পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
‘নাফাকাতুন’ পরিভাষাটির সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি পরিভাষা হলো ‘আল-‘আতা’ অর্থাৎ বৃত্তি, অনুদান। রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান হতদারদের জন্য বায়তুলমাল থেকে যা নির্ধারণ করেন তাকে আলÑ‘আতা বা বৃত্তি বলা হয়। ‘নাফাকাহ’ ও ‘আতা’Ñ এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে ‘নাফকাহ’ শরী‘আহ কর্তৃক র্ধায হয়, আর ‘বৃত্তি’ রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কর্তৃক ধার্য হয়। “আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.২, পৃ.১০৪”। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে আল্লাহ তাকেযা দান করেছেন তা হতে দান করবে। “আলÑকুরআন, ৬৫:০৭”। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: পিতার কর্তব্য যথাবিধি তাদের ভরণ-পোষণ করা। “আলÑকুরআন, ০২:২৩৩”।
আইনের ৩নং ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতাÑমাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোন পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে তারা আলোচনার মাধ্যমে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিশ্চিত করবেন এবং তা নিশ্চিত করার জন্য সন্তানদেরকে তাদের পিতা-মাতার সাথে একসঙ্গে এবং একস্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৩”।
আইনের ৩নং ধারার (৪) এ বলা হয়েছে, পিতা-মাতাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধ নিবাসে বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না কিংবা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না। ধারা ৩ (৪) নং উপধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তান তাঁর পিতাÑমাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করবে। ৩নং ধারার (৬)নং উপধারায় বলা হয়েছে, পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে সন্তান থেকে পৃথক বসবাস করলে সেক্ষেত্রে তাদের সাথে নিয়মিত সাক্ষাৎ করতে হবে।
আইনের ৩নং ধারা এর (৭) নং উপধারায় বলা হয়েছে যে, পিতা-মাতা সন্তানদের সাথে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে সে ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তান তার মাসিক বা বাৎসরিক আয় হতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা বা ক্ষেত্র হিসেবে উভয়কে নিয়মিতভাবে প্রদান করবে।
উল্লিখিত আইনের ৩ নং ধারায় ১ থেকে ৭ পর্যন্ত মোট সাতটি উপধারায় ভরণ-পোষণের বিস্তারিত দিক নির্দেশনা ও ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। যথা পিতা-মাতা ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা, একাধিক সন্তানের ক্ষেত্রে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা, বৃদ্ধ নিবাসে বসবাসে বাধ্য না করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করা এবং মাসিক আয় থেকে অর্থ প্রদান করা।
৩নং উপধারায় পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চত করার জন্য সন্তানকে পিতাÑমাতার সাথে একইসঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙ্গে একক পরিবার প্রথা গড়ে ওঠছে। কর্মসংস্থানের তাগিদে গ্রাম অঞ্চল থেকে মানুষ শহরমুখী হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে এ দিক নির্দেশনা অনুপস্থিত। এছাড়া কর্মজীবী সন্তানদের তাদের পিতাÑমাতার সাথে একই স্থানে বসবাস করার বিধান বাধ্যতামূলক করা হলে তা নতুন জটিলতা তৈরি করবে। উপেক্ষা নয়; সম্মান ও সহানুভূতি বজায় রেখে পিতাÑমাতাকে তাদের পছন্দনীয় আবাসস্থলেই রাখা বেশি কল্যাণজনক হবে।
৭নং উপধারায় বলা হয়েছে, পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে সন্তানের সাথে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে সে ক্ষেত্রে সন্তান তার দৈনন্দিন আয় রোজগার বা মাসিক আয় বা বার্ষিক আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা-মাতাকে প্রদান করবে। এ ধারায় ‘যুক্তিসঙ্গত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে; কিন্তু এর সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। ২নং ধারায় ‘ভরণ-পোষণ’ বলতে খাওয়-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধার কথা বলা হয়েছে। ৭নং উপধারায় বর্ণিত ‘যুক্তিসঙ্গত’ অর্থ দ্বারা ২নং ধরার ‘ভরণ-পোষণ’ সম্পন্ন হবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ দ্বারা ভরণ-পোষণ সম্ভব না হলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে অথবা সন্তানের আয় দ্বারা তার নিজেরই খরচ সংকুলান না হলে অথবা সন্তান নিজেই যদি পিতা-মাতার উপর বোঝা হয়ে থাকেন তাহলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, এর দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করা হয়নি।
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমি মানুষদের এই মর্মে নির্দেশ দিয়েছি যে, তারা যেন পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে। তার মা কষ্ট করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্ট করেই তাকে প্রসব করেছে। তাকে গর্ভে ধারণ ও দুধপান করাতে ত্রিশ মাস লেগেছে। এমন কি যখন সে পূর্ণ যৌবনে পৌঁছেছে এবং তারপর চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হয়েছে তখন বলেছে: “হে আমার রব, তুমি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে যেসব নিয়ামত দান করেছো আমাকে তার শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক দাও। আর এমন সৎ কাজ করার তাওফীক দাও যা তুমি পছন্দ করো। আমার জন্য আমার সন্তানদেরকে সৎ বানিয়ে আমি তোমার কাছে তাওবা করছি। আমি নির্দেশের অনুগত (মুসলিম) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। “আল-কুরআন, ৪৬;১৫”।
আলোচ্য আয়াতে ওসিয়ত শব্দের অর্থ তাকীদপূর্ণ নির্দেশ এবং ইহসান অর্থ সদ্ব্যবহার। এর মধ্যে সেবা-যতœ, আনুগত্য, সম্মান ও সস্ত্রম প্রদর্শনও অন্তর্ভুক্ত। ‘কুরহুন’ শব্দের অর্থ সে কষ্ট যা মানুষ কোন কারণবশত সহ্য করে থাকে অথবা যে কষ্ট সহ্য করতে অন্য কেউ বাধ্য করে। এ বাক্যটি প্রথম বাক্যেরই তাকীদ। “মুফতী মুহাম্মদ শাফী রহ. তাফসীরে মা‘আরেফুল কুরআন, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (মদীনা মুনাওওয়ারাহ: বাদশাহ ফাহাদ মুদ্রণ প্রকল্প, ১৪১৩ হি.), পৃ. ১২৪৯”। অর্থাৎ পিতা-মাতার সেবা-যতœ ও আনুগত্য জরুরী হবার কারণ এই যে, তারা তোমাদের জন্য অনেক কষ্টই সহ্য করেছেন। এই আয়াতে আরেকটি বিষয়ের প্রতি ইংগিত রয়েছে, তা হলো মাতার হক পিতার অপেক্ষা বেশি, যা আমরা হাদীস থেকে প্রমাণ পাই। আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স.) এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার উত্তম সাহচর্যের অধিকতর হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে পুনরায় বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, এরপরেও তোমার মা। সে বলল, অত:পর কে? তিনি বললেন, অত:পর তোমার পিতা। “ইমাম বুখারী, আল জামি‘ আস সহীহ, কিতাবুল আদব, বাবু মান আহাক্কান নাসি বিহুসনিস সুহবাহ, হাদীস নং ৫৬২৬”।
পিতা-মাতার সেবা করা এবং তাদের অনুগত হওয়ার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, যার মাধ্যমে জান্নাতের পথ সুগম হয়। অন্যদিকে তাদের অধিকার পদদলিত কিংবা অবহেলিত হলে তাদের অসন্তুষ্টির কারণে জাহান্নামের রাস্তাও খুলে যেতে পারে। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ। তাদের আনুগত্য করলে আল্লাহর নির্দেশ পালন করা হয়। এর জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে অনেক কল্যাণ ও সওয়াব রয়েছে। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের ইহকালীন ও পরকালীন উভয় গুরুত্ব রয়েছে। এ জন্য রাসূলুল্লাহ (স.) এর একটি হাদীসে এসেছে, ইবনে উমার (রা.) বলেন, (কারো প্রতি তার) পিতা সন্তুষ্ট থাকলে প্রভুও তার প্রদি সন্তষ্ট থাকেন এবং তার পিতা অসন্তুষ্ট থাকলে প্রভুও অসন্তষ্ট থাকেন। “ ইমাম বুখারী. আল-আদাবুল মুফরাদ, অনুবাদ: মুহাম্মদ মূসা (ঢাকা: আহসান পাবলিকেশন্স, ২০০১), অনুচ্ছেদ: কওলুহু তা‘য়ালা: ওওয়াস-সাইনাল ইনসারনা বি ওয়লিদাইহি ইহসানা, পৃ.৩৩, হাদীস নং ২”।
আইনের ৪ নং ধারায় পিতার অবর্তমানে দাদাদাদীকে এবং মাতার অবর্তমানে নানানানীকে ভরণÑপোষণের কথা বলা হয়েছে এবং তাদের এই ভরণ-পোষণ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ হিসেবে গণ্য হবে। “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩, ধারা-৪”।
আইনের ৪নং ধারায় পিতার অবর্তমানে দাদাদাদীকে এবং মাতার অবর্তমানে নানানানীকে ভরণ-পোষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোন সন্তানের পিতা ও দাদা একইসাথে বর্তমান থাকাবস্থায় পিতা অক্ষম বা অবসর জীবনযাপন করলে কিংবা পিতা আয় করতে সক্ষম না হলে উক্ত সন্তানের উপরই তার পিতা ও দাদার দায়িত্ব একই সাথে বর্তাব্ েকিনা তা বলা হয়নি। আর যদি এ অবস্থায় পিতা ও দাদার দায়িত্ব বর্তায় তাহলে তার উপর একাধিক দায়িত্ব বর্তাবে। তা পালনে সে সক্ষম না হলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তা উল্লেখ করা হয়নি।
জমহুর ফকীহ (হানাফী, শাফিঈ, হাম্বলী)Ñএর মতে, পৌত্র ও পৌত্রির উপর দাদার ভরণ-পোষণ দেয় ওয়াজিব। তিনি পিতার দিক থেকে (দাদা) হোন কিংবা মাতার দিক থেকে (নানা)। ওয়ারিস সহ বা না হন এবং অন্য ধর্মের অনুসারী হলেও। যেমন পৌত্র মুসলিম ও দাদা কাফির অথবা দাদা মুসলিম ও পৌত্র কাফির। কেননা আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আর পৃথিবীতে তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।’ “আলÑকুরআন, ৩১:১৫”। তাদের প্রয়োজন পূরণ করা সদ্ভাবে জীবনযাপনের অংশ। হাদীসে এসেছে, ‘নিশ্চই তোমাদের সন্তানগণ তোমাদের সর্বোত্তম উপার্জন। সুতরাং তোমাদের সন্তানদের উপার্জন ভক্ষন করো। “আবু দাউদ (সম্পা.ইজ্জত উবাইদ দা‘আস) খ.৩, পৃ.৮০১, ইবনে মাজাহ (সম্পা.আলা হালাবী)( খ.২, পৃ.৭৬৯, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা-এর হাদীস থেকে উদ্ধৃত করেন। আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১, পৃ.৯৮”। উপরন্ত, দাদা পিতার সাথে সংযুক্ত, যদিও তিনি পিতা শব্দের আওতাভুক্ত নন। আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খ.১, পৃ.৯৮”। (অসমাপ্ত)