বিভাগ: সম্পাদকীয়

বাজার নিয়ন্ত্রণে তদারকি

যেকোনো অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে অনৈতিক মুনাফা অর্জন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রায় সব ঋতুতেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো হয়। উৎসবের সময় এলেও জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে হঠাৎ করেই বাড়তে শুরু করেছে ডিমের দাম। অথচ প্রান্তিক খামারি বা উৎপাদনকারীরা এর সুফল পাচ্ছে না। যখন খুচরা বিক্রেতারা হালিতে আট টাকা লাভে ডিম বিক্রি করছে, সেখানে একজন খামারি বা প্রান্তিক উৎপাদনকারীকে মাত্র ৫০ পয়সা লাভে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারি বাজারের চেয়ে খুচরা বাজারে ডিমের দাম অনেক বেশি। পাইকারি বাজারে ৩০ টাকা হালি দরে বিক্রি হওয়া ডিম খুচরা বিক্রেতারা বিক্রি করছে ৩৮ টাকা দরে। এ কথা ঠিক যে ডিমের উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে। ফলে খামারিদের অনেকেই ডিম উৎপাদন থেকে সরে এসেছে। এতে ডিমের উৎপাদন কমেছে। কিন্তু এতে এমন কিছু ঘটেনি যে বাজারে ডিমের দাম এতটা বেড়ে যাবে। আসলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণেই ডিমের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। শুধু ডিম নয়, ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়েছে বাজারে। সামনে ঈদ। এই সময় নতুন করে মসলার বাজার অস্থির হতে পারে বলে অনেকের ধারণা।
যেকোনো ছুতায় বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেওয়া যেন ব্যবসায়ীদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এটাই যেন অলিখিত নিয়ম এখন। পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে পৃথিবীর সব দেশেই খুচরা পর্যায়ের বাজারেও কিছু নিয়ম-কানুন আছে। কিন্তু আমাদের এখানে তা নেই। নিয়মিত তদারকি হয় না। বাজারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই। ফলে মাঝেমধ্যেই বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ক্রেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলে বা গণমাধ্যমে অস্থিতিশীল বাজারের তথ্য প্রকাশ পেলে নীতিনির্ধারকদের কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। কিন্তু বাজারে এর কোনো প্রতিফলন পড়ে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের বাজারে নীতিনৈতিকতার কোনো বালাই নেই। সুযোগ বুঝে এখানে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কখনো কখনো তৈরি করা হয় কৃত্রিম সংকট। এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ ক্রেতাদের। নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে ভোক্তাদের শুধুই ঠকতে হয় ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে। বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি ও নজরদারি থাকলে এমনটি ঘটার সুযোগ থাকত না। সময়ে-অসময়ে সুযোগ বুঝে পণ্যের দাম বাড়ানোর এই অশুভ তৎপরতা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মাল্টিমিডিয়া ক্লাস চালু হোক

 

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য বর্তমান সরকারের। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক করে সাজানোর পরিকল্পনায় এরই মধ্যে দেশের ৩৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের যাবতীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করেও তার সুফল পাওয়া যায়নি। খরচ হয়ে গেছে হাজার কোটি টাকা। আরো প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলমান। অনেক প্রতিষ্ঠানে সরঞ্জাম এখনো প্যাকেটবন্দি, নষ্ট হওয়ার পর মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা ও স্পিকারের সমন্বয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম গড়ে তোলা হবে। কঠিন ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলো ছবি, এনিমেশন ও ভিডিও ক্লিপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরা হবে। উদ্দেশ্য হচ্ছে পাঠের বিষয়কে শিক্ষার্থীদের কাছে আনন্দময় করে তোলা। এই কার্যক্রম চালানোর জন্য উপকরণের পাশাপাশি যোগ্য শিক্ষকও প্রয়োজন। তবে সবার আগে দরকার বিদ্যুৎ সংযোগ। সেই সঙ্গে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, যাঁরা নিজেদের তৈরি করা কনটেন্ট দিয়ে কার্যকরভাবে শ্রেণিপাঠ পরিচালনা করবেন। কিন্তু বাস্তবে উল্টো ফল ফলতে শুরু করেছে। একদিকে প্রযুক্তিভীতি, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে দেশ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরাও পর্যাপ্ত সুযোগ না পেয়ে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ভুলে যেতে বসেছেন। অনেক স্থানে মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম ব্যবহার করাই হচ্ছে না। কিশোরগঞ্জ জেলার এক হাজার ৭৫২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক হাজার ৩৬৫টিতেই মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম নেই। বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে, সেখানে ইন্টারনেটের ধীরগতিই হচ্ছে প্রধান প্রতিবন্ধক। আবার সব ধরনের সরঞ্জাম থাকার পরও অনেক বিদ্যালয়ে অবকাঠামো না থাকায় মাল্টিমিডিয়া বা ডিজিটাল ক্লাসরুম করা যায়নি। অন্যদিকে ক্লাসরুম ও মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম থাকার পরও দেশের অনেক স্থানে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ সেখানে নেই উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক। এদিকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন আছে। সরকারিভাবে মাত্র ১৪ দিনে আইসিটির প্রশিক্ষণ দিয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনা কতটা সম্ভব, এটাও বড় প্রশ্ন। এমনও দেখা গেছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জামের প্যাকেটই খোলা হয়নি। কোথাও কোথাও ল্যাপটপ ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যক্তিগত কাজে। কোথাও সব সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে, মেরামত করা হয়নি। কোথাও পাঠদান চলছে দায়সারাভাবে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় নিশ্চয় আছে। সার্বিকভাবে সব স্কুলে গিয়ে অবস্থা দেখতে হবে। কোথায় মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম দেওয়া যাবে তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখতে হবে। সবার আগে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও অবকাঠামো। অবকাঠামো ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু সরঞ্জাম সরবরাহ করে কোনো লাভ হবে না। আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে দৃষ্টি দেবে।

প্রবাসী বীমা কার্যক্রম শুরু হোক

কর্মসংস্থানের জন্য যারা বিদেশে যায়, তাদের বেশির ভাগ সাধারণ কর্মী হিসেবে যায়। অনেক ঝক্কি সয়ে যেতে হয়। ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল বিক্রি করে নিজের ও পরিবারের সচ্ছলতার জন্য বিদেশে যায় তারা। তার পরও অনেকের ভাগ্যোন্নয়ন হয় না। চাকরি না পেয়ে বা ছাঁটাই হয়ে অনেকে দেশে ফিরে আসে। কেউ দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে ফিরে আসে। তাদের বাকি জীবন পরিজনদের নিয়ে দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যে কাটে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ বিষয়ে সামগ্রিক ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেই বলেই ভাগ্যান্বেষী অনেক মানুষকে ভাগ্যহত হতে হয়; তাদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
দুঃসহ পরিস্থিতিতে যাতে তাদের আর পড়তে না হয়, দুর্বিষহ জীবন যাতে আর কাটাতে না হয় সে জন্য একটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদেশগামী কর্মীদের বীমার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বীমা থাকলে বিদেশে গিয়ে আহত বা নিহত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পাওয়া যাবে। নিয়োগ পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত হলে পাওয়া যাবে চার লাখ টাকা। প্রবাসে কেউ বেকার হলে তাকে সর্বোচ্চ তিন মাস ২৫ হাজার টাকা করে বেকার ভাতা দেওয়া হবে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ, আরো আগেই নেওয়া উচিত ছিল। বীমাসংক্রান্ত খসড়াটি প্রণয়ন করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় খসড়াটি অনুমোদন করেছে।
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত খসড়া নীতিমালা বীমাসংক্রান্ত সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ ‘সেন্ট্রাল রেটিং কমিটির’ পরবর্তী বৈঠকে পেশ করা হবে। সেখানে অনুমোদিত হলে বীমা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ‘প্রবাসী কর্মী বীমা নীতিমালা’ নামে এটি কার্যকর হবে। বয়স-নির্বিশেষে সব বীমাগ্রহীতার জন্য অভিন্ন প্রিমিয়াম হার থাকবে। বীমা চলাকালে বীমাকারীর মৃত্যু হলে তার উত্তরাধিকারী বীমার অঙ্কের শতভাগ (পাঁচ লাখ টাকা) পাবে। প্রবাসে দুর্ঘটনায় উভয় চোখ বা হাত বা পা হারালে বীমার অঙ্কের শতভাগ পাওয়া যাবে। দুর্ঘটনায় স্থায়ী ও আংশিক শারীরিক ক্ষতির জন্যও নীতিমালায় নির্ধারিত হারে বীমা সুবিধা পাবে প্রবাসীরা। বীমাগ্রহীতা নিয়োগ পাওয়ার পর স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত হলেও বীমার সুবিধা পাবে। কত মাসের মধ্যে চাকরিচ্যুত হয়েছে তা বিবেচনায় নিয়ে বীমা সুবিধার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়লে বা অসদাচরণ ও অনৈতিক কাজের দায়ে চাকরি গেলে অথবা অদক্ষতা, অবৈধ নিয়োগ বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে চাকরি নেওয়ার কারণে ছাঁটাই হলে এ সুবিধা মিলবে না।
এমন উদ্যোগ খুবই জরুরি ছিল। শুভ উদ্যোগ। সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ। নীতিমালা চালু হলে শুধু প্রবাসী কর্মীরাই সুরক্ষিত হবে না, প্রবাসে কর্মসংস্থানের বিষয়ে মানুষের আগ্রহও বাড়বে। নীতিমালা দ্রুত কার্যকর হবে এ আশাই করি।

সড়ক আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

সড়কে দুর্ঘটনা নয়, একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে শুধু আন্দোলনকারী শিশুদের নয়, এমন দাবি অনেক বিশিষ্টজনদেরও। লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, বেপরোয়া গতি, প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানো, কোনো শৃঙ্খলা না মানা এমনই অনেক কারণে সড়কে এ রকম হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এ জন্য আইনের দুর্বলতাকেই প্রধানত দায়ী করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার মন্ত্রিসভায় নতুন সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। সংসদের আগামী অধিবেশনে এটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সড়কে চলা নৈরাজ্যের ধারাবাহিকতায় রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি সপ্তাহব্যাপী তারা চালকের লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেসসহ কাগজপত্র চেক করে, গাড়িগুলোকে লেন মেনে শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে চলাচলে বাধ্য করে। এ পরিস্থিতিতে পুলিশও গত রবিবার থেকে ট্রাফিক সপ্তাহ পালন শুরু করে। কিন্তুসড়কে বিশৃঙ্খল অবস্থাই দেখা গেছে। এমনকি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে গাড়ি চালাতেও দেখা গেছে অনেককে। জানা যায়, হঠাৎ করেই বিআরটিএ কার্যালয়ে ফিটনেস সংগ্রহের জন্য গাড়ির ভিড় জমে গেছে। কিন্তু সেখানে দালালদেরও সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। ফলে ফিটনেস না থাকলেও অনেক গাড়ি হয়তো ফিটনেস সনদ পেয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে শৃঙ্খলা না ফেরার প্রধান কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সদিচ্ছার অভাব। অভিযোগ আছে, টাকা দিলে গাড়ি চালাতে না জানলেও বিআরটিএ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়। প্রশিক্ষণ নেওয়া বা পরীক্ষা দেওয়ারও প্রয়োজন হয় না। একইভাবে ফিটনেস সনদ নিতে গাড়ি দেখানোরও প্রয়োজন হয় না। একই অবস্থা সড়কেও। গাড়ি কালো ধোঁয়া ছাড়ছে, ইন্ডিকেটর লাইট নেই কিংবা জ্বলছে না, বেপরোয়া গতিতে চলছে, দুই গাড়িতে প্রতিযোগিতা করছে দেখার কেউ নেই। ট্রাফিক পুলিশকে অন্যদিকে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। ‘লাইনম্যান’ দিয়ে তোলা আদায়ের অভিযোগও আছে। এ অবস্থায় নতুন আইন করে কতটুকু লাভ হবে, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ প্রকাশ করছেন। ছয় বছর আগে গাড়িতে ডিজিটাল নাম্বার প্লেট প্রদান শুরু হয়েছে, অথচ এখনো অনেক গাড়িতে সেই পুরনো টিনের প্লেটই দেখা যায়। ডিজিটাল প্লেটে একটি আরএফআইডি ট্যাগ থাকে, যার সাহায্যে গাড়িগুলোর অবস্থান জানা যায়। সে জন্য আরএফআইডি চেকপোস্ট স্থাপন জরুরি। সারা দেশের মধ্যে শুধু রাজধানীতে এমন মাত্র ১২টি পোস্ট স্থাপিত হয়েছে বলে জানা যায়। গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার জন্য স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক ব্যবস্থা শুধু বিআরটিএর মিরপুর কেন্দ্রে রয়েছে। কিন্তু সেটিরও ব্যবহার সীমিত বলে জানা যায়। এখানে মনে হয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থাই অটোমেশনের বিরোধী। বাড়তি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই এমন বিরোধিতা বলে মনে করা হয়। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে নতুন আইন কি পারবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে?
আমরা চাই, নতুন আইনে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক এবং রাস্তায় তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হোক। আইন বাস্তবায়নে কারো গাফিলতি থাকলে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হোক।

পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ চাই

সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা। এই ঈদে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যে যার সাধ্যমতো পশু কোরবানি করবে। পশুর মাংস নিজেরা খাবে, গরিব-দুঃখী কিংবা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিতরণ করবে। এ সময় পেঁয়াজ, আদা-রসুন ও অন্য কিছু মসলার চাহিদা কিছুটা বেড়ে যায়। আর প্রতিবছর এ সুযোগই নেয় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। কোরবানির ঈদের আগে আগে নানা রকম কারসাজি করে এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। গত এক-দেড় মাসে পেঁয়াজের দাম বাড়তে বাড়তে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। রমজান মাসের পর দেশি জাতের পেঁয়াজের দাম ছিল ৩৫ টাকা, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে। আর আমদানি করা পেঁয়াজের দাম হয়েছে কেজিপ্রতি ৪০ টাকা। অথচ গত সপ্তাহেও যে দামে এই পেঁয়াজের এলসি করা হয়েছে, তাতে কেজিপ্রতি আমদানিমূল্য হবে সর্বোচ্চ ২১ টাকা। এসব পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
দাম বাড়ানোর পেছনে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কথাও শোনা যায়। বিগত রমজান মাস শুরু হওয়ার আগে আগে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রমজান মাসের শুরুতে বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা ও বাড়তি মনিটরিং চালু করায় ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয় দাম কমাতে। তখনই দেশি পেঁয়াজের দাম নেমে আসে কেজিপ্রতি ৩৫ টাকায় এবং বিদেশি পেঁয়াজ ২০ থেকে ২৫ টাকায়। সম্প্রতি ভারতের বাজারেও পেঁয়াজের দাম সামান্য বেড়েছে। সেই বাড়তি দামে আমদানি করা হলেও কেজিপ্রতি মূল্য পড়বে ২১ টাকার মতো। সেই পেঁয়াজ ৪০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ার পেছনে কোনো যুক্তিই থাকতে পারে না। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট নানা ধরনের কারসাজি করে ক্রমাগতভাবে দাম বাড়িয়ে চলেছে। তাঁদের মতে, সরকার চাইলে এসব কারসাজি নিয়ন্ত্রণ করা মোটেও কঠিন কাজ নয়। কিন্তু সেই চাওয়াতেই যেন ঘাটতি রয়েছে।
আমরা চাই অবিলম্বে পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেওয়া হোক। সরকারি সংস্থা টিসিবিকে দ্রুত সক্রিয় করতে হবে। প্রয়োজনে টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ আমদানিরও উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি খোলাবাজারে পেঁয়াজসহ জরুরি কিছু পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের বাজার যেহেতু কোনো নিয়ম-নৈতিকতা মেনে চলে না, তাই এখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ বাড়াতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অনৈতিক মুনাফাখোরদের শাস্তি দিতে হবে। আমরা আশা করি, ঈদুল আজহায়ও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

যানবাহন চলাচলে শৃংখলা

নিরাপদ সড়কের দাবিতে সপ্তম দিনের মতো শনিবারও রাজপথে নামে শিক্ষার্থীরা। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সব দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলা হলেও তারা পথ ছেড়ে যায়নি। এদিকে রাজধানীতে গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে। নিরাপত্তার অজুহাতে ছেড়ে যাচ্ছে না দূরপাল্লার বাস। বিপাকে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। প্রতিদিন যাদের কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়, তাদের ভোগান্তি চরমে। শুক্রবার সকাল থেকে বন্ধ থাকার পর রাতে চলেছিল দূরপাল্লার বাস। শনিবার সকাল থেকে আবার বন্ধ হয়ে যায় সড়ক যোগাযোগ। বাস মালিক সমিতির সভাপতি বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই বাস চলাচল করবে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাল্টায় পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের এই অঘোষিত ধর্মঘটে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বাস টার্মিনালগুলোতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে বাসের দেখা পাননি। বিদেশগামী যাত্রীদের বিমানবন্দরে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়েছে। অসুস্থদের জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতেও গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত ভাড়া। অভিযোগ উঠেছে, যাত্রীবাহী বাস না থাকায় রাইড শেয়ারিংয়ের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। চলমান আন্দোলনের মধ্যেই শুক্রবার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়েছেন। শনিবার গাজীপুরে কাভার্ড ভ্যান চাপায় কলেজছাত্রী নিহত হয়েছেন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের শিশু-কিশোররা পথে নেমে গত কয়েক দিনে আলোর দিশা দেখিয়েছে। তাদের দাবি পূরণে সম্মত হয়েছে সরকার। এরই মধ্যে দিয়া ও করিমের পরিবারকে অনুদান হিসেবে ২০ লাখ টাকা করে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। রমিজ উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে বিআরটিসির পাঁচটি বাস দেওয়া হয়েছে। সব স্কুলের সামনে গতিরোধক করে দেওয়া হবে। অনেক দিন ধরে আটকে থাকা সড়ক পরিবহন আইন মন্ত্রিসভায় উঠছে। এরপর শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু তার পরও শিক্ষার্থীরা শনিবার রাজপথে নেমে আসে। এদিকে পরিবহন শ্রমিকরা কোথাও কোথাও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। এ অবস্থায় উভয় পক্ষের মুখোমুখি হওয়া এবং সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা করা যেতেই পারে। বিশেষ করে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে অঘোষিত ধর্মঘটে যাওয়ার বিষয়টি জনমনে নানা গুঞ্জন ছড়াচ্ছে। শিশু-কিশোররা অসংগঠিত। এই সুযোগটি নিতে পারে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। তার ইঙ্গিতও মিলতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তুলে নিয়ে যাওয়া এমনকি নিহত হওয়ার খবর পর্যন্ত ছড়ানো হচ্ছে। এই সুযোগে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যেকোনো স্থানে অঘটন ঘটিয়ে ফেললে তার দায় কে নেবে? এরই মধ্যে পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়েছে। অনভিপ্রেত এসব ঘটনা একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। বিশেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাস করে না এই আন্দোলনে তাদের সম্পৃক্তি থেকে দূরে থাকতে হবে। দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ফিরে যেতে হবে শ্রেণিকক্ষে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের। অন্যদিকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদেরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। দ্রুত এই অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে সামনে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যাংকিং বিনিয়োগ বান্ধব হোক

দেশের অগ্রগতির ধারা টেকসই করতে প্রয়োজন প্রচুর বিনিয়োগ। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ব্যাংকিং খাত সেখানে খুব বেশি অবদান রাখতে পারছে না। এর বড় কারণ ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার। ১৫ শতাংশ বা এরও বেশি সুদে ঋণ নিয়ে লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা প্রায় অসম্ভব। তাই ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তারা অনেক দিন ধরেই ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার দাবি করে আসছিলেন। কিন্তু কোনোভাবেই তা কমছিল না। অবশেষে ঋণের সুদ এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী কিছু নির্দেশনা দেন। সেই অনুযায়ী বাজেটে করপোরেট কর কমিয়ে আনা হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা নগদ সংরক্ষণ অনুপাত কমিয়ে আনা হয়। এসবের ভিত্তিতে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস বা বিএবি বলেছিল, ১ জুলাই থেকে সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা হবে। বাস্তবে তা হয়নি। কয়েকটি ব্যাংক সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনলেও বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংক তা করেনি। এ অবস্থায় অর্থমন্ত্রী বৃহস্পতিবার ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ বা এবিবির সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের জানান, ৯ আগস্ট থেকে ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমানতের সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ। অবশ্য ভোক্তাঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের ঋণ এর বাইরে থাকবে।
ব্যাংকিং খাতে সুদের হার নিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্য চলছিল। অনেক ব্যাংক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপায়ে ঋণের ওপর ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করত, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা মানসম্মত না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি হয়ে যায়। সেই সঙ্গে মন্দ ঋণের ধাক্কা তো আছেই। তাই ব্যাংকগুলো আমানত ও ঋণের সুদের হারের পার্থক্য ক্রমাগতভাবে বাড়িয়েছে। কিন্তু এমন ব্যাংকঋণ দেশের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে না। তাঁদের মতে, সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। অবিলম্বে সব ব্যাংকে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। ভোক্তাঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সুদের হারেও পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমানে এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সুদের হার শুধু অযৌক্তিক নয়, অনৈতিকও।
অর্থমন্ত্রী একই সঙ্গে জানিয়েছেন, সরকারের সঞ্চয়পত্রের সুদহারও ৮ আগস্ট পর্যালোচনা করা হবে। অর্থাৎ তা কিছুটা কমিয়ে আনা হতে পারে। আর তা নিয়ে আমানতকারীরা, বিশেষ করে অবসর জীবনযাপনকারীরা এক ধরনের শঙ্কায় রয়েছেন। এই দিকটি বিশেষ বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
আমরা চাই, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বিনিয়োগবান্ধব হোক।

পাহাড় ধস রোধে পদক্ষেপ

বর্ষা এলেই পার্বত্যাঞ্চলের মানুষ এক ধরনের শঙ্কার মধ্যে দিন কাটায়। না জানি কখন পাহাড় থেকে নেমে আসে এক দঙ্গল কাদামাটি, পরিবারসুদ্ধ সবার জীবন কেড়ে নেয়। তার পরও ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই পাহাড়ের নিচে থাকা ছোট খুপরিঘরেই বাস করতে বাধ্য হয়। প্রতিবছরই পাহাড়ধসের এমন দুঃখজনক বহু ঘটনা ঘটে। এ বছর এরই মধ্যে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি জেলায় অর্ধডজন পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। প্রাণও হারিয়েছে অনেকে। পাহাড়ধসের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল চট্টগ্রামে ২০০৭ সালের জুন মাসে। সেই ঘটনায় মারা গিয়েছিল ১২৭ জন। গত বছরও ব্যাপক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে এবং চার সেনা কর্মকর্তাসহ ১৬৮ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে। তখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পর সরকার পাহাড়ধসের কারণ খুঁজতে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছিল। ৯ মাস ধরে অনুসন্ধানের পর সেই কমিটি তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে সম্ভাব্য কারণগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। এতে বাস্তব অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হবে কি, নাকি আগের সব প্রতিবেদনের মতোই এটিও ফাইলচাপা পড়ে যাবে?
জানা যায়, এক শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর সহায়তায় কিছু প্রভাবশালী লোক পাহাড়ের নিচে সরকারি জমিতে খুপরিঘর তৈরি করে ভাড়া দেয়। ভাড়া কম হওয়ায় দরিদ্র লোকজন সেখানে গিয়ে ভিড় জমায়। বড় বৃষ্টিপাতের আগে কর্তৃপক্ষ মাইকিং করে তাদের সরে যেতে বলে এবং তাদের দায়িত্ব সারে। মাইকিং শুনেও অনেকের পক্ষে অন্যত্র সরে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাদেরই ভাগ্যে নেমে আসে এমন আকস্মিক মৃত্যু। অথচ আমাদের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অবৈধ প্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারেনি। কমিটির অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে, পাহাড়ধসে করুণ মৃত্যুর জন্য এই অবৈধ বসতি স্থাপন মূলত দায়ী। অন্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পাহাড় কাটা, পাহাড়ের গাছপালা কেটে ন্যাড়া করে দেওয়া, রক্ষাবেষ্টনী ও নালা না থাকা ইত্যাদি। আগের প্রতিবেদনগুলোতেও একই কথা বলা হয়েছিল এবং পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ঠেকাতে একই ধরনের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়? এখনো চলছে অবাধে বৃক্ষ নিধন ও পাহাড় কাটা। যাদের তা নিয়ন্ত্রণ করার কথা, অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও। জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পাহাড় কাটা নিয়ে খবরের কাগজগুলোতে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু কমিটির পর কমিটি করে কোনো লাভ হবে না। প্রয়োজন এসব কমিটির সুপারিশগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন। আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার সে অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

পরিবহনে শৃংখলার বিকল্প নেই

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। ৯ দফা দাবিও জানিয়েছে তারা। দুই সহপাঠীকে হারিয়ে সড়কে নামা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা স্বীকার করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী তাদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যেতে বলেছেন। টানা চতুর্থ দিনের মতো শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করায় বিড়ম্বনায় পড়ে শহরবাসী। এদিকে শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া দুই বাসের নিবন্ধন সাময়িকভাবে বাতিল করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এই দুটি বাসের একটির ফিটনেস সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালের ১৮ মে। রুট পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ১৯ মে। ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদও শেষ হয়েছে চলতি বছরের মে মাসে। অর্থাৎ বাসটি ফিটনেস সার্টিফিকেট, ট্যাক্স টোকেন ও রুট পারমিট ছাড়াই চলাচল করছিল। অন্য আরেকটি প্রতিবেদনে জানা যায়, জাবালে নূর পরিবহনের আটক চালকদের কারো বাস চালানোর লাইসেন্স ছিল না। এদিকে কুমিল্লায় দুই ছাত্রীর ওপর ট্রাক উঠে যাওয়ায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহনে অব্যবস্থাপনা নিয়ে গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক বৈঠকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অবৈধ গাড়িচালকদের ধরতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজধানী ও নগর পরিবহনে কোনোভাবেই শৃঙ্খলা আনা যাচ্ছে না। মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষেরই আইনভঙ্গের প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। আইনগত ব্যবস্থা নিতে গেলেই যানবাহন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। নগর পরিবহনে সরকারি সড়ক পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির অনুপস্থিতির কারণেই একচ্ছত্র ব্যবসা করছে বেসরকারি বাস কম্পানিগুলো। যাত্রীদের জিম্মি করে ফেলেছে তারা। সিটিং সার্ভিসের নামে অরাজক ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে। বাসভাড়ায় কোনো শৃঙ্খলা নেই। একেক কম্পানি একেক ধরনের ভাড়া আদায় করে। এসব বাসে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য কোনো হাফ ভাড়া নেই। ভাড়া আদায়ের নামে যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়। যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। অথচ যখন টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা ছিল, তখন সব বাস নির্দিষ্ট স্টপেজে থামত।
ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি পাসের বাধ্যবাধকতা ও গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল গত বছর মার্চ মাসে। প্রায় দেড় বছর পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সেই আইনের অনুমোদন দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। আইনের খসড়াটি এখন সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। মন্ত্রিসভা এই আইনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পর তা পাস করতে সংসদে তোলা হবে।
রাজধানী সহ নগর পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর কোনো বিকল্প নেই। দ্রুত আইন পাস ও সব রুটে বিআরটিসির বাস চালু করা গেলে বেসরকারি বাস মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হবে।

আসামে বাঙালি নাগরিকত্ব

ভারতের আসাম রাজ্য প্রায়ই বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মূলত বাঙালি তথা বাংলাভাষী অধিবাসীদের সূত্রে। অহমিয়া জাত্যভিমান-প্রসূত ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযানও পরিচালিত হয়েছে বেশ কয়েকবার। কখনো এসবে জড়িত ছিল অহমিয়া জনগোষ্ঠী, কখনো রাজ্য সরকার, কখনো উভয়ে। রক্তপাতের ঘটনাও ঘটেছে। ভাষাকেন্দ্রিক বিরোধও ঘটেছে। রাজ্য সরকারের অহমিয়া ভাষাকে আসাম রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলন হয়েছে। ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ১১ জন বাঙালি। বাঙালি তথা বাংলাভাষীদের সঙ্গে বৈরী আচরণ এর পরও অনেকবার হয়েছে। এ আচরণের পক্ষে সংশ্লিষ্টদের যুক্তি হলো বাঙালিরা অভিবাসী, তারা আসামের বা অহমিয়া জনগোষ্ঠীর স্বকীয়তায় বাধা সৃষ্টি করছে। এসব অজুহাতে দশক দেড়েক আগে গণহারে পুশব্যাকের ঘটনাও ঘটানো হয়েছিল।
এবার সমস্যা দেখা দিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে। ‘অবৈধ বিদেশি’ চিহ্নিত করতে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী সোমবার হালনাগাদ ‘জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি)’-এর চূড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে আসাম রাজ্য সরকার। এতে রাজ্যের ৪০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। নিজ ভূখণ্ডে তারা ‘উদ্বাস্তু’ হয়ে পড়েছে এ দাবি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা এনআরসিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন। এর পরও নিশ্চিন্ত থাকার উপায় যে নেই, সে কথা সবাই বোঝে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাদপড়া ব্যক্তিরা বাংলাদেশি নয়। বাংলাদেশ তাদের ফিরিয়ে নিতে পারবে না। ভারত অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, এনআরসি নিয়ে তারা এমন কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশের কোনো সমস্যা হয়।
সমস্যার কিছু কারণ তার পরও থেকে যাচ্ছে। ভারতের একজন বিশেষজ্ঞের অভিমত, আসামে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি যারা, তাদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার খুব একটা ভাবেনি। এখন পর্যন্ত সরকারি নীতি খুবই অস্পষ্ট। বাদপড়াদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে পরে ধীরে ধীরে ‘ন্যাচারালাইজেশন’-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়া হতে পারে। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এমনও হতে পারে, তাদের ধীরে ধীরে অন্যান্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে এ সমস্যার চাপ একা আসামকে সামলাতে না হয়। অবশ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী এনআরসি প্রকাশের পরই রাজ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার কথা বলেছেন। আর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, যারা বাদ পড়েছে, তাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। এটি খসড়া তালিকা। তারা আবারও আবেদন করার সুযোগ পাবে।
রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকার বাদপড়া লোকদের নিয়ে যা বলেছে, তা বাহ্যত স্বস্তিদায়ক। কিন্তু ঐতিহাসিক যে নজির রয়েছে তাতে আশঙ্কিত হওয়ার কারণ রয়েছে। রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে জাত্যভিমান রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারে যাঁরা আছেন তাঁদের কারো কারো অতীতের বক্তব্য ভরসাযোগ্য বিষয় নয়। বাংলাদেশ সরকার এটিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় উল্লেখ করে কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। তবে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো বেচালের বড় ঝাপটা প্রথমে বাংলাদেশের ওপরই পড়বে।