কাজির বাজার ডেস্ক
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই এবার নতুন করে যুক্ত হলো যুক্তরাষ্ট্রের নাম। সোমবার (১৬ জুন) ইরান দাবি করেছে যে তারা একটি অত্যাধুনিক মার্কিন গছ-৯ ড্রোন গুলি করে ভ‚পাতিত করেছে। ইরানের আকাশসীমায় মার্কিন ড্রোনের উপস্থিতি স্বভাবতই নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কি এবার সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে?
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী সফলভাবে মার্কিন গছ-৯ ড্রোনটিকে ভ‚পাতিত করেছে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন তাৎক্ষণিকভাবে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েক দিন ধরেই পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন ড্রোন ভ‚পাতিত করার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এই দাবি সত্য হয়, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি তবে ইরানকে কাবু করতে ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরাসরি হামলার পথ বেছে নিচ্ছেন? এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেদিকেই এখন সবার নজর।
ইরান ও ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান হামলা-পাল্টা হামলার গত চার দিনে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে অন্তত ৩৭০টি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং শত শত বিস্ফোরকবাহী ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। এতে ইসরাইলের অন্তত ৩০টি সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সোমবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে প্রকাশ করা এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক দুই প্রতিদ্ব›দ্বী ইরান ও ইসরায়েলের মাঝে টানা চতুর্থ দিনের মতো হামলা-পাল্টা হামলা চলছে। ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় শুক্রবার ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা তৈরি করেছে। আঞ্চলিক এই সংঘাতে বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলোও জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইসরাইলে নিহত হয়েছেন ২৪ জন এবং আহত হয়েছেন আরও ৫৯২ জন। আহতদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কা জনক।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পূর্ণ প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি নিয়ে কোনো আলোচনা নয়-এমন কড়া বার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, হামলা অব্যাহত থাকলে কোনো মধ্যস্থতা কিংবা আলোচনা ইরানের পক্ষে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’। রোববার (১৫ জুন) বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও ওমানকে এই অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে তেহরান।
রয়টার্সকে এক ইরানি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা কাতার ও ওমানকে পরিষ্কার করে জানিয়েছি, প্রথম হামলার সম্পূর্ণ প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা হবে না।” এর আগে ইসরায়েলের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, ইরান যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে কাতার ও ওমানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। তবে এই তথ্যকে ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এ অবস্থান যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা আরও বাড়াবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করবে। হামলা-পাল্টাহামলার চতুর্থ দিনে এসে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইসরাইলি বিমানবাহিনী তেহরানের আকাশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ইসরাইল। সোমবার ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলের তেল নোফ বিমানঘাঁটি পরিদর্শনে গিয়ে এই দাবি করেছেন তিনি।
ইসরাইলি গণমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার মধ্যাঞ্চলীয় তেল নোফ বিমান ঘাঁটি পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ও চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির।
ঘাঁটিতে সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেন, ইসরাইলের বিমানবাহিনী ‘তেহরানের আকাশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।’ নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা পরমাণু ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি নির্মূল করার দুটি লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছি।’
তেহরানের বাসিন্দাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তেহরান ত্যাগ করুন। আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।’
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তেহরানের আকাশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় আমরা এখন সেসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছি; যা ইরানি শাসকগোষ্ঠীর। এর বিপরীতে ইরানের অপরাধী শাসকগোষ্ঠী আমাদের সাধারণ নাগরিকÑশিশু ও নারীদের হত্যায় মেতে উঠেছে।’
তিনি বলেন, ‘ইসরাইল তেহরানের সাধারণ মানুষকে আগেভাগেই রাজধানী ত্যাগ করার আহŸান জানিয়েছে। কারণ ইসরাইলি বিমানবাহিনী রাজধানীর নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করছে।’
বিমান ঘাঁটিতে সৈন্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের ধন্যবাদ। সৃষ্টিকর্তার সহায়তায় আমরা ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করবো এবং সফল হবো। আমাদের বিজয় না হওয়া পর্যন্ত এগিয়ে যাবো।’
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত দেশটিতে অন্তত ২২৪ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানের হামলায় ইসরাইলে কমপক্ষে দুই ডজন নিহত ও আরও অনেকেই আহত হয়েছেন।
ইসরায়েলের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় রাজধানী তেহরানে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, প্রাণ বাঁচাতে হাজারো মানুষ শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে।
তেহরানের পেট্রল পাম্পগুলোতে ছিল দীর্ঘ লাইন, যেখানে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন ঘর ছাড়তে প্রস্তুত বাসিন্দারা।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা সংবাদমাধ্যমকে জানান, “মানুষজন চরম আতঙ্কে ভুগছে। প্রতিটি পেট্রল পাম্পে উপচে পড়া ভিড়, সবাই দ্রæত নিরাপদ স্থানে যেতে চাইছে।”
পেট্রল পাম্পে জ্বালানির স্বল্পতাও চোখে পড়ছে। অনেকেই অভিযোগ করছেন, চাহিদামতো পেট্রল পাওয়া যাচ্ছে না। আরেকজন বাসিন্দা হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “রাজধানীতে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। যদি হামলা হয়, আমরা কোথায় যাব?”
তেহরানের অধিকাংশ বাসিন্দা উত্তর দিকের গ্রামীণ এলাকাগুলোকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করে সেদিকেই ছুটছে। কিন্তু এই গণপলায়নের কারণে মহাসড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে, যা চলাচলকে অত্যন্ত ধীর ও কষ্টসাধ্য করে তুলেছে।
ইসরায়েল তাদের অস্ত্র কারখানার আশেপাশে বসবাসকারী ইরানিদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে অনুরোধ জানিয়েছিল। একই দিনে ইরানও ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বৈজ্ঞানিক স্থাপনার আশেপাশে বসবাসকারী ইসরায়েলিদের সরে যাওয়ার অনুরোধ জানায়, যা উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।
রয়টার্স-এর প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, আহত ও আতঙ্কিত বহু মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। এই সংঘাতে নিহতদের বেশিরভাগই সাধারণ বেসামরিক নাগরিক, যা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
এদিকে, ইসরায়েলের বন্দরনগরী হাইফায় ইরানের হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তেল আবিব থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের এই শহরটিতে হামলার খবর নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম।
তারা জানিয়েছে, হামলার শিকার এলাকাগুলোতে ভয়াবহ আগুন দেখা যাচ্ছে। ইরানের এই সর্বশেষ হামলার পর ইসরায়েলের জরুরি সেবার কর্মীরা দ্রæত উদ্ধার ও ত্রাণ কাজে নেমে পড়েছেন। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, সোমবার ভোরে ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার উদ্দেশ্যেই ইসরায়েল ইরানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
এর আগে, তেহরানে ইসরায়েলের হামলায় ইরানের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান, তার একজন সহকারী এবং একজন কমান্ডারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে ইরান।
ইরানের হামলায় ইসরায়েলে মোট আটজন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে হাইফা শহরেই সাতজন প্রাণ হারিয়েছে। এই চলমান সংঘাত দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে এসেছে।
সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী ইরান এখন পর্যন্ত ইসরায়েলে প্রায় ৩৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ধাপে ধাপে ছোড়া প্রতিটি ঝাঁকে প্রায় ৩০ থেকে ৬০টি করে মিসাইল ছিল।
সোমবার (১৬ জুন) ইসরায়েলি বাহিনীর সবশেষ আপডেটের বরাতে আল জাজিরার লাইভ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী আরও জানিয়েছে, ইরানের হামলায় নিহতের সংখ্যা ২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই আশ্রয়কেন্দ্রে ছিল না।
ইরনা নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ১৩ জুন রাতভর ইসরায়েল বিনা প্ররোচনায় আগ্রাসন চালিয়ে ইরানের ভ‚খÐের ভেতরে আবাসিক ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা শুরু করে।
আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় ইরান কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই ইসরায়েলের গভীরে শাস্তিমূলক হামলা চালিয়ে আসছে। তেল আবিব, জেরুজালেম এবং হাইফাসহ অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন দিয়ে আঘাত করছে।
ইরনা জানিয়েছে, অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। ইসরায়েলিরা ভ‚গর্ভস্থ বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছে।



