রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং ॥ সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে থাকবে প্রশাসন

7

কাজিরবাজার ডেস্ক :
পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে কঠোর বাজার মনিটরিং করা হবে। চাহিদা অনুযায়ী বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে থাকবে প্রশাসন। দাম বাড়াতে তৎপর অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধে পুরো রমজান মাসজুড়ে বাজার তদারকি করবে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২৮টি মনিটরিং টিম বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করবে। কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি ও অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে তিনটি গোয়েন্দা সংস্থাকে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, র‌্যাব, নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর এবং জেলা প্রশাসনের একাধিক টিম বাজার মনিটরিংয়ে কাজ করবে। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে তদারকি জোরদার করতে সকল জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত মুনাফা না করতে ব্যবসায়ীদের কাছেও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। আর রমজানে বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং দ্রব্যমূল্য কমাতে পুরো বিষয়টির দিকে নজর রাখছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
জানা গেছে, দেশে বিপুল পরিমাণ চিনির মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারী মিলগুলোতে চিনির কোন সঙ্কট নেই। এ ছাড়া প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত রমজান মাস সামনে রেখে চিনি বিক্রির আগ্রহ দেখিয়ে বাংলাদেশকে চিঠি দিয়েছে। ভোজ্যতেলের দাম কমাতে তিনস্তরে ৩০ শতাংশ ভ্যাট কমিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। মশুর ডালের আমদানি ও মজুদ সন্তোষজনক। এ অবস্থায় ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার কোন সুযোগ নেই বলে মনে করছে সরকার। রোজা সামনে রেখে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি ভোক্তাদের স্বার্থে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি অনুরোধ সংবলিত চিঠি দেয়া হয়। তবে অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা এখনও দ্রব্যমূল্য বাড়াতে তৎপর রয়েছে। অতিরিক্ত মুনাফা করতে তাদের কারসাজি বন্ধ হয়নি। আর এ কারণেই কঠোর বাজার মনিটরিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দ্রব্যমূল্য-সংক্রান্ত এক বৈঠকে পণ্যের অবৈধ মজুদ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতা চাওয়া হয়। গোয়েন্দা সংস্থা ভোজ্যতেল নিয়ে কারসাজির প্রমাণ পেয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের তদন্তে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার পেছনে অসাধু ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ মিলেছে। এসব কারণে আরও কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং করা হবে। সম্প্রতি দ্রব্যমূল্য-সংক্রান্ত এক বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, পুরো রমজান মাস বাজার মনিটরিং করা হবে। পণ্যের দাম বেশি নেয়ার কোন সুযোগ নেই। জানা গেছে, চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী রবিবার থেকে পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে যাচ্ছে। রমজান ঘিরে ভোগ্যপণ্যের কেনাকাটা বাড়িয়েছেন ভোক্তারা। তবে এই সময়ে ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুরের দাম কমে গেছে। মানভেদে প্রতিকেজি পেঁয়াজ ২০-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে খুচরা বাজারে। এ ছাড়া সরকারী সংস্থা টিসিবি প্রতিকেজি পেঁয়াজ ২০ এবং প্রতিকেজি ছোলা ৫০ টাকায় বিক্রি করছে। তবে খুচরা বাজারে প্রতিকেজি ছোলা ৭০-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিকেজি চিনি খুচরা বাজারে ৮০-৮৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। অর্থাৎ চিনির দাম নতুন করে আর বাড়েনি। এরই মধ্যে ভারত তাদের অতিরিক্ত চিনি বাংলাদেশে রফতানি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন রমজানে কিছুটা কম মূল্যে বাজারে চিনি বিক্রি করবে। টিসিবি থেকেও ভোক্তারা ভর্তুকি মূল্যের চিনি কিনতে পারছেন। তবে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে এখনও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ভোজ্যতেল। এ ক্ষেত্রে ভোজ্যতেলের বাজারেও কঠোরভাবে মনিটরিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ প্রসঙ্গে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ভোজ্যতেলের দাম বেশি রাখা এবং কারসাজির বিষয়টি এখন প্রমাণিত। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবে সন্তুষ্ট নয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর। সরকারীভাবে আরও গভীরভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভ্যাট প্রত্যাহারের সুবিধা কার্যকর করতে বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উদ্যোগে ঢাকা মহানগরীসহ বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। অধিদফতর থেকে এ জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের ভোক্তা অধিকার কমিটির কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা, ডিজিএফআই, এনএসআই এবং সরকারের অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠে নামিয়েছে সরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি ও অবৈধ মজুদের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। দেশে কর্মরত তিনটি গোয়েন্দা সংস্থাকে নজরদারি করতে বলা হয়েছে। রমজানে পণ্যের মূল্য যাতে না বাড়ে, এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, বাজার তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২৮টি মনিটরিং টিম রয়েছে। একজন উপ-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের একজন ম্যাজিস্ট্রেট, একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, অর্থ, খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন করে কর্মকর্তা এবং আনসার, পুলিশ ও র‌্যাবের সমন্বয়ে গঠিত এই সব টিম সারাবছর মাঠে থাকার কথা থাকলেও মূলত রমজানকে কেন্দ্র মাঠে কার্যকর ভূমিকা পালনে সচেষ্ট হয়। এসব টিম নিয়মিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করা ছাড়াও অনিয়মের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টিম ছাড়াও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, র‌্যাব এবং জেলা প্রশাসনের একাধিক টিম বাজার মনিটরিংয়ে কাজ করে। যে কোন পণ্য আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদনসহ পাইকারি ও খুচরা মূল্য মনিটরিং করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ে তদারকি জোরদার করতে সকল জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকেও একই নির্দেশ দেয়া হয়েছে।