বিসিএসে কৃতিত্বের পরও নিয়োগবঞ্চনায় পুনম

200

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কুশলী নেতৃত্বে এই ১০ বছরে নারীর অগ্রযাত্রায় অসামান্য সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। যার জন্য স্বীকৃতি আর সম্মাননা আসছে বিশ্বদরবার থেকেও। বিশেষ করে শিক্ষায় বাংলার নারীরা দারুণ কৃতিত্ব দেখিয়ে চলেছে। শিক্ষার হারে বলুন, ফলাফলে বলুন- অনেক ক্ষেত্রেই ছেলেদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের মেয়েরা।

বিজয়লক্ষ্মী নারীর পদচারণা চারদিকে। কেউ বিমান চালনায়, কেউ বিসিএসে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। নতুন প্রজন্মের এমনি একজন বিজয়িনী হুমাইরা চৌধুরী পুনম। বাংলাদেশ সরকারের সিভিল সার্ভিসের ৩৬তম (বিসিএস) পরীক্ষায় পররাষ্ট্র ক্যাডারে কৃতকার্য হন। পান দশম স্থান। তবে আর দশজনের মতো সহজ ছিল না তার পথচলা। স্বামী-সন্তান তথা সংসার সামলানোর ব্যস্ততার মাঝে যেটুকু অবসর, তার মাঝেই পড়েছেন, বসেছেন বিসিএস পরীক্ষায়। প্রথমবারেই সব ধাপ কৃতিত্বের সঙ্গে উতরে যান।

পুনম সর্বোচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। প্রথমে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে করেন স্নাতক। তারপর একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর। দুই ক্ষেত্রে দারুণ ফলাফল। পুনমের বিয়ে কিন্তু হয়ে যায় স্নাতকের পরপরই। তারপরও থেমে যাননি। স্বামী সফিক মজুমদার সুমনও সহায়তা করেন। স্নাতকোত্তরের পর বিসিএসেও অংশ নেন।

সব পরীক্ষায়ই ভালো ফল করেছেন পুনম। তার জন্য কিন্তু দিবস-রজনী কেবল বই নিয়ে পড়ে থাকেননি। তবে যখন পড়ার টেবিলে তখন মন কেবল সেখানে। বিক্ষিপ্ত কোনো ভাবনা রেখেছেন দূরে সরিয়ে। তবে শিক্ষক কিংবা সহপাঠীদের ভাবনাটা ভিন্ন। তাদের কাছে পুনম ‘স্রষ্টা প্রদত্ত মেধার অধিকারী।’ এত কম পড়ে, এত ভালো ফলাফল; আর কোনো ব্যাখ্যা পান না তারা।

তবে বিসিএসের প্রিলিমিনারির পর পুনমকে পড়তে হয়েছে ভালোই। কেননা ভালো ক্যাডার পাওয়ার বিষয়টির সঙ্গে লিখিত পরীক্ষার ফলাফল নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই প্রস্তুতিতে কোনো ফাঁক রাখেননি। তখন পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নিয়মিত পত্রিকা পড়তেন। খবর শুনতেন। আর অনেক অনেক মডেল টেস্টে নিজেকে ঝালিয়ে নেন। এর সুফলও পান হাতে হাতে। মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভা পর্ব পার হন আগের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখায়।

সব ধাপ পার হওয়ার পর পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেবেন। অবশেষে সুখে-শান্তিতে বসবাস করবেন। এভাবে শেষ হওয়ার কথা পুনমের গল্প। কিন্তু জীবনের সব হিসাব সরলরেখার মতো একই দিকে চলে না। তাই তার বিসিএস সতীর্থরা যখন সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, তখনো তা অধরা রয়ে গেছে তার কাছে।

বিসিএস ক্যাডার হিসেবে পুনমের সরকারি চাকরি যখন প্রায় নিশ্চিত, তখন কে বা কারা পরশ্রীকাতর হয়ে যায়। দাঁড়ায় তার বিরুদ্ধে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার শুরু করে। যেখানে বলা হয়, পুনমের বাবা আওয়াল চৌধুরী বিএনপির জাঁদরেল নেতা। তাদের পরিবার জামায়াত-ঘনিষ্ঠ। এটাই কাল হয়ে যায় পুনমের ক্যারিয়ারে।

অথচ পুনমের বাবা আওয়াল চৌধুরী নন। তার বাবার নাম আওলাদ হোসাইন চৌধুরী, গাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসায়ী। মা মোর্শেদা নাসরীন নিতান্তই একজন গৃহিণী। পুনমের গ্রামের বাড়ি শেরপুর জেলায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে তিনি নিয়মিত প্রথম হতেন। পরিবারে তিন ভাইবোনের মধ্যে পুনম সবার বড়। ছোটবেলা থেকে এইচএসসি পর্যন্ত তিনি তার মায়ের তত্ত¡াবধানে পড়াশোনা করেন।

বিএনপি-ঘনিষ্ঠ আওয়াল চৌধুরী বলে কেউ কী আছে? এমন প্রশ্নে হুমাইরা চৌধুরী পুনম এই সময়কে জানালেন, এই ব্যক্তিকে চেনেন তিনি। তাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। এ বিষয়ে তার ভাষ্য, ‘আমি বা আমার পরিবারের কেউ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না। যাকে আমার বাবা বলে অপপ্রচার করা হচ্ছে, তিনি আমার বাবা নন, আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয় হন। এই দেশের একটি গ্রামের, একটি এলাকার সবাই কোনো না কোনোভাবে সবার আত্মীয় হন। এরা সবাই কিন্তু একই দলের রাজনীতি করে না। একজন বিএনপি নেতাকে আমার বাবা বানিয়ে চাকরি আটকে দেওয়া হয়েছে। এই কারণে আমার জীবনে অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে।’

পুনম থামতেই তার কাছে পরের প্রশ্ন: পরে কী আর বিসিএস দিয়েছেন?

-পরেরবার প্রিলিমিনারি দিয়েছিলাম। যেহেতু আগেরবার হয়ে গেছে, এজন্য আর বাকি ধাপে অংশ নেইনি। তখন তো আর জানি না আমার চাকরি এভাবে আটকে যাবে।

-এখন কী করছেন?

-এখন বাসায়ই আছি। চাকরি-বাকরি কিছু করছি না।

-আর কোনো চাকরির পরীক্ষা দেননি?

-আমার বিসিএসের চাকরি আটকে যাওয়ায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় আছি। পড়াশোনায় ওইভাবে মনোযোগ দিতে পারছি না। তাই পরীক্ষাও দিতে পারছি না।

ক্যারিয়ার নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

-এখনো স্বপ্ন দেখি পররাষ্ট্র ক্যাডারে আমি নিয়োগ পাব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীদের জন্য অনেক কিছু করছেন। তার কাছে আমার আকুল আবেদন, আমার চাকরির বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে, তিনি যেন আমার নিয়োগের ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন।