মাঠ, মঞ্চ সব একই আছে নেই শুধু খালেদা জিয়া

6
  • আজ আসছেন তারেক রহমান

সোয়েব বাসিত

দীর্ঘ ২০ বছর পর পূর্ণ্যভ‚মি সিলেটের মাটিতে পা রাখছেন তারেক রহমান। সাবেক ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ২১ দিনের মাথায় তাঁর এ সিলেট সফর। বেগম খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০১৮ সালে বিএনপির চেয়ারপার্সন হিসেবে সিলেট সফরে এসেছিলেন। এই হিসেবে মায়ের সফরের ৭ বছর পর ছেলে তারেক রহমান আজ ২১ জানুয়ারি সিলেট আসছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ২২ জানুয়ারি বেলা ১১টায় সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদরাসা মাঠে বিএনপি আয়োজিত বিশাল জনসভায় ভাষন দেবেন। ধারণা করা হচ্ছে স্মরণাতীত কালের মধ্যে এটি হতে যাচ্ছে বিএনপির সর্ববৃহৎ জনসমাবেশ। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের সিলেট সফর দেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে নিঃসন্দেহে। তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে উচ্ছৃসিত দলের তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায়ে নেতাকর্মীরা। প্রবল আগ্রহ নিয়ে সাধারণ মানুষও মুখিয়ে আছেন তারেক রহমানের সিলেট সফর ও সমাবেশকে ঘিরে। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরা, ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো ও সাবেক ৩ বারের প্রধানমন্ত্রী মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তারেক রহমানের সিলেট সফরকে কেন্দ্র করে বাড়তি উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। সর্বত্রই যেন সাজ সাজ রব। পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন আর তুরণে ছেয়ে গেছে গোটা নগরী। নেওয়া হয়েছে ছয় স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
তারেক রহমানের সিলেট সফরে বাড়তি উৎসাহ উদ্দিপনা যোগ করেছে তার শশুর বাড়ি। তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের বাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় সিলামের বিরাহীমপুরে। সাবেক বিমান বাহিনীর প্রধান মরহুম রিয়াল এডমিরাল মাহবুব আলী খান তারেক রহমানের শশুর।
এ কারণে অনেকেই তারেক রহমানের এ সফরকে ‘সিলেটী জামাইয়ের’ সিলেট সফর হিসেবেও দেখছেন। দেশে ফেরার আগে লন্ডনে তারেক রহমান সর্বশেষ এক সংবর্ধনায় নিজেকে ‘হাফ সিলেটি” বলেও উল্লেখ করেছিলেন। তার এ কথায় তখন সংবর্ধনা সভার হল রুম জুড়ে উপস্থিত নেতা কর্মীরা তুমুল করতালি দিয়ে সাদরে গ্রহন করেন। সব মিলিয়ে তারেক রহমানের সিলেট আগমন দলীয় সকল দ্ব›দ্ব, গ্রæপিং আর সংঘাতকে পেছনে ফেলে সিলেট বিএনপিকে এ মুহুর্তে এক ফ্রেমে বন্দি করেছে।
গত ১২ জানুয়ারি দলের পক্ষথেকে তারেক রহমানের সিলেট আগমনের পূর্ণাঙ্গ সূচি নিশ্চিত করা হয়েছে। কর্মসূচি অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। এরপর ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হবে। ওই হিসেবে ২১ জানুয়ারি আকাশপথে সিলেটে পৌঁছানোর পরের দিন ২২ জানুয়ারি হজরত শাহজালাল ও হযরত শাহপরান (রঃ) মাজার জিয়ারত শেষে বেলা ১১টায় তিনি সিলেট নগরীর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রথম নির্বাচনী জনসভায় যোগ দেবেন। ওই জনসভায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনয়নপ্রাপ্ত সংসদ সদস্য প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। জনসভা শেষে তিনি সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন। পথে মৌলভীবাজারের শেরপুর ও হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে আরও দুটি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন তারেক রহমান। এসব জনসভায় ও সংশ্লিষ্ট জেলার সংসদ সদস্য প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে।

বিএনপির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হওয়ার পর ঢাকার বাইরে এটিই হবে তারেক রহমানের প্রথম সফর। এই সফরের মধ্য দিয়ে তিনি তার দলের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমের যাত্রা শুরু করবেন। এর আগে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি এলাকায় স্বাভাবিক সফরের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা পরবর্তীতে বাতিল করা হয়।

২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে সিলেট হয়েই দেশে ফেরেন। ঐদিন বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তিনি ঢাকায় চলে যান। সিলেট বিমানবন্দরে নেতা-কর্মীরা এক মুহুর্তের জন্য তাকে দেখার সুযোগ পাননি। যার কারণে নেতা কর্মীদের মধ্যে কিছুটা হলেও আফসোস ছিল। আজকের সিলেট সফরের মধ্যদিয়ে নেতা কর্মীদের সেই আফসোস কিছুটা হলেও মিটবে বলে মনে করছেন তারা।

যুক্তরাজ্যে থাকাকালীন তারেক রহমান তাঁর ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে হারান। অকালে মারা যান ক্রীড়ামোদি কোকো। এরপর তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়া কারাবরণ করেন। পরে সেখানেই তিনি গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। ২০০৭ সালে তত্ত¡াবধায়ক সরকার আসার পর তারেক রহমানের জীবনের উপর বয়ে যায় একের পর এক রাজনৈতিক নিপীড়ন। কিশোর বয়সে পিতার মৃত্যু, প্রবাসে থেকে ভাইয়ের মৃত্যু, মায়ের জেল-জুলুম, অসুস্থ্যতা- তারেক রহমান জীবনের এমন কোনো কঠিন পরিস্থিতি নেই যে, তার মুখোমুখী হননি। প্রবাসে থাকাকালীন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোয়াবদা রহমানও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়েন। ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একটি মামলায় গত বছরের আগস্টে ঢাকার একটি আদালত জোবাইদা রহমানকে তিন বছরের কারাদÐ এবং তারেক রহমানকে নয় বছরের কারাদÐ দেয়া হয়। অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগে ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কাফরুল থানায় করা এ মামলায় জোবাইদা রহমানের মাকেও আসামি করা হয়।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রæয়ারি ছিল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়কে ঘিরে ৫ ফেব্রæয়ারি সর্বশেষ সিলেট আসেন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া। হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের নারী ইবাদতখানায় কোরআন তেলাওয়াত, ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ দোয়া করেন তিনি। এরপর রাতে শাহপরান (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন। রাত ১০টায় সিলেট সার্কিট হাউস থেকে খালেদা জিয়া গাড়িবহর নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। এটাই ছিল বেগম খালেদা জিয়ার সিলেটের শেষ সফর। ওইদিন খালেদা জিয়ার আগমনে সিলেট শহরে জনতার ঢল নামে। নারায়ণগঞ্জ থেকে সিলেটে আসার পথে তখনকার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হন খালেদা জিয়া। পথে পথে তাকে স্বাগত জানাতে আসা দলীয় নেতাকর্মীদের আটক করা হয়। নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে অনেক জায়গায় নেতাকর্মীদের দাঁড়াতে দেয়নি পুলিশ। কোথাও কোথাও এ নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মী ও পুলিশের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এসব ঘটনায় শতশত নেতাকর্মী পুলিশী হয়ারানি ও জেল-জুলুমের শিকারহন। তবে সব বাধা ডিঙ্গিয়ে বেগম খালেদা জিয়া সিলেট সার্কিট হাউজে যান। কিন্তু তখনকার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তাদের অনুগত প্রসাশন খালেদা জিয়ার সিলেট সফর ও সার্কিট হাউসে অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রবল বাধার সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমে আসলে ভেস্তে যায় ক্ষমাতাসীন দলের সকল বাধা বিপত্তি। এর আগে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ৪ অক্টোবর সিলেট সফর করেন বেগম খালেদা জিয়া। সে সময় আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে ২০ দলীয় জোটের এক বিশাল জনসভায় বক্তব্য দেন। এবারও সেই একই মাঠে জনসভা অনুষ্টিত হচ্ছে। বক্তব্য দেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান হিসাবে তারই পুত্র তারেক রহমান। মাঠ, মঞ্চ, পরিবেশ সবই একই আছে নেই শুধু বেগম খালেদা।