বিভাগ: ইসলামের আলো

সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী (সা:)’র কৌশল

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
খ. মদীনার সনদ : কাফির-মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মহানবী (সা.) মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় স্থায়ীভাবে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে মদীনায় বসবাসকারী অন্যান্য ধর্মালম্বী বিশেষত ইয়াহুদীদের সাথে তিনি শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন, যা ইতিহাসে মদীনার সনদ (ঈযধৎঃবৎ ড়ভ গধফরহধ) নামে খ্যাত। “নুরুল ইসলাম মানিক সম্পাদিত, সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলাম, প্রবন্ধকার: ড. মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ ও মোহাম্মদ আতীকুর রহমান, প্রবন্ধ: সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলামের ভূমিকা, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৫, পৃ. ১১৪।” নবী করীম (সা.) এর পক্ষ থেকে কুরাইশী, মদীনাবাসী, তাদের অধীনস্থ এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্টদের এবং জিহাদে অংশগ্রহণকারী মু‘মিন ও মুসলিমদের মধ্যে সম্পাদিত এ অঙ্গীকারনামায় সন্ত্রাস প্রতিরোধক যে ধারাগুলো ছিলো তা নিম্নরূপ:  ১। যারা বাড়াবাড়ি করবে, সকল সত্যনিষ্ঠ মুসলিম তাদের বিরোধিতা করবে। ঈমানদারদের মধ্যে যারা জুলুম অত্যাচার, পাপ, দাঙ্গা-হাঙ্গমা বা ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করবে, সকল মু‘মিন তাদের বিরোধিতা করবে। ২। মু‘মিনরা সম্মিলিতভাবে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে থাকবে। অন্যায়কারী কোন মু‘মিনের সন্তান হলেও এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হবে না। ৩। কোন ব্যক্তি যদি কোন মু‘মিনকে হত্যা করে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে এর পরিবর্তে তার কাছ থেকে কিসাস আদায় করা হবে। অর্থাৎ হত্যার অপরাধে অপরাধী হওয়ায় তাকেও হত্যা করা হবে। তবে যদি নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনকে হত্যাকারী ক্ষতিপূরণ দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে কিসাস করা হবে না। ৪। কোন হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী বা বিদ’আতীকে সাহায্য করা মু‘মিনের জন্য বৈধ বিবেচিত হবে না। অশান্তি সৃষ্টিকারী কোন ব্যক্তিকে কেউ আশ্রয় দিতে পারবে না। যদি কেউ আশ্রয় দেয় বা সাহায্য করে, তাহলে কিয়ামতের দিন তার উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হবে। ইহলৌকিক জীবনে তার ফরয ও নফল ইবাদাত কোনটাই কবুল হবে না। “আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৬-১৯৭”
গ. সন্ত্রাসীদের শাস্তিদান : সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী (সা.) সন্ত্রাসীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। কারণ তিনি জানতেন সন্ত্রাসকে অঙ্কুরেই নির্মূল করা না হলে তা ক্রমেই সমাজ-রাষ্ট্র ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌছবে। তখন ইচ্ছা হলেই তা আর নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। যেমন অবস্থা বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে দেখা যাচ্ছে। তাই দূরদর্শী বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.) আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে সন্ত্রাসকে সমূলেই নির্মূল করেছিলেন। নিম্নের ঘটনাটি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: “উকল বা উরাইনা গোত্রের কিছু লোক (ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে) মদীনায় এলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল। নবী (সা.) তাদেরকে (সদকার) উটের নিকট যাওয়ার এবং পেশাব ও দুধ পান করার নির্দেশ দিলেন। তারা সেখানে চলে গেল। অতঃপর তারা যখন (উটের পেশাব ও দুধ পান করে) সুস্থ হলো তখন নবী (সা.) এর রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এ সংবাদ দিনের প্রথম ভাগেই (তাঁর নিকট) এসে পৌছল। তারপর তিনি তাদের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য লোক পাঠালেন। বেলা বাড়লে তাদেরকে পাকড়াও করে আনা হলো। অতঃপর তাঁর আদেশে তাদের হাত পা কেটে দেয়া হলো। উত্তপ্ত শলাকা দিয়ে তাদের চোখ ফুটিয়ে দেয়া হলো এবং গরম পাথুরে ভূমিতে তাদের নিক্ষেপ করা হলো। এমতাবস্থায় তারা পানি প্রার্থনা করছিল কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি। আবূ কিলাবাহ (র.) বলেন, এরা চুরি করেছিল, হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল, ঈমান আনার পর কুফরী করেছিল এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল”। “ইমাম বুখারী, সহীহ আল-বুখারী, অধ্যায়: আল-উযূ, অনুচ্ছেদ: আবওয়াবুল ইবিলি ওয়াদ- দাওয়াব্বি ওয়াল-গানামী ওয়া মারাবিযিহা,প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ২১।”
ঘ. সন্ত্রাসীদের উৎখাতকরণ : দেশ থেকে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাস নির্মূলের প্রয়োজনে মহানবী (সা.) কখনও সন্ত্রাসীদেরকে গোষ্ঠীসহ উৎখাত করেছিলেন। ইয়াহুদী গোত্র বানূ নাযীর মহানবী (সা.) কে সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। ঘটনা প্রমাণিত হওয়ার পর মহানবী (সা.) তাদেরকে তাদের আবাসস্থল থেকে উৎখাত করে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়ার মাধ্যমে মদীনাকে সন্ত্রাসমুক্ত করেন। ঘটনাটির বিবরণ হলো: “সাহাবী আমর ইবনে উমায়্যা আদ-দামরী (রা.) বানূ ‘আমিরের দু’জন লোককে ভুলবশত শত্র“পক্ষ মনে করে হত্যা করেন। প্রকৃত ব্যাপার হল, বানূ ‘আমিরের সাথে মহানবী (সা.) এর মৈত্রীচুক্তি ছিল। ফলে মহানবী (সা.) তাদেরকে ‘রক্তপণ’ দিতে মনস্থ করেন। আর এ কাজে সহযোগিতা ও মধ্যস্থতা করার জন্য তিনি ইয়াহুদীদের সবচেয়ে বড় গোত্র বানূ নাযিরের নিকট যান। তাদের ব্যবসা ছিল মদীনা থেকে দুই মাইল দূরে উপকণ্ঠে। বানূ ‘আমিরের সাথে বানূ নাযীরেরও মৈত্রীচুক্তি ছিল। বানূ নাযিরের লোকজন মহানবী (সা.) কে দেখে আনন্দ প্রকাশ করে বরং তাঁর সাথে প্রথমত খুবই ভাল ব্যবহার করে। তারা এ ব্যাপারে তাঁকে সহযোগিতার পূর্ণ আশ্বাস দেয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে। মহানবী (সা.) তাদের একটি দেয়াল ঘেঁষে বসে ছিলেন, তাঁর সাথে আবূ বকর, ওমর ও আলী (রা.) প্রমুখ দশজন সাহাবীও ছিলেন। বানূ নাযীরের লোকজন নিজেদের মধ্যে সলা-পরামর্শ করতে লাগলেন যে, এমন মোক্ষম সুযোগ আমরা আর কখনো পাব না। আমাদের কেউ যদি ঘরের ছাদে উঠে তাঁর মাথার উপর একটি ভারী পাথর ছেড়ে দেয় তাবে আমরা চিরতরে তার হাত থেকে নি®কৃতি পাব। আমার ইবন জাহহাশ ইবন কা’ব নামে তাদের এক লোক বলল, আমি এ কাজের জন্য প্রস্তুত। এই বলে সে ঠিকই মহানবী (সা.) এর উপর পাথর ছেড়ে দেয়ার জন্য সবার অলক্ষ্যে ঘরের ছাদে উঠে গেল। তখনই মহান আল্লাহ মহানবী (সা.) কে ওহী মারফত এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দেন। সাথে সাথে মহানবী (সা.) সেখান থেকে উঠে পড়েন এবং কাউকে কিছু না বলে সোজা মদীনায় চলে আসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা সাহাবীগণও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তাঁর সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। অতঃপর মদীনা থেকে আগত এক ব্যক্তিকে পেয়ে তাকে মহানবী (সা.) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি বলল, আমি তাঁকে মদীনায় প্রবেশ করতে দেখেছি। অতঃপর তাঁরা মদীনায় এসে মহানবী (সা.) এর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি তাদেরকে ইয়াহুদীদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানালেন এবং সকলকে রণপ্রস্তুতি নিয়ে তাদের মোকাবিলা করার জন্য বের হবার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) কে মদীনার দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে তিনি সেনা সমভিব্যবহারে বানু নাযীরের বসতিতে পৌঁছেন। সেখানে পৌঁছে তিনি তাদেরকে চর্তুদিকে থেকে অবরোধ করেন। ছয়দিন অবরোধ করার পর তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য তাদের খেজুর গাছ কেটে ফেলেন এবং বাগান জ্বালিয়ে দেন।” “ইমাম বুখারী, সহীহ আল-বুখারী, অধ্যায়: আত-তাফসীর, অনুচ্ছেদ : মাকতা’তুম মিন লিনাতিন, প্রাগুক্ত, খ.৪, পৃ. ১৪৭৯।” তখন মহানবী (সা.) এর সমর্থনে আয়াত নাযিল হয়। “তোমরা যে খেজুর বৃক্ষগুলো কর্তন করেছ এবং যেগুলো কান্ডের উপর স্থির রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে; তা  এজন্য যে, আল্লাহ পাপচারীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন”। “আল-কোরআন, ৫৯: ০৫।”
মূলত সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে যুদ্ধকৌশল হিসাবে এ ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। অবশেষে বানূ নাযীরের মনে মহান আল্লাহ ভীতির সঞ্চার করে দিলেন। তারা নিজেদেরই প্রস্তাব দিয়ে দেশ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাবার পথ বেছে নিল। অন্যত্র গিয়ে যাতে তারা আবার সন্ত্রাস করতে না পারে সেজন্য মহানবী (সা.) তাদেরকে সাথে করে অস্ত্র নিয়ে যেতে দেন নি। শুধুমাত্র নিজেদের উটের পিঠে করে যে পরিমাণ মালপত্র নেয়া যায় সে পরিমাণই নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এ আদেশ এত কঠোর ছিল যে, তিলতিল করে গড়ে তোলা নিজেদের ঘরবাড়ি তাদের নিজেদের হাতেই ভেঙ্গে ফেলতে হল। আর তার যতটুকু পারা যায় ততটুকু সাথে নিয়ে অবশিষ্ট আসবাবপত্র ছেড়ে যেতে হল। তাদের কতক খায়বারে গিয়ে বসতি স্থাপন করে, আর কতক চলে যায় সিরিয়ায়। ফলে মদীনা মুনাওয়ারা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল অভিশপ্ত ইয়াহুদীদের এ গোত্রটির কুটির ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের হাত থেকে রেহাই পায়।
ঙ. সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান : সন্ত্রাসীদের নির্মূল করে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মহানবী (সা.) প্রয়োজন হলেই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আভিযান পরিচালনা করতেন। এমনই একটি অভিযান তিনি তৃতীয় হিজরীর আউয়াল মাসে মদীনার নিকটবর্তী যু’আমর নামক স্থানে মুসলিমদের পরাজিত ও নি:শেষ করার দৃঢ় সংকল্পে একত্রিত বনী ছা’লাবা এবং বনী মুহারিব গোত্রদ্বয়ের এক বিরাট বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু সন্ত্রাসীরা মুসলিম সৈন্যবাহিনীর আগমনের সংবাদে ছত্রভঙ্গ হয়ে আশেপাশে পাহাড়গুলোতে আত্মগোপন করে। রাসূল (সা.) তাঁর অভিযান অব্যাহত রাখেন এবং সৈন্যবাহিনীসহ সন্ত্রাসীদের অবস্থানস্থল পর্যন্ত গমন করেন এবং কিছু দিন সেখানে অতিবাহিত করে মদীনায় ফিরে আসেন। অধ্যাপক “এ.টি.এম. মুছলেহ উদ্দীণ ও অন্যান্য সম্পাদিত, সীরাত বিশ্বকোষ, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৩, খ. ৬, পৃ. ৪৭৫-৪৭৬:” “আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪৭”
এই অভিযানের পর পরই মুহারিব গোত্র সন্ত্রাসের পথ পরিহার করে ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে চলে এসেছিল। তবে ছা’লাবা গোত্র এর পরও কিছু দিন ধরে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ অব্যাহত রাখে। এর ফল হিসাবে ৬২৬-৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে আরো ৫টি অভিযান প্রেরণ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যাতুর রিকার বিরুদ্ধে মহানবী (সা.) এর নেতৃত্ব পরিচালিত অভিযান। পঞ্চম হিজরীর মুহাররম মাসে পরিচালিত এই অভিযান যাতুর রিকাহ গোত্রের অবাধ্যতামূলক সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে এক বিরাট নিবৃত্তকারী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এরপর থেকে মহানবী (সা.) এর বিরুদ্ধে ছা’লাবার তীব্র বিরোধিতার অবসান ঘটে। এবং সপ্তম হিজরীর শেষ নাগাদ ছা’লাবা গোত্রের মধ্যে ইসলামের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিলো। ড. মুহাম্মদ ইয়াসীন মাযহার সিদ্দিকী, রাসূল (সা.) এর সরকার কাঠামো, অনুবাদ, “মুহাম্মদ ইবরাহীম ভূঁইয়া, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৪, পৃ. ৩০-৩১”
এভাবে মহানবী (সা.) তাঁর সমগ্র মাদানী জীবনে দেশী ও বিদেশী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাত থেকে সমসাময়িক মদীনা কেন্দ্রিক ইসলামী রাষ্ট্রের এবং পরবর্তীকালের সমগ্র আর উপদ্বীপকে সন্ত্রাসমুক্ত করে সন্ত্রাস নির্মূলে বিশ্ববাসীর সামনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে যান। সন্ত্রাস নির্মূলে তাঁর কার্যক্রমের উপর আত্মবিশ্বাস থেকে তিনি ঘোষণা দিয়ে যান যে, এমন একদিন আসবে যেদিন একজন আরোহী একাকী সানআ থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত ভ্রমণ করবে এবং সে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কাউকে (কোন সন্ত্রাসীকে) ভয় পাবে না।” “ইমাম বুখারী, সহীহ আল-বুখারী অধ্যায়: ফাযায়িলুস সাহাবা, অনুচ্ছেদ: মা লাকিয়ান নাবিয়্যি স. ওয়া আসাহাবুহু মিনাল মুশরিকীনা বি মাক্কাতা, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৩৯৮”
এ প্রবন্ধে সন্ত্রাস প্রতিরোধে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা ও রাসূল সা. এর কার্যক্রম বর্ণনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়াও সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলাম মানবীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সামাজিক সাম্য ও অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় সহনশীলতা বৃদ্ধি, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি রোধ, আদর্শ সমাজ গঠন, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে। আর ইসলামী দন্ডবিধি প্রতিষ্ঠা সন্ত্রাসসহ যে কোন অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বর্তমান সৌদি আরব। সেখানে ইসলামী দন্ডবিধি কার্যকর থাকায় অপরাধের হার সারাবিশ্বের চেয়ে অনেক নিচে। “মোহাম্মাদ আলী মনসুর, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ইতিহাস, ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক ল‘রিসার্চ এন্ড লিগ্যাল এইড সেন্টার, ২০১০, পৃ:২০”
উপসংহার : বিশ্ববাসী ইসলামের ব্যাপক আবেদন থাকা সত্ত্বেও হিংসা ও স্বভাবজাত শত্র“তাবশত অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা বিশেষ করে ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা ইসলাম ও মুসলিমদের নামে অন্যান্য নানা কুৎসা রটাচ্ছে। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ইসলাম ও এর অনুসারীরা ইসলাম বিরোধীর নিকট থেকে যেসব ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে বর্তমান সন্ত্রাসকে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টাও সেসবের অন্যতম। একদিকে ইহুদী-খ্রিষ্টান- পৌত্তলিকদের ষড়যন্ত্র অপরদিকে জন্মগতভাবে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভ্রান্তি, এ দুয়ে মিলে ইসলাম আজ পৃথিবীতে ভুলবোঝা ধর্মে” (ঞযব গরংঁহফবৎংঃড়ড়ফ জবষরমরড়হ) পরিণত হয়েছে, মেযনটি বলেছেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ মুহাম্মদ কুত র.। ”গঁযধসসধফ  ছঁঃয, ওংষধস-ঞযব গরংঁহফবৎংঃড়ড়ফ জবষরমরড়হ, কঁধিরঃ: ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ওংষধসরপ ঋবফধৎধঃরড়হ ড়ভ ঝঃঁফবহঃ ঙৎমধহরুধঃরড়হং, ১৪০১ অ.ঐ./১৯৮১ অউ. তবে আশার কথা, মুসলিমরা এখন ধীরে ধীরে তাদের অজ্ঞতা ও ভ্রান্তির বেড়াজাল ছিন্ন করার চেষ্টা শুরু করেছে। সন্ত্রাসের সাথে যে ইসলামের কোন রকম সম্পর্ক নেই সে কথা উপযুক্ত আলোচনায় কিছুটা হলেও স্পষ্ট হয়েছে। ইসলামের অবস্থান কোরআন, হাদীস ও রাসূল (সা.) এর জীবনাদর্শে চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে। কোরআন, হাদীস ও রাসূল (সা.) এর জীবনাদর্শ দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে ইসলামের সাথে সন্ত্রাসের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, বরং চরম বিরোধী। শান্তিকে বিঘিœত করে এমন কোন কর্মকান্ডকে ইসলাম সমর্থন করে না, উপরন্তু বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামের চিরন্তন নীতি। ইসলাম স্বভাবগত কারণেই কখনো সন্ত্রাসে বা বিশ্বশান্তি নষ্ট করে এমন কর্মে উৎসাহ, সমর্থন, অনুমোদন দেয় না। মুসলিম কখনো সন্ত্রাসী হতে পারে না। তাছাড়া গুটিকতক তথাকথিত মুসলিমের কর্মবিচার করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ধর্ম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধিন ইসলামকে সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃকক্ত করা কখনোই  উচিত নয়।
লেখক: শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট, পাঠানপাড়া (খান বাড়ি), কদমতলী, সদর, সিলেট-৩১১১।                          (সমাপ্ত)

পবিত্র ক্বোরআনের আলোকে মানবতাবাদ : একটি পর্যালোচনা

আফতাব চৌধুরী

মানবতাবাদ বর্তমান বিশ্বে এক বহুচর্চিত বিষয়। সমগ্র বিশ্বজুড়ে আজ মানবতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত। মানবাধিকার সংস্থাসমূহ বোধ হয় পৃথিবীর সকল দেশে নিজেদের জাল বিস্তার করে আছে। কিন্তু তবুও পদে পদে মানবতা লুণ্ঠিত, অবহেলিত, অপমানিত।
এখন প্রশ্ন হল মানবতা কী ? মানবতাবাদই বা কী ? আর মানবাধিকার বলতে কী ধরনের অধিকারকে বোঝায়? কেন বিশ্বজুড়ে বারবার মানবতা লুন্ঠিত হচ্ছে? বর্তমান বিশ্বে ধর্মের তো খরা চলছে না, বরং বলা যায় বাড়বাড়ন্ত। তবুও হত্যা, অপহরণ, লুন্ঠন, ব্যভিচার, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, গোষ্ঠী সংঘর্ষ, সন্ত্রাসী আক্রমণ, কর্মক্ষেত্রে, রাজনীতিতে সর্বত্র দুর্নীতি ইত্যাদি অমানবিক কর্মকান্ড অব্যাহত থাকায় মানবতাবাদে বিশ্বাসী মানুষের আজ নাভিশ্বাস উঠছে।
মানবতা হলো মানুষের বিশেষ গুণাবলী যার সুবাদে মানুষ, পশুপক্ষী ও অন্যান্য ইতর প্রাণীসমূহ থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পরিচিত। মানুষ হিসেবে জন্ম হলেই যে কোনও ব্যক্তি মানবিক গুণসম্পন্ন নাও হতে পারে। কারণ মানবিক গুণাবলী জাগ্রত করার জন্য যে অধ্যবসায়ের প্রয়োজন, তা হয়ত সঠিকভাবে অনেকের ভাগ্যে জোটে না। সাধারণত মানবতা বলতে আমরা বুঝি এক মানুষের প্রতি আরেক মানুষের সহানূভূতি, সহমর্মিতা, বিপদে আপদে একজন আরেকজনের প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করা, দীন-দুঃখী, বিকলাঙ্গদের সাধ্যমত সাহায্য করা ইত্যাদি। এককথায় মানুষের প্রতি মানুষের থাকা দায়িত্ব, কর্তব্য পালন করা। অন্য মানুষের সুখে নিজেকে সুখী মনে করা এবং দুঃখে দুঃখী অনুভব করা।
তবে বর্তমান বস্তুতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায়, মানবতা তথা মনুষ্যত্বের বিষয়টি মানুষের চিন্তা, চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। অনেকের মতে এটা আল্লাহ অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে না। মানবাধিকার হল সেসব অধিকার, যা মানুষ হিসেবে জন্মসূত্রে তার প্রাপ্য। একজন ধর্মবিশ্বাসী ব্যক্তির কাছে নৈতিকতা বিষয়টি সুনির্দিষ্ট হলেও একজন নাস্তিকের কাছে নৈতিকতার মূল্যবোধ আপেক্ষিক। তার কাছে মানবতাবাদ হলো একটি ধারণা বা মতবাদ যা মানুষকে শেখায় যে মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির স্বীকৃতি মানবিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির বিরুদ্ধে যায় এমন যে কোনও ব্যবস্থা অমানবিক। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় বিধান বা নৈতিকতা নয়, মানবিক বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত যুক্তিই ন্যায়ের মানদন্ড। কোনও ধর্মগ্রন্থের শিক্ষা বা ধর্মীয় বিধান এখানে গৌণ। আধুনিক মানবতাবাদের প্রবক্তাদের ধারণা যে, কোনও দৈবশক্তির সাহায্যের প্রয়োজন নেই; কারণ মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই ঠিক করে নিতে পারে।
পৃথিবীর সব মহামানব তাদের সারাজীবন ধরে মানবতার জয়গান গেয়েছেন এবং সকল পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহে মানবজাতিকে মানবতার শিক্ষাপ্রদান করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র ক্বোরআনের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। ক্বোরআন আল্লাহর বাণী। এটা মানব রচিত কোন গ্রন্থ নয়। তাই ক্বোরআনে মানবিক শিক্ষায় ভুল থাকতে পারে না। বরং মানুষের বোঝার ভুল হতে পারে বলে মুসলমানদের বিশ্বাস। ক্বোরআন ঘোষণা করেছে যে, মানুষ সৃষ্টির সেরা এবং তাকে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি করে পাঠানো হয়েছে। আর দেওয়া হয়েছে জ্ঞান, বিবেক বা বুদ্ধি যা অন্য প্রাণীদের নেই। ক্বোরআন এমন একটি ধর্মগ্রন্থ যা সমস্ত মানবজাতিকে সিরাতুল মসতাক্কিম অর্থাৎ সুপথ প্রদশনের জন্য বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। অতএব পবিত্র ক্বোরআন হলো বিশ্ব মানবের জন্য ঐশী ও সর্বশেষ সংবিধান। ক্বোরআনে মানবতাবাদ হলো একটি বিশাল ব্যাপার যা এ ক্ষুদ্র পরিসরে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই শুধু কিছু মুখ্য বিষয়ে এ আলোচনা সীমিত রাখা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
পবিত্র ক্বোরআন বলে, সমগ্র মানবজাতি এক আত্মা থেকে সৃষ্ট। সবাই আদমের সন্তান। তবে মহান আল্লাহ তাঁর সেরা সৃষ্টি মানুষের মধ্যে বিভিন্ন গোত্র বা বংশ সৃষ্টি করেছেন যাতে করে তারা একে অপরকে চিনতে পারে। কিন্তু মানুষ শয়তানের কুমন্ত্রণায় এ সুযোগের অসদ্ব্যবহার করে মানুষে মানুষে বিভেদের প্রাচীর খাড়া করেছে। আজ ধর্ম, জাতি, ভাষা, বর্ণ ইত্যাদি ভেদাভেদ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করছে হানাহানি, একাংশ মানুষ হয়েছে মানুষের শত্র“। ধর্মের নামে অধর্মের বাহাদুরি এখন এক স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। মানুষে মানুষে হিংসা, বিদ্বেষ বোধহয় অনেক সময় পশুদেরও লজ্জা দেয়। উগ্র সাম্প্রদায়িকতা যখন তার বিষদাঁত বের করে, তখন মানবসমাজে নেমে আসে নরকের বিভীষিকা।
ক্বোরআন এমন একটি ধর্মগ্রন্থ যা দীপ্তকন্ঠে ঘোষণা করছে যে সমগ্র মানবমন্ডলী একই পুরুষ আদম ও একই নাবী হাওয়া (ইভ) থেকে জাত। অর্থাৎ জগতের সমস্ত মানুষ একই বংশোদ্ভূত। এ মর্মে পবিত্র ক্বোরআনের বাণী, ‘হে মানুষেরা তোমরা স্বীয় প্রতিপালকের ভয় কর-যিনি তোমাদের একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন ও তা হতে তদীয় সহধর্মিণী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের উভয় হতে বহু নরনারী বিস্তৃত করেছেন; এবং সেই আল্লাহকে ভয় কর, যিনি তোমাদিগকে পরস্পর সন্বন্ধযুক্ত ও ঘনিষ্ঠতর করেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের তত্ত্বাবধানকারী ’ (০:০১)।’ পরবর্তীকালে মানুষ যখন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখন মানুষেরই সুবিধার্থে তাদের বিভিন্ন দল-গোত্রে বিভক্ত করে দেওয়া হল। এ সম্পর্কে পবিত্র ক্বোরআন বলছে, ‘হে মানুষেরা! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী লোক থেকে এবং তোমাদের পরিণত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা একে ওপরকে চিনতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে অধিক মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে অধিক ন্যায়দর্শী’(৪৯:১৩)। আবার ক্বোরআন বলছে, ‘এবং ইহা ও তাঁর নিদর্শন যে, তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং তোমাদের বিভিন্ন ভাষা ও তোমাদের বর্ণসমূহ সৃষ্টি করেছেন, নিশ্চয়ই ইহাতে জ্ঞানবানদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে (৩০:২২)।
আগেই উল্লেখ করেছি যে ক্বোরআন ঘোষণা করেছে যে সমগ্র মানব জাতি এক আত্মা থেকে সৃষ্ট। অতএব বিশ্বমানব এক জাতি। দেশ-মহাদেশ, সাদা-কালো, দীর্ঘ-বেঁেট, সুন্দর-অসুন্দরের, দুর্বল-সবলের বালাই নেই, সবাই আপন, কারণ সবাই এ ধরায় আল্লাহর প্রতিনিধি। এ পৃথিবীতে আল্লাহর কাছে সবাই সমান। কেননা সবাই তাঁরই সৃষ্টি। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, সৎ-অসৎ, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ ইত্যাদি যে কোনও পার্থক্য নির্বিশেষে সবার উপর তাঁর করুণা বর্ষিত হয়। কারণ তিনি পরম করুণাময়, পরম দয়ালু ‘রাহমানির রাহিম’। সবার জন্য আলো, বায়ু, পানি এবং সুন্দর ধরণীতে কারও প্রতি আল্লাহর কার্পণ্য বা বৈষম্য নেই।
পবিত্র ক্বোরআন বিশ্ব মানবের জন্য পথ প্রদর্শক। ক্বোরআন দেখায় ‘সিরাতুল মুসতাকিম’ অর্থাৎ ইহকালের সাফল্য ও পরকালের মুক্তির সহজ সরল পথ। মহাগ্রন্থ ক্বোরআন ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচার ও সৎকার্য করতে এবং আত্মীয়-স্বজনদিগকে দান করতে আদেশ করেছেন এবং অশ্লীলতা ও দুষ্কার্য এবং বিদ্রোহিতা (অত্যাচার) হতে নিষেধ করেছেন। তিনি উপদেশ প্রদান করেছেন যেন তোমরা স্মরণ কর (১৬:৯০)।’
ক্বোরআন আরও ঘোষণা করেছে, ‘ আর তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর শরিক সাব্যস্ত করো না তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে। আর সদ্ব্যবহার কর পিতামাতার সঙ্গে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে, এতিমদের সঙ্গে, ভিক্ষুকদের সঙ্গে, নিকট প্রতিবেশী ও দূর প্রতিবেশীর সঙ্গে, সঙ্গীসাথী ও পথচারীর সঙ্গে এবং তোমাদের অধিকারভূক্ত দাসদাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয়ই , আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক, আত্মগর্বিত ব্যক্তিকে (০৪:৩৬)।’ সর্বাবস্থায় ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দিয়েছে পবিত্র ক্বোরআন। এ মর্মে ক্বোরআনে ঘোষণা, ‘হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায়পরায়ণতার সহিত সাক্ষ্যদানকারী সুবিচার প্রতিষ্ঠাতা হও এবং কোনও সম্প্রদায়ের শত্র“তাহেতু তোমরা সুবিচারের অন্যথা করিও না; তোমরা সুবিচার কর, উহা ধর্মভীরুতার নিকটবর্তী, এবং আল্লাহকে ভয় কর; তোমরা যাহা কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরিজ্ঞাত আছেন (০৫:০৮)।’
ইসলাম ধর্ম, মানব ধর্ম, চিরকালীন ধর্ম। পৃথিবীর আদি মানব হজরত আদম ছিলেন আল্লাহর বান্দা, এক অদ্বিতীয় আল্লাহর উপাসক। হজরত মোহাম্মদ সর্বশেষ নবী, ক্বোরআন শেষ ও চূড়ান্ত ঐশীবাণী। হাদিস শাস্ত্র মতে এ পৃথিবীতে আল্লাহ এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী প্রেরণ করেছেন। জগতে এমন কোনও জাতি নেই, যার প্রতি কোনও নবী প্রেরিত হন নাই। পবিত্র ক্বোরআনে মাত্র পঁচিশজন নবীর নামোল্লেখ থাকলেও মুসলমানদের আল্লাহ প্রেরিত সব নবীর প্রতি বিশ্বাস রাখতে হয়। কিন্তু ইসলাম ধর্মে জোর জবরদস্তির কোনও স্থান নেই। ক্বোরআন ঘোষণা করেছে, ‘ধর্মে কোন জবরদস্তি নাই (০২: ২৫৬)।’ ক্বোরআন আরও ঘোষণা করছে, ‘(হে মোহাম্মদ) তুমি জ্ঞান ও সৎ উপদেশ দ্বারা তোমার প্রতিপালকের পথে (মানুষকে) আহ্বান কর এবং তাহাদের সহিত সদ্ভাবে আলোচনা কর। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক পরিজ্ঞাত আছেন যে, কে তাহার পথ হইতে বিভ্রান্ত হইয়াছে এবং তিনি সুপথগামীদিগকেও পরিজ্ঞাত আছেন’ (১৬:১২৫)। ‘নিশ্চয় ইহা সদুপদেশ ; অতএব যাহার ইচ্ছা সে স্বীয় প্রতিপালকের দিকে পথ পরিগ্রহণ করবে (৭৩ : ১৯)।
আল্লাহ কারও প্রতি অবিচার করেন না। পাপ-পুণ্যের বিচার হবে পরকালে কেয়ামতের মাঠে এবং সেখানে দেওয়া হবে পুরস্কার বা শাস্তি যার যেটা প্রাপ্য। এ মরজগৎ মুক্তাঞ্চল। এ পৃথিবীতে যারা তাঁর অবাধ্য থাকবে অর্থাৎ নিজ সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করে তাঁর আদেশ নিষেধ অমান্য করবে, তাদের জন্য রয়েছে পরকালে সুবিচার ও উপযুক্ত শাস্তি। কিন্তু ইহকালে আল্লাহ তাদের শাস্তি না দিয়ে শুধরানোর সুযোগ দেবেন। আর যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে সৎকর্ম করে তাদের জন্য পরকালে রয়েছে উপহার অর্থাৎ স্বর্গোদ্যান যার নিম্নদেশে স্্েরাতস্বিনী প্রবাহিত।
অনেকে হয়ত বলতে পারেন যে কোনও কোনও ক্ষেত্রে ক্বোরআন অনেক অমানবিক বিধান প্রবর্তন করছে। যেমন চুরির শাস্তি হাত কাটা ধর্ষণের শাস্তি বেত্রাঘাত করা বা পাথর বর্ষণে হত্যা করা ইত্যাদি। কিন্তু এটা এতো সরল নয় যে চোরকে ধরেই তার হাত কেটে ফেলবেন আর ধর্ষককে ধরেই শাস্তি দেবেন। কারণ অপরাধীর বিচার হতে হবে নির্দিষ্ট বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে। অতঃপর বিচারে দোষী প্রমাণিত হলেই তবে শাস্তি কার্যকর করবে দেশের প্রশাসন এবং যার হাত (বাম) কাটা যাবে তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে দেশের সরকার। আর এটা হলো শাস্তির সর্বোচ্চ সীমা। অপরাধের মাত্রা অনুসারে শাস্তিও কম বেশি হতে পারে। সেভাবে বিচারে দোষী প্রমাণিত হলেই তবে ধর্ষকের শাস্তি হবে। কারণ ধর্ষিতা কি ইসলামি বিধান মেনে তার দেহকে উপযুক্ত পোশাকে সুরক্ষিত রেখেছেন? না আজকালের একাংশ উচ্ছৃঙ্খল নারীর মতো-‘আমাদের দেহ, আমার অধিকার’ বলে অর্ধ উলঙ্গ থেকে ধর্ষকের মতো নরপশুকে প্রলুব্ধ করেছেন? এভাবে এসবে জড়িয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। পবিত্র ক্বোরআনের অনিন্দ্যসুন্দর বিধান মেনে চললে চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার, ধর্ষণের মতো অপরাধ যে ঘটবে না, এটা হলফ করে বলা যায়। ক্বোরআনের মতো মহাগ্রন্থের মানবিক শিক্ষার প্রতি অবহেলা সব ধরনের অপরাধের মূল কারণ বললে বোধহয় ভুল হবে না।
ক্বোরআনের শিক্ষা নিয়ে আরবরা সারা বিশ্বকে পথ প্রদর্শন করেছিল। তাই আরবের ইসলামি সভ্যতাকে আধুনিক সভ্যতার বুনিয়াদ বলা হয়। ইসলামের সুমহান শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আরবরা তাদের দেশ থেকে ক্রীতদাস প্রথা মুছে ফেলেছে। ধনী-গরিব বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ধনীদের জন্য যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক করেছে ক্বোরআন। মানুষে মানুষে পার্থক্য মুছে দিতে ইসলাম ধনী-গরিব, আমির-ফকির, রাজা-প্রজা, জ্ঞানী-মুর্খ, উচ্চ-নীচ; প্রভু-ভৃত্য সবাই কাঁেধ কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে নামাজ পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছে মানব ধর্ম ইসলাম। আল্লাহর সামনে সবাই সমান, সবাই তাঁর বান্দা, সেখানে সকল বিভেদের রেখা মুছে যায় মানবতার মহান শিক্ষায় । বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে অনারবদের উপর আরবদের কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর উপর সাদার কোনও প্রভুত্ব হতে পারে না।
অনেকে ভাবেন ক্বোরআনে জেহাদের কথা বলা হয়েছে যেটা নাকি অমানবিক। আসলে এসব তাদের ভ্রান্ত-ধারণা। কারণ তারা জেহাদ ও সন্ত্রাসবাদকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন অজ্ঞাতবশত। জেহাদ মানে অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার জন্য অবিরত সংগ্রাম করে যাওয়া; সেটা ব্যক্তিগত জীবনে, সামাজিক জীবনে এমনকী রাষ্ট্রীয় জীবনেও হতে পারে। নিজের মান-সম্মান প্রাণ ধর্ম ও দেশের স্বাধীনতা রক্ষার্থে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নাম জেহাদ। নিরপরাধ মানুষ হত্যার নাম জেহাদ নয়। ইসলামে শুধু মানুষ নয় বিনা কারণে একটি পিপীলিকা হত্যা করাও নিষিদ্ধ, একজন নির্দোষ মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিতে হত্যা করার মতো সমান অপরাধ বলে গেছে পবিত্র ক্বোরআন আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে।
মক্কার ইসলাম বিদ্বেষীদের দ্বারা অকথ্য অত্যাচারের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণরক্ষার্থে আল্লাহর নির্দেশে গোপনে মদিনাতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন আল্লাহর রসুল। কিন্তু প্রতিশোধ নিতে অস্ত্র হাতে নেননি। অতঃপর, যখন মক্কার শত্র“তা মদিনায় গিয়েও তাকে বার বার আক্রমণ করছিল, তখন বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষার্থে জেহাদে অবতীর্ণ হয়েছিলেন মহানবী মোহাম্মদ (সঃ)। আর এ সময়ের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি ঐশীবাণী অবতীর্ণ হয়েছিল তাৎক্ষণিকভাবে।
বর্তমানে একাংশ ক্বোরআনবিদ্বেষী এগুলোর অপব্যাখ্যা করে ক্বোরআন ও মুসলমানদের বদনাম করার অপচেষ্টা করেন বললে বোধহয় ভুল হবে না। কিছু মানুষ রয়েছেন যারা ক্বোরআনকে খুব ভয় করেন। কারণ ক্বোরআনকে মানলে চুরি করা যাবে না, সুদ খাওয়া যাবে না, মদ খাওয়া যাবে না, জুয়া খেলা যাবে না, সমকামী হওয়া যাবে না, লিভ টুগেদার করা যাবে না, অবৈধ প্রেম করা যাবে না। সর্বোপরি কোন ধরনের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করা যাবে না। তাই ক্বোরআন সেকেলে, আধুনিতাবিরোধী ; অতএব এ যুগে অচল, পরিত্যাজ্য। এভাবে একাংশ মানুষ ধর্মের সুমহান শিক্ষাকে ব্রাত্য মনে করে প্রবৃত্তির দাসত্ব করে মানবসমাজে বয়ে আনছেন অসভ্যতার তমসাচ্ছন্ন কালো রাত্রি। তাই, আজ চতুর্দিকে দুনীর্তির জয় জয়কার।
তবে সুখের কথা আজকাল অনেক লোককে বলতে শোনা যায় যে একাংশ মানুষে মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলতে চললেও মনুষ্যত্ববোধের এখনও অপমৃত্যু ঘটেনি। মানে এ ধরণীতে মানবতা নামক সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ এখনও একেবারে লোপ পায়নি। তবে মানবতার অপমৃত্যু যেভাবে ঘনিয়ে আসছে, নিকট ভবিষ্যতে হয়তো মানবজগৎ আলোড়ন করে আসবে এক মহাপ্রলয়, যার পরিণামে মনবতাবাদ বিরোধী শক্তিসমূহ এ ধরণী থেকে একেবারে মুছে যাবে অথবা এ ধরায় আয়ু নিঃশেষ হয়ে আসছে, মহাপ্রলয় সন্নিকটে। কিন্তু না আমরা মানুষ আশাবাদী। আমাদের এ সুন্দর ভুবন এত তাড়াতাড়ি ধ্বংস হবে না। কারণ মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা এখানে হ্রাস পেলেও মানবতাবাদী মানুষের সংখ্যা এখনও একদম ফেলে দেওয়ার মতো নয়। কোটি কোটি মানুষের বাসস্থান এ গ্রহে এখনও কোটি কোটি মানুষ মানবতার পূজারী। তাদের কাছে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে নাই।’

সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী (সা:)’র কৌশল

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
এরূপ করতে নিষেধ করেছেন।” “ইমাম ইবনে কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, রিয়াদ: দারুত ত্বায়্যিবাহ লিন নাশরি ওয়াত তাওযী’, ১৯৯৯, খ. ৩, পৃ. ৪২৯”
ইমাম কুরতুবী (র.) বলেন, স্বল্প-বিস্তর যতটুকুই হোক শান্তি স্থাপনের পর আল্লাহ পৃথিবীতে কম বা বেশি যাই হোক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন।” “ইমাম কুরতুবী, আল-জামি’ লি-আহকামিল কুরআন, রিয়াদ: দারু ‘আলামিল কুতুব, ২০০৩, খ.৭, পৃ. ২২৬”
অনর্থ বিপর্যয় সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হতে নিষেধ করে আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ যাহা তোমাকে দিয়েছেন তা দ্বারা আখেরাতের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলো না; তুমি অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না, আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ভালবাসেন না।” “আল-কুরআন, ২৮: ৭৭”
৪। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করো না।” “আল-কুরআন, ৬: ১৫১, ১৭: ৩৩” আদম সন্তানকে সম্মানিত ঘোষণা করে আল্লাহ বলেন: “আমি তো আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি; তাদেরকে উত্তম রিয্ক দান করেছি এবং আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” “আল-কুরআন ১৭:৭০” এত মর্যাদাবান ও অনুগ্রহপুষ্ট শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী সমগ্র মানবজাতির কোন এক সদস্যের প্রাণহানি ঘটানোকে সমগ্র মানবজাতির প্রাণহানী ঘটানোর সাথে তুলনা করে আল্লাহ বলেন: “এই কারণেই বনী ইসরাঈলের প্রতি এই বিধান দিলাম যে, নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করা ব্যতীত কেউ কাউকেও হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করল।” “আল-কুরআন, ৫: ৩২” অন্য আয়াতে আল্লাহ ইচ্ছাকৃত কোন মু‘মিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা’নত (অভিশাপ) করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।” “আল-কুরআন, ৪: ৯৩”
৫। সম্প্রতি সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য অর্জনে আত্মঘাতি হামলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই হামলার মাধ্যমে সন্ত্রাসী তার নিজের জীবনকে ধ্বংস করে ফেলে। অথচ আল-কুরআনে নিজেকে ধ্বংস করতে নিষেধ করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মঘাতি হামলা আত্মহত্যার শামিল, আর উভয়ই স্পষ্ট হারাম। আল্লাহ বলেন: “নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কর না। তোমরা সৎকাজ কর, আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণ লোকেদের ভালোবাসেন।” “আল-কুরআন, ২: ১৯৫।”
এভাবে আল-কুরআনুল কারীমে অসংখ্য আয়াতে অন্যায়ভাবে মানব হত্যা, আহত করা, আত্মহত্যা করা, অন্যের সম্পদ লুট করা, পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা, বিশৃঙ্খলা ঘটানোসহ সন্ত্রাসের বিভিন্ন রূপ, প্রকৃতি, বৈশিষ্ট, পরিণাম, প্রতিরোধ, শাস্তি সম্পর্কে নির্দেশনা এসেছে। এসব আয়াতের ব্যাখ্যা হিসাবে রাসূল (সা.) এর হাদীসে এ প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত নির্দেশনা পাওয়া যায়।
সন্ত্রাস প্রতিরোধে আল-হাদীসের নির্দেশনা ঃ সন্ত্রাস প্রতিরোধে আল-কুরআনে বর্ণিত নির্দেশনার আলোকে আল-হাদীসেও ব্যাপক নির্দেশনা এসেছে। প্রাসঙ্গিক কারণে কিছু হাদীস নিম্নে পেশ করা হলো-
১। রাসূল (সা.) বলেন: “বিবাহিতা ব্যভিচারী, হত্যার বদলে হত্যা এবং দ্বীন (ইসলাম) ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার অপরাধ ব্যতীত ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল’ এ সাক্ষ্য দানকারী কোন অমুসলিমের রক্ত বৈধ নয়।” “ইমাম বুখারী সহীহ আল-বুখারী, অধ্যায়: আদদিয়াত, অনুচ্ছেদ: কওলুল্লাহ তা’আলা “ইন্নান নাফসা বিন নাফসি… হুম যালিমুন (আল- মায়িদাহ-৪৫), প্রাগুক্ত, খ. ৬, পৃ. ২৫২১”২। সন্ত্রাস অর্থই হচ্ছে ত্রাস, ভয় আতঙ্ক সৃষ্টি করা, অন্যকে আতংকিত করা। কিন্তু আল-হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, কোন মুসলিমকে আতংকিত করা বৈধ নয়। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেন: “কোন মুসলিমের জন্য অপর মুসলিম ভাইকে আতংকিত বা সন্ত্রস্ত করা বৈধ নয়।“ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান, অধ্যায়: আল আদাব, অনুচ্ছেদ: মাই ইয়াখুযুশ শাইআ‘আলাল মিযাহি,প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ৪৫৮”
৩। সন্ত্রাস একটি অন্যায় কর্ম। যে কোন অন্যায় কর্ম দেখে তা প্রতিরোধ করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। সাধ্যানুযায়ী প্রতিরোধ প্রচেষ্টা পরিচালিত করার নির্দেশনা প্রদান করে রাসূল (সা.) বলেন: “তোমাদের মধ্যকার যে ব্যক্তি অন্যায় করতে দেখবে, সে যেন তাঁকে তার হাত দ্বারা প্রতিহত করে। যদি সম্ভব না হয় তাহলে কথা দ্বারা প্রতিবাদ করবে, তাও সম্ভব না হলে অন্তর দ্বারা প্রতিবাদ করবে। এটিই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক।” “ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: আল ঈমান, অনুচ্ছেদ: বায়ানু কওলিন নাহয়ি আনিল মুনকারি মিনাল ঈমান…. ওয়াজিবানে, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৬৯”
সন্ত্রাস সম্পর্কে উল্লেখিত আলোচনা থেকে স্পষ্টতই প্রমাণ হয় যে, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ইসলাম সমর্থনেতো করেই না, বরং তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যারা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে কিংবা ভীতি প্রদর্শন করে তারা প্রকৃতপক্ষে মুসলিম নয়। তারা ইসলামের তথা কুরআন ও হাদীসের রীতিনীতি ও নির্দেশনাকে বিসর্জন দিয়েছে। তেমনি বর্তমানে যারা ধর্মের নামে বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা করে নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করছে এবং বিভিন্ন ধরণের হুমকি দিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে তারা মুসলিমদের দলভুক্ত নয়। তাদেরকে ইসলামী দলের অন্তর্ভুক্ত মনে করে তাদের কোনো সহযোগিতা করা যাবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “তোমরা সৎ ও তাকওয়াভিত্তিক কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর না।” আল-কুরআন, ৫:২ বরং তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে।
সন্ত্রাস প্রতিরোধে রাসূল (সা.) এর কার্যক্রম ঃ মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে অশান্ত ও বিশৃঙ্খল পৃথিবীতে শান্তি, শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ : “আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণা করেছি।” “আল-কুরআন, ২১: ১০৭।” এজন্য তিনি সর্বদাই বিশ্বে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য সচেতন ও তৎপর ছিলেন এবং সন্ত্রাস, অন্যায়, অনাচার, অত্যাচার প্রতিরোধে সমগ্র জীবন বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। রাসূল (সা.) একদিকে ছিলেন শান্তি স্থাপনকারীদের জন্য সুসংবাদদানকারী অপরদিকে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের জন্য ছিলেন সতর্কবাণী। আল্লাহ বলেন: “হে নবী! আমি তো আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারীরূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।” “আল-কুরআন, ৩৩: ৪৫-৪৬”
উজ্জ্বল প্রদীপরূপী রাসূল (সা.) তাঁর সমগ্র জীবনে যে আদর্শ বাস্তবায়িত করেছেন, তা অনুসরণের মাধ্যমে আজো পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও সন্ত্রাস প্রতিরোধ করা সম্ভব। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আদর্শ অনুকরণীয় হিসেবে রাসূল সা. কেই গ্রহণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: “তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূল (সা.) এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” “আল-কুরআন, ৩৩: ২১”
সামাজিক বন্ধনহীন পরিস্থিতি, অস্থির ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ, বলগাহীন নেতৃত্ব, শঠতা, প্রবঞ্চনা, হত্যা, লুটতরাজ প্রভৃতি অকল্যাণকর কার্যকরণের ফলশ্র“তিতে আরবের গোত্রে গোত্রে কলহ বিবাদ, যুদ্ধ বিগ্রহ সর্বত্র স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। মানুষের শান্তিময় জীবন মারাত্মকভাবে লংঘিত হতে থাকলে জনসাধারণ এই অশান্ত অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে। উদ্বিগ্ন মানুষের উদ্বেগকে দূর করার জন্য রাসূল (সা.) যে কার্যক্রমসমূহ গ্রহণ করেছিলেন তার মধ্যে সর্বপ্রথম দূর করার জন্য রাসূল (সা.) যে কার্যক্রমসমূহ গ্রহণ করেছিলেন তার মধ্যে সর্বপ্রথম ছিল “হিলফুল ফুযুল” নামক চুক্তি সম্পাদন। রাসূল (সা.) এর বয়স যখন ১৫ বছর, “আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, আর- রাহীকুল মাখতুম, অনু. “খাদিজা আখতার রেজায়ী, ঢাকা: আল কোরআন একাডেমী লন্ডন (পরিবেশিত), ১৯৯৯, পৃ. ৭৫” এই যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনকারী হাশিম সম্প্রদায়ের নেতা আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র জুবাইরের প্রস্তাবে মক্কার আব্দুল্লাহ ইবনে জাদ’আনের বাসভবনে বনী হাশিম, বনী যুহরা, বনী তাঈম, বনী মুত্তালিব, বনী আসাদ গোত্রের সকললে সম্মিলিতভাবে অন্যায়, অত্যাচার, সন্ত্রাস প্রতিরোধ করতে ঐকমত্যে উপনীত হয় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। মুহাম্মাদ সা. এই চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেন। চুক্তিটিকে ইতিহাসে ‘হিলফুল ফুযুল’ নামে অভিহিত করা হয়। “মো. আব্দুল কাসেম, মানবশ্রেষ্ঠ হযরত মুহাম্মাদ (সা.) রাজশাহী: “মোসা. হোসনে আরা বেগম, ২০০৫, পৃ. ৬৭” “আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৬” এই চুক্তিতে আবদ্ধ গোত্রসমূহ যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তার সারমর্ম হলো:
১। আমরা দেশের অশান্তি দূর করার নিমিত্ত যথাসাধ্য চেষ্টা করব। ২। বিদেশী লোকদের ধন-প্রাণ ও মান-সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব। ৩। দরিদ্র ও অসহায় লোকদের সহায়তা করতে আমরা কখনই কুণ্ঠিত হবো না। ৪। অত্যাচারী ও তার অত্যাচারকে দমাতে ও ব্যাহত করতে এবং দুর্বল দেশবাসীদেরকে অত্যাচারীর হাত থেকে রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা করব। “মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা-চরিত, ঢাকা: কাকলী প্রকাশনী, নবম মুদ্রণ, ২০১০, পৃ. ১৮৮” এই প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী হিলফুল ফুযুলের সদস্যগণ বহুদিন যাবৎ কাজ করতে থাকেন। এই সেবা- সংঘের প্রচেষ্টায় দেশের অত্যাচার অবিচার বহুলাংশ হ্রাস পেলো, রাস্তাঘাট নিরাপদ হয়ে উঠল। রাসূল (সা.)-এর প্রতিষ্ঠিত হিলফুল ফুযুল সংঘ ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্ব পর্যন্ত বলবৎ ছিল। ইসলামের আগমনের পর এই সেবা সংঘ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ল। কারণ, সকল প্রকার অন্যায়, অমঙ্গল ও পাপের মূলোৎপাটন করার এবং সর্বাধিক ন্যায়, মঙ্গল ও পুণ্য সাধনের দায়িত্ব নিয়ে যখন ‘ইসলাম’ আত্মপ্রকাশ করল তখন আর উক্ত সেবাসংঘের কোন প্রয়োজনই রইল না। “শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ তাফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, সম্পাদনা: ড. এ.এইচ. এম মুজতবা হোছাইন, ঢাকা: ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, ২০০৯, পৃ. ২০১।”
সন্ত্রাস প্রতিরোধে তরুণ বয়সে মুহাম্মদ (সা.) যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তার বাস্তবায়ন তার সমগ্র জীবনে পরিলক্ষিত হয়। তিনি নবুওয়াত পাওয়ার পরেও এই প্রতিজ্ঞার কথা ভুলেননি। তিনি নবুওয়াত প্রাপ্তির পর কোন একদিন বলেন: “আজও যদি কোন উৎপীড়িত ব্যক্তি “হে ফুযুল প্রতিজ্ঞার ব্যক্তিবর্গ’ বলে ডাক দেয়, আমি অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দেব। কারণ, ইসলাম এসেছে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং উৎপীড়িত, অত্যাচারিতকে সাহায্য করতে। “মোহাম্মদ আকরম খাঁ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮৮” এভাবে মহানবী (সা.) মক্কানগরী থেকে অন্যায়, অত্যাচার ও সন্ত্রাস দূর করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং পরবর্তী সময়ের জন্য সন্ত্রাস প্রতিরোধের আদর্শ রেখে গিয়েছেন।
রাসূল (সা.) নবুওয়াত লাভের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অহীভিত্তিক ফর্মূলা অনুযায়ী বিশ্বকে গড়ে তোলার জন্য সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত করেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস কোন সাফল্যজনক পদ্ধতি হতে পারে না। বিশেষ করে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদ যদি সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়ে-যেমনটি মহানবী (সা.) এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবে হয়েছিল, তাহলে সন্ত্রাস নির্মূলে সন্ত্রাসী নির্মূলের নির্বুদ্ধিতাগত নীতির ফলে পুরো সমাজটাকেই প্রায় নির্মূল করে ফেলতে হবে। আবার সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করার কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বসে থাকলে সন্ত্রাস ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে। উভয় অবস্থায়েই সমাজের সর্বনাশ অনিবার্য। তাই মহানবী (সা.) সন্ত্রাস প্রতিরোধে মধ্যপন্থা গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করে তথায় শান্তি স্থাপনের চেষ্টায় মহানবী (সা.) তাঁর সমগ্র নবুওয়াতী জীবন ব্যয় করেছিলেন। সন্ত্রাস প্রতিরোধ বা নির্মূলে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পদক্ষেপ অগণিত। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো- ক. বাই’আতে আকাবা ঃ নবুওয়াতের দ্বাদশ বছর হজ্ব উপলক্ষে মক্কায় আগত লোকদের মধ্যে ১২ জন রাসূল (সা.) এর সাথে আকাবা নামক স্থানে সাক্ষাৎ করলে তারা তাঁর নিকট ইসলাম গ্রহণপূর্বক অনৈসলামিক কার্যকলাপ পরিত্যাগ করার অঙ্গীকার করলেন। এই অঙ্গীকার গ্রহণ অনুষ্ঠানকে আকাবার প্রথম বাইয়াত বলা হয়। “ইবনে হিশাম, সীরাতে ইবনে হিশাম, অনু. আকরাম ফারুক, ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ২০০৩, পৃ. ১১৫” এই বাইআতে সাহাবাগণ যে বিষয়গুলোর উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তার বিবরণ দিয়ে বাই’আতের অন্যতম সদস্য উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) বলেন : “আমরা রাসূল (সা.) এর সাথে অঙ্গীকার করেছিলাম যে, আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার (শরীক) করবো না, চুরি-ডাকাতি করবো না, ব্যভিচার করবো না, সন্তান হত্যা করবো না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাবো না এবং ন্যায়সঙ্গত ব্যাপারে রাসূল (সা.) এর অবাধ্যতা করবো না। অতঃপর রাসূল (সা.) বললেন: “এসব অঙ্গীকার পূরণ করলে তোমাদের জন্য জান্নাত রয়েছে। আর এর কোন একটি ভঙ্গ করলে তোমাদের পরিণতি আল্লাহর হাতে ন্যস্ত থাকবে। ইচ্ছে করলে মাফ করে দিবেন, ইচ্ছা করলে তিনি শাস্তি দিবেন। “ইমাম বুখারী, সহীহ আল-বুখারী, অধ্যায়: ফাযায়িলুস সাহাবা, অনুচ্ছেদ: উফুদুল আনসার ইলান নাবিয়্যি (সা.) বি মাক্কাতা ওয়া বাই’আতুল আকাবা, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১৪১৩” এই প্রতিজ্ঞার বিষয়াবলীর সবগুলোই প্রত্যক্ষভাবে সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত। তাই মহানবী (সা.) সন্ত্রাস প্রতিরোধে সর্বপ্রথম তার সাহাবাদেরকে সকল সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন, যার ফলে পরবর্তীকালে মক্কা-মদীনাসহ সমগ্র ইসলামী বিশ্ব থেকে সন্ত্রাস নির্মূল হয়েছিলো।                                                   (চলবে)

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক ইজতেমার আহ্বান

॥ আতিকুর রহমান নগরী ॥

মা নুষকে ন্যায়সঙ্গতভাবে হেকমত অবলম্বন করে ওয়ায-নসিহতের মাধ্যমে খোদার রাহে, হেদায়াতের পথে আহ্বান করার কথা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেছেন। এ ব্যাপারে সূরা নাহলের ১২৫নং আয়াতে বর্ণিত আছে, ‘আপনি হেকমত ও উত্তম কথামালার দ্বারা মানুষদেরকে প্রতিপালকের রাহে আহ্বান করুন।’ নবী-রাসূলরা আর আসবেন না উম্মাহকে এ পথে আহ্বান করার জন্য। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে নবী আগমনের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এ কাজের যিম্মাদারী কোরআনের ভাষ্যানুযায়ী আমাদের উপর বর্তায়। কেননা বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী মহাগ্রন্থ কোরআনুল কারীমে ‘কুনতুম খাইরা উম্মাতিন’ অর্থাৎ আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মাহ বা জাতি উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। আর এই শ্রেষ্ঠত্বের পিছনে রয়েছে ‘আমর বিল মারুফ, নাহি আনিল মুনকার’ তথা সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধ করা। দাওয়াতে তাবলিগ যা প্রত্যেক নবী-রাসূলের আগমনের মূল লক্ষ্য; একমাত্র এর দ্বারাই পারি আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে।
বিশ্বখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে শিক্ষা অর্জন করা আল্লামা শাহ ইলিয়াস (রাহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘তাবলীগ জামাতের’ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হচ্ছে কীভাবে প্রিয়নবী (সা.)-এর প্রতিটি উম্মতকে আল্লাহওয়ালা বানানো যায়। কীভাবে মুসলিম জাতিকে তাকওয়া ওয়ালা বানানো যায়, নামাজি বানানো যায় ইত্যাদি। তাই বছরে একবার সম্মিলিতভাবে বিশ্বের সব মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে ঈমানী মুযাকারা করার মানসে তুরাগপাড়ে বসে ‘বিশ্ব মুসলিমদের’ মিলনমেলা। বিশ্ব ইজতেমার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ুক সারা বিশ্বে হেদায়াতের হাওয়া।
বিশ্ব ইজতেমা বিশেষভাবে তাবলিগ জামাতের বার্ষিক বৈশ্বিক সমাবেশ, যা বাংলাদেশের টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তাবলিগ জামাতের এই সমাবেশটি বিশ্বে সর্ববৃহৎ এবং এতে অংশগ্রহণ করেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। ‘বিশ্ব ইজতেমা’ শব্দটি বাংলা ও আরবি শব্দের মিশ্রণে সৃষ্ট। আরবি ‘ইজতেমা’ শব্দের অর্থ সম্মিলন, সভা বা সমাবেশ। সাধারণত প্রতি বছর শীতকালে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়ে থাকে, এজন্য ডিসেম্বর বা জানুয়ারি মাসকে বেছে নেওয়া হয়।
১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতি বছর এ সমাবেশ নিয়মিত আয়োজিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার রমনা পার্ক সংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে তাবলিগ জামাতের প্রথম বার্ষিক সম্মেলন বা ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের তৎকালীন হাজী ক্যাম্পে ইজতেমা হয়, ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন এটা কেবল ইজতেমা হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতি বছর ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে ইজতেমার আয়োজন করা হয়। ওই বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অংশ নেয়ায় ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান অবধি ‘বিশ্ব ইজতেমা’ টঙ্গীর কহর দরিয়া খ্যাত তুরাগ নদের উত্তর-পূর্ব তীরসংলগ্ন ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু মিলিয়ে রাজউকের হুকুমে প্রাপ্ত ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-শহর-বন্দর থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং বিশ্বের প্রায় ৫০ থেকে ৫৫টি দেশের তাবলিগি দ্বীনদার মুসলমান জামাতসহ ২৫ থেকে ৩০ লক্ষাধিক মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক ইসলামী মহাসম্মেলন বা বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেন। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে মাওলানা ইলিয়াস (রাহ.) ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহরানপুর এলাকায় ইসলামী দাওয়াত তথা তাবলিগের প্রবর্তন করেন এবং একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক সম্মিলন বা ইজতেমারও আয়োজন করেন। বাংলাদেশে ১৯৫০-এর দশকে তাবলিগ জামাতের প্রচলন করেন মাওলানা আবদুল আজিজ। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় মারকাজ বা প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদ থেকে এ সমাবেশ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা হয়। পুরো সমাবেশের আয়োজনই করে থাকেন এক ঝাঁক ধর্মপ্রাণ মুসলমান স্বেচ্ছাসেবক। যারা আর্থিক, শারীরিক সহায়তা দিয়ে প্রথম থেকে আখেরতক এ সমাবেশকে সফল করতে সচেষ্ট থাকেন।
পুরো সমাবেশস্থলটি একটি উন্মুক্ত মাঠ, যা বাঁশের খুঁটির উপর চট লাগিয়ে ছাউনি দিয়ে সমাবেশের জন্য প্রস্তুত করা হয়। শুধু বিদেশি মেহমানদের জন্য টিনের ছাউনির ব্যবস্থা করা হয়। সমাবেশস্থলটি প্রথমে খিত্তা ও পরে খুঁটি নম্বর দিয়ে ভাগ করা হয়। অংশগ্রহণকারীগণ খিত্তা নম্বর ও খুঁটি নম্বর দিয়ে নিজেদের অবস্থান শনাক্ত করেন। তাছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলাওয়ারি মাঠের বিভিন্ন অংশ ভাগ করা থাকে। বিদেশি মেহমানদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা বেষ্টনী সমৃদ্ধ এলাকা থাকে, সেখানে স্বেচ্ছাসেবকরাই কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, কোনো সশস্ত্র বাহিনীর অনুপ্রবেশের অধিকার দেওয়া হয় না। সাধারণত তাবলিগ জামাতের অংশগ্রহণকারীরা সর্বনিম্ন তিন দিন আল্লাহর পথে কাটানোর নিয়ত বা মনোবাঞ্ছা পোষণ করেন। সে হিসাবেই প্রতি বছরই বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় তিন দিন জুড়ে। সাধারণত প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের শুক্রবার আমবয়ান ও বাদ জুম্মা থেকে বিশ্ব ইজতেমার কার্যক্রম শুরু হয়। এ বছর ৯ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে তিন দিনব্যাপী প্রথম দফার ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দফা শুরু হবে আগামী শুক্রবার ১৬ জানুয়ারি থেকে। প্রতি বছরই এ সমাবেশে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিশ্ব ইজতেমা প্রতি বছর দুইবারে করার সিদ্ধান্ত নেয় কাকরাইল মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় এবং তিন দিন করে আলাদা সময়ে মোট ছয় দিন এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ আম বয়ান বা উন্মুক্ত বয়ানের মাধ্যমে শুরু হয় এবং আখেরি মোনাজাত বা সমাপনী প্রার্থনার মাধ্যমে শেষ হয়।

মেওয়াত থেকে তুরাগ তীর ॥ তাবলীগ জামাত এবং বিশ্ব ইজতেমা

॥ মুহাম্মদ রুহুল আমীন নগরী ॥

আ ল্লাহর দেয়া জীবন, সম্পদ এবং সময় আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে এর সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি শিক্ষা-জানা এবং বাস্তব জীবনে এর সঠিক প্রয়োগ করার পাশাপাশি আল্লাহ ভোলা মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক করে দেয়ার মেহনত করাই হলো তাবলীগের উদ্দেশ্য। আর এটাকেই বলা হয় ‘ঈমানের দাওয়াত। এ দাওয়াত নিজের সংশোধন তথা গোটা মানবজাতির মুক্তির দাওয়াত। প্রকৃত তাবলীগ অনুসারী মুসল্লিগণ কোনো বৈষয়িক লাভের আশা না করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দ্বীনের মেহনত করেন। বলা চলে- তাওহিদের শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার জন্যই বাংলাদেশে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব ইজতেমা। এই তাবলীগের দাওয়াতের সূত্র ধরেই মুসলিম ঐতিহ্যের স্পেনের মাটিতে ৫০০ বছর পর মসজিদের মিনারে আজানের সুমধুর আওয়াজ ধ্বনিত হয়। ক্রমেই তাবলীগের কার্যক্রম বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের গন্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় বিশ্বের সর্বত্র। নিম্নে তাবলীগ জামাত  ও বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হলো।
‘তাবলীগ’ আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো প্রচার করা, প্রসার করা, পৌঁছানো প্রভৃতি। পরিভাষায় একজনের অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা নিজ ইচ্ছা ও চেষ্টার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানো বা শিক্ষা দেয়াকে তাবলীগ বলা হয়। তাবলীগ  নবীদের পুণ্যময় কাফেলা। শেষ নবীর তিরোধানের পর এ দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তাঁর সব অনুসারীর কাঁধে। কোরআনে আল্লাহ নবীদের কাজ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছাই এবং আমি তোমাদের বিশ্বস্ত হিতাকাক্সক্ষী।’ (সূরা আরাফ : ৬৮)। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমার কাছে যদি কোনো বাণী থাকে তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’ উদ্ধৃত আয়াত ও হাদিসে আরবি তাবলীগ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
বিশ্ব ইজতেমা : ‘ইজতেমা’ শব্দের অর্থ সভা-সমাবেশ বা সম্মেলন। পারিভাষিকভাবে এটি বাংলাদেশে ধর্মীয় সমাবেশ বিশেষত তাবলীগের সম্মেলনে অধিক ব্যবহৃত ও পরিচিত। ইসলামে সুন্দর মানবিক আদর্শ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছে তুলে ধরার মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখে ঢাকার অদূরে টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় তাবলীগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান এ মহাসম্মেলনে সমবেত হন। একইসঙ্গে মিলিত হন বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশ থেকে আগত হাজার হাজার তাবলীগ অনুসারী ঈমানদার মুসল্লি। তারা কোনো বৈষয়িক লাভের আশা না করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দ্বীনের মেহনত করে ইজতেমা ময়দানকে মুসলিম মহামিলনের জন্য প্রস্তুত করে তোলেন। বলা চলে- তাওহিদের শক্তিতে বলীয়ান হতে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় এই বিশ্ব ইজতেমা। বিশ্ব ইজতেমা তাবলীগ জামাতের সবচেয়ে বড় সম্মেলন। আবার অন্যদিক থেকে (লোক সমাগমের দিক দিয়ে) হজের পর ইসলামী দুনিয়ার সবচেয়ে বড় জমায়েত। বিশ্ব ইজতেমায় পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ থেকে মুসলমানরা অংশগ্রহণ করেন। নানা মাজহাব এবং মত ও পথের মুসলমানরা এখানে হাজিরা দেন। আকাশের নীচে একই শামিয়ানার নিচে অবস্থান করেন। এই সমাবেশের মাধ্যমে মুসলমানদের শান-শওকত বৃদ্ধি, নিজেদের মধ্যে ঐক্য আরো সুদৃঢ় করার বার্তাই আমরা পেয়ে থাকি। কুফুরী শক্তির সামনে মুসলমানদের শক্তি প্রর্দশন, সাহস-মনোবল শাণিত হয়। সর্বোপরি মহান আল্লাহর রজ্জুকে অভিন্ন  ভাবে আঁকড়ে ধরার এক চেতনা জাগ্রত হয়। আল্লাহর দেওয়া জান-মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বের হতে শিক্ষা দেয়। মানব কল্যাণে জীবন বির্সজন দিতে তাবলীগ এক অনুপম দৃষ্টান্ত। শেষ রাতে মাওলায়ে হাক্বিকির দরবারে আপাদ মস্তক লুটিয়ে দিতে এবং  খেদমতে খালক এর অনুশীলনের এক উৎকৃষ্ট প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র হলো  তাবলীগ ও ইজতেমা!
প্রচলিত তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন ভারতবষের্র মুসলমানদের এক ক্রান্তিকালে বিংশ শতাব্দীর ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাধক হযরত মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভী (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.)। রাজস্থানের মেওয়াত নামক এলাকা থেকে শুরু হওয়া এই কাজের তিনি  মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর জীবদ্দশায়ই এই মহৎ কার্যক্রম ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তাবলীগ জামাতের রূপকার মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী (রহ.) দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ সময় শায়খুল হাদিস মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভীও এই কার্যক্রমের প্রাণপুরুষ ছিলেন। মাওলানা এনামুল হাসান (রহ.) পরবর্তীকালে তাবলীগ জামাতের অন্যতম আমির ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মুখ নিঃসৃত শাশ্বত বাণী: ‘তোমার কাছে যদি কোনো বাণী থাকে, তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’ এ দাওয়াতি আহ্বানকে কেন্দ্র করেই পর্যায়ক্রমে তাবলীগের বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রসার ঘটে। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত আজকের তাবলীগ জামাতের সার্থক রূপকার মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) বলেছেন, দাওয়াত ও তাবলীগের উদ্দেশ্য হলো ‘ঈমানের দাওয়াত। এ দাওয়াত নিজের সংশোধন তথা গোটা মানবজাতির মুক্তির দাওয়াত। ঈমানের এই দাওয়াতের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর দেয়া জীবন, সম্পদ এবং সময় আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে এর সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি শিক্ষা-জানা এবং বাস্তব জীবনে এর সঠিক প্রয়োগ করার পাশাপাশি আল্লাহ ভোলা মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক করে দেয়ার মেহনত করা।’ মানবজীবনে আজ এই দাওয়াতের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তিনি তৎকালীন ধর্ম-কর্মহীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন মুসলমানদের দ্বীনের পথে আনার জন্য সর্বপ্রথম এ মেহনত চালু করেন। ১৯১০ সালে ভারতের প্রত্যন্ত এলাকা মেওয়াত থেকে সামান্য ক’জন মানুষ নিয়ে তিনি প্রচলিত তাবলীগের কাজ শুরু করেন, যা এখন গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) সারাজীবন পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে এই দাওয়াত ও তাবলীগ জামাত তথা বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ঐক্যের প্রতীক বিশ্ব ইজতেমাকে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এক সুদৃঢ় মজবুত ও শক্তিশালী অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি স্থাপন করে ১৯৪৪ সালের ১৩ জুলাই ৫৯ বছর বয়সে ইহকাল ত্যাগ করেন।
মরহুম ইলিয়াস  (রহ.) অনুধাবন করেছিলেন যে, জনগণের বৃহত্তর অংশে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সুদৃঢ়করণ ও তার বাস্তব অনুশীলন না হলে মানবসমাজে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। বরং সাধারণ মানুষের জীবনে দ্বীন ইসলাম না আসলে মু’মিন হতে পারে না। তাই তিনি ১৩৪৫ হিজরিতে দ্বিতীয় হজ্ব থেকে ফিরে এসে তিনি তাবলীগ গাশ্ত শুরু করলেন, জনসাধারণের মাঝে কালেমা ও নামাযের দাওয়াত দিতে লাগলেন। তাবলীগ জামাত বানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বের হওয়ার দাওয়াত দিলেন। এভাবে গ্রামে গ্রামে কাজ করার জন্য জামাত তৈরি করে দিতেন। কয়েক বছর মেওয়াতে এ পদ্ধতিতে কাজ অব্যাহত থাকলো। শুধু ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে সামগ্রিক জীবন পাল্টে দেয়া বা জাহেলী বিশ্বাসকে পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়। তাই একমাত্র উপায় হিসেবে তাদের ছোট ছোট জামাত আকারে ইলমী ও দ্বীনি মারকাজগুলোতে গিয়ে সময় কাটানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন এবং ধর্মীয় পরিবেশে তালিম দিতে আরম্ভ করলেন। সেই ধর্মীয় মজলিসে উলামা-মাশায়েখদের ওয়াজ-নসিহতের পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিয়মনীতি বাতলে দেয়া হতো। দ্বীনদার পরহেজগার লোকদের জীবনযাপন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চাল-চলন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। ধর্মীয় মৌলিক বিশ্বাস ও ইবাদতের অনুশীলনের পাশাপাশি তিনি মুসলমানদের অনুসৃত প্রধান ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনের প্রয়োজনীয় কিছু সূরা- ক্বেরাত শিক্ষাদান, দোয়া-দরূদ, জরুরি মাসআলা-মাসায়েল সম্পর্কে অবহিত করে তার তাবলিগ জামাতকে একটি ভ্রাম্যমাণ মাদরাসাতে রূপান্তরিত করেন। প্রথম ইজতেমা সম্পর্কে হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী তার ‘একটি নূরানী ইজতিমা’ ও ‘হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রাহ.) ও তাঁর দ্বীনি দাওয়াত’ গ্রন্থে জানাচ্ছেন,৮, ৯ ও ১০ জিলক্বদ ১৩৬০ হিজরি, মোতাবেক ২৮, ২৯ ও ৩০ নভেম্বর ১৯৪১ খৃস্টাব্দে প্রথম দিল্লীর নিজামুদ্দীন মসজিদের ছোট এলাকা মেওয়াতের নূহ মাদ্রাসায় যে তাবলীগ ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়, মেওয়াতভূমির মানুষেরা এত বড় সমাবেশ ইতিপূর্বে আর দেখেনি। বাস্তবানুগ ধারণা মতে লোকসংখ্যা ছিল বিশ/পঁচিশ হাজার। এদের একটা বিরাট অংশ নিজের সামান ও নিজের খাবার-দাবার কাঁধে করে ত্রিশ/চল্লিশ ক্রোশ পথ হেঁটে হাজির হয়েছিলেন। বহিরাগত বিশিষ্ট মেহমানদের সংখ্যাও হাজারের কাছাকাছি ছিল। তারা মুঈনুল ইসলাম মাদরাসার ভবনে শানদার মেহমানদারিতে ছিলেন। মজমার সুপ্রশস্ত শামিয়ানার নিচে জুম্মার নামাজ পড়িয়েছিলেন শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (র)। জামে মসজিদসহ প্রায় মসজিদে নামায হওয়া সত্ত্বেও প্রধান জামাতের কাতারের কারণে সড়ক চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ছাদে ও বালাখানার উপরেও শুধু মানুষ আর মানুষ দেখা যাচ্ছিল।’
বাংলাদেশে তাবলীগ : অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোজাহেদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.) ও হযরত মাওলানা আবদুল আজিজ (রহ.)-এর মাধ্যমে ১৯৪৪ সালে বাংলাদেশে তাবলীগের কাজ শুরু হয়। হযরত মাওলানা আবদুল আজিজ (রহ.)-এর প্রথম আমির ছিলেন। বার্ষিক ইজতেমার প্রয়োজন অনুভব করে হযরত মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী (রহ.) মুরব্বীদের নিয়ে পরামর্শ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের নাম বেরিয়ে আসে। তাবলীগ জামাতের সদর দফতর দিল্লীতে থাকা সত্ত্বেও এর বার্ষিক সমাবেশের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেয়া হয়। আর সেই থেকেই বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের প্রতীক মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ সমাবেশ ও মহাসম্মেলন বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশে এসে নয়া দিগন্তে পৌঁছে। বিশ্ব ইজতেমাকে উপলক্ষে করে যে লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের সমাগম ঘটে তা হঠাৎ করে হয়নি। নিবেদিত প্রাণ তাবলীগ অনুসারীদের নিরলস প্রচেষ্টায় বিশ্ব ইজতেমা আজকের রূপ লাভ করেছে। অতঃপর ১৯৪৬ সালে বিশ্ব ইজতেমা সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হয় কাকরাইল মসজিদে। পরে ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম হাজী ক্যাম্পে। এরপর ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, তারপর ১৯৬৫ সালে টঙ্গীর পাগারে এবং সর্বশেষ ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ সালে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমার স্থান নির্ধারণ করা হয়।  সেই থেকে এ পর্যন্ত এখানেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ইজতেমা ।তখন থেকেই বিশ্ব ইজতেমা প্রকৃত অর্থেই বিশ্ব ইজতেমা এবং দেশের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশস্থলে পরিণত হয়। ইজতেমায় দেশি-বিদেশি ধর্মপ্রাণ মানুষের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার টঙ্গীর ইজতেমাস্থলের জন্য সরকারি জমি বরাদ্দ করে এবং বিশ্ব ইজতেমার পরিধি আরো বড় হয়ে ওঠে। বিগত ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকার উল্লেখিত জায়গায় বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবার লিখিত অনুমতি প্রদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সরকার এই জায়গায় ১৬০ একর জমি স্থায়ীভাবে ইজতেমার জন্য বরাদ্দ দেয় এবং অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন করে।  ১৯৬৭ সাল থেকে বর্তমান অবধি (২০১১ সাল থেকে দুই পর্বে) ‘বিশ্ব ইজতেমা’ টঙ্গীর কহর দরিয়াখ্যাত তুরাগ নদের উত্তর-পূর্ব তীরসংলগ্ন ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু মিলিয়ে রাজউকের ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।  একই স্থানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় এবং মুসল্লীদের দুর্ভোগ লাঘবের সুবিধার্থে কয়েক বছর যাবত দুই পর্বের ছয় দিনে বিশ্ব ইজতেমা হয়ে আসছে। বিশ্ব ইজতেমা বলতে এখন বাংলাদেশের টঙ্গীতে অনুষ্ঠিত তাবলীগ জামাতের ইজতেমাকেই বোঝায়। এই ইজতেমা আমাদের দেশের জন্য বয়ে এনেছে প্রভূত সম্মান। বিশ্ব ব্যাপী উজ্জ্বল করেছে দেশের ভাবমূর্তি। সাধারণত তাবলীগ জামাতের অংশগ্রহণকারীরা সর্বনিম্ন তিন দিন আল্লাহর পথে কাটানোর নিয়ত করে থাকেন। সে হিসেবে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় তিন দিন জুড়ে। এ তিন দিনের মধ্যে শুক্রবারকে রাখার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। শুক্রবার ফজর নামাজের আম বয়ান বা উন্মুক্ত বক্তৃতার মাধ্যমে শুরু হয় ইজতেমার আনুষ্ঠানিকতা এবং রোববার আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হয়। অনেকে শুধু জুম্মার নামাজ কিংবা আখেরি মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। তবে সবচেয়ে বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন আখেরি মোনাজাতে।
বিভিন্ন  দেশের অংশ গ্রহণ : ইজতেমা ময়দানের উত্তর পার্শ্বে টিনের ছাউনিযুক্ত কামরা সম্প্রসারণ করে প্রায় ৩০ হাজার বিদেশী মেহেমান অবস্থানের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যেসব দেশের মুসল্লিগণ ইজতেমায় অংশ গ্রহণ করে আসছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তান, সুইডেন, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, নরওয়ে, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিসর, শ্রীলংকা, কাতার, ইরান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, জর্দান, মরোক্কো, ওমান, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া, তিউনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইয়েমেন, জার্মানী, কানাডা, হংকং, আলজেরিয়া, কেনিয়া, বাহরাইন, জাম্বিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, ইটালী, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়াসহ প্রায় ১০০টি দেশের মুসল্লিগণ বিশ্ব ইজতেমায় শরীক হয়ে থাকেন।
বিশেষ আকর্ষণ : বিশ্ব ইজতেমার বিশেষ একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো যৌতুকবিহীন বিয়ে পড়ানো। প্রতিবছরই ইজতেমায় শত শত যৌতুকবিহীন বিয়ে পড়ানো। হযরত ফাতেমা (রাঃ) ও হযরত আলীর (রাঃ) বিয়ের দেনমোহর অনুসারে বিনা যৌতুকে এসব বিয়ে স¤পন্ন হয়ে থাকে। বয়ান শেষে বর- কনের অভিভাবকদের উপস্থিতে বিয়ে পড়ান হয়। পরে উপস্থিত দ¤পতিদের স্বজন ও মুসল্লিদের মধ্যে খুরমা-খেজুর বিতরণ করা হয়ে থাকে।
সেবা কার্যক্রম : ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান ইজতেমা ময়দানের উত্তর পার্শ্বে নিউ মন্নু কটন মিলের অভ্যন্তরে মেডিক্যাল ক্যা¤েপ চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে প্রতি বছরই। এসব চিকিৎসা ক্যা¤েপর মধ্যে রয়েছে হামদর্দ, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল লিঃ, জনকল্যাণ ফ্রি মেডিক্যাল সেন্টার, টঙ্গী পৌরসভা ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), হার্ট ফাউন্ডেশন, ইসলামী ফাউন্ডেশন উল্লেখযোগ্য। বিশ্ব ইজতেমা মুসলিম উম্মাহর জন্য শিক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য লালন করে আসছে। আল্লাহ উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছেন। ইজতেমায় সে বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। ইসলামের আদর্শ সামনে রেখে এখানে কোনো মুসলমানকে ছোট করে দেখা হয় না। আল্লাহর কাছে প্রত্যেক মুসলমানের মূল্য আছে- এখানে এটা ভালোভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। মুসলমানদের কোনো ভাগে বিভক্ত করা হয় না। এক মুসলমান যেন আরেক মুসলমানকে সম্মান করে সেজন্য জোর তাগিদ দেয়া হয়। কোনো মাজহাবের মুসলমানকে খাটো করা হয় না। বরং সবাইকে ঈমান ও আমলের মেহনতের প্রতি আহ্বান করা হয়। তারা একই প্লেটে খাবার খান, একইসঙ্গে ঘুমান। কারও মধ্যে কোনো হিংসা, ঘৃণা থাকে না। ধনি-দরিদ্র, সাদা-কালোর পার্থক্য থাকে না। সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ থাকে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী সব মানুষের চাওয়া-পাওয়া এক হয়ে যায়। এই সমতা সত্যিই এক মহান দৃষ্টান্ত।
লেখক : সহসভাপতি-অনলাইন জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন সিলেট (ওজাস)।

সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী (সা:)’র কৌশল

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
২। ন্যায়ানুগ পন্থার বিপরীতে বিকৃত পথে জীবন চালানো। প্রাচীনকালের আদ, সামুদ, লুত, মাদায়েনবাসীসহ বিভিন্ন জাতিকে আল-কুরআনে আল্লাহ ফাসাদকারী হিসেবে গণ্য করেছেন। কারণ তারা সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠভাবে জীবন-যাপনের পরিবর্তে বিকৃত পথে জীবনকে চালিত করেছিল।
আল্লাহ বলেন: “যারা দেশে সীমালংঙ্ঘন করেছিল এবং সেখানে অশান্তি  বৃদ্ধি করেছিল। “আল-কুরআন, ৮৯:১১-১২” অন্য আয়াতে অল্লাহ বলেন: “তোমরাই তো পুরুষ উপগত হচ্ছ, তোমরাই তো রাহাজানি করে থাক এবং তোমরাই তো নিজেদের মজলিসে প্রকাশ্যে ঘৃণ্য কাজ করে থাক। উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু এই বলল, আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আনয়ন কর- যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” “আল-কুরআন, ২৯:২৯”
৩। আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়। সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনের ফলে যে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয় তাও ফাসাদ। আল্লাহ বলেন: “সে বলল. রাজা-বাদশাহরা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে তখন তাকে বিপর্যস্তকরে দেয় এবং সেখানকার মর্যাদাবান ব্যক্তিদের অপদস্থ করে, এরাও এরূপই করবে।” “আল-কুরআন ২৭:৩৪।” অন্য স্থানে আল্লাহ বলেন, “আর সেই শহরে ছিল এমন নয় ব্যক্তি, যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং সৎকর্ম করত না।” “আল-কুরআন, ২৭:৪৮।”
৪। জুলুম, অবিচার ও লুটতরাজের কাজে প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার করা। যে ধরণের শাসন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রশাসনিক ক্ষমতাকে মহৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পরিবর্তে জুলুম, অবিচার ও লুটতরাজের কাজে ব্যবহার করা হয় তাকে আল-কুরআন ‘ফাসাদ’ নামে অভিহিত করেছে। আলাহ বলেন: ‘‘যখন সে প্রস্থান করে তখন সে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির এবং শস্যক্ষেত্র ও জীবজন্তু নিপাতের চেষ্টা করে। আর আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না।” “আল-কুরআন, ২: ২০৫।”
৫। সন্ত্রাসের মাধ্যমে যারা সমাজে অশান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায় আল-কুরআন তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত আখ্যায়িত করেছে। আল্লাহ বলেন: “যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণœ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং দুনিয়ায় অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।” “আল-কুরআন, ২: ২৭”
৬। অন্যায়ভাবে বা পৃথিবীতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে কোন ব্যক্তিকে হত্যা করা সমগ্র মানব জাতিকে হত্যা করার শামিল। আল্লাহ বলেন: “এই কারণেই বনী ইসরাঈলের প্রতি এই বিধান দিলাম যে, নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কার্য করার কারণ ব্যতীত কেউ কাউকেও হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করল।” “আল-কুরআন, ৫: ৩২”
৭। পৃথিবীতে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের শাস্তি ও পরিণতি প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: “যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায় এটা তাদের শাস্তি যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ হতে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়ায় এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও পরকালে তাদের মহাশাস্তিরয়েছে।” “আল-কুরআন, ৫: ৩৩”
হাদীসে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ : ইসলামী আইনের দ্বিতীয় উৎস আল-হাদীসের সন্ত্রাস শব্দটি সরাসরি ব্যবহৃত না হলেও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিভিন্ন দিক বুঝাতে বেশ কিছু পরিভাষার ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। সেসব পরিভাষার অন্যতম হলো, আল-কতলু বা হত্যা, আয-যুলম বা অত্যাচার, আত-তারভী, বা ভয় প্রদর্শন, হামলুছ ছিলাহ বা অস্ত্র বহন করা, আল-ইশারাতু বিছ-ছিলাহ বা অস্ত্র দ্বারা ইঙ্গিত করা ইত্যাদি। তবে এসব পরিভাষা ছাড়াও বিভিন্ন প্রেক্ষিতে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে সন্ত্রাসীদের কর্মকান্ডকে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ বুঝাতে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার কয়েকটি নিম্নে উদাহরণ হিসেবে পেশ করা হলো।
১। একে অপরের প্রতি অত্যাচার করা নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ বলেন: “হে আমার বান্দাগণ! আমি আমার জন্য অত্যাচার হারাম করেছি এবং তা তোমাদের জন্যও হারাম করে দিয়েছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর অত্যাচারে লিপ্ত হয়ো না।” “ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাতি ওয়াল আদাবি, অনুচ্ছেদ: তাহরীমুয যুলুম, বৈরূত: দারু ইহইয়াইত তুরাছিল আরাবি, তা.বি., খ. ৪, পৃ. ১৯৯৪।”
২। স্বাভাবিকভাবে একজনের রক্ত, সম্পদ, সম্মান হানী করা অপরজনের জন্য হারাম। রাসূল (সা.) বলেন: তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের সম্মান পরস্পরের জন্য ঐরূপ হারাম যে রূপ হারাম তোমাদের এই শহর, তোমাদের এই মাস এবং তোমাদের এই দিন “ইমাম বুখারী, সহীহ আল-বুখারী, অধ্যায়: আল-ঈমান, অনুচ্ছেদ: কওলিন নাবিয়্যি (সা.) রুববা মুবালাগিন আও’আ মিন সামিঈন, বৈরূত: দারু ইবনু কাছীর, ১৯৮৭, খ. ১, পৃ. ৩৭।”
৩। কোন মুসলিমকে আতঙ্কিত করা অবৈধ। রাসূল (সা.) বলেন: “কোন মুসলিমের জন্য অপর মুসলিম ভাইকে আতঙ্কিত বা সন্ত্রস্ত করা বৈধ নয়।” “ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান, অধ্যায়: আল-আদাব, অনুচ্ছেদ: মাই ইয়াখুযুশ শাইআ ‘আলাল মিযাহি, বৈরূত: দারুল কিতাব আল- আরাবিয়্যা, তা.বি.খ. ৪, পৃ. ৪৫৮”
৪। কোন মুসলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণকারী ব্যক্তি মুসলিম উম্মাহর সদস্য নয়। এ মর্মে রাসূল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি তোমাদের (মুসলিমদের) বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে, সে আমাদের অন্ত র্ভুক্ত নয়।” “ইমাম বুখারী, সহীহ আল- বুখারী, অধ্যায়: আদ- দিয়াত, অনুচ্ছেদ: কওলুল্লাহি তা’আলা ওয়া মান আহইয়াহা/ আল-মায়িদাহ- ৩২, প্রাগুক্ত, খ. ৬, পৃ. ২৫২০”
৫। কোন মুসলিমের অস্ত্র দ্বারা হুমকি দেয়া নিষিদ্ধ। রাসূল (সা.) বলেন: “তোমাদের মাঝে কেউ যেন তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অস্ত্র দ্বারা হুমকি না দেয়। কেননা হতে পারে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও শয়তান তার হস্তদ্বয় আঘাত হানার ফলে হতাহতের ঘটনা ঘটবে; অতঃপর সে এ অপরাধের কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে”। “ইমাম বুখারী, সহীহ আল-বুখারী, অধ্যায়: আল-ফিতান, অনুচ্ছেদ: কওলুন্নাবিয়্যি স. মান হামালা আলান্নাস সিলাহা ফা লাইসা মিন্না, প্রাগুক্ত, খ. ৬, পৃ. ২৫৯২”
রাসূল (সা.) বলেন: “কোন ব্যক্তি যদি লোহা দ্বারা তার ভাইকে হুমকি দেয় তবে তা থেকে বিরত না হওয়া পর্যন্ত  ফিরিশতাগণ তার প্রতি অভিশাপ করতে থাকেন যদিও হুমকি প্রদানকৃত ব্যক্তি তার সহোদর ভাই হয়।” “ইমাম মুসলিম, সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: আল- বিররি ওয়াস সিলাতি ওয়াল আদব অনুচ্ছেদ: আন-নাহইউ আনিল ইশারাতি বিসসিল্লাহি ইলা মুসলিমিন, প্রাগুক্ত, তা.বি, খ. ৪, পৃ. ২০২০।”
৬। আত্মঘাতি হামলার মাধ্যমে আত্মহত্যাও হারাম। রাসূল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি পৃথিবীতে নিজেকে কোন বস্তু দ্বারা হত্যা করবে কিয়ামতের দিন তাকে সে বস্তু দ্বারা শাস্তি দেয়া হবে।” “ইমাম বুখারী, সহীহ আল- বুখারী, অধ্যায়: আল- আদাব, অনুচ্ছেদ : মা ইউনহা ‘আনিস সিবাবি ওয়াল লা’নি, প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ২২৪৭।” রাসূল (সা.) আরো বলেন: “যে ব্যক্তি নিজেকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করবে তাকে জাহান্নামে অনুরূপভাবে শাস্তি দেয়া হবে। যে ব্যক্তি নিজেকে আঘাত করে আত্মহত্যা করবে তাকেও জাহান্নামে অনুরূপভাবে আঘাত করা হবে।” “ইমাম বুখারী, সহীহ আল- বুখারী, অধ্যায়: আল-জানাইয, অনুচ্ছেদ: মা জা‘আ কাতিলিন নাফস, প্রাগুক্ত, খ. ১, পৃ. ৪৫৯”
৭। শুধু মুসলিম ব্যক্তি নয়, কোন চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের হত্যা করাও নিষিদ্ধ। রাসূল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি মুসলিম জনপদে বসবাসকারী চুক্তিবদ্ধ কোন অমুসলিমকে হত্যা করবে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, অথচ চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব হতেও তার সুগন্ধ পাওয়া যাবে।” “ইমাম বুখারী, সহীহ আল- বুখারী, অধ্যায়: আল- জিযইয়া ওয়াল মাওয়াদিআতি, অনুচ্ছেদ: ইছমু মান কাতালা মু‘আহিদা বিগাইরি জুরম, প্রাগুক্ত, খ. ৩, পৃ. ১১৫৫”
৮। সন্ত্রাসীর অন্তরে দয়ামায়া থাকে না, তাই সে হতভাগা। রাসূল (সা.) বলেন: “একমাত্র দুর্ভাগা ব্যক্তি হতেই দয়া ছিনিয়ে নেয়া হয়”। “ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান, অধ্যায়: আল- আদাব, অনুচ্ছেদ: ফির রহমাতি, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ৪৪১”
৯। ইচ্ছাকৃত কোন মু‘মিনকে হত্যা করা বড় গুনাহসমূহের অন্যতম যার গুনাহ আল্লাহ মা‘ফ করবেন না। রাসূল (সা.) বলেন: “আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপনকারী ও ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মু‘মিন ব্যক্তিকে হত্যার গুনাহ ব্যতীত অন্য যে কোন গুনাহকে আল্লাহ হয়তো ক্ষমা করে দিবেন।” “ইমাম আবু দাউদ, আস- সুনান, অধ্যায়: আল ফিতান, অনুচ্ছেদ: ফী তা’যীমি কতলিল মু‘মিনি, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৬৭”
১০। অন্যায়ভাবে মু‘মিনকে হত্যাকারীর কোন ইবাদত কবুল করা হবে না। রাসূল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোন মু‘মিন ব্যক্তিকে হত্যা করবে আল্লাহ তার কোন নফল ও ফরয ইবাদত কবুল করবেন না।” “ইমাম আবু দাউদ, আস- সুনান, অধ্যায়: আলফিতান, অনুচ্ছেদ: ফী ত’যীমি কতলিল মু‘মিন, প্রাগুক্ত, তা.বি., খ. ৪, পৃ. ১৬৭”
১১। নিষিদ্ধ পন্থায় অপরের রক্তপাত ঘটানো মু‘মিনকে উচ্চ মর্যাদা থেকে স্খলিত করে। রাসূল (সা.) বলেন: “মু‘মিন ব্যক্তি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জীবন-যাপন করতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত  হারাম পন্থায় অন্যের রক্তপাত না ঘটাবে।” “ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান, অধ্যায়: আলফিতান, অনুচ্ছেদ: ফী তা’মীমি কাতলিল মু‘মিন, প্রাগুক্ত, খ. ৪, পৃ. ১৬৭”
১২। কোন মুসলিমকে হত্যা করা দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার থেকেও গুরুতর। রাসূল (সা.) বলেন: “আল্লাহর নিকট সারা দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার চেয়েও গুরুতর হচ্ছে কোন মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করা।” “ইমাম তিরমিযী, আস-সুনান, অধ্যায়: আদ-দিয়াত আন রাসূল (সা.) অনুচ্ছেদ: মা জাআ ফী তাশদীদি কতলিল মু‘মিননি, বৈরুত: দারুল ফিকর, ১৯৮৩, খ. ২, পৃ. ৪২৬”
১৩। নিরাপত্তা প্রদানকৃত যে কোন ধর্মাবলম্বীকে হত্যাকারীর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। রাসূল (সা.) বলেছেন- “যে ব্যক্তি নিরাপত্তা প্রদানকৃত ব্যক্তিকে হত্যা করে আমার সাথে ঐ হত্যাকারীর কোন সম্পর্ক থাকবে না, যদিও নিহত ব্যক্তি কাফির হয়।” “ইমাম আত-তাবারানী, আল-মু‘জামুস সগীর, অধ্যায়: হারফুল হামযাহ, অনুচ্ছেদ: আল-আলফ মিন ইসামিহি আহমাদ, বৈরুত: আল-মাকতাবাতুল ইসলামী, ১৯৮৫, খ. ১, পৃ.১৪১৫”
সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলাম : আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য একমাত্র জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম। আল্লাহ বলেন: “নিঃসন্দেহে ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন।” আল-কুরআন, ৩: ১৯। অন্য স্থানে আল্লাহ বলেন, “কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনও কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভৃক্ত।” আল-কুরআন, ৩ : ৮৫। ইসলাম শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থই শান্তি। এ জীবনব্যবস্থার এরূপ নামকরণই প্রমাণ করে যে, মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তি  প্রতিষ্ঠার চিন্তা ইসলামের সামগ্রিক প্রকৃতি ও মৌল দৃষ্টিকোণ হতে উৎসারিত। তাই ইসলামের প্রতিটি আদেশ-নিষেধ, বিধি-বিধান থেকে শান্তির ফল্গুধারা নিঃসৃত হয়। শান্তিময় পরিবেশের স্থায়িত্ব বজায় রাখার শান্তি বিঘিœত করে এমন সকল কর্মকান্ড প্রতিরোধ অপরিহার্য। তাই যৌক্তিকভাবেই ইসলাম শান্তি  প্রতিষ্ঠা ও এর স্থায়িত্ব বজায় রাখার স্বার্থে সকল ধরণের সন্ত্রাসকে প্রতিরোধে ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নির্র্মূল করার নির্দেশনা দান করে। ইসলাম বলতে প্রথমত ও প্রধানত কুরআন ও রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ বা হাদীসকেই বুঝায়। রাসূল (সা.) বলেছেন: “আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে গেলাম, এই দু‘টি জিনিসকে যতক্ষণ আঁকড়ে ধরে রাখবে ততক্ষণ পর্যন্ত  তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না, সে দু‘টি জিনিস হলো আল্লাহর কিতাব তথা কুরআন ও তাঁর রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ তথা হাদীস।” “ইমাম মালিক, আল-মুয়াত্তা, অধ্যায়: আল-ক্বাদর, অনুচ্ছেদ: আন-নাহইউ আনিল কওলি বিল ক্বাদর, মিসর: দারু ইহইয়াইত তুরাছিল আরাবিয়্যি, তা.বি., খ. ২, পৃ. ৮৯৯”
তাই সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা বলতে সন্ত্রাস প্রতিরোধে কুরআন ও রাসূল (সা.) এর সুন্নাহতে বর্ণিত নির্দেশনাসমূহ বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। উল্লেখ্য যে, সন্ত্রাস প্রতিরোধক আয়াত, হাদীস ও রাসূল (সা.) এর আদর্শ এত বেশি যে, তার সবগুলো এই স্বল্প পরিসরে উল্লেখ করা অসম্ভব। তাই এ ব্যাপারে ঐ তিন উৎসের মৌলিক নির্দেশনাসমূহ নিম্নে পেশ করার প্রয়াস পাচ্ছি। সন্ত্রাস প্রতিরোধে আল-কুরআনের নির্দেশনা ঃ আল-কুরআনে প্রথমত সাধারণতভাবে সন্ত্রাসের কারণ সৃষ্টি হওয়ার ছিদ্রপথ বন্ধ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
১। ন্যায়পরায়ণতা ও সদাচরণের নির্দেশ ও অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজ করতে নিষেধ প্রদান করে আল-কুরআনে নির্দেশনা এসেছে যে, “আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালঙ্ঘন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।” “আল-কুরআন, ১৬: ৯০”
২। সন্ত্রাস মূলত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘনের ফলেই সৃষ্ট। তাই জীবনের সকল ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন, বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করে আল-কুরআনে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আল্লাহ বলেন: “বল, হে কিতাবীগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীন সম্বন্ধে অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি কর না; এবং যে সম্প্রদায় ইত:পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে, অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে ও সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না।” “আল-কুরআন, ৫: ৭৭” অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; কিন্তু সীমালঙ্ঘন কর না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।” “আল-কুরআন, ২: ১৯০” উপরোক্ত প্রথম আয়াতে আহলে কিতাবদের উদ্দেশ্য করে এবং দ্বিতীয় আয়াতে সশস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রের প্রসঙ্গ বর্ণিত হলেও অন্যান্য আয়াত ও হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ি মুসলিমদের জন্যও সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ।
৩। পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ। সন্ত্রাস নিঃসন্দেহে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তাই সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে বা অন্য কোনভাবে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আল-কুরআনে নির্দেশনা এসেছে। আল্লাহ বলেন: “দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর তোমরা তাতে বিপর্যয় ঘটাইও না, তাঁকে ভয় ও আশার সাথে ডাকবে। নিশ্চয় আল্লাহর অনুগ্রহ সৎকর্মপরায়ণদের নিকবর্তী।” “আল-কুরআন, ৭: ৫৬”
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশ্বখ্যাত মুফাসসির হাফিয ইবনে কাছীর (র.) বলেন, “শান্তি  স্থাপনের পর ভূ-পৃষ্ঠে বিপর্যয় ও যে সকল কর্মকা- পৃথিবীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তা থেকে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। কেননা যখন কাজ-কারবার শান্তি পূর্ণ পরিবেশে যথাযথভাবে চলতে থাকে, তখন যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়, তবে তা হবে বান্দার জন্য বেশী ক্ষতিকর। এজন্য আল্লাহ                                 (চলবে)

বিশ্ব ইজতেমা : হেদায়তের হাওয়া ছড়িয়ে পড়–ক সারাবিশ্বে

॥ আতিকুর রহমান নগরী ॥

মানুষকে ন্যায়সঙ্গতভাবে হেকমত অবলম্বন করে ওয়ায-নসিহতের মাধ্যমে খোদার রাহে, হেদায়াতের পথে আহবান করার কথা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেছেন। এ ব্যাপারে সুরা নাহলের ১২৫ নং আয়াতে বর্ণিত আছে ”আপনি হেকমত ও উত্তম কথামালার দ্বারা মানুষদেরকে প্রতিপালকের রাহে আহবান করুন।” নবী-রাসূলরা আর আসবেন না উম্মাহকে এ পথে আহবান করার জন্য। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা.’র মাধ্যমে নবী আগমনের দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এ কাজের জিম্মাদারী কোরআনের ভাষ্যানুযায়ী আমাদের উপর বর্তায়। কেননা বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী মহাগ্রন্থ কোরআনুল কারীমে ‘কুনতুম খাইরা উম্মাতিন’ আয়াতাংশে আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মাহ বা জাতি উপাধিতে ভুষিত করা হয়েছে। আর এই শ্রেষ্ঠত্বের পিছনে রয়েছে ‘আমর বিল মারুফ, নাহি আনিল মুনকার’ তথা সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধ করা। দাওয়াতে তাবলীগ যা প্রত্যেক নবী-রাসূলের  আগমনের মূল লক্ষ্য। একমাত্র এর দ্বারাই পারি আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে।
বিশ্বখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের সূর্য্য সন্তান আল্লামা শাহ ইলিয়াস (রাহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘তাবলীগ জামাতের’ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হচ্ছে কীভাবে প্রিয়নবী (সা.)’র প্রতিটি উম্মতকে আল্লাহওয়ালা বানানো যায়। কীভাবে মুসলিম জাতিকে তাকওয়া ওয়ালা বানােনা যায়, নামাজী বানানো যায় ইত্যাদি। তাই বছরে একবার সম্মিলিতভাবে বিশ্বের সব মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে ঈমানী মুযাকারা করার মানসে তুরাগপাড়ে বসে ‘বিশ্ব মুসলিমদের’ মিলনমেলা। বিশ্ব ইজতেমার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ুক সারা বিশ্বে হেদায়াতের হাওয়া।
বিশ্ব ইজতেমা সাধারণত বৈশ্বিক যে কোনো বড় সমাবেশ, কিন্তু বিশেষভাবে তাবলিগ জামাতের বার্ষিক বৈশ্বিক সমাবেশ, যা বাংলাদেশের টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তাবলিগ জামাতের এই সমাবেশটি বিশ্বে সর্ববৃহৎ এবং এতে অংশগ্রহণ করেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। ‘বিশ্ব ইজতেমা’ শব্দটি বাংলা ও আরবি শব্দের মিশ্রণে সৃষ্ট। আরবি ‘ইজতেমা’ শব্দের অর্থ সম্মিলন, সভা বা সমাবেশ। সাধারণত প্রতিবছর শীতকালে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়ে থাকে, এজন্য ডিসেম্বর বা জানুয়ারি মাসকে বেছে নেয়া হয়।
১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতি বছর এই সমাবেশ নিয়মিত আয়োজিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার রমনা পার্ক সংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে তাবলিগ জামাতের প্রথম বার্ষিক সম্মেলন বা ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের তৎকালীন হাজি ক্যাম্পে ইজতেমা হয়, ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন এটা কেবল ইজতেমা হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতিবছর ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে ইজতেমার আয়োজন করা হয়। ওই বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অংশ নেয়ায় ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান অবধি ‘বিশ্ব ইজতেমা’ টঙ্গীর কহর দরিয়া খ্যাত তুরাগ নদের উত্তর-পূর্ব তীরসংলগ্ন ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু মিলিয়ে রাজউকের হুকুমে প্রাপ্ত ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-শহর-বন্দর থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং বিশ্বের প্রায় ৫০ থেকে ৫৫টি দেশের তাবলিগি দ্বীনদার মুসলমান জামাতসহ ২৫ থেকে ৩০ লক্ষাধিক মুসল্লি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক ইসলামি মহাসম্মেলন বা বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেন।১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে মাওলানা ইলিয়াস রাহ. ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহরানপুর এলাকায় ইসলামী দাওয়াত তথা তাবলিগের প্রবর্তন করেন এবং একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক সম্মিলন বা ইজতেমারও আয়োজন করেন। বাংলাদেশে ১৯৫০ এর দশকে তাবলিগ জামাতের প্রচলন করেন মাওলানা আবদুল আজিজ। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় মারকাজ বা প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদ থেকে এই সমাবেশ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করা হয়। পুরো সমাবেশের আয়োজনই করে থাকেন এক ঝাঁক ধর্মপ্রাণ মুসলমান স্বেচ্ছাসেবকবৃন্দ। যারা আর্থিক, শারীরিক সহায়তা দিয়ে প্রথম থেকে আখেরতক এই সমাবেশকে সফল করতে সচেষ্ট থাকেন।
পুরো সমাবেশস্থলটি একটি উন্মুক্ত মাঠ, যা বাঁশের খুঁটির উপর চট লাগিয়ে ছাউনি দিয়েসমাবেশের জন্য প্রস্তুত করা হয়। শুধুমাত্র বিদেশী মেহমানদের জন্য টিনের ছাউনি ও টিনের বেড়ার ব্যবস্থা করা হয়। সমাবেশস্থলটি প্রথমে খিত্তা ও পরে খুঁটি নম্বর দিয়ে ভাগ করা হয়। অংশগ্রহণকারীগণ খিত্তা নম্বর ও খুঁটি নম্বর দিয়ে নিজেদের অবস্থান শনাক্ত করেন। তাছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলাওয়ারি মাঠের বিভিন্ন অংশ ভাগ করা থাকে। বিদেশী মেহমানদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা বেষ্টনী সমৃদ্ধ এলাকা থাকে, সেখানে স্বেচ্ছাসেবকরাই কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, কোনো সশস্ত্র বাহিনীর অনুপ্রবেশের অধিকার দেয়া হয় না।
সাধারণত তাবলিগ জামাতের অংশগ্রহণকারীরা সর্বনিম্ন তিন দিন আল্লাহর পথে কাটানোর নিয়ত বা মনোবাঞ্ছা পোষণ করেন। সে হিসাবেই প্রতিবছরই বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় তিনদিন জুড়ে। সাধারণত প্রতিবছর জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহের শুক্রবার আমবয়ান ও বাদ জুমা থেকে বিশ্ব ইজতেমার কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এ বছর ৯ জানুয়ারী শুক্রবার থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। প্রতি বছরই এই সমাবেশে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিশ্ব ইজতেমা প্রতিবছর দুইবারে করার সিদ্ধান্ত নেয় কাকরাইল মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ থ্রিস্টাব্দ থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় এবং তিনদিন করে আলাদা সময়ে মোট ছয়দিন এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ আ’ম বয়ান বা উন্মুক্ত বয়ানের মাধ্যমে শুরু হয় এবং আখেরি মোনাজাত বা সমাপনী প্রার্থনার মাধ্যমে শেষ হয়।

সন্ত্রাস প্রতিরোধে মহানবী (সা:)’র কৌশল

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

সন্ত্রাস বর্তমান সময়ের সর্বাধিক আলোচিত বিষয়। একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে প্রতিযোগিতা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে সন্ত্রাস। সন্ত্রাস একদিকে যেমন বিশ্ব শান্তিকে হুমকির মুখে দাঁড় করে দিয়েছে অন্যদিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে সভ্যতার সৌধকে। বর্তমান বিশ্বে ইসলামকে সন্ত্রাসের সাথে একাকার করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ মানবসভ্যতার শুরুতেই সন্ত্রাস প্রতিরোধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত নিয়ে ইসলাম পৃথিবীতে এসেছে। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সন্ত্রাসের সাথে ইসলামী অনুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে, এর দ্বারা ইসলামপ্রিয় জনগোষ্ঠিকে আতঙ্কিত করে তোলা হচ্ছে এবং বিশ্বে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণার সৃষ্টি করা হচ্ছে। অত্র প্রবন্ধে সন্ত্রাস এর সংজ্ঞা, কোরআন ও হাদীসে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ, সন্ত্রাস প্রতিরোধে কোরআন ও হাদীসের নির্দেশনা ও মহানবী (সা.) এর কার্যক্রম বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
সন্ত্রাস এর সংজ্ঞা : সন্ত্রাস একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নির্ধারণ বর্তমান মতবিরোধপূর্ণ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একপ্রকার অসম্ভবই বটে। কারণ ব্যক্তি বা গোষ্ঠির দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা যে কোন বিষয় বা মতবাদের সংজ্ঞার ভিন্নতা নির্দেশ করে। তাই তো দেখা যায়, এক গোষ্ঠির দৃষ্টিতে যে কর্মকান্ড সন্ত্রাসের মতো নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত কর্ম, অপর গোষ্ঠির দৃষ্টিতে সে কর্মকান্ডই স্বাধীনতা কিংবা স্বাধিকার আদায় সংগ্রামের মতো মহৎ ও প্রশংসনীয় কর্ম। সন্ত্রাসের সংজ্ঞায়নে বিতর্ক থাকলেও বক্ষ্যমান আলোচনার উদ্দেশ্য অর্জনের প্রয়োজনে সন্ত্রাসের একটি সু-নির্দিষ্ট পরিচয় নির্ধারণ আবশ্যক।
সন্ত্রাস শব্দটি বাংলা ‘ত্রাস’ শব্দ উদ্ভূত। যার অর্থ ভয়, ভীতি, শঙ্কা। “ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হক ও অন্যান্য সম্পাদিত, ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯২, পৃ. ৫৭৩”
আর সন্ত্রাস অর্থ হলো, মহাশঙ্কা, অতিশয় ভয়, “আহমদ শরীফ সম্পাদিত, বাংলা একাডেমী সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬, পৃ. ৫৪১” কোনো উদ্দেশ্যে মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা, অতিশয় শঙ্কা বা ভীতি, “ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হক ও অন্যান্য সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১৩’’ অতিশয় ত্রাস বা ভয়ের পরিবেশ, “শৈলেন্দ্র বিশ্বাস, সংসদ বাংলা অভিধান, কলকাতা: শিশু সাহিত্য সংসদ প্রাইভেট লিমিটেড, ২০০০, পৃ. ৮০৪” ভীতিজনক অবস্থা, রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের জন্য অত্যাচার, হত্যা প্রভৃতি হিংসাত্মক ও ত্রাসজনক পরিবেশ। “রিয়াজ আহমদ, ব্যবহারিক শব্দকোষ, ঢাকা: সাহিত্য বিলাস, ২০০৮, পৃ. ২৬২” সন্ত্রাস এর সমার্থক শব্দ হিসাবে সন্ত্রাসবাদ, আতঙ্কবাদ, বিভীষিকাপন্থা, সহিংস আন্দোলন, উগ্রপন্থা, উগ্রবাদ, চরমপন্থা ইত্যাদিও ব্যবহৃত হয়। “অশোক মুখোপধ্যায়, সংসদ সমার্থ শব্দকোষ, কলকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৯৮৮, পৃ. ২৪৭” বর্তমানে সন্ত্রাস কোন বিচ্ছিন্ন কর্মকা- নয়। বর্তমানে এটি একটি মতবাদে পরিণত হয়েছে। তাই সন্ত্রাস ভিত্তিক বা কেন্দ্রিক মতবাদ ও কর্মকান্ডকে বুঝাতে সন্ত্রাসবাদ শব্দটি বহুল প্রচলিত। অভিধানে “সন্ত্রাসবাদ” অর্থ লেখা হয়েছে যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের জন্য হত্যা অত্যাচার ইত্যাদি কার্য অনুষ্ঠাননীতি, “ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হক ও অন্যান্য সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১৩,” রাজনীতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য পীড়ন, হত্যা প্রভৃতি হিংসাত্মক ও ত্রাসজনক কর্ম অবলম্বন করা উচিত- এই মত। “শৈলেন্দ্র বিশ্বাস, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮০৪,” ইংরেজীতে সন্ত্রাস অর্থ বুঝাতে ঞবৎৎড়ৎ: মৎবধঃ ভবধ/ধষধৎস ঃবৎৎড়ৎরংস গড়যধসসধফ অষধহফ ড়ঃযবৎং ইধহমষধ অপধফবসু ইধহমষধ-ঊহমষরংয উরপঃরড়হধৎু, উযধশধ: ইধহমষধ অপধফবসু, ১৯৯৪, ঢ়. ৭৮৬” বীঃৎবসব ভবধৎ, ঃযব ঁংব ড়ভ ড়ৎমধহরুবফ রহঃরসরফধঃরড়হ ঃবৎৎড়ৎরংস [নধংবফ ড়হ ষধঃরহ ঃবৎৎবৎব ড়ঃড় ভৎরমযঃবহ”, ুওষষঁংঃৎধঃবফ ঙঢঋঙজউ উওঈঞওঙঘঅজণ. খড়হফড়হ: উড়ৎষরহম শরহফবৎংষবু ষরসরঃবফ, ২০০৬. ঢ়. ৮৫৯” শব্দসমূহ ব্যবহৃত হয়।
আধুনিক আরবি ভাষায় সন্ত্রাস শব্দের প্রতিশব্দ হলো (ইরহাব)। “ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধান, ঢাকা: রিয়াদ প্রকাশনী, ২০০৯, পৃ. ৭১” এ শব্দটি এসেছে (রাহবুন) থেকে যার অর্থ (খাফ) ভীত হলো, ভয় পেলো ইত্যাদি। “ইবনে মানযুর আল-আফরাকী আল-মিসরী, লিসানুল আরব, বৈরূত: দারুল সাদির, তা.বি.খ. ১, পৃ. ৪৩৬” আর (ইরহাব) অর্থ হলো (তাখভীফ) ও (তাফযী), “ইবরাহীম মুসতাফা ও অন্যান্য, আল-মু’জামুল ওয়াসীত, বৈরূত: দারুল দা’ওয়াহ, তা.বি.খ. ১, পৃ. ৩৭৬: আল-মুনজিদ ফিল লুগাহ, বৈরূত: দারুল মাশারিক, ১৯৯৪, পৃ. ২৮২” তথা ভীতিপ্রদর্শন, শঙ্কিতকরণ, আতঙ্কিতকরণ। “ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান,প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৪, ৩০৩” সন্ত্রাস এর শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থের ব্যাপারে মতানৈক্য তেমন না থাকলেও এর পারিভাষিক সংজ্ঞা নির্ধারণে যথেষ্ট মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। আর এই মতানৈক্যের কারণেই আজ পর্যন্ত সন্ত্রাস এর সর্বসম্মত কোন পারিভাষিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক এষড়নধষ ঃবৎৎড়ৎরংস এর উপর প্রকাশিত ধহহঁধষ ৎবারবি ২০০০ এ বলা হয়েছে যে, ঘড় ড়হব ফবভরহধঃরড়হ ড়ভ ঃবৎৎড়ৎরংস যধং মধরহবফ ঁহরাবৎংধষ ধপপবঢ়ঃধহপব অর্থাৎ সন্ত্রাসের কোন সংজ্ঞা সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। “ঞযব এঁধফৎফরধহ ফধঃব:  ৭ গধু, ২০০১” প্রত্যেক মতবাদীরাই নিজ নিজ বিশ্বাস দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে সন্ত্রাসের সংজ্ঞা নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্র, দেশীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ সন্ত্রাসের সংজ্ঞায়নে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাস কেন্দ্রিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দুইটি প্রধান দর্শন। একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের সমন্বয়ে গঠিত পাশ্চাত্য দর্শন। অপরটি ইসলামী দর্শন। তাই সন্ত্রাস এর সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ উভয় দর্শন থেকে প্রদত্ত সংজ্ঞাসমূহ উল্লেখ করা হলো।
১। যায়েদ ইবনু মুহাম্মদ ইবনে হাদী আল-মাদখালী বলেন, ‘ইরহাব (সন্ত্রাস) এমন একটি শব্দ বিভিন্ন আঙ্গিকে যার অনেক অর্থ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে- নিরপরাধ অন্যায়ভাবে নির্দোষ মানুষকে ভয় দেখানো ও শঙ্কিত করা। কখনো নিরীহ ব্যক্তিবর্গকে হত্যার সীমাহীন ভীতি প্রদর্শন, সুরক্ষিত সম্পদ বিনষ্ট বা লুট, সধ্বী-সাধবী নারীর সম্ভ্রমহানি করা। “প্রফেসর ফাহাদ ইবনে ইবরাহীম আবুল উসারা, লামহাত আনিলি ইরহাবি ফিল আসরিল হাযির, সউদী আরব: জামি’আ আল-ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাউদ আল-ইসলামিয়্যাহ, ২০০৪, পৃ. ৫” ২। আল-মাওসূ’আহ আল-আরাবিয়্যাহ আল-‘আলামিয়্যাহ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ইরহাব (সন্ত্রাস) হচ্ছে ভীতি সঞ্চারের জন্য বল প্রয়োগ করা অথবা বল প্রয়োগের মাধ্যমে ভীতি প্রদর্শন করা। “আব্দুল আযীয ইবনে আব্দুল্লা, আল-ইরহাব আসবাবুহু ওয়া ওয়ায়িদুল ইলাজ, মাজাল্লাতুল বুহুছ আল-ইসলামিয়্যাহ, সউদী আরব: কেন্দ্রীয় দারুল ইফতা, ২০০৩ সংস্যা-৭০ পৃ. ১০৮-১০৯” ৩। রাবিত্বাতুল আলামিল ইসলাম’ পরিচালিত ‘ইসলামী ফিক্বহ কাউন্সিল’  ১৪২২ হিজরীতে মক্কায় অনুষ্ঠিত ১৬তম অধিবেশনে সন্ত্রাসের নিম্নোক্ত সংজ্ঞা নির্ধারণ করে, কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র কোন মানুষের ধর্ম, বুদ্ধিমত্তা, সম্পদ ও সম্মানের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে যে শত্র“তার চর্চা করে তাকে সন্ত্রাস বলে”। এ সংজ্ঞা সব ধরণের নীতিবহির্ভূত ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন, ক্ষতিসাধন, অন্যায় ও বিচার বহির্ভূত হত্যা, অপরাধমূলক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার লক্ষ্যে একক ও সমষ্টিগতভাবে পরিচালিত যে কোন ধরণের অন্যায় কর্ম, সশস্ত্র হামলা, চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, রাহাজানি, ভীতিকর ও হুমকিপূর্ণ কাজ এবং এবং লোকজনের জীবন, স্বাধীনতা, নিরাপত্তাকে বিঘিœত করে, জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে এমন কর্মকান্ডকে শামিল করে। তাছাড়া পরিবেশে বিপর্যয় সৃষ্টি, ব্যক্তিগত ও জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট বা প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করাও সন্ত্রাস হিসাবে গণ্য হবে। “প্রফেসর ফাহাদ ইবনে ইবরাহীম আবুল উসারা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫”। ৪। ১৯৮৯ সালে আরব দেশসমূহের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ প্রদত্ত সংজ্ঞা হচ্ছে- সহিংসতা সৃষ্টিকারী বা হুমকি-ধমকি প্রদানকারী এমন সব কাজ যা দ্বারা মানবমনে ভীতি-আতঙ্ক, ভয় ও ত্রাস সৃষ্টি হয়। তা হত্যাকান্ড, ছিনতাই, অপহরণ, গুপ্তহত্যা, পণবন্দী, বিমান ও নৌজাহাজ ছিনতাই বা বোমা বিস্ফোরণ প্রভৃতির যে কোনটির মাধ্যমে হোক না কেন। এছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংঘটিত যেসব কাজ ভীতিকর অবস্থা ও পরিবেশ, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে (তাও সন্ত্রাস)”। “ড. আব্দুর রহমান ইবনে মু’আল্লা আল-লুয়াইহিক, আল- ইরহাব ওয়াল-গুলু, জামি’আহ আল-ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সাউদ আল- ইসলামিয়্যাহ, ২০০৪, পৃ. ১৩” “৫. ইৎরঃধহহরপধ জঊঅউণ জঊঋঊঘঈঊ ঊঘঈণঈখঙচঊউওঅ তে সন্ত্রাস- এর সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ঞবৎৎড়ৎরংস ঃযব ংুংঃবসধঃরপ ঁংব ড়ভ ারড়ষবহপব ঃড় পৎবধঃব ধ মবহবৎধষ পষরসধঃব ড়ভ ভবধৎ রহ ধ ঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ ধহফ ঃযবৎবনু ঃড় নৎরহম ধনড়ঁঃ ধ ঢ়ধৎঃরপঁষধৎ ঢ়ড়ষরঃরপধষ ড়নলবপঃরাব. ইৎরঃধহহরপধ জঊঅউণ জঊঋঊজঊঘঈঊ ঊঘঈণঈখঙচঊউওঅ, ঘবি ফবষযর: ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ইৎরঃধহহরপধ (ওহফরধ) চাঃ. খঃফ ধহফ ওসঢ়ঁষংব গধৎশবঃরহম,) ঝঢ়বপরধষ বফরঃরড়হ ভড়ৎ ংড়ঁঃয অংরধ, ২০০৫, ঠড়ষঁসব- ৯, ঢ়. ২২৩”
একটি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য জনগণের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করার সুসংগঠিত পন্থাই হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ”। ৬. মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ঋইও সন্ত্রাসকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে, ঞযব ঁহষধভিঁষ ঁংব ভড়ৎপব ধহফ াধষবহপব ধমধরহংঃ ঢ়বৎংড়হং ড়ভ ঢ়ৎড়ঢ়বৎঃু ঃড় রহঃরসরফধঃব ড়ৎ পড়বৎপব ধ মড়াবৎহসবহঃ, ঃযব পরারষরধহ ঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ, ড়ৎ ধহু ংবমসবহঃ ঃযবৎবড়ভ, রহ ভঁৎঃযবৎধহপব ড়ভ ঢ়ড়ষরঃরপধষ ড়ভ ংড়পরধষ ড়নলবপঃরাবং (২৮. ঈ.ঋ.জ. ঝবপঃরড়হ ০.৮৫) িি.িভনর.মড়া/ংঃধঃং-ংবৎারপবং/ঢ়ঁনষরপধঃরড়হং/ ঃবৎৎড়ৎরংস-২০০২-২০০৫”
অর্থাৎ- সামাজিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে কোন সরকার, বেসকারি জনগণ বা অন্য যে কোন অংশকে ভীতি প্রদর্শন বা দমনের জন্য ব্যক্তিবর্গ বা সম্পদের উপর অবৈধ শক্তি প্রয়োগ বা সহিংস ব্যবহারকে সন্ত্রাস বলা হয়।
যে কর্মকান্ড সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, জান-মালের ক্ষতি সাধন, দেশ ও সমাজে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, শান্তি ও নিরাপত্তা ক্ষুণœ, স্থাপনা ও স্থাপত্য ধ্বংস এবং সর্বস্তরের নাগরিকদের আতঙ্কিত করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির সম্মুখীন করে তাকে বলা হয় সন্ত্রাস। মোটকথা যে কর্মকান্ড জনগণের মাঝে ভয়-ভীতি ও আতংকের সৃষ্টি করে এবং জানমালের ক্ষতি সাধন করে তাই সন্ত্রাস এবং যে বা যারা এ সকল কর্মকান্ডের সাথে জড়িত তারাই সন্ত্রাসী।
কোরআনে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ : ইসলামী আইনের প্রধান উৎস আল-কুরআনুল কারীমে সন্ত্রাস প্রসঙ্গ দুইভাবে এসেছে: শাব্দিক অর্থে ও পারিভাষিক অর্থে। সন্ত্রাস-এর আরবী প্রতিশব্দ ‘ইরহাব’ কে ভিত্তি ধরে শাব্দিক অর্থ হলো- প্রথমত: আল্লাহকে ভয় করা অর্থে এর শব্দমূলের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। যেমন: আল্লাহ বলেন: “মূসার ক্রোধ যখন প্রশমিত হলো তখন সেগুলো তুলে নিলো। যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে তাদের জন্য তাতে যা লিখিত ছিল মধ্যে ছিল পথনির্দেশ ও রহমত।” “আল-কুরআনুল,৭: ১৫৪” অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন: “হে বনী ইসরাঈল! আমার সেই অনুগ্রহকে তোমরা স্মরণ কর যা দ্বারা আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করেছি এবং আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করব। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।” “আল-কুরআনুল, ২: ৪০।” আল্লাহ অপর এক আয়াতে উল্লেখ আছে, “আল্লাহ বললেন, তোমরা দুই ইলাহ গ্রহণ কর না; তিনিই তো একমাত্র ইলাহ। সুতরাং আমাকেই ভয় কর”। “আল-কোরআন, ১৬: ৫১।”
দ্বিতীয়ত: মানুষকে ভয় দেখানো বা সন্ত্রাস করা অর্থেও ইরহাব (ইরহাব) শব্দের সরাসরি ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন: “তোমরা তাদের মোকাবেলার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখবে এর দ্বারা তোমরা সন্ত্রস্ত্র করবে আল্লাহর শত্র“কে, তোমাদের শত্র“কে এবং এ ছাড়া অন্যদেরকে যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ তাদেরকে শত্র“কে এবং এ ছাড়া অন্যদেরকে যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন। আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে দেয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।” “আল-কোরআন, ৮:৬০।”
সামান্য পরিবর্তিত ফর্মে শব্দটি ব্যবহার করে আল্লাহ অন্যত্র বলেন: “সে (মূসা) বলল, তোমরাই নিক্ষেপ কর। যখন তারা (যাদুকররা রজ্জু ও লাঠি) নিক্ষেপ করল তখন তারা লোকের চোখে জাদু করল, তাদেরকে আতংকিত করল এবং তারা এক রকমের জাদু দেখালো।” “আল-কোরআন, ৭: ১১৬।”
প্রচলিত অর্থে সন্ত্রাস বলতে যা বুঝায় তা প্রকাশের জন্য ইরহাব শব্দের ব্যবহার কোরআনে পাওয়া যায় না। সন্ত্রাস বা সন্ত্রাসী কার্যক্রম বুঝানোর জন্য কোরআনে ‘ফিতনাহ’ এবং ‘ফাসাদ’ শব্দদ্বয়ের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত সীরাত বিষয়ক উর্দু বিশ্বকোষ ‘নুকুশ’ এর বর্ণনা নিম্নরূপ; “পবিত্র কোরআন গভীরভাবে অধ্যয়ন ও গবেষণা করলে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানুষের জান-মাল, ইজ্জত-আব্র“, ঈমান, কায়-কারবার ইত্যাদি যার কারণে হুমকি ও বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয় তা-ই হলো ‘ফিতনা’ এবং যার কারণে মানুষের জীবনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, তা-ই হলো ‘ফাসাদ’।” “মো: মুখলেছুর রহমান, সন্ত্রাস নয়, শান্তি ও মহানুভবতার ধর্ম ইসলাম, ঢাকা: এন আরবি গ্র“প, ২০১১, পৃ. ১৫।”
আল-কোরআনে ‘ফিতনা’ প্রসঙ্গ : আল-কোরআনে ‘ফিতনা’ শব্দটি একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেসব আয়াতে ‘ফিতনা’ কে সন্ত্রাস কাছাকাছি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে তার কয়েকটি উদাহরণ নিম্নে প্রদত্ত হলো-
১। আল্লাহ অস্বীকার করা, তাঁর অংশীদার সাব্যস্ত করা, ইবাদতে বাধা প্রদান ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ফিতনার অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ বলেন, “পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে। বল, তাতে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা দান করা, আল্লাহকে অস্বীকার করা, মসজিদুল হারামে (প্রবেশে) বাধা দেয়া এবং তার বাসিন্দাকে তা হতে বহিষ্কার করা আল্লাহর নিকট তদপেক্ষা অধিক অন্যায়; ফিতনা (দাঙ্গা, বিশৃঙ্খলা, নির্যাতন) হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অন্যায়।” “আল-কোরআন, ২: ২১৭”
২। দুর্বলের উপর অত্যাচার করা, তাদের ন্যায্য অধিকার হরণ করা, তাদের ঘর-বাড়ি জবরদখল করা এবং তাদের বিভিন্ন পন্থায় কষ্ট দেয়াও ফিতনার আওতাভুক্ত। আল্লাহ বলেন: “যারা নির্যাতিত হওয়ার পর হিজরত করে, অতঃপর জিহাদ করে এবং ধৈর্য ধারণ করে, তোমার প্রতিপালক এসবের পর, তাদের প্রতি অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। “আল-কোরআন, ১৬:১১০।”
জবরদস্তিমূলক সত্যকে দমন করা এবং সত্যগ্রহণ থেকে মানুষকে বাধা দেয়। আল্লাহ বলেন: “ফির‘আউন ও তার পারিষদবর্গ নির্যাতন করবে এই আশংকায় মূসার সম্প্রদায়ের এক দল ব্যতীত আর কেউ তাঁর প্রতি ঈমান আনে নাই। বস্তুত ফির‘আওন ছিল দেশে পরাক্রমশালী এবং সে অবশ্যই সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত।” “আল-কোরআন, ১০: ৮৩।”
৪। মানুষকে বিভ্রান্ত করা, বিপথে চালিত করা এবং সত্যের বিরুদ্ধে প্রতারণা, ধোঁকা, বিশ্বাসঘাতকতা ও বল প্রয়োগের চেষ্টা করা। আল্লাহ বলেন: “আমি তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করেছি তা হতে তারা পদঙ্খলন ঘটানোর চেষ্টায় প্রায় চূড়ান্ত করেছিল যাতে তুমি আমার সম্বন্ধে তার বিপরীত মিথ্যা উদ্ভাবন কর; তবেই তারা অবশ্যই তোমাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতো”। “আল-কোরআন, ১৭: ৭৩।”
৫। বিশ্বাসীদের বিপদে ফেলা। আল্লাহ বলেন: “যারা বিশ্বাসী নর-নারীদেরকে বিপদাপন্ন করেছে এবং পরে তাওবা করেনি তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি, আছে দহন যন্ত্রণা”। “আল-কোরআন, ৮৫: ১০”
৬। অসত্যের প্রতিষ্ঠা, অসৎ ও অবৈধ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যুদ্ধ, হত্যা ও রক্তপাত করা। আল্লাহ বলেন: “যদি বিভিন্ন দিক হতে তাদের বিরুদ্ধে শত্র“দের প্রবেশ ঘটত, অতঃপর তাদেরকে বিদ্রোহের জন্য প্ররোচিত করা হতো, তবে তারা অবশ্য তাই করত, তারা এতে কালবিলম্ব করত না।” “আল-কোরআন, ৩৩: ১৪।” আল-কুরআনুল কারীমে ‘ফাসাদ’ শব্দটি বিভিন্ন আয়াতে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যে সব আয়াতে ‘ফাসাদ’ শব্দকে সন্ত্রাসের কাছাকাছি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে তার কয়েকটি উদাহরণ নিম্নে প্রদত্ত হলো।
১। অন্যায় শাসন ও হত্যাকান্ড, দুর্বলদের প্রতি অবিচার ও সম্পদ লুটপাট করা। আল-কোরআনে আল্লাহ ফির‘আউনকে ‘ফাসাদ’ সৃষ্টিকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ সে তার প্রজাদের মাঝে শ্রেণী ও বর্ণগত পার্থক্য সৃষ্টি করতো এবং স্বৈরাচারী শাসন চালাতো, দুর্বলদের ও বিরোধীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করতো এবং তাদের সম্পদ লুট করতো।
আল্লাহ বলেন: “ফিরআউন দেশে পরাক্রমশালী হয়েছিল এবং সেখানের অধিবাসীদেরকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে তাদের একটি শ্রেণীকে সে হীনবল করেছিল; তাদের পুত্রদেরকে সে হত্যা করত এবং নারীদেরকে জীবিত থাকতে দিত। সে তো ছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারী।” “আল-কোরআন, ২৮:৪” (চলবে)

 

ইতিহাস-ঐতিহ্যে বহমান জামেয়া

জুনাইদ কিয়ামপুরী

আজ থেকে চৌদ্দশো বছর পূর্বে স্কাইলাইটের আলোর মতো যে প্রক্ষেপ আছড়ে পড়েছিল পৃথিবীর আনাচে-কানাচে, মানবতার মুক্তি ও জীবনের অভিজ্ঞান নিয়ে। আমরা কতটুকু পেয়েছি এর উত্তরাধিকার? কীভাবে পেলাম এর গর্বিত বহনাধিকার? সে-এক বর্ণাঢ্য ইতিহাস বটে। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম হয় পৃথিবীর বরপুত্র সৃষ্টির সেরা মহামানব মোহাম্মদে আরবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। ৪০ বছর বয়সে লাভ করলেন নবুওতী পয়গাম। হেরার নির্জনগুহায় ধ্যানমগ্ন বিশ্বনবী ঘোষিত হলো “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল লাযি খালাক”; পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। শুরু হলো আসমানি পয়গাম নাযিলের সিলসিলা। সুদীর্ঘ ২৩ বছর চলল এই ধারাক্রম। পূর্ণাঙ্গ হলো শ্রেষ্ঠ জ্ঞানগ্রন্থ আল-কোরআন।
কোরআনী জ্ঞানের আলোকচ্ছটায় আলোকিত হলো একটি কাফেলাÑ নাম সাহাবায়ে কিরাম। আসমানী ইলমের প্রথম উত্তরাধিকারী হলেন তারাই। নবীজির শহর মদিনাতুল মুনাওয়ারায় গড়ে ওঠলো ইলমের মারকাজ। সাহাবায়ে কেরাম হলেন ইলমে নববীর একক উত্তরাধিকারী। সমস্ত সাহাবা যতটুকু ইলম ধারণ করলেন, প্রখর মেধাবী নবীজির ছয়জন সাহাবি একাই সেই ইলম ধারণ করলেন, এর মধ্যে প্রধান গণনীয় হলেন দুজন। একজন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ; অপরজন হজরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু। হজরত আলী এবং ইবনে মাসউদ প্রশাসনিক কাজে চলে এলেন কুফায়। কুফা নগরী হয়ে ওঠল ইলম চর্চার প্রধানকেন্দ্র। মদিনার ইলম স্থানান্তরিত হলো কুফায়, কুফা থেকে বাগদাদে। এভাবে বাগদাদ থেকে বোখারা, বোখারা থেকে সমরকন্দ, স্থান থেকে স্থানে, দেশ থেকে দেশান্তরে ইলমের মারকায স্থানান্তরিত হতে থাকে। ভারতে মদিনার ইলম বহু আগেই প্রবেশ করেছিল। মুসলিম মোঘল সম্রাটের সুবাদে মুসলিম মনীষীরা ইলমের অন্বেষায় গোটা বিশ্ব চষে বেড়িয়েছেন। মদিনা, ইয়ামেন, হিজায, বাগদাদ, বোখারা, সমরকন্দসহ বিভিন্ন দেশের শায়খদের কাছ থেকে ইলমের মণিমুক্তা আহরণ করে স্বদেশ আলোকিত করেছেন। মুজাদ্দিদে আলফে সানীর মাকতুবাত, শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভির তাসনীফাত, ফাতওয়ায়ে আলমগীরির সংকলন এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। ১১১৪ হিজরীতে জন্ম হয় শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভির। নিজের জ্ঞান মেধা ও সাধনার বদৌলতে স্বীকৃত হলেন ভারতের সেরা পণ্ডিত হিসেবে। মদিনার আলিম শায়খ আবু তাহির মাদানীর কাছ থেকে হাদীসের ইলম আহরণ করে ফিরে এলেন ভারতে। দিল্লী শহর পরিণত হলো ইলমের মারকাযে। দিল্লী মাদরাসার প্রধান শিক্ষক হিসেবে হাদীসের চর্চা ও গবেষণা শুরু করলেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র শাহ আব্দুল আজীজ দেহলভি পিতার পদে অধিষ্ঠিত হলেন। ইংরেজদের কালো থাবায় সেই ইলমচর্চা কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেল। নেমে এলো বর্বরতা, পাশবিকতার মর্মন্তুদ অবিচার। ১২৪৮ হিজরীতে জন্ম হলো হুজ্জাতুল ইসলাম ক্বাসিম নানুতভির। লর্ড ম্যাকেলের চ্যলেঞ্জ গ্রহণ করে ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করলেন দারুল উলূম দেওবন্দ। যেদিন দেওবন্দ মাদরাসার গোড়াপত্তন হলো; সেদিন দুনিয়ার মানচিত্র এক নতুন রঙে বিচিত্রিত হলো। ইতিহাসবিদ সেদিন রচনা করলেন দুনিয়ার ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। রহমতের ফিরিশতা সেদিন গোলামী ও অজ্ঞতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ মজলুম ভারতবাসীর কানে পৌঁছে দিলেন আজাদী ভ্রাতৃত্ব, আর সাম্যের মহা-পয়গাম। সময়ের ঘূর্ণনে, কালের পরিক্রমায় সেই দারুল উলূম আজ বিশ্ব কাঁপানো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সেই দারুল উলূম দেওবন্দের একজন কৃতি ছাত্র ছিলেন মাওলানা সহুল উসমানী ভাগলপুরী (রহ.)। ১৯১৭-১৮ সালের মাঝা-মাঝি সময়ে তিনি সরকারী আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতার সুবাদে সিলেটে আসেন। তখনকার সময়ে সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসা বিখ্যাত দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ছিল।
১৯১৩ সালের এক শুভক্ষণে সিলেট শহরের উপকন্ঠে কানিশাইল গ্রামে অনুষ্ঠিত তদানিন্তন সিলেট জেলার মুসলিম মৎসজীবী সমাজের এক সভায় উপস্থিত হয়ে বিশিষ্ট সমাজপতি ও শিক্ষাবিদ খান বাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ সি, আই, ই, (কাপ্তান মিয়া) হযরত শাহজালাল (রহ.) এর পবিত্র সিলেট নগরীতে একটি উচ্চাঙ্গের ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্যে অর্থ সাহায্যের আবেদন জানালেন, উপস্থিত ব্যবসায়ীগণ তাতে এমনভাবে সাড়া দিলেন যে, তাদের একদিনের চাঁদার টাকায়ই বিশাল মাদরাসা কম্পাউন্ড, টিনের অর্ধপাকাঘর দরজা পাঠকক্ষসমূহের জন্যে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র মসজিদ ও বিশাল খেলার মাঠের ইন্তেজাম হয়ে যায়। সৈয়দ আব্দুল মজিদ সাহেবের দৌহিত্র বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক আবু সালেহ রচিত ‘বিস্মৃত কাপ্তান’ পুস্তকে এর বিবরণ রয়েছে। খান বাহাদুর সাহেব ছিলেন আসামের শিক্ষামন্ত্রী, তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মাদরাসাটি পরিচালনার দায়িত্ব আসাম প্রদেশের সরকার গ্রহণ করে। ১৯৩৭ সালে শায়খুল উলামা আবু নসর ওহীদ যখন আসাম প্রদেশের শিক্ষামন্ত্রী, তখন তাঁর উদ্যোগে এ-মাদরাসায় টাইটেল ক্লাস খোলা হয়। সিলেটের অপর সমাজসেবী শেখঘাটের জিতু মিয়া সাহেব তাঁর পিতা মাওলানা আব্দুল কাদিরের নামে কাদেরিয়া বৃত্তি নামে একটি বৃত্তি চালু করেন। এভাবে গোটা উপমহাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানরূপে পূর্ণ একটি শতাব্দি ধরে এবং গোটা পূর্বভারতে ইসলামের আলো বিকিরণ করে চলে। গত শতাব্দির যে-সব পণ্ডিতাগ্রগণ্য ব্যক্তি এ মাদরাসায় অধ্যাপনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে মাওলানা সহুল উসমানী ভাগলপুরী, মাওলানা আব্দুল আজিজ পেশওয়ারী, মাওলানা শেরযামান হাজারভী, প্রিন্সিপাল রাহরুল উলূম মাওলানা মোহাম্মদ হুসাইন হুসাইন নিজপাঢী সিলেটি, ফখরুল মুহাদ্দিসিন মাওলানা ফৈয়াজ আলী (যিনি আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (র.) এর উস্তাদ) বিখ্যাত মানতেকি আলিম মাওলানা হাসান রেজা, ঢাকা আলিয়া মাদরাসার প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য সচিব মাওলানা ইয়াকুব শরিফ, বিখ্যাত আরবি কবি মাওলানা আব্দুল্লাহ নদভী, মাওলানা মোহাম্মদ মোশাহিদ বাইমপুরী (র.) সহ আরো অনেক। এ মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভ করে যারা খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ফখরে বাঙ্গাল মাওলানা তাজুল ইসলাম সাহেব, বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, বহুগ্রন্থপ্রণেতা, কোলকাতা আলিয়া মাদরাসার প্রাক্তন হেড মাওলানা, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রাক্তন সভাপতি, মাওলানা তাহির কোম্পানিগঞ্জী, আসাম প্রদেশ জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি ও আসাম প্রাদেশিক পরিষদের পাঁচবারের পার্লামেন্ট সদস্য হযরত মাওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী। আসাম শ্রেষ্ঠ ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র বাঁশকান্দি মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম মাওলানা আহমদ আলী, সিলেট শাহজালাল দরগাহ মসজিদের ৫৮ বছরের ইমাম ও খতিব এবং জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল, মাওলানা আকবর আলী (র.), বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও ঢাকা আলিয়া মাদরাসার প্রাক্তন অধ্যক্ষ, অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল মান্নান, দরগাহে হযরত শাহজালাল (র.) এর ভূতপূর্ব মুতাওয়াল্লী, বিশিষ্ট লেখক এ. জেড. আব্দুল্লাহ, বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য এনামুল হক চৌধুরী, সিলেট কাজির বাজার মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান, জেদ্দাস্থ ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের প্রাক্তন কন্সালট্যান্ট, বিখ্যাত লেখক গবেষক হাফিজ মাওলানা মুরতাহিনাবাল্লাহ জাসির, ইষ্ট লন্ডন জামে মসজিদের সাবেক ইমাম ও খতীব হাফিজ মাওলানা আবু সাঈদ, ঢাকা তিব্বিয়া কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা ইব্রাহিম আলী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক ষ্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ডক্টর আবু সাঈদ আব্দুল্লাহসহ অনেক খ্যাতিমান আলিম ও শিক্ষাবিদ এ মাদরাসা থেকে শিক্ষা অর্জন করেছেন। জ্ঞানের এই তীর্থ ভূমিতে মাওলানা সহুল উসমানীর সংযোগ ছিল একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। হাদিস ও ফেক্বাহ শাস্ত্রে এবং মাকুলাত বিষয়ের পাণ্ডিত্যে তখনকার বিদ্বৎসমাজে মাওলানা সহুল উসমানী ছিলেন প্রধান গণনীয় ব্যক্তি। ১৯১৭/১৮ সালের দিকে তিনি সিলেটে আসেন। কিন্তু সিলেটে তাঁর এই প্রথমবারের আগমন বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বছরখানেক সময় তিনি সিলেটে অবস্থান করেন। এই সামান্য সময়ের প্রচেষ্টায় সিলেটের সারস্বতসমাজে যে পরিবর্তন সূচিত হয়; তা রীতিমতো বিস্ময়কর। মাওলানা সহুল উসমানীর বিদ্যাভিলাষী মনোভাব আর গুণপনার কারণে সিলেটের শিক্ষিত সমাজ দলে-দলে তাঁর সান্নিধ্যে আসতে থাকেন। তাঁর উন্নত চরিত্র, অগাধ পাণ্ডিত্য, চুম্বকের মতো মানুষকে আকর্ষণ করতে থাকে। গোটা শহর ভেঙ্গে মধুমক্ষিকার মতো মানুষ ছুটে আসতে থাকে তাঁর দরবারে। সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি একজন জ্ঞানবোদ্ধা, পণ্ডিতপ্রবর, ধীমান কাণ্ডারী হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। সমাজের উচ্চ শিক্ষিত, ধর্মানুরাগী, সত্যসন্ধানী, সুধী ও কুশলিরা তাঁর চারপাশে জড়ো হতেন পরম মমতায়। মানুষের অফুরান শ্রদ্ধা আর অকৃত্রিম ভালোবাসায় তিনি এতই মুগ্ধ-মথিত হলেন যে, চাকুরির সুবাদে একাধিকবার সিলেটে আসতে তিনি সামান্যতম কুন্ঠা করেননি। সিলেটের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর হৃদয়ের গভীর টান তাঁকে বারবার এখানে আসতে প্রলুব্ধ করে। বছররাধিক কাল এখানে অধ্যাপনা করে যখন তিনি পাটনা যেতে চাইলেন, তখন প্রিন্সিপাল আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ সাহেব তাঁকে বারংবার বারণ করলেন, বললেন, ‘‘জনসাধারণ ক্রমান্বয়ে আপনার প্রতি আসক্ত হতে চলেছে। কিছুদিন পর গোটা আসাম আপনার পদতলে চলে আসবে। আপনি সিলেটে থেকে যান।’’ কিন্তু চাকুরিগত সুবিধা এবং পরিবারের সদস্যদের পীড়াপীড়ির কারণে তিনি সিলেট ছেড়ে পাটনা চলে যান। তাঁর চলে যাবার পর সিলেটবাসী হযরত মাদানী (র.) এর নিকট চিঠি লিখলেন, আমরা আপনার কাছে হাদিস পড়তে চাই। দয়া করে আপনি সিলেটে এসে আমাদের তৃষ্ণা নিবারণ করুন। যেহেতু হযরত মাদানী (র.) পূর্বে কখনো সিলেটে আসেননি; তাই হযরত মাওলানা সহুল উছমানী সাহেবের কাছে জানতে চাইলেন, সিলেট শহরটি কেমন? পরিবেশ কীরকম? মানুষের অবস্থা কী? উত্তরে মাওলানা সহুল উছমানী লিখলেন; “আমি যাবার পূর্বে সিলেটের অবস্থা ভালো ছিল না, সিলেটবাসী দেওবন্দি আলিমদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করতেন। আল্লাহর ফজলে এখন অবস্থা বিলকুল পাল্টে গেছে। পরিবেশ অনুকূল, জমিন উর্বর হয়ে আছে। আপনি গিয়ে বীজ বপন করুন।”
উত্তর পেয়ে হযরত মাদানী (র.) সিলেটে চলে এলেন। সিলেটে থাকাবস্থায় হযরত মাদানী (র.) এর ইলমি ঝরনাধারায় সিলেটের মাটি ও মানুষ যুগের পর যুগ সিক্ত হতে থাকে।
হযরত মাওলানা সহুল উসমানীর সাহচর্য যাদেরকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে, তারা হলেন: সৈয়দ জামিলুল হক সাহেব সৈয়দপুরী, প্রোফেসর মজদুদ্দিন সাহেব ফুলবাড়ী, বেগম সিরাজুন নেসা রশিদ চৌধুরী, মাস্টার তজম্মুল হুসাইন সাহেব, সৈয়দ নসীর আলী ডেপুটি কমিশনার, সৈয়দ তাফাজ্জাল হুসাইন (শিক্ষক, সিলেট আলীয়া মাদরাসা), মাওলানা লুতফুল হক চৌধুরী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সমাজের সাধারণ লোক ছাড়াও বিশেষ ব্যক্তিবর্গ মাওলানা সহুল উসমানীর সান্নিধ্যপ্রত্যাশী ছিলেন। বিশেষত: উকিল, বিচারক, ইংরেজী শিক্ষিত ও সমাজের উঁচু শ্রেণীর ব্যক্তিগণ তাঁর সান্নিধ্যপ্রার্থী ছিলেন। ফলে তিনি সর্বত্র ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রচারে ব্রতী হলেন। এ লক্ষ্যে তিনি দুটো কর্মসূচি গ্রহণ করলেন। প্রতি শুক্রবারে সুরমা নদীর তীরে ডাকবাংলার অপজিট পার্শ্বে শাহী মসজিদে একটি ইসলামি মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো, সে মাহফিলে হিন্দু মুসলমান সকলেই অংশগ্রহণ করতেন। মাওলানা সহুল উসমানী (র.) সে মাহফিলে উচ্চাঙ্গের বয়ান পেশ করতেন। প্রথমদিন আকিদা বিষয়ক আলোচনার দ্বারা মাহফিল শুরু করেন। বয়ান এতই জ্ঞানগর্ভ ছিল যে, কয়েক বৈঠকের পর মাওলানা আব্দুল মুসাওয়ির সাহেব যিনি সিলেটের প্রসিদ্ধ আলিম হিসেবে পরিচিত ছিলেন, বিস্ময়বিমুগ্ধ হয়ে বলে ওঠলেন, আকিদা কি জিনিস? সত্যিকার অর্থে আজ বুঝতে পারলাম, কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁর সে বয়ানগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়নি কিংবা সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। যদি সংরক্ষিত হতো, তবে আজ নতুন প্রজন্মের জন্যে তা জ্ঞানের অমূল্য রতœভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হতো। দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল, ঐতিহাসিক দরগাহ মসজিদে জিহাদ বিষয়ে আলোচনা করা। যেহেতু ইংরেজ রাজত্ব ছিল, তাই সিলেট আলীয়া মাদরাসায় কিতাবুল জিহাদ পড়ানো হত না। এ অধ্যায়টি পাঠ্যসূচির বাইরে ছিল। তিনি দরগাহ মসজিদে ফজরের নামাজের পর কিতাবুল জিহাদের দরস আরম্ভ করেন। মাদরাসা শিক্ষার্থী ছাত্র ছাড়াও সাধারণ শিক্ষিত, সুধীজনেরা এ দরসে উপস্থিত হতেন। মূলত এখান থেকেই জামেয়া প্রতিষ্ঠার সূচনা। এটা সেই সময়কার কথা, যখন সিলেট আলিয়া মাদরাসা সবেমাত্র কৈশোরকাল অতিক্রম করছে। আজ যে প্রতিষ্ঠান গোটা বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে তুলেছে সেই জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম মাদরাসাটি তখনও প্রতিষ্ঠা হয়নি। মাওলানা সহুল উসমানীর চতুর্পার্শ্বে বসে যারা জিহাদের  ফাযায়িল ও মাসায়িল শুনেছেন, দ্বীন সংরক্ষণের সবক নিয়েছেন, তাদের দ্বারা যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যে প্রেক্ষাপট গড়ে ওঠে, পরবর্তীতে এই প্রেক্ষাপটই মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক প্রমাণিত হয়। মূলত মাওলানা সহুল উসমানী দীর্ঘদিন পানি সেচ করে জমিনকে চাষাবাদ উপযোগী, উর্বর করে তুলেছিলেন, পরবর্তীতে তাঁর স্বহস্তে গড়া ছাত্র, মাওলানা আকবর আলী (র.) সেই জমিনে বীজ বপন করে এটিকে ফসলে-ফলনে ভরপুর করে তুলেন।
১৯৪৭ সালের সামান্য আগে মাওলানা সহুল উছমানীর পরামর্শে মাওলানা আকবার আলী রহ.-কে দরগাহ মসজিদের ইমাম নিয়োগ করা হয়। ইমামতির দায়িত্ব নেওয়ার কিছু দিন পর মাওলানা আকবর আলী রহ. তাঁর উস্তাদের অনুকরণে নামাজের পর মসজিদে দরসে কুরআন চালু করেন। তবে তা কেবল জিহাদের আয়াত ও হাদিসের ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখেন নি; কেননা জিহাদের সেই বিশেষ প্রেক্ষাপট এখন আর নেই। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠি অনেক আগেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এখন প্রয়োজন মুসলমানদের আত্মগঠন ও চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের, ধর্ম বিষয়ক গভীর জ্ঞান আহরণের, তাই তিনি দ্বীনি বিষয়ক বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যা মানুষের কাছে পেশ করতে লাগলেন। ক্বোরআনী আলোয় মানুষের হৃদয় যখন প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠল। মানুষের অন্তরে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রবিষ্ট হলো, তখন কুরআনপ্রেমিক জনতা একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার তাগিদ অনুভব করলেন। মানুষের স্বগত তামান্না পরিপূরণে ইমাম সাহেব ‘মাদরাসায়ে তালিমুল ক্বোরআন’ নামে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে সেই তালিমুল কুরআন প্রতিষ্ঠানটি ক্রমান্বয়ে বড় হতে হতে আজকের জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। জামেয়া যখন তার জাগরণী পয়গাম নিয়ে গোটা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছে, তখন জামেয়ার কিছু হিতাকাঙ্খী ভাইয়েরা অভিযোগের আঙুল তুলে বলছেন, জামেয়ার একাডেমিক ও প্রশাসনিক কারিকুলাম উন্নত বটে; তবে জিহাদের ব্যাপারে, বাতিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে জামেয়ার চিরায়ত নি®প্রভ ভূমিকা জামেয়ার সামুহিক উজ্জ্বলতাকে ম্লান করে রেখেছে। তাদের এমনতর অনুযোগের জবাবে আমরা বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই যে, জিহাদের মহান সবকের উপর ভিত্তি করে যে প্রতিষ্ঠানের পটভূমিকা তৈরি হয়েছে, জিহাদের সবক পঠন-পাঠনে যে জামেয়ার ভিত্তি রচিত হয়েছে, সেই জামেয়া জিহাদি তৎপরতায়, বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রামমুখরতায় নিস্তরঙ্গ থেকে যাবে, তা কেবল উন্নাসিকতাই নয় বরং তাঁর শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার নামান্তর। তালিম-তাবলিগ আল-জিহাদের মূলমন্ত্রে উজ্জ্বীবিত হয়ে জামেয়া আজও অগ্রসরমান। কে না জানে জামেয়ার তালিমি তারাক্কির কথা? কে অস্বীকার করবে এর তাবলিগি নেজামের কথা? আর জিহাদ? বারুদের উত্তাপকে অস্বীকার করা যেতে পারে, এটমের বিস্ফোরণ অগ্রাহ্য করা যেতে পারে কিন্তু জামেয়ার জিহাদি জাগরণ কখনো অস্বীকার করা যাবে না। জামেয়ার জন্মলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত যত খালিস ইসলামি আন্দোলন হয়েছে, বাতিলের বিরুদ্ধে যত অরাজনৈতিক সংগ্রাম হয়েছে, তাতে জামেয়া কেবল অংশগ্রহণই করেনি; বরং সম্মুখপানে নেতৃত্ব দিয়েছে। অতীত তার প্রমাণ। সেই চেতনা আজও বহমান। নিম্নে এর কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি।
এক. জামেয়ার একজন শায়খুল হাদিস ছিলেন মাওলানা আব্দুল হান্নান (র.)। ১৯৭৩ ঈসায়ীতে তিনি জামেয়ার মুফতি হিসেবে যোগদান করেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন ইসলামি আন্দোলনের সংগ্রামী নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিরক-বিদাত রিজভি ফিতনার সফল মোকাবিলা করেছেন। তর্কযুদ্ধ বা মুনাজারার চ্যালেঞ্জে বেদাতিরা যতবারই মোকাবিলার দুঃসাহস দেখিয়েছে, ততবারই তাদের পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। ১২ ফেব্র“য়ারী ১৯৭৬ ঈসায়ী মোতাবেক ৪ঠা চৈত্র হবিগঞ্জ জেলার আজমিরিগঞ্জের শিবপাশা গ্রামের বিতর্ক সভা থেকে রেজভিদের পলায়ন এরই উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
১৯৭৬ ঈসায়ীতে নরওয়েজীয় গির্জার পক্ষ থেকে উচ্চ শিক্ষিত ছোট একটি খ্রিস্টধর্ম প্রচারক দল বিভিন্ন কলেজে “বর্তমান খ্রিস্টধর্ম সঠিক, ইসলাম মিথ্যা, মুহাম্মদ ভণ্ড” (নাউযুবিল্লাহ) ইত্যাদি শ্লোগান প্রচার করতে থাকে। এক পর্যায়ে সিলেটের এম. সি কলেজে এসব প্রচারকালে কলেজের প্রফেসর বিখ্যাত কবি আফজাল চৌধুরীর সঙ্গে দুটি ধর্মের সত্যতা নিরূপণের জন্যে তারা তর্কযুদ্ধের সম্মতি জ্ঞাপন করে। কবি সাহেব তর্কযুদ্ধের জন্য সিলেটের আলিমগণের শরণাপন্ন হন। শ্রদ্ধেয় আলিমগণ সর্বসম্মতিক্রমে তর্কবিদ হিসেবে মুফতি আব্দুল হান্নান (রহ.)-কে মনোনীত করেন। নির্ধারিত  তারিখে নয়াসড়ক গির্জায় বিতর্ক শুরু হয়, সন্ধ্যালগ্ন থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত মুফতি আব্দুল হান্নান (রহ.) বিতর্ক যুদ্ধ চালিয়ে যান, (দুভাষী হিসেবে কবি আফজাল চৌধুরী সাহায্য করেন) যুক্তি ও প্রামাণ্য দলিল দ্বারা ইসলামের সত্যতা ও বর্তমান খ্রিস্টধর্মের ভ্রান্ততা প্রমাণিত ও ঘোষিত হতে থাকে। ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ ধর্ম প্রচারকগণ নিরুত্তর হয়ে এই বলে সভা মুলতবী ঘোষণা করে যে, আরো বর্ধিত পরিসরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে বড় আকারের বিতর্ক সভা অনুষ্ঠিত হবে। মুফতি সাহেব ও অধ্যাপক সাহেব সাদরে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। দিন তারিখ নির্দিষ্ট হয়, স্থান নির্ধারিত হয় প্রাক্তন জিন্নাহ হল বর্তমান কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে। কিন্তু পরে পাদ্রীগণ তাদের প্রস্তাবিত বিতর্কসভায় অংশগ্রহণে টালবাহানা শুরু করে। ফলে আর বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়নি। এই ঘটনার পর বৃহত্তর সিলেটে আজ পর্যন্ত পাদ্রীরা তর্কযুদ্ধ বা মুনাজারার সাহস দেখায়নি”।
দুই. জামেয়ার আরেক শায়খুল হাদীস খতীব মাওলানা উবায়দুল হক (রহ.)। গোটা বাংলাদেশ কাঁপানো বীরকন্ঠ। খতমে নবুওয়ত বা কাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবোন্মুখ জনতার প্রধান রাহবর ছিলেন তিনি। বিশ্বনবীর ব্যঙ্গকার্টুন অঙ্কনকারী বেয়াদব সাংবাদিক তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে জনতার ক্ষোভানল থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
তিন. মাওলানা আব্দুল বাসিত বরকতপুরী। জামেয়ার সাবেক মুহাদ্দিস। দরগাহ মাদরাসায় থাকাকালীন তিনি ক্বোরআনী আইন সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি ছিলেন। নারীনীতি বিরোধী আন্দোলন, ফাতওয়া বিরোধী আন্দোলনে তাঁর সাহসী নেতৃত্ব গোটা আলিমসমাজকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিল। সিলেট সিটি পয়েন্টে ৫০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটিয়েছিলেন তিনি।
চার. মাওলানা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী। জামেয়ার বর্তমান শায়খুল হাদীস ও সদর মুদারিরস। ব্লগে মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর প্রতিবাদে বিশ্বকাঁপানো যে আন্দোলন রচিত হয়, মাওলানা মুহিব্বুল হক সেই আন্দোলনের সিলেট জেলার আমীর পদে সমাসীন।
পাঁচ. মুফতি আবুল কালাম জাকারিয়া। জামেয়ার কীর্তিমান ফাযিল। বিরল প্রতিভাধর আলিম। জামেয়ার বর্তমান কর্ণধার ও মুহতামিম। খ্রিস্টবাদের বিরুদ্ধে বই লিখেছেন। বাতিলের মুখোশ উন্মোচন করে সত্যের আলো প্রকাশ করেছেন। মিডিয়ার অশুভ প্রচারণায় মাযহাব যখন সন্ধিগ্ধ, ইমাম আবু হানিফা রহ.’র যথার্থ উত্তরসূরী হিসেবে একাই এক মিছিল হয়ে লড়ে যাচ্ছেন।
মোট কথা, ইসলাম ও মুসলমান যখনই আক্রান্ত হয়েছে, নিরপেক্ষ-নির্ভেজাল ইসলামী আন্দোলনের ডাক এসেছে, শাহজালালের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে জামেয়ার সন্তানরা সেই আন্দেলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে সামান্যতম পিছপা হয়নি। তবে হ্যা! যে আন্দোলন রাজনীতির গ্যাড়াকলে সন্ধিগ্ধ হয়েছে; কিংবা স্বার্থসিদ্ধির সংক্রমণে সংক্রমিত হয়েছে। সেই আন্দোলন থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেওয়া জামেয়া  শ্রেয় মনে করেছে।
যে ভাবে প্রতিষ্ঠা হলো জামেয়া:
আরবের বুকে যখন ইসলামের প্রথম সূর্য উদিত হয়, তখন ইসলামের নব প্রভাতের মৃদু সমীরণের পরশ নিতে আবালবৃদ্ধবনিতা রাসুলে আকরাম (স.)-এর দরবারে পঙ্গপালের মতো ছুটে আসতে থাকেন। রহমতে দু-জাহান রাসুলুলল্লাহ (স.) আল্লাহ প্রদত্ত ইলমের অমীয়সুধা তৃষ্ণার্থ সাহাবাগণের মাঝে বিলিয়ে দিতে থাকেন। গঠিত হয় ‘আসহাবে সুফফার’ মাদরাসা। হুবহু এরই যেনো পুনরাবৃত্তি ঘটল এই জামেয়ার বেলায়। জাহেলিয়্যাতের ঘনঘোর অন্ধকারে আবদ্ধ মুক্তিকামী মানুষ যখন দ্বীনের সুশীতল হাওয়ায় নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য উদগ্রীব। তখন মুক্তির দিশারী আরিফবিল্লাহ হজরত মাওলানা আকবর আলী (র.) ইলমেওহির জ্ঞান মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে মনস্থ করেন। হজরত ইমাম সাহেব নামাজের পর মুসল্লিদের ‘তরজমায়ে কোরআন’ শুনানো শুরু করেন। মুসল্লিদের মধ্যে প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। বয়স্ক ও বালক বালিকারা ইসলামি শিক্ষা গ্রহণের জন্য ইমাম সাহেবের খেদমতে জড়ো হতে থাকেন, ক্রমান্বয়ে মেট্রিকের ছাত্ররাও তাঁর কাছে কোরআন শরিফ পড়া আরম্ভ করে। দরগাহ মহল্লার মানুষের চাহিদা ও আগ্রহে শিশু কিশোররাও আসতে থাকে দ্বীনের সার্বিক জ্ঞান আহরণের জন্য। এভাবেই চলতে থাকে দীর্ঘদিন।
অতঃপর যখন খলিফায়ে হাকিমুল উম্মত, মুফতিয়ে আজম, মুফতি শফি (রহ.) সিলেট সফরে আগমন করেন। তখন হজরত ইমাম সাহেবকে একটি মক্তব বা মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শ ও প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘আরিফ বিল্লাহ রাহবরে তরিকত ইমাম আকবর আলী (রহ.) মাজারের দক্ষিণপার্শ্বে ১৯৬১ সনের ৭ নভেম্বর মোতাবেক ১৩৮১ হিজরির ১৮ জামাদাউল উলা একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। নাম দেন ‘মাদরাসায়ে তালিমুল কোরআন দরগাহে হজরত শাহজালাল (র.)’। যা আজকের এই জামেয়া। তালিম তাবলিগের গুরুদায়িত্বে নিয়োজিত মুসলিম উম্মাহর সেরা সন্তান ইমাম আকবর আলী (র.) তাঁর নিষ্ঠাপূর্ণ অক্লান্ত পরিশ্রমের বদৌলতেই সেদিনকার সেই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানটি আজ তাঁর মিশন নিয়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়েছে। কালের ঝুড়ি থেকে পঞ্চান্নটি বসন্ত ঝরে পড়েছে। হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে অনেক বন্ধুর পথ মাড়িয়ে আজ বহু দূর এগিয়ে এসেছে এই জামেয়া। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বহুদেশে পৌঁছে গেছে তাঁর জাগরণী পয়গাম। বলতে দ্বিধা নেই ‘জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম’ কোনও গতানুগতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, একটি দ্বীনি আন্দোলন। একটি নীরব বিপ্লব। এ ক্ষুদ্র পরিসরে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়। কয়েকটি মূল পয়েন্টের ওপর অতি সংক্ষেপে আলোকপাত করার প্রয়াস পাবো ইনশা আল্লাহ।
জামেয়া প্রতিষ্ঠায় যারা সার্বিক সহযোগিতা করেন:
পৃথিবীর বুকে যে কোনও প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পেছনে কারও সহযোগিতা, কারও অবদান থাকে, তেমনই এই জামেয়া প্রতিষ্ঠার পেছনেও একদল নিবেদিতপ্রাণ নিরলস কর্মবীর মানুষের অবদান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে যারা সর্বাগ্রে, তারা হলেন সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসার সুপারিনটেনডেন্ট হাজি আরশাদ আলী সাহেব ও তাঁর ছাত্র দরগাহ শরিফের প্রাক্তন প্রভাবশালী মুতাওয়াল্লি এ জেড আব্দুল্লাহ সাহেব ও দরগাহ মসজিদের প্রাক্তন ইমাম ছাঈদ আলী কাছারী সাহেব। হাজী আরশাদ আলী সাহেবের সুপারিশে সরেকওম এ জেড আবদুল্লাহ সাহেব মাদরাসার জায়গা করে দেন। তাঁদের নাম অনুচ্চারণে জামেয়ার ইতিহাস রচনা অলিক কল্পনা বৈ কিছু নয়।
জামেয়ার নাম প্রসঙ্গ:
জামেয়ার প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল ‘মাদরাসায়ে তালিমুল কোরআন দরগাহে হজরত শাহজালাল (রহ.) সিলেট’। জামেয়া প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আর পশ্চাতে ফিরে তাকাতে হয়নি। যদিও এটা সত্য যে, প্রত্যেক উৎকৃষ্ট কাজের সূচনাতে বাধা-বিপত্তির উদ্ভব ঘটে। এ সব প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতা, চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে অগ্রসর হতে হয়। তেমনই এই জামেয়াও প্রতিকূলতার হিমালয় ডিঙিয়ে অনেক বাধার বিয়াবান পেরিয়ে ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হতে থাকে তাঁর লক্ষ্যপানে। জামেয়ার এই উন্নততর রূপ শিক্ষার সফলতা ও ব্যাপকতার কারণে প্রয়োজন পড়ে নাম পরিবর্তনের। অতঃপর ১৯৭৫ ঈসায়ী সনে যখন খলিফায়ে থানভী ক্বারী তৈয়্যিব (রহ.) সিলেট আগমন করেন। তখন তিনি রাসুলে করিম (স.)-এর হাদিস : ‘ইন্নামা আনা ক্বাসিমুন ওয়াল্লাহু ইউতি’ অর্থাৎ আমি হলাম জ্ঞান বিতরণকারী আর মহান আল্লাহ হলেন এর দাতা, এর দিকে লক্ষ্য রেখে এর নাম রাখেন মাদরাসায়ে ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ হজরত শাহজালাল (রহ.)। এর আরও কিছুদিন পরে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হলে মাদরাসা শব্দের স্থলে ‘জামেয়া’ শব্দ সংযোজন করা হয়।
লেখক : শিক্ষক, জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ, রাইটার এন্ড টকার বাংলাদেশ বেতার সিলেট।

জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ হযরত শাহজালাল (রহ.)

মুফতি আবুল কালাম যাকারিয়া

সিলেট দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী। গুণীজনের দেয়া এই উপাধির যথার্থতা সর্ব মহলেই স্বীকৃত। ওলীকুল শিরোমণী হযরত শাহজালাল (রহ.) ইসলাম প্রচারের মিশন নিয়ে সুদূর ইয়ামন থেকে সিলেটে আসেন। সেই থেকে সিলেট এই পরিচয়ে পরিচিত। কালের ঘূর্ণনে সময়ের পরিবর্তনে এখানে ইসলাম ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে। সুরমার শ্যামল তটে গড়ে ওঠে ইলমের পতাকাবাহী একাধিক প্রতিষ্ঠান। বিদ্ব্যানপ্রবর বুযুর্গদের প্রচেষ্টায় সিলেট হয়ে ওঠে ইসলামি শিক্ষার তীর্থভূমি। মহান আল্লাহর অশেষ রহমত বর্ষিত হয় এখানে। জন্ম নেন সময়ের সাহসী সন্তানেরা। আধ্যাত্ম্যচিন্তার আলোকোজ্জ্বল পুরুষেরা। সেই আলোক কাফেলার এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের নাম আরিফ বিল্লাহ আকবর আলী (রহ.)।
মাওলানা আকবর আলী (রহ.) শিক্ষাজীবন শেষে প্রবেশ করেন কর্মজীবনে। ১৯৪৭ ঈসায়ীতে তিনি দরগাহ মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হন। আরিফ বিল্লাহ মাওলানা আকবর আলী (রহ.) ইমামতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নামাযের পর মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে কোরআনের দরস চালু করেন। এ দরসে অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুসল্লিদের অন্তরে দ্বীন শেখার ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। মহল্লার ছোট-বড় অনেকেই ইলমে দ্বীন শিক্ষার জন্যে মসজিদে এসে ভিড় জমান। আরিফ বিল্লাহ মাওলানা আকরব আলী (রহ.) মানুষের ঔৎসুক্য দেখে এখানে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার বিষয় নীরবে নিভৃতে ভাবতে থাকেন। ইত্যবসরে তাঁর উস্তাদ মুফতি আজম মুফতি শফি (রহ.) সিলেট সফরে এলে মাওলানা আকবর আলী (রহ.)-কে দরগাহ সংলগ্ন এলাকায় একটি মাদারাসা প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়ে বলেন ‘ভাই! এখানে ব্যাপক বরকত অনুভূত হচ্ছে’ ‘তাই এখানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করুন’। প্রাণপ্রিয় উস্তাদের পরামর্শে ও নিজের চিন্তার আলোকে ইমাম সাহেব রহ. ২৭ জুমাদাল ঊলা ১৩৮১ হিজরী মোতাবেক ৭ নভেম্বর ১৯৬১ ঈসায়ী সনে হযরত শাহজালাল (রহ.) মসজিদের পাশে একটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এ প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয় “মাদরাসায়ে তা’লিমুল কোরআন”। ১৯৭৪ ঈসায়ী সনে যখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সর্বোচ্চস্তর ‘তাকমীল ফিল হাদিস’ খোলা হয়, তখন প্রয়োজন হয় নাম পরিবর্তনের। ১৯৭৫ ঈসায়ীতে ইমাম সাহেবের মুর্শিদ ক্বারি তায়্যিব (রহ.) সিলেটে আগমন করেন। মাদরাসার ব্যাপক উন্নতি অবলোকন করে তিনি হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাল্লাম অর্থাৎ- ‘আমি হলাম ইলমের বণ্টনকারী আর মহান আল্লাহ হলেন এর দাতা’-এর আলোকে মাদারাসার নাম ‘ক্বাসিমুল উলূম’ নামকরণের প্রস্তাব করেন, যা পরবর্তীতে ২৮.০৫.১৩৯৫ হিজরী মোতাবেক ১১.০৫.১৯৭৫ ঈসায়ী তারিখে অনুষ্ঠিত মজলিসে আমেলায় গৃহীত হয় এবং মাদরাসার গঠনতন্ত্রে নামটি পুনসংযোজন করা হয়। পরে মাদরাসার ব্যাপকতর উন্নতি সাধিত হলে ‘ক্বাসিমুল উলূম’ নামের সঙ্গে ‘জামেয়া’ শব্দটি সংযোজন করা হয়।
জামেয়ার কিছু বৈশিষ্ট্য :
১। লেখা-পড়ার মান: আরিফ বিল্লাহ মাওলানা আকবর আলী (রহ.)-এর দর্শন ছিলো, যে প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত ছাত্র রাজনীতির চর্চা হয়, সেখানে উচ্চতর লেখা-পড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানকে শতভাগ রাজনীতিমুক্ত মাদারাসা হিসেবে গড়ে তোলেন। শতব্যস্ততার ফাঁকেও তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকতো লেখাপড়ার দিকে। লেখাপড়ার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিতকরণে তাঁর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ছিলো সত্যিই অতুলনীয়। জীবন সায়াহ্নে উপনীত হয়েও তিনি ভুলে যাননি ছাত্রদের তা’লিম-তরবিয়্যতের কথা; মাঝেমধ্যে আকস্মিকভাবেই চলে যেতেন বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে। ছাত্রদের প্রশ্ন করতেন নানা বিষয়ে। লেখা-পড়ার মান উন্নয়নের প্রতি তাঁর আন্তরিক দৃষ্টি আর সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দের অক্লান্ত পরিশ্রমে জামেয়া একটি উচ্চতর অবস্থানে চলে আসে।
শিক্ষকমণ্ডলীর উন্নত পাঠদান প্রক্রিয়া, নির্ধারিত সিলেবাস নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করণের বাধ্যবাধকতা জামেয়ার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যই জামেয়াকে সামনে এগিয়ে নেয় দ্রুতগতিতে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের সাথে সাথে ছাত্রদের মধ্যে যোগ্যতা তৈরির দিকটিও অর্জিত হয় এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই।
আলহামদু লিল্লাহ! জামেয়ার উন্নতমানের লেখা-পড়ার কারণে প্রতিবছরই ভর্তি পরীক্ষায় ছাত্রদের উপচে পড়া ভিড় লেগেই থাকে। কিন্তু আবাসিক সংকটের দরুন অনেক যোগ্য ছাত্রই ভর্তির সুযোগ পায় না।
২। শিক্ষা বিভাগ ও পাঠ্যসূচী: সাবাহী মক্তব (প্রাইমারী) বিভাগ, হিফজ বিভাগ, সাধারণ বিভাগ ও তাখ্সসুস ফিল ফিক্বহ ওয়াল ইফতা (ইসলামী আইন) বিভাগে শিক্ষাবোর্ডের নির্ধারিত পাঠ্যসূচীর পাশাপাশি জামেয়ার স্বতন্ত্র সিলেবাসে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যুগ চাহিদা পূরণে বাংলা সাহিত্য, ইংরেজী, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, অর্থনীতি, পৌরনীতিসহ ফেরাকে বাতেলার খণ্ডনে বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থ উপযুক্ত ক্লাসে নেসাবের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সতর্ক তত্ত্বাবধান: শিক্ষার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নীতি নৈতিকতা ও মানবিকতার লালন ও বিকাশ সাধন। শিক্ষা গ্রহণের পর ব্যক্তি জীবনে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে শিক্ষার কোনো ফলাফল আসে না। তাই জামেয়া তার সন্তানদের শিক্ষার সাথে নৈতিক মূল্যবোধের লালন ও বিকাশে মগ্ন থাকতে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ইলমের সাথে আমলের সমন্বয় ঘটাতে সর্বোচ্চ সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয় প্রতিটি ছাত্রের ওপর। নিয়মিত স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় উত্তম চরিত্র ও গুণাবলির কথা। আকাবির আসলাফের আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলার তরবিয়াত দেয়া হয় বিভিন্ন উপায়ে।
৪। সাপ্তাহিক আলোচনা সভা: ছাত্রদের মেধা বিকাশের জন্য জামেয়া বহুমুখী কর্মসূচী পালন করে থাকে। বাকশক্তি বিকাশে প্রতি বৃহস্পতিবার চারটি গ্র“পে বক্তৃতাচর্চার অনুষ্ঠান হয়। উস্তাদদের সক্রিয় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় সাপ্তাহিক বক্তৃতা শিক্ষা কর্মসূচি। বলার অপেক্ষা রাখে না, মাতৃভাষা বাংলা আমাদের প্রাণের ভাষা। ইসলামের দাওয়াত সর্বশ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এ ভাষায় দক্ষ হওয়া অপরিহার্য। এ-গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রতি সপ্তায় সাহিত্য আসর অনুষ্ঠিত হয়। একজন উস্তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় এই আসর। যেখানে লেখালেখির নিয়ম, বানানরীতি সাহিত্য সমালোচনাসহ নানা বিষয়ে অনুশীলন হয়। সেসব আসর একত্র করে ‘শাণিত কলম’ নামে একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। আলহামদু লিল্লাহ! জামেয়ার এমন কর্মসূচি ছাত্রদের মেধা বিকাশে ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করছে।
৫। আরিফ বিল্লাহ আকবর আলী পাঠাগার: প্রাজ্ঞ আলেম হওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় প্রচুর পড়া-শুনার। নির্ধারিত পাঠ্য কিতাব-গ্রন্থাদির বাইরে রয়েছে জ্ঞানের অকূল দরিয়া। তাই জামেয়া বিভিন্ন উপায়ে ছাত্রদের কাছরাতে মুতালাআ বা প্রচুর পাঠাভ্যাসে উৎসাহ দিয়ে থাকে। আর এ জন্য জামেয়া ছাত্রদের জন্য “আরিফ বিল্লাহ আকবর আলী (রহ.) পাঠাগার” নামে একটি পৃথক পাঠাগারের ব্যবস্থা করেছে। এখানে জামেয়ার ছাত্ররা নির্ধারিত বিভিন্ন বিষয়ের গ্রন্থাদি ও পত্র-পত্রিকা পাঠ করে নিজেদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করে থাকে।
৬. কম্পিউটার প্রশিক্ষণ: তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে কম্পিউটার মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠেছে। শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা ও বাণিজ্য, দাওয়াতের প্রচার-প্রসারসহ অনেক ক্রিয়াকর্মে কম্পিউটারের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ইসলামের প্রচার প্রসারে ইন্টারনেট এখন একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তাই জামেয়া ছাত্রদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণের জন্য ‘কম্পিউটার বিভাগ’ চালু করেছে। এখানে ছাত্ররা নির্ধারিত সময়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কম্পিউটারের প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে।
৭। প্রকাশনা: অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে লিখনীর গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম বিরোধী দেশী-বিদেশী নানাচক্র প্রতিনিয়ত আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার চালাচ্ছে। তথ্যসন্ত্রাসের মাধ্যমে মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করার অশুভ পাঁয়তারা চলছে অহরহ। ইসলাম ও মিল্লাতের ওপর আরোপিত জঘন্য মিথ্যাচার আর প্রপাগাণ্ডার মোকাবিলার জন্য কলমী আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। ইসলামের সৌন্দর্যগুলো গণমানুষের কাছে তোলে ধরতে বই-পুস্তক, ম্যাগাজিন পত্র-পত্রিকা বরাবরই ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে থাকে। লেখা-লেখির অপরিসীম গুরুত্ব বিবেচনায় জামেয়া ক্বাসিমুল ঊলূম দীর্ঘদিন থেকে অনিয়মিতভাবে ‘মাসিক আল-ক্বাসিম’ প্রকাশ করে আসছে। এখন থেকে ইনশা আল্লাহ নিয়মিতভাবে মাসিক আল-ক্বাসিম প্রকাশিত হবে।
৮। অডিট ব্যবস্থা:  গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত অডিট টিম দ্বারা প্রতি বছর জামেয়ার আয়-ব্যয়ের হিসাব অডিট করানো হয়।
জামেয়ার অবদান :
নীতি-নৈতিকতার বিশাল ঘাটতি আজ আমাদের চারপাশ কলুষিত করছে। বর্তমানের চিত্র উদ্বেগজনক পর্যায়ে অবস্থান করছে। খুন, সন্ত্রাস আর নৈরাজ্যের কবলে পড়ে দেশের শান্তিকামী মানুষ অস্থির সময় পার করছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে আইন শৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনী।
দেশের এমন পরিস্থিতিতে বরাবরই বার্তা বাহকের ভূমিকায় থাকেন দেশের সম্মানিত আলেম সমাজ। দেশের সংকটময় যে কোনো মুহূর্তে ওলামায়ে কেরামই সঠিক দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। এই আলেম সমাজের কারণেই দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটা ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ বিরাজমান থাকে। জাতির কাণ্ডারি আলেম তৈরির কারখানা হচ্ছে কওমী মাদরাসা। কওমী মাদরাসা থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত একজন আলেম কখনও ডাকাত, সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গি হয় না। কওমী মাদরাসাগুলোতে কখনও অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনা যায় না। এদেশের সিংহভাগ সুনাগরিক তৈরি হয় কওমী মাদরাসা থেকেই।
আপনাদের জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম দরগাহ হযরত শাহজালাল (রহ.) সুনাগরিক সৃষ্টিতে অসামান্য অবদান রাখছে। এখান থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত আলেমগণ দেশ জাতি ও ইসলামের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন। জামেয়ার ফাযিলগণ সমাজের বিভিন্ন স্তরে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে চলেছেন। এ পর্যন্ত এ জামেয়া থেকে ১৪৩০ জন শিক্ষাসমাপনকারী আলেম ও ৮৬ জন মুফতি ইসলামি আইন ও গবেষণা কোর্স সম্পন্ন করে পেশাগত বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত আছেন। জামেয়ার বিস্তারিত অবদান এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে বর্ণনা করার সুযোগ নেই। সংক্ষেপে এতটুকু বলতে চাই; জামেয়া ক্বাসিমুল উলূম এ পর্যন্ত শত শত বিজ্ঞ আলেমে দ্বীন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। মুহাদ্দিস, মুফতি, মুফাসসির ও দক্ষ শিক্ষকের সংখ্যা মাশা আল্লাহ সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। দেশের শত শত মাদরাসায় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন আছেন জামেয়ার সন্তনেরা। শতাধিক আলিম রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছেন। জামেয়ার ফাযিলদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ রচনা সংকলন, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার কাজে নিয়োজিত থেকে সর্ব সাধারণের দোরগোড়ায় ইসলামের বাণী পৌঁছে দিচ্ছেন।
কওমী মাদরাসা শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য: আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে তিনটি ধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। ১. সাধারণ শিক্ষা ২. সরকারি মাদারাসা শিক্ষা ৩. কওমী মাদারাসা শিক্ষা।
কওমী মাদারাসা শিক্ষাব্যবস্থা একটি ঐহিত্যবাহী শিক্ষাধারা। প্রায় দেড় হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত এ শিক্ষাব্যবস্থা যুগে যুগে মানুষকে চিরস্থায়ী কল্যাণের দিকে আহবান করে আসছে। এ শিক্ষাধারা মানুষকে নীতি নৈতিকতার পাঠ শেখায়। দেশ জাতি রাষ্ট্র ও ধর্মের কল্যাণমুখী অগ্রযাত্রাই এর প্রতিপাদ্য বিষয়। কওমী মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি কোরআন-হাদিস এবং পরিপূর্ণ দ্বীনের সার্বিক বিষয়বস্তু এর পাঠ্যসূচী। বৈষয়িক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও এর পাঠ্যক্রমের অর্ন্তভুক্ত থাকে। তাই সংগত কারণেই কওমী মাদারাসা তাদের নিজস্ব ধারায় চলে। স্বকীয়তা স্বাতন্ত্র্য ধারণ করেই শিক্ষা-দীক্ষার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এ মাদরাসাগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে কওমী মাদারাসা শিক্ষায় সরকারি স্বীকৃতি নিয়ে খোদ কওমী অঙ্গনেই পক্ষে বিপক্ষে মতামত রয়েছে। যুক্তি রয়েছে উভয় পক্ষেরই। এ ব্যাপারে শুরু থেকেই কওমী মাদারাসার নেতৃত্ব থেকে যে বক্তব্যটুকু আসছে, তা হলো সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বীকৃতি। এই দাবিটুকু সরকার কতটুকু আমলে নিচ্ছে? না আদৌ নিচ্ছে না, তা পুরোপুরি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। এমন স্বীকৃতি কওমী মাদরাসা নিতে পারে না, যে স্বীকৃতির কারণে কওমী মাদরাসা তার স্বকীয়তা হারাবে। স্বীকৃতি বিষয়ে আরো আলোচনা-পর্যালোচনা ও গবেষণার পর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
প্রিয় নবী (সা.) কাউকে কোনো গুরু দায়িত্ব প্রদানের সময় মাথায় পাগড়ি পরিয়ে দিতেন। এটি তাঁর দায়িত্বের গুরুত্ব ও তাৎপর্যের বিশালতার প্রতি ইঙ্গিত করে। দশম হিজরীতে হুজুর (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে তিনশত লোকের নেতা বানিয়ে যুদ্ধাভিযানে ইয়ামন প্রেরণ করেন। রাসূল (সা.) তখন নিজ হাতে হযরত আলী (রা.)-এর মাথায় পাগড়ি পরিয়ে দেন। অতঃপর গুরুত্বপূর্ণ নসীহত পেশ করে তাঁকে বিদায় জানান। (যারকানী ১০৩, সিরাতে মুস্তফা ১৪৭/৩)
দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত ফাযিলদের পাগড়ি পরিয়ে সম্মাননা জানানোর রীতি শুরু থেকেই চলে আসছে। জামেয়া ক্বাসিমুল উলূমের এটা দ্বিতীয় দস্তারবন্দী (সমাবর্তন) সম্মেলন। প্রথম দস্তারবন্দী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ১৯৮৯ ঈসায়ী।
আজ যাদের মাথায় পাগড়ি পরিয়ে সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে; তাদেরকে বলবো, এটা শুধু সম্মাননা নয়, বরং এটা হচ্ছে দ্বীনি উলূমের হেফাজতের গুরুদায়িত্ব প্রদানের এক স্মারক। দেশ-জাতি ও ইসলামের সুরক্ষায় পর্বতসম দায়িত্ব সমঝিয়ে দেয়া হচ্ছে। আপনারা জীবনের সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চলবেন। এখলাছ ও তাক্বওয়াকে সঙ্গী বানিয়ে দায়িত্বের সবটুকু আনজাম দিয়ে যাবেন। দ্বীন রক্ষার যে কোনো সংগ্রামে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবেন। লাখো জনতার সামনে আকাবিরদের দেয়া এই আমানতটুকু রক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন। আল্লাহ তা’আলা আপনাদেরকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের তাওফীক দান করুন। আমীন!
জামেয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে আপনারা এ মহতী সম্মেলনে যোগদান করেছেন। আমরা সানন্দে পুলকিত হৃদে আপনাদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দান করুন।
জামেয়া ক্বাসিমুল উলূমের আমন্ত্রণে আপনারা ঐতিহাসিক এ সম্মেলনে শুভাগমন করেছেন। সত্যিই আমরা পুলতিক হয়েছি। হৃদ্যিক উষ্ণ অভিনন্দন রইলো আপনাদের প্রতি। আল্লাহ পাক আপনাদের উভয় জগতে সফলতা দান করুন। আমীন!