বিভাগ: সম্পাদকীয়

নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা

এমপিওভুক্ত নয় এমন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এবার আন্দোলনে নেমেছেন। গত মঙ্গলবার থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন তাঁরা।
২০১০ সাল থেকে এমপিওভুক্তি বন্ধ থাকলেও নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দেশের পাঁচ হাজার ২৪২টি নন-এমপিও স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর বেশির ভাগই বিনা বেতনে সেখানে চাকরি করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ২০ লাখের মতো। প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠছে সরকারের স্বীকৃতি নিয়েই। কিন্তু বছরের পর বছর এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়নি। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মতো নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানও একই নিয়ম মেনে পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীরা বোর্ডের পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হচ্ছে। শুধু শিক্ষকদের বেতন হচ্ছে না। এমপিওভুক্তি নিয়ে জাতীয় সংসদে একাধিকবার দাবি উঠলেও বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে। নির্বাচনের বছর সামনে রেখে তাই আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন শিক্ষকরা। পালন করছেন অবস্থান কর্মসূচি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি একটি নীতিনির্ধারণী বিষয়। এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। আবার নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও নানা নিয়ম-কানুন মানতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমৃদ্ধ করা, সুশিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি এবং শিক্ষার সুষ্ঠু বিকাশের জন্য এমপিওভুক্তি অত্যন্ত জরুরি। এর সঙ্গে শিক্ষকদের জীবন-জীবিকা, মান-মর্যাদার বিষয়টিও জড়িত। আমাদের দেশে শিক্ষকরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তাঁদের জীবনযাপনের জন্য বা ন্যূনতম জীবনমান সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বেতন-ভাতা জোগান দেওয়া হয় না। নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের বেশির ভাগকেই জীবনযাপনের জন্য অন্য কোনো কাজ করতে হয়। শিক্ষকদের এই দীনতার কারণেই অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না। বিষয়টি মাথায় রেখেই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অবিলম্বে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সেগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত যেমন নেওয়া যেতে পারে, তেমনি ভালো প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে না পারলে শিক্ষার মান উন্নত হবে না।
শিক্ষকদের জীবন অবহেলা ও কষ্টে কাটলে তাঁদের উৎসাহ ফুরিয়ে যাবে। তাঁদের হাত দিয়ে ভবিষ্যতের সুনাগরিক বেরিয়ে আসবে কিভাবে? কাজেই এমপিওভুক্তির ব্যাপারে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল এ ব্যাপারে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা

সরকার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট। যদিও সরকারি চিকিৎসাসেবা এখনো গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
চিকিৎসকরা গ্রামাঞ্চলে থাকতে চান না। পদায়ন হলেও নানা অজুহাতে অনেকে শহরে চলে আসেন। অনেক উপজেলায়ই আধুনিক চিকিৎসাসুবিধা নেই বললেই চলে। যেসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আধুনিক যন্ত্রপাতি রহস্যজনক কারণে নষ্ট হয়ে থাকে। ফলে ব্যবহার করা যায় না। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ছুটতে হয় জেলা সদরে বা কোনো বেসরকারি ক্লিনিকে।
জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার দৈন্যদশাই ফুটে উঠেছে। সারা দেশে ৩৫০টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধিকাংশ অপারেশন থিয়েটারই নির্মাণের পর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এসব অবকাঠামোর একেকটি বসাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা।
পরে সংযুক্ত হয়েছে আরো লাখ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি। কিন্তু পর্যাপ্ত শল্যবিদ ও অজ্ঞানবিদ না থাকার কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা মিলছে না রোগীদের। নেত্রকোনা জেলার ১০ উপজেলার মধ্যে সাতটিতে অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স আছে। কিন্তু চালু করা যায়নি জনবলের অভাবে। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আধুনিক নকশার সুপরিসর অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স আছে; কিন্তু নেই প্রয়োজনীয় জনবল। ফলে সেখানেও ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। রোগীদের যেতে হচ্ছে জেলা সদরে। জনবলের অভাবে সক্রিয় করা যায়নি নেত্রকোনার মদন উপজেলা হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারী উপজেলা হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারেরও একই অবস্থা। গাইবান্ধার তিনটি অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স চালু করা সম্ভব হয়নি।
অপারেশন থিয়েটার থাকার পরও কেন তা চালু করা যাবে না, কেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পর্যাপ্ত সেবা পৌঁছানো সম্ভব হবে না, তার কারণ খুঁজে বের করা দরকার। কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আবশ্যক। দেশে কি শল্যবিদ ও অজ্ঞানবিদের এতই অভাব পড়ে গেছে যে তাদের অভাবে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অপারেশন থিয়েটার চালু করা সম্ভব হচ্ছে না? নাকি সঠিক পরিকল্পনার অভাবেই প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া যাচ্ছে না? দেশে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা কত তা সরকারের জানা আছে। এসব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে কোথায় কত জনবল লাগতে পারে তার হিসাব করাও খুব কঠিন নয়। মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক সার্জন ও অ্যানেসথেসিয়ালজিস্ট তৈরি না করেই এসব হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার নির্মাণ করা হয়েছিল? তাতে কি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক স্বার্থ উদ্ধার হয়েছে? অপারেশন থিয়েটার নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি সংস্থাপনের পরও কেন তা পড়ে থাকবে? সঠিকভাবে ব্যবহার না হলে এসব অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি তো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাবে। শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, প্রয়োজনীয় জনবলের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খেয়াল রাখতে কবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে।

নির্বাচনে গণতান্ত্রিক চর্চার বিকল্প নেই

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র বছরখানেক বাকি। রাজনৈতিক দলগুলো এর মধ্যেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।
দল গোছানোর কাজকর্মও শুরু হয়ে গেছে। জোটভুক্ত দলগুলো নিজ দলের আসন নিয়ে দর-কষাকষি শুরু করেছে। অন্যদিকে প্রধান প্রতিপক্ষ দুই দলের বিরোধ-বিতর্ক ক্রমেই তুঙ্গে উঠছে। এরই মধ্যে নির্বাচনী হাওয়া ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। দেশের মানুষও নির্বাচন নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছে। নির্বাচনের আগের বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে নানা ধরনের আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন অনেকে। নাগরিক-পেশাজীবী নানা সংগঠনের পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচন নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশা ও পরামর্শ তুলে ধরা হচ্ছে। এসবের ভেতর দিয়ে সাধারণ মানুষের যে প্রত্যাশাটি বড় হয়ে উঠেছে তা হলো, সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হোক। দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা অস্থিতিশীলতা তৈরি না হোক। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট প্রদানের সুযোগ থাকুক।
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হওয়ায় ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ বেশ কিছু দল অংশ নেয়নি; বরং তারা সেই নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। ফলে দেশব্যাপী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রীবাহী বাস-ট্রেনে আগুন দেওয়া, রেললাইন উপড়ে ফেলা, সড়কে গাছ কেটে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা, সরকারি স্থাপনায় আগুন দেওয়ায় কী করা হয়নি তখন! নির্বাচনের দিনও সংঘাত চলে। ভোটকেন্দ্রে আসার পথে ভোটারদের ওপর হামলা, ভোটকেন্দ্র তথা বিদ্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া, এমনকি পোলিং-প্রিসাইডিং অফিসারদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ মানুষ তেমন দৃশ্য আর দেখতে চায় না। বিএনপি এবারও নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক অথবা নির্দলীয় সরকারের দাবি করে আসছে। ভোটের সময় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাইছে। এ ছাড়া বেশ কিছু দাবি করেছে। এসব দাবি মানা না হলে তারা নির্বাচনে যাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাহলে দেশ কি আবার সেই সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাবে? সরকারি দলের কোনো কোনো নেতা বলছেন, তেমন পরিস্থিতি হলে কঠোরভাবে তা দমন করা হবে। কিন্তু বিএনপির সব দাবিকে অবজ্ঞা করা হলে সেই পরিস্থিতির সৃষ্টির জন্য তাঁরাও কি দায়ী হবেন না? বিএনপির দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করতে অসুবিধা কোথায়? যে দাবিগুলো যৌক্তিক সেগুলো মেনে নেওয়াই কি উত্তম নয়? গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একগুঁয়েমির কোনো স্থান নেই। অন্যদিকে দাবি না মানার অজুহাতে সহিংসতাও কাম্য নয়। নিয়মতান্ত্রিক পথেই আন্দোলন চালাতে হবে। উভয় পক্ষকে জনপ্রত্যাশা বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে, ২০১৪ সালের মতোই বিএনপিসহ আরো অনেক দল যদি নির্বাচনে না আসে সে নির্বাচন কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে না।
বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। অগ্রগতির এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে রাজনীতিতে গণতন্ত্রের চর্চা বাড়াতে হবে। দেশে সুস্থ রাজনীতি থাকতে হবে। অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া সুস্থ রাজনীতি থাকতে পারে না। আমরা আশা করি, উভয় পক্ষ গণতান্ত্রিক সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে আগামী নির্বাচনকে অর্থবহ করবে।

শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর প্রতি দৃষ্টি দিন

নতুন বছরের প্রথম দিন বই উৎসব হবে সারা দেশে। শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে নতুন বই।
সেদিন থেকেই শুরু হবে নতুন শিক্ষাপঞ্জি। এর আগে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছুটি চলছে। গত শনিবার থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাঁদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আমরণ অনশন শুরু করেছেন। রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়া শিক্ষকদের ৯ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অনেকে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় অবস্থান করছেন। প্রথম দিনের তুলনায় অনশনস্থলে শিক্ষকদের উপস্থিতি বাড়ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা চান, প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তাঁদের বেতনের বৈষম্য কমানো হোক।
দেশের ৬৪ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত সহকারী শিক্ষকের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে কোনো বেতনবৈষম্য ছিল না।
ওই বছরই প্রথম বেতন স্কেলে এক ধাপ পার্থক্য তৈরি হয়। ২০০৬ সালে দুই ধাপ পার্থক্য তৈরি হয়। ২০১৪ সালে প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করার পর পার্থক্য বেড়ে দাঁড়ায় তিন ধাপ। প্রধান শিক্ষকরা বর্তমানে বেতন পাচ্ছেন ১১তম গ্রেডে। সহকারী শিক্ষকরা পাচ্ছেন ১৪তম গ্রেডে। ২০১৪ সালে যখন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেডে তিন ধাপ দূরত্ব তৈরি হয়, তখনই সহকারী শিক্ষকরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকও করেছেন তাঁরা। তাতে কোনো ফল হয়নি। এখন নতুন করে আন্দোলনে নেমেছেন।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের পদটি ব্লক পোস্ট। এখানে কোনো পদোন্নতি নেই। একজন সহকারী শিক্ষককে সহকারী শিক্ষক হিসেবেই চাকরিজীবন শেষ করতে হয়। এখানে পদোন্নতির সুযোগ থাকলে আজকের মতো আন্দোলন হয়তো হতো না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ধাপে ধাপে যোগ্যতা অনুযায়ী অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারতেন। আগে তো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন অনেক কম ছিল। শেখ হাসিনার সরকার সেখান থেকে তাঁদের মুক্তি দিলেও বৈষম্য দূর করা যায়নি। প্রধান শিক্ষকদের বেতন যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানজনক হওয়া যেমন আবশ্যক, তেমনি সহকারী শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মনে রাখতে হবে। যোগ্যদের শিক্ষকতা পেশায় উদ্বুদ্ধ করতে হলে বেতনকাঠামো নিয়ে ভাবতে হবে। বেতন সম্মানজনক পর্যায়ের না হলে যোগ্যতাসম্পন্নরা এ পেশায় আসতে আগ্রহী হবেন না। ফলে মানসম্পন্ন শিক্ষার লক্ষ্য পূরণ হবে না।
যোগ্য শিক্ষকের হাতেই তৈরি হবে ভবিষ্যতের নাগরিক। এই শিক্ষকদের কেন বেতনবৈষম্য দূর করার জন্য আন্দোলনে নামতে হবে? কেন আমরণ অনশনে যেতে হবে। শিক্ষকরা হয়তো অনশন প্রত্যাহার করবেন; কিন্তু তাঁদের যৌক্তিক দাবি অর্থাৎ বেতনবৈষম্য দূর করার দায়িত্ব সরকারের। আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সুরাহা করতে উদ্যোগী হবে।

গতিশীল প্রশাসনের বিকল্প নেই

১০২ ও ১০৩তম আইন ও প্রশাসনিক কোর্সের সমাপনীতে সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে যে প্রজাতন্ত্রের নবীন কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা রয়েছে, মানুষের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে প্রশাসনের ক্যাডার কর্মকর্তাদের যে বিশাল দায়িত্ব রয়েছে, সে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে কর্মকর্তাদের নিরলস কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মনে করিয়ে দিয়েছেন সৃষ্টিশীল কর্মকর্তাদের সৃষ্টিশীলতা ও নিষ্ঠা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে মূল্যবান ভূমিকা রাখবে।
গতিশীল জনপ্রশাসন যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। আর তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর। রাষ্ট্রের এই ক্ষেত্রটির ওপর রাষ্ট্র ও নাগরিকের কল্যাণও নির্ভর করে। জনপ্রশাসনে কর্মরত সবাইকে মনে রাখতে হবে, তাঁরা জনগণের সেবক। একই সঙ্গে তাঁরা সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বাহক। আর সে কারণেই তাঁদের দায়বদ্ধতা সব সময় জনগণের কাছে। অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা তাঁদের কর্তব্য। আর সেই কর্তব্য পালনে তাঁদের জনগণের কাছে যেতে হবে। সেবক হিসেবে সেবা করতে হবে জনগণের একজন হয়ে।
সরকার জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের সুদক্ষ করে গড়ে তোলার ব্যাপারেও যথেষ্ট আন্তরিক। সর্বশেষ বেতন স্কেলের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের বেতন যেমন প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে, তেমনি তাঁদের আন্তরিক উদ্যোগের স্বীকৃতি দিতে বিভিন্ন পদক প্রদানের ব্যবস্থা করেছে। সৃজনশীল কার্যক্রমে উৎসাহ দিতে গঠন করা হয়েছে উদ্ভাবনী তহবিল। কর্মকর্তাদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগও সৃষ্টি করা হয়েছে।
যেকোনো রাজনৈতিক সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা অনেকাংশেই নির্ভর করে দক্ষ ও যোগ্য জনপ্রশাসনের ওপর। সরকারের নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী দেশ পরিচালনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে জনপ্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সব সরকারই জনপ্রশাসনকে তাদের চিন্তাভাবনা ও মেয়াদভিত্তিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করে। বাস্তবায়নে তাদের সহায়তার প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বহির্বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ায় সরকার এখন পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প গ্রহণ করতে পারছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণ, সর্বজনীন শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃত্ব পরিষেবা, অর্থনৈতিক উন্নতিসহ সার্বিক স্থিতিশীলতা অর্জনের পথে আজকের বাংলাদেশ। দেশের এই অগ্রযাত্রা অনেকাংশেই নির্ভর করছে বর্তমান জনপ্রশাসনের ওপর। নবীন কর্মকর্তারা বিষয়টি অনুধাবন করে নিজেদের দেশসেবায় নিয়োজিত করলে বাংলাদেশের অগযাত্রা কেউ ব্যাহত করতে পারবে না। সরকারের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, তা মোকাবেলায় কর্মকর্তাদের আন্তরিক ও তৎপর হতে হবে। সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে দক্ষতা কাজে লাগানো গেলে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সহজ হয়ে যায়। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। দেশ ও জনগণের কল্যাণে তাঁরা নিয়োজিত হবেন। তাঁদের সবার ঐকান্তিক চেষ্টায় বাংলাদেশ যে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে সফল হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইতিবাচক ও গতিশীল জনপ্রশাসনই পারে দেশের সার্বিক চিত্র বদলে দিতে।

বিজয় নিশান উড়ছে ওই

আজ ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। ৪৬ বছর আগে এই দিনে স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত হয়েছিল নয় মাসের যুদ্ধ শেষের গান। সমবেত কণ্ঠে শব্দসৈনিকরা গেয়ে উঠেছিলেন, ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই, বাংলার ঘরে ঘরে, মুক্তির আলো ওই জ্বলছে।’ সেই আলোর ঝর্ণাধারায় প্রজ্বলিত হয়ে উঠেছিল বিশ্ব মানচিত্রে এক নতুন দেশ- বাংলাদেশ। গৌরবের, আনন্দের, অহঙ্কারের, আত্মমর্যাদার ও আত্মোপলব্ধির দিন আজ। বিজয়ের গৌরবে গৌরবান্বিত হওয়ার দিন।
দেদীপ্যমান, প্রসন্ন, আলোকিত বিজয় দিবস মানেই বাঙালীর নবজন্মকাল। বর্বর পাকিস্তানী হানাদার সেনাবাহিনী আর তাদের এ দেশীয় দোসর শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করার দিন। আর জাতি হিসেবে বাঙালীর সহস্র বছরের সাধনা শেষে অর্জিত চূড়ান্ত বিজয়ের দিন। স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার দিন। বিজয়ের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মত্যাগ ও সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তাদের রক্তে, অবদানে মুক্ত হয়েছিল স্বদেশ, উড়ছে পত পত করে স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা। সাড়ে সাত কোটি মানুষের অসীম ত্যাগ আর সাহসিকতার ফসল ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিজয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অকুতোভয় সংগ্রাম, রাজনৈতিক নির্দেশনায় লড়াই করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা, যাদের অবদান এই স্বাধীন দেশ।
একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর মেশিন গান, কামান, ট্যাঙ্ক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শুরু করেছিল নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। রুখে দাঁড়িয়েছিল বাঙালী বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে। তুলে নিয়েছিল হাতে প্রতিরোধের অস্ত্র। গড়ে তুলেছিল দুর্গ। সম্মুখসমরে জীবনবাজি রেখে লড়াই করেছিল। সেদিন কেবল পাকিস্তানী সেনার সঙ্গে নয়, তাদের এ দেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হয়েছে। এরা যুদ্ধকালে পাকিস্তানী হানাদারদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে গ্রাম-শহর, নগর-বন্দর, বাড়ি-ঘরে। অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ ও হত্যাসহ অমানুষিক সব কর্মকান্ড সংঘটিত করেছে।
বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে আলবদর, রাজাকাররা বাঙালীর শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরও হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাকিস্তানী হানাদার ও তাদের সহযোগীরা পর্যুদস্ত হয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। রেসকোর্স ময়দানে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানী সেনারা। দখলদার বাহিনীর দখলমুক্ত হয় বাংলাদেশ। বাঙালী রক্তাক্ত প্রান্তরে নিঃশ্বাস নেয় প্রাণভরে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ যখন পুনর্গঠনের পথে ঠিক তখন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মাথা তুলে দাঁড়ায়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক স্বৈরশাসকরা পরাজিত শক্তির শুধু পুনর্বাসন নয়, রাষ্ট্র ক্ষমতায়ও অংশীদার করে। স্বাধীনতার পর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত থাকে। কিন্তু সামরিক জান্তা শাসকরা সে বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয়। সাজাপ্রাপ্তসহ বিচারাধীনদের কারাগার থেকে মুক্ত করে রাজনীতির চৌহদ্দীতে নিয়ে আসে। শাসকরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃতই কেবল নয়, ধামাচাপা দিয়ে রাখে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম ইতিহাস ধারণ করতে না পারে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি ক্রমশ প্রকট হতে থাকে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেন নির্বাচনী ওয়াদানুযায়ী। বিচারের বাণীকে নীরবে নিভৃতে কেঁদে ফেরার পথ রুদ্ধ করে দেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের মামলার রায় প্রদান ও শাস্তি হচ্ছে। শাস্তির আদেশও কার্যকর হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। যে রাষ্ট্রের মর্মবাণী হবে গণতন্ত্র। যে রাষ্ট্রে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মুক্তির আস্বাদ নিয়ে বসবাস করবে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদ, ধর্মান্ধতা, মৌলবাদকে প্রতিহত করে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ওইসব অপশক্তিকে সমূলে উৎখাত করাই এখন লক্ষ্য। এবারের বিজয় দিবসের শপথ, তাই সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও শাস্তি, জঙ্গীবাদ নির্মূল করা। গণতন্ত্রের অব্যাহত অগ্রযাত্রার পথে সব নিশ্চিত করা এবং বাধা দূর করা।

দুর্নীতি রোধে সামাজিক প্রতিরোধ চাই

শুধু বাংলাদেশ নয়, দুর্নীতি এখন বৈশ্বিক সমস্যা। একসময় দুর্নীতিতে এক নম্বরে ছিল বাংলাদেশ।
দুর্নীতির দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যে জাতিগত প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিল, তা সংগঠিত করা সম্ভব হয়নি নানা কারণে। ফলে দেশে দুর্নীতিবাজদের শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে। একটি প্রভাবশালী মহল এখনো নানাভাবে দুর্নীতি করে যাচ্ছে। ঋণের নামে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ, পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস করে অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জন করছে একটি শ্রেণি। তাদের পেছন থেকে উৎসাহ জোগাচ্ছে কিছু প্রভাবশালী। শুধু দুর্নীতি নির্মূল নয়, এদের মুখোশ উন্মোচনও জরুরি।
দেশের দুর্নীতি তখনই বিস্তার লাভ করে, যখন তা প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়। সাংবিধানিকভাবে দেশের সব নাগরিকের অধিকার সমান হলেও সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে অনেকে বাড়তি সুবিধা নিয়ে থাকে। সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
সব সময় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা ঘনিষ্ঠরাই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে বাংলাদেশ এখনো মুক্ত হতে পারেনি। অতীতে সরকার কাঠামোয় ক্রমবর্ধমানভাবে প্রভাবশালী ও অশুভ একটি চক্রের তৎপরতায় দেশে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করতে দেখা গেছে। সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেককেই রাতারাতি ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হতে দেখা গেছে। দুর্নীতিবাজ শ্রেণি এভাবেই সমাজের নানা স্তরে প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের সহায়-সম্পত্তি বাড়িয়ে থাকে। এ ধরনের দুর্নীতিবাজের উত্থানে সমাজেও এক ধরনের বৈষম্য দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসের আলোচনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানও বলেছেন, ‘আমাদের সমাজে দুর্নীতিবাজ নামের শকুনের উদ্ভব হয়েছে। এদের উৎখাত করতে চাই। ’ তিনি বলেছেন, দুর্নীতিবাজরা ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে। তাদের বিষদাঁত ভেঙে দিতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারো একার পক্ষে দুর্নীতি দমন করা সম্ভব নয়। সমাজের সর্বস্তরে প্রতিরোধ গড়ে তোলা গেলে দুর্নীতি দূর করা কঠিন হবে না।
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়টি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলা গেলে সমাজ ও রাষ্ট্র দুর্নীতিমুক্ত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা আশা করব, সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি প্রতিরোধে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালিত হবে। সবার সহযোগিতায় সমাজ একদিন দুর্নীতিমুক্ত হবে।

জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি করতে হবে

আরেকটি সুখবর। চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই জনশক্তি রপ্তানিতে আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এই ১১ মাসে কাজ নিয়ে বিভিন্ন দেশে গেছে বাংলাদেশের ৯ লাখ ৩১ হাজার ৮৩২ জন শ্রমিক। ডিসেম্বর মাসের জনশক্তি রপ্তানি যোগ হলে এ সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলেই আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক গেছে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায়। এ দুটি দেশে শ্রমিক যাওয়ার পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, কাতার, ওমানেও আগের তুলনায় বেশি শ্রমিক গেছে। কিছু নতুন বাজারও সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের শ্রমবাজার আছে এমন কয়েকটি দেশে শ্রমিক যাওয়ার পরিমাণ কিছুটা কমেছেও। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধির এই গতি ধরে রাখতে হলে আরো কার্যকরভাবে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
জনসংখ্যাকে যদি জনসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে শুধু জনসম্পদই একটি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে অনেক দেশই এই সত্য প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ছোট, জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সীমিত। বেকারত্বের হার অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবেই জনশক্তি রপ্তানি আমাদের জন্য অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু এখনো আমরা মূলত অদক্ষ শ্রমিকই রপ্তানি করি বেশি। অথচ বিশ্বে অদক্ষ জনশক্তির চাহিদা ক্রমেই কমে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর কিছুটা জোর দেওয়া হয়েছে, তবে তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করা গেলে বিদেশে তাদের উপার্জন বাড়ে, দেশেও তারা অনেক বেশি পরিমাণে অর্থ পাঠাতে পারে। জনশক্তি রপ্তানির সুযোগও বাড়ে। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় অনেক বেড়েছে। প্রথম পাঁচ মাসে শুধু ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৭৬ কোটি ৮৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৭ শতাংশ বেশি। আর শুধু নভেম্বর মাসে গত বছরের নভেম্বরের তুলনায় রেমিট্যান্স বেশি এসেছে ২৮ শতাংশেরও বেশি। আমরা যত বেশি দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করতে সক্ষম হব, আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ তত বেশি হবে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় তেলনির্ভর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছিল। আমাদের জনশক্তি রপ্তানি মূলত মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক হওয়ায় তার প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের শ্রমবাজারে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ইউরোপেও জনশক্তির চাহিদা কমে গিয়েছিল। এ রকম পরিস্থিতি যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে হতে পারে। তাই যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করেও আমাদের শ্রমবাজার যেন একটি টেকসই অবস্থান ধরে রাখতে পারে, সে জন্য নানামুখী পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

 

পেঁয়াজের দাম কমছে

শীতের সবজির দাম কমলেও স্বস্তি ফেরেনি বাজারে। ভোক্তাদের অস্বস্তির কারণ পেঁয়াজ ও চাল।
আমনের মৌসুমেও চালের দাম কমেনি। অথচ কৃষকের মুখে হাসি। কারণ বন্যার পর ফলন ভালো হয়েছে। সরকারও আমন সংগ্রহের জন্য যে দাম নির্ধারণ বিস্তারিত

তথ্য ও প্রযুক্তির প্রসার জরুরী

প্রযুক্তি, বিশেষ করে তথ্য-প্রযুক্তি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। পাঁচ দশক আগেও টেলিফোনে কথা বলার জন্য বুকিং দিয়ে অপেক্ষায় থাকতে হতো।
কখন লাইন পাওয়া যাবে, সেটিও ছিল অনিশ্চিত। আর এখন মোবাইল ফোনে শুধু বাংলাদেশে নয়, দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তে যেকোনো সময় কথা বলা যাচ্ছে। যার সঙ্গে কথা হচ্ছে, তাকে দেখাও যাচ্ছে। আশির দশকেও যেখানে একটি পার্সোনাল কম্পিউটার বা পিসিতে তথ্য ধারণের ক্ষমতা ছিল কয়েক মেগাবাইট, এখন সেখানে ছোট ছোট ল্যাপটপেও তথ্য ধারণক্ষমতার হিসাব গিগাবাইট ছাড়িয়ে টেরাবাইটে চলে যাচ্ছে। একজন ব্যবসায়ী আমেরিকায় বসেও বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন। দুনিয়ার যেকোনো বিষয়ে হাতের কাছে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা কয়েক দশক আগেও ছিল কল্পনার অতীত। প্রযুক্তির এই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যারা এগোতে না পারবে, তারা ক্রমেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। আমাদের সৌভাগ্য, গত সাত-আট বছরে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই আজ অটোমেশনের ছোঁয়া লেগেছে।
তাতে কাজের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি দুর্নীতি-অনিয়ম ক্রমেই কমে আসছে। এসবের জন্য দ্রুত জনবল গড়ে উঠছে। নতুন নতুন টেক পার্ক গড়ে উঠছে। আর সেসবের ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যেও। তথ্য-প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি এক বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, এক দশক আগেও যা ভাবা যেত না। আউটসোর্সিংয়ের আয় ২০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে বছরে পাঁচ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা যে খুব দ্রুতই অর্জিত হবে, তা এখন এ ক্ষেত্রে ওয়াকিফহাল প্রায় সবাই স্বীকার করছেন। এমন এক পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ডিজিটাল সম্মেলন ২০১৭। গত বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক সফল দৃষ্টান্ত সোফিয়া নামের কন্যা রোবট। রোবট সোফিয়া প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এবং পরে অতিথিদের উদ্দেশে যে আলাপচারিতা করে, তা যেন কল্পনাকেও হার মানায়। সোফিয়াকে একনজর দেখার জন্য সেখানে প্রচণ্ড ভিড় জমে যায়। সোফিয়ার উদ্ভাবক ড. ডেভিড হ্যানসন প্রযুক্তির প্রতি বাংলাদেশিদের এমন আগ্রহ দেখে অভিভূত হয়েছেন। ভবিষ্যতে সোফিয়ার নির্মাতা হ্যানসন রোবটিক্সের পক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ব্যাপারেও তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের জন্য এটি অবশ্যই একটি সুখবর। আর তা সম্ভব হয়েছে গত সাত-আট বছরে বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির একটি ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে বলেই।
তথ্য-প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশে অগ্রগতির যে ধারা সূচিত হয়েছে, তা আরো এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা আরো বাড়াতে হবে। ইতিমধ্যে সাবমেরিন কেবল ডাবল হয়েছে। মার্চের মধ্যে নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহ উক্ষেপণের কথা রয়েছে। নেটওয়ার্কিং আরো উন্নত করতে হবে। ইন্টারনেটের ব্যয় কমাতে হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের তরুণরা অবশ্যই মেধাবী, তারা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাবেই।