সংবাদ সম্মেলনে নতুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের হুঁশিয়ারি ॥ ছাত্রলীগের ব্যানারে চাঁদাবাজী ও টেন্ডারবাজিতে জড়িত থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা

16

কাজিরবাজার ডেস্ক :
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে ছাত্রলীগের বিতর্কিত শীর্ষ নেতৃত্বের অপসারণে দীর্ঘদিন পর স্বস্তি ফিরেছে ছাত্রলীগে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের স্বাগত জানিয়েছে সকলেই। সব বিরোধ ভুলে আনন্দ মিছিল করেছেন নেতাকর্মীরা। আন্দোলনকারী পদবঞ্চিত ছাত্র নেতারাও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এদিকে চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ মেনে সংগঠনকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেছেন নতুন শীর্ষ দুই নেতা আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য।
এর আগে শনিবার রাতেই ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে বিতর্কিত কর্মকা- ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে অব্যাহতি দেয়া হয়। তাদের পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে বর্তমান কমিটির এক নং সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং এক নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। শনিবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভা থেকে বের হয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
এ ঘোষণার পর ভারপ্রাপ্ত শীর্ষ দুই নেতা রাত একটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গেলে নেতাকর্মীরা তাদের স্বাগত জানিয়ে আনন্দ মিছিল করেন। রবিবার দুপুরে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রথমবারের মতো মধুর ক্যান্টিনে যান জয়-লেখক। দুপুর একটার দিকে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা। এসময় তাদের পাশে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন। এসময় বহুদিন পর মধুর কেন্টিনে কেন্দ্র ও ঢাবি নেতৃবৃন্দকে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থানে দেখা যায়। স্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা যায় বিভিন্ন পদের নেতাকর্মীদেরও।
আজ সোমবার ধানম-ির ৩২ নম্বরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবেন জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ছাত্রলীগকে পরিচালিত করব। তিনি যেভাবে বলবেন ঠিক সেই ভাবে ছাত্রলীগ চলবে। ছাত্রলীগের লেবাসে চাঁদাবাজিতে জড়িত ব্যক্তিদের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং তারা যদি ছাত্রলীগের সুনাম নষ্ট করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আগামী দশমাসের মধ্যে সবগুলো কমিটি তৈরি করে একটি সুন্দর সম্মেলন উপহার দিতে হবে। ছাত্রলীগকে নিয়ে যাতে সাংবাদিকরা কোন নেতিবাচক প্রশ্ন করতে না পারেন, আমরা সেই পর্যায়ে ছাত্রলীগকে নিয়ে যাব। এটা বাস্তবায়ন করতে পারলে আমরা খুশি থাকব।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা ছাত্রলীগকে একটা ব্যানারের নিচে দাঁড় করাতে চাই। একটা ব্যানারের নিচে হবে ছাত্রলীগ। এখানে অমুকের তমুকের ছাত্রলীগ বলে কিছু নেই। ছাত্রলীগ একটাই সেটা হচ্ছে শেখ হাসিনার ছাত্রলীগ।
তিনি বলেন, আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে সেগুলো ওভারকাম করা। তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসছে, সেগুলো যেন আমাদের বিরুদ্ধে না আসতে পারে।
ত্যাগী পদবঞ্চিতদের বিষয়ে তিনি বলেন, শোভন-রাব্বানীর কমিটিতে যারা কাজ করেছে তারাও ভাল কাজ করেছে। তবে যেহেতু কিছু অভিযোগ এসেছে আমরা সেগুলোর পুনর্ব্যক্ত হতে দেবনা। যারা ছাত্রলীগের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছে তাদের কাউকে বঞ্চিত করা হবে না।
এদিকে শোভন-রাব্বানী নেতা হওয়ার পর ছাত্রলীগের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যে দূরুত্ব সৃষ্টি হয়, নতুন নেতৃত্ব আসায় তাদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতারাও নেত্রীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে নতুন নেতৃত্বকে অভিন্দন জানায়। রবিবার বিকেল তিনটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে আসেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জয়। সেখানে ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসের সঙ্গে কোলাকুলি করেন তিনি। সেখানে থাকা ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত আন্দোলনকারী নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। ফলে ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে আবারও একতা ফিরে আসে। বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছেন সকলেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস বলছিলেন, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তাতে সংগঠনের প্রতিটি নেতাকর্মী সন্তুষ্ট। যার প্রতিফলন আজকে ক্যাম্পাসেও দেখা যাচ্ছে। যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পছন্দের নেতা। যারা দিনের পর দিন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, আগে যারা নেতৃত্বে ছিলেন তাদের ভুলের কারণে সংগঠনের যে ক্ষতি হয়েছে নতুন নেতৃত্ব সেই ক্ষতি সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জয় বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুর ইউনিয়নের ঠাকুরমল্লিক গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আলী খানের ছেলে। বরিশাল জেলা স্কুলে মাধ্যমিক ও ঢাকা কমার্স কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন তিনি। বর্তমানে তিনি ঢাবির অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্স করছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ছাত্রলীগের উপ-আইন বিষয়ক সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ছাত্রলীগের বিগত কেন্দ্রীয় কমিটিতে আইন সম্পাদক হিসেবে এবং বর্তমান কমিটিতে জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
লেখক ভট্টাচার্য বাড়ি যশোরের মনিরামপুরে। যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ২০০৮-২০০৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ভর্তি হন তিনি। বর্তমানে তিনি এই বিভাগেই অধ্যয়নরত আছেন তিনি। লেখক অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
এদিকে ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানীকে গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। রবিবার দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে ডাকসু ভবনের সামনে তারা এই বিক্ষোভ মিছিল করে। বিক্ষোভকারীরা বলেন, আমাদের দাবি অনতিবিলম্বে এই চাঁদাবাজ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ডাকসুর জিএসের পদত্যাগ। যিনি দল থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এ রকম একজন ডাকসু জিএস কে আমরা চাই না। এ সময় তারা ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে ঢাবির সিনেট থেকে অপসারণের দাবি জানায়।