বিভাগ: সাহিত্য

অপরাধী…!

নূরুদ্দীন রাসেল

পাখি উড়ে যায় আকাশে
ডানা মেলে দৃষ্টি খোলে
উড়ে উড়ে গিয়ে বসতে চায়
বটবৃক্ষের ছায়ায়।
আমি তার পানে তাকিয়ে নির্বাক
অন্তর খেয়ে, শূন্য হৃদয়ে অশ্র“ বন্যা
বয়ে যায় নিরবধি।
আমি অসফলতার দায়ে
সারাটি জীবন অপরাধী….!

অগোচরে

মিজানুর রহমান মিজান
১৯৭৬ খ্রীষ্টাব্দের ফেব্র“য়ারী মাসের তীব্র শীতের রাত। নিরব, নিথর, নির্জন পরিবেশ হলেও মাঝে মাঝে দু’একজন পথিকের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। এক বার একজনের গানের উদাস কণ্ঠ বাতাসে ভেসে গ্রামের হয়ত অনেকের কর্ণ কুহরে প্রবেশিল। দশম শ্রেণীতে পড়ি। মনোযোগের সহিত বইয়ের পাতায় চোখ আবদ্ধ। রাত তখন এগারোটা। এ সময় আমারই গ্রামের দু’জন সমবয়সী দরজায় কড়া নাড়েন। দরজা খুলতেই উভয় আমার কক্ষে প্রবেশ করে বসে পড়েন আমার চৌকিতে।
আমি জিজ্ঞেস করি তাদের আগমনের হেতু কি ? কারণ এ সময় সাধারণত: আমার কক্ষে কেহ পদার্পণ করেন না। একটা অলিখিত ও অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার সমপর্যায়ভুক্ত বিবেচনায়। ওরা মুখ খুললেন, “ আজ তোমাকে গানের আসরে নিয়ে যেতে চাই”। তখনকার দিনে পল্লীগ্রামে যাত্রাগান, বাউল গান, কিচ্ছা ইত্যাদির বহুল প্রচলন ছিল। মানুষের কাজকর্মও এ মৌসুমে না থাকায় এ জাতীয় উৎসব, আয়োজনের প্রতি ঝোঁক ছিল অত্যধিক। সব বয়সের মানুষের যাতায়াত ছিল এক প্রকার বাধ্যতার তালিকায় আনন্দ উপভোগের নিমিত্তে। তখন পর্যন্ত আমি এ জাতীয় কোন অনুষ্ঠানে যোগ দেইনি। আমার ক্ষেত্রে অনেক কার্য কারণ ছিল বিদ্যমান। লেখাপড়ার দিক বিবেচনা, বয়স কম হওয়া ইত্যাদি। তদুপরি একেবারে হয়ত শূন্যের কোঠায় উপস্থিতির হার থাকতো না যেহেতু গ্রামেই বসবাস। আমার ক্ষেত্রে বাড়তি অসুবিধার কারণও ছিল যথেষ্ট। আমার পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত ও জনপ্রিয় বাউল শিল্পী। যে কারণে আমাকে হাটে-মাঠে, ঘাটে লোকে দেখলেই বলতেন, আমি একজন নামী বাউল হবো। কিন্তু জানি না মহান আল্লাহর কি ইচ্ছা ? এ ব্যাপারে কোনদিন আমি ভাবিনি, ছিল অনাগ্রহতা, অনিচ্ছা। ফলে আমি এ সব ক্ষেত্রে উপস্থিত হতে আমার ভয়, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব ও জড়তা ছিল প্রবল। একদিনের উপস্থিতি যে কেহ দেখলেই জনমুখে রটে যাবে ভবিষ্যৎ বাণীর সম্ভাব্যতার শত ভাগ সত্যতা। এমনিতেই আমি এ ব্যাপারে মানসিক যন্ত্রণার ভার বয়ে বেড়াচ্ছিলাম অহরহ। শেষ পর্যন্ত ওরা জানান দিলেন আজ আমাকে ওরা নিয়েই যাবে এ প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ।
অনেকক্ষণ আমার না সূচক জবাব এবং তাদের নিয়ে যাবার সাধাসাধিতে চলে কথোপকথন। দু’জনের সাথে একা পেরে উঠা সম্ভব হচ্ছিল না। আমার বইপত্র, লেপ-তোষক, বালিশ পর্যন্ত গাট্টি বেঁধে আমাকে অসহায় করে ফেলে। কি আর করা।
নিরুপায় হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মত হলাম। তবে আমার কথা ছিল তাদের নিকট আমাকে অত্যন্ত সংগোপনে এবং সতর্কতার সহিত অনুষ্ঠান শুনিয়ে, দেখিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ওরা আমার সকল প্রকার শর্তে একবাক্যে সম্মত। যেহেতু তাদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল আমাকে নেয়া। কিন্তু তাদের এ প্রতিজ্ঞার কথা জানা ছিল না আমার ঘুণাক্ষরে।
কক্ষটি বাহির দিকে তালাবদ্ধ করে জীবনে প্রথম বারের মত চলি মাইল দেড়েক দূরবর্তী গ্রামে কিচ্ছা বলার আসরে। রাস্তায় আরো ও শর্ত ছিল আমার পক্ষ থেকে আরোপিত, কঠোর গোপনীয়তাসহ অনুষ্ঠান শেষ হবার নিদেন পক্ষে ঘণ্টাখানেক পূর্বে রওয়ানা দিয়ে চলে আসার।
অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছেই যা ছিল লক্ষণীয়Ñতাহলো আমার পিতার উপস্থিতি অনুষ্ঠানের কেন্দ্রস্থলে এবং আমার বড় ভাই (চাচাতো) তাঁরা দর্শক সারিতে যত্রতত্র দন্ডায়মান। পরবর্তীতে এলাকার সচেষ্টজনদের উপস্থিতি যা পূর্বেই অনুমেয় ছিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত আমি আত্ম-গোপনের প্রচেষ্টা চালাই সাধ্যমত। অনুষ্ঠান ছিল একটি বাড়ির বড় উঠানে। পূর্বের ভিটায় গৃহ শূন্যতায় পুকুর ঘাটের এলাকা পর্যন্ত ছিল অবারিত। ঘাটের পশ্চিমে ছিল প্রকান্ড কাঁঠাল গাছ তির্যক ভাবে দাঁড়িয়ে। আমি ঐ গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলাম। সঙ্গিরা চলে গেলেন আমার নিরাপদ অবস্থান অনুসন্ধান কার্যে। চল্লিশ মিনিটের মত সময় অতিক্রান্ত। তাদের ফিরে আসার কোন লক্ষণ নেই। বরং আমার দৃষ্টিতে স্পষ্ট ওরা এক স্থানে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠানের দর্শক সেজে নির্বিঘেœ উপভোগে মত্ত। আমি আশার হাল ছাড়িনি। হয়ত এক্ষুনি চলে আসবে এ প্রত্যাশায়। ইতিমধ্যে বাড়ির অপর গৃহের একজন মহিলার দৃষ্টিতে আমার উপস্থিতি ধরা পড়ে যায়। ঐ মহিলা পাম্প লাইটের আলোতে আমাকে দেখে ফেলেন। ছোট একটি কিশোরীকে কুপি বাতি হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দেন আমার কাছে। কিশোরীর আগমন লক্ষ্য করেই আমার মনে ভয়ের উদ্রেক হয়। অনুষ্ঠানের আনন্দ উপভোগে সকলেই মগ্ন হলে ও কিশোরীর আগমনে কেউ না কেউ অবশ্যই লক্ষ্য করবে। আর তা থেকে আমার ধরা পড়া সুনিশ্চিত। তথাপি মনে সাহস সঞ্চার করে অপেক্ষমান থাকি গাছের আড়ালে গুটিশুটি মেরে। কিশোরী নিকটে এসে জিজ্ঞেস করে আপনি কে, কোথায় বাড়ি, এখানে একা কেন বসে আছেন ইত্যাদি।
প্রত্যুত্তরে আমি কিশোরীকে শান্তশিষ্ট ভাবে আমার অসুবিধা বলে বিদায় করতে সক্ষম হই। মহিলার নিকটবর্তী হতেই কি জানি কি বলে আবার আমার কাছে পাঠানো হচ্ছে দেখে ঐ স্থানে বসে থাকা আমার পক্ষে নিরাপদ নয় বলেই দ্রুত স্থান ত্যাগ করি। তাছাড়া এতক্ষণে মশার কামড়ে গায় জ্বালা ধরে গেছে। সব কিছু বিবেচনায় উত্তরমুখী হয়ে হাঁটতে থাকি। কিয়ৎ অগ্রসর হবার পর বিদঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। এক সময় অজানা, অচেনা স্থানের অনুমান বা ঠাহর হচ্ছিল না। পা ফেলতেই ফসকে পড়ে যাই প্রায় ২/৩ হাত নীচু খালে। খালের কাদায় জুতো, কাপড়-চোপড়ের অবস্থা শোচনীয়। কোন মতে আন্দাজে হাঁটতে থাকি পূর্বমুখী হয়ে। অনেক কষ্টে এক সময় পেয়ে যাই পতিত জমি। একটু স্বস্তির নি:শ্বাস নেই এবং পরিষ্কার হবার চেষ্টা করি। অগ্রহায়ণ মাসের ফসল উত্তোলনের পর গ্রামের জমিগুলি থাকে শুষ্ক ও ফাঁকা। যেদিক ইচ্ছা চলাফেরার থাকে অবাধ সুবিধা। সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে চারিদিক থেকে লোক আগমন তখন ও ছিল বিদ্যমান। ২/৩ জনের একটি দল আসার লক্ষণ দেখেই আমি হাঁটতে থাকি বিপরীতমুখী হয়ে তথা আমার গ্রামের দিকে। তাদের প্রত্যেকের হাতে টর্চ লাইটের আলো ফেলে লক্ষ্যস্থলের দিকে এগুচ্ছিল। হঠাৎ একজন আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করে “কে”? আমি চাদর দিয়ে মুখ চেপে জবাব দেই “আমি ” কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালিয়ে। তাদের আবারো জিজ্ঞাসা “আমি কে”? পূর্ণ পরিচিতির নিশ্চয়তা চায়। আমার সকল প্রকার সাধনা ব্যর্থতায় হবে পর্যবেশিত ওরা পরিচয় পেলেই। সুতরাং আমি প্রাণপণে শুরু করি দৌড়। ওরা সকলেই ছুটে ধর ধর বলে আমার দিকে। একটির পর একটি লাইটের আলো আমার উপর পতিত হওয়ায় রাস্তা চলা আমার সহজ হয়ে যায়। এক সময় বিরক্ত হয়ে ওরা দৌড় থামায়। ততক্ষণে আমি গ্রামের নিকট এসে গেছি। নিরাপদ স্থান দেখে বসে বিশ্রাম নেই কিছুক্ষণ। বাড়িতে এসে কাপড় পাল্টিয়ে দেই নির্বিঘেœ ঘুম।
পরদিন বেলা ৯ ঘটিকায় আসে খোঁজ নিতে সঙ্গিদ্বয়। অনেক প্রকার ভনিতার আশ্রয় নেয় আমাকে সন্তুষ্টি প্রদানের। কিন্তু সত্য তার আপন মহিমায় সুপ্রতিষ্ঠিত। যতই ছলচাতুরী, মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হোক না কেন ? হয়ত সময়ের ব্যবধানে হেরফের হতে পারে। সত্যের স্বপদে প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত। অনেকটা প্রশ্নোত্তরে ধরা পড়ায় ওদের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। আমি এ দিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্মৃতির পশরায় জাগ্রতবোধে থাকি বিরত। আর কখনও এ জাতীয় লোকের সঙ্গে চলা থেকে থাকি সদাসচেতনতায় সচেষ্ট। পরবর্তী সময় দু’একদিন এ ধরণের অনুষ্ঠানে যাবার সৌভাগ্যে উপনীত হয়েছি, তবে সঙ্গিবিহীন। একা একা নীরবে হত গমন এবং অনুষ্ঠান শেষ হবার অনেক আগে ফিরে এসেছি সংগোপনে। ঘুণাক্ষরেও কেহ ঠাহর করতে পারেননি বা আমার যাত্রা থেকেছে সকলের অগোচরে, অলক্ষ্যে।

জেসমিন জুঁই-৪

জালাল আহমেদ জয়

শিহরিত মুহূর্তে
ছুঁয়ে  যাও যখন
বিজয়ের নিশানে
হেসে যাও তখন।

আলোভরা চোখেতে
চেয়ে থাকো যখন
বুক কেটে রক্ত
ভেসে যায় তখন।

হাসিভরা মনেতে
হাসো তুমি যখন
সুখে-দুঃখে দুটি মন
এক হয় তখন।

আহবান ছড়িয়ে দিতে

নেছার আহমদ নেছার

হে প্রিয় সাথী তোমার পথ চলায়
তোমার প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিতে চায় চিরতরে-
শোষক বেনিয়া স্বার্থান্বেষী মানুষের স্বার্থের ভূতটা।
প্রতিদিন জীবন চলার শত ঘটনার মাঝে
ওরা তোমাকে ধ্বংস করে দিতে চায়;
অসহ্য ওদের তোমার অস্তিত্ব, তোমার স্পর্শতা।
ওদের দুর্নীতির দ্বিচারণ ভূমি এটা
সাধু আর অসাধু ছলনা-চাতুরীর মাঝে
সৎ অসতের খেলা- ফন্দি ও ধান্দাবাজীর
উৎকট রহস্য।
সমাজ আত্মার প্রাণশক্তিটুকুও ওরা
কেড়ে নিতে চায় ওদের মুঠিতে
যেমন ইচ্ছে তেমনি ব্যবহারে অন্ধ অভিলাষ।
মানবতার সুকোমল অনুভব নেই
হৃদয়ের টানে হৃদয়ের মূল্য নেই,
স্বার্থের টানে তুচ্ছ মানব সত্ত্বা।
ও-রা হে সাথী তোমাকে দুনিয়া থেকে
সরিয়ে দিতে চায়- তাই তুমি সাবধান-
একটু সতর্কতা তোমার আজ বড় প্রয়োজন।
আজকাল বড় বেশী প্রয়োজন তোমাকে বেঁচে থাকা,
এ সমাজ বৃক্ষের মানবীয় শান্তির ছায়াতলে মাথা রেখে
মানবীয় জাগরণের আহবান ছড়িয়ে দিতে।

বেকারত্বের ফাঁস

সৌমেন কুমার

প্রতিদিন করি হাপিত্তাশ
সুখ যত হচ্ছে নাশ,
হয়ে আছি জীবন্ত লাশ
কষ্টে যায় দিন আর মাস।

ক্রমে যাচ্ছি হয়ে ভাজ ভাজ
সবাই করে ফিসফাস,
করতে হবে হয়ত চাষবাস
কি হলো করে পাশ !

ভেঙে চুরমার সব বিশ্বাস আর
সুন্দর স্বপ্নবিন্যাস,
দগ্ধ আজ জীবন উপন্যাস
হয়ে গেছি সন্ন্যাস।

ভুলে গেছি কি ঐ বিকাশ
জগত যেন বোগাস,
শেষ সম্বল শুধু দীর্ঘশ্বাস
আর বেকারত্বের ফাঁস।