দারিদ্র্যতার কারণ ও প্রতিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাখিয়াছি মর্মন্তদ শাস্তি। আর মানুষ অকল্যাণ কামনা করে; যেইভাবে কল্যাণ কামনা করে; মানুষ তো অতি মাত্রায় ত্বরাপ্রিয়’’। ‘‘আল-কুরআন, ১৭:১০-১১’’।
বস্তুতান্ত্রিক নাস্তিকতা মানবজাতির জন্য ইহলৌকিক ও পারলৌকিক অকল্যাণকর, যা ইসলাম পছন্দ করে না; কিন্তু পাশ্চাত্য জগৎ ও অন্যান্য দেশে এমন কি মুসলিম দেশেও তাদের অনুসারীরা সে দিকেই ধেয়ে চলেছে। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘মহাকালের শপথ, মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু উহারা নহে, যাহারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়’’। ‘‘আল-কুরআন, ১০৩:১-৩।’’
দরিদ্র ও দারিদ্র্য সম্পর্কে ইসলাম ঃ ১. মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য: বৈষয়িক দরিদ্র ও দারিদ্র্য বিষয়ে ইসলামী ধারণা প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমাদের জেনে নেয়া প্রয়োজন আল্লাহ্ কেন মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আমি সৃষ্টি করিয়াছি জিন এবং মানুষকে এই জন্য যে, তাহারা আমারই ইবাদত করিবে। আমি উহাদের নিকট হইতে জীবিকা চাহি না এবং ইহাও চাহি না যে, উহারা আমার আহার্য যোগাইবে। আল্লাহই তো রিয্ক দান করেন এবং তিনি প্রবল, পরাক্রান্ত’’। ‘‘আল-কুরআন, ৫১:৫৬-৫৮।’’
আল্লাহ্ প্রতিটি প্রাণীর জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি বলেন: ‘‘সালাত সমাপ্ত হইলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়িবে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করিবে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করিবে যাহাতে তোমরা সফলকাম হও’’। ‘‘আল-কুরআন, ৬২:১০।’’ তিনি আরোও বলেন: ‘‘তোমরা কি দেখ না, আল্লাহ্ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে সমস্তই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করিয়াছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁহার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করিয়াছেন? মানুষের মধ্যে কেহ কেহ অজ্ঞতাবশত আল্লাহ্ সম্বন্ধে বিতন্ডা করে, তাহাদের না আছে পথনির্দেশক আর না আছে কোন দীপ্তিমান কিতাব’’। ‘‘আল-কুরআন, ৩১:২০।’’ আল্লাহ্ মানুষকে নির্দেশ করেন: ‘‘তিনিই তো তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম করিয়া দিয়াছেন; অতএব তোমরা উহার দিগ-দিগন্তে বিচরণ কর এবং তাঁহার প্রদত্ত জীবনোপকরণ হইতে আহার্য গ্রহণ কর; পুনরুত্থান তো তাঁহারই নিকট’’। ‘‘আল-কুরআন, ৬৭:১৫।’’ অতঃপর আল্লাহ্ বলেন: ‘‘আল্লাহ্ যাহা তোমাকে দিয়াছেন তা দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া হইতে তোমার অংশ ভুলিও না; তুমি অনুগ্রহ কর যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করিয়াছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিতে চাহিও না। আল্লাহ্ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না’’। ‘‘আল-কুরআন, ২৮:৭৭।’’ এ ভাবে পৃথিবীতে রিয্ক অন্বেষণ, শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন ও অপরের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করে আখিরাতে সফলকাম হওয়ার জন্য আল্লাহর ইবাদত্ করার উদ্দেশ্যেই আল্লাহ্ মানুষ সৃষ্টি করেছেন।
২. দরিদ্র ও দারিদ্র্যের ইসলামী ধারণা: ইসলামী জীবন দর্শনে দারিদ্র্যকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: (ক) আধ্যাত্মিক দারিদ্র্য এবং (খ) বস্তুগত দারিদ্র্য। ইসলাম যদিও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় তবুও এ বিষয় উপেক্ষা করেনি যে, মানুষের জন্য সে পরিমাণ পার্থিব সম্পদ অর্জন করা প্রয়োজন, যে পরিমাণ সম্পদ না থাকলে আল্লাহ্র ইবাদতে সম্পদের ঘাটতি জনিত উদ্বেগ উৎকন্ঠার কারণে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। আল্লাহ্ বলেন: “আল্লাহ্ যাহা তোমাকে দিয়াছেন তদ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান কর এবং দুনিয়া হইতে তোমার অংশ ভুলিও না”। “আল-কুরআন, ২৮:৭৭” অর্থাৎ সে পরিমাণ অর্জিত বস্তুগত সম্পদও পৃথিবীতে পার্থিব চিন্তামুক্ত মনে পারলৌকিক কল্যাণ ও সাফল্য লাভে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনে তাঁর ইবাদতের পথ সুগম করার জন্যই ব্যয় করতে হবে। আমরা এখানে এ দু’প্রকার দারিদ্র্য নিয়ে আলোচনা করব।
ক. আধ্যাত্মিক দারিদ্র্য: ইসলামের দৃষ্টিতে এই দুনিয়ায় সীমিত কালের জীবন যাপনের মুখ্য উদ্দেশ্যই হলো পারলৌকিক অনন্ত জীবনের মুক্তির পাথেয় সঞ্চয় করা। মানব জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যই হলো আল্লাহ্ সৃষ্ট এই সীমাহীন বিশ্বজগতের জ্ঞান আহরণ করা, যাতে তারা আল্লাহ্র দরবারে পৌঁছতে পারে এবং সেখানে তারা সেই সব প্রিয় মহামানবদের সান্নিধ্য লাভ করতে পারে যারা আল্লাহ্র সীমাহীন সৌন্দর্যের সাক্ষ্য দানে যথোপযুক্ত। এই অবস্থান লাভই তাদের জন্য সৌভাগ্যের চূড়ান্ত পর্যায় এবং এটাই আল্লাহ্র পক্ষ থেকে তাদের জন্য মহাপুরস্কার-জান্নাত বা বেহেশ্ত। পরকালে এই অবস্থান লাভের জন্যই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং সেখানেই তারা অনন্তকাল অবস্থান করবে।
এ দুনিয়ায় মানুষ দু’টি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল: একটি আত্মার বিকাশের পক্ষে যা কিছু ক্ষতিকর সে সকল কারণ থেকে আত্মরক্ষা করা এবং আত্মার বিকাশের ও পরিপূর্ণতার সহায়ক বিষয়গুলো ও নির্ধারণ করা। অপরটি দেহের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো থেকে আত্মরক্ষা করা ও দেহের সুস্থতা রক্ষার পন্থাগুলো অবলম্বন করা। আল্লাহ্ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান ও তাঁর পরিচয় লাভ করা এবং তাঁকে ভালবাসাই আত্মার আহার। এ বিষয়ে মানুষ যত বেশি যতœবান হবে ততই আত্মা পরিপুষ্ট হবে এবং তা তার জন্য ইহলৌকি ও পারলৌকিক মঙ্গল। অপরদিকে দেহের পরিপুষ্টি ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজন খাদ্য ও প্রয়োজনবোধে চিকিৎসা। মনে রাখা দরকার, দেহ নশ্বর কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর। আত্মার জন্যই দেহের প্রয়োজন এবং এ দুনিয়াতেই আত্মার পরিপুষ্টির কর্ষণ করতে হবে।
“দুনিয়ার মোহমায়ার অন্ত নাই। তবে মনে করিও না যে, দুনিয়ার যাবতীয় পদার্থই মন্দ এবং ক্ষতিকর; বরং দুনিয়ায় এমন কতগুলি বস্তু আছে যাহা বস্তুতঃ পারলৌকিক পদার্থ। যেমন, সৎজ্ঞান ও সৎকর্ম। এইগুলি দুনিয়ার অন্তর্গত হইলেও ইহা দুনিয়ার পদার্থের মধ্যে পরিগণিত নহে। এই দুইটি বস্তু মানবাত্মার সহিত পরকাল পর্যন্ত যাইবে”। “ইমাম গাযালী, হুজ্জাতুল ইসলাম, কিমিয়ায়ে সাআদাত, ঢাকা: অনুবাদক: মাওলানা নূরুর রহমান, এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ১৯৯৫, খ. ১, পৃ. ৮৬-৯৩”
দুনিয়ার ধনদৌলত ব্যবহার সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন: “দেখ, তোমরাই তো তাহারা যাহাদিগকে আল্লাহ্র পথে ব্যয় করিতে বলা হইয়াছে অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা করিতেছ। যাহারা কার্পণ্য করে তাহারা তো কার্পণ্য করে নিজেদেরই প্রতি। আল্লাহ্ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত। যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে স্থলবর্তী করিবেন; তাহারা তোমাদের মত হইবে না”। “আল-কুরআন, ৪৭:৩৮” এই পৃথিবীতে সত্য-জ্ঞানচক্ষু উন্মিলনের তাগিদ দিয়ে আল্লাহ্ আলো বলেন: “আর যে ব্যক্তি এইখানে অন্ধ সে আখিরাতেও অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট”। “আল-কুরআন, ১৭:৭২” আল্লাহ্ প্রদত্ত পরম সত্য-জ্ঞানহীন লোক ইহকালে আত্মা বিনষ্টকারী বলে ইহকাল ও পরকাল উভয়কালেই দরিদ্র, পার্থিব ধন-সম্পত্তি তার যাই থাক না কেন। মানুষের এই আধ্যাত্মিক দারিদ্র্যের প্রতি ইঙ্গিত করেই আল্লাহ্ বলেন: “যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করিবেন; তাহারা তোমাদের মত হইবে না”। “আল-কুরআন, ৪৭:৩৮” আল্লাহ্ পুণ্যাত্মার বিকাশপ্রাপ্ত, আধ্যাত্মিক চর্চা ও জ্ঞান সমৃদ্ধ সম্ভ্রান্ত জাতির উপরই আস্থা রাখেন এবং তাদের পছন্দ করেন পারলৌকিক সম্পদহীন আড়ম্বরপূর্ণ পার্থিব জীবন যাপনকারী আত্মিক দরিদ্রের উপর নয়। তাই আল্লাহ্ বলেন: “যাহারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের চেয়ে ভালবাসে মানুষকে নিবৃত্ত করে আল্লাহ্র পথ হইতে এবং আল্লাহ্র পথ বক্র করিতে চাহে; উহারাই তো ঘোর বিভ্রান্তিতে রহিয়াছে”। “আল-কুরআন, ১৪:৩”
খ. বস্তুগত দরিদ্র ও দারিদ্র্য: ইসলামের দৃষ্টিতে বস্তুগত দরিদ্র ও দারিদ্র্য বিষয়ে আলোচনার আগে আমাদের সংসার বিরাগী বা যুহ্দ এবং আসলেও যারা বস্তুগতভাবে দারিদ্র্য তাদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে।
প্রকৃত সংসার বিরাগী বা যুহ্দ: এ বিষয়ে ইমাম গাযালী র.-এর ভাষ্য হলো: “যে ব্যক্তি বদান্যতা বা দানশীলতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে অথবা পারলৌকিক সৌভাগ্য অন্বেষণ ভিন্ন অপরকোন পার্থিব উদ্দেশ্যে সংসার ত্যাগ করিয়াছে, তাহাকে প্রকৃত যাহিদ বা সংসার বিরাগী বলা যাইবে না। আবার, কেবল পারলৌকিক শান্তির বিনিময়ে ইহকাল বিক্রয় করা তত্ত্বজ্ঞানী মহাপুরুষগণের নিকট নিতান্ত দুর্বল তুচ্ছ ধরনের ‘যুহদ’ বা বৈরাগ্য। পূর্ণ ও প্রকৃত যাহিদ সেই ব্যক্তিকেই বলা যাইতে পারে, যিনি ইহলোকের ভোগ-বিলাসের প্রতি যেমন অমনোযোগী, তদ্রƒপ পরলোকের চিরস্থায়ী ভোগ-বিলাস এবং সুখ-শান্তি হইতেও অমনোযোগী। অর্থাৎ তিনি পার্থিব সুখ-শান্তির বিনিময়ে পারলৌকিক শান্তি ভোগ করিতেও অনিচ্ছুক। …..ইহলোকের বিনিময়ে ইন্দ্রিয়ভোগ্য বেহেশ্ত পাইতে ইচ্ছুক না হইয়া উভয় জগতের বিনিময়ে কেবলমাত্র আল্লাহ্ তাআলাকে পাইতে চান এবং তাঁহারই দর্শন ও পরিচয়লব্ধ আনন্দে পরিতৃপ্ত থাকিতে উৎসুক হন। একমাত্র আল্লাহ তাআলার সত্তা ব্যতীত অন্য সমস্ত পদার্থই তাঁহাদের দৃষ্টিতে নিতান্ত তুচ্ছ এবং নগণ্য বলিয়া প্রতিপন্ন হয়। আল্লাহ্ তাআলার তত্ত্বজ্ঞানে যাহারা পরিপক্কতা লাভ করিয়াছেন কেবল তাহারাই এই শ্রেণীর ‘যাহিদ’ হইতে পারেন। এই শ্রেণীর সংসার বিরাগী লোক সাংসারিক ধনৈশ্বর্য হইতে পলায়ন না করিলেও ক্ষতি নাই; বরং তাঁহারা মাল-আসবাব পাইলেই গ্রহণ করিয়া থাকেন এবং নিজের জন্য কিছু না রাখিয়া যথাসময়ে যথাস্থানে ব্যয় করিয়া ফেলেন এবং উপযুক্ত প্রাপককে দান করিয়া থাকেন”। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৬-১৫৭”। এ ধরনের ‘যাহিদ’-এর দৃষ্টান্ত উসমান রা. ও আয়েশা রা.। বিপুল ধন-ভান্ডার হাতে পেয়েও উসমান রা. সমস্ত ধন উপযুক্ত প্রাপকের হাতে তুলে দিয়ে নিজে নিতান্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন। আয়েশা রা. লক্ষ মুদ্রা হাতে পেয়ে সমস্ত মুদ্রাই দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দিয়েছেন এবং রোযা ইফতারের পর নিজের আহারের জন্য একটি মুদ্রাও গোশ্ত ক্রয়ে ব্যয় করেন নি। (অসমাপ্ত)