তারা বাংলাদেশের গড়পরতা চার সদস্য বিশিষ্ট যে কোন পরিবারের তুলনায় সচ্ছল। আবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে সকল চার সদস্য বিশিষ্ট পরিবার বার্ষিক ২,৯২০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি বা কম আয় নিয়ে জীবন যাপন করছে তারা চার সদস্যের ঐ সকল পরিবারের তুলনায় সচ্ছল যাদের বার্ষিক আয় ১,৪৬০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি বা কম, যদিও এটা সত্য যে, উভয় শ্রেণীর বার্ষিক আয়ের পরিবারগুলোই মার্কিন মানদন্ডে চরম দারিদ্র্য জীবন যাপন করছে। “বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানবেতর জীবনধারা যেমন দেখি, সে রকম দারিদ্র্য আমেরিকায় চোখে পড়েনি কোথাও। এর কারণ, বিকশিত বাজার অর্থনীতির দেশ আমেরিকায় আর আমাদের দেশের জাতীয় বা বিশ্বব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত দারিদ্র্যসীমারেখা এক নয়’’। ‘‘মিতবাক, দিন বদলায়, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২৩ তম সংখ্যা, ২৩ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০’’ এ থেকে এটা অনুমান করা যায় যে, দারিদ্র্য সীমায় অবস্থানরত মার্কিন মুল্লুকের বয়স্ক সদস্য ও চার সদস্য বিশিষ্ট পরিবারগুলোর বার্ষিক আয় বাংলাদেশের অধিকাংশ সচ্ছল পরিবার ও সদস্যদের সমান্তরাল বা বেশি বিবেচনা করা যেতে পারে।
ভেবে দেখুন, ‘‘সে প্রস্তর যুুগের আদিম সাম্যবাদী সমাজে, যখন সব মানুষ অতি অল্প পরিমাণ সম্পন্ন হলেও সমাজের মোট জীবন-উপকরণ সবাই মিলে সমান ভাগ করে নিয়ে জীবন যাপন করত, তখন কি কেউ নিজেকে দরিদ্র (কিংবা ধনী) বলে অনুভব করত? এসব বিবেচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দারিদ্র হলো একাধারে একটি বস্তুনির্ভর বাস্তবতা এবং তার চেয়েও বেশি, তা হলো একটি সামাজিক অনুভব যা সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা দ্বারা কালপরিক্রমায় একেক মাত্রায় ও রূপে নির্ধারিত হয়ে থাকে। সমাজে বৈষম্যের মাত্রা দ্বারা বহুলাংশেই দারিদ্র্যের চেহারা ও অনুভব নির্ধারিত হয়’’। ‘‘সেলিম, মুজাহিদুল ইসলাম, ক্ষুদ্রঋণের জন্য ‘খাই-খালাসী আইন’ প্রয়োজন, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২২তম সংখ্যা, ২২ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০।’’
এ ধরনের ধন বৈষম্য ইসলাম সমর্থন করে না: ‘‘আল্লাহ্ জীবনোপকরণে তোমাদের কাহাকেও কাহারও উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যাহাদিগকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হইয়াছে তাহারা তাহাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদিগকে নিজেদের জীবনোপকরণ হইতে এমন কিছু দেয় না যাহাতে উহারা এ বিষয়ে তাহাদের সমান হইয়া যায়। তবে কি তাহারা আল্লাহ্র অনুগ্রহ অস্বীকার করে?’’ ‘‘আল-কুরআন, ১৬:৭১।’’ এ থেকে এটাই অনুমিত হয় যে, ইসলাম ধন-সম্পদের ব্যক্তি মালিকানায় আস্থা রেখেই এর শরীয়া ভিত্তিক সমবণ্টনে বিশ্বাস।
২. পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের কারণ: এ কারণ ব্যাখ্যা করতে যেয়ে সংক্ষেপে বলা যায়- ঞযব পড়ৎহবৎংঃড়হব ড়ভ ঃযব পধঢ়রঃধষরংঃ সড়ফব ড়ভ ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ রং, যড়বিাবৎ, ঃযব ভধপঃ ঃযধঃ ড়ঁৎ ঢ়ৎবংবহঃ ংড়পরধষ ড়ৎফবৎ বহধনষবং ঃযব পধঢ়রঃধষরংঃং ঃড় নুঁ ঃযব ষধনড়ঁৎ ঢ়ড়বিৎ ড়ভ ঃযব ড়িৎশবৎ ধঃ রঃং াধষঁব, নঁঃ ঃড় বীঃৎধপঃ ভৎড়স রঃ সঁপয সড়ৎব ঃযধহ রঃং াধষঁব নু সধশরহম ঃযব ড়িৎশবৎ ড়িৎশ ষড়হমবৎ ঃযধহ রং হবপবংংধৎু ঃড় ৎবঢ়ৎড়ফঁপব ঃযব ঢ়ৎরপব ঢ়ধরফ ভড়ৎ ঃযব ষধনড়ঁৎ ঢ়ড়বিৎ. ঞযব ংঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব মার্কস-এর ভাষায়: [ঞযব] রহপৎবসবহঃ ড়ৎ বীপবংং ড়াবৎ ঃযব ড়ৎরমরহধষ াধষঁব ও পধষষ ‘ংঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব.’ ঞযব াধষঁব ড়ৎরমরহধষষু ধফাধহপবফ, ঃযবৎবভড়ৎব, হড়ঃ ড়হষু ৎবসধরহং রহঃধপঃ যিরষব রহ পরৎপঁষধঃরড়হ, নঁঃ ধফফং ঃড় রঃংবষভ ধ ংঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব ড়ৎ বীঢ়ধহফং রঃংবষভ. ওঃ রং ঃযরং সড়াবসবহঃ ঃযধঃ পড়হাবৎঃং রহঃড় পধঢ়রঃধষ. ঝঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব …. ংঢ়ষরঃং ঁঢ় রহঃড় াধৎরড়ঁং ঢ়ধৎঃং. ওঃং ভৎধমসবহঃং ভধষষ ঃড় াধৎরড়ঁং পধঃবমড়ৎরবং ড়ভ ঢ়বৎংড়হং, ধহফ ঃধশব াধৎরড়ঁং ভড়ৎসং, রহফবঢ়বহফবহঃ ঃযব ড়হব ড়ভ ঃযব ড়ঃযবৎ, ংঁপয ধং ঢ়ৎড়ভরঃ, রহঃবৎবংঃ [র.ব. টংঁৎু], সবৎপযধহঃং’ ঢ়ৎড়ভরঃং, ৎবহঃ, ্ প. …. ডযধঃবাবৎ নব ঃযব ঢ়ৎড়ঢ়ড়ৎঃরড়হ ড়ভ ংঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব ঃযব রহফঁংঃৎরধষরংঃ পধঢ়রঃধষরংঃ ৎবঃধরহ ভড়ৎ যরসংবষভ, ড়ৎ ুরবষফং ঁঢ় ঃড় ড়ঃযবৎং, যব রং ঃযব ড়হব যিড়, রহ ঃযব ভরৎংঃ রহংঃধহপব, ধঢ়ঢ়ৎড়ঢ়ৎরধঃবং রঃ.’’ ঠরফব. গধৎী, ঈধঢ়রঃধষ. ঠড়ষ. ও. ১৯৪৮. চঢ়. ১৪৯, ৫২৯-৫৩০’’ ঢ়ৎড়ফঁপবফ রহ ঃযরং ভধংযরড়হ রং ফরারফবফ ধসড়হম ঃযব যিড়ষব পষধংং ড়ভ পধঢ়ঃধষরংঃং ধহফ ষধহফড়হিবৎং, ঃড়মবঃযবৎ রিঃয ঃযবরৎ ঢ়ধরফ ংবৎাধহঃং, ভৎড়স ঃযব চড়ঢ়ব ঃড় ঃযব কবরংবৎ ফড়হি ঃড় ঃযব হরমযঃ ধিঃপযসধহ ধহফ নবষষড়.ি ডব ধৎব হড়ঃ পড়হপবৎহবফ যবৎব রিঃয যড়ি ঃযরং ফরংঃৎরনঁঃরড়হ পড়সবং ধনড়ঁঃ নঁঃ ঃযরং সঁপয রং পবৎঃধরহ: ঃযধঃ ধষষ ঃযড়ংব যিড় ফড় হড়ঃ ড়িৎশ পধহ ষরাব ড়হষু ড়হ ঃযব ঢ়রপশরহমং ভৎড়স ঃযরং ংঁৎঢ়ষঁং-াধষঁব, যিরপয ৎবধপয ঃযবস রহ ড়হব ধিু ড়ৎ ধহড়ঃযবৎ.’’ গধৎী, কধৎষ, ঋৎবফবৎরপশ ঊহমবষং, ঝবষবপঃবফ ডড়ৎশং, গড়ংপড়:ি ঋড়ৎবরমহ খধহমঁধমবং চঁনষরংযরহম ঐড়ঁংব, ১৯৬২. ঠড়ষ. ও, ঢ়. ৫৫৮.’’
পুঁজিবাদী অর্থনীতির এ জাতীয় শ্রম-শোষণ ইসলামী অর্থনীতিতে নৈতিকতা পরিপন্থী। ‘‘দুর্ভোগ তাহাদের জন্য যাহারা মাপে কম দেয়, যাহারা লোকেদের নিকট হইতে মাপিয়া লইবার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাহাদের জন্য মাপিয়া অথবা ওজন করিয়া দেয়, তখন কম দেয়’’। ‘‘আল-কুরআন, ৮৩:১-৩’’। আরো বলা হয়েছে, ‘‘শ্রমিকের পারিশ্রমিক ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে ধনী ব্যক্তিদের টালবাহানা করা জুলুম।’’ ‘‘মান্নান অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল ও অন্যান্য সম্পাদিত, দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০০. পৃ. ৪৯৯ এই গ্রন্থে হাদিসটি বুখারী ও মুসলিম, সূত্র: মিশকাত, পৃ. ২৫১ থেকে উদ্ধৃত।’’ আল্লাহ্ বলেন: ‘‘প্রতিশ্র“তি পালন করিও; নিশ্চয় প্রতিশ্র“তি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হইবে’’। ‘‘আল-কুরআন, ১৭:৩৪।’’ শ্রমিকের ন্যায্য পারিশ্রমিক আদায়ে টালবাহানাকারীকে আল্লাহ্র দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।
৩. পাশ্চাত্যের বস্তুতান্ত্রিক ব্যস্ততা: পুঁজিবাদে বস্তুগত সম্পদ আহরণে তৎপর পাশ্চাত্যের মডেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ‘‘আমেরিকা জোর গলায় দাবি করে, তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবার, বন্ধু ও বিশ্বাস। কিন্তু বাস্তবে তাদের জীবনের অধিকাংশ সময়ই ব্যয় হয় বস্তুগত নানা সংগ্রহ ও ভোগ্যপণ্যের চাহিদা পূরণের জন্য। কোন না কোন ভাবে আমেরিকানরা বাজারের দাস হয়ে পড়ছে। শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্ব জুড়েই ক্রমশ বেশি বেশি মানুষ এই ভাগ্য বরণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে’’। ‘‘মিতবাক, দিন বদলায়, দৈনিক ইত্তেফাক, ৫৮তম বর্ষ, ৩২৩তম, সংখ্যা, ২৩ নভেম্বর, ২০১০, পৃ. ১০’’। এ বিষয়ে আল্লাহ্ সম্যক্ অবহিত: ‘‘মানুষ ধন-সম্পদ প্রার্থনায় কোন ক্লান্তি বোধ করে না’’। ‘‘আল-কুরআন, ৪১:৪৯’’। সমগ্র মানবজাতির প্রতি আল-কুরআনের সাবধান বাণী: ‘‘হে মানুষ! নিশ্চয় আল্লাহ্র প্রতিশ্র“তি সত্য; সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদিগকে কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং প্রবঞ্চক (শয়তান) যেন কিছুতেই আল্লাহ্ সম্পর্কে তোমাদিগকে প্রবঞ্চিত না করে’’। ‘‘আল-কুরআন, ৩৫:৫।’’ পাশ্চাত্যের বস্তুগত কল্যাণ সাধনায় ত্বরাপ্রিয় ব্যস্ত পরলোকে বিশ্বাসহীন মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের অকল্যাণ করে বসে: এবং যাহারা আখিরাতে ঈমান আনে না তাহাদের জন্য প্রস্তুত (অসমাপ্ত)

কিশোর অপরাধ প্রতিকারে ইসলাম

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আনয়নের আহবান জানাতে হবে। এ বিষয়ে লুকমান হাকীমের উপদেশগুলো প্রণিধানযোগ্য। যা প্রতিটি মানবসন্তানের ঈমানকে সুদৃঢ়, কর্মকে পরিশুদ্ধ, চরিত্রকে সংশোধন ও সামাজিক শিষ্টাচারকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। আল-কুরআনে উক্ত উপদেশাবলি চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, (হে নবী, স্মরণ করো) যখন লুকমান তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিতে গিয়ে বললো,  হে প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে শরীক করো না। নিশ্চয় শিরক গুরুতর অপরাধ।
এভাবে অভিভাবকগণ পর্যায়ক্রমে সন্তানদের সামনে ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো যেমন আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং আখিরাতের প্রতিটি পর্যায় যেমন কবর, হাশর, জান্নাত, জাহান্নাম এবং ভাগ্যের ভাল-মন্দের পরিচয় অত্যন্ত সুন্দর ও যৌক্তিকভাবে তুলে ধরে সেগুলোর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবেন। ফলে সন্তানের ঈমান হবে সুদৃঢ়। আর ঈমান দৃঢ় ও শিরকমুক্ত হলে নৈতিক গুণাবলি অর্জন তার জন্য অত্যন্ত সহজ হবে।
জ্ঞান মানুষের অমূল্য সম্পদ। মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জ্ঞানার্জনের মাধ্যমেই মানবিক গুণাবলি  উৎকর্ষিত ও বিকশিত হয়। যে জ্ঞানের উৎকর্ষিত ও বিকশিত হয়। যে জ্ঞানের  কল্যাণেই মানবজাতি সমগ্র জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন। সেটি হলো কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান। আল-কুরআন সকল জ্ঞানের উৎস। হাদীস তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ। ইসলাম জ্ঞানার্জনকে সকল মুসলিমের জন্য আবশ্যক করে দিযেছে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, জ্ঞানার্জন সকল মুসলিমের উপর ফরজ।
বস্তুত জ্ঞানার্জন দীনকে ভালভাবে উপলব্ধি করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দীনের কল্যাণ ও উৎকর্ষ নির্ভর করে জ্ঞানার্জনের উপর। একমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই আল্লাহকে সত্যিকারার্থে ভয় করে তাঁর আদেশ-নিষেধ যথাযথভাবে পালন করে। যেমন আল-কুরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাহদের মধ্যে কেবল বিদ্বানগণই আল্লাহকে ভয় করে। সুতরাং মাতা-পিতা সন্তানকে ঈমানের শিক্ষা  প্রদানের পর ইসলামের যথার্থ জ্ঞান দান করবেন এবং তাদের অনুসন্ধিৎসাকে জাগিয়ে তুলবেন। যাতে করে তারা অর্জিত জ্ঞানের  দ্বারা ভাল-মন্দের, ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে এবং নিজেদেরকে বিরত রাখতে পারে অপরাধকর্ম থেকে।
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে ইবাদতের রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। ইবাদত বলা হয় চূড়ান্ত বিনয় ও নম্রতা সহকারে আল্লাহর আনুগত্য করা। ব্যাপক অর্থে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ যথাযথভাবে পালন করার নামই ইবাদত। ইসলামের মৌলিক ইবাদত যথাক্রমে সালাত, সিয়াম, হজ্ব, যাকাত প্রত্যেকটিই মানুষের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া উপস্থাপন করেছে এাবং প্রত্যেকটিরই চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ লক্ষ্য হচ্ছে, মানুষকে সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা ও অপরাধ প্রবণতা থেকে মুক্ত করে কেবলমাত্র এক আল্লাহর অনুগত বান্দাহ বানানো। যেমন সালাত মহান আল্লাহর সাথে তাঁর বান্দাহদের গভীর সম্পর্ক স্থাপন ও আত্মসমর্পণের ভাবধারা সৃষ্টি করে। যা তাদেরকে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত হতে বাধা দেয়। আলা-কুরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে যাবতীয় অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। সিয়াম পালনের মাধ্যমে তাকওয়ার গুণ অর্জিত হয়। যা মানব মনের যাবতীয় কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে সাহায্য করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরে, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।”
এভাবেই ইবাদত পালনের মাধ্যমে যাবতীয় অপরাধকর্ম থেকে বিরত থাকার মানসিকতা সৃষ্টি করতে চায় ইসলাম। মাতা-পিতা শৈশবকাল থেকেই সন্তানদের সালাত, সিয়ামসহ ইসলামের মৌলিক ইবাদত অনুশীলনের ব্যবস্থা করবেন। যাতে করে তারা কুপ্রবৃত্তি বা শয়তানের প্ররোচণায় অপরাধ কর্মে লিপ্ত না হয় এবং পরবর্তী  জীবনে ইবাদত পালনে অভ্যস্ত হয়। শিশু-কিশোরদের উপর সালাত ফরয না হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (স.) সন্তানদেরকে সালাত আদারে ব্যাপারে অভিভাবকদের নির্দেশ এবং প্রয়োজনে প্রহারের অনুমতি দিয়ে বলেন, “তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছরে পদার্পণ করলে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিবে। দশ বছর বয়সে সালাত আদায় না করলে তাদেরকে প্রহার করবে এবং তাদের জন্য  আলাদা শয্যার ব্যবস্থা করবে।”
চরিত্র মানুষের উত্তম ভূষণ। মানুষের আচার-আচারণ ও দৈনন্দিন কাজ-কর্মের মধ্য দিয়ে যে স্বভাব প্রকাশিত হয় তাকে আখলাক বা চরিত্র বলে। বিশ্ববরেণ্য ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক ইমাম গাযালী (রহ.) চরিত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘চরিত্র হলো মানব মনে প্রোথিত এমন অবস্থা, যা থেকে কোন কর্ম চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই অনায়াসে প্রকাশিত হয়। আর মানুষের আচার-আচরণ ও কাজ-কর্ম সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা আদর্শের আলোকে গড়ে উঠলে তাকে বলা হয় নৈতিকতা। শৈশবকাল থেকেই মূলত নৈতিকতা বিকশিত হওয়া শুরু হয় এবং কৈশোরকালের শেষ পর্যায়ে গিয়ে চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে। “সাধন কুমার বিশ্বাস ও সুনতা বিশ্বাস, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও নির্দেশনা, শিশু-কিশোরের নৈতিকতার উন্নয়নে পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অনস্বীকার্য। তবে পরিবারের ভূমিকাই মুখ্য। মা-বাবা নৈতিকতা মেনে চললে এবং শিক্ষা দিলে শিশু-কিশোররা তা অনুকরণ করে মেনে চলতে শিখবে। এভাবে তারা চরিত্র গঠনের নৈতিক গুণাবলী অর্জন করতে পারলে কিশোর অপরাধ প্রবণতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সক্ষম হবে। কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত চরিত্র গঠনের উত্তম গুণাবলী যেমন তাক্ওয়া, লজ্জাশীলতা, সত্যবাদিতা, ওয়াদা পালন, আমানতদারিতা, সবর, ইহসান, বিনয়, নম্রতা, উদারতা ও দানশীলতা প্রভৃতি গুণাবলী পরিবারের পক্ষ থেকে সন্তানকে শিক্ষা দানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। এ ক্ষেত্রে সন্তানকে উদ্দেশ্য করে লুকমান (আ.) এর উপদেশগুলো সকল পিতা-মাতার জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে। যা আল-কুরআনে সুন্দরভাবে উল্লিখিত হয়েছে, “হে প্রিয় বৎস!  সালাত কায়েম করবে, ভাল কাজের আদেশ দিবে এবং খারাপ কাজে নিষেধ করবে এবং বিপদ-আপদে ধৈর্য্য ধারণ করবে, এটিই তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ। অহংকারবশত তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করবে না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণা করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন উদ্ধত অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। তুমি পদক্ষেপ করবে সংযতভাবে এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করবে; নিশ্চয়ই স্বরের মধ্যে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (স.) সন্তানদেরকে শৈশবকাল থেকে শিষ্টাচার শিক্ষা প্রদানের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আর যখন সন্তান ছয় বছর বয়সে পদার্পণ করবে, তখন তাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিবে।’
পিতা-মাতা সন্তানদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজ সুন্দর ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করার শিক্ষা দিবেন যেমন খাবার, পানাহার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও গৃহে প্রবেশের শিষ্টাচার সহ যাবতীয় আদব শিখাবেন। যা তাদের নৈতিকমান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এ প্রসঙ্গে ‘উমার ইবন আবী সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, আমি শৈশবকালে রাসূলুল্লাহ (স.) এর গৃহে ছিলাম। আমার হাত খাবার পাত্রের চতুর্দিকে যাচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (স.) আমাকে বললেন, “হে বালক! আল্লাহর নাম বলো, ডান হাতে খাও এবং নিজের সম্মুখ হতে খাও। এ হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শিশু-কিশোরদের সার্বিক বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। এছাড়াও শিশু যে পরিবেশে মানুষ হবে সে পরিবেশটিকে যথাসম্ভব সবদিক থেকে স্বাস্থ্যসম্মত করে তুলতে হবে। অভাব-অনটন, পারিবারিক সমস্যা, পিতা-মাতার কলহ-দ্বন্দ্ব যেন সন্তানদেরকে স্পর্শ না করে সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। শিশু-কিশোরদেরকে অশ্লীল বিনোদন থেকে দূরে রাখতে সুস্থ গঠনমূলক চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে যেমন উপকারী খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, আনন্দ ভ্রমণ প্রভৃতি। তাদের নিত্যসঙ্গী, খেলাধূলার সাথী ও বন্ধু-বান্ধব যাতে সুনির্বাচিত হয় সেদিকে পিতা-মাতাকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা বন্ধু ভাল না হলে জীবন-জগৎ ও পরকাল সবই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এজন্যই ইসলাম বন্ধু নির্বাচনে সতর্কতা অবলম্বনের গুরুত্বারোপ করেছে।
এজন্যই মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলুল্লাহ (স.) কে ভাল লোকদের সঙ্গী হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, “নিজেকে তুমি তাদেরই সংস্পর্শে রাখবে যারা সকালে ও সন্ধ্যায় আহবান কারে তাদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরে নিয়ো না; যার চিত্তকে বা অন্তরকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে তুমি তার আনুগত্য করো না”। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “মানুষ তার বন্ধুর স্বভাব চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়, কাজেই তোমাদের মধ্যে যারা বন্ধু গ্রহণ করবে, তারা যেন পর্যবেক্ষণ করে তা গ্রহণ করে”।
শিশু-কিশোররা যে সমাজে বসবাস করে সে সমাজেরও রয়েছে অসংখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য। সমাজে যদি অন্যায়-অনাচার অবাধে চলতে থাকে, তাহলে শিশু-কিশোররা তা অনুসরণ করে অপরাধ প্রবণ হতে পারে। ফলে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘিœত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সমাজ থেকে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ করতে হলে কেবলমাত্র শিশু সমাজকে উন্নত করলেই চলবে না; বরং সমগ্র সমাজের উন্নয়ন করতে হবে। সমাজের নৈতিক আদর্শ, পারস্পরিক আচরন, কর্তব্যপরায়ণতা, সামাজিক সচেতনতা প্রভৃতির মান্নোয়ন হলে স্বাভাবিকভাবেই তখন অপরাধ সমাজ থেকে লুপ্ত হয়ে যাবে। এজন্যই ইসলাম সমাজে বসবাসরত সকল মানুষের মৌলিক অধিকারে নিশ্চয়তা বিধান করেছে। সমাজের সকল সদস্যের মধ্যে সৌহার্দ-সম্প্রীতি বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে কোন কিছুকে তাঁর সাথে শরীক করবে না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, দুরবর্তী সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না”।
ইসলাম সমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়-অবিচার, অপকর্ম প্রতিরোধ করে সমাজকে স্থিতিশীল, শান্তিময় ও কল্যাণকর রাখার জন্য ভাল কাজের আদেশ ও খারাপ কাজের বাধা প্রদানের কর্মসূচী কার্যকর করার আহবান জানিয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা মুসলিম সমাজকে লক্ষ্য করে বলেন, “তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল অবশ্যই হতে হবে, যারা মানুষদেরকে কল্যাণের দিকে আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দিবে এবং খারাপ কাজ হতে বিরত রাখবে”। অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরা কল্যাণকর ও আল্লাহ ভীতির কাজে পরস্পরকে সাহায্য সহযোগিতা করবে। আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে না”।
অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (স.) সমাজে অন্যায়, অপকর্ম হতে দেখলে তা প্রতিরোধের নির্দেশ দিয়ে বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ অন্যায় ও গর্হিত কাজ করতে দেখলে সে যেন তা তার হাত দিয়ে (বল প্রয়োগের মাধ্যমে) প্রতিহত করে। এতে সক্ষম না হলে সে যেন তার মুখ দিয়ে (প্রতিবাদ করে) প্রতিহত করে, তাতেও সক্ষম না হলে সে যেন তার অন্তর দিয়ে তা (অপছন্দ করে/মূলোৎপাটনের পরিকল্পনা করে) প্রতিহত করার চেষ্টা করে। আর এটি হলো ঈমানের দুর্বলতম অবস্থা”।
উল্লিখিত আয়াত ও হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, সমাজের একজন সদস্য হিসেবে মু’মিনের দায়িত্ব হলো নিজে সৎকর্ম সম্পাদন করবে ও অসৎকর্ম থেকে বিরত থাকবে এবং অন্যকেও ভাল কাজে উৎসাহ দিবে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। সমাজের বৃহত্তর পরিসরে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠন, সমাজ সেবামূলক সংগঠন, ধর্মীয় সংগঠন ও ক্রীড়া বিষয়কে সংগঠন শিশু-কিশোরদের আচরণ ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব সর্বাপেক্ষা বেশী।
মানব জীবনে শিক্ষা একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। মহান স্রষ্টা ও সৃষ্টিজগতের পরিচয় লাভের জন্য শিক্ষা গ্রহণ আবশ্যক। আল্লাহকে চিনতে হলে এবং তাঁকে সঠিকভাবে মানতে হলে শিক্ষা লাভের বিকল্প নেই। এছাড়াও শিক্ষার মাধ্যমেই শিশু-কিশোরদের মানবিক বৃত্তিগুলো বিকশিত হয়। তাদের মেধা, মনন ও রুচি উৎকর্ষ লাভ করে এবং আচার-আচরণ হয় পরিশীলিত ও মার্জিত। পারিবারিক গন্ডি পেরিয়ে শিশু-কিশোররা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে এবং এখানেই তাদের শিক্ষার মূল ভিত রচিত হয়। প্রাথমিক শিক্ষায়তনে শিশু যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়, পরবর্তী জীবনে তার চিন্তা-চেতনা ও আচার-আচরণে তাই প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে। শিশু-কিশোররা তার শিক্ষক ও সহপাঠীদের  কাছ থেকে যা শিখে তাই তার হৃদয়ে অঙ্কিত হয়। পারিবারিক পরিবেশে যদি এর সমর্থন মিলে তাহলে তা তার চরিত্রে প্রোথিত হয়ে যায়। অতএব, অভিভাবক যদি মনে করেন যে, নৈতিকতা সম্পন্ন করে তিনি তার সন্তানকে গড়ে তুলবেন তাহলে তাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, নিয়ম-শৃঙ্খলা, সহপাঠী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকার আচরণ; তাদের জীবন-দর্শন, তাদের সাথে স্পর্ক, শিক্ষার বিষয়বস্তু ও পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়গুলো ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কেননা এগুলো শিক্ষার্থীর আচরণ ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত তাবি’ঈ মুহাম্মাদ ইব্ন সীরীন (রহ.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই এই ইলম হচ্ছে দীন। সুতরাং কার নিকট থেকে দীন গ্রহণ করছ তা  সতর্কতার সাথে দেখে নিবে’। (অসমাপ্ত)