বিভাগ: ইসলামের আলো

ইসলাম কায়েমের নামে বোমাবাজি, ইসলাম কি বলে?

॥ আতিকুর রহমান নগরী ॥

সম্প্রতি একটি গোষ্ঠি ইসলাম কায়েমের দোহাই দিয়ে, শান্তির প্রতিষ্ঠার ফুলঝুরি ছিটিয়ে, শিখানো বুলি শুনিয়ে বোমাবাজি আর মানুষহত্যার মিশন অব্যাহত রেখেছে। সেই গোষ্ঠি ইসলামের নিখুঁত ইতিহাসে কলংক লেপনে আদাজল খেয়ে কোমর বেঁধে ময়দান চষে বেড়াচ্ছে।
বাংলাদেশে ব্লগার হত্যার দায় স্বীকার করেছে আল্-কায়েদা। সম্প্রতি প্যারিসে হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ঘটিয়ে বলেই দায় কাঁধে নিয়েছে। শুধু আল্-কায়েদা বা আইএস-ই নয়, আরো যত নামে-বেনামে রয়েছে এদের দল-উপদল।
বেশক তারা জানেন, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যে নবীর আগমন ঘটেছিল, তিনি নিজে ইসলামের দাওয়াতি অভিযানে কাউকে ইসলাম গ্রহণের জন্য জোর-জবরদস্তি করেননি। যার কাছে দাওয়াত নিয়ে গেছেন সে ছোট হোক বা বড়, তার প্রতি অকৃতিম ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই দিয়েছেন তিনি দাওয়াত। রাষ্ট্রনায়ক বা দলপতিদের কাছে তিনি বিশেষ দূত পাঠিয়ে চিঠির মাধ্যমে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসার আহবান জানিয়েছিলেন।
আর সেই নবী মুহাম্মদ (সা.)’র উম্মত আর ইসলামের সঠিক অনুসারী দাবি করে বোমা মেরে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে, মানুষ হত্যা করে ইসলাম কায়েমের অপচেষ্টা করার মানে কি? যে ধর্মের জয়গান শুনে, যে ধর্মের অনুসারীদের চরিত্রে অভিভূত হয়ে অমুসলিমরা মুসলমান হওয়ার প্রয়াস পেয়েছিল। সেই ধর্মকে বিশ্ববাসীর কাছে কলংকিত করা কোনো মুসলমান বা ইসলামী সংগঠনের কাজ হতে পারেনা।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যে জাতি একসময় পৃথিবীর বুকে স্পেশাল এক পাওয়ার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতো। যে জাতির সাহসি হুংকারে বাতিলরা ভয়ে কাঁপতো। যে জাতির নাম শুনলে আবু জেহেল, উতবা, শাইবার মত শীর্ষ কাফের নেতারা লেজ গুটিয়ে পালাতো। সে জাতি আজ পরস্পর দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে একদল ইসলাম কায়েমের নামে বোমাবাজি আর মানুষ হত্য করে বিশ্বব্যাপী শান্তির ধর্ম ইসলামকে কলংকিত করার জন্য অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু তারা জানে যে, ইসলামের নামে অশান্তি-অরাজকতা সৃষ্টি করা বৈধ নয়, তবুও কোনো এক পরাশক্তির খবরদারিতে তারা এ কাজে নেমেছে তা একমাত্র সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। তবে তাদের এই হীন চেষ্টা কখনো বাস্তবে রূপ নেবে না।
ইসলাম শান্তির ধর্ম, সব ধরনের অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, মারামারি, হানাহানি, জুলুম নির্যাতন বন্ধ করে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য এবং নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য ইসলামের আগমন ঘটেছে। জাহেলি যুগে তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুনাখুনি, হানাহানি এবং রক্তের বদলে রক্ত নিতে গিয়ে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের জীবনহানি ঘটত এবং বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধবিগ্রহ চলত। ইসলামের মহান প্রবর্তক বিশ্বশান্তির মূর্তপ্রতীক হযরত মুহাম্মদ (সা.) এসে এ সবকিছু সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। বিদায় হজ্বের ভাষণে তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে ঘোষণা করলেন : হে মানবমণ্ডলী! আজকের এই দিন, এই মাস, এই শহরটি যেমন সম্মানিত, তেমনি তোমাদের রক্ত, তোমাদের ইজ্জত, তোমাদের সম্পদ পরস্পরের প্রতি কিয়ামত পর্যন্ত সম্মানিত।
হাল যামানায় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষ আজ নির্যাতিত-নিপীড়িত। আত্মঘাতি, বিস্ফোরণ আর বোমা হামলা আর নামে-বেনামের জঙ্গি সংগঠনের আতংকে নির্ঘুম রজনী পার হচ্ছে। আতংকে যুক্ত হয়েছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)।
অন্যায়ভাবে একজন মানুষ হত্যা করাকে কোরআনে কারিমে ‘সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা’ করার নামান্তর আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনুল কারিমে অন্যায়ভাবে হত্যা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধ সম্পর্কে ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল, আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করল সে যেন সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। (সূরা মায়েদা:৩২) অন্যায়ভাবে হত্যার শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন- কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে চিরস্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা’নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। (সূরা নিসা:৯৩)
ইসলাম ধর্মে হত্যার প্রতি প্ররোচণা দানকারী হিসেবে হিংসা-বিদ্বেষ-ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছে। এ বিষয়ে হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করো না, হিংসা করো না এবং একে অপরের পেছনে লেগে থেকনা। আল্লাহর বান্দা সবাই ভাই ভাই হয়ে যাও। (সহিহ বোখারি) এমনকি হত্যার প্রাথমিক বিষয় তথা অস্ত্র দিয়েও কাউকে ভয় দেখাতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের দিকে অস্ত্র তাক না করে। কারণ সে জানে না, হয়ত শয়তান তার হাত থেকে তা বের করে দিতে পারে, ফলে সে জাহান্নামের গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হবে।’ (সহিহ বোখারি) মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টজীবকে পুড়িয়ে মারার অধিকার কাউকে দেননি। আগুনে পুড়িয়ে মারার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই। আগুনে পুড়িয়ে মারার ফলে একসাথে কয়েকটি অপরাধ সংগঠিত হয়, এর কোনো কোনোটি তো শিরকের পর্যায়ভুক্ত। কাউকে আগুনে পুড়িয়ে মারা বা মারার চেষ্টা জঘন্যতম অপরাধ। যারা এ ধরনের কাজ করবে, আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনের কারণে তারা আল্লাহর রহমত থেকে অবশ্যই বঞ্চিত হবে এবং রাসূল (সা.) এর কথা না মানার কারণে তারা কিয়ামতের দিন রাসূল (সা.) এর শাফায়াত পাবে না,। হাদীস শরীফে আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো মানুষ, জীব-জন্তু বা কোনো ফসল-গাছ-পালাকে আগুনে পোড়াতে নিষেধ করেছেন। রাসূলে কারিম (সা.) বলেন, ‘আগুন দ্বারা কেবল আল্লাহই শাস্তি দেবেন, আল্লাহ ছাড়া আর কারো আগুন দ্বারা শাস্তি দেওয়ার অধিকার নাই।’ (বোখারি ও আবু দাউদ)
তেমনি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা মহা পাপ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন”। (সূরা আন নিসা: আয়াত নং ৯৩)
কিন্তু আজ খুবই দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সবাই লক্ষ্য করছেন যে, আমাদের মুসলিম ভাই-বোনদের অহরহ আগুনে পোড়ানো হচ্ছে এবং অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে আহত ও নিহত করা হচ্ছে। জীবন্ত মানুষকে পেট্রোল বোমা, গান পাউডার ইত্যাদি দিয়ে জ্বালানো হচ্ছে। ইসলামের বিধানের তোয়াক্কা না করে, মানবতাকে পায়ে পিষে, পশুত্বের কোন স্তরে পৌঁছলে এমন কাজ করা সম্ভব তা বোধগম্য নয়। এই সব জঘণ্যতম কর্ম-কাণ্ড দেখলে শয়তানও ঘৃণা ও লজ্জা পায়। আমরা আজ কোথায় বাস করছি? আমরা কি সভ্য জগতের বাসিন্দা, আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব? নাকি অন্য কিছু, কিছুই বুঝতেছি না!
মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী।’ (মুদ্দাস্সির : ৩৮) ইসলাম কোনোভাবেই অন্যের জানমালের ক্ষতি সাধন সমর্থন করে না। যারা মানুষের জানমালের ক্ষতি করে ইসলাম তাদের প্রকৃত মুমিন বলে স্বীকৃতি দেয় না। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন- প্রকৃত মুমিন সে ব্যক্তি যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (মুসলিম)
ইসলাম তার সূচনালগ্ন থেকে সন্ত্রাসবাদ তো দূরের কথা কোনো ধরণের অশৃঙ্খলাকে সমর্থন করেনি আর করবেও না। বোমাবাজি-হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ইসলাম কায়েম করার কোনো ইয়ত্তা নেই। এমনকি ইসলামের দাওয়াতি অভিযানে গিয়েও যদি অমুসলিম কোনো সম্প্রদায়ের হাতে কষ্ট পেয়ে থকেন তবুও সেই সম্প্রদায়ের লোককে অভিশাপ করা মুসলমানের জন্য সমিচীন নয়, কারণ তায়েফের ময়দানে নবী মুহাম্মদ (সা.)’র উপর কাফের জনগোষ্ঠির নির্যাতনে জুতো পর্যন্ত রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল তদুপরি তিনি বদদোয়া তথা অভিশাপ করেননি। তবে কেন মুসলমান দাবি করে বোমাবাজি আর মানুষ হত্যা করে ইসলাম কায়েমের অপচেষ্টা?
বাংলাদেশের ব্লগার হত্যা, সম্প্রতি প্যারিস টাউনে হামলা, মূল টার্গেট সাব্যস্তকরণ, স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়ে যাচ্ছে আইএস। হামলার পর দায় স্বীকার করে ওয়েব সাইটসহ মিডিয়ায় প্রচার। বিশ্বনেতাদের মুখেও আইএসের দায় স্বীকারের কথা। তবে দেশবাসীসহ বিশ্বের শান্তিকামী জানতে চায় তথ্যপ্রযুক্তির দিক দিয়ে যে দেশগুলোর অবস্থান সবার শীর্ষে। কাদের নিয়ে আইএস গঠিত, এদের মূল ঠিকানা কোথায়? কোথা থেকে ওদের সূত্রপাত ইত্যাদি বিষয় বের করতে পারছেন না।
ঐক্য। যার গুরুত্বের অন্ত নেই। অপরিসীম গুরুত্বের অধিকারি বিষয়টি হচ্ছে ঐক্য। মহান সৃষ্টিকর্তা মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার তাগিদ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে অর্থাৎ “ তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর, আর পরস্পর পৃথক হয়ো না।” (সূরা: আল্-ইমরান)
এ দুটু আয়াত ও হাদিস দ্বারা এ কথা প্রতিয়মান হয় যে, মুসলমানরা ঐক্যের প্লাটফর্মে সুদৃঢ় অবস্থান থেকে পিছু হঠার দরুনই তারা আজ প্রতিনিয়ত অধ:পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
অতএব, আসুন, যত হোক গালাগালি-স্বার্থের চালাচালি, ভিন্নমতের সংঘাত। সবাই মিলাই হাতে হাতে মোরা মুহাম্মদ (সা.)’র উম্মাত।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

জন্ম নিয়ন্ত্রণের ইসলামি দৃষ্টিকোণ

॥ মুহাম্মদ মাহবুবুল হক ॥

একবিংশ শতাব্দীর এ সময়ে পৃথিবীর নানা দেশে জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রথা চালু আছে।বাংলাদেশেও জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রতি দেশের জনগণকে উৎসাহিত করা হয়। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে ব্যাপক প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে মানুষকে জন্ম নিয়ন্ত্রণ মুখী করতে বিভিন্ন কর্মসূচীর উদ্যোগ নেয়া হয়। “দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়” ও “ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট “ইত্যাদি মুখরোচক প্রতিপাদ্য গণমাধ্যমে বেশ জোরেশোরেই প্রচারিত হয়।পরিবার পরিকল্পনার প্রধান অনুষঙ্গ জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রচারের ক্ষেত্রে মিডিয়া শক্তি নিয়ামক ভূমিকা রাখছে। জনসংখ্যার বৃদ্ধি রোধ করা, অর্থনৈতিক প্রবিদ্ধি অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচনও লাগামহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে -এসব যুক্তির অবতারণা করে বিজ্ঞানীরা জন্ম নিয়ন্ত্রণের সুফল প্রমাণের চেষ্টা করেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এনজিও সংস্থার মাঠ কর্মীরা বিভিন্ন ফন্দি ও কৌশলে সুখি পরিবার গঠনের ফিরিস্তি আওড়িয়ে গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে জন্ম নিয়ন্ত্রণের পথ দেখাচ্ছে। আর্থিক প্রলোভন ও ধোঁকার আশ্রয়ে এক রকম বাধ্য করে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করানো হচ্ছে সংক্রান্ত দৈনিক মানবজমিনের একটি প্রতিবেদন আমার চোখে পড়ে। একটি ভিটামিন ইন্জেকশন দেয়া হবে ও হাজার খানেক টাকা দেয়া হবে বলে দালাল চক্রের এক সদস্য একজন রিকশা চালককে জন্ম নিয়ন্ত্রণের পুশ করায়। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, দালালরা কারো জন্ম নিয়ন্ত্রণ করাতে পারলে কর্তৃপক্ষ থেকে বোনাস পায়। এ হলো বাংলাদেশের জন্ম নিয়ন্ত্রন পরিস্থিতি। ইসলামে জন্ম নিয়ন্ত্রণকে নিরুৎসাহিত করে। জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রাধানত দুটি পদ্ধতি রয়েছে। এক. দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রণ। নারী -পুরুষের অস্ত্রোপচার বা ইন্জেকশনের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়া হয় দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতিতে। অভাব-অনটনের ভয়ে বা জনসংখ্যা রোধে যে কোন কারণে যে উপায়েই স্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা হোক, শরীয়তের দৃষ্টিতে তা হারাম ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।স্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করলে আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের অবজ্ঞা ও অকৃতজ্ঞতা হয় এবং স্রষ্টার সৃষ্টির পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধন হয়। হাদীস শরীফে অধিক সন্তান জন্মদানের জন্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে। রাসূল (স.) বলেছেন, “তোমরা প্রচন্ড মায়াবতী ও অধিক সন্তান প্রসবিনী মহিলার সাথে পরিণয় করো, কেননা কিয়ামত দিবসে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অন্যান্য উম্মতের উপর আমি গর্ব করবো”(মিশকাত)। দরিদ্রতার আশংকা ও পারিবারিক ঝামেলা এড়াতে সন্তান জন্মদান থেকে সংযত থাকা নিরেট বোকামি। পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিজীবের অন্ন, বাসস্থান সহ সবকিছুর ব্যবস্থাপক আল্লহ তাআলা। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা দরিদ্রতার ভয়ে স্বীয় সন্তানদেরকে হত্যা করো না,আমিই তোমাদের ও তোমাদের সন্তানদের রিজিক প্রদান করি”(সূরা আনআম)।হাদীস থেকে জানা যায়, কিছু সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম পার্থিব ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে, একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতে ডুবে থাকতে রাসূলের (স.) কাছে যৌন ক্ষমতা বিলুপ্তির অনুমতি চাইলে তিনি তাদের মনের বাসনাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। স্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রণ করে বংশ পরম্পরার পথ রুদ্ধ করা হারাম। দুই. স্বল্পমেয়াদি সাময়িক জন্ম নিয়ন্ত্রণ: ইসলামের প্রাথমিক যুগে আযলের সাথে সামঞ্জস্যশীল পদ্ধতি।স্বামীর বীর্য শুক্র স্ত্রীর জরায়ূর ডীম্বাশয়ে পৌঁছতে প্রতিবন্ধক যে কোন পদ্ধতি গ্রহণ করাই আযল বা সাময়িক জন্ম রোধ। সাম্প্রতিক সময়ে কনডম ইত্যাদির দ্বারা এ পদ্ধতি কার্যকর হয়ে থাকে। গ্রহণযোগ্য শরীয়ত সম্মত অপারগতা ও সমস্যা ব্যতিত সাময়িক জন্মরোধ ও মাকরূহ থেকে মুক্ত নয়। নারীর জরায়ূতে বীর্য পৌঁছার পর গর্ভনিরোধক বিভিন্ন ঔষধের দ্বারা শুক্রকীট ধ্বংস করা জায়েজ নয় এবং গর্ভপাত ঘটানোও বৈধ নয়। জনসংখ্যার বৃদ্ধি ভীতি কাটিয়ে জনসংখ্যাকে জনশক্তি ও মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ইসলামী বিধান পালনের মাধ্যমে সুখী-সমৃদ্ধ পরিবার গঠন করতে হবে।

লেখক: আলেম, প্রাবন্ধিক।

জন্ম নিয়ন্ত্রণে ইসলামী দৃষ্টিকোণ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

জন্ম নিয়ন্ত্রণ (ইরৎঃয পড়হঃৎড়ষ) আন্দোলন আঠারো শতকের শেষাংশে ইউরোপে সূচনা হয়। সম্ভবত: ইংল্যান্ডের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসই (গধষঃযঁং) এর ভিত্তি রচনা করেন। এ আন্দোলনের আসল উদ্দেশ্য হল বংশ বৃদ্ধি প্রতিরোধ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার দেখে মি. ম্যালথাস হিসাব করেন, পৃথিবীতে আবাদযোগ্য জমি ও অর্থনৈতিক উপায়-উপাদান সীমিত। কিন্তু বংশবৃদ্ধির সম্ভাবনা সীমাহীন। ১৭৯৮ সালে মি. ম্যালথাস রচিত অহ বংংধু ড়হ ঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ ধহফ ধং রঃ বভভবপঃং, ঃযব ভঁঃঁৎব রসঢ়ৎড়াসবহঃ ড়ভ ঃযব ংড়পরবঃু. (জনসংখ্যা ও সমাজের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে এর প্রভাব) নামক গ্রন্থে সর্বপ্রথম তার মতবাদ প্রচার করেন। এরপর ফ্র্যান্সিস প্ল্যাস (ঋৎধহপরং চষধপব) ফরাসী দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রতিরোধ করার প্রতি জোর প্রচারণা চালান। কিন্তু তিনি নৈতিক উপায় বাদ দিয়ে ঔষধ ও যন্ত্রাদির সাহায্যে গর্ভনিরোধ করার প্রস্তাব দেন। আমেরিকার বিখ্যাত ডাক্তার চার্লস নোল্টন (ঈযধৎষবং শহড়ষিঃড়হ) ১৮৩৩ সালে এ প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন সূচক উক্তি করেন। তিনি তার রচিত ঞযব ঋৎঁরঃং ড়ভ ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যু নামক গ্রন্থে সর্বপ্রথম গর্ভনিরোধের চিকিৎসা শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এবং এর উপকারের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। কিন্তু মাঝখানে ১৮৪০ সাল থেকে ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত এ আন্দোলন বন্ধ থাকে। ইংল্যান্ডের অধিবাসীরা এর প্রতি কোনরূপ গুরুত্বারোপ ও সহযোগিতা করতে অস্বীকার জানিয়েছিলেন।
আবার ১৮৭৬ সালে নতুন করে ম্যালথাসীয় আন্দোলন (ঘবি গধষঃযঁংরধহ গড়াসবহঃ) নামক নতুন আন্দোলন শুরু হয়। মিসেস এ্যানী বাসন্ত ও চার্লস ব্রাডার ডাঃ নোল্টনের (ঋৎঁরঃং ড়ভ ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যু) গ্রন্থটি ১৮৭৬ সালে ইংল্যান্ডে প্রকাশ করেন। ১৯৭৭ সালে ডাঃ ড্রাইসডেল (উৎুংফধষব)-এর সভাপতিত্বে একটি সমিতি গঠিত হয় ও জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রচার কার্য শুরু হয়ে যায়।
১৮৭৯ সালে মিসেস বাসন্ত-এর রচিত খধি ড়ভ ঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ (জনসংখ্যার আইন) নামক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৮৮১ সালে হল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও জার্মানীতে এ আন্দোলন ছড়িয়ে যায় এবং ক্রমে ইউরোপ ও আমেরিকার সকল সভ্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানে স্থানে জন্মনিরোধ ক্লিনিক (ইরৎঃয ঈড়হঃৎড়ষ ঈষরহরপং) খুলে দেয়। ‘‘ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ (ঢাকা: আধুনিক প্রকাশনী, ১৯৯২), পৃঃ ১৩-১৫।’’
বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে জন্মনিয়ন্ত্রণের নামে প্রকাশ্যে সন্তান হত্যার হিড়িক পড়ে গেছে। এমনকি দৈনিক পত্রিকাসহ সকল মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচারণা চলছে। যেমন ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক দু’টি সন্তানই যথেষ্ট’, দুইটি সন্তানের বেশী নয়, একটি হ’লে ভালো হয়’ ইত্যাদি। এছাড়াও কিছু স্যাটেলাইট ক্লিনিক গর্ভবর্তী মায়ের সেবার নামে গর্ভপাত ঘটানোর গ্যারেজে পরিণত হয়েছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি : জন্ম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি দু’প্রকার : (১) সাময়িক ব্যবস্থা ও (২) স্থায়ী ব্যবস্থা।
(১) সাময়িক ব্যবস্থা :
(ক) আযল তথা ভিতরে বীর্যপাত না করা (ডরঃয ফৎধধিষ)
(খ) নিরাপদ সময় মেনে চলা (ঝধভব ঢ়বৎরড়ফ)।
(গ) কনডম ব্যবহার। (ঘ) ইনজেকশন পুশ। (ঙ) পেশীতে বড়ী ব্যবহার। (চ) মুখে পিল সেবন ইত্যাদি।
(২) স্থায়ী ব্যবস্থা : (ক) পুরুষের অপারেশন। (খ) নারীর অপারেশন।
(ক) পুরুষের অপারেশন : পুরুষের অন্ডকোষে উৎপাদিত শুক্রকীটবাহী নালী (ঠধং ফবভবৎবহং) দু’টি কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে পুরুষের বীর্যপাত ঘটে, কিন্তু বীর্যে ক্রমোজম শুক্রকীট না থাকায় সন্তান হয় না। ‘‘ ডা. এস.এন. পান্ডে, গাইনিকলজি শিক্ষা, (কলিকাতা : আদিত্য প্রকাশনী, ১৯৭৭), পৃঃ ১২৪।’’
(২) নারীর অপারেশন : নারীর ডিম্বাশয়ে উৎপাদিত ডিম্ববাহী নালী (ঋধষষড়ঢ়রধহ ঞঁনব) কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে পূর্ণ ক্রমোজম ডিম্ব (গধঃঁৎবফ ঙাঁস) আর জরায়ুতে প্রবেশ করতে পারে না। ‘‘ ঐ, পৃঃ ১২৫।’’
নারী অথবা পুরুষে যেকোন একজন স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করলে, অপর জনকে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় না। কারণ নারীর ডিম্ব পুরুষের শুক্রকীট দ্বারা নিষিক্ত না হ’লে সন্তানের জন্ম হয় না। ‘‘ ঐ, পৃঃ ১৪’’
জন্ম নিয়ন্ত্রণের কুফল : জন্মনিয়ন্ত্রণের বহুবিধ কুফল রয়েছে। এ সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হ’ল-
ব্যভিচারের প্রসার : ব্যভিচার সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অবৈধ যৌন সম্ভোগের নিকটবর্তী হয়ো না। এটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ’ (ইসরা ১৭/৩২)। কিন্তু শয়তান মানুষকে দরিদ্রতার ভয় দেখিয়ে অসামাজিক, অনৈতিক কাজের প্রতি প্রলুব্ধ করে। নারী জাতি আল্লাহভীতির পাশাপাশি আরও একটি নৈতিকতা রক্ষা করতে বাধ্য হয়। তাহ’ল অবৈধ সন্তান জন্মের ফলে সামাজিক মর্যাদা বিনষ্ট হবার আশংকা। কিন্তু জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেয়ার ফলে, এ আশংকা থেকে একদম মুক্ত। যারা নৈশক্লাবে নাচ-গান করে, পতিতা বৃত্তি করে, প্রেমের নামে রঙ্গলীলায় মেতে উঠে, তারা অবৈধ সন্তান জন্মানোর আশংকা করে না। তাছাড়া কখনও হিসাব নিকাশে গড়রমিল হয়ে অবৈধ সন্তান যদিও গর্ভে এসে যায়, তবে স্যাটেলাইট ক্লিনিক নামের সন্তান হত্যার গ্যারেজে গিয়ে প্রকাশ্যে গর্ভ নষ্ট করে ফেলে।
ইংল্যান্ডে প্রতি ১০০ জন নারীর মধ্যে ৮৬ জন নারী বিয়ে ছাড়াই যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে। অবৈধ সন্তান জন্মের সময় এদের শতকরা  ৪০ জন নারীর বয়স ১৮-১৯ বছর, ৩০ জন নারীর বয়স ২০ বছর এবং ২০ জন নারীর বয়স ২১ বছর। এরা তারাই যারা জন্মনিয়ন্ত্রণের যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরও এ দুর্ঘটনাবশত গর্ভবতী হয়েছিল। ‘‘ ঝবযধিৎু ঙংধিষফ, ঞযব চংুপড়ষড়মু ড়ভ ঝবী (খড়হফড়হ : ১৯৫১), চ. ৫০’’।
সেখানে প্রতি তিন জন নারীর একজন বিয়ের পূর্বে সতীত্ব সম্পদ হারিয়ে বসে। ডাঃ চেসার তার রচিত ‘সতীত্ব কি অতীতের স্মৃতি?’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে পরিষ্কার ভাষায় বর্ণনা করেছেন’। ‘‘ঈযবংবৎ ওং ঈযধংঃরঃু ঙঁঃসড়ফবফ, (খড়হফবহ : ১৯৬০), চ. ৭৫’’
ওহফরধহ ঈড়ঁহপরষ ভড়ৎ গবফরপধষ জবংবধৎপয-এর ডিরেক্টর জেনারেল অবতার সিংহ পেইন্টাল বলেন, ডব ঁংবফ ঃড় ঃযরহশ ড়ঁৎ ড়িসবহ বিৎব পযধংঃব, ইঁঃ ঢ়বড়ঢ়ষব ড়িঁষফ নব যড়ৎৎরভরবফ ধঃ ঃযব ষবাবষ ড়ভ ঢ়ৎড়সরংব পঁষঃু যবৎব.  অর্থাৎ আমাদের নারীদেরকে আমরা সতী বলে মনে করতাম। কিন্তু অবৈধ যৌনকর্ম এখানে এতবেশী বৃদ্ধি পেয়েছে যে, লোকে এতে ভীত না হয়ে পারে না। ‘‘নারী ৯৭ পৃঃ; হাফেয মাসঊদ আহমদ; আত-তাহরীক (বিশ্বে বিভিন্ন ধর্ম ও সমাজে নারী : একটি সমীক্ষা-) (৬ষ্ঠ বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা জানুয়ারী ২০০৩), পৃঃ ৪’’
আমেরিকার বিদ্যালয় সমূহে অশ্লীল সাহিত্যের চাহিদা সর্বাপেক্ষা বেশী। যুবক-যুবতীরা এসব অধ্যয়ন করে অশালীন কাজে লিপ্ত হয়। এছাড়া হাইস্কুলের শতকরা ৪৫ জন ছাত্রী স্কুল ত্যাগ করার পূর্বে চরিত্রভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। আর এদের যৌন তৃষ্ণা অনেক বেশী। ‘‘এবড়ৎমব খরহফংবু, জবাড়ষঃ ড়ভ গড়ফবৎহ ণড়ঁঃয চ-৮২-৮৩’’ বৃটেনেও শতকরা ৮৬ জন যুবতী বিয়ের সময় কুমারী থাকে না। ‘‘দৈনিক ইনকিলাব, ৬ই জুন ১৯৯৮ইং’’ প্রাশ্চাত্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে তাদের শিক্ষা ব্যয়ের প্রায় অধিকাংশ খন্ডকালীন যৌনকর্মী হিসাবে অর্জন করে থাকে। মঙ্গোলয়েড দেশসমূহে যৌন সম্পর্কীয় বিধি-বিধান অত্যন্ত শিথিল। থাইল্যান্ডের ছাত্রীদের বিপুল যৌনতা লক্ষ্য করা যায়। ‘‘ মাসিক পৃথিবী (প্রশ্চাত্যে যৌন বিকৃতি, জুলাই ২০০১ইং, পৃঃ ৫২-৫৩’’
চীনের ক্যান্টন শহরে কুমারীদের প্রেম বিষয়ে শিক্ষা দেয়ার জন্য বিদ্যালয় খোলা হয়েছে। ‘‘জহুরী খবরের খবর, ১ খন্ড, ১১৬ পৃঃ’’ পশ্চিমা সভ্যতার পূজারীরা সর্বজনীন অবৈধ যৌন সম্পর্কের মহামারীর পথ প্রশস্ত করেছে। মরিয়ম জামিলা, ইসলাম ও আধুনিকতা, ৯৯ পৃঃ’’। চীনে যৌন স্বাধীনতার দাবী সম্বলিত পোষ্টারে যার সাথে খুশী যৌন মিলনে কুণ্ঠিত না হবার আহবান জানানো হয়। ‘‘খবরের খবর, ১ম খন্ড, ১১৬ পৃঃ’’। ইউরোপে যৌন স্বাধীনতার দাবীতে পুরুষের মত নারীরাও নৈতিকতা হারিয়ে উচ্ছৃংখল ও অনাচারী এবং সুযোগ পেলেই হন্যে হয়ে তৃপ্ত করত যৌনক্ষুধা। অশুভ এই প্রবণতার ফলে বৈবাহিক জীবন ও পরিবারের প্রতি চরম অনিহা সৃষ্টি হয়। ‘‘সায়্যেদ কুতুব, ভ্রান্তির বেড়াজালে ইসলাম, ৯৮ পুঃ’’। অর্থ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে আমেরিকার ৭৫ লাখ নারী পুরুষ বিবাহ ব্যতীত ‘লিভ টুগেদার’-এ। ‘‘দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৬ এপ্রিল ২০১১, পৃঃ ৫’’।
প্রাশ্চাত্যের যুবতীরা যাতে অপ্রত্যাশিতভাবে গর্ভবতী না হয়ে পড়ে, সেজন্য তাদেরকে যথেষ্ট পরিমাণে গর্ভনিরোধের দ্রব্যাদি দেয়া হয় এবং এ সকল দ্রব্য ব্যবহারের বিষয়ে তাদেরকে যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণও প্রদান করা হয়ে থাকে। এমনকি মায়েরা কন্যাদেরকে এই সকল দ্রব্য ব্যবহারের কায়দা-কৌশল শিক্ষা দিয়ে থাকে। গর্ভনিরোধ দ্রব্যাদির ব্যবহার সম্পর্কে স্কুল-কলেজে প্রচারপত্র বের করে এবং বিশেষ কোর্সেরও প্রবর্তন করে। এর অর্থ হ’ল- সকলেই নিঃসংকোচে মেনে নিয়েছে যে, যুবক-যুবতীরা অবৈধ যৌন সম্ভোগ করবেই। ‘‘নারী, পৃঃ ৮৫; আত-তাহরীক, জানুয়ারী ২০০৩, পৃঃ ৪’’।
প্রাশ্চাত্যে ক্রমবর্ধমান অবৈধ যৌন স্বাধীনতাই সবচাইতে ক্ষতি সাধন করেছে। নারীর দেহকে বাণিজ্যিক রূপ দেয়ার কোন প্রচেষ্টাই বাকী রাখা হয়নি। অবিবাহিত মহিলাদের গর্ভধারণের সংখ্যা বৃদ্ধি, অবৈধ সন্তান জন্ম, গর্ভপাত, তালাক, যৌন অপরাধ ও যৌন ব্যাধিই এর প্রমাণ। অপর দিকে অবৈধ যৌন সম্পর্কের ফলে কোন আইন-বিচার ও আইনী শাস্তির বিধান নেই। বরং এটাকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে বিবেচনা করা হয়। ‘‘ ইসলাম ও আধুনিকতা, পৃঃ ২৩’’। সম্প্রতি ভারতেও অবৈধ যৌন সম্প্রীতি ও হিন্দু-মুসলমান যুবক-যুবতীর নির্বিঘেœ বিবাহ বন্ধন এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণের নামে গর্ভপাত ঘটানোর হিড়িক পড়ে গেছে।
জটিল রোগের প্রাদুর্ভাব : নারীর ব্যভিচার দিনদিন প্রসার লাভ করে চলেছে। নারী স্বাধীনতার নামে এরা আরও বেপরোয়া হয়ে গেছে। এই অবৈধ যৌন সম্ভোগের মাধ্যমে নারী-পুরুষের মারাত্মক জটিল সব রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।
জন্ম নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে জীবাণু নাশক ঔষধ, পিল, কনডম ইত্যাদি উপকরণ ব্যবহারের ফলে তৎক্ষণাৎ কোন ক্ষতি হয় না। কিন্তু বেশ কিছু কাল যাবৎ এসব ব্যবহার করার ফলে মধ্যবর্তী বয়সে উপনীত হ’তে না হ’তেই নারী দেহের স্নায়ুতন্ত্রীতে বিশৃংখলা (ঘবৎাড়ঁং রহংঃধনরষরঃু) দেখা দেয়। যেমন-নিস্তেজ অবস্থা, নিরানন্দ, উদাসীনতা, রুক্ষমেজাজ, বিষণœতা, নিদ্রাহীনতা, মস্তিষ্কের দুর্বলতা, হাত-পা অবশ, শরীরে ব্যথা, স্তনে সাইক্লিক্যাল ব্যথা, ক্যান্সার, অনিয়মিত ঋতু, সৌন্দর্য নষ্ট ইত্যাদি। ‘‘ ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ, পৃঃ ৬২’’ নারী-পুরুষ অবৈধ যৌন মিলনে সিফিলিস, প্রমেহ, গণরিয়া, এমনকি এইডস-এর মত মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। যে সমস্ত বিবাহিতা নারীর দেহে অস্ত্রপচার করা হয়, তাদের শতকরা ৭৫ জনের মধ্যেই সিফিলিসের জীবাণু পাওয়া যায়। ‘‘ ঐবৎ ংবষভ, উৎ. খড়ৎিু, চ-২০৪’’। সিফিলিস রোগে আক্রান্ত রোগী সুচিকিৎসা গ্রহণ না করলে মারাত্মক সব রোগের সৃষ্টি হয়। এইডস রোগের ভাইরাসের নাম এইচ. আই. ভি (ঐওঠ)। এ ভাইরাস রক্তের শ্বেত কণিকা ধ্বংস করে। এ রোগ ১৯৮১ সালে প্রথম ধরা পড়ে এবং ১৯৮৩ সালে একজন ফরাসী বিজ্ঞানী এইচ. আই. ভি ভাইরাসকে এই রোগের কারণ হিসাবে দায়ী করেন। ‘‘কারেন্ট নিউজ (ডিসেম্বর সংখ্যা ২০০১), পৃঃ ১৯’’। বল্গাহীন ব্যভিচারের ফলে এই রোগ উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। ডাঃ হিরোশী নাকজিমা বলেন, জনসাধারণের মধ্যে এইডস বিস্তার লাভ করলে সমগ্র মানবজাতির বিলুপ্তি ঘটতে পারে। ‘‘ঞযব ঘবি ঝঃৎধরঃং ঔরসবং, (কঁধষধষধসঢ়ঁৎ, গধষধুংরধ, ২৩ লঁহব ১৯৮৮), চ-৯’’
এছাড়া জন্ম নিরোধ পদ্ধতি ব্যবহার করার ফলে নানা প্রকার রোগ বদঅভ্যাসের প্রসার ঘটেছে। তন্মধ্যে কনডম ব্যবহার বা আযল করার জন্য নারীরা মিলনে পরিতৃপ্ত না হ’তে পেরে অবৈধ মিলনের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। স্তনে সাইক্লিক্যাল ব্যথা, স্তনচাকা বা পিন্ড, স্তন ক্যান্সারের পূর্ব লক্ষণ। জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবনে স্তনে এ ধরনের ব্যথা ও পিন্ড তৈরী হয় এবং ৭৫% নারী স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকে। ‘‘প্রথম আলো, ২৭ অক্টোবর ২০১০, পৃঃ ৪’’ বুক ও জরায়ুর কার্সিনোমা হ’তে পারে শর্করা জাতীয় খাদ্য সহ্য হয় না, লিভার দুর্বল হয়, রক্ত জমাট বাঁধতে ব্যহত হয়, বুকের দুধ কমে যায় এবং খধপঃধঃরড়হ কম হয় এবং দেহে ফ্যাট জমা হয়। ‘‘গাইনিকলজি শিক্ষা, পৃঃ ১২৩’’ এছাড়া জরায়ু ক্যান্সার ও স্থানচ্যুতি সহ আরও অনেক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জন্মের হার কমে যাওয়া : আগত ও অনাগত সন্তান হত্যার ব্যাপারে মহান আল্লাহ নিষেধ করেন ‘তোমরা অভাব ও দরিদ্রতার আশংকায় তোমাদের সন্তানদের হত্যা কর না’ (ইসরা ১৭/৩১)। কিন্তু শয়তান আল্লাহর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘আমি অবশ্যই তাদেরকে নির্দেশ দিব। আর তারা তদনুযায়ী সৃষ্টির কাঠামোতে রদবদল করবে’ (নিসা ৪/১১৯)। এই রদবদল শব্দের অর্থ খুঁজতে গেলে বর্তমান যুগের জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অন্যতম। আর জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের নামে যারা সন্তান হত্যা বা অনাগত ভবিষ্যৎ বংশধরদের হত্যা করে চলেছে, তারা সন্তানের জন্মকেই দারিদ্রের কারণ বলে চিহ্নিত করেছে। আর সেজন্যেই ক্রমশঃ জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলন নির্লজ্জভাবে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার জ্যামিতিক হারে হ্রাস পেয়েছে। ভবিষ্যৎ বংশধর উৎপাদন ব্যাহত হ’লে মানব জাতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। যার ফলশ্রুতিতে মুনাফা অর্জনের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশী সক্রিয় হবে। জাহেলী যুগে সন্তানের আধিক্য থেকে বাঁচার জন্য লোকেরা সন্তান প্রসবের সঙ্গে সঙ্গে তাকে হত্যা করত। গর্ভ নিরোধের প্রাচীন ও আধুনিক যত ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়েছে, সবগুলোই মানব বংশ ধ্বংসের পক্ষে কঠিন বিপদ বিশেষ। ‘‘মাওলানা আব্দুর রহিম, পরিবার ও পারিবারিক জীবন, পৃঃ ৩৩২’’ জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে ইউরোপ তাদের জন্য ভয়াবহ বিপদ বিবেচনা করেছে। ‘‘ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ, পৃঃ ১২৮’’ জন্মনিয়ন্ত্রণ জন্মহার হ্রাসের একমাত্র কারণ না হ’লেও অন্যতম প্রধান কারণ একথা নিশ্চিত। ইংল্যান্ডের রেজিষ্ট্রার জেনারেল নিজেই একথা স্বীকার করেছেন যে, জন্মহার হ্রাস পাওয়ার শতকরা ৭০ ভাগ জন্ম নিয়ন্ত্রণের দরুণ ঘটে থাকে। ইনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকাতে বলা হয়েছে, পাশ্চাত্য দেশসমূহের জন্ম হার হ্রাস প্রাপ্তির কারণ গুলোর মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের কৃত্রিম উপকরণাদির প্রভাব অত্যধিক। জন্মনিয়ন্ত্রণ ও ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবারকে সীমিত করার প্রবণতার কারণেই জন্মহার হ্রাস পাচ্ছে। ‘‘জবঢ়ড়ৎঃ ড়ভ ঃযব জড়ুধষ ঈড়সসরংংরড়হ ড়হ ঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ (১৯৪৯), চ-৩৪’’
ফ্রান্স সর্বপ্রথম ব্যাপকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণের উপায় ও পদ্ধতিকে পরীক্ষা করেছে। একশত বছর পর সেখানে প্রতিটি জেলায় মৃত্যুহারের চেয়ে জন্মহার কমে যেতে থাকে। আর এই জনসংখ্যার হার কমে যাওয়ার ফলে দু’টি বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্স এমন শোচনীয় পরাজয় বরণ করে যে, বিশ্বে তার প্রভাব প্রতিপত্তির সমাধি রচিত হয়। ‘‘ ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ, পৃঃ ১১২’’ ফিডম্যান বলেন, সমষ্টিগতভাবে আমেরিকান শতকরা ৭০টি পরিবার জন্ম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আর বৃটেন ও আমেরিকার অবস্থা পর্যবেক্ষণে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, পরিবারগুলোর ক্ষুদ্র আকার প্রাপ্তির মূলে রয়েছে জন্মনিরোধের প্রচেষ্টা। ‘‘ঋধসরষু চষধহহরহম ঝঃবৎরষরঃু ধহফ চড়ঢ়ঁষধঃরড়হ এৎড়ঃিয (ঘবুিড়ৎশ : ১৯৫৯), চ-৫’’ যদি ম্যালথাস আজ জীবিত থাকতেন, তাহ’লে এটা নিশ্চয়ই অনুভব করতেন যে, পাশ্চাত্যের লোকেরা জন্ম নিরোধ করার ব্যাপারে প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশী দূরদর্শীতার পরিচয় দিয়েছে। পাশ্চাত্যের শিল্প ও নগর সভ্যতার কারণে অন্যান্য জাতিও বিপদের সম্মুখীন।
সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় : জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের মধ্যে যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে তাতে ক্রমশঃ পারস্পরিক সদ্ভাব ও ভালবাসা হ্রাস এবং অবশেষে ঘৃণা ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে। তাছাড়া নারীদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যে বৈকল্য দেখা দেয় এবং তার মেজাজ দিন দিন রুক্ষ হয়ে উঠে, ফলে দাম্পত্য জীবনের সকল সুখ-শান্তি বিদায় নেয়। সন্তানই স্বামী-স্ত্রীকে চিরদিন একত্রে সংসার গঠনের ভূমিকা রাখে। এজন্য বলা যায়, সন্তানই পরিবার গঠনের সেতুবন্ধন।
ইউরোপ ও আমেরিকাতে দাম্পত্য জীবন অত্যন্ত দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এবং জন্মনিরোধ আন্দোলন প্রসারের সঙ্গে তালাকের সংখ্যাও দিন দিন দ্রুত গতিতে বেড়ে চলেছে, সেখানে এখন দাম্পত্য জীবন ও পারিবারিক জীবন চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। ‘‘ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ, পৃঃ ৬৮-৬৯’’
সমস্ত ইউরোপের সামাজিক দৃশ্যপট বদলে যায় শিল্প বিপ্লবের অভিঘাতে। আমূল পরিবর্তন আসে গ্রামীণ জীবনেও, ভেঙ্গে যায় পারিবারিক জীবনের ভিত। নারীরা কল-কারখানায় নির্বিঘেœ কাজ করতে শুরু করে। এছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ ইউরোপিয়ান ও আমেরিকান তরুণ নিহত হ’ল। ফলে বিধবা হ’ল অগণিত নারী। যুদ্ধ বিড়ম্বিতা নারীরা বাধ্য হয়ে পুরুষের শূন্যস্থান পূরণ করতে গিয়ে কারখানা মালিকের নিকটে শ্রম বিক্রয়ের পাশাপাশি কমনীয় দেহটাও মনোরঞ্জনের জন্য দিতে হ’ল। যৌবনের তাড়নায় ইন্দ্রিয় ক্ষুধা চরিতার্থ করার জন্য তাকে বেছে নিতে হ’ল অবাধ বিচরণের পথ। আর নারীর মনের গভীরে পেটের ক্ষুধার সঙ্গে যুক্ত হ’ল অতৃপ্ত যৌনতা এবং দামী পোশাক ও প্রসাধনীর প্রতি প্রচন্ড মোহ। ‘‘ ভ্রান্তির বেড়াজালে ইসলাম, পৃঃ ৯৮-১০১’’
জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে চরিত্রের ক্ষতি সাধিত হয়। এ ব্যবস্থা নারী-পুরুষের অবাধ ব্যভিচারের সনদ দিয়ে থাকে। কেননা এতে জারজ সন্তান গর্ভে ধারণ ও দুর্নাম রটনার ভয় থাকে না। এজন্য অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপনে অতি  উৎসাহী হয়ে ওঠে। উৎ. ডবংঃৎ গধৎপশ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ঋঁঃঁৎব ড়ভ গধৎৎরধমব রহ ডবংঃবৎহ ঈরারষধরুধঃরড়হ-এ বলেন, গর্ভনিরোধ বিদ্যা বিয়ের হার বাড়াতে পারে। কিন্তু এর ফলে বিয়ে বন্ধন ছাড়াই যৌন মিলনের পথও অত্যন্ত প্রশস্ত হয়ে যায়। ‘‘ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ, পৃঃ ৬৯’’
জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে শিশুরাও তাদের মেধা বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়। যদি অন্য ছোট-বড় ভাই বোন খেলার সাথী হিসাবে থাকে, তবে তাদের সাথে একত্রে থাকা ও মেলামেশা, সাহায্য-সহযোগিতা ইত্যাদি শিক্ষণীয় গুণাবলী তার মাঝেও প্রস্ফুটিত হয়। মনস্তত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, একাকিত্বের ফলে শিশুদের মন-মগজের সুষ্ঠু বিকাশে বাধা সৃষ্টি হয়। এমনকি দু’টি শিশুর বয়সের পার্থক্য বেশী হ’লে নিকটস্থ ছোট শিশু না থাকার কারণে বড় শিশুটির মস্তিষ্কে (ঘবঁৎড়ংরংর) অনেক ক্ষেত্রে রোগও সৃষ্টি হয়। ‘‘উধারফ গ খবাু, গধঃবৎহধষ ঙাবৎ চৎড়ঃরপঃরড়হ- (ঘবুিড়ৎশ : ১৯৪৩), চ-৩৫’’
অর্থনৈতিক ক্ষতি : জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে নৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির পাশাপাশি এ সমস্ত উপকরণ ব্যবহারের জন্য জাতীয় রাজস্বে বিরাট ক্ষতি সাধিত হয়। এটাকে এক ধরনের অপচয় বললেও ভুল হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অপব্যয় কর না, নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই’ (ইসরা ১৭/২৭)। ‘খাও ও পান কর, অপব্যয় কর না। নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) অপব্যয়কারীকে পছন্দ করে না’ (আ‘রাফ ৭/৩১)।
বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণ জনসংখ্যা হ্রাস জনিত যুক্তি দিন দিন অধিকতর জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর কারণ হ’ল- জন্মহার ধারাবাহিকভাবে (ঞড়ঢ়বৎরহম) কমে যাওয়ার ফলে একদিকে পুঁজি বিনিয়োগের প্রয়োজন হরাস পায়। পক্ষান্তরে বাড়তি জনসংখ্যার কারণে পুঁজি বিনিয়োগ ব্যবস্থা উন্নত হয়। ‘‘ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ, পৃঃ ৭৩’’ কেনসি হাসান বলেন, জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করলে সমাজের অর্থনৈতিক তৎপরতাও অনেক বেড়ে যায়। সে সময় সম্প্রসারণকারী শক্তিগুলি (ঊীঢ়ধহংরাব) সংকোচনকারী শক্তিগুলির (ঈড়হঃৎধপঃরাব) তুলনায় অধিকতর শক্তিশালী হয়। তখন অর্থনৈতিক তৎপরতা বিশেষভাবে বেড়ে যায়। অর্থাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে অর্থনৈতিক তৎপরতা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়। আর জনসংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে অর্থনৈতিক তৎপরতা হ্রাস পায়।
বাংলাদেশ অতি ছোট দেশ। এদেশের সামান্য আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অত্যন্ত বেশী। কিন্তু প্রতিবছর এদেশ শ্রমশক্তি বিদেশে রফতানী করে কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছে। এই বিশাল জনসংখ্যা যদি শ্রমশক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়, তাহ’লে এ জনসংখ্যা ক্ষতির কারণ না হয়ে আশীর্বাদের কারণ হবে। যে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের রাজস্ব খাতে বিরাট ভূমিকা রাখছে, নিশ্চয়ই তা বেকারত্ব দূর করতেও বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যথায় ‘পরিবার পরিকল্পনার’ নামে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ফলে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। একদিকে জনশক্তির অপমৃত্যু, অন্যদিকে অর্থনৈতিক অবক্ষয়। এই জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় কনডম, ইনজেকশন, বড়ি ও খাবার পিল ইত্যাদি। সরকারের পক্ষ থেকে যে খাবার পিল বিতরণ করা হয়, তা অত্যন্ত নিম্নমানের। কিন্তু বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানী যে পিল বের করেছে তা উচ্চ মূল্যে (৫০-৮০ টাকা) ক্রয় করে জনগণ ব্যবহার করছে। এতে পুঁজিবাদীরা জনগণের পকেট ফাঁকা করে চলেছে জন্মনিয়ন্ত্রণের নামে।
গ্রামাঞ্চলে একটি শিশুর জন্ম দানের জন্য এত টাকা ব্যয় করতে হয় না, যত টাকা ব্যয় করতে হয় জন্মনিরোধ উপকরণাদি ক্রয়ের জন্য। ‘‘ইৎরঃরংয গবফরপধষ ঔড়ঁৎহধষ, (খড়হফড়হ : ৮ ঔঁষু, ১৯৬১), চ-১২০’’
জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে শ্রমজীবী লোক দিন দিন কমে যাচ্ছে। যার ফলে পুঁজিবাদীরা উচ্চমূল্যে বিদেশ থেকে শ্রমিক আমদানী করে মিল-কারখানায় উৎপাদন করছে। এতে দ্রব্যমূল্য দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার ফলে পণ্যের ব্যবহারও দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদনও কমে আসছে। অতএব জন্মনিয়ন্ত্রণ আমাদের কোন সুফল বয়ে আনেনি বরং অর্থনৈতিক ও নৈতিকতার মহা ক্ষতির কারণ হিসাবে পরিগণিত হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে এর বিধান : মহান আল্লাহ পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করার ইচ্ছা পোষণ করে আদি পিতা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন। কিন্তু মাতা হাওয়া (আঃ)-কে সৃষ্টির কোন প্রয়োজন ছিল কি? যদি একটু চিন্তা করি, তবে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, মহান আল্লাহ আদম (আঃ)-এর একাকীত্ব দূর করতে জীবনসঙ্গিনী হিসাবে হাওয়া (আঃ)-কে শুধু সৃষ্টি করেননি। বরং আরও একটি বিশেষ কারণে তাঁকে সৃষ্টি করেছেন। তাহ’ল মহান আল্লাহ তাদের ঔরশজাত সন্তান দ্বারা সমগ্র পৃথিবী কানায় কানায় পরিপূর্ণ করে দিতে চেয়েছেন। আর সমস্ত মানব তাঁর (আল্লাহর) একত্ব ঘোষণাপূর্বক দাসত্ব করবে। এ হ’ল আদম ও হাওয়া (আঃ)-এর সৃষ্টির একান্ত উদ্দেশ্য। আমরা সেই অনাগত সন্তানদের নির্বিঘ্নে হত্যা করে চলেছি। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা কর না দারিদ্রের কারণে, আমিই তোমাদের রিযিক দান করি এবং তাদেরও আমিই রিযিক দান করব’ (আন‘আম ৬/১৫১)।
আলোচ্য আয়াতে খাবারের অভাবের আশংকায় অনাগত সন্তানকে হত্যা করতে মহান আল্লাহ স্পষ্ট নিষেধ করেছেন। আবার বললেন, ‘আমি তোমাদের রিযিক দান করি এবং তাদেরও আমিই দিব’। ‘আমিই দিব’ এই প্রতিশ্র“তির ব্যাখ্যা হ’ল অনাগত সন্তানদের রিযিকের মালিক আল্লাহ। তাঁর খাদ্য ভান্ডারে খাবারের হিসাব অকল্পনীয়। আবার তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই তাদের হত্যা করা মারাত্মক ভুল’ (ইসরা ১৭/৩১)।
তিনি যথার্থই বলেছেন, অনাগত সন্তান হত্যা করা বিরাট ভুল। ভূপৃষ্ঠে একচতুর্থাংশ স্থল, বাকী সব সাগর, মহাসাগর। কিন্তু বর্তমানে মহাসাগরে হাওয়াইন দ্বীপপুঞ্জের মত ছোট-বড় দ্বীপ জেগে উঠেছে এবং নদী ভরাট হয়ে চর জেগে উঠেছে। এভাবে আমাদের আবাদী জমি ও বাসস্থান বাড়ছে এতে কোন সন্দেহ নেই।     মহান আল্লাহ বলেন, ‘ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য ও সুখ-শান্তির উপাদান ও বাহন’ (কাহাফ ১৮/৪৬)। আল্লামা আলুসী এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ধন-সম্পদ হচ্ছে প্রাণ বাঁচানোর উপায়। আর সন্তান হচ্ছে বংশ তথা মানব প্রজাতি রক্ষার মাধ্যম। ‘‘পরিবার ও পারিবারিক জীবন, পৃঃ ৩৪০’’
জনৈক রুশ লেখক তার ইরড়ষড়মরপধষ ঞৎধমবফু ড়ভ ডড়সধহ গ্রন্থে বলেছেন, নারী জন্মের উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানববংশ রক্ষা করা। ‘‘ ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ, পৃঃ ৫৮’’ যৌন প্রেরণার অন্তর্নিহিত লক্ষ্য মানববংশ বৃদ্ধির সঙ্গে দেহের প্রতিটি অঙ্গ স্ব স্ব দায়িত্ব পালনে তৎপর। নারী দেহের বৃহত্তম অংশ গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মানোর উদ্দেশ্যেই সৃষ্ট। ‘‘ঞযব চংুপযড়ষড়মু ড়ভ ঝবী, চ-১৭’’ মা হাওয়াসহ পৃথিবীর সমস্ত নারী সৃষ্টির উদ্দেশ্য মানব বংশ রক্ষা ও সন্তান উৎপাদনের মাধ্যমে পারিবারিক কাঠামোতে সন্তানের সুষ্ঠু লালন-পালন।
আযল-এর বিধান : প্রাচীনকালে আরব সমাজে ‘আযল’ করার যে প্রচলন ছিল। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে কোন আলোচনা খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে হাদীছে স্পষ্ট আলোচনা আছে। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হ’ল-
১. জাবির (রাঃ) বলেন, ‘আমরা রাসূলের জীবদ্দশায় ‘আযল’ করতাম অথচ তখনও কুরআন নাযিল হচ্ছিল। ‘‘মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩১৮৪’’ অর্থাৎ পবিত্র কুরআনে ‘আযল’ সম্পর্কে কোন নিষেধবাণী আসেনি। আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)ও তা নিষেধ করেননি।
২. আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সঙ্গে বনী মুস্তালিকের যুদ্ধে বের হয়ে গেলাম। সেখানে কিছু সংখ্যক আরবকে (দাসী) বন্দী করে নিলাম। তখন আমাদের মধ্যে রমণীদের প্রতি আকর্ষণ জাগে। যৌন ক্ষুধাও তীব্র হয়ে উঠে এবং এ অবস্থায় ‘আযল করাকেই আমরা ভাল মনে করলাম। তখন এ সম্পর্কে নবী করীম (সাঃ)-এর নিকটে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি জবাবে বললেন, তোমরা যদি তা কর তাতে তোমাদের ক্ষতি কি? কেননা আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ সৃষ্টি করবেন, তা তিনি নির্দিষ্ট করে রেখেছেন এবং তা অবশ্যই সৃষ্টি করবেন। ‘‘মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৩১৮৬’’
৩. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তুমি কি সৃষ্টি কর? তুমি কি রিযিক দাও? তাকে তার আসল স্থানেই রাখ, সঠিকভাবে তাকে থাকতে দাও। কেননা এ ব্যাপারে আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়ছালা রয়েছে। ‘‘সিলসিলা ছহীহাহ হা/৫৭৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৪০৩৮’’
ইবনে সীরীন-এর মতে, এ বাক্যে ‘আযল’ সম্পর্কে স্পষ্ট নিষেধ না থাকলেও এ যে নিষেধের একেবারে কাছাকাছি এতে কোন সন্দেহ নেই। ‘‘পরিবার ও পারিবারিক জীবন, পৃঃ ৩৩৩’’  হাসান বছরী বলেন, আল্লাহর শপথ, রাসূলের একথায় ‘আযল’ সম্পর্কে স্পষ্ট ভৎর্সনা ও হুমকি রয়েছে। ‘‘পরিবার ও পারিবারিক জীবন, পৃঃ ৩৩৩’’ ইমাম কুরতুবী বলেছেন, ছাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উক্ত কথা থেকে নিষেধই বুঝেছিলেন। ফলে এর অর্থ দাঁড়ায় রাসূল (সাঃ) যেন বলেছেন, তোমরা ‘আযল’ কর না, তা না করাই তোমাদের কর্তব্য। ‘‘পরিবার ও পারিবারিক জীবন, পৃঃ ৩৩৩’’ রাগিব ইসফাহানীর মতে, ‘আযল’ করে শুক্র বিনষ্ট করা এবং তাকে তার আসল স্থানে নিক্ষেপ না করা সম্পর্কে স্পষ্ট নিষেধ। ‘‘পরিবার ও পারিবারিক জীবন, পৃ: ৩৩৭’’  মুয়াত্তা গ্রন্থ প্রণেতা ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন যে, ইবনে ওমর (রাঃ) ছিলেন তাদের অন্যতম যাঁরা ‘আযল’ পছন্দ করতেন না। ‘‘ ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ, পৃঃ ১০১-১০২’’।
‘আযল’ অর্থ হ’ল, পুরুষাঙ্গ স্ত্রী অঙ্গের ভেতর থেকে বের করে নেয়া যেন শুক্র স্ত্রী অঙ্গের ভেতরে স্খলিত হওয়ার পরিবর্তে বাইরে স্খলিত হয়। ‘‘পরিবার ও পারিবারিক জীবন, পৃঃ ৩৩২’’
আইয়ামে জাহেলিয়াতে যেসব কারণে সন্তান হত্যা করা হ’ত, বর্তমান যামানায় জন্মনিয়ন্ত্রণও ঠিক একই কারণে গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু সোনালী যুগের ‘আযল’-এর উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে যুগে তিনটি কারণে মুসলমানদের মধ্যে ‘আযল’-এর প্রচলন ছিল।
(এক) দাসীর গর্ভে নিজের কোন সন্তান জন্মানো তাঁরা পছন্দ করতেন না, সামাজিক হীনতার কারণে।
(দুই) দাসীর গর্ভে কারো সন্তান জন্মালে উক্ত সন্তানের মাকে হস্তান্তর করা যাবে না, অথচ স্থায়ীভাবে দাসীকে নিজের কাছে রেখে দিতেও তারা প্রস্তুত ছিল না।
(তিন) দুগ্ধপায়ী শিশুর মা পুনরায় গর্ভ ধারণ করার ফলে প্রথম শিশুর স্বাস্থ্যহানীর আশংকা অথবা পুনরায় সন্তান গর্ভে ধারণ করলে মায়ের স্বাস্থ্যের বিপর্যয়ের আশংকা, কিংবা সন্তান প্রসবের কষ্ট সহ্য করার অনুপযুক্ত তা চিকিৎসকের পরামর্শে যথাযোগ্য বিবেচনায় এক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
উপরোক্ত তিনটি কারণের মধ্যে প্রথম দু’টি কারণ আধুনিক যুগে বিলুপ্ত হয়েছে। শেষের তিন নম্বর কারণ ব্যতিরেকে সম্পদ সাশ্রয়ের জন্য ও নিজের আমোদ-প্রমোদের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ করা বৈধ নয়।
পরিশেষে বলব, জন্মনিয়ন্ত্রণ জনসংখ্যা বিস্ফোরণ সমস্যার প্রকৃত সমাধান নয়। বরং জনসংখ্যাকে দক্ষ শ্রমশক্তিতে রূপান্তর ও উৎপাদন বাড়ানো, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপকরণাদির উন্নয়নের মধ্যেই রয়েছে এ সমস্যার প্রকৃত সমাধান। জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের অর্থ হচ্ছে না বুঝে পরাজয় বরণ করা। একটি কাপড় কারো শরীরে ঠিকমত ফিট না হ’লে কাপড়টি বড় করার পরিবর্তে মানুষটির শরীর কেটে ছেঁটে ছোট করার মতই জন্মনিরোধ ব্যবস্থা অন্যায় ও অস্বাভাবিক। কেননা বিজ্ঞানের যুগে আমরা মানুষের যোগ্যতা অনুযায়ী তার শ্রমশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারি। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন!!

লেখক: শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট।

নারী ধর্ষণ-নির্যাতন দণ্ডনীয় অপরাধ এবং তার প্রতিকার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

(পূর্ব প্রকাশের পর)
বাইবেল অনুসারে নারী দুর্বল ও নরম স্বভাবের। ঈশ্বর তাদের এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। এ জন্য তাদের সাথে বুদ্ধিপূর্বক চলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর তাৎপর্য হল, তাদেরকে না ঠকানো ও প্রতারিত না করা। তাদেরকে ভোগ্য পন্য না বানানো বা তাদেরকে অধিকার বঞ্চিত না করা। কারণ বাইবেলে একের প্রতি অন্যের ভালোবাসা সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। ভালোবাসা সবসময় ধৈর্য ধরে, দয়া করে, হিংসা করে না, গর্ব করে না, অহংকার করে না, খারাপ ব্যবহার করে না, নিজের সুবিধার চেষ্টা করে না, রাগ করে না, কারো মন্দ ব্যবহারের কথা মনে রাখে না, মন্দ কিছু নিয়ে আনন্দ করে ন। বরং যা সত্য তাতে আনন্দ করে। “করিন্থিয়, ১৩:৪-৬”।
নারী নির্যাতন রোধে বাইবেলের দশ আজ্ঞায় সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘ব্যভিচার করো না। অন্যের ঘর, স্ত্রী, দাসদাসী, গরু-গাধা কিংবা অন্য কিছুর উপর লোভ করো না।’ “যাত্রাপুস্তক, ২০:১৪ও১৭”। অন্যত্র আরো কড়াকাড়িভাবে বলা হয়েছে, ‘যে কেউ কোনো স্ত্রীলোকের দিকে কামনার চোকে তাকায় সে তখনই মনে মনে তার সঙ্গে ব্যভিচার করল। তোমার ডান চোখ যদি তোমাকে পাপের পথে টানে তবে তা উপড়ে দুরে ফেলে দাও। তোমার সমস্ত দেহ নরকে পোড়ার চেয়ে বরং তার একটা অংশ নষ্ট হওয়া তোমার পক্ষে ভাল। যদি তোমার ডান হাত তোমাকে পাপের পথে টানে তবে তা কেটে ফেলে দাও। তোমার সমস্ত দেহ নরকে যাওয়ার চেয়ে বরং একটা অংশ নষ্ট হওয়া তোমার পক্ষে ভাল। “মথি, ৫:২৭-৩০”।  নারীদের ভুল-ত্র“টি শুধরে দেয়ার নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘বয়স্কা স্ত্রীলোকদের মায়ের মত মনে করে সংশোধন করো এবং যুবতীদের বোনের মত মনে করে পবিত্রভাব বজায় রেখে সংশোধন করো। “তীমথিয়, ৫:২”। বিভিন্ন বয়সী নারীগণের সাথে পুরুষরা কেমন আচরণ করবে এ নির্দেশনা থেকে তা জানা যায়। এ নির্দেশনা মেনে চললে নারীদের প্রতি বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে না।
সমাজে নারীঘটিত সকল সমস্যা সমাধানে খ্রিষ্টধর্মের মূলীভূত চেতনা ও শিক্ষা কার্যকর হতে পারে। খ্রিষ্টধর্মের চেতনা অনুসারে, মানবদেহ ঈশ্বরের এবং এ দেহ ঈশ্বরের থাকার মন্দির। মানবদেহকে ঈশ্বরের গৌরবের জন্য ব্যবহার করা যায়। যৌন সম্পর্ক ঈশ্বরের দেয়া একটি দান। এ সম্পর্কে বাইবেলে বলা হয়েছে, ‘কিন্তু চারদিকে অনেক ব্যভিচার হচ্ছে, সেজন্য প্রত্যেক পুরুষের নিজের স্ত্রী থাকুক আর প্রত্যেক স্ত্রীর নিজের স্বামী থাকুক।’ “করিন্থিয়, ৭:২”। বাইবেলে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কেও সর্তক করা হয়েছে, ‘প্রত্যেকে যেন বিয়ের ব্যাপারটাকে সম্মানের চোখে দেখে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিয়ের পবিত্র সম্পর্ক রাখা উচিত, কারণ যে কোনো রকম ব্যভিচার হোক না কেন, যারা সেই দোষে দোষী ঈশ্বর তাদের শাস্তি দেবেন।’ “ইবরীয়, ১৩:৪”। খ্রিস্টধর্মে অবশ্য সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে পরিবারের চাহিদা মিটাবার ভার পুরুষকে দেয়া হয়েছে। “আদিপুস্তক, ৩:১৯”।
একজন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তারা তাদের দায়িত্ব কিভাবে পূর্ন করবেন বাইবেলে সে সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘দেহের দিক থেকে স্ত্রীর যা পাওনা, তার স্বামী তাকে তা দিক। সেভাবে স্ত্রীও স্বামীকে দিক। স্ত্রীর দেহ তার নিজের নয়, তার স্বামীর। একইভাবে স্বামীর দেহ তার নিজের নয়, তার স্ত্রীর। একে অন্যের সঙ্গে দেহে মিলিত হতে অস্বীকার করো না; তবে কেবল প্রার্থনা করতে সুযোগ পাবার জন্য একমত হয়ে কিছুকাল আলাদা থাকতে পার। তারপরে আবার একসঙ্গে মিলিত হয়ো, যেন নিজেদের দমনের অভাবে শয়তান তোমাদের পাপের দিকে টানতে না পারে’। “করিন্থিয়, ৭:৩-৫”।  খ্রিস্টসমাজে চারপাশে যৌন হয়রানির যে ঘটনা ঘটে খ্রিস্টধর্মীয় বিধান মেনে প্রত্যেক পুরুষ স্ত্রী আর প্রত্যেক স্ত্রী স্বামী গ্রহণ করলে যৌন হয়রানীমূলক কার্যকলাপ সংঘটিত হতে পারে না।
খ্রিস্টধর্ম সদাচার ও সুনীতির যে নির্দেশনা রয়েছে তা যথাযথভাবে পালন করলে এবং মানুষ ধর্ম বিশ্বাসে অটুট থাকলে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটার কথা নয়। কিন্তু মানুষ পাপের পথে গিয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়ে সমাজকে কুলষিত করছে। বাইবেলে বলা হয়েছে, এভাবে মানুষ ঈশ্বরকে মানতে চায়নি বলে ঈশ্বরও পাপপূর্ণ হতে তাদের ছেড়ে দিয়েছেন। আর সেজন্যই মানুষ অনুচিত কাজ করতে থাকে। সব রকম অন্যায়, মন্দকাজ, লোভ, নীচতা, হিংসা, খুন, মারামারি, ছলনা ও অন্যের ক্ষতি করার ইচ্ছায় তারা পরিপূর্ণ। তারা অন্যের বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, অন্যের নিন্দা করে এবং ঈশ্বরকে ঘৃণা করে। তারা বদমেজাজি, অহংসারী ও গর্বিত। অন্যায় কাজ করার জন্য তারা নতুন নতুন উপায় বের করে। তারা মা-বাবার অবাধ্য, ভালমন্দের জ্ঞান তাদের নেই আর তারা অবিশ্বস্ত। পরিবারের প্রতি তাদের ভালবাসা নেই এবং তাদের অন্তরে দয়ামায়া নেই। ঈশ্বরের এই বিচারের কথা তারা ভাল করেই জানে যে, এ রকম কাজ যারা করে তারা মৃত্যুর শাস্তির উপযুক্ত। এ কথা জেনেও তারা যে কেবল এ সব কাজ করতে থাকে তা নয় কিন্তু অন্য যারা তা করে তাদের সায়ও দেয়। “রোমীয়, ১:২৮-৩২”।
বাইবেলের এ সকল নির্দেশনা মেনে চললে কোন খ্রিস্টধর্মালম্বীর পক্ষে কোনো নারীকে নির্যাতন করা সম্ভব নয়। বরং এ সকল নির্দেশনা মেনে চললে প্রত্যেক ধর্মভীরু খ্রিস্টানের নারীর প্রতি ভালো দৃষ্টিতে দেখায় অভ্যাস তৈরি হবে, অন্যের প্রতি মমত্ববোধ ও সহমর্মিতা বেড়ে যাবে।
বৌদ্ধধর্মে নারী: বৌদ্ধধর্মীয়গণ মৈত্রীপরায়ণ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন পদ্ধতিতে বিশ্বাসী। তারা বুদ্ধের অহিংসা নীতি, সংযম ও ধৈর্য সংহতির মন্ত্রে উজ্জীবিত। তারা বিশ্বাস করে, বৈরিতা কখনো প্রশমিত হয় না, বৃদ্ধি পায়। অহিংসা ও মৈত্রী দিয়েই বৈরিতা প্রশমিত হয়। এটিই জাগতিক নিয়ম। বৌদ্ধ ধর্মমতে, জীবন সমৃদ্ধির জন্য করুণা ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন অপরিহার্য। এ দুটি গুণ ছাড়া জীবন কখনো পরিপূর্ণতা সাধন করে না। জীবনকে পূর্ণ মনুষ্যত্বে পর্যবসিত করতে হলে দয়া, সেবা, দান, মমতা, ভালবাসা, সহিষ্ণুতা, পরোপকারিতা, সমব্যাথি হওয়া প্রভৃতি ধর্মগুণের প্রয়োজন হয়। এগুলোই মানুষকে করুণাবান ও মৈত্রীবান হতে শেখায়। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, মৈত্রীর দ্বারা ক্রোধকে জয় করবে, অসাধুতাকে জয় করবে সাধুতার দ্বারা, কৃপণকে দান দ্বারা এবং মিথ্যাবাদীকে সত্য দ্বারা জয় করবে। “ধম্মপদ, শ্লোক ২২৩”। অন্যত্র বলা হয়েছে, পরস্পরকে বঞ্চনা করো না, হিংসা বা আক্রোমের বশবর্তী হয়ে পরস্পরের মধ্যে দুঃকোৎপাদনের চেষ্টা করো না। “ধম্মপদ, শ্লোক ৬”।  মহামতি বুদ্ধ উপদেশ দিয়েছেন, যারা পরকে দুঃখ দিয়ে কিংবা পরের অনিষ্ট সাধন করে নিজের সুখ কামনা করে সেই বৈর-সংসর্গ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ কোনদিন মুক্তি লাভ করতে পারবে না। শাস্ত্র তাই বলছে, ‘পরদুক খুপদানের সো অত্তনো সুখমিচ্ছতি রেবসংস¹ সংসটপাঠো বেরা সোন পরিমুচ্চতি’। “ধম্মপদ, শ্লোক ২৯১”।
বৌদ্ধধর্মের মহানির্বাণ সূত্রে জানা যায়, তথাগত বুদ্ধ সপ্ত অপরিহানীয় ধর্মে বজ্জীদের উদ্দেশ্যে যে সাতটি অমূল্য উপদেশ প্রণয়ন করেছিলেন সেখানে পঞ্চমটিতে রয়েছে, মাতৃজাতিকে সম্মান করার কথা, কুল নারীদের শ্রদ্ধা করার কথা, তাদের মান-সম্মান রক্ষা করার কথা। সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম হল, খাবতীবঞ্চ আনন্দ বজ্জী যা তা কুরিখিযো, কুল কুমারিয়ো তা ন ওক্কসস বাসেসন্তি, বুদ্ধিযেব আনন্দ বজ্জীনং পাটিকঙ্খ নো পরিহানী। “ধম্মপদ, শ্লোক ২৪৯”। অর্থাৎ আনন্দ! যতদিন বজ্জীগন কুলকুমারী ও রমণীদেরকে সম্মান করবে, শ্রদ্ধা করবে এবং বলপূর্বক অপহরণ করে নিজ গৃহে বসবাস করাবে না ততদিন বজ্জীদের শ্রীবৃদ্ধি হবে, কখনো তাদের পরিহানী হবে না।
বৌদ্ধগন যে কোনো মানবতার কাজে উৎসাহ যোগান। ত্রিপিটকে মহামতি বুদ্ধ বলেছেন,
অসুভানুপসিসং বিহরন্তং, ইন্দ্রিয়েসু সুসংতং
ভোজননাহি চ মত্তঞঞুং, সদ্ধং, আরদ্ধবীরিযং
তং বে নপ্পসহতি মারো বাতো সেলংব পব্বতং। “ধম্মপদ, শ্লোক ৮”।
অর্থাৎ যিনি বাহ্যিক শোভা বা সৌন্দর্য দর্শন হতে বিরত থাকেন, সকল ইন্দ্রিয়সমূহকে সংযত রাখেন, ভোজনে, মাত্রাজ্ঞান ও সেবাপরায়ণ হন, শ্রদ্ধাবান ও আরদ্ধবান, তারা কখনো পরাভূত হন না, যেমনি হয় না প্রবল বায়ুতে শিলাময় পর্বত।
ইসলামে নারী: রাসূলুল্লাহ (সা.) এর আবির্ভাব প্রাক্কালীন সময়ে আরবে নারী নির্যাতন চরম আকার ধারন করেছিলো। নারীর জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের কোনো নিরাপত্তা ছিলো না। প্রকাশ্য আসরে ব্যভিচারিতার নিলর্জ্জ প্রদর্শনে নারীকে বাধ্য করা হয়েছিল। খুন, রাহজানি, ধর্ষণ, অপহরণ, ব্যভিচারিতার মিথ্যা অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতা প্রভৃতি নারী জীবনের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠেছিলো। নারীদের চলাফেরা, খোলামেলা পোশাক আর উত্তেজক শারীরিক কসরত পুরুষকে এ কাজে আরো বেশি উদ্বুদ্ধ করছিলো। ইসলাম নারীকে এমন নির্যাতিত জীবনের পরিবর্তে সম্মানের জীবন দেয়ার ব্যবস্থা করে। নারী নির্যাতনের সকল পথ ও পদ্ধতি নিষিদ্ধ করে নারীর মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিময় জীবনযাত্রা নিশ্চিত করে। “অধ্যাপক নাজির আহমেদ ও ড. মুহাম্মদ রুহুল আমিন, মুসলিম সংস্কৃতির ইতিহাস, ঢাকা: আরাফাত পাবলিকেশন্স, ১৯৮৯, পৃ: ২৬৭”।
বর্তমান সময়ে পরিবারে ও সমাজে নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়। কন্যা হয়ে জন্মানোর অপরাধে তাকে মা-বাবা ও অন্যান্যদের বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়। ছেলে সন্তানের চেয়ে সকল ক্ষেত্রে সে কম সুবিধা ও অধিকার পায়। বিবাহের ক্ষেত্রেও তার কোনো মতামত নেয়া হয় না। বিয়ের পর স্বামী ও তার আত্মীয়দের যৌতুক দাবি এবং সে কারণে নির্যাতন কিংবা এমনিতেই মৌখিক, শারীরিক ও মানসিক লঞ্ছনা নারীকে দুঃসহ জীবনে ঠেলে দেয়। আর্থিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা, মানুষ হিসেবে সমান অধিকার ও মর্যাদা না দেয়া, নারীর পাপের কারণ বলে অবহেলা ও উপেক্ষা করা, ব্যভিচারে বাধ্য করা, ধর্ষণ, হত্যা, অকারণে তালাক দেয়া, মিথ্যা অপবাদ দেয়া, অসম শ্রমে বাধ্য করা, ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা, ধর্ম ও শিক্ষা চর্চা থেকে দূরে রাখা, নাচ, গান, বিজ্ঞাপন, নাটক এবং চলচ্চিত্রে নারীদেহকে পন্য হিসেবে ব্যবহার, বিবাহ-পূর্ব প্রেম এবং শিক্ষা ও চাকুরি জীবনে অবাধ নারী সম্ভোগের ব্যবস্থা রাখা প্রভৃতি পদ্ধতিতে নারী নির্যাতনের শিকার হয়। “আল্লামা আব্দুস সামাদ রাহমানী, নারী মুক্তি কোন পথে? ভাষান্তর: মুফতী মুঈনদ্দীন তৈয়বপুরী, ঢাকা: ২০০০, পৃ: ৭৭”।  ইসলামের বিধান অনুসারে নির্যাতনের এ সকল ক্ষেত্র থেকে নারীকে কিভাবে রক্ষা করা যায় কুরআন-হাদীসে তার বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। কোনো নারীর প্রতি কোনো পর-পুরুষ ইচ্ছা করে তাকিয়ে থাকতে পারবে না। বরং দৃষ্টি সংযত রাখবে। নারীও কোনো পর-পুরুষের দিকে তাকিয়ে থাকবে না। অনিচ্ছায় হঠাৎ করে চোখ পড়ে গেলেও সাথে সাথে ফিরিয়ে নেবে। কেননা কামনা সৃষ্টি হওয়া বা লোভ জন্ম নেয়ার শুরু চোখের দেখা থেকেই হয়। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেনো তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেনো তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে। “আল-কুরআন, ২৪: ৩০-৩১”।  সৃষ্টিগতভাবেই নারীদেহের প্রতি পুরুষের এবং পুরুষের প্রতি নারীর জৈবিক আগ্রহ থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় একে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও পুরুষ বা নারীদেহের উত্তেজক প্রদর্শনী এমনকি সাধারণ প্রকাশও বিপরীত লিঙ্গকে উত্তেজিত করে তুলতে পারে। ফলে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে নারী নির্যাতনের শিকার হয় বেশি। এ কারণে সে অপর পুরুষকে নিজের রূপ সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না। অপর পুরুষের মন বা দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় এমন পোশাক পরবে না। অলংকার বা প্রসাধনে নিজেকে আকর্ষণীয় করে পরের সামনে উপস্থাপন করবে না। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন নারীরা সাধারণভাবে যা প্রকাশ পায় তা ছাড়া যেনো তাদের আবরণ প্রদর্শন না করে। তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেনো তারা মাথায় কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখে। গোপন আবরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে তারা যেনো সজোরে পদক্ষেপ না করে। “আল-কুরআন, ২৪: ৩১”।
মুমিন পুরুষ এবং নারী তাদের লজ্জাস্থান হিফাযত করবে। একজন অপরজনকে তার লজ্জাস্থান দেখাবে না এবং যে কোনো হারাম কাজে লজ্জাস্থান ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে। উল্লেখ্য যে, সাধারণভাবে পুরুষের লজ্জাস্থান হলো নাভীমূল থেকে হাটু পর্যন্ত এবং নারীর লজ্জাস্থান হলো তার হাত, পা ও মুখমন্ডল ছাড়া পুরো শরীর। “আবদুল হামিদ আহমদ আবুসুলায়মান, বৈবাহিক সমস্যা ও কুরআন মজীদের সমাধান, ঢাকা: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থ্যট, ২০০০, পৃ: ৭৭”।
মুমিন নর-নারী কেউ কারো ঘরে অনুমতি না নিয়ে প্রবেশ করবে না। কেননা এতে লজ্জাস্থানের হিফাযত অসম্ভব হয়ে পড়বে। আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেরদের ঘর ব্যতীত অন্য কারো ঘরে ঘরবাসীদের অনুমতি না নিয়ে এবং তাদের সালাম না করে প্রবেশ করো না। যদি তোমরা ঘরে কাউকে না পাও তাহলেও তাতে প্রবেশ করবে না। যতক্ষণ না তোমাদের অনুমতি দেয়া হয়। যদি তোমাদের বলা হয়, ‘ফিরে যাও’, তাহলে তোমরা ফিরে যাবে”। “আল-কুরআন, ২৪: ২৭-২৮”।
মুমিন নর-নারী পরস্পরের পবিত্রতার ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করবে। কেউ কারো ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষন করে তাকে মানসিক নির্যাতনের শিকার বানাবে না। আল্লাহ বলেন, “যখন তারা অপবাদ সম্পর্কে শুনলে তখন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা আপন লোকদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষন করলো না কেনো? এবং বললো না, এটাতো সুস্পষ্ট অপবাদ। “আল-কুরআন, ২৪:১২”।
মুসলিম সমাজে অশ্লীল অশোভন কোনো বিষয়ের স্থান নেই। সমাজে অশ্লীলতা প্রসার পেলে নারীর মর্যাদা নষ্ট হয়। তার সম্মান বিনষ্টের সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেয়। আল্লাহ তাই শুধু অশ্লীল আচরণ নয় বরং অশ্লীল বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলাও হারাম করেছেন। তিনি বলেছেন, “নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্যে দুনিয়া ও আখিরাতের মর্মন্তু শাস্তি রয়েছে।” “আল-কুরআন, ২৪:১৯”।
সৎ চরিত্রবান পবিত্র নারীর প্রতি ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ উত্থাপন কররে নারী নিদারুণ মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। নারীকে নির্যাতন থেকে রক্ষা করার জন্যে মহান আল্লাহ একে কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা দিয়েছেন, “যারা সতি ও পবিত্র চরিত্রবতী নারীর প্রতি (ব্যভিচারের) অপবাদ আরোপ করে কিন্তু চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি কশাঘাত করবে এবং তাদের সাক্ষ্য কখনোই গ্রহণ করবে না এরাইতো সত্যত্যাগি।” “আল-কুরআন, ২৪:৪”।
নারী-পুরুষ উভয়ে পারস্পরিক সম্মতিতে অবৈধ দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তুললে এবং তা চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রমাণ হলে তাদেরকে একশত কশাঘাত করা হবে। “আল-কুরআন, ২৪:২”। এ শাস্তি অবিবাহিত নারী-পুরুষের জন্য। যদি তারা বিবাহিত হয় তাহরে তাদেরকে পাথর দ্বারা আঘাত করে হত্যা করা হবে। “ইমাম বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায়: আল-হুদূদ, অনুচ্ছেদ: রজমুল মুহসিন, বৈরুত: দারু ইবনু কাছীর, ১৪০৭ হি./ ১৯৮৭ খ্রি: খ.৬, হাদীস নং- ৬৪২৯”। কিন্তু অপরাধটি যদি নারীর অমতে হয়, তাকে যদি এ কাজে বাধ্য করা হয় এবং সাক্ষী প্রমাণের ভিত্তিতে নারীর অসহায়ত্ব ও অমত সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে তাহরে এ জন্যে নারী কোনো শাস্তি পাবে না। রবং এজন্যে ধর্ষক পুরুষই শাস্তি পাবে। সে অবিবাহিত হলে তাকে একশত কশাঘাত করা হবে। সে বিবাহিত হলে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে। এক্ষেত্রে নারীর অব্যাহতি প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “আর যে তাদেরকে (ব্যভিচারে) বাধ্য করে তাহলে তাদের জবরদস্তির পর আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” “আল-কুরআন, ২৪:৩৩”।
স্বামী যেনো ব্যভিচারিতার মিথ্যা অভিযোগ তুলে স্ত্রীকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে না পারে সে জন্যে আল্লাহ লিআনের বিধান দিয়েছেন। এ প্রক্রিয়ায় ব্যভিচারের অভিযোগ তুলতে স্বামীকে চারবার আল্লাহর নামে কসম করে বলতে হয়- তার স্ত্রীর ব্যাপারে ব্যভিচারের অভিযোগ উত্থাপনের ব্যাপারে সে সত্যবাদী। পঞ্চমবারে শপথ করে বলতে হয়- ‘যদি সে এ ব্যাপারে মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তার উপর আল্লাহর লানত।’ “আল-কুরআন, ২৪:৬-৯”। অভিযোগ উত্থাপনের পর স্বামী যদি কসম করতে অস্বীকার করে তাহলে তাকে মিথ্যা অপবাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে। “ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মাআদ, দিল্লী: ১৪০৬, পৃ:৭৫”।
ব্যভিচারের শাস্তির বিধান বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য হতে চারজন সাক্ষী আনো। যদি তারা সাক্ষ্য দেয় তবে তাদেরকে (নারীদের) ঘরে আবদ্ধ করে রাখো, যে পর্যন্ত না তাদের মুত্যু হয় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা করেন। তোমাদের মধ্যে যে দুজন এতে লিপ্ত হবে তাদেরকে শাস্তি দিবে। যদি তারা তওবা করে এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয় তাহলে তা হতে বিরত থাকবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু।” “আল-কুরআন, ৪:১৫-১৬”।  এ আয়াতদ্বয়ে প্রথমত ব্যভিচার প্রমাণের বিশেষ পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে যে, চারজন পুরুষের সাক্ষ্য দরকার হবে। দ্বিতীয়ত ব্যভিচারের শাস্তি নারীর জন্যে ঘরে আবদ্ধ রাখা এবং উভয়কে কষ্ট প্রদান করার কথা উল্লেখিত হয়েছে, এ প্রসঙ্গে একথাও বলা হয়েছে যে, ব্যভিচারের শাস্তি সংক্রান্ত এই বিধানই সর্বশেষ নয়, বরং ভবিষ্যতে অন্য বিধান আসবে। সূরা নূরে আল্লাহ সেই অন্য বিধান বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “ব্যভিচারী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ তাদের প্রত্যেককে একশত করে কশাঘাত করো। আল্লাহর বিধান কার্যকর করায় তাদের প্রতি দয়া যেনো তোমাদের প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও। মুমিনদের একটি দল যেনো তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” “আল-কুরআন, ২৪:২”। অর্থাৎ শাস্তিটি গোপনে দেয়া যাবে না, দিতে হবে প্রকাশ্যে। সূরা নূরের আলোচ্য আয়াতে কোনোরূপ বিবরণ ও বিশেষায়ন ছাড়াই ব্যভিচারের শাস্তি একশত কশাঘাত বর্ণিত হয়েছে। এ শাস্তি কোনো ধরনের পুরুষ ও নারীর জন্যে আল্লাহ তার সুনির্ধারিত ব্যাখ্যা দেননি। কিন্তু তার পরোক্ষ নির্দেশ ও নির্দেশনায় রাসূলুল্লাহ সা. এ শাস্তির প্রয়োগগত দিক বিশ্লেষণ করে বলেছেন, “আমার নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করো। আল্লাহ ব্যভিচারী পুরুষ ও নারীর জন্যে বিধান বিবৃত করেছেন। তা হচ্ছে, অবিবাহিত নারী ও পুরুষের জন্যে একশত কশাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন আর বিবাহিত নারী ও পুরুষের জন্যে একশত কশাঘাত ও পাথরের আঘাতে হত্যা”। “ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, অধ্যায়: আল-হুদূদ, অনুচ্ছেদ: হাদ্দুয যিনা, বৈরূত: দারু ইহায়াহতি তুরাছিল আরাবিয়্যি, তা.বি., খ.৩, হাদীস নং-১৬৯০”।
আবু হুরায়রা ও যায়দ ইবনে খালিদ আল-জুহানী রা. এর বর্ণনা থেকে বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়। তাঁরা বর্ণনা করেন, জনৈক বিবাহিতা মহিলা তার অবিবাহিত চাকরের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। ব্যভিচারীর পিতা তাকে নিয়ে রাসূলূল্লাহ সা. এর নিকট উপস্থিত হন। স্বীকারোক্তির মাধ্যমে ঘটনা প্রমাণিত হয়ে গেলে রাসূলূল্লাহ সা. বলেন “আমি তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফয়সালা করবো”। তারপর তিনি আদেশ দিলেন ব্যভিচারী অবিবাহিত ছেলেকে একশত কশাঘাত করো”। তিনি বিবাহিত মহিলাকে পাথরের আঘাতে হত্যা করার জন্য উনায়স রা. কে আদেশ দিলেন। উনায়স রা. নিজে মহিলার স্বীকারোক্তি নিলেন। তারপর তার উপর প্রস্তারঘাতে হত্যার বিধান প্রয়োগ করলেন”। “ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, অধ্যায়: আল-হুদূদ, অনুচ্ছেদ: মান ইতারাফা আলা নাফসিহি বিয-যিনা, প্রাগুক্ত, খ.৩, হাদীস নং-১৬৯৭”।
এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বিবাহিত ও অবিবাহিতকে ভিন্ন ধরনের শাস্তি দিয়েছেন এবং দুটো শাস্তিকেই আল্লাহর ফয়সালা বলে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ হলো, যদিও কুরআনে প্রস্তারাঘাতে হত্যার বিধান বিধান দেয়া হয়নি কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা. এ ফয়সালা ওহীর মাধ্যমে আল্লাহর নিকট থেকেই পেয়েছেন। “আবদুল হালীম আবু শুককাহ, রসূলের স. যুগে নারী স্বাধীনতা, ঢাকা: বাংলাদেশে ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থ্যট, ২০১১, খ.১, পৃ:৪৩”।
নারীদেরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হলে বা নির্যাতন করা হলে তার প্রতিবিধানে ইসলাম কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। নারীর শ্লীলতাহানির জন্য নির্যাতন হলে সংশ্লিষ্ট পুরুষকে ব্যভিচারের শাস্তি দিতে হবে। আর্থিক বা অন্য কোনো বৈষয়িক কারণে নারীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হলে ইসলামী আদালত কিসাসের বিধান অনুসারে অপরাধীকে শাস্তি প্রদান করবে। যতটুকু নির্যাতন নারীকে করা হয়েছে বা যেভাবে তাকে আহত করা হয়েছে কিংবা আঘাত করা হয়েছে, নির্যাতনকারীকেও ঠিক ততোটুকু পরিমাণ আঘাত করতে হবে। কুরআন মাজীদে এ জাতীয় শাস্তির উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, “আমি তাদের জন্য তাওরাতের বিধান দিয়েছিলাম যে, প্রাণের পরিবর্তে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁেতর বদলে দাঁত এবং জখমের বদলে সমান জখম। এরপর কেউ যদি তা ক্ষমা করে তাহলে ক্ষমাকারীর পাপ মোচন হবে। আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুসারে যারা বিচার ফয়সালা করে না তারাই জালিম”। “আল-কুরআন, ৫:৪৫”।
তাই শারীরিকভাবে নারী যতটুকু নির্যাতিত হবে, ইসলামী আইনের আলোকে ততটুকু নির্যাতন নির্যাতনকারীর উপর চালানো যাবে। অবশ্য নারী নিজে এই কাজ করবে না। ইসলামী আদালত নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শাস্তিদানের ব্যবস্থা করবে। নারীকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের সাথে সাথে যদি তাকে অসম্মান করার জন্য অশালীন কোনো কাজ করা হয় বা কোনো কথা বলা হয়, অপরাধের ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনা করে বিচারক সে জন্যও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
এসিড নিক্ষেপ ভয়ানক কাপুরুষতা এবং অমানবিক বর্বরতা। বাংলাদেশে এটি ভীতিকর অবস্থায় এসে উপনীতি হয়েছে। এসিড নিক্ষেপের ব্যাপারে কিসাসের শাস্তিই হবে কার্যকর ব্যবস্থা। “গাজী শাসছুর রহমান, ইসলামে নারী ও শিশু প্রসঙ্গ, ঢাকা: ১৯৮১, পৃ: ৬০”। অর্থাৎ যে এসিড নিক্ষেপ করবে, তাকেও এসিড দিয়ে ঝলসে দেয়া হবে, ততটুকু, যতটুকু সে করেছে। এর পাশাপাশি এসিড নিক্ষেপের সাথে সাথে সন্ত্রাস সৃষ্টির একটি সম্পর্ক রয়েছে বলে সন্ত্রাসীর জন্য ইসলাম যে শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়েছে এসিড নিক্ষেপকারীর উপর সে শাস্তিও কার্যকর করা যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের শাস্তি হলো, তাদেরকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হবে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়ার জীবনে এটাই তাদের লাঞ্ছনা আর আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি”। “আল-কুরআন, ৫:৩৩”।
ইসলামের শাস্তিবিধান অনুসারে এসকল শাস্তি প্রকাশ্যে জনসমাবেশে কার্যকর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো মমতা বা দয়া দেখানো যাবে না। তাহলে মূলত অপরাধী আরো অপরাধ করার উৎসাহ পাবে। শাস্তি যদি জনসমাবেশে প্রকাশ্যে কার্যকর করা হয় তাহলে নতুন করে কেউ আর একই অপরাধ করতে সাহসী হবে না। “এ জেড এম শামসুল আলম, ইসলামী প্রবন্ধমালা, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশণ, ২০০৪, পৃ: ২৮৭”। শাস্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রে এই নীতি ও পদ্ধতি উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন, “আল্লাহর বিধান কার্যকর করায় তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের প্রভাবিত না করে, যদি তোমারা আল্লাহ এবং আখিরাতে বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে”। “আল-কুরআন, ২৪:২”। এমন কঠোর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হলে এসিড নিক্ষেপ থেকে নারীকে সহজেই রক্ষা করা যাবে।
পথে-প্রান্তরে নারী নানা অবাঞ্ছিত পরিরস্থিতির শিকার হয়। বখাটে এবং ভদ্রবেশী বিভিন্ন বয়সের পুরুষরা তাদেরকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে। অশ্লীল কথা বলে, অঙ্গভঙ্গি করে, শীল বাজিয়ে, স্বাভাবিক পথচলা ব্যাহত করে, নানা কুপ্রস্তাব দিয়ে প্রভৃতি রকমারি পদ্ধতিতে নারীকে উত্ত্যক্ত করা হয়। বলা বা লেখায় নারীর প্রতি উত্ত্যক্তকরণের ক্ষতিকর প্রভাব বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। বরং সংশ্লিষ্ট নারীই এই বিড়ম্বনার অন্তহীন কষ্টের কথা বলতে পারেন। যে কারণে আমরা বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে উত্ত্যক্তকরণের শিকার নারীকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে দেখি। “ইসহাক ওবায়দী, যুগে যুগে নারী, ঢাকা: ১৯৯৭, পৃ: ৫৪”। এসব ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান হলো, উত্ত্যক্তকরণের কারণে নারী যদি আত্মহননে পথ বেছে নেয় তাহলে সংশ্লিষ্ট উত্ত্যক্তকারী মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হবে। কারণ প্রত্যক্ষভাবে হত্যায় অংশ না নিলেও সেই মূলত হত্যাকারী। তাকে ইসলাম নির্ধারিত হত্যার শাস্তিই দেয়া হবে। আর যদি উত্ত্যক্তকৃত নারী আত্মহননের পথ বেছে না নেয় তাহরে সমাজে বিশৃঙ্খলা-বিপর্যয় এবং অশালীন কার্যকলাপ সৃষ্টির দায়ে উত্যক্তকারীদের বিরুদ্ধে বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দন্ডবিধান কার্যকর করা হবে। “ড. জামাল আল বাদাবী, ইসলামী শিক্ষা সিরিজ, ঢাকা: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থ্যট, ২০০৮, পৃ: ৮৭”।
বাংলাদেশে যৌতুক এক ভয়ঙ্কর বিভীষিকা। হিন্দুধর্মবালম্বীদের বিবাহরীতিতে আবশ্যকীয় বিষয় হিসেবে যে পণপ্রথার ব্যবস্থা রয়েছে তাই যৌতুক হিসেবে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। হিন্দু ধর্মমতে পিতা-মাতার সম্পদে নারীর কোনো অংশ নেই বলে বিবাহের সময় স্বামী-পক্ষ যথাসম্ভব বেশি বেশি অর্থ ও উপহার পণ হিসেবে গ্রহণ করে। বিবাহের আগে দরকষাকষির মাধ্যমে এটা নির্ধারিত হয়ে থাকে। ইসলামে এমন বিধান নিষিদ্ধ। ইসলামে বরং বিবাহের জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে মোহর প্রদান করতে হয়। যৌতুক তাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ইসলাম বিরুদ্ধ প্রথা। মুসলিমদের এ প্রথায় অভ্যস্ত হওয়ার অর্থ হলো ইসলামের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাওয়া। ইসলামী আদালত ইসলামী বিধানের বিরুদ্ধাচরণের জন্য যারা যৌতুক দাবি করবে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থা অনুসারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। “বি আইশা লেমু ও ফাতেমা হীরেন, ইসলামের দৃষ্টিতে নারী, ঢাকা: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থ্যট, ২০১০, পৃ: ২১”।
নারী হওয়ার কারণে তার প্রতি কোনো প্রকার অসম আচরণ করা যাবে না। “মুহাম্মদ আবদুর রহীম, পরিবার ও পারিবারিক জীবন, ঢাকা: খায়রুন প্রকাশনী, ১৯৮৮, পৃ:৮৮”। যেমন মেয়ে শিশুকে কম খেতে দেয়া, ছেলে শিশুকে বেশি খেতে দেয়া, মেয়ে শিশুকে কম আদর করা বা অবহেলা করা আর ছেলে শিশুকে বেশি আদর করা, নারীকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা আর পুরুষকে সকল উত্তারধিকারের মালিক করে দেয়া। নারী বলে কাউকে কাজে নিয়োগ না দেয়া (যদি সে কাজে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে শরীয়তের নিষেধাজ্ঞা থাকে, সে কথা স্বতন্ত্র), নারী হওয়ার কারণে তাকে লেখাপড়া থেকে দূরে রাখা ইত্যাদি বিষয়গুলো ইসলাম সমর্থন করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইসলাম বরং মেয়ে শিশু ও নারীকেই পুরুষের উপর অধিক মর্যাদা এবং অধিকতর অধিকার প্রদান করে থাকে। “মুহাম্মদ আবদুর রহীম, নারী, ঢাকা: খায়রুন প্রকাশনী, ২০০৮, পৃ: ৪৭”।
বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নারীরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। এ দেশের পুরুষরা ইসলামের বিধি-বিধান সত্যিকারার্থে অনুশীলন করে না। তারা নারীকে মর্যাদা দেয়ার পরিবর্তে কখনো ভোগের সামগ্রী মনে করে। এমতাবস্থায় যে সকল নারীর ক্ষমতা আছে তারা ব্যক্তি পর্যায় থেকে জীবনের সকল পর্যায়ে ইসলামের উন্নত নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, সন্তানদের ইসলামের নৈতিকতা সমৃদ্ধ করে তুলতে পারেন, নিজেরা ইসলামের শালীনতার বিধান মেনে চলতে পারেন। তাহরে আশা করা যায়, অনেক বিব্রতকর অবস্থা থেকে তারা এমনিতেই রক্ষা পাবেন। বাংলাদেশে যত নারী এসিডদগ্ধ হয়েছে তাদের কেউ-ই পর্দানশীল বা বোরখা পরিহিতা নারী নন। এ থেকে এটাও প্রমাণ হয়, এ সকল নারীর অনেকেই আন্তরিকভাবে পর্দাবিধান না মেনে চললেও কেবল বোরখা পরার কারণে যেখানে অনেকখানি নির্যাতন থেকে রেহাই পাচ্ছেন, সেখানে তারা যদি ইসলামের সকল বিধান মেনে চলেন, তাহলে তারা যে নির্যাতন থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাবেন, তা সহজেই প্রতীয়মান হয়। সাথে সাথে সমাজের পুরুষগন যদি ইসলামের বিধান মেনে নারীর অধিকার আদায় এবং নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনে এগিয়ে আসেন, তাহলে আলাদা করে নারী দিসব ঘোষণা করার প্রয়োজন হবে না। বরং প্রতিদিনই নারীর সম্মান ও অধিকার যথাযথভাবে রক্ষিত হবে। এই বাংলাদেশে একজন নারীও আর নির্যাতনের শিকার হবেন না। “অধ্যক্ষ যাইনুল আবেদীন, নারী নির্যাতন রোধে ইমামগণের ভূমিকা, ঢাকা: ২০০৬, পৃ: ১৩”।
উপসংহার: সনাতন, খ্রিস্ট, বৌদ্ধ বা ইসলাম কোনো ধর্মীয় আইনই নারী নির্যাতন সমর্থন করে না বরং নারীকে নির্যাতন থেকে সুরক্ষার জন্য সর্বোতভাবে চেষ্টা করে। বিশেষত ইসলাম ধর্মে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য যেমন বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট আইন প্রদান করা হয়েছে তাতে ইসলাম ধর্মের অনুসারী কোনো ব্যক্তির পক্ষে ধর্মীয় কারণেই কোনো ধরনের নারী নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। সনাতন, খ্রিস্ট ও বৌদ্ধ ধর্মের নারী নীতিও একান্তভাবে এটাই প্রমাণ করে ধর্মগুলোর নিষ্ঠাবান কোনো অনুসারী নারী নির্যাতন করতে পারে না। এমনকি তাদের সামনে কোনো নারী নির্যাতনে শিকার হতে পারে না। ধর্মীয় শিক্ষা ও আবেগের জন্যই তারা নারীকে নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে তৎপর হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ হলেও এ দেশে সনাতন, বৌদ্ধ ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী লোক সংখ্যাও কম নয়। সকল ধর্মানুসারী লোকের মধ্যে তাদের স্ব স্ব ধর্ম অনুসারে নারী নির্যাতন প্রতিরোধক শিক্ষা ও বিধি সমূহের নির্মোহ, নিরপেক্ষ এবং সঠিক প্রচারণা চালানো হলে এবং তাদেরকে ধর্মীয় আর্দশ ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা গেলে বাংলাদেশে সমন্বিতভাবে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সম্ভব হবে। (সমাপ্ত)

ইসলামী আইনে অমুসলিমদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
এ মন এক সময় এসেছিলো যখন সীমান্তের ব্যাপক অংশ জুড়ে অবিরাম যুদ্ধ চলছিল। অথচ সে সময়ে সামরিক বিভাগে চাকরি করে কেউ জীবিকা অর্জন করার কথা চিন্তাও করত না। কারণ সে সময়ে যুদ্ধে ঝুঁকির পরিমাণ ছিল বেশি। যারা সৈনিক হিসাবে যুদ্ধ করত তাদের আর্থিক অবস্থাও অসচ্ছল। আরবের অসংখ্য অমুসলিম হিসাবে যুদ্ধ করত তাদের আর্থিক অবস্থাও ছিল অসচ্ছল। আরবের অসংখ্য অমুসলিম তখন মুসলিম শাসনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। তাদের শাসনকে মেনে নিয়েছিল অকপটে। তাছাড়া অন্য কারো সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে মুসলমানদের উৎখাত করার কোন চিন্তাও তাদের ছিল না। তবু এ সমস্ত অমুসলিমদের সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে তাদেরকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হত। অমুসলিমরা এতে বরং খুশি হত। অথচ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুসলমানদের ছুটে যেতে হত যুদ্ধের ময়দানে। এই অবসরে অমুসলিমরা নিজেদের কাজকর্ম ও ব্যবসা বাণিজ্য চালাতে পারত পুরো মাত্রায়। ফলে তাদের অর্থনৈতিক উন্নতি হতো। বিনিময়ে তারা জিযিয়া নামে অতিরিক্ত একটি ট্যাক্স দিত। অবশ্য মহিলা শিশু এবং দরিদ্রদের জিযিরা প্রদান করতে হত না।
জিযিয়ার পরিমাণও ছিল যৎসামান্য। নবী করীম (সা:)-এর আমলে একজন অমুসলিমের বাৎসরিক জিযিয়ার পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ দিরহাম। এটা ছিল মোটামুটিভাবে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের দশ দিনের খরচের সমান। তাছাড়া একজন অমুসলিম যদি বছরের কোন সময়ে কোন যুদ্ধে অংশ নিত তাহলে সেও ঐ বছরের জিযিয়া প্রদান করা থেকে অব্যাহতি পেত। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় মদীনা অথবা অন্য কোথাও জিযিয়া প্রদানের প্রচলন ছিল না। নবম হিজরীতে জিযিয়া সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হয়। বলা রাখা আবশ্যক যে, জিযিয়া ইসলামের অবশ্য পালনীয় কোন বিধান নয় বরং বিশেষ ব্যবস্থা ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে জিযিয়ার বিধান কার্যকর করা হয়। নিম্নের দুটি ঘটনা থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
ক. নবী করীম (সা:) এর এক ছেলের নাম ইবরাহীম (রা:)। তাঁর মা ছিলেন একজন মিশরীয় কিবতী মহিলা। ইবরাহীম (রা:) তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত। সে সময়ে নবী করিম (সা:) বলেছিলেন যে, যদি ইবরাহীম আরোগ্য লাভ করে তাহলে ইবরাহীমের মায়ের সম্মানে কিবতীদের জিযিয়া থেকে অব্যাহতি দেবেন।
খ. ফুসতাত (কায়রো) থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত একটি খাল ছিল। হযরত উমর (রা:)-এর শাসনামলে একজন অমুসলিম মিশরবাসী চমৎকার একটি পরিকল্পনা নেয়। সে প্রস্তাব দেয় যে, এ খালটি পুন:খনন করা হলে নৌপরিবহনের উন্নতি ঘটবে এবং মিশর থেকে মদীনায় খাদ্য-খাবার পাঠান অনেকখানি সহজতর হবে। সেই খালটির নামই নহরে আমিরুল মু’মিনীন। খলীফা তাঁর পরামর্শে খুশি হয়ে তাকে গোটা জীবনের জন্য জিযিয়া প্রদান করা থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন।
তাছাড়া বর্তমানে অবস্থারও পরিবর্তন ঘটেছে। এখন বিশ্বের সর্বত্র ইসলামের দাওয়াত পৌছে গেছে। লক্ষ লক্ষ মুসলমান অমুসলিম শাসনাধীন অঞ্চলে বসবাস করে। এমতাবস্থায় খৃষ্টান, ইয়াহুদী, হিন্দু অথবা অন্যদের উপর যদি জিযিয়া আরো করা হয় তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই খৃষ্টান এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর শাসনাধীন অঞ্চলে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে মুসলিম আইনবিদগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, জিযিয়া আরোপ করার সময় এ বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে।
একটি হাদীসে এরূপ উল্লেখ আছে যে, নবী করীম (সা:) মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় হিজাজের খৃষ্টান ও ইয়াহুদী অধিবাসীদের অন্যত্র স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছিলেন। হাদীস শরীফে এ ধরনের নির্দেশ প্রদানের কোন কারণ উল্লেখ করা হযনি। তবে এটা স্পষ্ট যে, এ বিধানটি সর্বসাধারণের জন্য প্রযোজ্য ছিল না। বরং কিছুসংখ্যক লোকের বিরুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক আচরণের কারণে এরূপ অবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
বলে রাখা আবশ্যক যে, খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে অনেক মুসলমানের দাস-দাসী ছিল অমুসলিম। তাদের অনেকেই মনিবের সঙ্গে মক্কা ও মদীনায় বসবাস করত। এ প্রসঙ্গে একজন খৃষ্টান চিকিৎসকের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। পবিত্র কা’বা ঘরের মিনারের নিচেই ছিল তার চিকিৎসা কেন্দ্র (ইব্ন সা’দ) ঐতিহাসিক ইবন সা’দ আরো উল্লেখ করেছেন যে, জুফাইনা নামক একজন খৃষ্টান মদীনার একটি স্কুলের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখাতেন।
পরিশেষে নবী করীম (সা:) এর আরো দুটি হাদীসের উল্লেখ করা যেতে পারে। আল-মাওয়ারদী থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সা:) মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় বলেছেন, আমার তরফ থেকে অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে, নিষ্ঠার সঙ্গে তা প্রতিপালন কর। তিনি আরো বলেছেন যে, কোন অমুসলিমের উপর যে নির্যাতন চালাবে, শেষ বিচার দবিসে সে আমাকে নির্যাতিতের পক্ষে সুপারিশকারী হিসাবে দেখতে পাবে (আবু দাউদ)। নবী করীম (সা:) আমাদের জন্য যে নির্দেশ রেখে গেছেন, নিজের জীবনে পরবর্তীকালের মুসলমানগণ এগুলোকেই আইন হিসাবে বিন্যস্ত করেছেন এবং বাস্তব জীবনে অনুসরণ করেছেন নিষ্ঠার সাথে। এখানে তার কিছু উদাহরণ উপস্থাপন করা হলো :
একবার মহান খলীফা হযরত উমর  (রা:) সিরিয়ার গভর্ণরকে রাজস্বের হিসাব সংরক্ষণের জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ একজন গ্রীক অধিবাসীকে মদীনায় পাঠানোর নির্দেশ প্রযোজ্য। মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার-উপযোগী একটি বিখ্যাত আইন গ্রন্থের নাম হিদায়া। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যে কোন প্রকার নিন্দা বা অপবাদ সেটা মুসলমান অথবা জিম্মী (অমুসলিম) যারা বিরুদ্ধেই হোক না কেন, তা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। ‘বাহর আর রায়ক’ নামক আইন গ্রন্থে আরো উল্লেখ আছে যে, একজন মৃত মুসলমানের দেহাবশেষ যেভাবে সম্মান করতে হয় তেমনি সম্মান করতে হয় একজন অমুসলিম (জিম্মী)-এর মৃতের দেহাবশেষকে। তাকে কোনভাবেই অপবিত্র করা যাবে না। কারণ কোন অমুসলিমকে যদি জীবদ্দশায় নিরাপত্তা দেওয়া হয়, হিফাজত করা হয় অন্যায় অপবাদ থেকে তাহলে তার মৃত্যুর পর সকল প্রকার অপবাদ অপবিত্রতা থেকে রক্ষা করাটাও বাধ্যতামূলক। ফকীহগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যেমন শাস্তি সে পেত একজন মুসলিম রমনীর অমর্যাদা করলে। এ ব্যাপারে ইসলামী আইনবিদগণের মধ্যে কোন মতানৈক্য নেই।
খলীফা হযরত উমর (রা:)-এর আমলের ঘটনা। কিছুসংখ্যক মুসলমান একজন ইয়াহুদীর জমিতে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। খলীফা উমর (রা:)-এর কাছে এ সংবাদ পৌছে, তখন তিনি মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলার এবং উক্ত জমিখন্ড ইয়াহুদী মালিককে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে লেবাননের খৃষ্টান শিক্ষাবিদ অধ্যাপক কারদাহী লিখেছেন : বায়তুল ইয়াহুদীর সেই বাড়িটি এখনও বিদ্যমান রয়েছে (প্রাইভেট ইন্টারন্যাশনাল ল অফ ইসলাম, লেকচার সিরিজ, দি হেগ, ১৯৩৩)। দামেশকের প্রধান মসজিদ সম্পর্কেও অনুরূপ একটি মশহুর কাহিনী রয়েছে। ইবনে কাছীর এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকের বর্ণনায় বিষয়টি স্থান পেয়েছে ঘটনাটি এ রকম- একজন উমাইয়া খলীফা একটি মসজিদ সম্প্রসারণের সুবিধার্থে পার্শ্ববর্তী একটি চার্চ দখল করেন। পরবর্তীতে এ অভিযোগটি খলীফা উমর বিন আব্দুল আযীযের নিকট উপস্থাপন করা হয়। তৎক্ষণাৎ তিনি এ মর্মে নির্দেশ জারি করেন যে, গীর্জার যে অংশে বলপূর্বক মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে, তা ভেঙ্গে ফেলতে হবে এবং উক্ত স্থান গীর্জার জন্য নির্ধারিত থাকবে। যা হোক পরবর্তীতে খৃষ্টানরা অর্থের বিনিময়ে উক্ত ভূমিখন্ডের মালিকানা প্রত্যাহার করে নেয় এবং এভাবেই উভয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এখানে হযরত উমর ইব্ন আবদুল আযীয-এর আরেকটি নির্দেশনামার উল্লেখ করা যেতে পারে। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যাবে ইব্ন সা’দের ইতিহাসে গ্রন্থে। গভর্ণর আদি বিন আরতাতকে এ মর্মে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, অমুসলিমদের প্রতি নজর দাও এবং তাদের সঙ্গে বিনয় নম্র ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ যদি বার্ধক্যে পৌছে এবং নিজের বিষয় সম্পদ না থাকে, তাহলে তার ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা নেওয়া তোমার দায়িত্ব। যদি তার কোন আপনজন থাকে, তবে তার কাছ থেকে ভরণ-পোষণ বাবদ অর্থ আদায় কর। যদি কেউ তার সঙ্গে অন্যায় আচরণ করে তাহলে প্রতিশোধ নাও। আমি জানতে পেরেছি তুমি আমদানিকৃত মদের এক দশমাংশ আদায় কর এবং তা সরকারী কোষাগারে জমা দাও। স্মরণ রেখো যে, এই কোষাগার তোমারও নয়, আমারর নয়। এর মালিকানা আল্লাহর। আমি তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি যে, এ জাতীয় সম্পদ-এর পরিমাণ যত সামান্যই হোক না কেন, আর কখনো তা সরকারী কোষাগারে জমা নেবে না। যদি তুমি সম্পদের পবিত্রতা সম্পর্কে নিশ্চিত হও তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা। তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। এখানে উমর ইব্ন আবদুল আযীযের আরো একটি পত্রের উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। পত্রের বিষয়বস্তু এ রকম : পুরাতন নথি-পত্রগুলো পর্যালোচনা কর। অন্যায়ভাবে কর আরোপ সংক্রান্ত উত্থাপিত আপত্তি এবং অন্যায় অবিচার করলে তার সংশোধন কর এবং প্রত্যেককেই তার ন্যায্য পাওনা ভোগ করতে দাও। অত্যাচার জর্জরিত কোন লোক যদি মারা যায় তাহলে তার উত্তরাধিকারীর নিকট তার পাওনা হস্তান্তর কর। এটা সকলের জানা কথা যে, কোনকিছু ক্রয় বা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে দূরের লোক অপেক্ষা প্রতিবেশীরা অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। ফকীহগণও এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। এটা অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও একটি স্বীকৃত নীতি। অমুসলিমদের এমন কতকগুলো রীতিনীতি বা প্রথা আছে যেগুলো ইসলামী আক্বীদা বা আচার-আচরণের পরিপন্থী। তদসত্ত্বেও ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিমরা এ সমস্ত রীতিনীতি বা প্রথা মেনে চলার অধিকার ভোগ করে থাকে। যেমন- মদ্যপান মুসলমানদের জন্য হারাম। অথচ অমুসলিম নাগরিকরা ইচ্ছামত মদ্যপান করতে পারে। এমনকি মদ আমদানি, উৎপাদন ও ক্রয়-বিক্রয়ের সুযোগ পেয়ে থাকে। অনুরূপভাবে তারা জুয়া খেলতে, নিকটাত্মীয়কে বিয়ে করতে ও সুদী কারবারে লিপ্ত হতে পারে। অথচ অমুসলমানদের জন্য এসবকিছু নিষিদ্ধ বা হারাম।
ইসলামের প্রথম যামানায় অমুসলিমদের এ সমস্ত অনৈসলামিক কাজকর্ম মুসলমানদের উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারত না। এমনকি এ সমস্ত বিষয়ের প্রতি মুসলমানরা বড় একটা আমলও দিত না। তবে আধুনিক আইন বিশারদগণের মতে সুখী সমাজ ও সুন্দর বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য মদের ব্যবসা বা মদ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকলে চলবে না, সমাজের গোটা জনগোষ্ঠীর উপর এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপ করা আবশ্যক। এ ব্যাপারে অমুসলিম চিন্তাবিদগণও অনুরূপ ধারণা পোষণ করেন। তদনুসারে একজন খৃষ্টানকে মদীনায় পাঠনো হল এবং তাকে নিয়োগ করা হলো রাজস্ব প্রশাসনের প্রধান হিসাবে (দ্র. আল-বালাযুরী, আনসা)
এমনকি কখনো কখনো খলীফা হযরত উমর (রা:) অমুসলিমদের সঙ্গে সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনেতিক, প্রশাসনিক বিষয়ে আলোচনা করতেন। ইসলামে ইমামের (মসজিদের ইমাম) পদটি মুসলমানদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। ইসলাম আধ্যাত্মিক এবং পার্থিব জীবনের মধ্যে সমন্বয়ের বিধান দিয়েছে। সে কারণেই নামাযে ইমামতি করা রাষ্ট্রপ্রধানের যেমন দায়িত্ব তেমনি এটা তার একটি অধিকার। এভাবে যদি বিষয়টি বিবেচনা করা হয় তাহলে কোন অমুসলিম মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হতে পারেন না। বস্তুতপক্ষে এটা একটা ব্যতিক্রম। এর অর্থ এই নয় যে, দেশের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক কর্মকান্ড থেকে অমুসলিম নাগরিককে বাদ দিতে হবে।
খলীফাগণের আমল থেকেই মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমরা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে, এমনকি মন্ত্রীর পদ-মর্যাদার নিয়োগ পেয়েছেন। শাফি’ঈ মযহাবের আল-মাওয়ারদী এবং হাম্বলী মযহাবের আবু ইয়া’লা আল-র্ফারা খলীফা কর্তৃক অমুসলিম নাগরিককে মন্ত্রী হিসেবে এবং নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ সমর্থন করেছেন। প্রিয়নবী (সা:) নিজেই একজন অমুসলিমকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে আবিসিনিয়ায় প্রেরণ করেছিলেন। বিশ্বের দরবারে যে সমস্ত দেশ ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের ধারক বলে পরিচিত সে সমস্ত দেশেও এরূপ নজীর পাওয়া যাবে না।
ইসলামের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে, এখানে অমুসলিমদেরকে সামাজিক এবং বিচার সংক্রান্ত বিষয়ে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। কুরআনুল করীমে উল্লেখ আছে যে, তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি এর পূর্বে অবতীর্ণ কিতাবের সমর্থক ও সংস্কারকরূপে। সুতরাং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে তুমি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করবে এবং যে সত্য তোমার নিকট এসেছে তা ত্যাগ করে তাদের খেয়াল খুশির অনুসরণ করবে না (৫ ঃ ৪২-৪৮)।
কুরআনুল করীমের এই নির্দেশের প্রেক্ষিতেই নবী করীম (সা:) এবং খলীফাগণ ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকদের বিচার সংক্রান্ত বিষয়ে স্বাধিকার প্রদান করেছিলেন। তারা স্বাধিকার ভোগ করেছিল দেওয়ানী, ফৌজদারী, ব্যক্তি আইন প্রভৃতি সকল বিষয়ে। খলীফাগণের সমসাময়িক কালে খৃষ্টানদের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে, মুসলিম শাসনামলে খৃষ্টান যাজকদের বিচারের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছিল। মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার-উপযোগী একটি বিখ্যাত আইন গ্রন্থের নাম হিদায়া। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যে কোন প্রকার নিন্দা বা অপবাদ সেটা মুসলমান অথবা জিম্মী (অমুসলিম) যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন, তা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। ‘বাহর আর রায়ক’ নামক আইন গ্রন্থে আরো উল্লেখ আছে যে, একজন মৃত মুসলমানের দেহাবশেষ যেভাবে সম্মান করতে হয় তেমনি সম্মান করতে হয় একজন অমুসলিম (জিম্মী)-এর মৃতের দেহাবশেষকে। তাকে কোনভাবেই অপবিত্র করা যাবে না। কারণ কোন অমুসলিমকে যদি জীবদ্দশায় নিরাপত্তা দেওয়া হয়, হিফাজত করা হয় অন্যায় অপবাদ থেকে তাহলে তার মৃত্যুর পর সকল প্রকার অপবাদ অপবিত্রতা থেকে রক্ষা করাটাও বাধ্যতামূলক। ফকীহগণ ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন যে, একজন মুসলিম কোন অমুসলিম রমনীর অমর্যাদা করলে সে তেমন শাস্তি পাবে যেমন শাস্তি সে পেতো একজন মুসলিম রমনীর অমর্যাদা করলে। এ ব্যাপারে ইসলামী আইনবিদগণের মধ্যে কোন মতানৈক্য নেই। (চলবে)

ভূমিকম্প ও বিশ্বনবী (সা.) সতর্কবাণী

সৈয়দ উবায়দুর রহমান

হা দীস শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে,  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াাসাল্লাম বলেন, যখন অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হবে, কাউকে বিশ্বাস করে সম্পদ গচ্ছিত রাখা হবে কিন্তু তার খেয়ানত করা হবে (অর্থাৎ যার সম্পদ সে আর ফেরত পাবে না), জাকাতকে দেখা হবে জরিমানা হিসেবে, ধর্মীয় শিক্ষা ব্যতীত বিদ্যার্জন করা হবে, পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে কিন্তু তার মায়ের সাথে বিরূপ আচরণ করবে, বন্ধুকে কাছে টেনে,নেবে আর পিতাকে দূরে সরিয়ে দিবে, মসজিদে উচ্চস্বরে শোরগোল (কথাবার্ত) হবে, সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তিটি শাসক রূপে আবির্ভূত হবে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি জনগণের নেতা হবে, বাদ্যযন্ত্র এবং নারী শিল্পীর ব্যাপক প্রচলন হয়ে যাবে, মদ পান করা হবে (বিভিন্ন নামে মদ ছড়িয়ে পড়বে), শেষ বংশের লোকজন তাদের পূর্ববর্তী মানুষগুলোকে অভিশাপ দিবে। এমন সময়ও আসবে যখন তীব্র বাতাস প্রবাহিত হবে তখন একটি ভূমিকম্প সেই ভূমিকে তলিয়ে দিবে (ধ্বংস স্তুপে পরিণত হবে বা পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাবে)। হাদিসের মাঝে আরো বলা হয়েছে যে আল্লাহ মহানের পক্ষ থেকে জমিনে কখন কেন ভূমিকম্পের আজাব প্রদান করা হয়। আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেন, মহান আল্লাহ মাঝে মাঝে পৃথিবীকে জীবন্ত হয়ে উঠার অনুমতি দেন, যার ফলে তখন বড় ধরণের ভূমিকম্প অনুষ্ঠিত হয়। তখন এই ভূমিকম্প মানুষকে ভীত করে। তারা মহান আল্লাহর নিকট তাওবা করে, পাপ কর্ম ছেড়ে দেয়, আল্লাহর প্রতি ধাবিত হয় এবং তাদের কৃত পাপ কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে মুনাজাত করে। আগেকার যুগে যখন ভূমিকম্প হত, তখন সঠিক পথে পরিচালিত সৎকর্মশীল লোকেরা বলত, ‘মহান আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করেছেন।
বিজ্ঞান কী বলে? ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে ভূপৃষ্ঠের নীচে একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় রয়েছে কঠিন ভূত্বক। ভূত্বকের নীচে প্রায় ১০০ কি.মি. পূরু একটি শীতল কঠিন পদার্থের স্তর রয়েছে। একে লিথোস্ফেয়ার (খরঃযড়ংঢ়যবৎব) বা কঠিন শিলাত্বক নামে অভিহিত করা হয়। আমাদের পৃথিবী নামের এই গ্রহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, কঠিন শিলাত্বক (লিথোস্ফেয়ার)সহ এর ভূপৃষ্ঠ বেশ কিছু সংখ্যক শক্ত শিলাত্বকের প্লেট (চষধঃব) এর মধ্যে খন্ড খন্ড অবস্থায় অবস্থান করছে। ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে এই  প্লেটের চ্যুতি বা নড়া-চড়ায় দরুণ ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। ভূমিকম্প বিষয়ে পবিত্র কোরানে সূরায়ে ‘যিলযাল’ নামে একটি সূরাই নাযিল করা হয়েছে। মানুষ শুধু কোন ঘটনা ঘটার কার্যকারণ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয় এবং ভূতত্ত্ববিজ্ঞানও এই কার্যকারণ সম্পর্কেই আলোচনা করে থাকে। কিন্তু কুরআনুল কারীম একই সাথে কোন ঘটনা ঘটার কার্যকারণ বর্ণনার পাশাপাশি উক্ত ঘটনা থেকে শিক্ষনীয় বিষয় কি এবং এই ঘটনা থেকে অন্য আরো বড় কোন ঘটনা ঘটার সংশয়হীনতার প্রতি ইংগিত করে। ভূমিকম্প বিষয়ে কুরআনুল কারীমে দু’টি  শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। একটি হল ‘যিলযাল’, যার অর্থ হল একটি বস্তুর নড়াচড়ায় অন্য আরেকটি বস্তু নড়ে ওঠা। দ্বিতীয় শব্দটি  হল ‘দাক্কা’, এর অর্থ হল প্রচন্ড কোন শব্দ বা আওয়াজের কারণে কোন কিছু নড়ে ওঠা বা ঝাঁকুনি খাওয়া। পৃথিবীতে বর্তমানে যেসব ভূমিকম্প ঘটছে, তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে কঠিন শিলাত্বকে চ্যুতি বা স্থানান্তরের কারণে। কিয়ামতের দিন আরেকটি ভূমিকম্পে পৃথিবী টুকরো টুকরো হয়ে ধূলিকণায় পরিণত হবে এবং তা হবে ফেরেশেতা হযরত ইসরাফিলের ( আ.) সিঙ্গায় ফুৎকারের কারণে, যাকে বলা হয় ‘দাক্কা’। যা হবে এক প্রচন্ড আওয়াজ। পৃথিবীতে মাঝে মাঝে কঠিন শিলাত্বকের স্থানান্তরের কারণে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প আমাদেরকে এ কথার প্রতি ইংগিত করে যে, একদিন ওই ‘দাক্কা’ সংঘটিত হবে, যার নাম কেয়ামত। তখন এই চাকচিক্যময় দুনিয়ার সবকিছুই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে। মানুষ যেন কিয়ামতকে ভুলে না যায়, দুনিয়াকেই তার আসল ঠিকানা মনে না করে, তাই মাঝে মাঝে মহান আল্লাহ ভূমিকম্পসহ আরো অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে মানুষকে সতর্ক করে থাকেন।
ভূমিকম্প একটি আজাব আল্লাহ মহান পবিত্র কোরানে ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর, তোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে) অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম, অথবা তিনি তোমাদের দল- উপদলে বিভক্ত করে একদলকে আরেক দলের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাতেও সম্পূর্ণরূপে সক্ষম।” (সূরা আল আনআম : ৬৫) আল-বুখারি তার সহিহ বর্ণনায় জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যখন তোমদের উপর থেকে (আসমান থেকে) নাজিল হলো তখন রাসূল (স) বললেন, আমি তোমার সম্মুখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, অথবা যখন, অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব নাযিল হলো, তখন তিনি (সা.) বললেন, আমি তোমার সম্মুখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (সহিহ বুখারি, ৫/১৯৩) আবূল-শায়খ আল-ইস্পাহানি এই আয়াতের তাফসিরে বর্ণনা করেন, “বল, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর, তোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে)- যার ব্যাখ্যা হলো, তীব্র শব্দ, পাথর অথবা ঝড়ো হাওয়া; আর অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম- যার ব্যাখ্যা হলো, ভূমিকম্প এবং ভূমি ধসের মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাওয়া।) বান্দার উপর আজাব কেন আসে? হযরত আলী [রা.] হতে বর্ণত রসুল [সা.] ইরশাদ করছেন, আমার উম্মত যখন ১৫ টি কাজে লিপ্ত হতে শুরু করবে তখন তাদের প্রতি বালা মসিবত আপাতিতি হতে আরম্ভ করবে। কাজগুলো হল ১. গণিমতের মাল ব্যক্তিগত সম্পদে  পরিণত হবে। ২. আমানতের সম্পদ পরিণত হবে গণিমতের মালে। ৩. যাকাত আদায় করাকে মনে করবে জরিমানা আদায়ের ন্যায়। ৪. স্বামী স্ত্রীর বাধ্য হবে। ৫. সন্তান মায়ের অবাধ্য হবে। ৬. বন্ধু-বান্ধবের সাথে সদ্ব্যবহার করা হবে। ৭. পিতার সাথে করা হবে জুলুম। ৮. মসজিদে উচ্চস্বরে হট্টগোল হবে ৯. অসম্মানী ব্যক্তিকে জাতির নেতা মনে করা হবে। ১০. ব্যক্তিকে সম্মান  করা হবে তার অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য। ১১. প্রকাশ্যে মদপান করা হবে। ১২. পুরুষ রেশমী পোষাক পরবে। ১৩. গায়িকা তৈরি করা হবে। ১৪. বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা হবে। ১৫. পূর্ববর্তী উম্মতদের (সাহাব, তাবে, তাবেঈন) প্রতি অভিসম্পাত করবে পরবর্তীরা। এই কাজগুলি যখন পৃথিবীতে হতে শুরু হবে তখন অগ্নিবর্ষী প্রবল ঝড়, ভূমিকম্প ও  কদাকৃতিতে রূপ নেয়ার অপেক্ষা করবে। এখন একটু চিন্তা করা উচিত যে আমরা এগুলোর মাঝেই লিপ্ত রয়েছি। আর যখন আমাদের উপর মসিবত আসে তখন প্রকৃতির বা মানুষের বা অন্যান্য জিনিসের দোষ দেই। আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত যে সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন আমরা হই তা আসলে আমাদের গুনাহের কারণেই এত আযাব। ভূমিকম্প হলে করণীয় কি? যখন কোথাও ভূমিকম্প সংগঠিত হয় অথবা সূর্যগ্রহণ হয়, ঝড়ো বাতাস বা বন্যা হয়, তখন মানুষদের উচিত মহান আল্লাহর নিকট অতি দ্রুত তওবা করা, তাঁর নিকট নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা এবং মহান আল্লাহকে অধিকহারে স্মরণ করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা যেভাবে রাসূল (সা.) সূর্য গ্রহণ দেখলে বলতেন, যদি তুমি এরকম কিছু দেখে থাক, তখন দ্রুততার সাথে মহান আল্লাহকে স্মরণ কর, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। [বুখারি ২/৩০ এবং মুসলিম ২/৬২৮] বর্ণিত আছে যে, যখন কোন ভূমিকম্প সংগঠিত হতো, উমর ইবনে আব্দুল  আযিয (রহ) তার গভর্ণরদের দান করার কথা লিখে চিঠি লিখতেন। ভূমিকম্প একটি কেয়ামতের আলামত। আবূল ইয়ামান (রহ.) আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি [সা.] বলেছেন, কিয়ামত কায়েম হবে না, যে পর্যন্ত না ইলম  উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং হারজ(খুনোখুনি)  বৃদ্ধি পাবে। তোমাদের সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, উপচে পড়বে। [সহিহ বুখারি, অধ্যায়: ১৫/ বৃষ্টির জন্য দুআ, হাদিস নাম্বার : ৯৭৯] পবিত্র কোরানের একাধিক আয়াতে  বলা হয়েছে যে, জলে স্থলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তা মানুষেরই  অপকর্মের ফল। আল্লাহপাক মানুষের অবাধ্যতার অনেক কিছুই মাফ করে দেন। তারপরও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। কোরান নাজিল হওয়ার পূর্বেকার অবাধ্য জাতি সমূহকে আল্লাহপাক গজব দিয়ে ধ্বংস করেছেন। সে সবের অধিকাংশ গজবই ছিল ভূমিকম্প। ভূমিকম্প এমনই একটা দুর্যোগ যা নিবারণ করার মতো কোন প্রযুক্তি মানুষ আবিষ্কার করতে পারে নাই। এর পূর্বাভাস পাওয়ার মতো কোন প্রযুক্তিও মানুষ আজ পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারে নাই। হাদিস শরীফেও একাধিকবার বলা হয়েছে যে, মানুষের দুষ্কর্মের জন্যই ভূমিকম্পের মতো মহাদুর্যোগ ডেকে আনে। কুরআন এবং হাদিসে আদ, সামুদ, কওমে লুত এবং আইকার অধিবাসীদের ভূমিকম্পের দ্বারা ধ্বংস করার কাহিনী বিভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণনা করা হয়েছে। একটু ভাবুন তো…
সামান্য এই ভূমিকম্পেই সম্পদের মায়া ছেড়ে আমরা রাস্তায় নামছি। এটা যখন আরো বাড়বে, তখন সম্পর্কের মায়াও ছেড়ে  দেবো আমরা। নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায় ব্রতী হবো সবাই। যখন তার চাইতেও আরো বাড়বে তখন যেই মা দুধ খাওয়াচ্ছেন  তিনিও তার বাচ্চাকে ছুড়ে ফেলে দেবেন, গর্ভের শিশুকেও বের করে দেবেন। ভূমিকম্পের সময় কে কি অবস্থায় ছিলাম, কে টের পেয়েছে, কে টের পায়নি, চেয়ার টেবিল নড়ছিলো কিনা, ফ্যান দুলছিলো কিনা- এই সব গবেষণা পরে করলেও হবে। আগে করা  দরকার তওবা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। সবচেয়ে বড় কথা হল, এটি আল্লাহ কর্তৃক একটি নিদর্শন। যাতে করে মানুষ স্বীয় অপরাধ বুঝতে সক্ষম হয়। ফিরে আসে আল্লাহর পথে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে আন্তরিকতার সাথে খাঁটি তওবা করার  তাওফিক দান করুন। আমিন।

আল্লাহ্ অস্তিত্বের ধারণা : আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শন সূক্ষ্মতত্ত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

(পূর্ব প্রকাশের পর)
মূলত হযরত মুসা (আ.) এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী নবীগণ যে একত্ববাদের প্রচার করেন তা ছিল পুরা ইসলাম। হযরত মুসা (আ.) ইসলামের যে মর্মবাণী এক ও লা-শরীক আল্লাহ্তে বিশ্বাস, সেদিকে তাঁর কওমকে আহ্বান করেন। বলা বাহুল্য, শুধু মুসা (আ.) কেন আল্লাহ্ প্রেরিত সব নবী রসূলই আল্লাহ্র একত্মবাদের দিকে মানুষকে আহ্বান করেছেন। আর এ কারণেই আল্লাহ্ তা’আলা মুসলমানদেরকে মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর আনীত আল-কুরআনের প্রতি ঈমান আনার সাথে সাথে অন্যান্য নবী-রসূল ও তাঁদের উপর অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনের নিুোক্ত বাণীটি প্রণিধানযোগ্য :
“বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহ্র উপরে এবং ঐ শিক্ষার উপরে যা আমাদের উপরে নাযিল করা হয়েছে এবং ঐ শিক্ষার উপরে এবং যা কিছু দেয়া হয়েছিল মুসা, ঈসা এবং অন্যান্য নবীগণের উপর তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে, তার ওপরও ঈমান এনেছি। …” “ সূরা ২, আয়াত-১৩৬-১৩৭”। বর্তমান তাওরাত হযরত মুসা (আ.)-এর আনিত দীন ইসলামের নয়। বরঞ্চ ঐ দীন ইসলামেরই বিকৃত রূপ-ইয়াহুদীবাদেরই বহিঃপ্রকাশ। “সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী, সীরাতে আলম (দ্বিতীয় খন্ড), পৃ. ১৩৫”।
“ড. মরিস বুকইলী বর্তমান তাওরাতের উপর ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে উক্ত গ্রন্থ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, “তাওরাতের বিভিন্ন পুস্তক সন্দেহাতীতভাবে বিভিন্ন ঐতিহ্য ভিত্তিক কাহিনীর সমাহার। অবশ্য একথা মানতে হবে যে, লেখকরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ সব ঘটনার সমাবেশ ঘটিয়ে গেছেন এবং এসব কাহিনীকে তাঁরা পাশাপাশি সাজিয়ে কখনো-সখনো তাঁদের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্যে নানা গল্প-কথা টেনে এনেছেন।” ড. মরিস বুকাইলি, বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান, পৃ. ৩১”।
সুতরাং এখন পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, বর্তমানে ইয়াহুদী ধর্মে যে একত্মবাদের পরিবর্তে বহু দেবদেবী এবং পূর্ববর্তী অনেক নবী-রাসূলদের তাঁরা উপাস্য হিসেবে মেনে নিয়েছে- এটা মূলত তাদের মনগড়া চিন্তারই ফলশ্র“তি। আদতে মুসা (আ.)-এর আনীত প্রকৃত তাওরাতের সাথে বর্তমান তাওরাতের মিল খুব কমই পাওয়া যায়। বর্তমান তাওরাতের অনুসারীদের মধ্যে যারা ইয়াহুদী পন্ডিত নামে খ্যাত স্বয়ং তাদের সম্পর্কেই কুরআনে বলা হচ্ছে, “অধিকাংশ ইয়াহুদী আলেম, পীর, দরবেশ লোকদের ধন-সম্পদ অবৈধভাবে ভোগ করতো এবং তাদেরকে আল্লাহ্র পথ থেকে সরিয়ে রাখতো।” “সূরা ৯, আয়াত ৩৪”। ইয়াহুদীদের  বাড়াবাড়ি ও পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে কুরআনে অন্যত্র বলা হচ্ছে, ইহুদীরা বলে যে, “হযরত ওযাইর আল্লাহ্র পুত্র।” তারা হযরত মুসা (আ.)-এর একত্ববাদের শিক্ষা ভুলে যেয়ে পয়গম্বরগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করা এবং হত্যাকান্ড করতেও কুন্ঠিত না হওয়া, অথবা তাঁদেরকে স্বয়ং আল্লাহ্ কিংবা আল্লাহ্র পুত্র বলে পরিচয় দেয়া ইহুদীদের স্বভাবে পরিণত হয়। “মুফতী মুহামম্দ শাফী, তাফসীর মা’আরেফুল কুরআন, অনুবাদ-মুহিউদ্দীন খান (মদীনা : খাদেমুল হারামাইন শরীফাইন বাদশাহ ফাহদ কুরআন মুদ্রণ প্রকল্প, ১৪১৩ হি.), পৃ. ৩৪৮”।
উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে বলেন, “তোমার প্রভু তোমার জন্যে তোমারই মধ্যে থেকে অর্থাৎ তোমারই ভাইদের মধ্যে থেকে আমার মত একজন নবীর আবির্ভাব ঘটাবেন।” এখানে তোমার প্রভু বলতে এক লা-শারীক আল্লাহ্কে বোঝানো হচ্ছে এবং একজন নবী বলতে সেই নবীকে বোঝানো হচ্ছে স্বয়ং কুরআনে যে নবী সম্পর্কে বলা হচ্ছে, যে, “মুহাম্মদ (সা.) তোমাদের পুরুষদের কারো পিতা নন।” সূরা ৩৩, আয়াত-৪০”।
অতএব, এখন একথা বলা যেতে পারে যে, মূল তাওরাতের শিক্ষা ছিল একত্ববাদের দিকে, যদিও পরবর্তীতে উক্ত গ্রন্থে সেই শিক্ষাকে বিকৃত করে বহু দেববাদ ও শিরকবাদের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে।
বিশ্বের সমগ্র মানব সমষ্টির একটা বড় অংশ হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। বহু দেববাদে বিশ্বাসী হলেও গবেষণায় জানা গেছে যে, প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে বৈদিক যুগে মূর্তিপূজা তথা বহু দেব-দেবীর পূজা ছিল না। “সুশান্ত ভট্টাচার্য, বেদ-পূরাণে আল্লাহ্ ও হযরত মুহাম্মদ (সা.), নও-মুসলিম কল্যাণ সংস্থা, ঢাকা : পঞ্চম সংস্কার ১৯৯৭), পৃ.৫৮”। এমনকি পবিত্র বেদে যে ‘ব্রহ্ম’ শব্দটি রয়েছে সেই শব্দটিকে ‘একমেবাদ্বিতীয়ম ব্রহ্ম’ অর্থাৎ ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। “নূর নবী, আল্লাহ্তত্ত্ব পৃ.৮”  কিন্তু দুঃখের বিষয় উক্ত বেদই আবার ব্রহ্মের স্বরূপ বর্ণনা করতে দিয়ে দ্বিত্ববাদ, ত্রিত্ত্ববাদ, প্রকৃতিবাদ, বহুদেববাদ, সর্বেশ্বরবাদ প্রভৃতি মতবাদের জন্ম দিয়েছে। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে প্রশ্ন জাগে আমরা যে এক, লাÑশরীক আল্লাহকে বুঝি যিনি সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী, যিনি যাবতীয় গুণাবলীর আধার পবিত্র বেদে কি সেই ধরণের গুণ প্রকাশক কোন শব্দ নেই? যে শব্দের দ্বারা এক ও লাÑশরীক আল্লাহকে বোঝাবে?
১৩৩৩ সালে কলিকাতার “বসুমতি সাহিত্য মন্দির” থেকে শ্রীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় মহাশয় কর্তৃক মুদ্রিত এবং উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় “ শ্বেতাশ্বতরোনিষৎ” ঠড়ষ. ১১ নামে যে মূল্যবান গ্রন্থখানা প্রকাশিক হয়েছে সেখানে অন্যান্য বেদের সাথে “অথর্ববেদ” নামে একটি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে। এই “অথর্ব” বেদে চারখানা উপনিষৎ রয়েছে। যার মধ্যে ‘অল্লোপনিষৎ’ অন্যতম। এই ‘অল্লোপনিষৎ’Ñ ১৯-৩০ পৃ. যে মন্ত্রগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে একটি অন্যতম মন্ত্র হলো,
“হ্রং হোতার মিন্দ্রো হোতা ইন্দ্রো রামা হাসু রিন্দ্রাঃ।
অল্লো জ্যেষ্ঠং শ্রেষ্ঠং পরমং পূর্ণং ব্রহ্মণ অল্লাম।”
এ মন্ত্রে জ্যেষ্ঠ, পরম এবং পূর্ণ সত্তা বলতে যে অসীম অনন্ত বিশ্ব প্রভুকে বুঝানো হয়েছে, তাঁর আসল নাম “অল্ল” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। “বেদ-পুরাণো আল্লাহ ও হযরত মুহাম্মদ” নামক বই-এ দেখানো হয়েছে যে, সংস্কৃত ভাষায় ‘অল্ল’. বাইবেলে ‘এল’ বা ‘এলী’ এবং কুরআনে ‘আল্লাহ্’Ñ এর নামগুলো একই ধাতু মূল থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে এবং একই তাৎপর্য বহন করছে এবং সেই তাৎপর্য হলো, ‘অল্ল’ ‘এল’ বা ‘এলী’ এবং ‘আল্লাহ্’ হলেন তিনি যিনি অসীম, অনন্ত বিশ্বপ্রভু এবং এই নামটি কোন সময়ে কোন মানুষ, দেব-দেবী, বস্তু বা সত্তার উদ্দেশ্য ব্যবহৃত হয়নি। “সুশান্ত ভট্টাচার্য বেদ-পূরাণে আল্লাহ্ ও হযরত মুহাম্মদ (সা.) পৃ. ৯৫”।
পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করলে একই সত্যের আভাস মেলে। আর সেই সত্যটি হলো, বহুদেববাদে বিশ্বাসী আরব মুশরিকরাও ‘সৃষ্টি’র ব্যাপারে এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন দেব-দেবীকে স্থান দিত না।” “সূরা ২৯, আয়াত ৬১, ৬৩ ; সূরা ৪৩, আয়াত ৮৭ ; সূরা ২৩, আয়াত ৮৪-৮৯”।
কিন্তু কালক্রমে হিন্দুরা প্রকৃত শিক্ষাকে ভুলে তারা বহু দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা করতে শুরু করে।
প্রাচীন ভারতে ইতিহাস অন্তিমযুগ অন্ধকার এবং অত্যাচারের যুগ হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। সেই অস্তিমযুগ পঞ্চম খ্রীষ্টাব্দ হতে শুরু হয়। বলা হয়ে থাকে যে, বৈদিক যুগে মূর্তি পূজা ছিল না পরবর্তীতে সেই মূর্তি পূজা শুরু হয়। যার ফলশ্র“তিতে এক আল্লাহকে কেউ কেউ মাতৃরূপী জননী ভেবে জগদ্ধাত্রী, কালী, দুর্গা, ভৈরবী প্রভৃতি নামকরণ করে। এবং কল্পনায় মাটির মূর্তি তৈরি করে তাদের পূজা অর্চনা করতে থাকে। অনুরূপভাবে কেউ কেউ আল্লাহ্কে পিতৃরূপ কল্পনা করে তাঁর নাম দিয়েছে শিব, মহাদেব, নারায়ণ ইত্যাদি। আদতে আল্লাহ্র পরিবর্তে এই নামগুলোর সবই তাদের মনগড়া বৈ আর কিছুই নয়। “সুশান্ত ভট্টাচার্য, বেদ-পূরাণে আল্লাহ্ ও হযরত মুহাম্মদ (সা), পৃ. ৭৯”।
সুতরাং একথা পরিষ্কার যে, পবিত্র বেদের মূল আহ্বানই ছিল একত্ববাদের দিকে।
পৃথিবীর প্রাচীন ধর্মগুলোর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম অন্যতম। এই ধর্মের প্রবর্তক হিসেবে গৌতম বুদ্ধের নাম করা হয়। এই ধর্মের ধর্মীয় গ্রন্থ হচ্ছে ত্রিপিটক। সাধারণভাবে বলা হয় এই ধর্ম নিরীশ্বরবাদী।“ নূর নবী, আল্লাহতত্ত্ব, পৃ. ৯”। কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই এসে যায়, আর তা হলো, ধর্মে অবশ্যই অতীন্দ্রিয় ও অদৃশ্য শক্তিতে বিশ্বাস থাকতে হবে। কিন্তু কোন ধর্মে যদি অতীন্দ্রিয় ও অদৃশ্য বিশ্বাসের কথা না থাকে অর্থাৎ সেই ধর্ম যদি নিরীশ্ববাদী হয় তাহলে সেটি কি কোন ধর্ম পদবাচ্য? “সাইয়েদ আবুল হাই, দর্শন ও মনোবিদ্যা পরিভাষা কোষ (দ্বিতীয় খ-), (বাংলা একাডেমী ঃ ঢাকা, ১৯৮৬), পৃ. ৮৬০”।
প্রকৃতভাবে ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে যে নিরীশ্বরবাদের কথা বলা হয়ে থাকে মনে হয় তা যুক্তিযুক্ত নয়। কেননা বৌদ্ধধর্ম সুপ্রাচীন ধর্মের মধ্যে অন্যতম একটি ধর্ম। এই ধর্মের প্রবর্তক হিসেবে যার নাম করা হয় অর্থাৎ বুদ্ধ ছিলেন মূলত দুনিয়ার প্রখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মধ্যে একজন। তাঁর সম্পর্কে এ অনুমান করা হয় যে, সম্ভবত তিনিও নবী ছিলেন। “সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী, সীরাতে সরওয়ারে আলম (দ্বিতীয় খ-), পৃ. ২১৪”।
তবে অনেকের মতে, তাঁর আনীত ধর্মকে নিরীশ্বরবাদী বলার কারণ এই হতে পারে যে, তিনি ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বেদকে অস্বীকার করতেন এবং সৃষ্টিকর্তা হিসেবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে নির্বাক থাকতেন। অবশ্য মানুষে মানুষে যে শ্রেণী বিভেদ করা হত বুদ্ধ তার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। বুদ্ধ মনে করতেন যে, সামাজিক আচার অনুষ্ঠান ও দেবতাদের পূজা অর্চনার মাধ্যমে মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয়, মুক্তি নিহিত তার নৈতিকতার উন্নতি সাধনের মধ্যেই। “সাইয়েদ আব্দুল হাই, দর্শন ও মনোবিদ্যা পরিভাষা কোষ (দ্বিতীয় খ-), পৃ. ১০-১০৯”।
যারাথুস্ত্রা কর্তৃক প্রচারিত যারাথুস্ত্রাবাদ একটি সুপ্রাচীন ধর্ম। এ মূল গ্রন্থ আবেস্তা মূল ভাষায় এখন আর বিদ্যমান নেই। “প্রাগুক্ত”। যদিও বলা হয়ে থাকে যে যারাথুস্ত্রাবাদের মূল তত্ত্ব হলো সৎ ও অসৎ এর দ্বন্দ্ব। অর্থাৎ এই ধর্মকে দ্বৈতবাদী বলা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে এই ধর্মও যে ছিল একত্ববাদের উপর প্রতিষ্ঠিত তা হাউগ (ঐধঁম) প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। হাউগের মতে, “যারাথুস্ত্রা সৎ ও অসৎ নামক নীতি দু’টিকে কার্যত পরস্পর বিরোধী মনে করতেন না; বরং তাঁর মতে এ দু’টি হলো একই প্রাথমিক সত্তার দুই অংশ বা দুই দিক।” “এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, সাইয়েদ আবুল হাই, দর্শন ও মনোবিদ্যা পরিভাষা কোষ (দ্বিতীয় খ-), পৃ. ১১৭০-১১৭৬; মুহাম্মদ ইকবাল, প্রজ্ঞান চর্চায় ইরান, অনুবাদকÑ কামালউদ্দিন খান (পূর্ব পাকিস্তান ইকবাল একাডেমী, ঢাকা : ১৩৭২ বাংলা) পৃ. ১-৬”।
এটি আংশিক চীনা ও জাপানীদের ধর্মমত। কনফুসিয়াস (৫৫১-৪৭৯ খৃ. পূ.) একজন শাসক ও ধর্ম প্রচারক হিসেবে পরিচিত। তাঁর ধর্মমত কনফুসীয় মতবাদ নামে খ্যাত। অতি
প্রাচীন ধর্ম হওয়ায় যদিও এ ধর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত তেমন কিছু জানা যায় না, তবুও অনেক গবেষক মনে করেন, পৌত্তলিকতার পরিবর্তে রাজার উপাসনাই এ ধর্মের মর্মবাণী। “নূর নবী, আল্লাহ্তত্ত্ব, পৃ. ১০”।  কিন্তু মাইকেল এইচ. হার্ট “বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী” নামক গ্রন্থে কনফুসীয় মতবাদের প্রবক্তা কনফুসিয়াস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে দেখান যে, কনফুসিয়াস এক ঈশ্বরের প্রতিই মানুষকে আহবান জানিয়েছিলেন। “কনফুসীয় মতবাদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, মাইকেল এইচ. হার্ট, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী, সংকলকÑমোঃ হুমায়ুন কবীর (সোলেমানিয়া বুক হাউস, বাংলা বাজার, ঢাকা: ২০০১), পৃ. ৩৬২-৩৬৮”।
উপরে পৃথিবীর পাঁচটি বড় বড় ধর্মে আল্লাহ সম্পর্কিত ধারণার সংক্ষিপ্ত বিবরণ পেশ করা হয়েছে এসব ধর্মের আলোচনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, আর তা হলো, আদিতে প্রত্যেকটি ধর্মই ছিল মূলত তৌহিদবাদী যদিও কালের পরির্তনে একমাত্র ইসলাম ছাড়া অন্যান্য ধর্মগুলোতে দ্বিত্ববাদী ও বহুত্ববাদী চিন্তার অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষের মধ্যে কোন না কোনভাবেই আল্লাহতে বিশ্বাস রয়েছে। তবে দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যারা আল্লাহ্তে বিশ্বাস করেন এমন লোকদের মধ্যেও আল্লাহ্র স্বরূপ, শক্তি, সংখ্যা ও গুণাগুণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আল্লাহ্ সম্পর্কিত মতামতের এ বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্য মোটামোটিভাবে ফুটে উঠেছে অনেকেশ্বরবাদ, দ্বিÑঈশ্বরবাদ ও একেশ্বরবাদÑএ তিনটি মতবাদে। “বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, ঈঁহহরহমযধস এ. ডধঃঃং, চৎড়নষবসং ড়ভ চযরষড়ংড়ঢ়যু (ঘড়ি উবষযর: উরংপড়াবৎু চঁনষরংযরহম ঐড়ঁংব, ১৯৯৩), ঈযধঢ়ঃবৎ-ঢঢঠ.”।
নিম্নে এ তিনটি মতবাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় এবং এ প্রসঙ্গে কুরআনের বক্তব্য উল্লেখ করা হলো ঃ
(ক) অনেকেশ্বরবাদ বা বহু ঈশ্বরবাদ : এ মতবাদ বহুদেববাদ নামেও পরিচিত। এ মত বহু স্বতন্ত্র ও স্বাধীন ঈশ্বর বা দেবতার বিশ্বাসী। এ মতে বিশ্বাসী মানুষের এক এক সমস্যা এক এক দেবতা সম্পাদন করে থাকেন। অতীত কালের ন্যায় বর্তমান কালেও বহুদেববাদে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা কম নয়। “আমিনুল ইসলাম, জগৎ জীবন দর্শন, পৃ ১৭৮”।
(খ) দ্বিÑঈশ্বরবাদ : এ মতে বিশ্বাসীরা কল্যাণ ও অকল্যাণের উৎস হিসেবে স্বতন্ত্র স্বভাবের ও পরস্পর বিরোধী দুই দেবতার অস্তিত্বে বিশ্বাসী। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৯”। পারসিক ধর্মে এরূপ দু’জন দেবতা বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব কল্পনা করা হয়।
(গ) একেশ্বরবাদ ঃ এ মতে ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। তিনি পূর্ণ স্বভাব ও সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। এ মতবাদ অনুযায়ী বিশ্বের সৃষ্টি, এর স্থিতি, স্থায়ীত্ব, ক্রমবিকাশ, ক্রমোন্নতি, প্রতিপালন, পরিপোষণ, ক্ষয়, লয় প্রভৃতি সকল ব্যাপারেই এক ঈশ্বর তথা আল্লাহ্র কোন সমসক্ষ বা শরীক নেই। “ প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮০”।
আল্লাহ সম্পর্কিত উপরে যে তিনটি মতবাদের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পেশ করা হলো এর মধ্যে একেশ্বরবাদ তথা তৌহিদাবাদী মতবাদটি সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং যৌক্তিক। পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় বহু দেববাদ ও দ্বিÑঈশ্বরবাদ ধারণার যৌক্তিকযোগ্য বলে মনে হয়। আর সেটি হল, দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে যেয়ে দেখানো হয়েছে যে, শিরকের তথা বহুদেববাদের অন্ধকারময় আবর্তে সর্বপ্রথম মানুষের ধর্মীয় জীবনের সূত্রপাত হয়। “সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী, সীরাতে সরওয়ারে আলম (প্রথম খ-), পৃ. ৩৮”।
অতঃপর ধারাবাহিক বিবর্তনের মাধ্যমে এ অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং আলোর রেখা উজ্জ্বল হতে থাকে। এভাবে অবশেষে তওহীদ বা এক আল্লাহ্র ধারণায় উপনীত হয়। কিন্তু কুরআন এর সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য পরিবেশন করে বলেছে, দুনিয়ার পরিপূর্ণ আলোকে মানুষের জীবনের সূত্রপাত হয়। আল্লাহ্ সর্বপ্রথম যে মানুষটিকে সৃষ্টি করেছিলেন ঐ প্রথম মানুষটিকে কুরআনের পরিভাষায় বলা হয়ে থাকে আদম (আ.) এবং প্রথম ঐ ব্যক্তিটিকে তিনি কবেন প্রথম নবী এবং এই এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেন তার জোড়া। অতঃপর ঐ জোড়ার বংশ ধারা চালু করেন। শত শত হাজার হাজার বছর ধরে তা চলতে চলতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীতে যত মানুষ জন্ম নিয়েছে সবাই ঐ প্রথম জোড়াটির সন্তান।
সকল জাতির ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বর্ণণাধারা এক বাক্যে ঘোষণা করে যে, একজন মানুষ থেকেই মানুষ জাতির বংশ ধারার সূচনা হয়। বিজ্ঞানের অনুসন্ধান থেকেও একথা প্রমাণিত হয়নি যে, পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় পৃথক পৃথক মানুষ সৃষ্টি হয়েছিল। বরং অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক এ ধারণা পোষণ করেন যে, প্রথমে একজন মানুষই জন্মে থাকবে এবং দুনিয়ার যেখানেই যত মানুষ পাওয়া যাবে সবাই ঐ একজন মানুষেরই সন্তান। “এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, ড. মরিস বুকাইলি, মানুষের আদি উৎস, অনুবাদÑআখতার উল-আলম (জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, ঢাকা: তৃতীয় প্রকাশ, ১৯৯৬”।
কিন্তু পরবর্তীতে হযরত আদম (আ.)-এর সন্তানদের মধ্যে যারা ছিল ভাল ও সৎ তারা পিতার নির্দেশিত সোজা পথে চলতে থাকে। কিন্তু যারা অসৎ ছিল তারা এ পথ ত্যাগ করে ধীরে ধীরে সব রকমের অন্যায় ও অপকর্মের জন্ম দেয় এবং চাঁদ, সূর্য, তারকা, বৃক্ষ, পশু ইত্যাদির উপাসনায় মগ্ন হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন বলেছে, “শুরুতে সব মানুষ একই পথে চলছিল। (তারপর এ অবস্থা অব্যাহত থাকল না এবং মতবিরোধ দেখা দিল) অতঃপর আল্লাহ নবী পাঠালেন, তারা ছিলেন (সত্য-সোজা পথ অবলম্বনকারীদের জন্য) সুসংবাদ দানকারী এবং (বক্র-ভুল পথ অবলম্বনের পরিণাম সম্পর্কে) ভীতি প্রদর্শনকারী। তাদের সাথে নাযিল করেন সত্য গ্রন্থ। যাতে সত্যের ব্যাপারে লোকদের মধ্যে যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল সে সম্পর্কে ফয়সালা করা যায়। আর এ মতবিরোধ দেখা দেবার কারণ এটা নয় যে, শুরুতে তাদেরকে সত্য সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি………।“সূরা ২, আয়াত ২১৩”।
পবিত্র কুরআন পর্যালোচনা করলে বহুদেববাদ, দ্বিÑঈশ্বরবাদ প্রভৃতি মতবাদ যে অসার এবং অযৌক্তিক তা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় দেখানো হয়েছে। কুরআনে বলা হচ্ছে, “আসমান যমীনে যদি আল্লাহ্ ছাড়া আরও ইলাহ থাকতো, তবে বিশ্বের ব্যবস্থাপনা ওলট-পালট হয়ে যেত।” “সূরা ৭৮, আয়াত ২২”।
বিশ্ব সৃষ্টির পর থেকে আজ অবধি বিশ্ব ব্যবস্থাপনা একই নিয়মের অধীনে চলছে। আজ পর্যন্ত এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। যদি একের অধিক আল্লাহ্ থাকতো তাহলে অবশ্যই যে বিশ্বব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা যেত সেই কথাটি উপরের আয়াতে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে অন্যত্র বলা হচ্ছে, “বল, আল্লাহ্র সাথে যদি অন্য ইলাহ্ হতো, যেমন লোকেরা বলছে, তাহলে তারা আরশ অধিপতির রাজত্ব দখল করার জন্যে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করত।” “সূরা ১৭, আয়াত ৪২-৪৩”।
মানুষেরা যেসব জিনিষকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করে, আল্লাহ্র সাথে শরীক করে সে সমস্ত জিনিসও সৃষ্ট। যেমন সূর্য, চন্দ্র, বাতাস, পানি, সাপ, বড় বড় গাছ ইত্যাদি। সৃষ্টি যে কোন দিন স্রষ্টা হতে পারে না, সৃষ্টিকে স্রষ্টা অংশীদার ভাবা যে সাংঘাতিক ভাবে অযৌক্তক তা কুরআনে উপমার মাধমে বলা হচ্ছে। কুরআনে বলা হচ্ছে, “তোমাদের আমি যে রূযী দিয়েছি, তোমাদের অধিকারভূক্ত দাস-দাসীরা কি তাতে তোমাদের সমান সমান অংশীদার? তোমরা কি তাদেরকে সেরূপ ভয় কর, যেরূপ নিজেদের লোককে ভয় কর?” “সূরা ৩০. আয়াত ২৮”।
এখানে মহান আল্লাহ্ দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বোঝাচ্ছেন, গোলাম ও মালিক যেমন একই মর্যাদার অধিকারী নয় তেমনি স্রষ্টা ও সৃষ্টি একই মর্যাদার অধিকারী নয়। অর্থাৎ সৃষ্টিকে স্রষ্টার আসনে বসানো বা স্রষ্টার সাথে অংশীদার বানানো চরম মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
আসলে মানব প্রকৃতির মধ্যেই এক আল্লাহ্র স্বীকারোক্তি বিদ্যমান। কিন্তু সত্যকে জানা সত্ত্বেও যারা অসৎ পথ অবলম্বন করে তারা ধীরে ধীরে বহু দেব-দেবীর আরধনায় মশগুন হয়ে পড়ে। আর মূলত মানুষের সামনে হারিয়ে যাওয়া সত্য পথটি আবার সুষ্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্যই যুগে যুগে আল্লাহ নবী-রাসূল পাঠান। “সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী, সীরাতে সরওয়ারে আলম (১ম খ-), পৃ. ৩৮”।
তৎকালীন আরব সমাজের মুশরিকদের ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকে লক্ষ্য করে কুরআন বলছে, “যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর তাদের কে পয়দা করেছে? তাহলে তরা নিশ্চয়ই বলবে আল্লাহ্।” “সূরা ৪৩, আয়াত ৮৭”।
সুতরাং একথা পরিষ্কার যে, বহুদেববাদ ও দ্বিÑঈশ্বরবাদ গ্রহণযোগ্য কোন মতবাদ নয়। বরং এ মতবাদদ্বয় মানব প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক।
উপরে ‘একত্ববাদের ধারণ’ সংক্রান্ত বিষয়ে যে আলোচনা করা হয়েছে তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, দ্বি-ঈশ্বরবাদ ও বহু ঈশ্বরবাদ নয় বরং একেশ্বরবাদই অধিক যুক্তিযুক্ত। এবং মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল। এ প্রসঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যে প্রশ্নটি ওঠে সেটি হলো, এই এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ্র সাথে জীব ও জগতের সম্পর্ক কী? অর্থাৎ আল্লাহ্ এই জগতের অন্তরে না এই জগতকে অতিক্রম করে আছেন? এই মূল প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত মতবাদের “বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, আমিনুল ইসলাম, জগৎ দর্শন, পৃ. ১৮৮-১৯৪; শ্রী প্রমোদবন্ধু সেগুপ্ত, পাশ্চাত্য দর্শন, পৃ. ৩৩০-৩৪৫”।
সৃষ্টি হয়েছে তা হলো : (১) অতিবর্তী ঈশ্বরবাদ (উবরংস), (২) সর্বেশ্বরবাদ (চধহঃযবরংস), (৩) সর্বধরেশ্বরবাদ (চধহবহঃযবরংস) ও (৪) ঈশ্বরবাদ (ঞযবরংস)। নিম্নে এগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো ঃ
(১) অতিবর্তী ঈশ্বরবাদ (উবরংস) ঃ এই মতবাদ অনুযায়ী আল্লাহ সম্পূর্ণভাবে এই জগৎকে অতিক্রম করে আছেন (এড়ফ রং যিড়ষষু ঃৎধহংপবহফবহঃ)।
(২) সর্বেশ্বরবাদ (চধহঃযবরংস) ঃ এই মতবাদ অনুসারে আল্লাহ সম্পূর্ণ জগতের অন্তর্বর্তী বা জগতের অন্তরে আছেন (এড়ফ রং যিড়ষষু রসসবহবহঃ)।
(৩) সর্বধরেশ্বরবাদ (চধহবহঃযবরংস)-ও ঈশ্বর (চধহঃযবরংস) এই দুই মতবাদ অনুসারে আল্লাহ জগতের অন্তর্বর্তী ও অতিবর্তী উভয়ই। আল্লাহ জগতকে অতিক্রম করে আছেন এবং জগতের অন্তরেও আছেন। (এড়ফ রং নড়ঃয রসসধহবহঃ ধহফ ঃৎধহংপবহফবহঃ)।
তবে উভয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলোÑ ঈশ্বরবাদীদের মতে, আল্লাহ একাধারে জগতের অতিবর্তী ও অন্তর্বর্তী বটে। তবে তিনি পুরাপুরিভাবে জীবকুলের অতিবর্তী। কিন্তু সবধরেশ্বরবাদীদের মতে, আল্লাহ্ যেভাবে জগতের অতিবর্তী ও অন্তর্বর্তী, ঠিক একইভাবে জীবকুলেরও অতিবর্তী ও অন্তর্বর্তী। কিন্তু অতিবর্তী ঈশ্বরবাদও সর্বেশ্বরবাদ গ্রহণযোগ্য মতবাদ নয়। উভয় মতই চরম বলে মনে
হয়। অতিবর্তী ঈশ্বরবাদ মেনে নিলে আল্লাহ্কে একজন যন্ত্র নির্মাতার সাথে কল্পনা করতে হয়। যিনি এই জগতরূপ বিশাল যন্ত্রটিকে তৈরি করে জগতের বাইরে চলে গেছেন। আর আল্লাহ্ ছাড়া যদি জগত আপনা আপনিই চলতে পারে তাহলে আল্লাহ্র প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না। অপর পক্ষে, সর্বেশ্বরবাদকে এক শূণ্যগর্ভ মতবাদ বলে আখ্যায়িত করা হয়। কেননা, এই মতবাদ বহুকে উপেক্ষা করে কেবল এককে স্বীকার করে। কিন্তু বহুকে অস্বীকার করে শুধুমাত্র একের ধারণা শূন্যগর্ভ। এই মতবাদে জীব ও আল্লাহ্ এক অভিন্ন। এখানে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু পার্থক্যকে কেন্দ্র করেই ধর্মের অস্তিত্ব সম্ভব। তাই এই মতবাদ ধর্ম সম্পর্কীয় অনুভূতির কোন যক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে পারে না। অপরদিকে সর্বধরেশ্বরবাদ মতবাদটিকে গ্রহণযোগ্য বলা যেতে পারে। এই মতবাদ অনুযায়ী আল্লাহ্ একই সাথে জীব ও জগতের অতিবর্তী ও অন্তর্বর্তী। পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্মগুলোর মতে, জগতের শুধু বাইরে নয়, জগতের মধ্যেও এবং জগতের কর্মকান্ড পরিচালনায় নিয়ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছেন।” “আমিনুল ইসলাম, জগৎ জীবন দর্শন, পৃ. ১৮৯”।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় যে, মহান আল্লাহ্পাক আসমান ও যমীনকে সৃষ্টি করে যেমন সিংহাসনে আসীন হয়েছেন তেমনি তিনি সর্বদাই জীবকুলের নিকটবর্তী হয়ে প্রত্যেকটি জীবের কর্মবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনের কিছু বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য ঃ “তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টন করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়।” “সূরা ২, আয়াত ২৫৫”।
“পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহ্রই। অতএব, তোমরা যে দিকেই মুখ ফেরাও, সে দিকেই আল্লাহ্ বিরাজমান।” “সূরা ২, আয়াত ১১৫”।
“নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা নিকটেই আছেন তিনি আহবানে সাড়া দেন।” “তিনি তোমাদের সাথেই আছেন, তোমরা যেখানেই থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।” “সূরা ১১, আয়াত ৬১।” “… আমি তার গ্রীবস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী।” “সূরা ৫০, আয়াত ১৬”।
বস্তুতপক্ষে এটা বলা যেতে পারে, আত্মা যেমন বিভিন্ন মানসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজকে প্রকাশ করে কিন্তু তাই বলে মানসিক প্রক্রিয়ার সমষ্টি যেমন আত্ম নয় তেমনি সসীম বস্তু ও শান্ত জীবের সমষ্টিই আল্লাহ্ নন। বলা যেতে পারে যে, আল্লাহ্ জগতের মধ্যে থেকেও জগতের বাইরে রয়েছেন। যে আল্লাহ্ একাধারে জগতের বাইরে থেকেও জগতের মধ্যে প্রতিনিয়ত ক্রিয়া করে চলেছেন তাঁর প্রকৃতি কী, এটা আলোচনা করা অতীব জরুরী বিধায় বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির নিরীখে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হচ্ছে।
কোন জিনিসের স্বরূপ বা প্রকৃতি (ঘধঃঁৎব) যেমন সেই জিনিসের গুণাবলীর মাধ্যমে জানা যায় তেমনি আল্লাহ্র স্বরূপ বা প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে হলেও তা আল্লাহ্র গুণাবলীর মাধ্যমে জানতে হবে। “ড. এম. হুদা, সাধারণ দর্শণের মূলতত্ত্ব (এম.বি.প্রিন্টিং পাবলিকেশন্স, ঢাকা : দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৯০), পৃ. ২৮৪”।
বিভিন্ন ধর্মে আল্লাহ্কে যেমন বিভিন্নভাবে গ্রহণ করা হয়েছে তেমনি দর্শনের কোথাও আল্লাহ্কে ‘নিছক একটি শক্তি’ অথবা ‘প্রথম বা আদি নিমিত্ত’ (ঋরৎংঃ পধঁংব) অথবা ‘বিশ্বজাহানের আত্মা’ আবার কোথাও আল্লাহ্ এই বিশ্বজাহানের কারখানটিকে একবার চালিয়ে দেবার প্রয়োজন পূর্ণ করে (তাঁর সৃষ্টি থেকে) পৃথক হয়ে গেছেন “জন ক্লোভার মোনজ্মা, চল্লিশ জন সেরা বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে আল্লাহর অস্তিত্ব, “ভূমিকা”।
এমন ধারণা করা হয়ে থাকে। বলা বাহুল্য এই সবের মাধ্যমে আল্লাহ্র প্রকৃত স্বরূপ বা প্রকৃতি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানার্জন সম্ভব নয় বলে মনে হয়। তাছাড়া যাকে আল্লাহ্ বলে স্বীকার করা হবে তিনি যদি শুধুমাত্র উপরোক্ত প্রকৃতি সম্পন্ন হন তাহলে একজন বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন এবং মেধাসম্পন্ন মানুষের পক্ষে তার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। যাকে আল্লাহ্ বলে স্বীকার করা হবে তাঁকে হতে হবে সর্বগুণে গুণান্বিত এক সত্তা আল্লাহ্র স্বরূপ বা প্রকৃতি কী? এর যথার্থ জবাব আর-কুরআনে সবিস্তারিত ও সম্পূর্ণাঙ্গ রূপে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু কুরআনে এই বিষয়ে এত বেশি আলোচনা করা হয়েছে যে, এতটুকুন ছোট্ট পরিসরে এতদসম্পর্কিত ধারণা পেশ করা দুরূহ। তাই নিম্নে এ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধারণা পেশ করা হচ্ছে।
যে প্রকৃতি সম্পন্ন হওয়ার জন্য কোন সত্তাকে আল্লাহ্ বলে গণ্য করতে হবে তাঁর প্রথম পরিচয় হল সেই সত্তার অবশ্যই সৃষ্টি করার যোগ্যতা থাকতে হবে। “সূরা ৯৬, আয়াত ১”।
তবে একজন মানুষ যখন প্রকৃতির কোন জিনিসের সহযোগিতায় কোন যন্ত্র তৈরি করেন তখন তাঁকে স্রষ্টা (ঈৎবধঃড়ৎ) বলা যায় না। বরং তিনি একজন আবিষ্কার্তা (ওহাবহঃড়ৎ)। স্রষ্টার গুণসম্পন্ন তাঁকেই বলা যাবে যিনি কোন কিছুর সাহায্য ছাড়া যখন, খুশী, যেমন খুশী, যেভাবে খুশী, যা খুশী, তা সৃষ্টি করতে পারবেন। সেদিক থেকে আল্লাহ্ই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। মহান আল্লাহ্ কুরআনে বলেন, “নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। ..— শুনে রেখ, তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা ও আদেশ দান করা।” “সূরা ৭, আয়াত ৫৮”।
কুরআন অন্যত্র বলা হচ্ছে, “আল্লাহ্ সব কিছুই স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর দায়িত্ব গ্রহন করেন।” “সূরা ৩৯, আয়াত ৬২”।
বলা বাহুল্য, সৃষ্টিকর্মে আল্লাহ্র কোন সহযোগিতা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু ইচ্ছা হলেই তিনি তৎক্ষণাৎ কোন কিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম।” “সূরা ১৬, আয়াত ৪০”।
যিনি স্রষ্টা হবে তিনি সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হবেন না। তিনি সৃষ্টির জণ্য নির্ভুল বিধান প্রণয়ন করার ক্ষমতা রাখবেন। তাইত কুরআনে বলা হচ্ছে, “আমি বললাম, তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও। এরপর যখন আমার পক্ষ থেকে কোন হিদায়াতের বিধান তোমাদের কাছে পৌছাবে তখন যারা সেই বিধানের অণুসরণ করবে তাদের জন্য থাকবে না কোন ভয়, দুঃখ বেদনা।” “সূরা ২, আয়াত ৩৮”।
আল্লাহ্কে অবশ্যই স্বয়ম্ভূ ও চিরন্তর হতে হবে। অথাৎ তাকে অবশ্যই তার নিজের অস্তিত্বের কারণ হতে হবে। তাঁর অস্তিত্ব কারও উপর নির্ভর করবে না। “সূরা ১১২,; সূরা ৫৭, আয়াত ৩”।
আল্লাহ্র অবশ্যই এই জগতের উপর আধিপত্য থাকতে হবে, তাঁকে সর্বস্থানে বিদ্যমান থাকতে হবে এবং প্রত্যেক পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয় সম্পর্কে তাঁকে অবশ্যই অবগত থাকতে হবে। “সূরা ৩, আয়াত ১৮৯; সূরা ৮৫, আয়াত ১৬; সূরা ৪, আয়াত ২৬; সূরা ২, আয়াত ১১৫; সূরা ৪, আয়াত ১১”।
তাঁকে অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ বিচক্ষণতা তথা প্রজ্ঞার অধিকারী হতে হবে যাতে তিনি মানুষের সব ধরণের কর্মকান্ড বিশেষ করে নৈতিক কর্মের নির্ভুল পথ প্রদর্শন করতে সক্ষম হন। “সূরা ৪৫, আয়াত ৩৭; সূরা ৭৬, আয়াত ৩০”।
তাকে হতে হবে সকল দোষত্রুটি, দুর্বলতা ও অক্ষমতা থেকে মুক্ত। “সূরা ১২, আয়াত ১০৮; সূরা ৩৭, আয়াত ৮০”।
জীবন ও মৃত্যু থাকবে তাঁরই করায়ত্বে। “সূরা ৭, আয়াত ১৫৮; সূরা ৯, আয়াত ১১৬”।
উপরোক্ত গুণাবলী ছাড়া অসংখ্য গুণাবলী রয়েছে মহান আল্লাহ তা’আলার; যে গুণাবলী মাধ্যমে আল্লাহর প্রকৃতি সম্পর্কে জানা যেতে পারে। কিন্তু এত ছোট পরিসরে সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া কঠিন। সেই সমস্ত গুণাবলীর নাম, সূরা এবং তৎসংক্রান্ত কিছু কিছু আয়াত নিম্নে উল্লেখ করা হচ্ছে ঃ  তিনি এক, তাঁর সমকক্ষ নেই (১২২ ঃ ১); তিনি কারো সন্তান নন এবং তাঁর সন্তানও কেউ নয় (১১২ ঃ ৩); তিনি তওবা কবূলকারী (৯ ঃ ১০৪, ২৪ ঃ ১০, ৪৯ ঃ ১২); তিনি ধৈর্যশীল (১৭ ঃ ৪৪, ২২ ঃ ৫৯); তিনি রিযিক দাতা (৬২ ঃ ১১) শ্রবণকারী (৭ ঃ ২০); গোপন ও প্রকাশ্য সম্পর্কে জ্ঞান (৯ ঃ ৯৪); তিনি প্রবল ক্ষমতাশালী (৮ ঃ ১০); তিনি অনুগ্রহকারী (২৫ ঃ ২৮); কেউ তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয় (৮ ঃ ৪৭); প্রতিটি জিনিসের উপর তাঁর জ্ঞান পরিব্যপ্ত (৭ ঃ ৮৯); তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ (২০ ঃ ১১৪); তিনি সর্বজয়ী (৩৫ ঃ ২)
একক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্র ধারণা, একত্ববাদ, প্রকৃতি প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করা হলো। এখন আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ বিষয়ে আলোচনা করা হবে। তবে এখানে একটা বিষয় প্রথামেই বলে নেয়া প্রয়োজন আর সেটি হলো, প্রকৃতপক্ষে, স্থানÑকালে কোন জাগতিক বস্তুকে যেভাবে প্রমাণ করা যায় আল্লাহ্র অস্তিত্বের বিষয়টি ঠিক সেভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তবে জাগতিক কোন বস্তুর মত আল্লাহ্র প্রমাণের বিষয়টি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রমাণ করা যায় না বলে একথা বলা যাবে না যে, আল্লাহ্র বুঝি অস্তিত্ব নেই। কেননা, আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ অভিজ্ঞাতাভিত্তিক নয় তেমনি আল্লাহ্র অনস্তিত্বকেও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রমাণ করা যায় না। এটি আসলে হৃদয় মনে উপলব্ধির বিষয়। এরপরও দার্শনিকরা দাশনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এবং বিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। নিম্নে দর্শন ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ ছাড়াও কুরআনের দৃষ্টিতে আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
দার্শনিকগণ আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণ “আরো দেখুন, ঈঁহহরহমযধস এ. ডধঃঃং, চৎড়নষবসং ড়ভ চযরষড়ংড়ঢ়যু, ঢ়ঢ়. ৪১৩-৪১৮; উৎ. অনফঁষ ঔধষরষ গরধ অ ঈড়ঃবসঢ়ড়ৎধৎু চযরষড়ংঢ়যু ড়ভ জরষরমরড়হ (ওংষধসরপ ঋড়ঁহফধঃরড়হ, উযধশধ: ১৯৮২), ঈযধঢ়ঃবৎ-ঠওও. ”।
দিতে যেয়ে যে সমস্ত যুক্তির অবতারণা করেছেন সেগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে উপস্থাপন করা হল ঃ
প্রথমত, তত্ব বিষয়ক যুক্তি ঃ এই যুক্তিটির মূল বক্তব্য হলো, আল্লাহর ধারণার (ওফবধ ড়ভ এড়ফ) মধ্যেই আল্লাহ্র বাস্তবতা (জবধষরঃু ড়ভ এড়ফ) নিহিত। এখানে চিরন্তর বা ধারণা থেকে অস্তিত্বের উপনীত হওয়া বা অস্তিত্বের সিন্ধান্ত করাই হল যুক্তিটির সার কথা।
দ্বিতীয়ত, আদিকারণ বিষয়ক যুক্তি : এই যুক্তিটির মূল বক্তব্য হলো, বিনা কারণে কোনো কার্যের উদ্ভব সম্ভব নয়। কাজেই এই সৃষ্ট জগতেরও কোন কারণ আছে। সৃষ্ট জগতের কারণ কোন সসীম বস্তু
হতে পারে না। কেননা তাহলে তার আবার অন্য কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। জগতের কারণ অসীম (ওহভরহরঃব) হওয়া প্রয়োজন। এই কারণ হলে আল্লাহ্।
তৃতীয়ত, উদ্দেশ্য সম্বন্ধীয় যুক্তি ঃ  এই যুক্তিটির মূল বক্তব্য হলো, এ বিশ্বের প্রতি ক্ষেত্রে, প্রতি ঘটনায় এক উদ্দেশ্যের পরিষ্কার প্রমাণ দেখা যায়। আর যেখানে উদ্দেশ্য আছে সেখানে সচেতন বুদ্ধির পরিচালনাল প্রশ্ন আছে; অতএব, জগতের পরিচালক হিসেবে, জগতের মহাপরিকল্পক হিসেবে এক অনন্ত ও অসীম আল্লাহ্র অস্তিত্ব রয়েছে।
চুতুর্থ, নৈতিক যুক্তি ঃ এই যুক্তিটির মূল বক্তব্য হলো, সাধারণত দেখা যায় এ জগতের ধার্মিকগণ প্রায়ই অসুখী থাকেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে ধার্মিককে সুখী করা সম্ভব নয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে এ কাজ কার? একমাত্র আল্লাহ্ই ধার্মিকতা ও সুখের সমন্বয় সাধন করতে পারেন। ধার্মিক ব্যক্তি ইহজীবনে সুখী না হলেও পরজীবনে আল্লাহ্ তাকে সুখী করতে পারেন। অতএব, আল্লাহ্র অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতে হয়।
আল্লাহ্র অস্তিত্বের বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ব্যাপারে একটা কথা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, পরীক্ষাগারে বা বাস্তব যাচাই পদ্ধতিতে কোন জিনিসকে যেমন প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা যায়, আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণটি ঠিক সেরকম নয়। তবে একথা ঠিক নয় যে, অদৃশ্যে বিশ্বাসের নাম বিজ্ঞান। প্রকৃতপক্ষে ধর্ম এবং বিজ্ঞান উভয়েই মধ্যেই অদৃশ্যের কার্যকারিতা রয়েছে। “ড. ওয়াহীদুদ্দীন খান, আধুনিক চিন্তাধারা বনাম ধর্ম, পৃ. ৪০”।
ধর্মের মূূল চক্ররেখা চূড়ান্ত বাস্তবতা নির্ণয়ের দিক নির্দেশ করে, অপরদিকে বিজ্ঞান ততক্ষণ পর্যন্ত দৃশ্যমান জ্ঞান, যতক্ষণ তা প্রাথমিক ও বাহ্যিক বিষয় সম্পর্কে কথা বলে। আর যখন তা বস্তুর চূড়ান্ত ও প্রকৃত অবস্থা নির্ণয়ের উদ্যোগ নেয়Ñযা মূলত ধর্মের রাজ্যভুক্ত তখন তাও ঠিক সেভাবে অদৃশ্য বিশ্বাস এর পন্থা অনুসরণ করে। উদাহরণস্বরূপ মাধ্যাকর্ষণ নীতির কথা বলা যায়। হরহামেশা আমরা দেখি একটি পাখি মরে গেলে মাটিতে পড়ে, একটি পাথরকে মাটি থেকে উঠাতে গেলে শক্তি খরচ হয়, তেমনি পাহাড় থেকে নামার তুলানায় পাহাড়ে উঠা কঠিন। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই আমাদের সামনে আসে, সেগুলোর মধ্যে বাহ্যত কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু উপরে উল্লিখিত ইন্দ্রিয়নুভূত ঘটনারাজি এবং যুক্তিগ্রাহ্য বাস্তবতাসমূহকে একসাথে মিলিয়ে দেখলে সবকিছুর মধ্যে একটা শৃঙ্খলা পরিদৃষ্ট হয়; যার নাম দেয়া যায় মাধ্যাকর্ষণ নীতি। যদিও এই নীতি কখনও বাস্তবে পরিদৃষ্ট চক্ষুষ বস্তু নয়, বিজ্ঞানীরা যে জিনিসটি দেখেছেন, পরীক্ষা করেছেন, তা স্বয়ং আকর্ষণ নীতি নয় বরং অন্য কিছু যাকে তারা যুক্তির খাতিরে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন এবং স্বীকার করেছেন যে, এর মধ্যে এমন কোন বস্তু বিদ্যামান, যাকে তারা মাধ্যাকর্ষণ নীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন।
এই জন্য বলা যায়, বিজ্ঞান যেমন দৃশ্যমান বস্তুকে স্বীকার করে তেমনি অদৃশ্যমান বিষয়ের উপরও বিশ্বাস করে। অদৃশ্যমান বিষয়গুলোর প্রতি যদি আস্থা বা বিশ্বাস করা না হয় তাহলে মাধ্যাকর্ষণ নীতি, পরমাণুর অস্তিত্বের ধারণা- সব মিথ্যা হয়ে যেত।
আসলে একটি অদৃশ্য বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে তার ফলাফলের কারণে বিজ্ঞানীরা সুদৃঢ বিশ্বাস পোষণ করে পরোক্ষভাবে একথার স্বীকৃতি দেন যে, যে সমস্ত বাস্তবতার উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করি, আদিতে তা একটি কল্পিত (ঐুঢ়ড়যঃবঃরপধষ) সিন্ধান্তই হয়ে থাকে। অতঃপর যখন ক্রমান্বয়ে নুতন নতুন বাস্তবতা প্রতিভাত হয়ে এই সিন্ধান্তের সত্যতা প্রমাণিত হতে থাকে তখন তা বাস্তবতা রূপ প্ররিগ্রহ করে, এমনকি শেষ পর্যন্ত আমাদের চূড়ান্ত বিশ্বাসে পরিণত হয়। “প্রাগুক্ত, পৃ. ৪২”।
ঠিক একই ভাবে আল্লাহ্কে প্রমাণ করতে গিয়ে এরূপ করা হয়না যে, কোন দূরবীক্ষণ যন্ত্রের
গরধ, অ ঈড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু চযরষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ জরষরমরড়হ (ওংষধসরপ ঋড়ঁহফধঃরড়হ, উযধশধ: ১৯৮২), ঈযধঢ়ঃবৎ-ঠওও.
সাহায্যে স্বয়ং আল্লাহ্কে দেখিয়ে দেওয়া হয়, বরং এভাবে এর পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করা হয় যে, সৃষ্টিরাজির নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য একথার প্রমাণ যে, এর পিছনে কোন প্রজ্ঞাময় সত্তার অস্তিত্ব রয়েছে। এভাবে আমাদের যুক্তি সরাসরি আল্লাহ্ না মেনে পারা যায় না। উপরোক্ত কথাগুলো সামনে রেখে আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণের জন্য কুরআন উল্লিখিত কিছু বিজ্ঞান ভিত্তিক আয়াতের পর্যালোচনা করে উক্ত আয়াতগুলো যে বিজ্ঞানের বক্তব্যের সাথে হুবহু সাদৃশ্যমান-এর ভিত্তিতে আল্লাহ্র অস্তিত্বের বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রমাণ দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হবে। কেননা কুরআনের বক্তব্য যদি প্রবক্তা তিনি স্বয়ং আল্লাহ্। কেননা কুরআন এখন থেকে দেড় হাজার বৎসর পূর্বে নাযিল হয়েছে, আর বিজ্ঞান প্রাকৃতিক জগতের ব্যাখ্যা দিচ্ছেÑ যা কুরআনের সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে তা মাত্র একশত বৎসর পূর্বেই প্রমাণ। তবে এখানে একটি বিষয় প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন আর তা হচ্ছে, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য সম্বলিত কুরআনের বাণী সংখ্যায় সুপ্রচুর। এত ছোট পরিসরে তার সবটুকু কেন সামান্য অংশও উল্লেখ করা মুশকিল। এখানে সংক্ষেপে মাত্র তিনটি বিষয়ের উল্লেখ করা হলো ঃ
প্রথমত, পানির প্রসঙ্গটি উল্লেখযোগ্য। কুরআনের দু’টি জায়গায় পানির একটি বিশেষ নীতি প্রকৃতির বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, “তিনিই দুই দরিয়াকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন, একটির পানি মিষ্টি, সুপেয় এবং অপরটির পানি লোনা, খরÑ উভয়ের মধ্যে তিনি রেখে দিয়েছেন এক অন্তরাল, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।” “সূরা ২৫, আয়াত ৫৩”।
অন্য জায়গায়, “তিনি প্রবাহিত করেন দুই দরিয়া যারা পরস্পর মিলিত হয়, কিন্তু ওদের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরাল যা ওরা অতিক্রম করতে পারে না। “সূরা ৫৫, আয়াত ১৯-২০”।
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে পানির যে বহিঃপ্রকাশের উল্লেখ করা হয়েছে তা প্রাচীনতম যুগ থেকে মানুষের জানা থাকলেও এই ঘটনা প্রকৃতির কোন নিয়মের অধীনে ঘটে চলছে তার কারণ অতি সম্প্রতি জানা গেছে। আধুনিক পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, তরল পদার্থের মধ্যে পৃষ্ট প্রসারণ (ঝঁৎভধপব ঞবহংরড়হ)-এর একটি বিশেষ নিয়ম রয়েছে এবং এই নিয়মই উভয় প্রকার পানিকে পৃথক রাখে। উক্ত আয়াতদ্বয়ে যে বরযাখ বা অন্তরাল শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত পৃষ্ঠ প্রসারণ (ঝঁৎভধপব ঞবহংরড়হ)-এর দিকেই ইংগিত করছে। “ড. ওয়াহীদুদ্দীন খান, আধুনিক চিন্তাধারা বনাম ধর্ম, পৃ. ১৫৯”।
দ্বিতীয়ত, রাত ও দিনের আবর্তন সংক্রান্ত প্রসংঙ্গটি উল্লেখ করা যায়। কুরআনে বলা হচ্ছে, “তিনি দিনকে রাত দ্বারা আচ্ছাদিত করেন যাতে ওদের একটি অন্যটিকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে।” “সূরা ৭, আয়াত ৫৬৪”।
এই আয়াতে রাত ও দিনের বাহ্যিক আগমন-নির্গমনের কথা বলা হলেও পৃথিবীর আপন কক্ষপথে পরিভ্রমলের একটি অতি সুন্দর ইঙ্গিত রয়েছে। যা আধুনিক পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে। এ প্রসঙ্গে রাশিয়ার প্রথম মহাশূন্য ভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা যায়। আর তা হলো, তিনি মহাশূন্য থেকে পৃথিবীকে এই রূপে দেখেছেন যে, সূর্যের সম্মুখে আপন অক্ষের উপর আবর্তিত হওয়ার কারণে তার উপর আলো ও আঁধারের আগমন নির্গমনের একটি দ্রুত ধারাবহ (জবঢ়রফ ঝঁপপবংংরড়হ) অব্যাহত রয়েছে। “ড. ওয়াহীদুদ্দীন খান, আধুনিক চিন্তাধারা বনাম ধর্ম, পৃ. ১৬১। আরো দেখুন, ড. মরিস বুকাইলি, বাইবেল”।
তৃতীয়ত, মহাশূন্য বিজয়ের কথা বলা যায়। কুরআনে বলা হচ্ছে, ‘হে জ্বীন ও মানবমন্ডলী, যদি তোমরা প্রবেশ করতে পার আসমান ও যমিনের এলাকায়, তাহলে তাতে প্রবেশ কর। তোমরা এতে প্রবেশ করতে পারবে না মহাক্ষমতা ব্যতিরেকে।’ “সূরা ৫৫, আয়াত ৩৩”।
উপরোক্ত আয়াতে যে শর্তে (যদি) কথা বলা হয়েছে তা অর্জিত হতে পারে এমন কথা বোঝাচ্ছে। কেননা ‘যদি’ বুঝাতে আরবীতে ‘ইজা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে তা অর্জন করা সম্ভব নয় বোঝায়। উপরোক্ত আয়াতে ‘ইন’ শব্দটি দ্বারা এমন এক যদির ধারণা দেওয়া হয়েছে যা অর্জনযোগ্য। এ প্রসঙ্গে ড. মরিস বুকাইলী বলেন,
“মহাশূন্য বিজয়ের কর্মসূচীতে এই মানুষেরা যে মহাক্ষমতার (সুলতান) বলে সাফল্য অর্জন করবে, ধারণা করা যেতে পারে যে, সেই ক্ষমতা আসবে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র তরফ থেকে।” “ড. মরিস বুকাইলি, বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান, পৃ. ২৬৯”।
কুরআনে বর্ণিত অসংখ্য বিজ্ঞান ভিত্তিক আয়াতের মধ্যে এখানে মাত্র দু’একটি আয়াত পেশ করা হলো যা প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে। যদি আল্লাহ্ বলে সত্তা না থাকেন তাহলে এখন থেকে দেড় হাজার বৎসর পূর্বে সম্পূর্ণ অক্ষর জ্ঞানহীন একজন মানুষের দ্বারা এমন বক্তব্য পেশ করা আদৌ সম্ভব নয়। আল্লাহ্র অস্তিত্বের প্রমাণকে ‘জাগতিক অভিজ্ঞতা ভিত্তিক প্রমাণ’, ‘উদ্দেশ্যমূলক প্রমাণ’, ‘আত্মিক চেতনা ভিত্তিক প্রমাণ’ এবং ‘প্রত্যাদেশ ভিত্তিক’ প্রমাণে বিভক্ত করে দেখানো যেতে পারে। এখন কুরআনের আলোকে উপরোক্ত শিরোনামে আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ বর্ণনা করা হচ্ছে।
সৃষ্টি জগতের দিকে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যায় এই জগৎ আল্লাহ্র সাক্ষ্য দিচ্ছে। এই জগতে বিদ্যমান এমন একটি বস্তুও নেই যা নিজ থেকেই বিদ্যমান। প্রতিটি ক্ষুদ্র-বৃহৎ বস্তুর পিছনে একজন নির্মাতা অবশ্যই আছে। এর এটা একটা বাস্তবিকই অর্থহীন কথা যে, সৃষ্টিকে স্বীকার করা হবে কিন্তু স্রষ্টাকে স্বীকার করা হবে না। ঠিক একইভাবে এটিও বিশ্বাস করা যায় না যে, এই বিরাট সৃষ্টি জগৎ এমনিতেই সৃষ্টি হয়ে গেছে এবং এর পিছনে কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। একমাত্র অস্তিত্বশীল স্রষ্টাই এই জগতের প্রতিটি বস্তুকে সৃষ্টি করেছেন, এবং সেই সৃষ্টির প্রকৃতি, এর গঠনবিন্যাস, এর কার্যকারিতা প্রভৃতির উপলব্ধির দ্বারা এক আল্লাহ্র অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়া উপায় যে নেই সেই সত্যটি পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে বলা হয়েছে। যেমন কুরআনে বলা হচ্ছে, “তোমাদের আল্লাহ্ এক ও একক। সেই দয়াবান ও করুণাময় আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই। (এই সত্যটি চিহ্নিত করার জন্য যদি কোন নিদর্শন বা আলামতের প্রয়োজন হয় তাহলে) যারা বুদ্ধি বিবেক ব্যবহার করে তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর ঘটনাকৃতিতে, রাত্রদিনের অনবরত আবর্তনে, মানুষের প্রয়োজনীয় ও উপকারী সামগ্রী নিয়ে সাগর দরিয়ার চলমান জলযানসমূহে, বৃষ্টি ধারার মধ্যে, যা আল্লাহ্ বর্ষণ করেন ওপর থেকে তারপর তার মাধ্যমে মৃত ভূমিতে জীবন দান করেন এবং নিজের এই ব্যবস্থাপনা বদৌলতে পৃথিবীতে সব রকমের প্রাণী ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেন, আর বায়ূ প্রবাহ এবং আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালায় অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে।” “সূরা ২, আয়াত ১৬৩-১৬৪”।
কুরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে, “তিনি অর্থাৎ আল্লাহ্ আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা। তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন……।” “সূরা ৪২, আয়াত ১১”।
কুরআনে আরো বলা হচ্ছে, “হে মানব জাতি। ইবাদত কর তোমাদের রবের যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্বে যারা অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের সবার সৃষ্টিকর্তা….।” “সূরা ২, আয়াত ২১; আরো দেখুন, সূরা ১৬, আয়াত ১০-১১; সূরা ৬, আয়াত ৯৯; সূরা ৫০, আয়াত ৯-১১”।
পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, কুরআনের অনেক জায়গায় বলা হয়েছে, এই জগতকে বিনা উদ্দেশ্য সৃষ্টি করা হয়নি। এই জগতে যে নিয়ম শৃঙ্খলা, সামঞ্জস্য, ঐক্য বিরাজমান এদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে আল্লাহ বোঝাতে চাচ্ছেন যে, প্রকৃতির সকল ঘটনারাজির ঐক্য বিধানের জন্য নিশ্চয়ই একজন স্রষ্টা প্রয়োজন। যে ঐক্যের মধ্যে কোন ফাটল বা অসামঞ্জস্যতা থাকবে না। কুরআনে বলা হচ্ছে, “সেই মহান সত্তাই সাত আসমানকে স্তরে স্তরে তৈরি করেছেন। তুমি সেই করুণাময়ের সৃষ্টিতে কোথাও কোন ক্রটি দেখতে পাবে না। “সূরা ৬৭, আয়াত ৩-৪”।
কুরআনের অন্যত্র বলা হচ্ছে, “আমি আকাশ ও ভূমন্ডল এবং তন্মধ্যস্থ যাবতীয় ব্স্তু খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। নিশ্চয়ই আমি উভয়কেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে তৈরি করেছি কিন্তু অধিকাংশ লোকই অনুধাবন করে না।” “সূরা ৪৪, আয়াত ৩৮-৩৯”।
এটিকে দর্শনের পরিভাষায় আল্লাহর অস্তিত্বের তত্ত্ব বিষয়ক প্রমাণ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এটি হলো, মানুষের মনে আল্লাহর ধারণার উপস্থিতিই তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। কুরআনে বলা হচ্ছে, মানুষ বিপদে পড়লে অকস্মাৎ সে আল্লাহ্কে স্মরণ করে, আসমান যমীনের সৃষ্টির ব্যাপারে প্রশ্ন করলেও সে জবাব দেয় যে, মহান আল্লাহ্ই এগুলো সৃষ্টি করেছেন। “সূরা ৪১, আয়াত ৫১; সূরা ৪৩, আয়াত ৯”।
এখানে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে যদি আল্লাহ্র অস্তিত্ব না-ই থাকে তাহলে মানুষের অন্তরে এমন ধারণা কে সৃষ্টি করে? সুতরাং এ থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ্র অস্তিত্ব অত্যন্ত সুষ্পষ্ট।
আল্লাহ্ যুগে যুগে মানব জাতিকে হিদায়েতদানের জন্য নবী রাসূল প্রেরণ করেছেন। “সূরা ৩৫, আয়াত ২৪”।
সেই সাথে ঐসব নবী-রাসুলকে তিনি সঙ্গে দিয়েছেন আসমানী গ্রন্থ। ঠিক এরই ধারাবাহিকতায় তিনি সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)Ñকে পবিত্র কুরআন দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। “সূরা ৬, আয়াত ১৯”।
পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় চ্যালেঞ্জ “সূরা ২, আয়াত ২৩; সূরা ১০, আয়াত ৩৮; সূরা ১১, আয়াত ১৩; সূরা ১৭, আয়াত ৮৮ এবং সূরা ৫২, আয়াত ৩৩-৩৪”।
দিয়ে বলা হয়েছে যে, এই কিতাব স্বয়ং আল্লাহ্রই বাণী এবং মানুষ ও জ্বীনকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে যে, তোমরা যদি মনে কর এটি আল্লাহ্র বাণী নয় তাহলে তোমরা অনুরূপ একটি অধ্যায় বা সূরা রচনা করে নিয়ে এসো। এই চ্যালেঞ্জ যে মানুষ গ্রহণ করেনি তা নয়। কিন্তু মানুষ অনুরূপ একটি অধ্যায় তো দূরের কথা একটি ছোট সূরাও রচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ্র অস্তিত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত।  সব শেষে কোন্ কোন্ ভিত্তির উপরই নির্ভর করে আল্লাহ্র সাথে মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তা আলোচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে কুরআনে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। তার মধ্যে মাত্র কয়েকটি বিষয়ে অতি সংক্ষেপে এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে ঃ মানুষের দুটি দিক রয়েছে, ১. দৈহিক দিক, ২. আত্মিক দিক। দৈহিক দিকের চেয়ে আত্মিক দিকটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই আত্মিক দিকের সঙ্গে খোদ আল্লাহ্র প্রকৃতিগত সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে হয়। কেননা কুরআনে বলা হচ্ছে, “মানুষ আপনাকে রূহ্ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আপনি বলুন রূহ আমার প্রভুর দির্দেশ। “সূরা ১৭, আয়াত ৮৫”।
অর্থাৎ এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে আর তা হলো, স্বয়ং আল্লাহ্র রুহানিয়াত মানুষের মধ্যে ফুঁকে দেওয়া হয়েছে। এদিক থেকে বলা যায় মানুষের সাথে আল্লাহর একটা আধ্যাত্মিক (ঝঢ়রৎরঃঁধষ) সম্পর্ক রয়েছে। আর এটাই বলা হচ্ছে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে, “তোমরা আল্লাহ্র রঙ্গে রঙ্গিন হয়ে যাও।” “সূরা ২, আয়াত ১৩৮”।
জ্ঞানগত দিক : পবিত্র কুরআন থেকে জানা যায় মহান আল্লাহ্ হচ্ছেন সকল জ্ঞানের আধার; তিনি সুবিজ্ঞ। ভূমন্ডল ও নভোমন্ডল এমন কোন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় নেই যে সম্পর্কে তিনি পরিজ্ঞাত নন। “সূরা ৪০, আয়াত ২; সূরা ৪১, আয়াত ৪৭; সূরা ৫৭, আয়াত ৪”।
মূলত জ্ঞানগত দিক থেকে আল্লাহ্কে সর্বজ্ঞানী বলা হয়। এই জ্ঞানের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ তিনি মানুষকে দিয়েছেন। ফেরেশতারা হয়তো এক এক দিক ও বিভাগ সম্পর্কে মানুষ অপেক্ষা বেশী জ্ঞান রাখে। কিন্তু মানুষ জগতের সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কে কমবেশী জ্ঞানের অধিকারী। “সূরা ২, আয়াত ৩১”।
এই জন্য মানুষ সৃষ্টির ব্যাপারে ফেরেশতাদের আপত্তির মুখে আল্লাহ্ যেমন বলেছেন আমি যা জানি তোমরা তা জাননা। “সূরা ২, আয়াত ৩০”।
অপর দিকে, মানুষ সৃষ্টির পর জ্ঞানের পরীক্ষায়ও ফেরেশতারা মানুষের কাছে পরাজিত হয়। “সূরা ২, আয়াত ৩২”।
সুতরাং বলা যেতে পারে যে, যদিও সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কে এবং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আল্লাহ্ই পরিপূর্ণভাবে জ্ঞান; কিন্তু এটা বলা যেতে পারে যে, সেই জ্ঞানের একটা ক্ষুদ্র অংশের প্রতিনিধিত্ব করলেও মানুষ তা করছে।
বিশ্ব জাহানের বিশাল সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধিকারী মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন। “সূরা ২, আয়াত ২৫৫”।
তিনি মানুষকে তার একচ্ছত্র কর্তৃত্বের কিছু অংশ দিয়ে এই পৃথিবীতে খেলাফতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। “সূরা ২, আয়াত ৩০”।
এবং অন্য কোন সৃষ্টি জীব বা পদার্থ নয় স্বয়ং মানুষই সেই দায়িত্বের বোঝা বহন করতে সম্মত হয়েছেন। “সূরা ৩৩, আয়াত ৭২”।
সুতরাং বলা যেতে পারে যে, বিশাল সাম্রাজ্যের মধ্যে মানুষ আল্লাহর ইচ্ছা বাস্তবায়নের ব্যাপারে সে তাঁরই সাহায্যকারী। “মুহাম্মদ ইকবাল : ইসলামে ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন অনুবাদ সম্পাদকÑ অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা ঃ ১৯৫৭), অধ্যায়-৪; সূরা ৬১, আয়াত ১৪”।
নৈতিক দিক থেকেও মানুষের সাথে আল্লাহ্র সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে হয়। ইচ্ছার স্বাধীনতা থেকেই নৈতিকতার উৎপত্তি। এদিক থেকে বলা যায় যে, মহান আল্লাহ্ সকল প্রকার ইচ্ছার একচ্ছত্র অধিপতি। তিনি ইচ্ছার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করেন। তিনি যখন যা খুশী তখনই তা বাস্তবায়ন করেন। যখন কোন কিছু করা ইচ্ছা হয় তখনই তিনি শুধু বলেন, “হও”, আর অমনি তা হয়ে
যায়।” “সূরা ৩, আয়াত-৪৭”।  এদিক থেকে বলা যায় যে, মানুষ সীমিতভাবে হলেও নিজ ইচ্ছা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। আর এই স্বাধীনতা ভোগ করে বলেই কুফর বা ঈমান গ্রহণ করার পূর্ণ ইখতিয়ার তার রয়েছে। “সূরা ১৮, আয়াত ২৯”। সুতরাং এ কথা বলা যেতে পারে যে, নৈতিকতার সর্বোচ্চ উৎস হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ্ আর মানুষ তার নিজ পরিসরে নৈতিক বোধসম্পন্ন এক সীমাবদ্ধ জীব।  এ পর্যন্ত আল্লাহ্ সম্পর্কিত বিষয়ে যতটুকু আলোচনা করা হয়েছে সেখানে একটি বিষয়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দার্শনিক, বিজ্ঞানী সব শ্রেণীর মানুষের মনে আল্লাহ্র ধারণার স্বীকারোক্তি প্রচ্ছন্নভাবে হলেও বিদ্যমান। বিভিন্ন ধর্মে, দর্শনে এবং বৈজ্ঞানিক আলোচনায় আল্লাহ্র অস্তিত্বের স্বীকৃতি দৃঢ়ভাবে স্বীকৃতÑ এবং বহু বা দুই নয় এক আল্লাহ্র প্রতিই মানুষের যৌক্তিক আকর্ষণ বিদ্যমান। অবশ্য আল্লাহ্ সম্পর্কিত আলোচনা এত ব্যাপক এবং বিশাল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আলোচ্য প্রবন্ধে যেসব শিরোনামে এবং যেসব দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করা হয়েছে তা ছাড়াও মঙ্গল অমঙ্গলের ধারণার সাথে আল্লাহ্র সম্পর্ক, আল্লাহ্র গুণাবলী প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে এবং ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করা যেতে পারে। ‘আল্লাহ্র ধারণা’ বিষয়ে বিস্তারিত পাঠের জন্য প্রবন্ধের শেষে “সহায়ক তথ্য নির্দেশনা” প্রদান করা হলো।
তথ্য নির্দেশনা
* খলিফা আব্দুল হাকীম, ইসলামী ভাবধারা, অনুবাদÑ সাইয়েদ আব্দুল হাই (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৭০) পৃ. ৫৪-৯০।
* ইসলামী বিশ্বকোষ, দ্বিতীয় খ- (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০০), পৃ. ৬৩৪-৬৩৬।
* মুহাম্মদ শাহজাহান, আল-গাযালীর দর্শন, উত্তরণ অফসেট প্রিন্টিং প্রেস, রাজশাহী, ২০০০।
* মুহাম্মদ শাহজাহান, আলÑফারাবীর দার্শনিক চিন্তাধারা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২০০২ পৃ. ১৫-১৯।
* আল্লামা শিবলী নু’মানী, ইসলামী দর্শন, অনুবাদÑ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮১, পৃ. ২০৭-২১৪।
* মুহাম্মদ আল-গাযালী, ইসলামী আকীদা, অনুবাদÑ মুহাম্মদ মুসা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৮৬, পৃ. ১-৫৬।
* আল-গাযালী, কিমিয়ায়ে সা’আদাত, অনুবাদÑনুরুর রহমান (এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ঢাকা : ১৯৯৫।)
লেখক-শিক্ষাবিদ, কলামিষ্ট, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক। (সমাপ্ত)

আল্লাহ্ অস্তিত্বের ধারণা ॥ আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শন সূক্ষ্মতত্ত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

আল্লাহ্র অস্তিত্বের ধারণা ও স্বীকৃতি মানব প্রকৃতির মধ্যেই বিদ্যমান। “সূরা ২৯, আয়াত ৬১, ৬৩”। কিন্তু সর্বকালে ও সর্বদেশে আল্লাহ্র ধারণা, তাঁর প্রকৃতি প্রভৃতির রূপ একই রকম ছিল না; এমনকি বর্তমানেও নেই। তাছাড়া ধর্মে আল্লাহ্র অস্তিত্বের বিষয়টি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলেও দৃশ্যত বিভিন্ন ধর্মে আল্লাহ্র প্রকৃতি, গুণাগুণ, সংখ্যা প্রভৃতির মধ্যে বিস্তর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এহেন পরিস্থিতিতে ধর্মীয় ইতিহাস পর্যালোচনা করে আদিতে প্রত্যেক ধর্মই যে এক আল্লাহ্র দিকে মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে সেটি নিরূপণ করা প্রয়োজন। তাছাড়া বর্তমান যুগ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কারের যুগ। এমতাবস্থায় বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকদের মন থেকে আল্লাহ্র অস্তিত্বের ধারণা কি মুছে গেছে, না প্রখ্যাত সব বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল্লাহ্র অস্তিত্বে বিশ্বাস রাখেন- এ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া সময়ের দাবী। কিন্তু আমার জানা মতে, বাংলা ভাষায় ঠিক এই আংগিকে উল্লেখযোগ্য গবেষণামূলক প্রবন্ধ বা গ্রন্থ খুব কমই লক্ষ্য করা যায় বিধায় বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে “আল্লাহ্ সম্পর্কে দর্শন, পরিবেশ, বিজ্ঞান ও ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি” নিরূপণ করা।  উপরোক্ত উদ্দেশ্য অনুসারে সাধারণভাবে মানুষের মনে আল্লাহ্র ধারণা, বিজ্ঞানে আল্লাহ্র ধারণা, দর্শনে আল্লাহ্র ধারণা, বিভিন্ন ধর্মে আল্লাহ্র ধারণা, একত্মবাদের ধারণা, আল্লাহ্র সঙ্গে জীব জগতের সম্পর্ক, আল্লাহ্র প্রকৃতি, আল্লাহ্র অস্তিত্ব এবং সবশেষে আল্লাহ্র সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বিষয়ে বিভক্ত করে প্রবন্ধের আলোচনাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। নিম্নে এতদ্সম্পর্কিত বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল :
মানুষের মনে আল্লাহ্র ধারণা বিষয়ে বলতে গেলে প্রথমেই যেটা বলা প্রয়োজন মনে হয় সেটি হলো, মানুষ কমবেশী ধর্মভাবাপন্ন। আদিম যুগ থেকে বর্তমানকাল অবধি প্রত্যেক সমাজই জগতের একজন স্রষ্টা আছে বলে বিশ্বাস করে। “আমিনুল ইসলাম, জগৎ জীবন দর্শন (বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম পুন:মুদ্রণ, ১৯৯৫), পৃ. ১৭৭”। কেননা মানুষের প্রকৃতিতে ও অনুভূতিতে একজন সৃষ্টিকর্তা ও অধিকর্তার ধারণা জন্মগতভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে। এটা হচ্ছে তার অবচেতন মনের একটি অনিবার্য অংশ। আর এই কারণেই যারা আল্লাহ কে পেতে আগ্রহী হয় না, তাদের আগ্রহ উদ্দীপনা অন্য কোন কৃত্রিম জিনিসের দিকেই ধাবিত হয়। মানুষ মাত্রই নিজের অন্তরে এই বাসনা পোষণ করতে বাধ্য যে, এমন কোন বস্তুু ব্যক্তি বা সত্তা তার নাগালের মধ্যে আসুক যার সামনে সে তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম উপলব্ধিকে উৎসর্গ করতে পারে। তবে এটা ঠিক যে, এ অনুভূতি যেহেতু  প্রকৃত গত তাই তা প্রথমে স্বাভাবিক আকারেই প্রকাশিত হয়। এর প্রথামিক ঝোঁক থাকে নিজের প্রকৃত ইলাহ্ (মাবুদ)- এর দিকে, পরে অবস্থা ও পরিবেশের প্রভাবে তা ভ্রান্তির দিকে মোড় নেয়। আর তাই মানুষ যখন কিছুদিন একটি বিশেষ জীবন ধারায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে তখন সেটার মধ্যেও সে এক ধরনের স্বাদ পেতে থাকে। এই করণে যে সমস্ত মহাপন্ডিতকে আল্লাহ্ নেই বলতে শোনা যায় তারাও আল্লাহ্কে আপন উপাস্য হিসেবে মেনে না নিলেও অপর একজন উপাস্যের প্রয়োজন থেকে নিজেকে নির্লিপ্ত রাখতে পারেন না। এ প্রসঙ্গে বিবিসিতে ১৯৫৯ সনে ফ্রিম্যানকে দেয়া বাট্রান্ড রাসেলের একটি কথোপকথনকে এখানে উল্লেখ করা মনে হয় মোটেও  অপ্রাসংগিত হবে না। ফ্রিম্যান রাসেলকে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনি কি সার্বিকভাবে অংক ও দর্শন চর্চাকে ধর্মীয় চর্চার শ্রেষ্ঠ বিকল্প হিসেবে পেয়েছেন?” রাসেল উত্তর দেন, “জী, হ্যা, নিশ্চিতভাবে আমি চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত এই প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত ছিলাম যার সম্পর্কে প্লেটো বলেছেন, ‘আপনি অংক শাস্ত্র দ্বারা তা লাভ করতে পারেন, সত্যি এটা একটা চিরন্তন বিশ্ব, কালোত্তীর্ণ জগৎ। যেখানে আমি সেই প্রশান্তি লাভ করেছি, যা ধর্মের মধ্যে পাওয়া যায়।” “ড. ওয়াহীদুদ্দীন খান, আধুনিক চিন্তাধারা বনাম ধর্ম, অনুবাদক, আব্দুল মতীন জালালাবাদী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৮৮) পৃ. ২০২”। মানব প্রকৃতির এইস্বরূপটিই পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে, “যদি অবিশ্বাসীদের তুমি জিজ্ঞেস কর, কে তাদের সৃষ্টি করেছে? তারা নিশ্চয় বলবে- আল্লাহ্ তবু তারা সত্য পথ থেকে কী করে বিপথগামী হয়?” সূরা ৪৩, আয়াত ৮৭”
শুধু তাই নয়, প্রকৃত আল্লাহকে ভুলে নিজের ইচ্ছামত মানুষ যে অন্য কাউকে আল্লাহ্ হিসেবে বেছে না নিয়ে থাকতে পারে না সেটাও কুরআনে বিবৃত হয়েছে। বলা হয়েছে, “হে নবী! যে ব্যক্তি নিজের নফসের খাহেশাতকে নিজের খোদা বানিয়ে নিয়েছে তুমি কি তার সম্পর্কে ভেবে দেখেছ?” “সূরা ২৫, আয়াত ৪৩”।
উপরের আলোচনা হতে একথা বলা যেতে পারে যে, আবহমান কাল থেকে মানুষের আল্লাহ্ সম্পর্কিত ধারণা বদ্ধমূল। যদিও পরিবেশগত বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধরনের মানুষের কাছে এ ধারণার রূপ বিভিন্ন। এবার দর্শনে এ বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে মানব প্রকৃতির মধ্যে আল্লাহ্ র ধারণা কোন না কোনভাবেই বিরাজমান থাকে। এখন এই মানুষই বুদ্ধি-বিবেচনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশ্লেষণকল্পে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। দার্শনিক ও বিজ্ঞানী শ্রেণী তাদের মধ্যে অন্যমত। দর্শনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, নিসর্গবাদ (চধমধহরংস) দিয়েই দর্শনের সূচনা হয়েছে। “ড. আব্দুল হাই তালুকদার, গ্রীক দর্শনের ইতিহাস (থেলিস থেকে প্লাটিনাস), কাজলা, রাজশাহী, ১৯৯১”। যেটাকে পাশ্চত্য দর্শনের ইতিহাসে প্রাচীন যুগ নামে আখ্যায়িত করা হয় । কিন্তু এই ধারা সমসাময়িক কয়েকজনের মধ্যে থাকলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যে দেখা যায় দাশনিকরা প্রত্যয়বাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। তাইতো দর্শনের ইতিহাসে জগতের মূল সত্তা হিসেবে থেলিসকে পানি (ডধঃবৎ), এ্যনাক্সিমেন্ডারকে সীমাহীন (ইড়ঁহফষবংং), এ্যানাক্সিমিনিসকে বায়ু (অরৎ), হেরাক্লিটাসকে হেরাক্লিটাসকে অগ্নি (ঋরৎব) বলতে যেমন শোনা যায় ঠিক তেমনি সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিষ্টটলের মত মহান চিন্তানায়কদের প্রত্যয়বাদের পক্ষে জোর সমর্থন দিতে দেখা যায়। “প্রাগুক্ত, পৃ. ৯;  ড.ঞ. ঝঃধপব, অ ঈৎরঃরপধষ ঐরংঃড়ৎু ড়ভ এৎববশ চযরষড়ংড়ঢ়যু (খড়হফড়হ: গধপসরষষধহ ধহফ ঈড়. খঃফ. ১৯৬০).” এরপর  খৃষ্ট ধর্মের সংস্পর্শে এসে এই প্রত্যয়বাদ আরো গুরুত্ব লাভ করে। ফলে মধ্যযুগীয় পাশ্চত্য দর্শনে আল্লাহ্র একত্মকে যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করার এক বিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়- যাঁদের দলে সেন্ট-অগাষ্টিন, প্লাটিনাসসহ আরো অনেক জাত্যাভিমান দার্শনিকের পরিচয় মেলে। “নূরুল ইসলাম মানিক, ইসলামী দর্শনের রূপরেখা (ঢাকা ঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮২), “ভূমিকা”। এরপর পঞ্চদশ শতক-রেনেসাঁর পর হতে যাকে পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে আধুনিক যুগ নামে।
অভিহিত করা হয়, সেখানে বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার সমান প্রভাব দৃষ্ট হয়। ফলে আল্লাহ্র ধারণাও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। বুদ্ধিবাদীদের মধ্যে ডেকার্ট (যিনি আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের জনক নামে খ্যাত), লাইবনিজ এবং অভিজ্ঞতাবাদীদের মধ্যে জন লক, জর্জ বাকলী প্রমুখকে যেমন আল্লাহ্-বিশ্বাসের পক্ষে জোর সমর্থন দিতে দেখা যায় ঠিক তারই পাশাপাশি ডেভিড হিউমের মত চরম অভিজ্ঞতাবদী দার্শনিকেরও পরিচয় মেলে যিনি পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বাইরে এক কদমও পা ফেলতে রাজী হননি। যার ফলশ্র“তিতে তিনি শুধু আল্লাহ্র অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন নি সাথে সাথে কার্যকারণ তত্ত্বের চিন্তামূলেও কুঠারাঘাত হানেন। “শ্রী প্রমোদবন্ধু সেনগুপ্ত, পাশ্চাত্য দর্শনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (আধুনিক) (ব্যানার্জী পাবলিশার্স, কলিকাতা, ষষ্ঠ সংস্করণ, ১৯৬৩-৯৪), অধ্যায়-নবমঃ ইবৎঃৎধহফ জঁংংবষষ, ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ডবংঃবৎহ চযরষড়ংড়ঢ়যু (খড়হফড়হ : এবড়ৎমব অষষবহ ধহফ টহরিহ খঃফ. ১৯৭১), ইড়ড়শ ঞযৎবব, চধৎঃ-১, ঈযধঢ়ঃবৎ-ঢঠওও”  অবশ্য আধুনিক দর্শনের সূচনায় ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান ও বুদ্ধিজাত জ্ঞানকে বেশী প্রাধান্য দেওয়ায় স্বজ্ঞালব্ধ (ওহঃঁরঃরড়হ) জ্ঞান প্রায় লুপ্ত হওয়ার পথে ছিল। যার নিবু নিবু প্রকাশ স্পিনোজা ও শেলিং এর মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। শ্রী প্রমোদবন্ধু সেনগুপ্ত, পাশ্চাত্য দর্শন (ব্যানার্জী পাবলিশার্স, কলিকাতা চতুদর্শ সংস্করণ, ১৯৮৫) পৃ. ১০৩; ইবৎঃৎধহফ জঁংংবষষ, ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ডবংঃবৎহ চযরষড়ংড়ঢ়যু, ইড়ড়শ ঞযৎবব, চধৎঃ-২, ঈযধঢ়ঃবৎঢঢঠওওও. যার কারণে উপরোক্ত স্বজ্ঞাবাদী দার্শনিকরা এক অতিজাগতিক সত্তায় বিশ্বাস করতেন। কিন্তুু ইংল্যান্ড তথা ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রথমে ‘বাস্তবাদ’ (জবধষরংস) এবং তারপর বিশ্লেষণী (অহধষুঃরপ) দর্শন প্রধান্য বিস্তার করার পর থেকে স্বজ্ঞা আবার তার অজ্ঞাতবাসে চলে যেতে বাধ্য হয়। এ বিশ্লেষণী ধারা কেবলমাত্র বস্তুুজগতকে অস্তিত্ব স্বনির্ভর বলে প্রমাণ করেই থামেনি। ম্যূর, রাসেলের পরে ক্রমেই তা ভাষার বিশ্লেষণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে এ মতবাদ সংবেদন (ঝবহংধঃরড়হ) ব্যতীত জ্ঞানের অপর কোন মাধ্যমই স্বীকার করতে প্রস্তুুত নয়। “নূরুল ইসলাম মানিক, ইসলামী দর্শনের রূপরেখা, পৃ. ৫”। সমকালীন পাশ্চত্য দর্শন যৌক্তিক দৃষ্টবাদ (খড়মরপধষ ঢ়ড়ংরঃরারংস), প্রয়োগবাদ (চৎধমসধঃরংস), অস্তিত্ববাদ (ঊীরংঃবহঃরধষরংস) সহ আরো দার্শনিকধারা উদ্ভব হয়েছে। এই মতবাদগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, রমাপ্রসাদ দাস ও শিবপদ চক্রবর্তী, পাশ্চাত্য দর্শনের রূপরেখা (পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্যৎ কলিকাতা, ৩য় সংস্করণ,  ১৯৯২), অধ্যায়-ষষ্ঠ ও একাদশ; ঋৎবফবৎরপশ ঈড়ঢ়ষবংঃরড়হ, ঝ.ঔ. ঈড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু চযরষড়ংড়ঢ়যু (ঝঃঁফরবফ ড়ভ খড়মরপধষ চড়ংরঃরারংস ধহফ ঊীরংঃবহঃরধষরংস), (ঞযব ঈযধঢ়বষ জরাবৎ চৎবংং/ খড়হফড়হ ঞযরৎফ ওসঢ়ৎবংংরড়হ, ১৯৬০); অনিল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বিংশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য দর্শন (পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ; কলিকাতা ১৯৪৮), অধ্যায়-ষষ্ঠ, অস্টম ও একাদশ; আমিনুল ইসলাম, সমকালীন পাশ্চাত্য দর্শন (নিউ এজ পাবলিকেশন্স; ঢাকা, তৃতীয় সংস্করণ-১৯৯৯), অধ্যায়-প্রথম, ষোড়শ। ইসলাম, সমকালীন পাশ্চাত্য দর্শন (নিউ এজ পাবলিকেশন্স; ঢাকা, তৃতীয় সংস্করণ-১৯৯৯), অধ্যায়-প্রথম, ষোড়শ। এদের মধ্যে যৌক্তিক দৃষ্টবাদের প্রধান প্রধান প্রবক্তরা দর্শন থেকে আল্লাহ্র ধারণা বলে প্রত্যাখ্যান করার প্রয়াস পান যে, অধিবিদ্যক বাক্যসমূহ (গবঃধঢ়যুংরপধষ চৎড়ঢ়ড়ংরঃরড়হং) যেহেতু বাস্তবে যাচাইযোগ্য নয় তাই দর্শনে এগুলো স্বীকার করার প্রয়োজন নেই। “অধিবিদ্যক বাক্য যেমন, আল্লাহ্র অস্তিত্ব আছে, এই জীবন (দুনিয়ার জীবন) অস্থায়ী পরকালীন জীবন স্থায়ী ইত্যাদি। ‘টেবিলের উপর একটি নীল রঙের বই আছে’- বাক্যটিকে যেভাবে বাস্তবে যাচাই করে এর সত্যাসত্য নির্ণয় করা যায় ঠিক সেভাবে আলালাহ্র অস্তিত্ব আছে’- ধরণের অধিবিদ্যক বাক্যসমূহ বাস্তবে বা চাক্ষুষভাবে যাচাই করে এর সত্যাসত্য নির্ণয় করা যায় ঠিক সেভাবে ‘আল্লাহ্র অস্তিত্ব আছে’ ধরনের অধিবিদ্যক বাক্যসমূহ বাস্তবে বা চাক্ষুষভাবে যাচাই করে এর সত্যাসত্য নির্ণয় করা যায়না বিধায় যৌক্তিক দৃষ্টবাদীরা এধরনের বাক্য এবং বাক্যে বর্ণিত বিষয় (ঋধপঃ) গুলোর অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয়। এ বিষয়ে আরো জানার জন্য দেখুন, রমাপ্রসাদ দাস ও শিবপদ চক্রবর্তী, পাশ্চাত্য দর্শনের রূপরেখা, পৃ.১৭৪”।  প্রয়োগবাদী  চিন্তাধারা অনুযায়ী, “যে সমস্ত বিশ্বাস-ধারনা আমাদের জীবনের সহায়ক হবে তাদেরই আমরা ‘সত্য’ ; বলে স্বীকার করব”। “ডরষষরধস ঔধসবং, চৎধমসধঃরংস (ঘবি ণড়ৎশ, ১৯০৭), ৫৪-৫৫; আমিনুল ইসলাম, সমকালীন পাশ্চাত্য দর্শন, পৃ. ১৭০”। সেই হিসেবে তাদের ভাবটা যেন এমনি যে, ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়েই একজন ব্যক্তিকে আল্লাহ্র ধারণা মনে পোষণ অথবা বর্জন করতে হবে। প্রয়োগবাদী চিন্তাধারার গুরু জেম্স এর বক্তব্য যেন সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে— “আমাদের যথার্থ মনোভাব এই হওয়া উচিৎ যে, ঈশ্বর (এড়ফ) সম্পর্কীয় কোন বিশ্বাস বা সম্ভাবনা ব্যবহারিক জীবনে কার্যকর হবে তাকেই সত্য বলে মেনে নেব।” “অনিল কুমুর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিংশ শতাব্দীর পাশ্চত্য দর্শন (পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, ১৯৮৪) পৃ.৮৯”।
আর আস্তিক অস্তিত্ববাদী দার্শনিক-যিনি অস্তিত্ববাদের গুরু সোরেন কিয়ের্কগার্ডসহ গেব্রিয়েল মার্শেল এবং কার্ল ইয়েসপার্স আল্লাহ্র অস্তিত্বকে স্বীকার করলেও অপর অংশের প্রভাবশালী নাস্তিক অস্তিত্ববাদী দার্শনিক বিশেষ করে অস্তিত্ববাদের প্রচার সচিব বলে খ্যাত, জ্যাঁ-পল-সার্ত্র আল্লাহকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করলে ব্যক্তি তার স্বাধীন চিন্তার আলোকে কিছুই করতে পারবে। “ঋৎবফবৎরপশ ঈড়ঢ়ষবংঃড়হ, ঝ.ঔ. ঈড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু চযরষড়ংড়ঢ়যু, চ. ১৮৯”।
অপরদিকে বুদ্ধিবাদী বলে পরিচিত মুসলিম দার্শনিকবৃন্দ গ্রীক দর্শন কিছুটা প্রভাবান্বিত হলেও নিজেদের স্বকীয়তা এবং কুরআন ও হাদীসের প্রতি নিজেদের প্রত্যয়কে সুদৃঢ় রেখে তাঁরা দর্শনে আল্লাহ্র অস্তিত্বকে সমুন্নত রাখার প্রয়াসে অনেক যুক্রি এবং প্রমাণের আশ্রয় নেন। “নূরুল ইসলাম মানিক, ইসলামী দর্শনের রূপরেখা, “ভূমিকা”। এদের মধ্যে আল-কিন্দী, ইবনে সীনা, আল-ফারাবী, ইবনে রুশদ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তবে মধ্যযুগের প্রখ্যাত মুসলিম দার্শিনিক আল-গাযালী এবং আধুনিক যুগের আল্লামা ইকবার আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বীকার করেছেন সম্পূর্ণ কুরআনের বক্তব্যের আলোকে।
সুতরাং একথা বলা যেতে পারে যে, দর্শনে আস্তিক্যবাদী এবং নাস্তিক্যবাদী দুই ধারার দার্শনিক থাকলেও প্রভাবশালী আস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী দার্শনিকদের সংখ্যা কম নয়। আরো মজার ব্যাপার হলো, দার্শনিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন অনেক দার্শনিকের পরিচয় মেলে যাঁরা জীবনের প্রথম পর্যায়ে নাস্তিক্যবাদী চিন্তাধারার পরিপোষকতা করলেও পরবর্তীকালে তাঁদেরকে আস্তিক্যবাদী চিন্ত-চেতনার সাথে কিছুটা আপোষরফা করে চলতে দেখা যায়। “আমিনুল ইসলাম, জগৎ জীবন দর্শন, পৃ. ২৬৭-২৬৮” এখন এখন বিজ্ঞানীদের মধ্যে আল্লাহ্র অস্তিত্ব বিষয়ে ধারণা কী-এ বিষয়ে আলোকপাত করা হচ্ছে।
দর্শনের ন্যায় বিজ্ঞানেও আল্লাহ্ সম্পর্কিত ধারণার পক্ষ-বিপক্ষ আছে। বিশেষ করে বিজ্ঞানীদের মধ্যে যাঁরা মনে করেন, “প্রকৃত জ্ঞান মাত্রই অভিজ্ঞতার সাথে এমনভাবে সম্পর্কিত থাকে যে, তার সত্যতা যাচাই করা কিংবা প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ প্রমাণ লাভ করা সম্ভব।” এঁরা নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী। এঁরা আরো মনে করেন, “ঘটনারাজি যদি প্রাকৃতিক কারণে ঘটে তাহলে তো তা অতিপ্রাকৃতিক কারণে ঘটে না”। “ড. ওয়াহীদুদ্দীন খান, আধুনিক চিন্তাধারা বনাম ধর্ম, পৃ. ৫”
অন্য আর একদল বিজ্ঞানী মনে করেন, বাহ্যিক ঘটনার কিছু বর্ণনা দিলেই তো একটা ঘটনার মূল কারণ আবিষ্কৃত হয়ে যায় না। উদাহরণ স্বরূপ তাঁরা বলতে চান যে, “খাদ্য হজম হওয়া এবং তা দেহের অংশে রূপান্তরিত হওয়ার বিষ্ময়কর ক্রিয়াকন্ডকে প্রথমে আল্লাহ্র দিকে সম্পর্কিত করা হত। কিন্তুু এখন আধুনিক পর্যবেক্ষণের সাহয্যে ঐ রাসায়নিক ক্রিয়াকর্মের ফলশ্র“তি মানুষেরই দৃষ্টিগোচর হয়, তাই বলে কি আল্লাহ্র অস্তিত্বের বিষয়টি নেতিবাচক হয়ে দাঁড়াল? কোন সেই চূড়ান্ত শক্তি, যে রাসায়নিক উপাদনসমূহকে বাধ্য করল অনুরূপ উপকারী ক্রিয়াকান্ড ঘটাতে? খাদ্য মানুষের দেহে প্রবেশ করার পর একটি বিস্তয়কর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার অধীন যেভাবে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে তা নিরীক্ষণ করার পর এ কথাটি একেবারে আলোচনা বহির্ভূত হয়ে দাঁড়ায় যে, এ বিস্ময়কর ব্যবস্থা শুধুমাত্র ঘটনা পরস্পরায় অস্তিত্ব লাভ করেছে। প্রকৃত অবস্থা এই যে, এই নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের পর এটাঁ আরো জরুরী হয়ে দাঁড়ায় যে, আমরা স্বীকার করবো, আল্লাহ্ তাঁর মহান নীতি অনুসারে এই কর্মকান্ড ঘটিয়ে থাকেন এবং এর অধীনেই তিনি জীবনকে বিকশিত করেন। প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩”
এখানে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, বিজ্ঞানীদের প্রথম দলটি নাস্তিক্যবাদে বিশ্ববাসী হলেও দ্বিতীয় দলটি আস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী। আস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী এই বিজ্ঞানীরা আল্লাহকে নিছক একটি শক্তি অথবা প্রথম বা আদি নিমিত্ত (ঋরৎংঃ ঈধঁংব) অথবা বিশ্বজাহানের আত্মা মনে করে না। বরং এঁরা আল্লাহকে সর্বজ্ঞ, শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী এবং ইচ্ছাশক্তির অধিকারী বলেই মনে করেন। এঁরা এও মনে করেন যে,আল্লাহ একবার সৃষ্টি করেই বসে নেই, বরং প্রতি মুহূর্তে সৃষ্টি করে চলেছেন। “জন ক্লোভার মোনজমা ঃ সম্পাদনা, অনুবাদক-সৈয়দ রেদওয়ানুর রহমান, চল্লিশ জন সেরা বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে আল্লাহ্র অস্তিত্ব (মদীনা পাবলিকেশন্স, ঢাকা : ত্রয়োদশ সংস্করণ-২০০০) পৃ. ৫”
এ প্রসঙ্গে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে হয়, আর তা হলো, নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসীদের মধ্যে অনেক বিজ্ঞানী প্রথম দিকে প্রকৃতির বাহ্যদিকের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপ করে এক আল্লাহকে অস্বীকার করলেও পরে তাঁরা এক আল্লাহতে বিশ্বাস করেন। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮”
এ কথা  বললে অত্যুক্তি হবে না যে, মধ্যযুগে সমগ্র খ্রীষ্টান জগতে বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিদের উপর পুরোহিততন্ত্র এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল যার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ একদল বিজ্ঞানী নাস্তিক্যবাদ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ কথার সমর্থনে ড. মরিস বুকাইলির মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তাঁর মতে, “মধ্যযুগটা ছিল খ্রীষ্টান জগতের জন্য অচলায়তনের কাল; আর একই আবর্তে ঘুরপাক খাওয়ার যুগ। বলে রাখা ভাল যে, ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টানদের ধর্মীয় কিতাবেও বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি কোন অনীহা ছিল না’ কিন্তুুু সেকালে ঐ দুই ধর্মের সেবক হিসেবে যাঁরা নিজেদের পরিচয় দিতেন, তাঁরা বৈজ্ঞানিক গবেষণার পথে সৃষ্টি করে রেখেছিলেন নানা প্রতিবন্ধকতার। এরপর এল রেনেসাঁর যুগ। সেই রেনেসাঁর যুগে বিজ্ঞানীরা স্বভাবতই ধর্মীয় কর্মকর্তাদের উপরে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলেন”। “ড. মরিস বুকাইলি, বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান, রূপান্তর ঃ আখতার-উল-আলম (রংপুর পাবলিকেশন্স লিমিটেড, ঢাকা : তৃতীয় সংস্করণ-১৯৮৯), পৃ. ১৮২”।
সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, প্রখ্যাত সব বিজ্ঞানীদের মধ্যে অধিকাংশই আল্লাহ্র অস্তিত্বে বিশ্বাসী। দর্শন ও বিজ্ঞানে আল্লাহ্র ধারণা আলোচনার পর এখন বিভিন্ন ধর্মে আল্লাহ্র ধারণা বিষয়ে কি বক্তব্য রয়েছে তা দেখা প্রয়োজন।
প্রথমেই উল্লেখ করা হয়ে যে, মানুষ মাত্রই কমবেশী ধর্ম ভাবাপন্ন। এ দৃশ্যমান জগতের অন্তরালে যে এক পরম সত্তা আল্লাহ্র অস্তিত্ব রয়েছে, সেই আদিম যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সব মানব সমাজে তা কমবেশী জাগ্রত। যদিও বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ধর্মে, আল্লাহ্কে এক এক নামে ডাকা হয়েছে। তবে বক্ষ্যমান প্রবন্ধটিতে আল্লাহ্ বলতে লা-শরীক বা অংশীদার বিহীন এক, অদ্বিতীয়, শাশ্বত আল্লাহকে বোঝানো হবে। এবং এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন ধর্মে আল্লাহ্র যে ধারণা পেশ করা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হবে যে, আদিতে সব ধর্মই ছিল মূলত তৌহিদবাদী।
ইসলাম ধর্মে আল্লাহ্র ধারণা : ইসলাম ধর্মকে জগতের শ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধর্মের প্রবর্তক স্বয়ং আল্লাহ্। আল্লাহ্ পাক যুগে যুগে নবী-রাসূলদের মাধ্যমে সেই সময়ের এবং স্থানের প্রেক্ষিতে ইসলামের বিধান রূপ হিদায়াতকে ক্রমান্বয়ে নাযিল করে তা সম্পূর্ণ করেছেন সর্বশেষ গ্রন্থ আল-কুরআন অবতীর্ণের মাধ্যমে। “সূরা- আয়াত ৩৮; সূরা-৫, আয়াত ৩”।
সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে যে, কুরআনে আল্লাহ্র একত্বের যে বর্ণনা দেওয়া পেশ করা হয়েছে সেটাই ইসলামী ধারণা। তবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্র একত্বের যে বর্ণনা দেওয়া     হয়েছে তা নির্দিষ্ট এক জায়গায় নয়। এই বর্ণনা এসেছে বিভিন্ন সূরার বিভিন্ন আয়াতে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে। এর মধ্যে সূরা ইখলাসে বর্ণিত আল্লাহ্ সম্পর্কিত যে ধারণা তথা পরিচয় পেশ করা হয়েছে তা সংক্ষিপ্ত হলেও পূর্ণাঙ্গ বলো যেতে পারে। উক্ত সূরায় আল্লাহ্র ধারণা তথা পরিচয় দিতে যেয়ে বলা হচ্ছে যে, “বল, আল্লাহ্ এক, অদ্বিতীয়। আল্লাহ্ অন্য নিরপেক্ষ। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তিনি নিজেও জাত নন। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই, তিনি তুলনাহীন”। “সূরা-১১২”
উক্ত আয়াতে আল্লাহ্র একত্ববাদের ধারণাই পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। তাছাড়া আল্লাহ্ সম্পর্কিত ধারণার সংক্ষিপ্ত হলেও একটি পরিষ্কার পরিচয় পাওয়া যায় ‘কালেমা তাওহীদ’ বা ইসলামের সাক্ষ্য ঘোষণায় (ষ্টেটমেন্ট অব টেষ্টিমনি) ‘আল্লাহ্ ব্যতীত কোন প্রভু নেই, মুহাম্মদ (সা:) আল্লাহ্র রাসূল’ এই উক্তি বা কালেমার মধ্যে সুষ্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ ছাড়া সমগ্র বিশ্বে আর কোন মাবুদ বা প্রভু নেই; তিনি ব্যতীত এমন কোন সত্তা নেই যাকে প্রভুর সমকক্ষ বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। আবদুল জলিল মিয়া “তাওহীদের তাৎপর্য” দর্শন ও প্রগতি, প্রথম সংখ্যা, ডিসেম্বর-১৯৮৪, ঢাকা: পৃ. ১২৯”। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ্র একত্বের ধারণা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে এসেছে। এদের মধ্যে সবগুলো উল্লেখ করা সম্ভব নয় বিধায় এ সম্পর্কে আর একটি মাত্র তাৎপর্যপূর্ণ উদ্ধৃতির উল্লেখ করা হলো ঃ “আল্লাহ্, তিনি ছাড়া আর কোন প্রভু নেই। তিনি চিরজীবন্ত, স্বলালিত ও পরিচালিত এবং চিরন্তন। আকাশ ও জমিনের সমস্ত জিনিসি কেবল তাঁরই। সমগ্র আকাশ-পৃথিবীব্যাপী তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব এবং এসব তত্ত্বাবধান ও সংরক্ষণ করতে তিনি ক্লান্তিবোধ করেন না। কেননা তিনি হচ্ছেন সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ।” সূরা ২, আয়াত-২২৫”।
উপরের আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে যে, ইসলামে আল্লাহ্র যে ধারণা পেশ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ একত্ববাদের (গড়হড়ঃযবরংস) ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। ধর্মে আল্লাহ্র ধারণা বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এখন খ্রীষ্টান ধর্মে আল্লাহ্ সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় তা আলোচনা করা হচ্ছে। বলা বাহুল্য, বিশ্বের গোটা মানব সমাজের মধ্যে খ্রীষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা কম নয়। হযরত ঈসা (আ) কর্তৃক প্রচারিত আল্লহ্র একত্ববাদের ধর্ম “সূরা-৩ আয়াত-৫০-৫২”।
পরবর্তীকালে খ্রীষ্ট ধর্ম নামে পরিচতি লাভ করে। “নূর নবী, আল্লাহ্তত্ত্ব (গ্রীন বুক হাউস লিমিটেড, ঢাকা : ১৯৮১). পৃ. ৭”।
পবিত্র কুরআন থেকে জানা যায় যে, হযরত ঈসা (আ:) ছিরেন আল্লাহ্র একজন সম্মানিত রাসূল এবং তাঁকে পাঠানো হয়েছিল পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীদের কিতাবের সত্যতার নিদর্শন রূপে। “সূরা-৩, আয়াত ৫০”।
“এবং আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন পয়গাম্বর পাঠিয়েছি, যিনি এই বলে আহ্বান জানিয়েছেন, এক আল্লাহ্র বন্দেগী কর এবং খোদাদ্রোহীদের আনুগত্য থেকে দূর থাক। ” সূরা-১৬, আয়াত ৩৬”।
ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ঈসা (আ:)- এর প্রথামিক যুগের অনুসারীরা ঈসা (আ:)-এর শিক্ষার পুরোটাই অনুসরণ করে চলতো। তাঁরা ঈসা (আ:)-কে শুধু একজন নবী বলেই মানতো; তাঁরা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল এবং মুসা (আ:)-এর শরীয়তের অনুসারী ছিল। আকীদাহ-বিশ্বাস, হুকুম-আহকাম ও ইবাদত বন্দেগীর ব্যাপারে তারা অন্যান্য (ইসরাইলী) ইয়াহুদীদের থেকে কিছুতেই পৃথক মনে করতো না। প্রসঙ্গে ড. মরিস বুকাইলী তাঁর ‘বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান’ নামক গ্রন্থে কার্ডিনাল ডানিয়েলুর গবেষণার যে একটি উদ্ধৃতি দিয়েছেন সেটি হলো ঃ যীশুখীষ্টের অন্তর্ধানের পর তাঁর—
‘প্রেরিতদের একটি ক্ষুদ্র দল’ এমন একটি সম্প্রদায় গঠন করলেন-যারা ইয়াহুদী মন্দিরের উপাসনার পদ্ধতির প্রতি ছিলেন একান্ত অনুগত ও বিশ্বস্ত।” কিন্তুু পরবর্তীকালে তারা হযরত ঈসা (আ:) কর্তৃক প্রচারিত তৌহিদের মর্মবাণীকে বিকৃত করে এক আল্লাহ্র পরিবর্তে আল্লাহকে ত্রি-ধা বিভক্ত করে। “সূরা-৪, আয়াত ১৭১”।
বর্তমান খ্রীষ্ট সমাজ যে তাদের মূলধর্মকে বিকৃত করে তৌহিদের মর্মবাণী থেকে নিজেদেরকে শিরকবাদে পর্যবাষিত করেছে তা আধুনিক নান গবেষক প্রমাণ কতে সমর্থ হয়েছেন। বিশেষ করে ড. মরিস বুকাইলী খৃষ্ট ধর্মের উপর যে ব্যাপক অনুসন্ধান কাজ চালিয়েছেন তাতে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, বর্তমান খ্রীষ্টানরা যে চারটি সুসমাচারকে যিশুর সময় রচনা করা হয়েছে বলে দাবী করেন তা সত্য নয়। সেগুলোর রচয়িতাগণের মধ্যে একজনও যিশুর সাহাবী ছিলেন না। বরং বর্তমান খ্রীষ্টান সমাজে প্রচলিত যে চারটি সু-সমাচার রয়েছে সেগুলো সম্পূর্ণ মানুষের মনগড়া কথায় তথা শিরকবাদে ভরপুর। উক্ত গ্রন্থসমূহের রচয়িতাগণের যিনি পৃষ্ঠপোষক, তিনি ছিলেন (পৌল বা সেন্টপল) খোদ যিশুখ্রীষ্টের পরিবারের সদস্যদের নিকট বিশ্বাসঘাতক এবং যার সাথে যিশুর কোনদিনই সাক্ষাৎ ঘটেনি। “ড. মরিস বুকাইলি, বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান, পৃ. ৮৮”।
তবে যীশুর (হযরত ঈসা (আ:) প্রাচরিত ধর্ম যে এক তৌহিদবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তা পবিত্র কুরআন অধ্যয়নের মাধ্যমে যেমন জানা যায় তেননি অধুনা ‘বার্ণাবাসে’র “ইঞ্জিল সম্পর্কে জানার জন্য দেখুন, সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী, সীরাতে সরওয়ারে আলম (দ্বিতীয় খন্ড), অনুবাদ-আব্বাস আলী খান (সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী রিসার্চ একাডেমী, ঢাকা-১৯৮৮), পৃ.১৭৯-১৮৫”। ইঞ্জিল আবিষ্কার হওয়ার পর তা আরও সু-প্রতিষ্ঠিত হয়। উক্ত গ্রন্থে হযরত ঈসা (আ:)- এর আসল স্বরূপ, তাঁর প্রকৃত শিক্ষা তথা তাওহীদের শিক্ষা, শিরক খন্ডন ইত্যাদি বিষয়ে আর চার ইঞ্জিল অপেক্ষা অনেক বেশী স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। উক্ত গ্রন্থের  যৎকিঞ্চিত উদ্ধৃতি নিুে তুলে ধরা হলো।
“কিন্তু আল্লাহ্ যখন আমকে দুনিয়া থেকে নিয়ে যাবেন তখন শয়তান আবার এমন বিদ্রোহ করবে যে, দুরাচার লোকেরা আমাকে খোদা ও খোদার ছেলে বলে মানবে। সে কারণে আমার কথা ও শিক্ষাগুলোকে এতদূর বিকৃত করে দেওয়া হবে যে, ত্রিশ জন মুমিন অবশিষ্ট থাকাও কঠিন হয়ে পড়বে… (অধ্যায়-১৬) “ইধৎহধনধং, ঞযব এড়ংঢ়বষ ড়ভ ইধৎহধনধং, অুনবাদক, খড়হংফধষব এবং খধঁৎৎধধম (ক্লারেগুন প্রেস, অক্সফোর্ড, লন্ডন-১৯৭০), অধ্যায়-১৬”।
“[শিষ্যদেরকে হযরত ঈসা (আ:) বললেন,] আমি নিশ্চিতভাবে তোমাদের বলছি যে, মুসার কিতাব থেকে সত্যকে যদি মুছে ফেলা না হতো তাহলে আল্লাহ্ আমাদের পিতা দাউদকে আর একখানা কিতাব দিতেন না। আর যদি দাউদের কিতাবকে বৃকত করা না হতো তাহলে আল্লাহ্ আমাকে ইঞ্জিল দিতেন না। কেননা আমাদের খোদা পরিবর্তনশীল নন। তাই সবাইকে তিনি একই কথা বলেছেন। সুতরাং যখন আল্লাহ্র রাসূল আসবেন তখন খোদা বিমুখ লোকের দ্বারা কলুষিত আমার কিতাবকে তিনি কলুষমুক্ত করবেন।” (অধ্যায়-১২৪১) “প্রাগুক্ত, অধ্যায় ১২৪”।
উপরের আলোচনা হতে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, খ্রীষ্টান ধর্ম ছিল মূলত একত্ববাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। যা পরবর্তীকালে অনেকটা শিরকবাদের দিকে ঝুঁড়ে পড়ে। কুরআনের পরই বার্ণাবাসের ইঞ্জিল সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইয়াহুদী ধর্মে আল্লাহ্র ধারণা ঃ বর্তমান বিশ্বে একত্ববাদী বলে পরিচিত আর একটি ধর্ম হলো ইয়াহুদী ধর্ম। যদিও ইয়াহুদী ধর্মের —
প্রবর্তক হিসেবে হযরত মুসা (আ:)-কে গণ্য করা হয়ে থাকে, কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, আল্লাহ্র প্রেরিত নবীদের মধ্যে কেউই ইয়াহুদী ছিলেন না। নামের ভিত্তিতে এ ধর্মের উৎপত্তি বহু পরবর্তী যুগের । মনে করা হয়ে থাকে যে, ইয়াকুক (আ:)-এর চুতুর্থ পুত্র ইয়াহুদার প্রতি এ ধর্ম আরোপ করা হয়। “সাইয়েদ আবুল আ’ল মওদুদী, সীরাতে সরওয়ারে আলম (দ্বিতীয় খন্ড), পৃ. ১২৩”।                                                           (চলবে)

ইসলামের দৃষ্টিতে খেলাধূলা ও বিনোদন

শামসীর হারুনুর রশীদ

খে লাধূলা ও বিনোদনমূলক বিষয়াবলীকে ইসলাম ধর্মে খুব সর্তকতার সাথে মূল্যায়ন করা হয়েছে। খেলা যখন খেলায়, বিনোদন যখন বিনোদনে সীমাবদ্ধ থাকে, তাতে মন্দ কোন বিষয়ের উঁকি-ঝুঁকি না থাকলে ইসলাম এমন খেলা ও বিনোদনে বাধা দেয়নি, দিবেও না। কারণ খেলাধূলা পৃথিবীর আদিকাল থেকে শিশু-কিশোরদের মজ্জাগত স্বভাব ছিল ও আছে। এটা সর্বজন স্বীকৃত একটি বিষয়। কিন্তু যখন এটাকে শিশু-কিশোরদের থেকে কেড়ে নিয়ে কিংবা শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করে ব্যবসায়িক রূপ দেয়া হয়, যুবক-যুবতী, নর-নারীসহ প্রাপ্ত বয়স্করা বিভিন্ন পেশায় বিঘœতা সৃষ্টি করে মূল্যবান সময়ের একাংশ খেলায় এবং অপরাংশ খেলা দেখায় নষ্ট করতে দেখা যায়। অনেকে এটাকে জীবনের নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় বানিয়ে ফেলেছেন। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থা খুব উদ্বেগজনক! তারা ক্লাস শুরুর আগে, দুপুরের বিরতির ফাঁকে, পুরো বিকাল, সকাল ও রাতের কিছু সময় খেলায় এবং অর্ধরাত পর্যন্ত খেলা দেখায় ব্যস্ত থাকে।  ফলে খেলার মাঠের চে’ বিদ্যালয় এখনও তাদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেনি। অনেক শিক্ষার্থী সুযোগ পেলেই মোবাইলসহ নানা প্রযুক্তিতে গেইম খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া শিশুদের এ খেলা ও খেলার মাঠকে যখন ছিনিয়ে নিয়ে আঞ্চলিক করণ, অত:পর জাতীয়করণ, পরবর্তিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন খেলা আর খেলা থাকেনি এটাকে হাজার কোটি মুদ্রা উপার্জনের মাধ্যম বানানো হয়। শুরু হয় রাষ্ট্র কর্তৃক পৃষ্ঠপোষকতা দান। সৃষ্টি করা হয় দেশে দেশে পৃথক ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠা করা হয় সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা সংস্থা, ক্লাব ও সংগঠন। শুরু হয় খেলাধূলা নিয়ে নানা রকমের প্রতিযোগিতা। এসব প্রতিযোগিতায় আয়-উপার্জনের হার দিন দিন বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে বিশ্ব মোড়লদের নজর কাড়ে। তারা শুরু করে নানা পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা ও গবেষণা। এক পর্যায়ে আয়োজন করা হয় বিশ্বকাপ ফুটবল। আবিষ্কার করা হয় বিশ্বকাপ উপলক্ষে ক্রীড়া-কৌতুক ও বিনোদনের নানাজাত পণ্যসামগ্রী। ছড়িয়ে দেয়া হয় মুক্তবাজার-বিশ্ব বাজারে এবং তা থেকে আশাতীত আয়-উপার্জন হয়। তার আগে আয়োজন করা হয়েছিল ক্রিকেট বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ উম্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বায়নের ঘরে ঘরে। বিশ্ব বাজারে ক্রিকেট সমাগ্রীও যথেষ্ট লাভের পথ দেখায়। সম্প্রতি ক’ বছর থেকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আয়োজন করা হচ্ছে অলিম্পিক মহোৎসব। অলিম্পিকেও মাত্রারিক্ত উন্মাদনা চলছে, চলুক তাতে তেমন কোন আপত্তি ছিলনা। কিন্তু যখন দেখা গেল এই খেলাধূলা, বিশ্বকাপ, অলিম্পিক এর সাথে জুয়া, লটারী, অশ্লীলতা, নগ্নতা, মাদকাসক্ততা, খেলাধূলার লাভ-ক্ষতি নিয়ে হানাহানি সহ নানাজাত অপরাধ-অপকর্মগুলো একাকার হয়ে যাচ্ছে। নানা শ্রেণী পেশার মানুষ এর ধারা প্রভাবিত হয়ে প্রকাশ্যে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। পার্থিব পরকালীন ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এমনকি এ খেলাধূলার মাধ্যমে দ্বীন-ধর্ম-কর্ম থেকে মানুষ নিজে পথভ্রষ্ট হচ্ছে বা অপরকে পথভ্রষ্ট করছে। আর আকাশ সংস্কৃতির উপহার নানা প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুরা পর্যন্ত প্রভাবিত হয়ে নানা অপরাধ-অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে যা বিবেকবান চিন্তাশীলদের ভাবিয়ে তুলছে, তখন তো একেবারে চুপ করে বসা যায় না। এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে নতুন করে জানার, বুঝার, ভাবার, বিশ্লেষণ ও লেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। খেলাধূলাকে এসব অপকর্ম থেকে মুক্ত রাখতে দেশের মূল ধারার মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা আরও এক যুগ আগে ভাবার প্রয়োজন ছিল। অনেক দেরী হয়ে গেছে আশা করি ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়া হবে। চলমান নিবন্ধে এ বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হবে।
এক.
আবহমান বিশ্বে, বিশেষ করে আমাদের দেশে খেলাধূলা বলতে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, ভলিবল, হ্যান্ডবল, বাস্কেটবল, জিমন্যাসটিকস, টেবিল টেনিস, স্কোয়াশ, ড্রাইভিং, হাডুডুুডু, ব্যাডমিন্টন, এ্যথলেটিকস, সাঁতার, জুড়ো, ক্যারাটে, কুংফু, বক্সিং, কুস্তি, ভারোত্তোলন, শ্যূটিং, ওয়াটার পোলো, দাবা, ছক্কা-পাঞ্জা, গাফলা, তাস, ক্যারাম, দাড়িয়াবান্ধা, লাঠিখেলা, নৌকা বাইস, গোল্লাছুট, খোÑখো, ষাড়ের লড়াই প্রভৃতি খেলা-ধূলায় ধার্মিক-অধার্মিক, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, অতিশিক্ষিতরা শহর-নগর, পাড়া-মহল্লা, গাঁও-গ্রামে আঞ্চলিক কিংবা জাতীয় স্টেডিয়ামে নানা শ্রেণী পেশার মানুষের স্বত:স্ফূর্ত উপস্থিতি না হলেও বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক-এ খেলতে নয়, খেলা দেখাই যেন চলমান বিশ্বের নজরে সবচে জনপ্রিয় একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ লেখাটি তৈরি করার আগে বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট বিশ্বকাপ এবং ২০১৪ এর অলিম্পিক উৎসবও প্রযুক্তির কল্যাণে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। তাই প্রথমে ক্রিকেট বিশ্বকাপ, বিশ্বকাপ ফুটবল সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা করেই মূল বিষয়ের দিকে চলে যাব।
ক্রিকেট বিশ্বকাপ ইতিকথা : ক্রিকেট খেলাটা আবিষ্কার হয় ১৭২৫ খ্রিস্টাব্দে। বিশ্বকাপ হিসেবে তার যাত্র শুরু ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে। ইংল্যান্ডের লর্ডসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তার  প্রথম আসর। অতি সম্প্রতি আসরটি আইসিসি কর্তক পরিচালিত ক্রিকেট বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার একাদশ আসর, ১৪ ফেব্র“য়ারি থেকে শুরু হয়ে যা চলে ২৯ মার্চ পর্যন্ত। চলমান এই বিশ্বকাপ অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজল্যান্ড যৌথভাবে আয়োজন করছে যাতে সর্বমোট ৪৯টি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। দেশ দুটি ১৯৯২ সালেও ক্রিকেট বিশ্বকাপের আয়োজন করেছিল। ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৫ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ১২ ফেব্র“য়ারী ২০১৫ তারিখে নিউজল্যান্ডের ক্রাইষ্টার্চাচ ও অষ্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ণে পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল প্রতিযোগিতার একাদশ আসরে অর্থ পুরস্কার হিসেবে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘোষণা করা হয়। এ সংখ্যাটি অন্যান্য বিশ্বকাপের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। চলমান বিশ্বকাপ উন্মাদনায় সঙ্গ দিয়েছেন বিশ্বের সেরা গলফার ‘রবি ম্যাকলর্য’। রবি আইসিসির সদর দফতর দুবাইয়ে কিছু সময় তার বলিং একশ্যন দেখাতে ব্যয় করেছেন। বাংলাদেশেও ক্রিকেট বিশ্বকাপের উন্মাদনা ছড়াতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) দেশের ৩টি ভেন্যুতে- খুলনা, চট্টগ্রাম ও ঢাকা মিরপুর স্টেডিয়ামে আয়োজন করা হয় কনসার্ট। এতে গান পরিবেশন করেন বাপ্পা, এ্যান্ড ফেন্ডস, ওয়ারফেজ, মাইলস, এলআরবি ও মমতাজ। এ উপলক্ষে টিকিট বিক্রি হয় ১০০০/৫০০/১০০ টাকার।
বিশ্বকাপ ফুটবলের পূর্ব ইতিহাস : ১৯০৪ সালের ২১শে মে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইউরোপের সাতটি দেশ- ফ্রান্স, স্পেন, ডেনমার্ক, নেদারলেন্ড, সুইজারলেন্ড, সুইডেন ও বেলজিয়াম মিলে এক বৈঠকে মিলিত হয় এবং ফেডারেল ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল এসোসিয়েশন বা ফিফা (ঋওঋঅ) নামে একটি কমিটি গঠন করে। তারা বৈঠকে সিন্ধান্ত গ্রহণ করে যে, সমস্ত বিশ্বকে নিয়ে যদি কোন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় তবে ফিফারই থাকবে সেই অধিকার। ১৯২৮ সালে হল্যান্ডের রাজধানী অর্মস্টাডে অলিম্পিক প্রতিযোগিতা চলার সময় ফিফা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা প্রতি চার বছর পরপর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে। ইউরোপীয় দেশগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও ইউরোপের চারটি দল, আমেরিকার দুটি দল এবং ল্যটিন আমেরিকা থেকে সাতটি দল মিলে মোট ১৩টি দল নিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের যাত্রা শুরু। ১৯৩০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোট ২০বার বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বকাপের খবর প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া কে কার চাইতে সুন্দর উপস্থাপনায় আগ বাড়িয়ে খবর দিতে পারে এ নিয়ে চলছে আরেক প্রতিযোগিতা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিশ্বকাপের সাথে বা অলিম্পিকের সাথে যে উম্মাদনা চলে তা গোটা বিশ্বকে আইয়্যামে জাহিলিয়াত থেকে আরো কয়েক ধাপ নিচুমানের বর্বরতায় নামিয়ে দিচ্ছে। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় মধ্যযুগীয় বর্বরতায়ও এতো ঢাকঢোল পিটিয়ে অশ্লিলতা চলত না। উদাহরণ স্বরূপ গত ৮ জুন ২০১৪ দৈনিক মানব জমিনের এক তথ্যসন্ধানি রিপোর্টের দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আর্কষণ করছি। ঐ পত্রিকার শেষের পৃষ্ঠায় একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল “হোটেলে মোটেলে সয়লাব যৌন কর্মীরা”, সংবাদটি পড়ে জানা যায় ব্রাজিল অভিমুখে ছুটছে দর্শক, পর্যটক, এই দুরন্ত চলায় যেন তারা ক্লান্ত না হয়, মেজাজ বিগড়ে না যায়, সেজন্য ব্রাজিলের হোটেলে মোটলে সর্বত্রই নেয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। এরই মধ্যে দেশের বেশিরভাগ আবাসিক হোটেলে গিজ গিজ করছে ভিড়ে। একদিকে বিশ্বকাপের মাঠে জমবে স্নায়যুদ্ধ, ঠিক তখন পর্দার আড়ালে চলবে আরেক যুদ্ধ। সেটা এখন আর আড়ালে নেই। একেবারে উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে। তা হল বিশ্বকাপের আসর থেকে যৌনকর্মীদের উপার্জন কৌশল, এটা ব্রাজিলের সবখানে বৈধ ও আয়ের অন্যতম কৌশল, এ কারণে পর্যটক আকর্ষণ করতে সমাবেশ ঘটানো হয়েছে সুন্দরী দেহপসারিনীদের, নানা শ্রেণীর যৌনকর্মী মৌজুদ রাখা হয়েছে। যাতে চাওয়া মাত্র পাওয়া যায়। মাদকসহ অন্যান্য ব্যবসা তো আছেই…………।
দুই.
সকাল-বিকাল শিশু কিশোররা যেভাবে খেলাধূলায় ব্যস্ত থাকে, ঠিক তেমনি মধ্য বয়সী থেকে বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ খেলা দেখায় সময় কাটানো যেন জীবনের নিত্য নৈমিত্তিক প্রয়োজনীয় কাজ হয়ে পড়েছে। খেলাধূলার নেশার আমেজ অবিরাম চলে যাচ্ছে, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। তবুও খেলোয়াড়, খেলা অনুরাগী ও খেলা দর্শনার্থীদের মধ্যে অবসাদের একটুও আভাস দেখা যায়না। যেন তাদের কাছে জীবন বা সময়ের কোন মূল্য নেই। এদেশের ছেলেরা বিশ্বয়ানের কাফেলা থেকে পিছিয়ে থাকার এটা একটা উল্লেখযোগ্য কারণ।
বিশ্বে যত ক্রীড়া উৎসব হয় তন্মধ্যে সর্বাধিক শ্রেষ্ঠ ক্রীড়া উৎসব হচ্ছে অলিম্পিক, যেন তার সাথে অন্য কোন ক্রীড়া উৎসবের তুলনা করা চলেনা। কারণ বর্তমান দুনিয়ার সব ধরণের খেলাধূলা বা ক্রীড়া উৎসবের যৌথ বা ক্রীড়া সমন্বয়কারী ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের নাম অলিম্পিক, বিশ্বকাপ, অলিম্পিক, এশিয়ান গেমস, সাফ গেম্স, প্রভৃতি খেলা ও ক্রীড়া উৎসব সমূহের উদ্দেশ্য হিসেবে যা বলা হয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি, সমগ্র বিশ্ববাসী মানুষকে এ উৎসবের সুযোগে কাছাকাছি দাঁড় করানো এবং জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে নারী-পুরুষ দলবদ্ধ হয়ে রঙ্গ তামাশায় ও মিলন মেলায় মত্ত হওয়া ইত্যাদি। আর এসব লক্ষ্য অর্জনে প্রতি চার বছর পর পর বর্ণিল অলিম্পিক, বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট বিশ্বকাপ ও সাফ গেমসের আয়োজন করা হয় প্রত্যেক স্বাগতিক দেশে দেশে। কিন্তু ক বছর থেকে আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করে আসছি যে, বিশ্বকাপ মৌসুমে অশ্লীলতা, নগ্নতা, বেহায়াপনা, নোংরামীসহ সর্বপ্রকার অপসংস্কৃতির অশুভ বার্তা হানাদেয় বিশ্বের ঘরে ঘরে। শুরু হয় বিশ্বব্যাপী খেলা দেখার মেলা। শহর-নগর, পাড়া-মহল্লা, গাঁও-গ্রামেও দলবদ্ধ হয়ে খেলা দেখার উদ্দ্যেশে সারা রাত কাটিয়ে দেয়া হয়। তখন দেখা যায় টি.ভি ক্রয়ের প্রতিযোগিতা মাসখানেক আগ থেকে। সপ্তাদিন আগ থেকে বিশ্বজুড়ে বার্ণাঢ্য কর্মসূচী পালনের পরিকল্পনা করা হয়। ছড়িয়ে পড়ে চৌদিকে-দশদিকে উত্তেজনা-উম্মাদনা। ভিন্ন-ভিন্ন বর্ণের ভিন্ন জাতির পাতাকা উত্তোলন করা হয় মুসলমানদের বাসভবনের ছাদে, রোডের এপাশ ওপাশে, বাড়ির দেয়ালে, চৌমুহনী রাস্তার মোড়ে মোড়ে। মজার ব্যাপার হচ্ছে-নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওরের মাঝে অবস্থিত নিরীহ গাছ-গাছালিগুলোর চূড়ায় বিজাতীয় পতাকা হেলতে দোলতে দেখা যায়। কখনও মসজিদ, ঈদগাহ, কবরস্থান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে বিজাতীয় পতাকা টানা বা ছাটার অজুহাতে দেয়ান-দরবার শুনা যায়। এমনকি নিজস্ব সমর্থিত দল বিজয়ী হলে প্রচন্ড হাবিজাবি, হুড়–স্থুল এবং পরাজিত হলে নানা গালাগাল সহ আত্মহত্যার খবর পর্যন্ত মিডিয়ায় আসে হরহামেশা।
এরই ফাঁকে কালো টাকার মালিকদের দেখা যায়, বিভিন্ন মাঠে-ময়দানে, হাওর-বাওরে, নিজেদের নাম ছড়ানোর লক্ষ্যে আঞ্চলিক কাপ খেলার আয়োজন, অমুক-তমুক টুর্ণামেন্ট ফাইনাল খেলার মাইকিং এর আওয়াজে শব্দদূষণসহ আশপাশের মসজিদে নামাজ পড়া মুশকিল হয়ে যায়। মারামারি, দেন-দরবার সহ শিক্ষার্থীদের লেখা-পড়ায় ব্যাঘাত তো আছেই?
তিন.
শিশুরা স্বভাবগতভাবে কুচিকুচি ও আজে-বাজে খেলাধূলায় শৈশব কাল কাটায়। এটা স্বাভাবিক, তাতে দোষের কিছু নেই। যখন তারা কৈশোরে পর্দাপণ করে তখন গ্রাম্য, আঞ্চলিক, দেশীয় খেলাধূলায় উদ্যমী হয়। আগেকার যুগে কচি ছেলে-মেয়েরা বিকাল বেলায় দেশীয় খেলাধূলা করে থাকতো আজো আছে, থাকা উচিত, কিন্তু বর্তমান দুনিয়ায় নানা জাতের খেলা, মেলা, জুয়া, লটারি আবিষ্কার হয়েছে, যেগুলো মুসলিম বিশ্বে তর্ক-বিতর্ক বেড়েই চলছে। কেননা খেলাধূলা বা খেলা দেখার নামে চলছে নারী-পুরুষ একত্রে উপবেশণ থেকে নিয়ে কনসার্ট, গীতিনাট্য, নৃত্যানুষ্ঠান, গান-মিউজিক, নারী কর্তৃক পুরুষের শরীর মেসেজ, ক্লোজ আপ, খেলোয়াড়দের অর্ধনগ্ন উরু প্রদর্শনী, অশ্লিল ছবির গান, বেহালার মূর্ছনা, একতারা টুংটাং দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করা, খেলার টিমের অধিনায়ক বা বিজয়ী হওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করা, বড় অংকের টাকায় খেলোয়াড় ক্রয় করা হয়। বিশেষ করে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক, এশিয়ান গেম্স ও বিভিন্ন লীগে অশ্লিলতা, নগ্নতা, জুয়া, মাদকাসক্ততা, দেহব্যবসা থেকে নিয়ে যে অপরাধগুলোর জন্ম দিয়ে যাচ্ছে, এতে সভ্য নাগরিক ও চিন্তাশালীরা এগুলোকে খেলাধূলা না বলে অপকর্ম বলাই ভালো বলে মনে করছেন। জাতির অভিভাবকের দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তিদের ঘুম ভাঙ্গার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আগামী প্রজন্মরা বিজাতীয় সংস্কৃতি-সভ্যতার বন্যায় কি শুধূ সাঁতারই কাটবে? এভাবে চোখের সামনে ইসলামী চেতনা, বিবেক অনুভূতিগুলো কি লাওয়ারিশ ও ইয়াতিম হয়ে যাবে? খেলাধূলার আনন্দ ও রঙ্গ তামাশার সাথে এ সব অপকর্মের কি বৈধতা দেয়া যায়? ফুটবল ও ক্রিকেট বলতে খেলোয়াড় ও ক্রীড়ামোদীরা ভাগ্যদেবতা বা ঈশ্বরের মত পূজ্য মনে করে তা কি ঠিক? ফাইনাল খেলা শেষে চ্যাম্পিয়ন দলপতি ও খেলোয়াড়রা বলকে বুকে চেপে ধরে নাকে-মুখে চুমু খেতে দেখা যায় তা কতটুকু যুক্তিসংগত?
চার.
ইসলাম নির্দিষ্ট কোন খেলাধূলাকে জায়েজ নাজায়েজ বলে নাই, বরং তিনটি শর্তের সাথে জায়েজ-নাজায়েজের সম্পর্ক, তা হলো ১. শারীরিক উপকার সাধন। ২. ইসলামি শরিয়াতের কোন বিধান লঙ্গন না হওয়া। ৩. আর্থিক ক্ষতিসাধন না হওয়া। এ তিনটি শর্ত যে খেলার মাঝে পাওয়া যাবে তা জায়েজ, আর পাওয়া না গেলে জায়েজ নয়। যার বিস্তারিত আলোচনা নিম্নরূপ-
ইসলামপূর্ব যুগে খেলাধূলা, মেলা ও জুয়া ভিত্তিক অনেক প্রকারের খেলাধূলার প্রচলন ছিল, শরিয়াতের বিধান লঙ্ঘিত হওয়ায় অনেকগুলোকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। যার বর্ণনা কোরআন-সুন্নাহ ও ফেক্বাহ শাস্ত্রে বিদ্যমান আছে। তবে হ্যাঁ! শরীয়তের সীমারেখার ভেতরে উল্লিখিত শর্তের সাথে শরীর চর্চা, সাময়িক সময়ে খুশিবাসি, তীরন্দাজ, যুদ্ধকৌশল ও রণক্ষেত্রে জয়লাভের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক দৌড়া-দৌড়ির বৈধতা বিভিন্ন হাদীসে ও ফেকাহগ্রন্থে পাওয়া যায়। তবে এগুলো খেলাধূলার অন্তর্ভূক্ত কি না এ নিয়েও পক্ষে বিপক্ষে বিতর্ক আছে।
খেলাধূলার সংজ্ঞা : মিসবাহুল মুনীর গ্রন্থে খেলাধূলা ক্রীড়া কৌতুক ও তৎসংশ্লিষ্ট বস্তুর শাব্দিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে- এমন বস্তুকে যা দ্বারা চিত্ত বিনোদন করা হয় অথচ জ্ঞান-বুদ্ধি তা সমর্থন করে না। অর্থাৎ যে কাজ ও বস্তু মানুষের জন্য অনিবার্য নয়, অর্থকরী নয়, তাতে সে ব্যস্ত হয়ে পড়াকে খেলাধূলা, ক্রীড়া কৌতুক ও কৌতকাবহ বস্তু বলা হয়।
ইসলামি পরিভাষায়, খেলাধূলা ক্রীড়া-কৌতুক এমন সব কাজ বস্তু বা বিষয়কে বলা হয় যা মানুষকে আল্লাহর এবাদত ও স্মরণ থেকে গাফেল করে ফেলে। যার কোন উল্লেখযোগ্য উপকারিতা নেই কেবল সময় ক্ষেপন কিংবা মনোরঞ্জনের জন্য করা হয়।
খেলাধূলার শরয়ী বিধান : খেলাধূলা ও কৌতুকাবহ বস্তুর বর্ণিত সংজ্ঞার ভেতরে যত কাজ, যত কথা, বস্তু ও বিষয় ঢুকবে সবগুলোকে শরিয়ত অনুমোদন দেয়নি। সূরা লুকমানের ৬ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “মানুষের মধ্যে এক শ্রেণীর মানুষ এমন আছে যারা লাহওয়াল হাদীস তথা খেলাধূলা-কৌতুকাবহ কথা ক্রয় করে মানুষকে আল্লাহর পথ পদ্ধতি থেকে ভ্রষ্ট করার জন্য। আর এটা নিয়ে ঠাট্ট্রাÑবিদ্রুপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবনামনাকর শাস্তি”। প্রথম লক্ষণীয় বিষয় এই যে, কোরআন পাক কেবল নিন্দার স্থলেই খেলাধূলা, ক্রিড়া-কৌতুকের উল্লেখ করেছে। এই নিন্দার সর্ব নিম্ন পর্যায় হচ্ছে মাকরুহ, আলোচ্য আয়াতটি খেলাধূলা ও অনর্থক কাজের নিন্দায় সুম্পষ্ট ও প্রকাশ্য। (রূহুল মাআনী, কাশ্শাফ)
বিংশ শতাব্দির প্রখ্যাত মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ শফী র. স্বীয়গ্রন্থ আহকামুল কুরআনে বর্ণিত আয়াতের হুকুম প্রসঙ্গে বলেন- পবিত্র কুরআনের এ আয়াতে ঐ সকল কথা, কাজ, বস্তু ও বিষয়কে হারাম করে যা মানুষকে আল্লাহ পাকের এবাদত ও তার স্মরণ থেকে গাফিল করে দেয়। তা গান-বাজনা হোক বা খেলাধূলা, ক্রীড়া-কৌতুক, মেলা, জুয়া সরঞ্জামসহ সবই এর অন্তর্ভূক্ত।
বর্ণিত আয়াতে অধিকাংশ তাফসীরের কিতাবে “লাহওয়াল হাদীস” এর ব্যাখ্যায় খেলাধূলা-ক্রীড়া-কৌতুক, আজে-বাজে কথাবার্তা, ছায়াছবি-নাটক, অশ্লীল উপন্যাস, কেচ্ছা-কাহিনী, গান-বাজনা ইত্যাদি যা মানুষকে আল্লাহর এবাদত ও স্মরণ থেকে গাফেলা করে তা হারাম সাবস্ত করেছেন। বিশ্ববিখ্যাত ফেকাহ শাস্ত্রীয় কিতাব ‘হেদায়া’র মধ্যে বলা হয়েছে শেতরানজ, নারদাশীল, চৌদ্দ গুটির খেলা এবং প্রত্যেক খেলা মাকরুহে তাহরীমী, কারণ এর দ্বারা জুয়া খেলা খেললে তা হবে মাইসির। আর মাইসির অকাট্য হারাম, পবিত্র কোরআন হাদীসের আলোকে। মাইসির হচ্ছে যে কোন জুয়া খেলার নাম, আর যদি এর দ্বারা জুয়া না খেলে তাহলে এটা হবে নিরর্থক লাভহীন এক কাজ। পৃথিবী বিখ্যাত ফতোয়ার কিতাব দুররে মুখতার গ্রন্থকার বলেছেন যে কোন খেলাধূলা বৈধ হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত হচেছ, তাতে হার জিতের ওপর কোন বাজী ধরা যাবে না। জুয়ার চুক্তি করা যাবেনা। খেলার অধ্যবসায় সদা-সর্বদা করা যাবেনা। জীবনের আদর্শ উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট হিসেবে একে আজীবন করা যাবেনা। খেলাধূলার কারণে ইসলামের অনুশাসন বাস্তাবায়নে কোন প্রকার বাধা সৃষ্টি হতে পারবে না। নতুবা তা হারাম হওয়ার বিষয়ে ফকীহগণ একমত।
প্রত্যেক খেলার ব্যাপারে ফতোয়ায়ে শামী গ্রন্থকার বলেন- খেলাধূলা, মেলা, অনর্থক, লাভহীন কথাবার্তা, কর্মকান্ড এবং এসব বস্তু তৃপ্তি সহকারে দেখা বা শুনা যেমন নৃত্য, উপহাস, করতালী, বীণার সুুুুুুুরেলা ধ্বনি, সঙ্গীতের সুরালাপ, হারমোনি, তবলা, বড়ঢোল প্রভৃতি বিষয় হারাম।
মৌলিক নীতি : ফতোয়ায়ে দুররে মুখতারে খেলাধূলার একটি মূলনীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো-
খেলাধূলা তখন জায়েজ হবে যখন তাতে জুয়া থাকবেনা। খেলার অধ্যবসায় সদা-সর্বদা করা যাবেনা। এটাকে জীবনের উদ্দেশ্য, আদর্শ ও বৈশিষ্ট্য মনে করা যাবেনা। সেই সাথে খেলাধূলার কারণে ইসলাম ধর্মের অনিবার্য বিধান লংঙ্ঘিত হতে পারবে না। অন্যথায় তা হারাম হওয়ার ব্যপারে ফকীহগণ একমত।
এ প্রসঙ্গে ফতোয়ায়ে শামীর মধ্যে বলা হয়েছে অনুরূপ যখন খেলাধূলার বেশিরভাগ ধর্মদ্রোহী, ধর্মবিদ্বেষী অসৎ পতিতা ও অসাধু মানুষ অংশ না নেবে, কিন্তু যখন খেলার মাঠে বর্ণিত স্বভাবের লোকজনের আড্ডায় পরিণত হবে, তখন আর খেলা বৈধ থাকবেনা। (খেলাধূলা ও আনন্দমেলা-মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল গফুর)
পাঁচ.
খেলধূলার বৈধতা : কোন কোন হাদীস ও ফেকহার কিতাবে যেসব খেলাধূলার বৈধতা দেয়া হয়েছে তা হলো- হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদিন রাসূল (সা.) পবিত্র মদীনায় খেলাধূলায় মগ্ন একদল ছেলেদের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। আর আমি তিনির কাঁধের ফাঁক দিয়ে তাদের খেলা দেখলাম, রাসূল (সা.) বললেন, খেলাধূলা কর হে আরিফের বৎসগণ! এতে ইয়াহুদি ও নাসারাগণ আমাদের শরীয়তে আনন্দোদ্দীপনার সুযোগ আছে বলে জানতে পারবে, ছেলেরা বলতে লাগলো ধন্যবাদ আবুল কাসিম, ধন্যবাদ, ইতোমধ্যে হযরত ওমর রা. আসায় সকলে মাঠ ত্যাগ করে চলে গেল। আরেক হাদীসে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন- তিন খেলাই মুসলমানদের- এক. আপন স্ত্রীর সাথে অত্যধিক প্রেমভরে খেলা করা। দুই. স্বীয় অশ্বকে যুদ্ধ কৌশল শিক্ষা দেয়া। তিন. শত্র“র মুকাবেলায় জয় লাভের জন্য তীর ছুড়া ছুড়ির প্রশিক্ষণ। (তিরমিজী, আবু দাউদ, ইবনে মাযা)
কানজুল উম্মাল নাকম কিতাবে আরেকটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো- (তোমরা মাঝে মধ্যে) খেলাধূলা কর, কারণ আমি তোমাদের জীবন ব্যবস্থায় সম্প্রীতির অভাব অপছন্দ করি।
ইমাম আবু দাউদ স্বীয় মারাসীল গ্রন্থে এক হাদীসে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, মাঝে মধ্যে মনকে আরাম দাও, অবকাশে থাক। জামে ছগিরের এক হাদীসে উল্লিখিত- আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, আল্লাহর যিকির-আযকার ব্যতীত যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান খেলাধূলার অন্তর্ভূক্ত।
সাংঘর্ষিক হাদীস সমূহের ব্যাখ্যা: খেলাধূলা জায়েজ-নাজায়েজ সম্পর্কিত হাদীসগুলোর ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসিন ও ফুকাহায়ে কেরামগণ বলেছেন, ইসলামী শরীয়তে নির্ধারিত কোন খেলাধূলা নেই। সেই সাথে নির্ধারিত কোন নিয়ম কানুনও নেই। বরং দ্বীন ইসলাম, ব্যক্তির শারীরিক ও আর্থিক স্বার্থ বিরোধী খেলা এবং জুয়া ভিত্তিক যাবতীয় খেলাধূলা নিষিদ্ধ ও হারাম। মোটকথা খেলাধূলা হারাম হওয়ার কারণ সমূহের মধ্যে থেকে প্রধান কারণ হিসেবে যে ক’টিকে সনাক্ত করে বৈধ বা অবৈধ হুকুম লাগিয়েছেন তা নিম্নরূপ-
(ক) দু’তরফা লেনদেন ও হার জিতের বাজি খেলা বা জোয়া খেলা করা। (খ) আল্লাহর জিকির আযকার ও তার স্মরণ থেকে মানুষকে গাফিল করা। (গ) বেশিরভাগ অধার্মিক ও অসাধু লোকজনের আড্ডা জমে উঠা। (ঘ) খেলার অধ্যবসায় সদা-সর্বদা করা। (ঙ) শারীরিক ক্ষতি সাধিত হওয়া। (চ) আর্থিক ক্ষতি সাধন হওয়া। এগুলো যে খেলায় পাওয়া যাবে সেটা হারাম ও নিষিদ্ধ আর না পাওয়া গেলে বৈধ। প্রিয় পাঠক! বর্তমান খেলাধূলার বিষয়টি মনোযোগের সহিত লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন যে, খেলাধূলা হারাম হওয়ার প্রধান কারণগুলো তাতে অবশ্যই জড়িত রয়েছে।
ক্রীড়া মঞ্চগুলোতে খেলার দিন সকাল থেকে দর্শনার্থীদের ঢল নেমে আসে, দূর দূরান্ত থেকে মূর্চ্ছনা, ঢোল, ডুগডুগির ছান্দিক, বাদ্য, একতারার টুংটাং এবং অশ্লিল অশালিন ছবির গান দিয়ে শুরু করা হয়। সেই সাথে থাকে উৎসব মুখর জনতার আনন্দের কলতান। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় এখেলা যেন তাদের আনন্দের তীর্থস্থান। অথচ এসব অনুষ্ঠানের কারণে পার্শ্ববর্তী এলাকার মসজিদ মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে লেখা-পড়ায় বাধা সৃষ্টিসহ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পর্যন্ত পালন করা যায় না। খেলার মাঠে হৈ-হোল্লড়, চিৎকার, ভাষ্যকারের ঘোষণা এবং জনতার করতালির কারণে যে শব্দদূষণ সৃষ্টি হয় তা বড় অসহ্য লাগে। হাজার হাজার খেলাপ্রিয় মানুষের ভিড়ের কারণে রাস্তাঘাট ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে নিরীহ পথচারীরা কষ্ট পায়, লঙ্ঘন করা হয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার। জাতীয় ও বিভাগীয় স্টেডিয়ামে দর্শক গ্যালারিতে তরুণ-তরুণীরা ইউরোপিয়ান কায়দায় স্বীয় সমর্থিত দলের পতাকাসহ উল্লাসে ফেটে পড়ে। বিশ্বকাপ ফুটবল, বিশ্বকাপ ক্রিকেট বা অলিম্পিক মাঠের গ্যলারিতে ইংলিশ ছায়াছবির মত নারীরা অশ্লিলতার মহড়া দেয়, নিজ নিজ সমর্থিত দলের পতাকা মাথায় গাল, স্তন, পেট ও উরুতে অংকন করে আর্শিবাদ জানায়। যদি নিজ সমর্থিত দলের জয় হয় তা হলে খেলোয়াড়দের প্রান উজাড় করে চুম্বন খেয়ে প্রেম উপহার দিতে দেখা যায়, আনুষ্ঠানিক নারীদের দুরবীন নিয়ে উপভোগ করতেও দেখা যায়।
খেলাধূলা আজ মহামারি ও জাতীয় মরণ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মাদ্রাসা, স্কুলসহ নানা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ভেস্তে যাচ্ছে। অধিকাংশ খেলাই ইসলামী সভ্যতা ও আদর্শের ওপর আগ্নেয়াস্ত্রের মত আঘাত হানছে। আন্তর্জাতিক খেলা থেকে নিয়ে আঞ্চলিক খেলা পর্যন্ত সব খেলাতেই জুয়া, ব্যবসা ও অসৎ উপায়ে টাকা উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। খেলায় বিজয়ী হওয়া জাতীয় মর্যাদা ও জাতীয় সম্মানের মানদন্ড হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। মজার ব্যাপার হল যাদু-টুনা ও খোদা পাকের পবিত্র নাম দ্বারা আরধনার মাধ্যমেও নিজ টিমকে জেতানোর চেষ্টা করতেও দেখা যায়। এসব অপসংস্কৃতির জোয়ারে আমরা কোথায় ভেসে যাচ্ছি?

ফিক্হশাস্ত্র গবেষণায় পাশ্চাত্যবিদদের দৃষ্টিকোণ

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
বি শ্লেষকদের মতে ‘ইসলামী ফিকহ বা আইন দীনের গন্ডির বাইরের একটি বিষয়’- শাখতের এমন মতবাদটাই হচ্ছে দৃশ্যত ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ। যদিও তারা তা প্রকাশ্যে স্বীকার করে না। ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের মতে হচ্ছে, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে ধর্ম থেকে দূরে থেকে। আর এভাবেই আধুনিক শিক্ষিত মুসলিম যুবসমাজের মাঝে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ শিকড় গেড়ে বসে। বিশেষ করে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যবিদ শাখ্ত ও তার অনুসারী অন্যান্য প্রাচ্যবিদের বই-পুস্তক পড়ানো হয় সেসব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী মুসলিম সন্তানদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা বেশি পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে ড. আব্দুল কাহহার দাউদের উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, শাখতের মতবাদই ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ। যদিও তা খুলে বলা হয় না। সেই মতবাদের মূল কথা হচ্ছে, ধর্ম থেকে দূরে থেকেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক তথা সরকার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমরা আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী আলী আব্দুর রাজ্জাককে এই (মতবাদের) পতাকা বহন করতে দেখেছি। পরবর্তীতে লক্ষ্য করেছি, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের দোসরদের অনেকেই তার সেই মত ও রায়কে নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫২”।
মুসলিম দেশসমূহে পাশ্চাত্য উপনিবেশবাদের যাত্রা শুরু হবার পর থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ আইনের প্রভাব ব্যাপক আকার ধারণ করে। এই রূঢ় বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে প্রফেসর মুহাম্মদ হামীদুল্লাহ বলেছেন, ডরঃয ঃযব ধফাবহঃ ড়ভ ডবংঃবৎহ পড়ষড়হরধষরংস রহ গঁংষরসং ষধহফং, ওংষধসরপ ষধি ধিং ড়াবৎংযধফড়বিফ নু ংবপঁষধৎ ষধ.ি “ঋধরুধষ অযসধফ গধহলড়ড়, অহ ঙৎরবহঃধষরংঃ চবৎংঢ়বপঃরাব ড়ভ ওংষধসরপ খধ:ি ঋৎড়স ঋড়ংংরষরুধঃরড়হ ঃড় খবমধষ ঞৎধহংঢ়ষধহঃ, ঞযব গঁংষরস ডড়ৎষফ ইড়ড়শ জবারব,ি টক: ঞযব ওংষধসরপ ঋড়ঁহফধঃরড়হ, ৩১:৪, ২০১১, ঢ়.৬”
এভাবেই আধুনিক মুসলিম প্রজন্মকে দীন থেকে দূরে রাখতে এবং ইসলামী আইন ও শরীয়া সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে পরিকল্পিতভাবে চালানো হয় এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। ক্রুসেড যুদ্ধের পর থেকে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে পরিচালিত ইউরোপিয়ানদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকে। বিগত দুই শতাব্দী ধরে তাদের এ আন্দোলন আরো বেগবান হয়। আন্দোলনের ফসল ঐসব প্রাচ্যবিদদের পিছনে ব্যয় করা হয় অঢেল সম্পদ। ফলে তাদের লেখালেখি ও গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত এই দেড়’শ বছরে প্রাচ্যবিদগণ তাদের এ অশুভ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রাচ্য তথা ইসলাম, ইসলামী শরীয়ত, মুসলমান ও মুসলিম দেশ সম্পর্কে ষাট হাজার বই-পুস্তক রচনা করেছেন। “প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৬; ড. আকরাম জিয়া আল-ওমারী, মাওকিফুল মুস্তাশরিক্বীন মিনাস সীরাতি ওয়াস সুন্নাহ, দারুল ইশবিলিয়্যাহ, পৃ. ৬-৭”। এর মধ্যে কিছু কিছু বই মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত সমাদৃত। ওসব গ্রন্থে উল্লেখিত প্রাচ্যবিদদের বিভিন্ন মতামতকে আধুনিক শিক্ষিত সমাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে থাকেন। যা অনেক সময় মুসলমানদের নতুন প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর ও ক্ষতিকর বিষয়ে পরিণত হয়। বিশেষ করে মুসলিম জীবনপ্রণালী, আইন ও বিচার, ফিক্হ, শরীয়তসহ ইসলামের সরাসরি বিষয়ে লিখিত কতিপয় প্রাচ্যবিদদের বই। প্রাঞ্জল আরবী বা ইংরেজি ভাষায় রচিত তাদের কোনো কোনো বইয়ের দোষ-ত্র“টিগুলো মুসলিম বিশেষজ্ঞ স্কলার্স ছাড়া সাধারণ পাঠক বা ছাত্র সমাজ কখনোই ধরতে পারবে না। অথচ ঐসব আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলমান যুবসমাজ এক সময় মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন, অনেক সময় ক্ষমতার শীর্ষস্থানীয় পদে আরোহণ করেন। তখন মুসলমানের সন্তান হয়েও সেসব ক্ষমতাবানদের কার্যক্রমে দেখা যায়, ইসলামের প্রতি তাদের কোনো দরদ নেই, ঈমান ও শরীয়া বিরোধী এবং মুসলমানদের স্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপ নিতে তাদের বুক কাঁপে না। মুসলিম হয়েও ইসলামী আইন মানেন না। ইসলামী আইন সেকেলে, এসব আইন ও বিচার বর্তমানে অচল, শরীয়া আইন মধ্যযুগীয় বর্বর আইন.. (নাউজুবিল্লাহ) ইত্যাদি যেসব উক্তি বর্তমান মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে বিভিন্ন নেতা ও কর্তাব্যক্তিদের মুখে শোনা যায়, তা সেই প্রাচ্যবিদদেরই ভয়াবহ প্রভাব এবং বিদ্বিষ্ট প্রাচ্যবিদদের লেখা বিভ্রান্তিকর বই-পুস্তকের আলোয় গড়ে উঠার ভয়ানক পরিণতি।
রচনা ও গবেষণার ক্ষেত্রে প্রাচ্যবিদদের কৌশল সম্পর্কে প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) বলেন, অনেক প্রাচ্যবিদ তাদের লেখায় নির্দিষ্ট পরিমাণে বিষ মিশিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা খুব সতর্কতা অলম্বন করেন। নির্ধারিত পরিমাণের চাইতে বেশি (তথ্য) বিষ প্রয়োগ করেন না, যাতে পাঠক নি:সঙ্গতা অনুভব না করে, সতর্ক হয়ে না যায় এবং লেখকের স্বচ্ছতার প্রতি তার যে আস্থা তা যেন দুর্বল হয়ে না যায়। এমন প্রাচ্যবিদদের লেখা পাঠকের জন্যে ঐসব লেখকের চাইতে বেশি ভয়ংকর ও বিপদজনক যারা প্রকাশ্যে শত্র“তা করেন এবং নিজেদের লেখা বই-পুস্তকসমূহকে মিথ্যা ও বানোয়াট দিয়ে বোঝাই করে তোলেন। ফলে মাধ্যম মানের বিবেকসম্পন্ন পাঠকের পক্ষে এসব লেখকের বিষাক্ত ও মিথ্যা তথ্যের সামনে হার না মেনে তাদের বই-পুস্তক থেকে বেরিয়ে আসা অথবা পড়া সমাপ্ত করা কঠিন হয়ে যায়। “সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭”।  তবে আধুনিক যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষের দরুন পশ্চিমাদের মাঝে ইসলাম, পবিত্র কুরআন ও হাদীস নিয়ে গবেষণার আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। বর্তমান প্রেক্ষিতে ইসলামী আইনের যথার্থতা অনেকের নিরপেক্ষ গবেষণায় ইতিবাচক হিসেবে ধরা পড়ে। ফলে পূর্ববর্তী প্রাচ্যবিদদের ইসলামী আইন ও ফিকহশাস্ত্র বিষয়ক কোনো কোনো দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রাচ্যবিদগণ ভিন্নমতও পোষণ করেন। বিশেষ করে পূর্ববর্তীদের মানহানিকর ও উপনিবেশবাদী সুরের স্থলে নতুনদের রচনায় স্থান করে নিয়েছে বিষয়ভিত্তিক ও একাডেমিক গবেষণা। এই প্রসঙ্গে বিশ্লেষক ফয়যাল ম্যানজু’র বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ঝরহপব ঃযব নবমরহহরহম ড়ভ ঙৎবরহঃধষরংস ধং ধ ফরংপরঢ়ষরহব রহ ঃযব ১৭ঃয পবহঃঁৎু ঁহঃরষ ঃড়ফধু, ৎবংবধৎপয সবঃযড়ফড়ষড়মু রহ ওংষধসরপ ষধি যধং রিঃহবংংবফ ধ ঢ়ধৎধফরমসধঃরপ ংযরভঃ. ঞযব ফবৎড়মধঃড়ৎু ধহফ পড়ষড়হরধষরংঃ ঃড়হব ড়ভ ঢ়রড়হববৎং ংঁপয ধং এড়ষফুরযধৎ, ঝপযধপযঃ ধহফ ডধঃঃ যধং নববহ ৎবঢ়ষধপবফ নু ধপধফবসরপ ড়নলবপঃরারঃু নু ংপযড়ষধৎং ংঁপয ধং ঘধফরধ অননড়ঃঃ ধহফ ডধবষ ঐধষষধয়. “ঋধরুধষ গধহলড় ঔনরফ, ঢ়.৬”
ফিক্হ সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের মতামত-পর্যালোচনা : ইসলামী আইন, শরীয়ত ও ফিক্হশাস্ত্র নিয়ে বিদ্বিষ্ট প্রাচ্যবিদদের কয়েকটি মতামত বা অপবাদ প্রসিদ্ধ, যা ইসলামী চিন্তাধারার সাথে অত্যন্ত সাংঘর্ষিক। যথা: এক. ইসলামী আইন ও শরীয়ত প্রাচীন রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত ও মদদপুষ্ট। দুই. আধুনিক যুগে ইসলামী শরীয়ত বা আইন অচল। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার যোগ্যতা নেই ইসলামী আইন ও ফিক্হশাস্ত্রের। তিন. ফিক্হ বা ইসলামী আইন ধর্মের গন্ডিবহির্ভূত একটি বিষয়। ইসলামী আইন, শরীয়াহ ও ফিক্হশাস্ত্র বিষয়ে প্রাচ্যবিদদের উপযুক্ত মতামত এবং তাদের আরোপিত অপবাদসমূহ নিতান্ত প্রলাপ এবং সত্যকে আড়াল করতে অন্ত:সারশূন্য অপপ্রয়াস বৈ কিছু নয়। ইসলামী আইনের বিদগ্ধ গবেষকগণ এসব অপবাদের যথাযথ জবাব দিয়েছেন তাদের বিভিন্ন গবেষণাকর্মে। এক্ষেত্রে প্রচুর বই বের হয়েছে আরব বিশ্বে। যার বিস্তারিত আলোচনা এই স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের কতিপয় মূল্যায়ন দিয়েই সংক্ষিপ্তাকারে এ বিষয়ে পর্যালোচনা করতে চাই।
শরীয়াহ আইন রোমান আইনের প্রভাব : ইসলামী আইন ও শরীয়ত প্রাচীন রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত ও মদদপুষ্ট-এর মতামত ও অপবাদের প্রবক্তা প্রাচ্যবিদ ‘গোল্ডযিহার’, ‘ভন ক্রেমার’, ‘শেলডন অ্যামস’সহ আরো অনেকে। এ প্রসঙ্গে প্রাচ্যবিদ শেলডন অ্যামস (ঝযবষফড়হ অসড়ং)-কয়েকটি প্রসিদ্ধ উক্তি প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক ড. মামুদ হামদী জকজুক তাঁর একটি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি শেলডনের উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, প্রাচ্যবিদ শেলডন স্পষ্টভাষায় বলেন, মুহাম্মাদী (তথা ইসলামী) আইন হচ্ছে পূর্বাঞ্চলীয় সাম্রাজ্যের রোমান আইনের সংস্কৃত রূপ। ওটাকেই আরব রাজ্যসমূহে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মুহাম্মাদী আইন জাস্টিনিয়ান (ঔঁংঃরহরধহ) আইন ছাড়া আর কিছু নয়। ওটাকেই কেবল আরবী পোশাক পরানো হয়েছে। “ড. মাহমুদ হামদী জকজুক, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৩-১১৪। গরধহ জধংযরফ অযসধফ কযধহ, ওংষধসরপ ঔঁৎরংঢ়ৎঁফবহপব, ঝয.গঁযধসসধফ অংযৎধভ, খধযড়ৎব, ১৯৭৮, ঢ়ঢ়. ১৫৩-১৫৫”
ইসলামী শরীয়াহ আইনে রোমান আইনের প্রভাব-এই বিষয়ের অনুকূলে প্রাচ্যবিদদের দাবি হচ্ছে, মুসলমানরা যেসব এলাকা ও অঞ্চল জয় করেছিল সেখানকার বিজিত জাতির আইন-কানুন থেকে সাহায্য নেয়াটাই স্বাভাবিক। আর এসব এলাকায় তখন প্রচলিত ছিল রোমান আইন। মুসলমানদের পদানত হবার পূর্বে এসব এলাকা রোমান সাম্রাজ্যের আতওতাধীন ছিল। এভাবে ইসলামী ফিক্হ ও শরীয়াহ আইন রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত হয়। এমনকি প্রাচ্যবিদ গোল্ড যিহারের ভাষায় ‘ফিক্হ’ ও ‘ফুকাহা’ পরিভাষাদ্বয় রোমান আইনি পরিভাষা যথাক্রমে (ঔঁৎরং) চৎঁফবহঃরং ও (ঔঁৎরং) চৎঁফবহঃবং দ্বারা প্রভাবিত। “ড. ইবরাহীম আওয়াদ, দায়েরাতুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়াহ আল-ইস্তিশরাকিয়া : আদালীল ওয়া আবা আবা’তীল, মিসর : মাকতাবাতুল বালাদিল আমীন, ১৯৯৮ইং, পৃ. ৯৯”।
রোমান আইনের ক্ষেত্রে প্রথম কথা হচ্ছে, সব প্রাচ্যবিদ কিন্তু এমন দাবি করেননি। যে, ইসলামী আইন ও ফিক্হ রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত। যারা করেছেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন : গোল্ড যিহার তার (ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ ঃড় ওংষধসরপ ঞযবড়ষড়মু ধহফ খধি গ্রন্থে, ভন ক্রেমার গ্রন্থে, ডি পোর তার গ্রন্থে এবং শেলডন অ্যামস তার (জড়সধহ ঈরারষ খধ)ি শীর্ষক গ্রন্থে। তাদের বাইরে আরো অনেক প্রাচ্যবিদ রয়েছেন যারা এ দাবির বিপক্ষে। তাদের মধ্যে মিয়্যূ, ন্যালিনিও, ওলফ, নোলডে, অ্যারমেনজুল, যায়েস প্রমুখ। উদাহরণস্বরূপ প্রাচ্যবিদ যায়েস নিশ্চিত করে বলেন, ইসলামের শরীয়াহ আইন ও রোমান আইনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ এখানে একটা মানব রচিত এবং আরেকটার উৎস হচ্ছে ঐশী প্রত্যাদেশ। “ড. ইবরাহীম আওয়াদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৪”।
কিসের ভিত্তিতে প্রাচ্যবিদগণ বলেন, ইসলামী শরীয়ত রোমান আইন ও রোমান বিচার ব্যবস্থা থেকে নেয়া। এক্ষেত্রে তাদের দলিলসমূহ হচ্ছে মোটামুটি নিম্নরূপ: ক. ইসলামের পূর্বে আরব ও রোমানদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। এই যোগাযোগের কারণে প্রথমপক্ষ দ্বিতীয় পক্ষের আইন দ্বারা প্রভাবিত হয়। খ. মুসলমানরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে রোমানদের আইন দ্বারা প্রভাবিত হয়। গ. ইসলামী শরীয়াহ আইন আরবদের প্রচলিত কতিপয় উরফ তথা প্রথা-রেওয়াজ দ্বারা প্রভাবিত, যেসব প্রথা-রেওয়াজ পূর্ব থেকেই রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ঘ. এক্ষেত্রে তারা কতিপয় রোমান আইনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে ইঙ্গিত করেন, যা তখনকার যুগে শাম, মিসর, আলেকজান্দ্রিয়া, বৈরূত ও কায়সারিয়ায় ছিল। ঙ. এ প্রসঙ্গে তারা রোমান আইন বিষয়ক কিছু বই-পুস্তকের কথাও উল্লেখ করেন। চ. রোমান বিচারপদ্ধতির প্রভাব, যা তৎকালীন সময়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনস্ত রাজ্যসমূহে প্রচলিত ছিল। বিশেষ করে তারা রোমান প্রেইটর পদ্ধতি এবং ইসলামের বিচারক পদ্ধতির মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে বলে দাবি করেন।
এছাড়া প্রাচ্যবিদদের মতে, ইসলামী ফিক্হ ও রোমান আইনের মধ্যে প্রচুর সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন অর্থাৎ বাদীকে দলিল পেশ করতে হবে, প্রাপ্ত বয়স্কের বয়স নির্ধারণ, (ক্রয়-বিক্রয়) ও (পণ্য বিনিময়)-এর মধ্যে সাদৃশ্য প্রভৃতি। তাদের দৃষ্টিতে এসব সাদৃশ্যই প্রমাণ করে, ইসলামী আইন রোমান আইন দ্বারা প্রভাবিত। “ড. মুহাম্মদ যুহদী য়াকুন, আল-কুনূনুর রূমানি ওয়াশ-শরীআতুল ইসলামিয়াহ, বৈরূত : দারু য়াকুন, পৃ. ৪৫-৮০; ড. ইবরাহীম আওয়াদ, প্রাগুক্ত, ১৯৭৫ইং, পৃ. ১০৫”। রোমান আইন বিষয়ে প্রাচ্যবিদদের উপর্যুক্ত মতামত ও দাবি নিতান্তই অজ্ঞতাপ্রসূত ইসলামী ফিক্হ ও আইনের প্রকৃত ইতিহাস এবং রোমান আইনের ইতিবৃত্ত পর্যালোচনা করলেই এসব মতামতের অসারতা প্রতীয়মান হয়।
প্রথমত, ইসলামী ফিক্হ রোমান আইনের মদদপুষ্ট- এই দাবিটাই হচ্ছে নতুন; যার সূচনা উনবিংশ শতাব্দীতে। সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি এ দাবিটা উত্থাপন করেন তিনি হচ্ছেন আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসী ‘ডোমিনিলো জেতসকি’ নামক জনৈক ইতালিয়ান আইনজীবী। আলেজান্দ্রিয়া থেকে ১৮৬৫ ইং, সালে ইতালি ভাষায় প্রকাশিত তার একটি বইয়ে তিনি এমন দাবি করেন। এখানে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, এ দাবি যদি সঠিক হত, তাহলে ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে দীর্ঘ শতশত বছরে পশ্চিমা লেখক ও গবেষকগণ নিশ্চুপ বসে থাকতেন না। বাইজান্টাইন লেখকরা ইসলাম, ইসলামের নবী, ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নিয়ে কত লিখেছেন! কিন্তু তাদের একজনও এমন দাবি করেননি। এ দাবির স্বপক্ষে লেশমাত্র সত্য থাকলেও আহলে কিতাব ও পশ্চিমারা ইসলামের শত্র“তায় বইয়ের পাহাড় রচনা করে দিতেন।
ফিকহ ও ফুকাহা পরিভাষাদ্বয় রোমান আইনি পরিভাষা থেকে নেয়া-প্রাচ্যবিদ গোল্ডযিহারের এমন দাবি নিতান্তই সত্যবিবর্জিত। ইসলামী আইনের মৌলিক উৎস পবিত্র কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে তার অজ্ঞতাই প্রমাণ করে। মিস্টার গোল্ডযিহার হয়ত জানেন না, ইসলামী আইন প্রণয়নে রোমান আইনের প্রভাবের অনেক পূর্বেই পবিত্র কুরআনে ফিকহ শব্দের মূলধাতু থেকে উৎসারিত বিভিন্ন আঙ্গিকে শব্দ অন্তত বিশ জায়গায় এসেছে। আর হাদীস শরীফে যা এসেছে তা তো অসংখ্য।
শরীয়া আইনে রোমান আইনের প্রভাব বিষয়ে প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত অবশিষ্ট দাবিও মতামতের জবাবে ইতিহাসের সত্য উচ্চারণ হচ্ছে, জাহিলি যুগে আরবরা বেদুঈন জীবন-যাপন করত। প্রতিবেশী বিভিন্ন জাতি যাদের মধ্যে বাইজান্টাইনও ছিল- তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কোনোই সুযোগ ছিল না। উভয়ের মধ্যে ব্যবসায়িক যে সম্পর্ক ছিল তা কাফেলাসমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যেসব কাফেলা বছরে একবার সিরিয়া যেত তাতে আরবদের সংখ্যাও থাকত নিতান্ত অল্প। সীমিত সময়ের জন্য কাফেলা থামত সেখানে এবং বাইজান্টাইনদের সঙ্গে পণ্য বিনিময় করে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করত। ঐসব এলাকায় বসবাসরত গাসসান জাতি বাইজান্টাইন সভ্যতা বাহ্যিক কিছু আচার-আচরণ দ্বারা প্রভাবিত ছিল বটে। কিন্তু তারাও রোমান আইন গ্রহণ করেনি। অনুরূপভাবে মিসর ও সিরিয়াবাসী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনস্ত হওয়া সত্ত্বেও আঁকড়ে ছিল তাদের স্থানীয় আইন-কানুন।
ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মাধ্যমে ইসলামের পূর্বেই আরবদের মধ্যে রোমান আইন স্থানান্তরিত হওয়া বিষয়ে গবেষকদের বক্তব্য হচ্ছে, বরং ইহুদি আইনই রোমান আইনে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ৭০ খ্রিস্টাব্দে ইহুদি আর রোমান সরকারের মধ্যে সংঘটিত সংঘর্ষসমূহের কারণে ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় প্রথাসমূহ ধরে রেখেছিল। এমনিতেই তারা রোমান সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল। এদিকে ইহুদিরা ইসলামের পূর্বে আরব উপদ্বীপে এতই সংখ্যালঘু ছিল যে, আরবদের উপর তাদের কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাই নেই। একইভাবে আরবদের মধ্যে খ্রিস্টানদের সংখ্যাও ছিল খুবই অল্প। নাজরানে যেসব খ্রিস্টান ছিল তাদের সম্পর্ক ছিল আবিসিনীয়দের সাথে। কারণ উভয়ের ধর্ম ইয়াকুবী হওয়ায় আবিসিনীয়দের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কে ভিন্ন ধর্মালম্বী রোমানদের তুলনায় বেশি শক্তিশালী ছিল। অন্যান্য খ্রিস্টান গোত্র যারা রোমান সাম্রাজ্যের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বসবাস করত তারাও তাদের গ্রামীণ ও বেদুঈন জীবনপদ্ধতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিল। রোমান আইনের কোনো কিছু তাদের মধ্যে প্রবেশের ঘটনা ঘটেনি। এ প্রসঙ্গে ড. বদরান আরো যোগ করে বলেন, ইসলামী ফিকহের কোনো ইমামই ইহুদি বংশোদ্ভুত ছিলেন না অথবা কেউই ইহুদি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। এছাড়া ইহুদি শরীয়া আইন লিপিবদ্ধ ছিল হিব্র“ ভাষায়, যা সাধারণত আরবরা জানত না। ফলে ইসলামের পূর্বে ইহুদি কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে আরবদের মধ্যে রোমান আইন প্রভাব বিস্তার করেছিল- কথাটা সঠিক নয়। রোমান আইনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রভাবের দাবিটাও অসত্য। গবেষক ড. যুহদি ও ড. বদরান উভয়ই তাদের দীর্ঘ গবেষণাকর্মের পর এই ফলাফলে পৌছেন যে, সিরিয়া ও মিসরে যখন ইসলামের বিজয় সূচিত হয় তার অনেক পূর্বেই ঐসব কথিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে গিয়েছিল। তারপরও মুসলিম ফিক্হবিদদের মধ্যে ঐসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবের দাবি তোলাটা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও কল্পনাপ্রসূত।
এবার আসুন রোমান আইনের বই-পুস্তকের প্রভাব বিষয়ে। এ দাবি খন্ডনের জন্য আমাদের এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, আরবরা চিকিৎসা, দর্শন, সৌরবিদ্যা, অংকশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে অনেক প্রাচীন বই-পুস্তক অনুবাদ করলেও তারা কিন্তু আইনের কোনো বই অনুবাদ করেনি। এ রকম কিছু ঘটলে অন্যান্য অনূদিত বিষয়ের মধ্যে তার উল্লেখও থাকত নিঃসন্দেহে। উদাহরণস্বরূপ পিথাগোরাস, প্ল্যাটো, এরিস্টটল, গালিনিউস প্রমুখদের নামের সাথে সাথে তাদের বই-পুস্তকের বাইজান্টাইন আইনজ্ঞদের নামও আমরা দেখতে পেতাম। এছাড়া রোমান আইনের বই-পুস্তক নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে- ধর্মীয় আক্বীদা-বিশ্বাস মুসলিম ফিক্হবিদদেরকে সেই অনুমতি দিত না। তবে হ্যাঁ, রোমান আইনের একটি গ্রন্থ পাওয়া যায় যা আরবীতে অনূদিত হয়েছিল। তা হচ্ছে- কিন্তু এর অনুবাদ সম্পন্ন হয় ১১০০ ইং, সালে অর্থাৎ ইসলামী ফিক্হ প্রণয়নের বেশ কয়েক শতাব্দী পর। এ একটি মাত্র উদাহরণ রয়েছে যার কোনো আলোচনাই আসেনি পরবর্তীতে প্রণীত ইসলামী ফিক্হ ও আইনের গ্রন্থসমূহে।
ইসলাম ও রোমান আইনের বিচারব্যবস্থার মধ্যে সাদৃশ্যের যে দাবি উত্থাপিত হয় তার জবাবে বলা যায়, আরবরা যখন প্রথম সিরিয়া জয় করে তখন ‘প্রেইটর’ পদ্ধতি বলবৎ ছিল। কিন্তু ইসলামের সূর্য উদিত হবার অন্তত চার শতাব্দী পূর্বেই রোমান সাম্রাজ্য থেকে এই পদ্ধতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এছাড়া উভয় পদ্ধতিতে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, তা তো আছেই। যেমন, রোমান আইনে বাদী-বিবাদী নিজেরাই বিচারক নির্বাচন করত এবং উভয়ের দাবি বিচারকের সামনে উত্থাপন করত। বিচারক তাদের দাবিগুলো শুনে নির্দিষ্ট বিশেষ কিছু ফরমে তা লেখার নির্দেশ দিত, যেখানে বিচারক মামলার রায় কিভাবে দিবে তার চিত্র তুলে ধরা হত। অথচ ইসলামী আইনে রাষ্ট্রই বিচারক নিযুক্ত করে। উভয় পক্ষে উপস্থাপিত মামলায় ইসলামের প্রচলিত আইনে সূরাহা না হলে বিচারক শরীয়তের আলোকে গবেষণা করে সিদ্ধান্ত বের করে রায় দিয়ে থাকেন।
ইসলামী ফিক্হ ও রোমান আইনের মধ্যে আরো যেসব সাদৃশ্যের কথা বলা হয়েছে যেমন, অর্থাৎ বাদীকে দলিল পেশ করতে হবে, প্রাপ্ত বয়স্কের বয়স নির্ধারণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাদৃশ্য তাও সঠিক নয়। কারণ, বাদী তার দাবির সপক্ষে দলিল উপস্থাপন করবে-মর্মে ইসলামী আইনে যে ধারাটি রয়েছে তা এমন একটি আরবী প্রবাদ থেকে উৎসারিত যা হাদীস শরীফে বর্ণিত। পুরো হাদীসটা হচ্ছে- “আহমদ ইবন হুসাইন আল-বায়হাকী, সুনান আল-বায়হাকী আল-কুবরা, মক্কা: মাকতাবাতু দারিল বা’য, ১৯৯৪ইং, খ. ৮, পৃ. ১২৩”।
সুতরাং এখানে তা রোমান কিংবা অন্য কোনো আইন থেকে নকল করার দরকার পড়ে না। এটাই সাধারণ জ্ঞানের কথা। প্রাপ্তবয়স্কের বয়স নির্ধারণের বিষয়টাও তেমন নয় যেমনটা প্রাচ্যবিদগণ বলে থাকেন। কারণ রোমান আইনে মেয়েদের জন্য বয়সসীমা হচ্ছে ১২ বছর আর ছেলের ক্ষেত্রে ১৪ বছর। অথচ ইসলামী শরীয়তে ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য ১৫ বছর। “ইসলামের পঞ্চম খলীফা উমার ইবনু আবদিল আযীয রাহ. শিশুর বয়সসীমা পনেরো বছর নির্ধারণ করেন। উল্লেখ্য তাঁর এ বয়সসীমা নির্ধারণেরও ভিত্তি হলো একটি হাদীস। নাফি’(রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য রাসূল (সা.) এর কাছে অনুমতি চাইলে রাসূল (সা.) তাঁকে অনুমতি দেননি। তখন তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। পরের বছর খন্দকের যুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য অনুমতি চাইলে তাঁকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল পনেরো বছর। রাবী নাফি (রা.) বলেন, এ ঘটনা শুনে খালীফা উমার ইবনু আবদিল আযীয রা. বললেন, এটাই হলো শিশু ও বয়স্কদের বয়সসীমা। (ইমাম, আস-সাহীহ, অধ্যায়- আল-ইমারাহ্, অনুচ্ছেদ : বায়ানু সিন্নিল বুলুগ, হা. নং : ৪৯৪৪)”। এর বিষয়েও আমরা দেখি, রোমান আইন উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছে এই বলে যে, তা হচ্ছে – অর্থাৎ মুদ্রা (ঈঁৎৎবহপু) দিয়ে বিনিময়। অর্থাৎ সম্পদের বিনিময়ে সম্পদ। এভাবে রোমান আইন উভয়কে যথাক্রমে সন্তুষ্টি ভিত্তিক চুক্তি এবং বেনামে অনির্ধারিত চুক্তি দুইভাগে বিভক্ত করে। কিন্তু ইসলামী শরীয়াহ ও উভয়কে সন্তুষ্টি ভিত্তিক বিক্রয় এর আওতাভুক্ত করে। “ড. ইবরাহীম আওয়াদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৬-১০৮”। সুতরাং শরীয়াহ আইনে রোমান আইনের প্রভাব রয়েছে- প্রাচ্যবিদদের এমন দাবি যথার্থ নয়। তাই ইসলামী ফিক্হশাস্ত্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রাচ্যবিদদের বুদ্ধিবৃত্তিক ষড়যন্ত্রসমূহ বিশেষ করে উপরোল্লেখিত তাদের প্রথম অপবাদ ও তার জবাব প্রসঙ্গে প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক ড. মুস্তাফা সিবায়ি লিখেন,
ইসলামী ফিকহের আত্মমর্যাদা ও মূল্যের ক্ষেত্রে সংশয় সৃষ্টি করা তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তারা যখন দেখলেন, এমন বিশাল আইনের ভান্ডার যা একত্রে ইতঃপূর্বে কোনো যুগের কোনো জাতির জন্য ছিল না, এত সমৃদ্ধ ইসলামের আইন কিভাবে হতে পারে। এ আইনের মাহাত্ম্য সম্পর্কে অবহিত হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান তারা। যেহেতু তারা রাসূলের নুবুওয়াতে ঈমান পোষণ করেন না, তাই এমন ধারণা করা ছাড়া আর কোনো পথ খুঁজে পেল না যে, এই মহান ও বিশাল ফিক্হশাস্ত্র অবশ্যই রোমান ফিক্হশাস্ত্র দ্বারা সাহায্যপুষ্ট। অর্থাৎ এটি তাদের- পশ্চিমাদের কাছ থেকে নেয়া। লাহাইয়ে অনুষ্ঠিত তুলনামূলক আইন সম্মেলনে যেসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তার মধ্যে এটাও ছিল যে, ইসলামী ফিক্হ নিঃসন্দেহে একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্র ফিক্হ বা আইন। এটা অন্য কোনো ফিক্হ বা আইন দ্বারা সাহায্যপুষ্ট নয়। এমন সিদ্ধান্তে প্রাচ্যবিদদের মধ্যে যারা মতলববাজ তাদের মুখ যেমন বন্ধ হয়ে গেছে, একইভাবে তা ন্যায়পরায়ণ সত্যের অনুসন্ধানী গবেষকদের আশ্বস্ত করেছে। “ড. মুস্তাফা আস সিবায়ী, আল-ইস্তিশরাক্ব ওয়াল-মুস্তাশরিকুন : মা লাহুম ওয়ামা আলাইহিম বৈরূত : আল মাকতাবুল ইসলামী, পৃ. ২৯”।
বর্তমানে কি ইসলামী আইন অচল? আধুনিক যুগে ইসলামী শরীয়ত বা আইন অচল। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার যোগ্যতা নেই ইসলামি আইন ও ফিক্হশাস্ত্রের কতিপয় প্রাচ্যবিদের এমন অপবাদ বা দাবির বিষয়ে যারা উত্তর দিয়েছেন তাদের একজন হচ্ছেন ড. আব্দুল হামীদ মুতাওয়াল্লী। তিনি তার আশ শরীআতুল ইসলামিয়া ওয়া মাউক্বিফু উলামাইল মুস্তাশরিক্বীন’ (অর্থাৎ ইসলামী শরীয়াহ এবং প্রাচ্যবিদদের অবস্থান) শীর্ষক গবেষণাকর্মে প্রাচ্যবিদদের সেই অপবাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন দালিলিকভাবে। তাঁর মতে ইসলামী শরীয়াহ ও আইন একেবারেই বন্ধ্যাত্বমুক্ত, সকল যুগের উপযোগী ও সচল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুনিয়ায় যত আইন রয়েছে তার মধ্যে ইসলামী শরীয়া আইনই সবচেয়ে বেশি গতিশীল সর্বাধিক উপযোগী এবং (সকল যুগে চলার) যোগ্য। (যুগ-যুগান্তরে) উপযোগিতার ক্ষেত্রে কোনো ত্র“টি বা অচলাবস্থা যদি থেকে থাকে তা কোনো মুসলিম আলিম কর্তৃক ব্যাখ্যার কারণে হলে হতে পারে। তিনি বলেন, শরীয়া আইনের কিছু লোকের ভুলের কারণে পুরো শরীয়াহকেই দোষারোপ করা এবং ধর্মীয় কোনো দলের ভুল-ত্র“টির কারণে গোটা ধর্মকেই দোষারোপ করা প্রাচ্যবিদদের চিরাচরিত পন্থা। তাদের এ পন্থা বেশ কয়েক বছর ধরে পরিচিত। “দ্রষ্টব্য: মদিনা সেন্টার ফর স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ অব অরিয়েন্টালিজম”।
সুতরাং বর্তমান যুগে ইসলামী আইন কখনো অচল হতে পারে না। ড. আব্দুল হামীদ আরো বলেন, তা কিভাবে হতে পারে যেখানে পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন আহকাম তথা বিধানসম্বলিত আয়াতসমূহ এসেছে সাধারণভাবে অথবা সামগ্রিক রূপে। সাধারণ বিধানগুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যার দিকে যায়নি। “প্রাগুক্ত”। অর্থাৎ মামলার মৌলিক ধারাটা উল্লেখ করা হয়েছে। যাতে করে যে, কোনো যুগের সংশ্লিষ্ট মামলা সেই আলোকে সমাধান করা যায়। কারণ, যুগ পরিবর্তনশীল, যুগের মানুষ ও অবস্থা পরিবর্তনশীল। ওসব মৌলিক ধারাতে যে কোনো যুগ ও পরিস্থিতির মামলার বিচারের সুযোগ রয়েছে। আর বিচারের সেই গুরু কাজটা আঞ্জাম দিতে পারবেন কেবলমাত্র বিদগ্ধ মুসলিম আইনবিদগণ। অতএব, কুরআনিক ধারায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। যেসব আয়াতে সাধারণ বিধান ও নির্দেশনা রয়েছে তার মধ্যে কয়েকটা যেমন: আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন। আর আমি আপনাকে তো বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি। “আল-কুরআন, ২১ : ১০৭”। তিনি দ্বীনের মধ্যে তোমাদের জন্য কোনো কঠোরতা আরোপ করেন নি। “আল-কুরআন, ২২ : ৭৮”।  আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তাই চান এবং যা তোমাদের জন্য কঠিন ও কষ্টকর তা চান না। “আল-কুরআন, ২ : ১৮৫”।
ইসলামী আইনের ইতিহাসে আইনগত এই গতিময়তা ও ফ্লাক্সিবিলিটির বাস্তবতা স্পষ্টত পরিলক্ষিত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এখানে এমন কিছু স্থির ও স্থায়ী বিষয় রয়েছে, যা অটল ও অমোঘ। কোনো ফকীহ কিংবা মুসলমান সেসব স্থির অকাট্য বিষয়ের বাইরে যেতে পারবে না। তবে পরিবর্তনযোগ্য বিষয় প্রচুর রয়েছে। “এক্ষেত্রে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন”। কারণ, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। সেই হিসেবে ইসলামী আইনও পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ। ইসলাম দাবি করে, জীবন-জগতের সব জিজ্ঞাসা ও সব সমস্যার সমাধান ইসলামে রয়েছে। পবিত্র কুরআন নিজেই ঘোষণা করেছে, সকল কিছুর বিবরণ তাতে রয়েছে। আর মহানবী (সা.) এর আদর্শ এমন সর্বব্যাপী কালজয়ী ও শাশ্বত যে, মহাপ্রলয় দিবসের পূর্ব পর্যন্ত কখনো এর আবেদন ফুরাবে না। বিশ্ব যতই আধুনিক থেকে অত্যাধুনিক যুগে প্রবেশ করছে ততই নতুন নতুন জিজ্ঞাসা ও আইনি সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে। বাহ্যত পবিত্র কুরআন ও মহানবী (সা.) এর সুন্নাহে আধুনিক এসব বিষয়ের কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য না থাকলেও এমন অনেক তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য ও ইঙ্গিত রয়েছে যার দ্বারা বিশ্বমানব পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে চিন্তা-গবেষণা করে নতুন সৃষ্ট আইনি জিজ্ঞাসা ও সমস্যার সমাধান আবিষ্কার করতে উদ্দীপ্ত হয়। এ প্রক্রিয়ার নামই ইজতিহাদ। “ড.মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ, ইসলামে ইজতিহাদ: একটি পর্যালোচনা, ইসলামী আইন ও বিচার, বাংলাদেশ ইসলামিক ল’ রিসার্চ এ- লিগ্যাল এইড সেন্টার, বর্ষ: ৬, সংখ্যা, ২৩, জুলাই- সেপ্টেম্বর: ২০১০, পৃ. ৯”।
ইসলামের আবির্ভাব থেকে আজ পর্যন্ত চৌদ্দশ বছরেরও অধিককাল ধরে ইজতিহাদের কার্যকারিতা ইসলামকে কালজয়ী আদর্শ ও জীবনব্যবস্থা হিসেবে এবং ইসলামী আইন ও বিচারকে কালজয়ী আইন ও বিচারব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে এবং ভবিষ্যতেও রাখবে।  ইসলামী আইনের সময়োচিত ও বৈজ্ঞানিক এই বাস্তবতা আধুনিক যুগের অনেক প্রাচ্যবিদও স্বীকার করেন। যেমনটি বিশ্লেষকদের মধ্যে অনেকের আলোচনায় ফুটে ওঠেছে। গবেষক ও বিশ্লেষক জনাব ফয়যাল প্রাচ্যবিদ ঘড়ৎসধহ ঈধষফবৎ, ঝঁংধহ অ. ঝঢ়বপঃড়ৎংশু, চধংপধষব ঋড়ঁৎহরবৎ এর ন্যায় প্রসিদ্ধ কয়েকজন প্রাচ্যবিদের ইসলামী শরীয়া ও আইনবিষয়ক গ্রন্থ পর্যালোচনা করতে গিয়ে এক পর্যায়ে বলেন: ঞযব ঢ়ৎরহপরঢ়ব রং ঃযধঃ রভ ঃযব ঃবীঃ রং য়ধঃ র ধষ-ঃযঁনঁঃ ধহফ য়ধঃ র ধষ ফধষধষধয ঃযবৎব রং যধৎফষু ধহু ংপড়ঢ়ব ভড়ৎ রলঃরযধফ ধং ঃযব ষধি ঃযবহ রং পষবধৎ-পঁঃ ধহফ পযধহমরহম ঃযব ষধি রং হড়ঃ ঢ়ড়ংংরনষব ধং ংঁপয ইঁঃ ঃযবৎব ধৎব পধংবং যিবৎব ঃযব ঃবীঃ রং য়ধঃ র ধষ-ঃযঁনঁঃ যিরষব নবরহম ুধহহর ধষ-ফধষধষধয ধহফ ঃযরং ড়ঢ়বহং ঁঢ় ধ ংসধষষ ংঢ়ধপব ভড়ৎ রলঃরযধফ. অ ষবমধষ ঃবীঃ পধহ ধষংড় নব ুধহহর ধষ-ঃযঁনঁঃ ধহফ ুধহহর ধষ-ফধষধষধয ধং রহ ঃযব পধংব ড়ভ শযধনধৎ ধষ-ধিযরফ ড়ৎ ুধহহর ধষ-ঃযঁনঁঃ ধহফ য়ধঃ ঃ ধষ-ফধষধষধয ধং রহ পধংবং ড়ভ বিষষ বংঃধনষরংযবফ ঢ়ৎধপঃরপবং. অষষ ঃযবংব ফরভভবৎবহঃ পষধংংরভরপধঃরড়হং ধৎব ঢ়ড়ংংরনষব যিবহ রহঃবঢ়ৎবঃরহম ধ ঃবীঃ ধহফ ঃযরং বীনষধরহং ঃযব বসবৎবমবহপব ড়ভ ঃযব ংপযড়ড়ষং ড়ভ ষধ.ি
(সংক্ষেপে) যেখানে (অকাট্যভাবে প্রমাণসিদ্ধ) ও (সুস্পষ্ট ও দ্বার্থহীন বক্তব্য) সম্বলিত শরীয়তের অকাট্য দলিল রয়েছে, সেখানে ইজতিহাদ, করার কোনো সুযোগ নেই আর যেখানে শরীয়তের মূল বক্তব্যে ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে অর্থাৎ যেখানে (অকাট্যভাবে প্রমাণসিদ্ধ) (অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্য) সম্বলিত দলিল রয়েছে সেখানে বিদগ্ধ ফিকহবিদদের গবেষণা বা ইজতিহাদ করার সুযোগ রয়েছে। একটি আইনবিষয়ক দলিল (অকাট্যভাবে প্রমাণসিদ্ধ নয়) (অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্য) অথবা (অকাট্যভাবে প্রমাণসিদ্ধ নয়) (সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য) ও হতে পারে। এরকম অনেক সুপ্রতিষ্ঠিত মামলার ক্ষেত্রে ঘটেছে। কোনো আইনী ধারাকে ব্যাখ্যা করার সময় এসব পার্থক্যকে বিবেচনায় আনা সম্ভব এবং স্কুলস অব ল তথা আইনের প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রয়োজনীয়তাকে পরিষ্কার করে। “ঋধরুধষ গধহলড়ড়, রনরফ, ঢ়.৮”
ইসলামী আইন ও ফিক্হশাস্ত্রে ধর্মের প্রভাব : ইসলামী আইন ও শরীয়া দ্বীনের বহিরাগত একটি বিষয়-প্রাচ্যবিদ শাখতের এমন মন্তব্যটি এতই অযৌক্তিক যে, তাতে পবিত্র কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে শাখতের সীমাহীন অজ্ঞতাই ফুটে ওঠে। বিস্তারিত ব্যাখ্যায় না গিয়ে সংক্ষেপে আমরা বলতে পারি, ফিক্হ ও ইসলামী আইন কতই দীনভিত্তিক তা দীনের প্রধান উৎস পবিত্র কুরআন ও হাদীসের অসংখ্য আইনি বিধান থেকে সহজে অনুমেয়। বিদগ্ধ পাঠকমহলের সুবিধার্থে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ইসলামী আইন-কানুন সংক্রান্ত আয়াতসমূহের একটি চার্ট উল্লেখ করা হচ্ছে:
বিষয়    বিধানের সংখ্যা    বিষয়    বিধানের সংখ্যা
ইবাদাত (ধনীদের উপর আরোপিত যাকাতও রয়েছে)    ৮৯    জিহাদ ও আন্তর্জাতিক আইন    ৭৪
সামাজিক ব্যবস্থা  (ব্যক্তি ও পারিবারিক বিধান)    ১২১    পানাহার বিষয়ক বিধান    ৪০
ক্রয়-বিক্রয়    ১৩    বিভিন্ন ধরনের অপরাধ    ৯
বিচার    ১৬    সাক্ষ্য    ৭
দৈহিক ও আর্থিক শাস্তি    ২৪

পবিত্র কুরআনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাসূল (সা.) এবং তাঁর সাহাবীদের জীবনেও ইসলামী আইন ও বিচারের অসংখ্য নজির রয়েছে। কথা ও কর্ম উভয় ক্ষেত্রে। রাসূল (সা.) এর সীরাতে আমরা দেখি, তিনি বিভিন্ন এলাকার শাসকদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন আল্লাহর আইন অনুযায়ী মানুষের মাঝে বিচার করেন। আমর ইবন হাযম (রা.) এর বরাবরে লিখিত একপত্রে তিনি (সা.) তাঁকে সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর ভয় ও তাকওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকওয়াবান এবং সৎকর্মপরায়ণদের সাথে রয়েছেন। এ ছাড়া যা কিছু গ্রহণ করবে তা আল্লাহর নির্দেশনা মতে হকের সাথে গ্রহণ করতে তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। “মুহাম্মদ হামীদুল্লাহ, মাজমূআতু আল-ওয়াসাইকিস লিল আহদিন নববী ওয়াল খিলাফাতির রাশিদাহ, দলিল নং ১০৫, বৈরূত : দারুন নাফায়েস, ১৯৮৭ইং, পৃ. ২০৭”।
সাহাবীদের মধ্যে উমর (রা.) কে দেখা যায়, তিনি আবু উবায়দা ও মু’আয (রা.) কে পত্র লিখেছেন এ মর্মে যে, ভালো ও সৎ লোক দেখে তাদেরকে বিচার কার্যে নিয়োগ দাও এবং তাদের রিযক তথা ভাতার ব্যবস্থাও করো। “ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, বৈরূত : ম,ুআসসাতুর রিসালাহ, ১৯৮৫ইং, খ. ১, পৃ. ৪৫৫”। রাসূল (সা.) নিজেও মানুষের মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে বিচার-ফায়সালা করেছেন।
আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন-কোনো বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল রায় বা সিদ্ধান্ত দিলে সেক্ষেত্রে কোনো মু’মিন পুরুষ বা নারীর ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। আর যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করবে সে স্পষ্ট পথভ্রষ্ট হবে। “আল-কুরআন, ৩৩ : ৩৬”। বিপুল সংখ্যক সাহাবীও রাসূল (সা.) এর যুগের বিচারক হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, আবু মুসা আল আশ’আরী (রা.), উবাই ইবন কা’ব (রা.) হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা.), দাহইয়া আল কালবী (রা.), যায়িদ ইবন সাবিত (রা.), আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ (রা.), আত্তাব ইবন উসাইদ (রা.), আলী ইন আবী তালিব (রা.), উক্ববাহ ইবন আমির (রা.), উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.), আমর ইবন হাযম (রা.), আমর ইবনুল আস (রা.), মু’আয ইবন জাবাল (রা.), মা’ক্বিল ইবন ইয়াসার (রা.), প্রমুখ। “ড. মুস্তাফা আল আজমী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮০”।
অতএব, ইসলামে পূর্ণাঙ্গ আইন ও বিচারব্যবস্থা যেমন রয়েছে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সেই আইন প্রয়োগের নির্দেশনাও রয়েছে পবিত্র কুরআন ও হাদীসে। রাসূল (সা.) এবং সাহাবায়ে কিরাম (রা.) সেই দীনভিত্তিক আইনের সফল বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন কথা ও কাজে। প্রয়োজন মত ইসলামী আইন লিপিবদ্ধও করা হয়েছে। ফলে প্রথম শতাব্দীর মধ্যে বনী উমাইয়্যার আমলেই ফিক্হশাস্ত্রের মৌলিক গ্রন্থসমূহ প্রস্তুত হয়ে গেছে। তাই ফিক্হশাস্ত্রের ভিত্তি নিয়ে প্রাচ্যবিদ শাখত এবং তার অনুসারীদের মন্তব্য সর্বৈব মিথ্যা। রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কিরাম তথা ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে ফিক্হ বা ইসলামী আইনের অস্তিত্ব ছিল না- কথাটাও সম্পূর্ণ অসত্য।
আমাদের করণীয় : ইসলামী আইন ও ফিকহশাস্ত্রে প্রাচ্যবিদদের এসব ষড়যন্ত্রমূলক রচনা ও উক্তি মূলত ইসলামের বিরুদ্ধে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের শামিল। এ যুদ্ধে জয়ী হতে হলে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই আগাতে হবে। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালীর ভাষায়-বুদ্ধি ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে কাউকে হারাতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঐ ব্যক্তির চাইতে বেশি জানতে হবে; বরং সর্বোচ্চ জ্ঞানী হতে হবে। তখন তার বুদ্ধিবৃত্তিক ভুলগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে খন্ডন করতে পারবেন আপনি। তাই ইসলাম সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের যেসব রচনা ও গবেষণাকর্ম রয়েছে সবগুলোকে সমালোচনা করার ক্ষেত্রে। অতঃপর তাদের লেখা ও রচনায় ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকৃত ভুলগুলোকে প্রমাণ করে তা শুধরে দিতে হবে। এই বাস্তবতাকে অনেক প্রাচ্যবিদও স্বীকার করেছেন। যেমনটি করেছেন ফরাসি প্রাচ্যবিদ ম্যাকসিন রডিনসন (গধীরস জড়ফরহংড়হ)। “ড. মাহমুদ হামদী জকজুক, আল-ইসলাম ওয়াল ইস্তিশরাক, কায়রো : মাকতাবাতু ওয়াহবা, ১৯৮৪ইং, পৃ. ২৭”।
মোটকথা, ইসলামী আইন ও ফিক্হশাস্ত্র সহ ইসলাম ও মুসলমানদের বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রাচ্যবিদদের রচনা ও গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ হতে হবে। এক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীলতা একান্ত জরুরী। প্রাচ্যবিদদের লেখা ও গবেষণাকে চোখ বন্ধ করে গ্রহণ না করে; বরং ইসলামী জ্ঞানের প্রধান উৎস পবিত্র কুরআন ও হাদীস এবং অন্যান্য মৌলিক গ্রন্থসমূহের সাথে তা মিলিয়ে দেখতে হবে। ইদানীং ইসলামী আইন ও ফিক্হশাস্ত্রের প্রচুর মৌলিক বই বাংলা, ইংরেজিসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মুসলিম দেশ ইসলামী ফিক্হ বিষয়ক বিশ্বকোষও প্রকাশ করেছে। ‘‘এ ক্ষেত্রে কুয়েতের ওয়াক্ফ ও ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ৪৫ খন্ডের আল মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ অর্থাৎ ফিক্হ বিশ্বকোষ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য’’।
ইসলামী বিষয়ে পশ্চিমা অমুসলিম লেখকদের তুলনায় মুসলিম স্কলার ও বিশেষজ্ঞ লেখকদের বই-পুস্তক ও গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক্ষেত্রে মুসলিম গবেষকদের করণীয় সম্পর্কে প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ সায়্যিদ আবুল হাসান আলী (রাহ.) এর একটি উক্তি দিয়ে এই প্রবন্ধের ইতি টানতে চাই তিনি বলেন- প্রাচ্যবিদদের নেতিবাচক প্রভাব রোধ করার জন্যে এবং এই অনিষ্টের সংশোধনের জন্যে ইসলামের আলিমসমাজ, গবেষক ও চিন্তাবিদদেরকে জ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে অবশ্যই কলম ধরতে হবে। মুসলিম বিশ্বের সামনে নিশ্চিত ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সঠিক ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি তোলে ধরতে হবে। সাথে সাথে সেই প্রশংসিত দিকগুলোর প্রতিও যথাযথ যতœবান থাকতে হবে, যা প্রাচ্যবিদদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য; বরং তাদের থেকে একটু বেশি থাকতে হবে এ ক্ষেত্রে। একইভাবে মৌলিক গবেষণা, বিস্তর অধ্যয়ন, গভীর দৃষ্টিভঙ্গি, নিশ্চিত ও সঠিক সোর্স এবং শক্তিশালী প্রমাণের দিক দিয়ে তাদের লেখা ও রচনাগুলো প্রাচ্যবিদদের লেখা ও রচনার তুলনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে। এছাড়া তাদের লেখা ও গবেষণাসমূহ সব ধরনের বিশুদ্ধতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর বহনকারী হতে হবে, হতে হবে নির্ভুল যার মধ্যে জ্ঞানগত কোন ত্র“টি থাকবে না। ‘‘সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী, প্রাগুক্তা, পৃ. ২০’’।
উপসংহার : প্রাচ্যবিদদের ইসলামবিষয়ক রচনা ও গবেষণা মূলত একটি সুদূরপ্রসারী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। ইসলামের অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শরীয়া আইন ও ফিক্হশাস্ত্রে তাদের রচনা ও গবেষণাকর্মসমূহ আলোচ্য আন্দোলনে নতুনমাত্রা যোগ করেছে। এই আন্দোলনে দুয়েকজন প্রাচ্যবিদ নিরপেক্ষ থাকলেও বিপুল সংখ্যক প্রাচ্যবিদদের রচনা ও গবেষণা পক্ষপাতদুষ্ট ও ষড়যন্ত্রমূলক। বিশেষ করে কতিপয় প্রাচ্যবিদ যেমন ইগ্নায গোল্ডযিহার (ওমহধু এড়ষফরুযবৎ), (জোসেফ শাখ্ত (ঔ.ঝপযধপযঃ), (নোয়েল জি. কোলসন (ঘ.ঔ.ঈড়ঁষংড়হ), (শেল্ডন অ্যামস) (ঝযবষফড়হ অসড়ং) প্রমুখের মতামত ও মন্তব্য অত্যন্ত আপত্তিকর ও ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলামী আইন ও ফিক্হ ধর্মবহির্ভূত একটি বিষয়, এই আইনটি প্রকৃতপক্ষে রোমান আইন থেকে নেয়া এবং বর্তমান যুগে ইসলামী আইন অচল ইত্যাদি মতামতকে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ওসব বিদ্বিষ্ট প্রাচ্যবিদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, মুসলমানদের অন্তরে বিদ্যমান ইসলাম ধর্ম ও ধর্মীয় আইনের প্রভাবকে ক্ষীণ করে তোলা, দীন সম্পর্কে আধুনিক প্রজন্মকে সংশয়যুক্ত করা, সর্বোপরি ইসলামী আইনকে অন্য দশটি মানবরচিত আইনের মত করে উপস্থাপন করে আইন ও বিচার বিভাগকে ধর্মহীন বা ধর্মনিরপেক্ষ বানানোর অপচেষ্টা করা। যার অশুভ ফলাফল আমরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছি অনেক মুসলিম দেশে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভাষায় রচিত প্রাচ্যবিদদের এমনতর আপত্তিকর মতামত সম্বলিত বই-পুস্তক ইউরোপ-আমেরিকাসহ মুসলিম বিশ্বের অনেক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যভুক্ত অথবা রেফারেন্স বুক হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে।
ইসলামী আইন ও বিচারের প্রতি মুসলিম যুবসমাজের আস্থা ও বিশ্বাসে দুর্বলতা আছে। অথচ প্রাচ্যবিদদের এসব মতামত নিঃসন্দেহে পবিত্র কুরআন, হাদীস ও বাস্তবতার নিরিখে সর্বৈব মিথ্যা ও কল্পনাপ্রসূত, যা বস্তুনিষ্ঠ গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে। এতে ইসলামী আইন ও ফিক্হশাস্ত্রের মৌলিক উৎস পবিত্র কুরআন ও হাদীস সম্পর্কে তাদের সীমাহীন অজ্ঞতা যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তাদের অশুভ পরিকল্পনাও স্পষ্ট হয়ে গেছে। তাই এ সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে মুসলিম স্কলার ও গবেষকদের সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে প্রাচ্যবিদদের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবেলা করার জন্য, ইসলামী আইনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবে সুচিন্তিত গবেষণার মাধ্যমে। ইসলামী আইন ও ফিক্হশাস্ত্র নিয়ে প্রাচ্যবিদদের অপবাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে ইসলামী আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি নতুন প্রজন্মের হৃত আস্থা ও শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনতে হবে। এতে করে মানবরচিত বিচার ব্যবস্থার যাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে মানবতা যেমন সুবিচার পাবে, সমাজ থেকে দূরীভূত হবে যাবতীয় যুলুম, অন্যায় ও অবিচার।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিষ্ট। (সমাপ্ত)