বিভাগ: ইসলামের আলো

কারবালা যুদ্ধের ঈমানদীপ্ত কিছু তথ্যকণিকা

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥
আমাদের দেশে তিন ভাষায় সন বা বর্ষ গণনা করা হয়। আরবী, বাংলা ও ইংরেজী। দেশ হিসেবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এবং স্বাধীন ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার নিজস্ব স্বকীয়তা ও মর্যাদা থাকলেও সন গণনার ক্ষেত্রে বাংলার অবস্থান দ্বিতীয়। মুসলিম জাতি হিসেবে আরবী ভাষার একটা স্বতন্ত্র মর্যাদা থাকলেও আমাদের কাছে তা নেই। ফলে আরবী সন গণনার স্তর গিয়ে দাঁড়িয়েছে তৃতীয়তে। কেবল প্রাধান্য পাচ্ছে ইংরেজী গণনা। প্রায় দু’শ’ বছরের ইংরেজ শাসন আমাদের মন-মগজকে যেভাবে ধুলাই করেছে বংশ পরিক্রমায় তা আমরা লালন করছি ঐশী বিধানের মতো। আমাদের যা নিজস্ব সম্পদ তার গুরুত্ব আমাদের কাছে নেই বললেই চলে। যেমন বাংলা ভাষার জন্য ৮ই ফাল্গুন রক্ত ঝরেছে। শহীদ হয়েছে অনেকে। অথচ আমরা মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করি ২১শ ফেবরুয়ারী। ৮ই ফাল্গুন ইংরেজদের ধুলাই আগুনে জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেছে। একইভাবে আরবী চলে গেছে আরব দেশে। সে যাই হোক, বাংলা ও ইংরেজি সন আমরা গণনা করি বটে। আজ পর্যন্ত কেউ এ সনদ্বয়কে চর্ম চক্ষে দেখছে বলে শুনিনি। ৩০/৩১ দিন শেষ হলেই তোতা পাখির ন্যায় বলি জানুয়ারি, ফেবরুয়ারি, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ইত্যাদি। আসলে এসবের কোন দৃশ্যমান অস্তিত্ব যেমন নেই তেমনি মানবজীবনে এর গুরুত্বও নেই। পক্ষান্তরে আরবী মাসসমূহ যেমন মানুষের চোখের সামনে দৃশ্যমান অনুরূপ এর গুরুত্বও অপরিসীম। এ বিশাল ও বৈচিত্রময় পৃথিবী যার ইঙ্গিতে সৃষ্টি হয়েছে সে মহামহিম আল্লাহ নিজেই এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘তোমরা যাতে করে বছরের সংখ্যা, সময় গণনা করতে পার তার জন্য আমি চন্দ্র ও সূর্য্যকে আলোকবর্তিকাময় ও উহার কক্ষপথ সুনিয়ন্ত্রিত করেছি।‘‘ (আল-কোরআন)। আরবী মাসসমূহ মূলত এ জন্যই দৃশ্যমান। যেহেতু আরবী মাসসমূহ সময় এবং কাল গণনার্তে স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি করেছেন। এ কারণেই দৃশ্যমান এ মাসগুলোর গুরুত্ব লক্ষণীয়। সময়ের আবর্তে নতুন চন্দ্র উদয়ের মধ্যদিয়ে চক্রাকারে এক একটি মাস নানান গুরুত্বে ও তাৎপর্য্যের বার্তা নিয়ে মানবমন্ডলীর সমীপে উপস্থিত হয়। এসব মাসের মধ্যে এমন কতক মাস রয়েছে যা অধিক মর্যাদার দাবীদার ও বরকতময়। এ বরকতময় ও তাৎপর্যপূর্ণ মাসসমূহের মধ্যে একটি হলো আরবী সনের প্রথম মাস ‘‘মাহে মহররম’’ বা হারাম মাস অথবা পবিত্র মাস। মহররমকে হারাম মাস বলা হয় এ কারণেই যে, এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি করা হারাম বা শরীয়া দৃষ্টিতে অবৈধ। পবিত্র মাস বলা হয় এ কারণেই যে, সকল প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ, বিবাদ-বিশৃংখলা, ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা দরকার বলেই এ মাসকে পবিত্র মাস হিসেবে মর্যাদা প্রদান করা হয়। যেহেতু সন গণনার সূচনা মাস সেহেতু এ মাসে কোন ধরনের খারাপ কাজ করা উচিত নয়। অন্যান্য মাসেও তা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা সূচনা মাসেই দেয়া হয়। পৃথিবীর সূচনা হতে এ পর্যন্ত যত বড় বড় বৈচিত্র্যপূর্ণ ও অকল্পনীয় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তার সিংহ ভাগই এ মাসের ১০ তারিখ সংঘটিত হয়েছে। এ দিনে সংঘটিত কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা নিম্নরূপ : ১। আল্লাহ তা’আলা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এ দিনে। অর্থাৎ পৃথিবীর জন্ম দিন হলো ১০ মহররম। ২। আদি পিতা হযরত আদম (আ.)কে সৃষ্টি করা হয় এ দিন। ৩। এ দিনেই হযরত আদম (আ.) কে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। ৪। বিচ্যুতির কারণে হযরত আদম (আ.)-এর পৃথিবীতে প্রেরণের পর এ দিনই তাঁর তাওবা কবুল করা হয়। ৫। জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্ম দিন। ৬। নমরুদের বিশাল অগ্নিকুন্ড হতে জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) মুক্তিলাভ করেন। ৭। তুর পাহাড়ে আল্লাহর সাথে হযরত মুসা (আ.)-এর কথোপকথন ও আসমানী কিতাব ‘‘তাওরাত’’ লাভ। ৮। জালেম ফেরাউনের দলবলসহ নীল দরিয়ায় সলিল সমাধি। ৯। হযরত ইদ্রীছ (আ.) এর পুনঃ জান্নাতে ফেরা। ১০। বিবি মরিয়ম (আ.)-এর গর্ভ হতে হযরত ঈসা (আ.) এর পৃথিবীতে আগমন। ১১। হযরত নুহ (আ.) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের মহাপ্লাবন হতে ম্ক্তু লাভ। ১২। হযরত ঈসা (আ.)-এর আকাশ গমন। ১৩। হযরত সোলাইমান (আ.)-এর পুনঃরাজত্ব লাভ। ১৪। হযরত আইয়োব (আ.)-এর রোগ মুক্তি ও পুনঃধন সম্পদ লাভ। ১৫। হযরত দাউদ (আ.)-এর হাতে জালিম বাদশা জালুত নিহত হয়। ১৬। হযরত দাউদ (আ.)-এর গুনাহ্ মাফ হয়। ১৭। হযরত্ ইয়াকুব (আ.) তার প্রিয় পুত্র হযরত ইউসুফ (আ.) কে ফিরে পান। ১৮। মাছের পেট হতে হযরত ইউনুস (আ.) মুক্তি লাভ। ১৯। আসমান হতে বৃষ্টি বর্ষণের সূচনা হয় এ দিনে। ২০। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদাত বরণ। ২১। এ দিনের কোন এক জুম্মাবারে ইস্রাফিলের সিংগার ফুঁৎকারে কেয়ামত সংগঠিত হবে। উপরোক্ত বহুল আলোচিত ঘটনাসমূহের মতো আরো অহরহ ঘটনা ঘটেছে মহররমের দশ তারিখ। এসব কারণেই এ মাস অতীব গুরুত্বের দাবী রাখে। সকল সংঘঠিত ঘটনাসমূহের মাঝে সব চেয়ে ব্যথাদায়ক ও বহুল আলোচিত ঘটনা হলো হযরত মুহাম্মদে আরবী (স.) এর প্রিয় দৌহিত্র শহীদ জননী ফাতেমাতুজ জোহরা (রা.) এর হৃদয়ের স্পন্দন, শেরে খোদা হযরত আলী মর্তুজা (রা.) এর নয়নের মনি বিশ্ব মুসলিম মিল্লাতের বিপ্লবী ও সংগ্রামী চেতনার প্রতীক সাইয়াদুস শুহাদা হযরত ইমাম হোছাইন (রা.) এর মর্মান্তিক শাহাদাত বরণ। দজলা ও ফোরাতের তীরে কারবালা প্রান্তরে হিজরী ৬১ সনে কাতেবে ওহি হযরত আমীরে মোয়াবিয়ার অযোগ্য সন্তান জালিম এজিদের পাষন্ড সৈন্য-সামন্তরা খোদায়ী খিলাফতকে পদ তলে দিয়ে আহলে বাইয়্যাতের যোগ্য খিলাফতকে অস্বীকার করে রাজতন্ত্রের দম্ভ প্রদর্শন করে সাইয়্যাদিনা ইমাম হোছাইন সহ ৭২জনকে শাহাদাত বরণ করিয়ে দুনিয়ার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করে। কিন্তু কেন এবং কিভাবে এ ঘটনা সংগঠিত হয় তার কম বেশি দুনিয়াবাসীর অজানা নয়। আমরা সি দিকে যাব না। শুধু এটুকু বলার প্রয়াস পাব যা জরুরী মনে হয়। কুফায় গভর্নর হযরত আমীরে মোয়াবিয়ার ইন্তেকালের পর তার পুত্র এজিদ পিতার উত্তরাধিকার হিসেবে নিজকে খলিফা বলে ঘোষণা দেয়। আহলে বাইয়্যাতদের কে সে তার আনুগত্য স্বীকার করার নির্দেশ দেয়। অথচ শরীয়াহ মোতাবেক এজিদ কোন প্রকার ইসলামী খিলাফতের জন্য উপযুক্ত ছিল না। তাই আহলে বাইয়্যাতগণ তার আনুগত্য স্বীকার করার মতো কোন ধরনের যৌক্তিকতা নেই বিধায় তাঁরা এজিদের নির্দেশকে প্রত্যাখ্যান করে। শুধু এ কারণেই হিজরী ৬১ সনের ১০ মহররম কারবালা প্রান্তরের ব্যথাদায়ক ঘটনা সংঘটিত হয়, আহলে বাইয়্যাতের পবিত্র রক্তে রঞ্জিত হয় কারবালা প্রান্তর। এজিদি শক্তি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, সুকৌশলে ৭২ জন আহলে বাইয়্যাতের রক্ত ঝরায় নির্মমভাবে। দুনিয়ার বুকে সৃষ্টি করে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। হযরত ইমাম হোছাইন (রা.) এর শাহাদাতের মর্মান্তিক ঘটনা অতি গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হয়ে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। আলোচনা পর্যালোচনা চলছেই। তা চলতে থাকবে প্রলয় দিবস অবধি। ঘটনার চুলচেড়া বিশ্লেষণ হচ্ছে। কিন্তু ঘটনার মূল কারণ কি সে ব্যাপারে সাধারণ মানুষ খুব বেশি ওয়াকিফহাল নয়। ফলে মুসলিম বিশ্ব এ ঘটনার তাৎপর্যকে কেন্দ্র করে যে শিক্ষা পাওয়ার কথা এবং শিক্ষার বিষয়কে মূল্যায়ন করার কথা তা করা হচ্ছেনা। অথচ এ দিনকে কেন্দ্র করে আমরা অনেক কিছু করে থাকি। যা করি তা শরীয়াহ্ সম্মত কিনা তার বাছ বিচার করা হয় না। বাস্তব সম্মত বিষয় হলো ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত ঐতিহাসিক ও হৃদয় বিদারক ঘটনার সামাজিক, রাজনৈতিক ও শরীয়াহ ভিত্তিক গুরুত্ব আছে। দেখার বিষয় হলো আমরা এর গুরুত্ব কতটুকু মূল্যায়ন করি এবং কি ভাবে মূল্যায়ন করি? আমরা যা করি তার মধ্য হতে অধিক আর করার কিছু আছে কিনা এবং যা করি তার মধ্য হতে বর্জনীয় কিছু আছে কিনা? তা জানা ও বুঝা সকলের জন্য অতিব জরুরী। এটা জানার পূর্বে আমরা দেখব যে, বিশ্বনবী (স.) এর আগমনের পূর্বে ও পরে মহররম পালন হতো কিনা? হলে কিভাবে হতো? বিশ্বনবী (স.) এর আগমন পূর্ব মহররম পালন: বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (স.)-এর আগমন পূর্ব যত নবী পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠে আগমন করেছেন তারা এবং তাদের উম্মতগণ মহররম পালন করেছেন। তাঁরা ১০ মহররম (অসমাপ্ত)

আশুরা

রমজান আলী রনি

আশুরারও কথা শুনি
সবার মুখে ভাই
তার-ই চেয়ে মহৎ কোনো
ইবাদত আর নাই।

কালো কাপড় গাঁয়ে পড়ে
ইবাদতে রত
সারাবিশ্বে মুসলমানও
রয়েছে ঠিক যত।

হুসাইনের গলায় চালায়
কাফের শিমার ছুরি
শহীদ হলো কারবালাতে
উড়ে শোকের ঘুড়ি!

মহরমের দশ তারিখে
আকাশ হলো ভারী
হুসাইনের সঙ্গী সকল
স্বর্গে দিলো পারি।

দশই মহররম

আসাদউজ্জামান খান

হোসেন ছিলো সবার প্রিয়
মহানবির নাতি
ছয়শ আশির দশ মহররম
ইমাম হোসেনের
নিবছে জীবন বাতি।

এজিদের দল ফোরাত তীরে
পাতলো কঠিন চাল
কারবালার সে ময়দানটিকে
ইমাম হোসেনের
রক্তে করলো লাল!

ইমাম হোসেন অসহয়ে
করল মৃত্যু বরণ
মহরমের দশ তারিখে
ইমাম হোসেনের
জীবন করি স্মরণ।

ইসলামের আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তার আইন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥
(পূর্ব প্রকাশের পর)
বুখারী ও মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত এক হাদীসে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেনÑ “শক্তি-সামর্থ্যরে অতিরিক্ত কাজ শ্রমিকদের উপর চাপাবে না। যদি তার সামর্থ্যরে অতিরিক্ত কোন কাজ তাকে দাও তাহলে সে কাজে তাকে সাহায্য কর। “হোসেন, মুহাম্মদ ফরহাদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২”।
মহানবী (সা.) এভাবে শান্তি, মৈত্রী, ক্ষমা, দয়া, শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের যে মহান আদর্শ রেখে গেছেনÑ মানব মর্যাদা ও মানবাধিকারের ধারণা ও তা অর্জনের ক্ষেত্রে তা এক অতুলনীয় দিক-নির্দেশনা। তাঁর এই গুণাবলি ও দৃষ্টিভঙ্গীতে মুগ্ধ বিখ্যাত দার্শনিক, সাহিত্যিক জর্জ বার্নড শ’ তাই বলতে কুণ্ঠাবোধ করেন নিÑ “ওভ ধষষ ঃযব ড়িৎষফ ধিং ঁহরঃবফ ঁহফবৎ ড়হব ষবধফবৎ, গড়যধসসধফ ড়িঁষফ যধাব নববহ ঃযব নবংঃ ভরঃঃবফ সধহ ঃড় ষবধফ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষবং ড়ভ াধৎরড়ঁং পৎববফং, ফড়মসধং ধহফ রফবধং ঃড় ঢ়বধপব ধহফ যধঢ়ঢ়রহবংং. “কাইয়্যূম, অধ্যাপক হাসান আব্দুল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২”।
৩। নারী অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রাসূল (সা.) এর গৃহীত কর্মপন্থা : নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। নারী মুক্তির প্রবক্তা হিসেবে আমরা হয়ত কেট মিলে (শধঃব গরষষবঃ), জার্মেন গ্রীয়ার (এবৎসধরহব এৎববৎ) বা অ্যানী নূরাকীন (অহহব ঘঁৎধশরহ) প্রমুখের নাম জানি; এছাড়াও রয়েছে মেরী উলষ্টন, অ্যানী বেসান্ত, মার্গারেট সাঙ্গাঁর, সুলতানা রাজিয়া, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখ মহীয়সী মহিলাদের সংগ্রামের ইতিহাস। কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাসে নারীর অধিকার ও মর্যাদার জন্য যে ব্যক্তি প্রথম সোচ্চার হয়ে ওঠেন, নারীকে সংযম ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য অংশ হিসাবে যে ব্যক্তি প্রথম স্বীকৃতি দেন, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর অধিকার পরিপূর্ণ আকারে যে ব্যক্তি প্রথম প্রচেষ্টা করেন, সত্যিকার অর্থে নারীর জাগরণ ও নারী মুক্তির যিনি প্রবক্তা তিনি হচ্ছেন মুহাম্মদ (সা.)। একথা বলা অত্তুক্তি হবে না যে, জীবনে অন্যকিছু না করলেও শুধু নারী জাগরনের ক্ষেত্রে তাঁর অবদানই বিশ্ব মনীষার মুহাম্মদ (সা.) কে সুউচ্চ আসনে সুদৃঢ়ভাবে অধিষ্ঠিত করবে। ‘‘আলী, সৈয়দ আশরাফ, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, সীরাত স্মরণিকা, ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪১৭ পৃ. ২৩’’
নারীর প্রতি রাসূল (সা.) এর দর্শন এসেছে মূলত কুরআনের নীতি-দর্শন থেকে। প্রকৃতপক্ষে তাঁর জন্মকালে নারীকে বিশ্বের কোথাও এমনকি স্বাধীন মর্যাদাবান মানুষ হিসেবেও বিবেচনা করা হতো না। নারীকে ‘ভোগের বস্তু’ লাঞ্ছনা ও পাপের প্রতিমূর্তি’ এবং কোথাও কোথাও অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তির মত ‘সম্পত্তি’ মনে করা হতো। কুরআনে সূরা আন-নাহল- এ আল্লাহ তা’আলা তৎকালীন সমাজে নারী সম্পর্কে মানুষের মানসিকতাকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। “যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয় তার মুখমন্ডল কোলে হয়ে যায়, সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয় তার গ্লানি হেতু সে নিজ সম্প্রদায় হতে আত্মগোপন করে। সে চিন্তা করে হীনতা সত্ত্বেও সে তা রেখে দেবে না মাটিতে পুঁতে দেবে। “আল-কুরআন, ১৬ : ৫৮ – ৫৯”।
এভাবে নারীর প্রকৃত মুক্তি, তার স্বাধীনতা, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) এক অনন্য সাধারণ দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন যা বর্তমান নারী স্বাধীনতা ও নারী মুক্তির ধারণার চেয়ে বহুগুণে উন্নত, পরিণত ও সুদূর প্রসারী। প্রখ্যাত লেখিকা নাসিমা খাতুন তার একটি গবেষণা নিবন্ধে বিষয়টি পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেছেনÑ “ডরযরহ ঃযব ঃবিহঃু-ঃযৎবব ুবৎং ফঁৎরহম যিরপয ঃযব ঢ়ৎড়ঢ়যবঃ গঁযধসসধফ (ঢ়বধপব নব ঁঢ়ড়হ যরস) ঢ়ৎড়সঁষমধঃবফ ঃযব গবংংধমব ড়ভ ওংষধস, ঃযব ঢ়ড়ংরঃরড়হ ড়ভ ঢ়ড়ংরঃরড়হ ড়ভ ড়িসধহ ধিং ৎধরংবফ ভৎড়স ঃযব ষড়বিংঃ ফবমৎধফধঃরড়হ ঃড় ঃযব মৎবধঃবংঃ যবরমযঃং ড়ভ বংঃববস, যড়হড়ঁৎ ধহফ ৎবংঢ়বপঃ” । “ঘধংরসধ কযধঃঁহ, ঃযব ংঃধঃঁং ধহফ জরমযুঃং ড়ভ ড়িসবহ রহ রংষধস, ঝড়পরধষ ঝপরবহপব জবারব,ি অ ঔড়ঁৎহধষ ড়ভ ঃযব ঋধপঁষঃু ড়ভ ঝড়পরধষ ঝপরবহপব, টহরাবৎংরঃু ড়ভ উযধশধ, ঠড়ষ-ীার, ঘড়-১ ঔঁহব ১৯৯৯, চ, ৪১০”। রাসূল (সা.) এর প্রতিষ্ঠিত নারী স্বাধীনতা ও নারী মর্যাদাকে সমসাময়িক অন্যান ধর্মমত ও জীবনদর্শনের সাথে তুলনা করে নাসিমা দেয়িছেন যে, যে, “…পড়সঢ়ধৎবফ ঃড় ধষষ ড়ঃযবৎ পরারষরুধঃরড়হং ধহফ ষধি ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ ওংষধসরপ ষধি যধং মরাবহ ড়িসবহ যবৎ ৎরমযঃং ঃড় ঃযব যরমযবংঃ ফবমৎবব, নবভড়ৎব বাবৎুনড়ফু ধষংড় ধহফ সড়ংঃ ফরংরহঃবৎংঃবফষু ধহফ ৎবপড়মহরুবফ যবৎ ঃঁৎব ফরমহরঃু “ঘধংরসধ কযধঃঁহ, ওনরফ, চ-৪১৩” মনীষী পিয়েরে ক্রাবাইট এর মতে, ঐব (গঁযধসসধফ) ধিং ঢ়ৎড়নধনষু ঃযব মৎবধঃবংঃ পযধসঢ়রড়হ ড়ভ ড়িসবহং ৎরমযঃং ঃযব ড়িৎষফ যধং বাবৎ ংববহ. “আলী, সৈয়দ আশরাফ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩”।
৪। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে শাস্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠা : অনেক ধর্মগুরু, ধর্মপ্রচারক বা মহাপুরুষের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন কিভাবে কেটেছে তা জানা যায় না। কিন্তু মুহাম্মদ (সা.) এর পারিবারিক ও সামাজিক জীবন সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। রাসূল (সা.) পারিবারিক জীবনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। ‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তির’ পথ তিনি পরিহার করে চলেছেন। বরং তাঁর মতে পরিবার ও সমাজে শান্তি, সাম্য, ন্যায়বিচার, ও আল্লাহর আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করাই প্রকৃত ধর্মাচরণ। আমরা ইত:পূর্বে ‘বিবাহ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিবারের ভিত্তি রচনা, পুত্র সন্তানের পাশাপাশি কন্যা সন্তানকে স্বাগত জানানো এবং কন্যাকে অধিক গুরুত্বদান, স্ত্রীর অধিকার প্রভৃতি সম্পর্কে তাঁর জীবন-দর্শন আলোচনা করেছিÑ যেখানে দেখা গেছে মানুষের জীবনের একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে অধিকার ও মানবতা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে। এখানে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে মানুষের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান সম্পর্কে অন্য কয়েকটি বিশেষ দিকের উপর আলোকপাত করা হলোÑ
ক. মানবাধিকারের এই উচ্চকণ্ঠের যুগে পরিবার- ব্যবস্থা ক্রমশ যেখানে দুর্বল হয়ে পড়ছে নগরায়ণ ও শহরায়নের পাশাপাশি লাগামহীন ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পরিবারের নির্ভরশীল সদস্য বিশেষত শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও অন্যান্যদের প্রতি ক্রমশ নিরাপত্তাহীনতা, অধিকার না পাওয়ার ও লাঞ্ছনার আশংকা বাড়ছে। অথচ রাসূল সা. দৃঢ়ভাবে পারিবারিক দায়িত্ব পালনে তাগিত দিয়েছেন। কুরআনে পিতা-মাতার সাথে সন্তানের সম্পর্ক ও দায়িত্বের কথা স্পষ্ট ঘোষণা করে বলা হয়েছেÑ “তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলবে। “আল-কুরআন, ১৭ : ২৩”।
খ. মুহাম্মদ (সা.) নিজ মা-বাবার সম্মান-মর্যাদা ও পরিবারে তাদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি কুরআনের নির্দেশনার আলোকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি বলতেন, পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ব্যতীত বেহেশতের দ্বার উন্মুক্ত হবে না। “যফীরুদ্দীন পুরানুহাভী, মাওলানা মুহাম্মদ, ইসলামের যৌন বিধান, মাওলানা মুহাম্মদ হাসান রহমতী অনূদিত, ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮৭, পৃ. ২৭”। নিজের পরিবারে যিনি সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দায়িত্ববোধ ও সকল সদস্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না তিনি যতই জগৎ জয় করুন, শ্রেষ্ঠ মানুষ হতে পারবেন না- এটিই মহানবী (সা.) এর জীবন দর্শন। অন্যদিকে তাঁর মতে পরিবারে স্ত্রীর মর্যাদাও অনেক উঁচুতে। তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ব্যক্তি যারা তাদের স্ত্রীদের কাছে উৎকৃষ্ট এবং পরিবার পরিজনদের সাথে স্নেহশীল ব্যবহার করে”। “আসমা, খাতুন হাফেজা, নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা. সীরাত স্মরণিকা, ঢাকা : ইসলামিক ফাউ-েশন বাংলাদেশ, ১৪১৫, পৃ. ৫১”। তাঁর যুগে এই কথা বলা ও পরিবারে তার অনুশীলন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং যুগান্তকারী এক পদক্ষেপ।
৫। বৃহত্তর সমাজ-জীবনে শান্তি, সাম্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠা : মুহাম্মদ (সা.) নিজ পরিবার, আত্মীয়-স্বজনের পর দৃঢ়ভাবে প্রতিবেশীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। মেহমানদের অধিকারও তিনি নির্ধারিত করেছেন। তাঁর মতে “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষদিনে ঈমান রাখে, সে যেন অবশ্যই মেহমানদের সম্মান করে, প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয় এবং অবশ্যই ভাল কথা বলে অথবা চুপ থাকে। “বুখারী, ইমাম, আস-সহীহ, অধ্যায় : আল-আদাব, অনুচ্ছেদ : মান কানা ইউমিনু বিল্লাহি ওয়াল ইয়াউমিল আখিরি, আল-কুতুবুস সিত্তাহ, রিয়াদ : দারুল সালাম, ২০০০, পৃ. ৫০৯”।
৬। অসহায়-বঞ্চিত ইয়াতীম ও বিধবাদের অধিকার : মুহাম্মদ সা. সমাজে ইয়াতীম, বিধবা অসহায়দের অধিকার রক্ষার ও তাদের কল্যাণে সারা জীবন কাজ করে গেছেন এবং অন্যকেও তেমনি দায়িত্ব পালনের তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন : ক্ষুধার্তকে খাবার দিও, পীড়ত ও রুগ্নকে দেখতে যেও এবং মুসলমান হোক কি অমুসলমান, সকল নির্যাতিত মানুষকে সাহায্য করো। “ইসলাম, মাওলানা আমিনুল, মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮৭, পৃ. ৭”। ইয়াতীমের তত্ত্বাবধানকে উৎসাহিত করতে তিনি বলেছেনÑ আমি এবং ইয়াতীমের তত্ত্বাবধানকারী বেহেশতে এভাবে থাকবে। তিনি আরো বলেছেন- বিধবা এবং গরীব-মিসকীনদের সাহায্য-সহায়তার চেষ্টা সাধনকারী, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী অথবা দিনভর রোযা ও রাতভর নামায আদায়কারীর অনুরূপ। এ হাদীসটিতে দেখা যায়, অপরিহার্য ‘ইবাদত এর সাথে গরীব-মিসকীন ও বিধবাদের সাহায্য ও সেবাদান করাকে সমতুল্য ঘোষণা করে তাদের অধিকার আদায়ের পথ সুপ্রশস্ত করেছেন। মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মদ (সা.) ইয়াতীম, অসহায়দের সম্পদ হরণ করাকে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেনÑ ‘ইয়াতীমদের সম্পদ আত্মসাৎ করা মানুষের ইহকাল ও পরকাল ধ্বংসকারী পাপের মধ্যে গণ্য হবে।’ “ ইসলাম, মাওলানা আমিনুল, মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৬”। রাগ বা ক্রোধ যা প্রায়শই আমাদের সমাজ জীবনে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাকে তিনি সর্বান্ত কারণে দমন করতে বলেছেন। এভাবে পরনিন্দা, পরচর্চা, কুৎসা রটনা, চুরি এমনকি অযথা সন্দেহ করাকেও নিষিদ্দ করেছেন তিনি।
৭। শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) : ইসলাম কল্যাণময় জীবন বিধান। মানব জীবনের সকল স্তর ও সকল বয়সের জন্য শান্তি ও কল্যাণের পথনির্দেশ ইসলামে বিদ্যমান। মানবজীবনের মূলভিত্তি হল শৈশবকাল। তাই ইসলাম শৈশবের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে। শিশু সন্তানের গুরুত্বারোপে আল-কুরআনের ভাষ্য হচ্ছেÑ ‘ধন-ঐশ্বর্য ও শিশু সন্তান পার্থিব জীবনের শোভা’। “আল-কুরআন, ১৮ : ৪৬”।
শিশুর খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি শিশুকে জাগতিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক, পারিপার্শ্বিক, শিষ্টাচার, আক্বীকা, খতনা, সুন্দর একটি নাম নির্ধারণ, পরিস্কার- পরিচ্ছন্নতার শিক্ষায় উজ্জীবিত করা প্রতিটি পিতামাতার অন্যত দায়িত্ব। নবী (স.) বলেন, ‘কারো সন্তান জন্মগ্রহণ করলে সে যেন একটি সুন্দর নাম রাখে এবং উত্তমরূপে তাকে আদব-কায়দা, শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়।’ “সম্পাদনা পরিষদ, দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ২০০৮, পৃ. ১৫৯”।
উপসংহার : বর্তমানে জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং- এর উপস্থিতি সত্ত্বেও বিশ্বের প্রায় ছয়শ কোটিরও অধিক মানুষ আজ চরম ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, বেকারত্ব, নাগরিক অধিকার দলন, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ইত্যাদির যাঁতাকালে পিষ্ঠ হচ্ছে। দেশে-দেশে জনপদে আজ ঐক্যবিধ্বংসী সন্ত্রাস, হত্যা-রাহাজানি, মারামারি-হানাহানি, নৈরাজ্য, যুদ্ধের বিভীষিকা, তথাকথিত মানবাধিকারে ধ্বজাধারীদের ব্যবহার মানবতাবিধ্বংসী অত্যাধুনিক মারণান্ত্রেস কবলে আজ সারাবিশ্ব চরম হুমকীর সম্মুখীন। বস্তুত আল্লাহ প্রদত্ত এবং রাসূল (সা.) প্রদর্শিত মানবাধিকারের আদর্শই কেবল বিশ্বমানবতার সামগ্রিক কল্যাণ, মুক্তি ও সফলতা সর্বজনীনভাবে নিশ্চিত করতে পারে। ইসলামের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার আলোকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব বিনির্মাণের পথে ঐক্যবদ্ধ ঈমানী প্রতিজ্ঞা-প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হবে বিশ্বের প্রতিটি বনী আদমের মানবাধিকার ততো তাড়াতাড়ি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। (সমাপ্ত)

ইসলামের আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তার আইন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
৫। স্বাধীনতা, চলাচল, বসবাস, রাজনৈতিক আশ্রয় ও নাগরিকত্ব লাভের অধিকার : মুহাম্মদ (সা.) প্রবর্তিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককের রাষ্ট্রের যে কোন স্থানে স্বাধীনভাবে চলাচল ও বসবাসের অধিকার প্রদান করে। একইভাবে স্বাভাবিক পরিস্থিেিত রাষ্ট্রের বাইরে যাওয়া ও অন্য রাষ্ট্রে বসবাসের অধিকারও প্রতিটি ব্যক্তিকে দেয়া হয়েছিল। তাঁর রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে একটি ‘বিশ্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা’ ধারণায় বিশ্বাসী ছিল। রাসূল (সা.) এর রাষ্ট্রদর্শন অনুযায়ী সমগ্র বিশ্ব আল্লাহর রাজ্যস্বরূপ- যা তিনি সকল মানুষের চলাচল ও বসবাসের জন্যে অবারিত করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সমগ্র দেশ আল্লাহর আর মানুষ আল্লাহর বান্দা, তুমি যেখানে মঙ্গলজনক মনে কর বসবাস কর। “প্রাগুক্ত”। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্ব পর্যন্ত মানুষের জন্য বিশ্বের যে কোন স্থানে স্বাধীনভাবে চলাচল ও বসবাসের সর্বজনীন স্বাধীনতা ছিল।
রাসূল (সা.) প্রবর্তিত ইসলামী রাষ্ট্রে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তিকে ‘ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে নাÑ এ শর্তে রাজনৈতিক আশ্রয় ও নাগরিকত্বের অধিকার দেয়া হয়েছে। মক্কা থেকে হিজরতকারী মুহাজির জনগণকে মদীনায় আশ্রয় ও নাগরিকত্ব প্রদানসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। মুহাম্মদ (সা.) এর নেতৃত্বে ইসলামী রাষ্ট্র আশ্রয়প্রার্থীদের মৌলিক চাহিদা পূরণার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ করে তাদেরকে স্বাবলম্বী করে তোলার প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেয়। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭২”।
৬। নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক আচরণ থেকে মুক্তি লাভের অধিকার : শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কোন ব্যক্তিকে শারীরিক-মানসিক শাস্তিদান বা তাকে কষ্ট দেয়াকে রাসূল (সা.) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “প্রকৃত মুসলমান হচ্ছে সেই ব্যক্তি যার কথা বা হাত থেকে মুসলমানগণ নিরাপদ থাকবে। “খতীব আত তাববীয়ী, ওয়ালিউদ্দীন মুহাম্মদ, আল-মিশকাতুল মাসাবীহ, কলিকাতা : এম. বশির হাসান এ্যা- সন্স, তা. বি. খ. ১, পৃ. ১২”।
এমনকি এক্ষেত্রে অমুসলিম নাগরিকগণের অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত দৃঢ়তায় তিনি বলেছেনÑ “মনে রেখো! যদি কোন মুসলমান অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালায়, তার অধিকার খর্ব করে, তার উপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেয় অথবা তার কোন বস্তু জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয় তাহলে কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহর আদালতে তার বিরুদ্ধে অমুসলিম নাগরিকের পক্ষ অবলম্বন করব।” “রহমান, মো. আতাউর, ইসলামী শ্রমনীতির রূপরেখা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, সংখ্যা ৪৬, জুন. ১৯৯৩, পৃ. ৪৩”।
৭। সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিতকরণ : ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার অধিকার দিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন- “অমুসলিমদের জীবন আমাদের জীবনের এবং তাদের সম্পদ আমাদের সম্পদের মতোই। তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, জীবনের নিরাপত্তা, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি অধিকার ইসলাম স্বীকার করে। মদীনা সনদ অমুসলিমদের মদীনায় বসবাসের অধিকার দিয়েছিল। এমনকি, তাদের একটি অংশ বিশ্বাসঘাতকতা করা সত্ত্বেও বাকী অংশের প্রতি অন্যায় আচরণ করা হয়নি। ইসলাম একজন অমুসলিম শ্রমিককে একজন মুসলিম শ্রমিকের মতই সুযোগ-সুবিদা দেয়। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেছেন, “সতর্ক থাক, সে ব্যক্তি সম্পর্কে যে ব্যক্তি অমুসলিমদের উপর জুলুম করে অথবা তাদের হক নষ্ট করে অথবা তাদের সামর্থ্যরে চাইতে বেশী কাজের বোঝা চাপাতে চেষ্টা করে অথবা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের থেকে কিছু জোরপূর্বক নেয়, আমি কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়ব। “রহমান, মুহাম্মদ মতিউর, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮”।
অমুসলিমদের ধর্মীয় উপাস্যদের নিন্দাবাদ ও গালমন্দকে কুরআন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ্ তা’য়ালা বলেনÑ “আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্য দেব-দেবীর উপসানা যারা করে তাদের উপাস্যদের তোমরা গালি দিয়ো না। “আল-কুরআন, ৬ : ১০৮”।
৮। গণতান্ত্রিক অধিকারের গোড়াপত্তন : মত প্রকাশের অধিকার, প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার, ন্যায়সঙ্গতভাবে সরকারের সমালোচনা করার অধিকার ইসলামে স্বীকৃত। এ প্রসঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনার উদ্ধৃতি দেয়া যায়। উমর রা. এর খিলাফতকালে খলীফা জুম্মার খুতবা মিম্বরে দাঁড়ানোর সাথে সাথে এক মুসল্লী জানতে চাইলেন খলীফার জামা এত লম্বা হলো কীভাবে? কারণ বায়তুলমাল থেকে সকলকে যে কাপড় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা দিয়ে এতো লম্বা জামা বানানো যায় না। প্রশ্নকর্তা যখন জানলেন, খলীফার ছেলের ভাগে যে কাপড় পাওয়া গেছে সেটা খলীফাকে দেয়ার ফলেই তাঁর পক্ষে লম্বা জামা বানানো সম্ভব হয়েছে তখন প্রশ্নকর্তা সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, হ্যাঁ এখন খুতবা শুরু করুন। আমরা শুনবো। খলীফা বললেন, যদি সন্তোষজনক জবাব না পেতে তাহলে কী করতে? তখন প্রশ্নকর্তা বললেন : তখন আমার এই তলোয়ার এর সমাধান দিতে! একথা শুনে খুশী হয়ে খলীফা বললেনÑ হে আল্লাহ্ ! যতদিন পর্যন্ত এরূপ সাচ্চা ঈমানদার বান্দা জীবিত থাকবে ততদিন ইসলাম ও মুসলমানের কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। “রহমান, মুহম্মদ মতিউর, পৃ. ৩৬”।
৯। ন্যায়বিচার লাভের অধিকার : মুহাম্মদ (সা.) প্রবর্তিত রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক-সামাজিক-পেশাগত মর্যাদা নির্বিশেষে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক একটি নিরপেক্ষ, অবাধ ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অধীনে স্বাভাবিক ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার লাভ করে। মূলত ন্যায়বিচার ধারণার উপর ইসলামে এতটা গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যে, কুরআনে প্রায় ষাটটি আয়াতে এ সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন একটি আয়াতে বলা হয়েছে “তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং আল্লাহর জন্য ন্যায় সঙ্গত সাক্ষ্য দাও, তাতে যদি তোমাদের পিতা-মাতা কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের ক্ষতি হয় তবুও। “আল-কুরআন, ৪ : ১৩৫”। রাসূল (সা.) প্রতিষ্ঠিত শাসনামলে ইসলামের বিচারব্যবস্থা যা শাসক গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ মুক্ত, স্বাধীন, অবাধ ও নিরপেক্ষ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে, তা ছিল মূলত রাসূল (সা.) এর মানবতাবোধ ও মানবাধিকারের উদার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উৎসারিত। মনীষী বার্ক এ সম্পর্কে চমৎকারভাবে রাসূল (সা.) এর কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিয়েছেন।
তাঁর ভাষায়Ñ ঞযব গঁযধসসবফধহ খধি রং নরহফরহম ঁঢ়ড়হ ধষষ, ভৎড়স ঃযব পৎড়হিবফ যবধফ ঃড় ঃযব সবধহবংঃ ংঁনলবপঃ. ওঃ রং ধ খধি রহঃবৎড়িাবহ রিঃয ধ ংুংঃবস ড়ভ ঃযব রিংবংঃ, ঃযব সড়ংঃ ষবধৎহবফ ধহফ সড়ংঃ বহষরমযঃবহবফ লঁৎরংঢ়ৎঁফবহপব ঃযধঃ যধং বাবৎ বীরংঃবফ রহ ঃযব ড়িৎষফ. সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.) : উল্লেখিত ক্ষেত্রগুলোর পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজ ও মানবিকতার ক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মদ সা. যে অনুপম আদর্শ রেখে গেছেন তা মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও সর্বজনীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এমন কতগুলো ক্ষেত্র এখানে আলোচনার দাবী রাখে।
১। শান্তি, সাম্য ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠায় রাসূল (সা.) এর বাস্তবমুখী পদক্ষেপ : কুরআনে আল্লাহ্ স্পষ্ট ভাষায় মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন, “আমি তোমাকে সমগ্র সৃষ্টির জন্যে রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি”। “আল-কুরআন, ২১ : ১০৭”। কুরআনের এ বাণী পরিপূর্ণভাবে সত্যে পরিণত করেছিলেন রাসূল (সা.)। সমাজ, রাষ্ট্র ও সমগ্র মানব জাতির ভ্রাতৃত্ব, শান্তি, সাম্য ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠায় তিনি যে অনন্য উদাহরণ রেখে গেছে পৃথিবীর ইতিহাসে তা আজো অদ্বিতীয় ও অনুকরণীয়। কেননা তিনি কেবল মুসলমানদের আদর্শ ছিলেন না, ছিলেন গোটা মানব জাতির আদর্শ। আল্লাহ্ তা’য়ালা তাঁকে এই মর্মে ঘোষণা দিতে নির্দেশ দিয়েছেনÑ “বলুন, হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর রাসূল। “আল-কুরআন, ৭ : ১৫৮”।
মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব যিনি অতি শৈশবে বিস্ময়করভাবে সমবণ্টন নীতিতে তার দুধ মা হালিমার ঘরে দুধ মাতার একটি মাত্র স্তন পান করতেন আর একটি রেখে দিতেন হালিমার নিজের সন্তানের জন্যে। “কায়্যূম, অধ্যাপক হাসান আব্দুল, শান্তির দূত হযরত (সা.) সীরাত স্মরণিকা, ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪১৫, পৃ. ৩৮”।
সমগ্র মক্কাবাসী যখন তাদের দ্বারা নির্যাতিত, বিতাড়িত, চরম প্রতিহিংসার শিকার মুহাম্মদ (সা.) এর হাতে চরম দন্ড পাওয়ার আশংকায় প্রহর গুণছিল, সেদিন শান্তির দূত মুহাম্মদ (সা.) নিঃশর্ত ক্ষমা করে দয়া ও ক্ষমার অপার মহিমান্বিত ইতিহাস রচনা করেন। ঐতিহাসিক গিবনের ভাষায় বলা যায়Ñ ওহ ঃযব ষড়হম যরংঃড়ৎু ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ ঃযবৎব রং হড় রহংঃধহপব ড়ভ সধহমহধসরঃু ধহফ ভড়ৎমরাবহবংং যিরপয পধহ ধঢ়ঢ়ৎড়ধপয ঃযড়ংব ড়ভ গঁযধসসধফ (ং) যিবহ ধষষ যরং বহবসরবং ষধু ধঃ যরং ভববঃ ধহফ যব ভড়ৎমধাব ঃযবস ড়হব ধহফ ধষষ. “প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০”।
২। দয়া, ক্ষমা ও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাসূল (সা.) এর অনন্য পদক্ষেপ : মহানবী (সা.) ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, ক্ষমাশীল ও কোমল। দয়া, ক্ষমা, শান্তি ও সাম্যের প্রতিরূপ এই মহামানব স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, “যে মানুষকে দয়া করে না, আল্লাহ্ তাকে দয়া করেন না। “রহমান, শেখ ফজলুর, সাম্য ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) সীরাতুন্নবী (সা.) স্মরণীয়, ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪০৭, পৃ, ১৮”। এখানে কেবল মুসলমানদের কথাই নয় বরং সমগ্র সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শনকে তিনি নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন। অন্য একটি হাদীসে মহানবী (সা.) বলেন : “পৃথিবীতে যারা আছে তাদের প্রতি দয়া কর। ঊর্ধ্বলোকে যারা আছেন তারাা তোমার প্রতি সদয় হবেন”। “রহমান, শেখ ফজলুর, প্রাগুক্ত পৃ. ১৯”। অন্যদিকে শ্রমিক, অধীনস্থ কর্মচারী ও চাকর-চাকরানীদের প্রতি সদয় ব্যবহার করা, তাদেরকে নিজেদের অনুরূপ, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ, বিশ্রাম ইত্যাদির ব্যবস্থা করতেও তিনি বার বার তাগিদ দিয়েছেন। বস্তুত বিশ্বনবী (সা.) শ্রমিকদের সব প্রকার বঞ্চনা, অত্যাচার, নিপীড়ন আর গ্লানির অবসান করে এমন সব শ্রমনীতির প্রবর্তন করে গেছেন যার সিকি শতাংশও জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রসংস্থা (আই.এল.ও) বিগত ১১৮ বছর ধরে মে দিবস উদ্যাপনের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। “হোসেন, মুহাম্মদ ফরহাদ, মে দিবস, শ্রমিক শ্রেণী এবং ইসলাম, দৈনিক যুগান্তর, ৩০ এপ্রিল, ২০০৪, পৃ. ১২”। (অসমাপ্ত)

ইসলামে ওযুর গুরুত্ব ও উপকারিতা

ডাঃ হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফুল্লাহ মানসুর

ই সলামি বিধান মতে অযু হল দেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ ধৌত করার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জনের একটি উত্তম পন্থা। যার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করা যায় এবং এর মাধ্যমে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতগুলোর মধ্যে বিশেষ করে নামাজ আদায় ও কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। নামাজ ও কুরআন তেলাওয়াত করার জন্য অবশ্যই পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন । কারণ পবিত্রতা ছাড়া আল্লাহ তাআলার কাছে নামায গৃহীত হবে না। এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেনঃ
ﻻَ ﻳَﻘْﺒَﻞُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺻَﻼَﺓَ ﺃَﺣَﺪِﻛُﻢْ ﺇِﺫَﺍ ﺃَﺣْﺪَﺙَ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺘَﻮَﺿَّﺄَ “আল্লাহ তাআলা তোমাদের কারও নামায গ্রহণ করবেন না, যখন সে অপবিত্র হয়ে যায়, যতক্ষণ না সে অযু করে। (বুখারী ও মুসলিম)
অন্য এক হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী “নামাজকে বলা হয় জান্নাতের চাবি আর ওযুকে বলা হয় নামাজের চাবি” পবিত্র কোরানে আছে “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তওবাকারীকে ভালবাসেন এবং যাহারা পবিত্র থাকে তাদেরকেও ভালবাসেন।” অনুরূপভাবে কুরআন শরীফ পড়তে ও স্পর্শ করতেও অযুর প্রয়োজন হয়। পবিত্র কোরানে আছে -“যাহারা পূত-পবিত্র তাহারা ব্যতীত অন্য কেহ তাহা স্পর্শ করো না।“[১] (সূরা ওয়াক্কিয়াহ্, আয়াত:৭৯)। দেহ ও পরিধেয় কাপড়ের পবিত্রতা আর্জনকে বলা হয় তাহারাত্। অযু বা গোসলের মাধ্যমে সেই তাহারাত্ আর্জন করা যায়। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলেন – “পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ধর্মের অর্ধেক।“ (সহীহ মুসলিম)। অতএব প্রত্যেকটা মুমিনের উচিত ওযু বা তাহারাত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা রাখা ও সব সময় ওযু অবস্থায় থাকা।
অযুর ফরজ ফরজসমূহ : যেমন
১. মুখমন্ডল পরিপূর্ণ ধৌত করা। ২. দুই হাত কনূই পর্যন্ত ধৌত করা। ৩. মাথার এক চতুর্থাংশ মাসেহ করা (ভেজা হাত মাথায় বুলানো)। ৪. দুই পায়ের টাকনু পর্যন্ত উত্তম রূপে ধৌত করা। (ক্ষেত্র বিশেষ চামড়ার মোজার উপর মসেহ্ করা যাবে যাকে খুফস বলা হয়)।
এ ফরজগুলি ছাড়াও আছে কিছু সুন্নাত ও মুস্তাহাব কাজ যার মাধ্যমে সুন্দরভাবে ওযু করা সম্ভব। তবে ফরজের কোন একটি কাজ বাদ পড়লে ওযু হবে না।
এ সম্পর্কে কোরআনে বর্নিত আছে : “হে মু’মিনগণ! যখন তোমরা সালাতের জন্য প্রস্তুত হবে তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও হাতের কনুই পর্যন্ত ধৌত করে নিবে এবং তোমাদের মাথা মসেহ্ করবে এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত করবে; যদি তোমরা আপবিত্র থাক, তবে বিশেষভাবে পবিত্র হয়ে নিবে।তবে তোমরা যদি অসুস্থ হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেহ শৌচস্থান হইতে আগমন করে, অথবা তোমরা স্ত্রীদের সহিত সংগম কর এবং পানি না পাও তবে পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করবে এবং তখন তোমাদের মুখমন্ডল ও হাত মসেহ্ করবে। আল্লাহ্ তোমাদিগকে কষ্ট দিতে চান না; বরং তিনি তোমাদিগকে পবিত্র করিতে চান ও তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করতে চান, যাহাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।(সূরা মায়িদা, আয়াত:৬)।
অযু ভঙ্গের কারণসমূহ :
কোন ব্যক্তি অযু করার পর কিছু নির্দিষ্ট কাজ না করলে তার অযু বলবৎ থাকে। কিন্তু ঐ কাজগুলো যখনই করা হয় তখনই অযু অকার্যকর হয়ে যায় যা অযু ভেঙ্গে যাওয়া বলে।
উযু ভঙ্গের কারণ ৭টি :
১. পায়খানা-পেশাবের রাস্তা দিয়ে কোন কিছু বের হওয়া।
২. অযু অবস্থায় মুখ ভরে বমি হলে।
৩. শরীরের ক্ষতস্থান হতে রক্ত, পুঁজ বা পানি বের হয়ে গড়িয়ে পড়লে।
৪. থুথুর সঙ্গে রক্তের ভাগ সমান বা বেশি হলে।
৫. চিৎ, কাৎ বা হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেলে।
৬. পাগল, মাতাল বা অচেতন হলে ।
৭. নামাযে উচ্চ আওয়াজে করে হাসলে।
যে পানি দিয়ে অযু করা যাবে : যেমন-
১. বৃষ্টির পানি ২. কুয়ার পানি যা ঢাকা থাকে ৩. ঝর্ণার, সাগর, নদীর পানি ৪. বরফ গলা পানি ৫. বড় পুকুর বা টেঙ্কের পানি
যে পানি দিয়ে অযু হবে না : যেমন-
১. অপরিচ্ছন্ন বা অপবিত্র পানি ২. ফল বা গাছ নিসৃত: পানি ৩. কোন কিছু মিশানোর কারণে যে পানির বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ এবং গাঢ়ত্ব পরিবর্তিত হয়েছে। ৪. অল্প পরিমাণ পানি: যাতে অপবিত্র জিনিস মিশে গেছে (যেমন: মূত্র, রক্ত, মল বা মদ)। ৫. অযু বা গোসলের জন্য ব্যবহৃত পানি। ৬. অপবিত্র (হারাম) প্রাণী, যেমনঃ শূকর, কুকুর ও আন্যান্য হিংস্র প্রাণীর পানকৃত পানির আবশিষ্ট।
ওযুর উপকারিতা
ওযুতে চারটি উপকারি রয়েছে-
দুটি উপকার ধর্মীয় যথা- ১. পবিত্রতা অর্জন যা মনে প্রশান্তি আনে ২. শয়তানের প্ররোচণা দূর হয় যা মন থেকে অশান্তি দূর করে প্রফুল্লতা ফিরে আনে।
অন্ন দুটি উপকার শারীরিক যথা-৩. অন্তকরণ সুদৃঢ় করে ৪. পদসমূহ মজবুত করে।
মস্তিষ্কের সাথে যেহেতু অন্তরের সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে তাই ওযুর মাধ্যমে মস্তিষ্ককে শক্তিশালী করা হয় অর্থাৎ শরীর ও মন শক্তিশালী হয়। এর মাধ্যমে অন্তকরণ মজবুত ও পদসমূহ সুদৃঢ় করা যায়। যেমন পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন-
হে নবী স্মরণ কর সেই সময়ের কথা যখন আল্লাহ তোমাদের উপর তন্দ্রা স্থাপন করেছিলেন স্বীয় সান্নিধ্য হতে তোমাদের উপর শান্তি স্থাপনের জন্য। আর আসমান হতে তোমাদের উপর পানি বর্ষণ করেছিলেন যাতে সে পানি তোমাদেরকে পবিত্র করে। এবং তোমাদের থেকে শয়তানের প্ররোচণা দূর করেন এবং তোমাদের অন্তর সমূহ সুদৃঢ় করেন এবং তোমাদের পদসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। (সূরা আনফাল)
আর ক্রোধ দমনে রাসূল (সা.) বলেছেন — ক্রোধ প্রকাশ করা শয়তানের কাজ এবং শয়তান আগুন হতে সৃষ্টি হয়েছে। আগুন পানি দ্বারা নিভে যায়। অতএব তোমাদের মধ্যে কেউ রাগান্বিত হলে সে যেন ওযু করে নেয়
এ ছাড়াও কুরআন ও হাদীসের আলোকে ওযুর কিছু ফজিলত আলোকপাত করা হলো :
১) ওযুকারিকে আল্লাহ তাআলার ভালোবাসেন :
অযু /ওযু হল পবিত্রতা, আর পবিত্রতা অর্জনকারীকে আল্লাহ তাআলা ভালবাসেন। এরশাদ হচ্ছে:
ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻳُﺤِﺐُّ ﺍﻟﺘَّﻮَّﺍﺑِﻴﻦَ ﻭَﻳُﺤِﺐُّ ﺍﻟْﻤُﺘَﻄَﻬِّﺮِﻳﻦَ
“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তওবাকারীদের এবং পবিত্রা অর্জন কারীদেরকে ভালোবাসেন।” (সূরা বাকারাঃ ২২২)
২) পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ: রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ ﺍﻟﻄُّﻬُﻮﺭُ ﺷَﻄْﺮُ ﺍﻹِﻳﻤَﺎﻥِ “পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।” (মুসলিম)
৩) ওযু কারীর জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হয় ”
যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যে ব্যক্তি সুন্দর ভাবে অযু করবে অত:পর অযুর শেষে নিম্ন বর্ণিত দুআ পাঠ করবে তার জন্যে
জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হবে, সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে।” দু’আটির বাংলা উচ্চারণ-
ঃ “আশহাদুআল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া
রাসূলুহু। আল্লাহুম্মাজআলনী মিনাত্ তাওয়্যাবীনা ওয়াজআলনী মিনাল মুতাত্বহহিরীন।” (তিরমিযী)
৪) ওযু কারীর জন্য জান্নাতের সুসংবাদ :
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
“যে কোন ব্যক্তি সুন্দর ভাবে অযু করে, একনিষ্ঠতার সাথে দুরাকাআত নামায আদায় করে তার জন্যে জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়।” (মুসলিম)
৫) অযু এক নামায হতে অন্য নামাযের মধ্যে সংঘঠিত গুনাহের কাফফারাহ স্বরূপঃ
রাসূল (স.) এরশাদ করেনঃ
ﻣَﻦْ ﺃَﺗَﻢَّ ﺍﻟْﻮُﺿُﻮﺀَ ﻛَﻤَﺎ ﺃَﻣَﺮَﻩُ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﻓَﺎﻟﺼَّﻠﻮَﺍﺕُ
ﺍﻟْﻤَﻜْﺘُﻮﺑَﺎﺕُ ﻛَﻔَّﺎﺭَﺍﺕٌ ﻟِﻤَﺎ ﺑَﻴْﻨَﻬُﻦَّ
“যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী পরিপূর্ণ ভাবে অযু সম্পাদন করে, (তার জন্য) ফরয নামাযগুলোর মধ্যবর্তী সময়ে সংঘঠিত গুনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়।” (মুসলিম)
৬) ওযুর মাধ্যমে গুনাহ দূর হয় ঃ
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (স.) বলেছেন: “যখন একজন মুসলিম বা মু’মিন ব্যক্তি অযু করে, সে যখন তার চেহারা ধৌত করে পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে তার চেহারার গুনাহ সমূহ দূর হয়ে যায় যা তার দৃষ্টি দ্বারা হয়েছে। এমনিভাবে সে যখন তার দুহাত ধৌত করে তার হাতের গুনাহ সমূহ যা হাত দিয়ে ধরার মাধ্যমে করেছে তা পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে দূর হয়ে যায়। আবার যখন দু’পা ধৌত করে পায়ের গুনাহ সমূহ যা পা দিয়ে চলার মাধ্যমে হয়েছে তা পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে দূর হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত- সে গুনাহ হতে সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে যায়। (মুসলিম)
৭) অযুর অংগ প্রত্যংগগুলো কিয়ামতের দিন আলোকিত হবে :
আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত তিনি বলেন, সাহাবাগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার উম্মত যারা আপনার পরে আসবে তাদেরকে আপনি কিভাকে পরিচয় পাবেন? তিনি বললেন” “আমার উম্মতগণ কিয়ামতের দিন অযুর স্থানগুলো আলোকীত অবস্থায় উপস্থিত হবে।” (মুসলিম)
৮) ঘুমানোর পূর্বে অযু করা দুআ কবুল হওয়ার কারণ :
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন মুসলিম ব্যক্তি যখন অযু করে নিদ্রায় যায়, রাত্রিতে জেগে দুনিয়া এবং আখেরাতের কোন কল্যাণের দুআ করলে দুআ কবুল করা হয়।” (নাসাঈ)

জিলহজ্ব মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমল সমূহ যা জানা খুবই প্রয়োজন

ডাঃ হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফল্লাহ মানসুর

পবিত্র রমজান মাসের পর গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সময় হলো জিলহজ মাসের প্রথম ১০দিন। এই দিনগুলোর ইবাদত করা আল্লাহ তায়ালার নিকট অতি প্রিয়।সহিহ বোখারির বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ভালো আমলের জন্য আল্লাহর নিকট এই দিনগুলোর চেয়ে প্রিয় কোনো দিন নেই; সাহাবারা প্রশ্ন করলেন ইয়া-রাসুলাল্লাহ (সঃ)- এমনকি আল্লাহর রাহে জিহাদও এই দিনসমূহের ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়? জবাবে ইরশাদ হলো- না, অন্য সময়ে আল্লাহর রাহে জিহাদও এই দশকের ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। অবশ্য যে ব্যক্তি জান ও মাল নিয়ে আল্লাহর রাহে জিহাদ করতে বের হয়েছেন এবং তার কোনোটি নিয়েই ফিরতে পারেননি, তার কথা ভিন্ন।
অতএব যারা কুরবানি করার সামর্থ্য রাখে অথবা সামর্থ রাখে না; তাদের সবার জন্য জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন অতি গুরুত্বের সাথে অতিবাহিত করা প্রয়োজন । কুরবানি করার আগ পর্যন্ত যে বিধি-নিষেধ রয়েছে যা পালন করার মধ্যে রয়েছে অনেক সাওয়াব। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে কোরআন-হাদিসে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া এই ইবাদত সম্পর্কে আমাদের সমাজের খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষই ধারণা রাখেন। চলুন জেনে নিই জিলহজ মাসের প্রথম দশকের উল্লেখযোগ্য ১০টি আমল যথা –
১. সামর্থ্যবান হলে হজ পালন করা। -সূরা আল ইমরান: ৯৭
২. কোরবানি করা। -সূরা কাউসার ও তিরমিজি
৩. অধিক পরিমাণে আল্লাহতায়ালার নামের জিকির করা। -সূরা হজ্ব : ২৮
বর্ণিত আয়াতে অবশ্য নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নামের জিকির করার কথা বর্ণিত হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসিরবিদ উলামায়ে কেরামের অভিমত হলো- ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’ বলতে জিলহজের প্রথম দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে।
৪. বেশি বেশি পরিমাণে নেক আমল করা ও দান-সাদাকাহ করা। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম
৫. সকল ধরনের পাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম
৬. কোরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির এই দশদিন- নখ, চুলসহ শরীর থেকে কোনো কিছু কর্তন না করা। -সহিহ মুসলিম
সেজন্য জিলহজ মাস আসার আগে জিলক্বদ মাসের শেষের দিকে যেমন-
ক.মাথার চুল কাটা কিংবা মাথা ন্যাড়া করা।
খ.হাত ও পায়ের নখ কাটা।
গ.মোচ ছেঁটে ছোট করা ইত্যাদি
৭. বেশি বেশি তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠ করা। যেমন- আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ। – আবু দাউদ
৮. আরাফার দিন ফজর হতে আইয়ামে তাশরিকে (ঈদের দিন ও তার পরে আরো তিন দিন) প্রতি নামাজের পর উল্লেখিত তাকবিরটি পাঠ করা। -আবু দাউদ
৯. আরাফার দিনে রোজা রাখা। সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি মনে করি, তার বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা এক বছর পূর্বের ও এক বছর পরের গুনাহ মাফ করে দিবেন।
আরাফার দিন ছাড়াও ঈদের দিন ছাড়া প্রথম দশকের বাকি দিনগুলোতেও রোজা রাখাকে মোস্তাহাব বলেছেন ইমাম নববি (রহ.)। কেননা নফল রোজাও নেক আমলের শামিল। হাদিসে এই দশকে সাধারণভাবে নেক আমলের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য হাদিসে স্বতন্ত্র নির্দেশ থাকায় আরাফার দিনের রোজা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
১০. ঈদের দিনের যাবতীয় সুন্নতসমূহ পালনে সচেষ্ট হওয়া যেমন-
ক. উত্তমরূপে গোসল করা।
খ. সাধ্যমত নতুন জামা পরে ঈদগাহে আসা।
গ. আতর ও সুরমা লাগানো।
ঘ. তালবিয়া পাঠ করতে করতে ঈদগাহে আসা।
ঙ. আত্মীয় সজনসহ সকলের সাথে কুশল বিনিময় করা।
চ. পশু কুরবানী থাকলে নামাজ শেষে কুরবানী করা।
ছ. খালিমুখে নামাজ পড়তে আসা, নামাজ শেষে কুরবানীর গোসত দিয়ে খাবার শুরু করা।
প্রিয় পাঠক! জিলহজ মাস তো কতোবারই এসেছে আমাদের জীবনে। কিন্তু আমরা কী পেরেছি জিলহজ মাসের এসব আমলসমূহ পালন করতে? কে জানে আগামী জিলহজ মাস আমাদের জীবনে আসবে কি-না? সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিন্তু এখনই। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে জিলহজ মাসের সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রেখে কুরআন- হাদিসের ওপর আমল করা এবং শরীয়তের বিধি-নিষেধগেুলোর প্রতি যতœবান হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ইসলামের আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তার আইন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার লংঘন ও নির্বাসনের একটি সমীক্ষা : মানবাধিকার সংরক্ষণের এক মহান উদ্দেশ্য নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা হলেও বর্তমানে বিশ্বের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ এর মানবাধিকার বিষয়ক ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জিং অধ্যায় বলে মনে করেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদ আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইতালী ও চীনকে ‘ভেটো’ প্রয়োগের নিরংকুশ ক্ষমতা প্রদান করে নিজেই মানবাধিকার লংঘনের নজীর স্থাপন করেছে। পৃথিবীর পরাশক্তিসমূহ বিশেষতঃ আমেরিকা ও ব্রিটেন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে শাসন-শোষণ ও বঞ্চনার করুণ শিকারে পরিণত করেছে। অথচ এরাই জাতিসংঘ ও মানবাধিকার কমিশন নিয়ন্ত্রণ করে। আর পুতুলসম জাতিসংঘেরও এমন কোন সংস্থা বা মেকানিজম নেই যা দেশে দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে কিংবা আইন দ্বারা তা মানতে বাধ্য করতে পারে। ফলে জাতিসংঘের ছাত্রছায়ায়, কোন কোন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে বৃহৎ শক্তিবর্গ বিশেষত আমেরিকা ও তার মিত্র শক্তি দুর্বল দেশসমূহে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার সনদকে পদতলে পিষ্ট করে আফগাস্তিান ও ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনীর নগ্ন আগ্রাসন, গণহত্যা, স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা হরণ, সিরিয়া, ইরান ও সৌদি আরবের প্রতি মার্কিন হুমকি, বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় সার্ব বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা, ফিলিস্তীনে ইসরাইলী আগ্রাসান ও দমন-পীড়ন, আলবেনিয়ায় গণহত্যা, স্বাধীনতাকামী কাশ্মীর মিন্দানাওয়ে মুসলিম নিধন, মায়ানমারে মুসলিমদের ওপর জেল-জুলুম ও নির্যাতন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি ও কোন কোন দেশে ঘন-ঘন সামরিক শাসন জারী, আমেরিকায় মুসলিম ও নিগ্রোদের প্রতি বৈরী আচরণ, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে নাগরিক অধিকার হরণ, দেশে দেশে বোমাতংক এবং সামাজিক নৈরাজ্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অস্থিতিশীল বিশ্ব পরিস্থিতি আজ জাতিসংঘের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতিকেও আজ বিপর্যয়কর অবস্থার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। ফলে মনে হয়, গুটি কয়েক রাষ্ট্রকে ভেটো প্রয়োগ ক্ষমতা প্রদান করে জাতিসংঘ এসব রাষ্ট্রকে তার সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ হতে ফায়দা লুটার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। পক্ষান্তরে এই ব্যবস্থা বিশ্বের কোটি কোটি শান্তিকামী মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে মুসলিম বিশ্ব ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা, আদর্শিক অসচেতনতা, সামাজিক পশ্চাদপদতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনগ্রসরতা প্রভৃতি সমস্যায় জর্জরিত। সর্বোপরি মুসলিম বিশ্বের মাঝে ঐক্য ও সংহতির অভাব আজ সুস্পষ্ট। ফলে তারা জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ হতে পুরোপুরি ফায়দা উঠাতে পারছে না। এমতাবস্থায় উপরোক্ত দুর্বলতাসমূহ কাটিয়ে উঠে মুসলিম উম্মাহ যদি কেবল মহান আল্লাহ প্রদত্ত এবং মহানবী (সা.) প্রদর্শিত শাশ্বত জীবন ব্যবস্থা ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণ করে এবং মহানবী (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদীনার জনকল্যাণমূলক আদর্শ রাষ্ট্রের মডেলে মানবাধিকারের শিক্ষা ও নীতিমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগে গ্রহণ করে তা হলে বিশ্ববাসীকে মানবাধিকারের গ্যারান্টি দিতে সক্ষম হবে। “আব্দুল কাদের, ড.আ.ক.ম, প্রাগুক্ত, পৃ.৫৬”। সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার এই উদারণ রাসূল (সা.) এর জীবনের শুরু থেকেই আজীবন নানাভাবে দেখা গিয়েছিল। পরবর্তীকালে যখন তিনি গোটা আরব জাহানের নেতা হয়ে উঠলেন তখন তিনি কি সমাজজীবনে, কি পারিবারিক জীবনে, কি রাষ্ট্রীয় তথা নাগরিক জীবনে, কি বিশ্ব নাগরিক হিসাবে- সর্বক্ষেত্রে মানুষের মূল্য-মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকারের যে সর্বজনীন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন আজ পর্যন্ত সারা বিশ্বের ইতিহাসে তা বিরল, অভূতপূর্ব। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নীতি-দর্শনের কয়েকটি দিকের উপর আলোকপাত করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠবে।
মানবাধিকার ও ইসলামী নীতিমালা (ওংষধসরপ চৎরহপরঢ়ষবং)
১। নিরাপদ জীবন-যাপনের অধিকার : মুহাম্মদ (সা.) মানুষের জীবনের অধিকার ও জান-মালের নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। নরহত্যা যেখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল সেখানে নরহত্যাকে জঘন্য অপরাধ হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, “সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ হচ্ছে, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করা এবং মানুষকে হত্যা করা। “আল-হাদী, উদ্ধৃত, গ.ঊৎংযধফঁষ ইধৎর, ঐঁসধহ জরমযঃং রহ ওংষধস রিঃয ঝঢ়বপরধষ জবভবৎহপব ঃড় ডড়সবহ জরমযঃ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঐঁসধহ জরমযঃং রহ ওংষধস শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধ, ১৯৯৪, ঢাকা : পৃ. ১৮”।
মহানবী (সা.) আলো বলেছেনÑ “কোন যিম্মীকে (মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিককে) হত্যাকারী জান্নাতের সুগন্ধ পর্যন্ত পাবে না। যদিও জান্নাতের সুগন্ধ অনেক দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়। “বুখারী, ইমাম, আস-সহীহ, মো. আব্দুল করিম খান সংকলিত, ঢাকা : বাংলাদেশ লাইব্রেরী ১৯৯৬, পৃ. ৩৩০, হাদীস নং ১২৭৭”। বিদায় হজ্বের ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী (সা.Ñ বলেছেন, “হে মানবজাতি! নিশ্চয় তোমাদের জীবন, সম্পদ এবং সম্ভ্রম তোমাদের প্রভুর সম্মুখে উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত পবিত্র”। “আহমদ, মুহাম্মদ শফিক ও মু. রুহুল আমীন, ইসলামে মানবাধিকার : নাগরিক ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, যুক্তসংখ্যা ৪৭, ৪৮, ৪৯, অক্টোবর ৯৩- জুন, পৃ. ১৫৮”। মহানবী (সা.) আত্মহত্যাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং আত্মহত্যাকারী তার নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দেয়ার শাস্তি হিসাবে আত্মহত্যার অনুরূপ পন্থায় দোযখে শাস্তি ভোগ করবে বলে হুঁশিয়ার বার্তা দিয়েছেন। “বুখারী, ইমাম, আস-সহীহ, মো. আব্দুল করিম খান সংকলিত, প্রাগুক্ত, হাদীস নং ১২৫১-১২৫৩”।
২। বিবাহ ও পারিবারিক জীবনযাপনের অধিকার : মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন দর্শনে সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তিকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। ইসলামে বিবাহ সমভাবে একটি অধিকার ও ধর্মীয় দায়িত্ব। রাসূল (সা.) বলেছেÑ “বিবাহ আমার সুন্নত, যে আমার সুন্নতের প্রতি অনাসক্ত সে আমার আদর্শভুক্ত নয়। “প্রাগুক্ত”। কৌমার্যব্রতকে প্রত্যাখান করে তিনি বলেছেন : “ইসলামে সন্ন্যাসবাদ ও বৈরাগ্য প্রথার অনুমোদন নেই। “প্রাগুক্ত”। প্রকৃপক্ষে ইসলামে ‘বিবাহ’ কেবল জৈবিকা চাহিদা পূরণের পন্থাই নয় বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, সমঝোতা, সমবেদনা ও নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। রাসূল (সা.) প্রবর্তিত বিবাহব্যবস্থা এমন একটি সামাজিক চুক্তি যাতে নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্মত বা অসম্মত হবার সমান অধিকার স্বীকৃত। তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যাপারেও ইসলামে নারী ও পুরুষকে সমান অধিকার প্রদান করা হয়েছে। “প্রাগুক্ত”।
বিবাহের পাশাপাশি পারিবারিক জীবনকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যেহেতু স্বামী-স্ত্রীই হল পরিবারের মূল ভিত্তি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের উপরই প্রাথমিকভাবে পারিবারিক জীবনের শান্তি ও সুখ নির্ভরশীল তাই পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক কেমন হবে এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়ে কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছেÑ “তাঁরা (স্ত্রীগণ) তোমাদের (স্বামীদের) ভূষণ আর তোমরা তাদের ভূষণ। “আল-কুরআন, ২ : ১৮৭”।
৩। সম্পদের মালিকানা : রাসূল (সা.) প্রবর্তিত ইসলামী অর্থব্যবস্থা সমাজবাদ বা পুঁজিবাদ কোনটিকেই সমর্থন করে না এখানে সীমিত পরিসরে ব্যক্তির জন্য সম্পত্তির মালিকানা স্বীকৃত। তবে তা এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে, ব্যক্তি এখানে সম্পদ উপার্জনের লাগামহীন স্বাধীনতা লাভ করে না। ইসলামী সমাজে সকল সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আল্লাহর। মানুষ দায়িত্বপ্রাপ্ত (ঞৎঁংঃবব) হিসাবে এর অর্জন, ভোগ ও বণ্টনের অধিকার লাভ করে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- “তাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে”। “আল-কুরআন, ৭০ : ২৪, ২৫”। দান-খয়রাত, সদকা, যাকাত, ফিতরা প্রভৃতির মাধ্যমে বর্ধিত সম্পদের বিলি-বণ্টন করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক অবস্থার কথা কেবল বলাই যায়নি, রাসূল (সা.) তাঁর জীবনে কার্যকরভাবে তা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ইসলামে সমাজে পুঁজিপতি ও শ্রমিকের সম্পর্ক শোষণ বা সংঘর্ষ নির্ভর নয় বরং পারস্পরিক কল্যাণমূলক ও ভ্রাতৃত্বসূলভ। রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে সত্তার হাতে আমার জীবন তার শপথ করে বলছি, কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারে না, যে পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তা অন্য ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করে”। “আহমদ, মুহাম্মদ শফিক ও মুহাম্মদ রুহুল আমীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৫”।
৪। দাসত্বের গোলক ধাঁধা থেকে স্বাধিকার : দাসত্বের পরাধীনতা মানবেতিহাসের এক চরম অমানবিক ও অবমাননাকর অধ্যায়। এর প্রচলন ছিল বিশ্বব্যাপী এবং ১৮৯০ সালে ব্রাসেলসে দাস-ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ কনফারেন্সের আগ পর্যন্ত বিশ্বের কোথাও এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধাচরণ করা হয়নি। “মানব প্রকৃতি অপরিবর্তনীয়”Ñ এ দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে প্লেটো ও এরিস্টোটল থেকে শুরু করে আঠারো শতকের অধিকাংশ দার্শনিক দাসপ্রথাকে সমর্থন করেছেন। দাস প্রথা সম্পর্কে এরিস্টোটলের মতামত উল্লেখ করে অনফঁষষধয কধহহড়ঁস বলেছেন- ”ওহ যরং ড়ঢ়রহরড়হ, সধহশরহফ পড়হংরংঃবফ ড়ভ ঃড়ি পধঃবমড়ৎরবং ঃযব ভৎবব ধহফ ঃযব ংষধাবং ধহফ ঃড় যরস ংড়সব ঢ়বড়ঢ়ষব বিৎব ংষধাবং নু ঃযবরৎ াবৎু হধঃঁৎব. ”কধহহড়ঁস, অনফঁষষধয রংষধস রং ঃযব ভরৎংঃ অহঃর-ঝষধাবৎু জবষরমরড়হং ঝুংঃবস ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ. ঞযব ওংষধসরপ জবারবি ঔড়ঁৎহধষ. ডড়ৎশরহম ঝঁৎাবৎু, ঊহমষধহফ, ঔঁষু-অঁমঁংঃ ১৯৬৬, চ. ৩৭. গ্রীক, রোমান, পারসিক প্রভৃতি প্রাচীন সভ্যতাসমূহে ইহুদী, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও সনাতন হিন্দু ধর্মে এমনকি আধুনিক ইউরোপ ও আমেরিকাতেও প্রথমদিকে দাস প্রথা স্বীকৃত প্রথার মর্যাদা পায়। ‘‘আহমদ, মুহাম্মদ শফিক ও মুহাম্মদ রুহুল আমীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০’’ এ থেকে অনুমিত হয় যে, এ প্রথাটির নৈতিকতা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রাথমিক কৃতিত্ব মহানবী সা. এরই প্রাপ্য।
মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মদ (সা.) সেই সপ্তম শতাব্দীতেই এ প্রথার বিরোধিতা ও এর বিলুপ্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। তাঁর দর্শন ছিল, সমগ্র মানব জাতি একজন নারী ও পুরুষ থেকে উদ্ভূত, সুতরাং জন্মগতভাবে সকল মানুষ সমান ও স্বাধীন।
তিনিই সর্বপ্রথম দাসমুক্ত করেন এবং দাসমুক্ত করাকে বিশেষ সওয়াবের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করলে সাহাবীদের মাঝে দাস মুক্তির হিড়িক পড়ে যায়। স্বয়ং নবী (সা.) ৬৭ জন, আবূ বকর (রা.) অসংখ্য, ওমর (রা.) এক হাজার, আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ত্রিশ হাজার দাস-দাসীকে মুক্তি দান করেন। মানুষে মানুষে এই সমতা বিধানের মহত্তম আদর্শ দেখে মুগ্ধ হয়ে উৎ. অযসধফ এড়ষধিংয তাঁর ”ঞযব জবষরমরড়হ ড়ভ ওংষধস” গ্রন্থে বলেন, ”ঊয়ঁধষরঃু ড়ভ ৎরমযঃ ধিং ঃযব ফরংঃরহমঁরংযরহম ভবধঃঁৎব ড়ভ ঃযব ওংষধসরপ ঈড়সসড়হবিধষঃয. অ পড়হাবৎঃ ভৎড়স ধহ যঁসনষব পষধহ বহলড়ুবফ ঃযব ংধসব ৎরমযঃং ধহফ ঢ়ৎরারষবমবং ধং ড়হব যিড়ফ নবষড়হমবফ ঃড় ঃযব হড়নষবংঃ কড়ৎধংরংয. ‘‘রহমান, মুহাম্মদ মতিউর, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯.
বর্তমানে দাসত্ব তথা দাস প্রথা উচ্ছেদ করার কথা সভ্য সমাজ মুখে বললেও এটিকে তারা বাস্তবে জিইয়ে রেখেছে। আমিরিকা তার সভ্যতা বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে, বহুতল বিশিষ্ট অট্টালিকা, সুরম্য জনপদ, প্রশস্ত সড়ক, বিশালাকার শিল্প-কারখানা ইত্যাদি নির্মাণে আফ্রিকা থেকে বহুসংখ্যক দাস আমদানি করে। সে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে এবং কিছুটা ভিন্ন আকারে। ১৭৭৬ সনের ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণার কথা বলতে গিয়ে ঈষধঁফব গ. খরমযঃভড়ড়ফ বলেন- ”ইষধপশ ৎবসধরহবফ ংষধাবং ঁহঃরষ ধনড়ঁঃ ৮০ ুবধৎং ষধঃবৎ, ড়িসবহ ফরফ হড়ঃ ৎবপরবাব ঃযব ৎরমযঃ ঃড় াড়ঃব ঁহরঃষ ১১২ ুবধৎং ষধঃবৎ ধহফ ঃযব ড়িৎশরহম পষধংং ফরফ হড়ঃ মবঃ ঃযব ষবমধষ ৎরমযঃ ঃড় ড়ৎমধহরহংব ধহফ পড়ষষবপঃরাবষু নধৎমধরহ ১৫০ ুবধৎং ষধঃবৎ. ‘‘প্রাগুক্ত’’
প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ইড়ংড়িৎঃয তাঁর ”গড়যধসসবফ ধহফ গড়যধসধফধহরংস” গ্রন্থে বলেন- ”ওঃ ৎবপড়মহরংবফ রহফরারফঁধষ ধহফ ঢ়ঁনষরপ ষরনবৎঃু, ংবপঁৎবফ ঃযব ঢ়বৎংড়হ ধহফ ঢ়ৎড়ঢ়বৎঃু ড়ভ ঃযব ংঁনলবপঃং ধহফ ঢ়ড়ংঃবৎবফ ঃযব মৎড়ঃিয ড়ভ ধষষ পরারপ ারৎঃঁবং. ওঃ পড়সসঁহরপধঃবফ ধষষ ঃযব ঢ়ৎরারষবমবং ড়ভ ঃযব পড়হয়ঁবৎরহম পষধংং ঃড় ঃযড়ংব ড়ভ ঃযব পড়হয়ঁবৎবফ যিড় পড়হভড়ৎসবফ ড়ভ রঃং ৎবষরমরড়হ, ধহফ ধষষ ঃযব ঢ়ৎড়ঃবপঃরড়হ ড়ভ পরঃরুবহংযরঢ় ঃড় ঃযড়ংব যিড় ফরফ হড়ঃ, ওঃ ঢ়ঁঃ ধহবহফ ঃড় ড়ষফ পঁংঃড়সং ঃযধঃ ৎিবৎব ড়ভ রসসড়ৎধষ ধহফ পৎরসরহধষ পযধৎপঃবৎ. ওঃ ধনড়ষরংযবফ ঃযব রহযঁসধহ পড়ংঃড়স ড়ভ নঁৎুরহয ঃযব রহভধহঃ ফধঁমযঃবৎং ধষরাব, ধহফ ঃড়ড়শ বভভবপঃরাব সবধংঁৎবং ভড়ৎ ঃযব ংঁঢ়ঢ়ৎবংংরড়হ ড়ভ ঃযব ংধষাব- ঃৎধভভরপ. ‘‘প্রাগুক্ত’’ (অসমাপ্ত)

ইসলামের আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তার আইন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
আমেরিকার ঞযব উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব এর ১৩ বছর পর ১৭৮৯ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সের বিপ্লবীরা স্বৈরাচারী রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তারা ইত:পূর্বে যেইসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল সেগুলোকে অন্তর্ভূক্ত করে ১৭৮৯ সালের ২৬ আগষ্ট “উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ জরমযঃং ড়ভ সধহ ধহফ ড়ভ ঃযব পরঃরুবহ” নামক ঐতিহাসিকক ঘোষণাপত্র সম্পাদন করে। এতে বলা হয়Ñ গবহ ধৎব নড়ৎহ ধহফ ৎবসধরহ ভৎবব ধহফ বয়ঁধষ রহ ৎরমযঃং.” “উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ জরমযঃং ড়ভ গধহ ধহফ ড়ভ ঃযব ঈরঃরুবহ, অৎঃরপষব-১”। এতে স্বাধীনতা, সম্পত্তি, নিরাপত্তা, অন্যায়ের প্রতিবাদ, বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রভৃতি অধিকারের উল্লেখ ছিল। “ওনরফ, অৎঃরপষব-২. আমেরিকা ও ফ্রান্সের মানবাধিকারের এই প্রভাব ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে পুরো ইউরোপীয় মহাদেশকে গ্রাস করে ফেলে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সংবিধানে মানবাধিকার বিষয়টি স্থান করে নেয়। “ইধৎর, উৎ. ঊৎংযধফঁষ, ওনরফ, চ-২৩-২৪ ক্রমে মানবাধিকারের এই আন্দোলন এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃতি লাভ করে।
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী সা. কর্তৃক গৃহিত বাস্তব পদক্ষেপ :
১। হিলফুল ফুযুলের প্রতিষ্ঠা : মহানবী (সা.) এর আবির্ভাব ঘটে আরব দেশে এক বেদুঈন অঞ্চলে, যেখানে অতীতে কখনো নগর জীবনের নান্দনিকতা ও সভ্যতার ছোঁয়া লাগেনি। “অষ-অমমধফ অননধং গধযসঁফ অঃযৎ-ধষ অৎধন ঋরধষ- ঐধফধৎধঃ-ধষ টৎঁ নলুধয ঊমুঢ়ঃ : উধৎ ধষ-গধ-ৎরভ. চ-৫-৬” । এখানকার জাহিলী পরিবেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত সমাজে জাহিলিয়্যাত ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। মহানবীর (সা.) আগমনের সমসাময়িককালে মক্কার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব ছিল আবু জাহল, আবু লাহাব, উতবাহ, শায়বাহ প্রমুখের হাতে। মানবাধিকার সম্পর্কে তাদের স্বচ্ছ ধারণা ছিল না বলে প্রতিনিয়ত তাদের হাতে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত ও পর্যুদস্ত হচ্ছিল। এমনি এক বৈরী পরিবেশে আবির্ভূত হওয়ার পর মহানবী (সা.) লক্ষ্য করেন যে, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বহু সন্তান পিতৃহারা হয়, অগণিত নারী হয় স্বামী কিংবা পুত্রহারা। মানবাধিকার চরমভাবে লংঘিত হয় এই যুদ্ধ-বিগ্রহে। অসহায়-দুস্থ-দুর্গত লোকজন বঞ্চিত হয় তাদের প্রাপ্য অধিকার হতে, ইয়াতীম-নি:স্ব বিধবাও বঞ্চিত হয় তাদের ন্যায্য পাওনা হতে। অত্যাচারীদের দোর্দন্ড প্রতাপ দুর্বল অসহায় লোকদের সদা সন্ত্রস্ত করে রাখে। সুতরাং এই বিপর্যয়কর অবস্থা হতে উত্তরণের জন্য মাত্র ১৭ বছর বয়সে মহানবী (সা.) মানবাধিকারের কতিপয় ধারা সংযোজনপূর্বক ‘হিলফুল ফুযূল’ গঠন করেন, যার মূল বক্তব্য ছিল- সমাজ হতে অশান্তি দূর করা, পথিকদের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভাবগ্রস্তদের সাহায্য-সহযোগিতা করা, মজলুমের সাহায্যে এগিয়ে আসা এবং কোন অত্যাচারীকে মক্কায় আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়া। “আব্দুল, কাদের, ড. আ.ক.ম, সীরাতু সায়্যিদিল মুরসালীন, চট্টগ্রাম : ইসলামিয়া লাইব্রেরী, ২০০১. পৃ. ৩৫-৩৬”।
২। বায়আতুল আকাবার শপথ : হিজরতের অব্যবহিত পূর্বে মহানবী (সা.) হজ্ব উপলক্ষে ইয়াছরিব হতে মক্কায় আগত খাযরাজ গোত্রীয় লোকদেরকে আল-আকাবা নামক স্থানে যে বায়আত বা আনুগত্যের শপথ করান তাতে মানবাধিকারের মৌলিক কতিপয় ধারা লক্ষ্য করা যায়। মহানবী (সা.) বলেনÑ “তোমরা আমার হাতে এ বিষয়ে আনুগত্যের শপথ (বায়আত) কর যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যেনা-ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, কারো বিরুদ্ধে মনগড়া কোন মিথ্যা অপবাদ দিবে না”। “অনঁ-অনফঁষষধয ওংসধরষ ইঁশযধর, অং ঝধযরয উরষযর : কঁঃঁন কযধহধ জধংরফরুধয. ১৯৭৭ ঠঙখ-১, চ-৭. মহানবী (সা.) এর উক্ত বাণীতে ধর্ম পালনের অধিকার, সম্পদের অধিকার মান-মর্যাদাও সম্ভ্রমের অধিকার এবং জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
৩। মদীনা সনদের প্রবর্তন : ৬২২ খ্রি. মহানবী (সা.) যখন মক্কা হতে ইয়াছরিব তথা মদীনায় হিজরত করেন তখন মদীনায় তিন শ্রেণীর জনগোষ্ঠী বাস করতোÑ এক: একনিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায় দুই : মদীনার আদি মুশরিক তথা পৌত্তলিক সম্প্রদায় এবং তিন : মদীনার ইয়াহুদী সম্প্রদায়।
এ ধরণের একটি বহু জাতিক ও বহুধর্ম ভিত্তিক অঞ্চলে হিজরত করে মদীনার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রধান হিসাবে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে মহানবী (সা.) হিজরতের প্রথম বর্ষে একটি লিখিত সনদ জারী করেন। ইতিহাসে এটি ‘মদীনা সনদ’ নামে প্রসিদ্ধ। “আব্দুল কাদের, ড.আ.ক.ম, আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা ও মহানবী সা. জনকল্যাণমূলক আদর্শ রাষ্ট্র, ঢাকা : বি.আই.সি.এস, সীরাত সংকলন, ২০০২, পৃ. ২২-২৩”। আরবী ভাষায় জারীকৃত এই সনদে ৫৩টি ধারা বিদ্যমান ছিল, যার অনেকগুলো ধারাই ছিল মানবাধিকার বিষয়ক। এতে উল্লেখ করা হয় যে, মদীনায় বসবাসকারী সকল ইয়াহুদী এবং ইয়াছরিব ও কুরাইশের সকল মুসলিম জনগোষ্ঠী একটি স্বতন্ত্র জাতি এবং সকলে সমান নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ভোগ করবে। পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকবে এবং কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা যাবে না, কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে প্রচলিত প্রথা ও ন্যায়বিচার মোতাবেক রক্তপণ আদায় করতে হবে, কেউ বন্দী হলে ন্যায়বিচার মোতাবেক তাকে মুক্ত করতে হবে, দুর্বল ও অসহায়কে আশ্রয় দেয়া হবে এবং সর্বতোভাবে তাদের রক্ষা করা হবে, ঋণগ্রস্তদের ঋণের বোঝা লাঘব করা হবে, অত্যাচারী, পাপিষ্ঠ এবং সমাজে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সকলে অবস্থান গ্রহণ করবে, তারা কারো সন্তান কিংবা নিকটাত্মীয় হলেও। কোন অন্যায়কারীকে সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে না এবং কোন প্রকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। কেউ কারো অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, মহানবী (সা.) এর পূর্বানুমতি গ্রহণ ব্যতীত কেউ যুদ্ধে জড়িত হতে পারবে না, একজনের অপকর্মের জন্য অন্যজনকে দায়ী করা যাবে না, ইয়াহুদীদের মিত্ররাও সমান নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ভোগ করবে, বহি:শত্র“ দ্বারা মদীনা আক্রান্ত হলে একে রক্ষা করার জন্য সকলে সম্মিলিত প্রায়াস চালাবে। “আব্দুল, কাদের, ড.আ.ক.ম, মদীনা সনদ : একটি পর্যালোচনা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল অব ল, ১৯৯১, খ. ৪, পৃ. ২৫৭-২৬১”। এভাবে মদীনা সনদের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও গোত্রের মানুষের পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করার নিশ্চয়তা বিধানের নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই প্রথম। সমাজের সকল শ্রেণীর নাগরিকের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম ও ধর্মীয় অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান এবং পরমত সহিষ্ণুতা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্প্রীতির উপর ভিত্তি করে রচিত মদীনা সনদ বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান বা শাসনতান্ত্রিক সরকারের মর্যাদা লাভ করে। “ঐধসরফঁষষধয, উৎ. গঁযধসফ, ঞযব ঋরৎংঃ ডৎরঃঃবহ ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ রহ ঃযব ড়িৎষফ, খধযড়ৎব : ঝযধয গঁযধসধফ অংযৎধভ, ১৯৮১, চ.৪”
৪। বিদায় হজ্বের অমোঘ ভাষণ : বিদায় হজ্বে প্রদত্ত মহানবী (সা.) এর ঐতিহাসিক ভাষণ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত। কোন আন্দোলন কিংবা সংগ্রামের মুখে নয়, কোন চাপের কাছে নত স্বীকার করে নেয়, সম্পূর্ণ নবুওয়তী দায়িত্ব ও কর্তব্যের খাতিরে স্বত:স্ফূর্তভাবে প্রদত্ত এই ভাষণে তিনি মানবাধিকার বিষয়ে যে সুস্পষ্ট বক্তব্য রাখেন তা অবিস্মরণীয়। তিনি বলেন, ‘আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর তোমাদের নিকট পবিত্র অনুরূপভাবে তোমাদের জীবন এবং সম্পদ ও পবিত্র’। “ঐধৎঁহ অনফঁং ঝধষধস (বফ) ঞধযলরন ংরৎধঃ ওনহ- ঐরংযধস, কঁধিরঃ : উধৎ-ধষ ইঁযঁঃয ধঃ ওংষধসরুধয, ১৯৮৪, চ, ৩২৫”।
রাসূল (সা.) আরো বলেন, কারো নিকট কোন সম্পদ গচ্ছিত থাকলে তা প্রকৃত মালিকের নিকট অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। জাহিলী যুগের সমস্ত সুদ প্রথা রহিত করা হল, কিন্তু মূলধন ফেরত পারবে।” “ওনরফ, চ.৩২৬”। “সম্মতি ও সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা অবৈধ। “ওনরফ, চ.৩২৭”। “জাহিলী যুগের সকল রক্তের প্রতিশোধ রহিত করা হল”। “ওনরফ, চ.৩২৬”। ইচ্ছাকৃত হত্যার শাস্তি মৃত্যুদন্ড, আর অনিচ্ছাকৃতভাবে হত্যার শাস্তি হল একশত উট রক্তপণ আদায়। “অষ-ঔধযরু-অসৎরহন ইধযৎ, করঃধন-অষ-ইধুধঃ ধিষ ঞধনুুধহ, ইধরৎঁঃ : উধৎ ধষ ঋরৎশৎ, ১৯৬৮, ঠড়ষ-১, চঁৎঃ-২, ৫৩”। মহানবী (সা.) কর্তৃক মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং (১৯৪৮) এর ৩, ৬ ও ১৭ নং অনুচ্ছেদে এবং সংবিধানের ৩২, ৪২, ৪২ (১) নং অনুচ্ছেদেও স্থান পেয়েছে।
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, “তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার রয়েছে। আবার তোমাদের উপরও তোমাদের স্ত্রীদের অধিকার রয়েছে। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হল তোমাদের বিছানায় তোমরা ছাড়া অন্য কেউ যেন না যায় এবং তারা যেন কোন অশ্লীল কাজ সম্পাদন না করে; তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর নির্দেশে তোদের সাথে দাম্পত্যের সম্পর্ক স্থান করে তাদেরকে নিজেদের জন্য বৈধ করেছ। “ঐধৎঁহ, অনফঁং ঝধষধস, ওনরফ, চ.৩২৬”। স্বামী-স্ত্রীর মানবাধিকার বিষয়টি জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপবষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং এর ১৬নং অনুচ্ছেদে এবং ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়াবহবহঃ ড়ভ ঈরারষ ধহফ চড়ষরঃরপধষ জরমযঃং (ওঈঈচজ) এর ২৩নং অনুচ্ছেদ স্থান লাভ করে।
মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সীমারেখা নির্ধারণ করে মহানবী (সা.) বলেন “এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। আর মুসলিম জাতি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।
অতএব, পারস্পরিক সম্মতি ও সন্তুষ্টি ব্যতীত কোন মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা বৈধ নয়”। “ওনরফ, চ.৩২৭”। মহানবী (সা.) আরো বলেন, “তোমাদের রব এক এবং তোমাদের পিতা এক। সকলকে আদম থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে আর আদম (আ.)কে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। “অষ-ঔধযরু-অসৎরহন ইধযৎ, শরঃধন- অষ-ইধুধহ ধিষ ঞধনুুধহ. চ. ১৬”। এভাবে ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধকে অনেক ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে। ঋুুবব বলেন, ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা কেবল প্রচার-প্রোপাগান্ডার মধ্যেই সীমিত নয়; বাস্তব জীবনেও তা অনুসরণের তাগিত দেয়া হয়। বস্তুত ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ইসলামের চিরন্তন সোনালী অধ্যায়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংগ। “ঋুুবব, অংধষভ, অ.অ., ঙঁঃ ষরহবং ড়ভ গড়যধসসধফধহ খধ,ি খড়হফড়হ : ঙীভড়ৎফ টহরাবৎংরঃু চৎবংং, ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ, চ.১৩.”। জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং-এর ১নং অনুচ্ছেদে মানুষের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বসূলভ আচরণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
দাস-দাসীদের সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, “তোমরা দাস-দাসীদের ব্যাপারে সাবধান থাকবে। তারা তোমাদেরই ভাই। তোমরা যা খাবে তাদেরকেও তা খেতে দেবে, তোমরা যা পরবে, তাদেরকেই তা পরতে দেবে। তাদের ্পর কোন প্রকার নির্যাতন চালাবে না, তাদের মনে আঘাত দিবে না।” “ইঁশযধৎর, অনঁ অনফঁষষধয ওংসধরষ, ওনরফ, ঠড়ষ, ১, চ, ৯ ”। শুধু তাই নয়, মহানবী সা. স্বীয় দাস যায়েদকে মুক্ত করে দিয়ে নিজের প্রতিপাল্য হিসেবে গ্রহণ করে দাসদেরকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছেন। জাতিসংঘের ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং- এর ৪নং অনুচ্ছেদে এবং ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ড়ভ পরারষ ধহফ ঢ়ড়ষরঃরপধষ জরমযঃং (ওঈঈচজ) এর ৮নং অনুচ্ছেদেও দাসত্বের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
বংশ কৌলিণ্য ও বর্ণবাদ বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেন, “কোন অনারব ব্যক্তির ওপর কোন আরববাসীর এবং কোন কৃষ্ণাঙ্গের উপর কোন স্বেতাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের একমাত্র মাপকাঠি হল তাকওয়া।” “অষ-ঔধযরু-অসৎরহন ইধযৎ, শরঃধন- অষ- ইধুধহ ধিষ ঞধনুুধহ, চ-৫৪”। উক্ত বক্তব্যে মহানবী (সা.) বংশ কৌলিন্য বর্ণবাদ প্রথাকে স্থান দেননি।
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঞযব উবপষধৎধঃরড়হ ড়হ ঃযব ঊষবসরহধঃরড়হ ড়ভ ধষষ ভড়ৎসং ড়ভ জধপরধষ উরংপৎরসরহধঃরড়হ এর অনুচ্ছেদ-এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য হল মানব মর্যাদার বিরুদ্ধে একটি অপরাধ এবং তা টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ঈযধৎঃবৎ ঃযব ঁহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং এর পরিপন্থী এবং জাতিসমূহের বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানের পথে বাধা স্বরূপ। “বেরা মন্ডল ও মো. শাহজাহান মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১-১১২”।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে মানবাধিকার : বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ঘোষিত ঞযব টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং- এর উত্তরাধিকার লালন করছে। বিশ শতকের প্রথম থেকেই মানব সভ্যতা অত্যন্ত অসহায়ভাবে দুটো ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে। মানবাধিকারের ললাটে কালিমা লেপন করে এতে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ নারী-পুরুষ- শিশু বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। অতঃপর ভার্সাই চুক্তি ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তুপের উপর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। “আহমদ, ড. এ.বি. এম শামসুদ্দীন, মদীনা সনদের আলোকে মানবাধিকার ঘোষণা, তা.বি.পৃ. ৮০”। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একনায়কত্ব ও ফ্যাসিবাদের ভয়াবহতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলার প্রেক্ষাপটে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ভয়াবহতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলার প্রেক্ষাপটে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সৃষ্টিকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম মানবাধিকারের প্রতি বিশ্বসমাজের উৎকণ্ঠা প্রকাশ পায়। ফলে নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি আন্তর্জাতিক চেতনা সৃষ্টি হয়। যার ফলশ্র“তিতে ১৯৪৫ সালে সানফ্রান্সিসকো শহরে জাতিসংঘের সনদ প্রণয়নকালে এর স্থপতিগণ মৌলিক মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও মানুষের মর্যাদার প্রতি তাঁদের আস্থা ব্যক্ত করেন। “রেবা মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮-৩১”।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সভায় ৩০টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত যে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয় তার ৩ থেকে ২১ পর্যন্ত অনুচ্ছেদসমূহে ১৯টি নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার স্থান পেয়েছে এবং এর ২২ থেকে ২৭ পর্যন্ত অনুচ্ছেদসমূহে ৬টি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। মানবাধিকারের এই সর্বজনীন ঘোষণা গৃহীত হওয়ার পর স্বাধীনতা প্রাপ্ত প্রায় সকল রাষ্ট্রের সংবিধানে উক্ত ঘোষণাপত্রে বর্ণিত মানবাধিকার সমূহ মর্যাদা সহকারে স্থান পেয়েছে। জাতিসংঘ তার সদস্য রাষ্ট্রসমূহের জন্য মানবাধিকারের এই সনদ অনুসরণ বাধ্যতামূলক করে নি। কিন্তু এটি অনুমোদন লাভ করার পর সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে এতে স্বেচ্ছামূলক করে নি। কিন্তু এটি অনুমোদন লাভ করার পর সদস্য রাষ্ট্রসমূহকে এতে স্বেচ্ছামূলক স্বাক্ষর প্রদানপূর্বক নিজ নিজ দেশে তা বাস্তবায়নের আহবান জানানো হয়। কোন দেশ এই সনদ কতটুকু অনুসরণ করছে তা পর্যবেক্ষণ ও এ সম্পর্কিত রিপোর্ট প্রদানের জন্য জাতিসংঘ একটি স্থায়ী মানবাধিকার কমিশন গঠন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই কমিশনের শাখা রয়েছে যার মাধ্যমে জাতিসংঘ তার সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মানবাধিকার বিষয়ক যাবতীয় রিপোর্ট অবহিত হয়। (অসমাপ্ত)

হযরত শাহজালাল (রহ.)’র ভক্ত ও উত্তরাধিকারী হিসেবে আমাদের করণীয়

রুহুল ফারুক

উপমহাদেশের অন্যতম মুবাল্লিগ, মুত্তাকী, ওলিকূল শিরমণি মহান দরবেশ হযরত শাহজালাল মজররদ ইয়ামেনী (রহ.) ১৩০৩ খৃষ্টাব্দে শুভাগমন করেন। ২৬ শাওয়াল ৭০৩ হিজরীতে দ্বীনের ঝান্ডা তুলেন ও সিলেট ফতেহ, বিজয় করেন। (দলিল : শিলালিপি, বিশ্বপর্যটক ইবনে বতুতার সফর নামা)
মহান ওলির আগমনের পর থেকে ধনী-গরীব, সাদা-কালো, নারী-পুরুষ, হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, সুখী-দুখী, শ্রমিক- মেহনতি, নবাব, রাজা, বাদশাহ, উজির, নাজির রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, কর্মকর্তা, কর্মচারী সহ সর্বস্তরের মানুষ দরগাহ শরীফে আসেন। এই মহান ওলির প্রতি মানুষের এত আকর্ষণের কারণ চুম্বক যেভাবে লোহাকে নিজের দিকে টানে, উনার মাঝে এরূপ অনেক গুণাবলী থাকায় মানুষ আকৃষ্ট হয়। বিশেষ করে আল্লাহর মাহবুব বান্দা হিসেবে রহমত প্রাপ্ত হয়েছেন। যার ফলে বিগত ৭১৫ বৎসরে উনার জীবন ও কর্মের প্রভাবে, আল্লাহর রহমতে সিলেট তথা বাংলাদেশে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ সহ-অবস্থান, সহ মর্মীতা বজায় রেখে জীবন যাপন করেছেন। দ্বীন আল ইসলামের প্রচার, প্রসার, হয়েছে, মসজিদ, মাদরাসা হয়েছে। হযরত শাহজালাল (রহ.) নামে (১) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (২) হযরত শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লি. (৩) হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর (৪) শাহজালাল সার কারখানা (৫) মাসিক শাহজালাল (গভ: রেজি: নং ১০৪) (৬) হযরত শাহজালাল (রহ.) নামে অনেক মসজিদ ও মাদরাসা, (৭) হযরত শাহজালাল (রহ.) নামে অনেক আবাসিক এলাকা (৮) হযরত শাহজালাল (রহ.) নামে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্টান (৯) হযরত শাহজালাল (রহ.) কে নিয়ে গবেষণা ও তিনটি থিসিস হয়েছে, আরোও হচ্ছে, শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে আমরা হযরত শাহজালাল (রহ.) জীবনের বিভিন্ন দিকগুলি জানার চেষ্টা করি তাহলে শিক্ষা গ্রহণ, বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
১। আল্লাহর মহব্বত (দলিল: সুরা : বাকারা : আয়াত ১৬৫) :
পৃথিবীতে বনী আদমের সন্তানরা, তথা যে কোন মানুষ যে কোন কাজ করার সময় একটি উদ্দেশ্য- লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করেন, একটি স্বার্থ থাকে, একটি আকর্ষণ থাকে, একটি চাওয়া পাওয়া থাকে। হযরত শাহজালাল (রহ.) জীবনের এই চাওয়া পাওয়া, এই আকর্ষণ, এই স্বার্থ এই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল আল্লাহর মহব্বত। (দলিল : সূরা বাকারা : আয়াত : ১৬৫)। আল্লাহর মহব্বতে নবী রাসূলগণ কাজ করে গেছেন। সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, আল্লাহর হাবীব হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর মহব্বতে কাজ করে গেছেন, খলিফায়ে রাশেদীন, তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়ীন, উলামায়ে দ্বীন, পীর মাশায়েখগণ আল্লাহর মহব্বতে কাজ করে গেছেন। হযরত শাহজালাল (রহ.) সুদুর ইয়েমেনের সানা শহরে জন্ম গ্রহণ করে মুর্শিদ হযরত সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.) এর নির্দেশে আল্লাহর মহব্বতে বাড়ি-ঘর, এলাকা, দেশ, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে দ্বীন-আল ইসলামের (দলিল : সুরা : আল-ইমরান : আয়াত : ১৯) কাজে আত্মানিয়োগ করেন। সুতরাং যে আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন; যার কাছে জীবনের সময়সীমা শেষ হলে, মৃত্যু হলে আবার ফিরে যাব সেই আল্লাহর মহব্বতে নিজের সকল কাজ করি; নিজের জীবনকে সফল করি।
২। আল্লাহর রাসূল হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর মহব্বত : (দলিল : সূরা : তওবা ২৪)
হযরত শাহজালাল (রহ.) আখেরী নবী ও রাসূল, আল্লাহর হাবীব হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.)’র প্রতি গভীর মহব্বত রাখতেন। সুতরাং আমরা এই ওলির ভক্ত, অনুসারী ও উত্তরাধীকারী হিসেবে হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর প্রতি মহব্বত রাখি, অনুগত্য করি, ছুন্নতের আমল করি, ছুন্নতের পাবন্দি হই।
৩। হক্্কুল্লাহ (দলিল : সূরা : নুর : আয়াত : ৬২, সূরা হুজুরাত : আয়াত : ১৪) :
হযরত শাহজালাল (রহ.)’র জীবন, কর্ম ও মিশনের প্রধান দুটি দিক ছিল (১) হক্্কুল্লাহ (২) হক্্কুল এবাদ। অর্থাৎ তিনি আল্লাহর রাস্তায় কাজ করেছেন। আল্লাহর হক আদায় করেছেন। আল্লাহর দেয়া দ্বীন আল ইসলামের জন্য সারা জীবন সাধনা করেছেন। বিশেষ করে ঈমান এনে ঈমানের হক আদায় করেছেন।
উল্লেখ্য যে, যিনি ঈমান আনলেন তিনিই মোমীন (দলিল : সূরা হুজুরাত : আয়াত : ১৫)। সুতরাং আল্লাহর উপর ঈমান আনার সাথে সাথেই একজন মোমীন আল্লাহর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে যান। অর্থাৎ আল্লাহ খালিক সৃষ্টিকর্তা এবং মোমীন মাখলুক (সৃষ্ট জীব) হিসাবেÑ
আক্্দ হয় চুক্তিপত্র (ধমৎববসবহঃ), অঙ্গীকার বদ্ধ হন। (দলিল : সূরা : মরিয়ম : আয়াত : ৯)
বাইয়্যাত (ক্রয়-বিক্রয় = ঝধষব – ঢ়ঁৎপযধংব) হয়। (দলিল : সূরা : ফাতহ : আয়াত : ১০)
এই ক্ষেত্রে হযরত শাহজালাল (রহ.) ঈমানের পরীক্ষায় যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে সারাজীবন পালন করে নিজেকে এক মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন; আসুন আমরাও আল্লাহর উপর ঈমানের ভিত্তিতে, আল্লাহর মহব্বতে, হযরত শাহজালাল (রহ.) এর ভক্ত হিসেবে দ্বীন আল ইসলামের ৫টি মৌলিক বিধিমালা পালন করি।
ফরজ ঈমানের বিধিমালা (দলিল : সূরা বাকারা : আয়াত ২, ৩, ৪, ২৮৫, ২০৮, ৬২, ২৫৬), (সূরা আল-ইমরান : আয়াত : ৮৪, ১৭৯, সূরা : নূর : আয়াত : ৬২, সূরা : তাগাবুন : আয়াত : ৮)
ফরজ সালাতের বিধিমালা (দলিল : সূরা বাকারা আয়াত : ৪৩, ৪৫, ১১০, ২৩৮)
ফরজ সাওমের বিধিমালা (দলিল : সূরা বাকারা : আয়াত : ১৮৩, ১৮৫)
ফরজ যাকাতের বিধিমালা (দলিল : সূরা তাওবা : আয়াত : ৬০, সূরা রুম : আয়াত: ৩৯)
ফরজ হজ্বের বিধান (দলিল : সূরা বাকারা : আয়াত ১৯৫, ১৯৬, ১৯৭, ১৫৮)
আসুন এই বিধিমালা অনুসরণ করে আমরা নিজেদেরকে কামিলিয়াতের দরজায় নিয়ে যাই।
হক্্কুল এবাদ (দলিল : সূরা : আল- ইমরান : আয়াত : ১১০) :
হযরত শাহজালাল (রহ.) হক্্কুল এবাদ তথা মানুষের হক আদায় করেছেন, আল্লাহর সৃষ্ট জীবের হক আদায় করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি মানুষের কল্যাণের জন্যই, মানুষের সেবার জন্যই দেশ থেকে দেশান্তরে গেছেন। এ সম্পর্কে আল-কোরআনে আল্লাহপাক নির্দেশ দিচ্ছেন “এবং তোমাদের মধ্যে এরূপ উম্মত হওয়া উচিত যারা কল্যাণের দিকে আহবান করে এবং ভাল কাজের আদেশ করে ও মন্দ কাজে নিষেধ করে আর তারাই সুফল প্রাপ্ত হবে।” [সূরা : আল-ইমরান : আয়াত ১০৪]। এই আয়াতের আলোকেই হযরত শাহজালাল (রহ.) পূর্ণ জীবন কাজ করেছেন এবং সুফলপ্রাপ্ত হয়েছেন বিধায় ৭১৫ বছর পরও সিলেট সহ সারা বাংলাদেশে উনার প্রতি শ্রদ্ধা, স্মরণ, অনুসরণ ও প্রভাব বিস্তার করছে। এ বিষয়ে একটি জ্বলন্ত উদাহরণ আজও সিলেটে প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত আছে, তা হচ্ছে একজন কাঠুরিয়ার মেয়ের বিবাহের আয়োজন এবং যে টিলা থেকে তিনি কাঠ কেটে এনেছিলেন তা সিলেটের এয়ারপোর্ট রোডে মালনীছড়া ও লাক্কারতুড়া চা বাগানের মধ্যস্থানে অবস্থিত যা সরকারীভাবে নির্ধারিত।
৫। দাওয়াত (দলিল : সূরা : নাহল : আয়াত ১২৫)
হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সবাই আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। হযরত শাহজালাল (রহ.) নায়েবে রাসূল হিসাবে সারা জীবন দাওয়াত দিয়েছেন। (দলিল : সূরা হা-মীম সিজদাহ : আয়াত : ৩৩; সুরা ইউসুফ : আয়াত : ১০৮)। আসুন আমরা ভক্ত হিসেবে দাওয়াতের কাজ করি।
৬। জীবনের নিয়ত : (দলিল : সূরা : আনআ’ম : আয়াত : ১৬২)
হযরত শাহজালাল (রহ.) এর জীবনের নিয়ত ছিল আল্লাহর মহব্বত অর্জন করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাই আসুন আমরাও উনার ভক্ত, অনুসারী হিসাবে জীবনের নিয়ত করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করি, রেজা-ই- এলাহী (খড়াব ড়ভ উরারহব) অর্জন করি। দলিল (সূরা আন-আম : আয়াত :১৬২,৭৯, সূরা বাকারা : আয়াত ১৬৫, ২০৭, সূরা লাইল : আয়াত ২০-২১, সূরা ইয়াসিন : আয়াত : ২৩, সূরা যারিয়াত : আয়াত ৫৬, সূরা : যুমার : আয়াত: ১১)
৭। সফল মোমীন (দলিল : সূরা : আল-মুমিনুন : আয়াত : ১-১১) :
হযরত শাহজালাল (রহ.) ছিলেন একজন সফল মোমীন, আসুন আমরা উনার ভক্ত, অনুসারী হিসাবে সফল মোমীন হওয়ার জন্য কোরআনের আয়াত ও নির্দেশনা পালন করি। (দলিল : সূরা : মুমিনুন : আয়াত : ১-১১, সূরা : নুর : আয়াত ৫১, সূরা হুজুরাত : আয়াত ১০, ১১, ১৫, সুরা : আনফাল : আয়াত ২, ৬, ৪, ৭৪, সূরা : তাওবা : আয়াত : ৭১, সুরা : রা’দ : আয়াত : ২৮)
৮। তাকওয়া > মুত্তাকী (দলিল : সূরা বাকারা : আয়াত ২-৪)
হযরত শাহজালাল (রহ.) নিঃসন্দেহে একজন তাকওয়াবান, মুত্তাকী ছিলেন। আধ্যাত্মিক সাধনায় যারা অগ্রবর্তী, সফলকাম, তারা তাকওয়ার পথ অবলম্বন করেন। তাকওয়া ছাড়া কামিলিয়াত হাসিল করা সম্ভব নয়। কারণ তাকওয়া আরবী শব্দ ওয়াকয়া থেকে এর উৎপত্তি। আভিধানিক অর্থে আত্মসুদ্ধি, বিরত থাকা, নিজেকে সকলপ্রকার ক্ষতি থেকে রক্ষা করা, সাবধান হওয়া, শয়তানের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য ও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে কাজ করে, আল্লাহর শাস্তি পাওয়াকে ভয় করা অর্থাৎ গুনাহ করলে আল্লাহর আজাব বা শাস্তি পেতে হবে এরই ভয় করা। বিধায় যারা আল্লাহর আশিক তারা তাকওয়ার তরিকা অবলম্বন করেন। এজন্য হযরত শাহজালাল (রহ.) একজন উঁচুদরের মুত্তাকী ছিলেন। বিশেষ করে জানা যায় উনি মৃত্যুর আগে নসিহত করে গেছেন যে তোমরা তাকওয়ার পথ অবলম্বন কর। দলিল : সূরা : তাওবা : আয়াত : ১১৯, সূরা হাশর : আয়াত ১৮, সূরা নুর : আয়াত ৫২, সূরা ইমরান : আয়াত ১০২, সূরা মূলক : আয়াত ১২, সূরা মায়েদা : আয়াত ২, সূরা নাহল আয়াত ১২৮, সূরা হুজুরাত আয়াত ১৩।
৯। ইতা’য়াত (দলিল : সূরা নিছা : আয়াত : ৫৯) :
ইতা’য়াত আরবী শব্দ এর অর্থ আনুগত্য করা; এর বিপরীত শব্দ মাছিয়াত অর্থ অমান্য করা। হযরত শাহজালালাল (রহ.) আল্লাহর এবং আল্লাহর রাসূলের মহব্বতে আনুগত্য করেছেন; দ্বীনের কাজ করেছেন। আসুন আমরাও তার ভক্ত হিসাবে ইতা’য়াত করি; মাছিয়াত থেকে বেঁচে থাকি।
(দলিল : সূরা : আল-ইমরান : আয়াত : ১৩২, সূরা নুর : আয়াত : ৫২, সূরা নিছা : আয়াত : ১৩, ৮০, ৬৯)
১০। লিবাস-উত-তাকওয়া : (দলিল : সূরা : নুর : আয়াত : ৩০) :
হযরত শাহজালাল (রহ.) আধ্যাত্মিক জগতে উন্নতী করায় অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে লিবাস-উত-তাকওয়া। প্রচলিত ভাবে লিবাছ বলতে পোষাক বুঝায়; যা দৃশ্যমান বা জাহেরী এবং লিবাস-উত-তাকওয়া অদৃশ্য বা বাতেনী এই জাহেরী লিবাস এবং বাতেনী লিবাস দুটিরই সম্পর্ক গভীরভাবে একত্রিত। এই লিবাস মানুষের ও পশুর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে; সুতরাং মানুষ হিসেবে নিজের মান, সম্মান, কল্যাণ, উন্নতির জন্য, লাজ-লজ্জা নিবারণের লিবাস ও লিবাস উত-তাকওয়ার পথ অবলম্বন করি। (দলিল : সূরা : নুর : আয়াত : ৩৯, ৫৯, ১৯, ৬০, সূরা : আরাফ : আয়াত : ২৬, সূরা : আহযাব : আয়াত : ৫৯, ৫৩, ৩২, ৩৩।)
উপসংহার : এই মহান ওলি, মুত্তাকী হযরত শাহজালাল (রহ.) এর আমি এক নগণ্য ভক্ত ও অনুসারী হিসাবে হযরতের নামে প্রকাশিত মাসিক শাহজালাল পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক হিসাবে বিনীত অনুরোধ, আপনারা উপরোক্ত বিষয়গুলি নিজের লাভের জন্য, নিজের কল্যাণের জন্য, নিজের শান্তি, উন্নতি, ছোয়াবের জন্য পড়–ন, আমল করুন। (দলিল : সূরা : তাহরিম : আয়াত : ৬) [আমীন]
লেখক : সম্পাদক, মাসিক শাহজালাল।