বিভাগ: সম্পাদকীয়

বাজার স্থিতিশীল করতে পদক্ষেপ জরুরী

নির্বাচনের বছরে এসে ব্যাংকঋণ কমানো এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার গুজবে আবার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। সপ্তাহের প্রথম দিন রবিবার বড় ধরনের ধস নামে। প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দরপতনের ঘটনা ঘটে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে। সূচকে ব্যাপক পতনের পাশাপাশি দুই বাজারে লেনদেনে থাকা কম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ৯০ শতাংশের বেশি শেয়ারের দাম কমে যায়। সপ্তাহের দ্বিতীয় দিন প্রথম আড়াই ঘণ্টায় পুঁজিবাজারের মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে কিছুটা নেতিবাচক ছিল। পরে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়। ব্যাংক আমানতে সুদের হার বৃদ্ধি, মুদ্রানীতি, ব্যাংক আমানত-ঋণের অনুপাত কমানো নিয়ে কয়েক দিন ধরেই পুঁজিবাজার ধুঁকছিল। ক্রমাগত নিম্নমুখী হওয়ায় অনেকে আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করেছে। পুঁজিবাজারের দরপতন নিয়ে মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন, ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ৩০ ব্রোকারেজ হাউস জরুরি সভা করেছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ব্যাংকের ঋণ-আমানত ইস্যুকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আতঙ্ক থেকে শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়ায় বাজারে পতন ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ব্যাংক আমানত-ঋণের হার কমানোর কোনো প্রভাব বাজারে পড়ার কথা নয়। তাদের মতে, পুঁজিবাজার নিয়ে ভয় পাওয়ার মতো কিছুই এখনো ঘটেনি। মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন মনে করে, আমানতের হার বাড়ানো হলে পুঁজিবাজারে অনাগ্রহ সৃষ্টি হবে। সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেশি হওয়ায় এখনো বিনিয়োগযোগ্য বড় ফান্ড বাইরে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে বাজারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তা সামাল দিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতন বা অস্থিরতার প্রধান কারণ হতে পারে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার গুজব। কিন্তু একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, ২০১৪ সালের বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময়ও বাজারে এত দরপতন হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহ সংকোচনের যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তার প্রভাবও বাজারে পড়বে। কিন্তু এভাবে বাজারের পতন হওয়ার কথা নয়। পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ধস নামার আগে উল্লম্ফন দেখা যায়। এবার তা হয়নি। কাজেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

কৃষি জমির মাটি পরীক্ষা

১৬ কোটি মানুষের খাদ্য জোগাতে গিয়ে বেশির ভাগ জমিতে তিন ফসল, এমনকি চার ফসলও করা হয়। একই ফসল বারবার করা হচ্ছে। কোনো বিরতি না দিয়েই জমিতে একের পর এক ফসল করায় মাটির পুষ্টিগুণ যে একেবারেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে আমরা নজরই দিচ্ছি না। ফলে দিন দিনই রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে সার ব্যবহৃত হয়েছিল ৩৬ লাখ ৮২ হাজার টন, সেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ব্যবহৃত হয়েছে ৪৮ লাখ টন। সার ব্যবহারের ধরনও বদলাচ্ছে। আগে সাধারণত দুই ধরনের সার ব্যবহৃত হতো, এখন ব্যবহৃত হয় আট ধরনের সার। এর একটা বড় অংশই আমদানি করতে হয়। এতে একদিকে ফসল উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে রাসায়নিক সারের অসম ব্যবহারেও মাটির পুষ্টিগুণ আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক সময়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট আবাদি জমির ৬১ দশমিক ৬ শতাংশেই জৈবপদার্থের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে এবং এই ঘাটতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ অবস্থায় কৃষিবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আবাদি জমির পুষ্টিগুণ রক্ষায় মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার ওপর দ্রুত নজর দিতে হবে।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, ফসল ফলাতে কৃষকরা রাসায়নিক সার ব্যবহারের কথা চিন্তাও করত না। জৈব সারই ছিল তাদের প্রধান ভরসা। আর এখন জৈব সারের ব্যবহার নেই বললেই চলে। তখন একবার ফসল ফলানোর পর জমিগুলো কিছুটা সময় পতিত রাখা হতো। নানা রকম ডাল, সরিষা, পেঁয়াজ, মরিচ ইত্যাদির চাষ করা হতো। এখন সেসবের জায়গা দখল করেছে উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান চাষ, যা মাটি থেকে অতিমাত্রায় পুষ্টি শোষণ করে। ফলে ক্রমেই বেশি করে সার ব্যবহারের প্রয়োজন বাড়ছে। আবার বিরতি না পাওয়ায় মাটি নিজে থেকেও পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মাটির স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা এতটাই কমে যাবে যে তখন মাটির নিজস্ব উর্বরতা বা উৎপাদন ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যাবে এবং তা পুরোপুরি সারনির্ভর হয়ে পড়বে। সে অবস্থায় কৃষিতে যে মহাবিপর্যয় নেমে আসবে, তা কি আমরা মোকাবেলা করতে পারব?
কৃষকরা এখন অনুমানের ওপর জমিতে সার দেয়। যে জমিতে ১০ কেজি ইউরিয়া প্রয়োজন সেখানে ২০ কেজি বা তারও বেশি ব্যবহার করে। মাটি পরীক্ষা করে চাহিদা অনুযায়ী সার দেওয়া গেলে সারের প্রয়োজন যেমন কম হতো, তেমনি মাটিও কম ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু মাটি পরীক্ষা করার সুযোগ তাদের নেই। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগও তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে পারছে না। আমরা আশা করি, সরকার জরুরি ভিত্তিতে বিষয়গুলো বিবেচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন

চলতি বছরের শেষার্ধে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন সে লক্ষ্যে কাজ করছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে। দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি এখনো প্রচারে নামেনি। অন্তত চলতি মাসের ৮ তারিখ পর্যন্ত তাদের ব্যস্ততা জিয়া অরফানেজ মামলার রায় নিয়ে। এই রায় সামনে রেখে দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়েছে। বিএনপি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আর সে কারণেই নির্বাচনের বছরে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেশি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী এরই মধ্যে অংশীজনদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক হয়েছে। সেসব বৈঠকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁদের পরামর্শ তুলে ধরেছেন। নির্বাচন কমিশনও বলেছে, সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে তাদের সদিচ্ছার কোনো অভাব নেই। গত শুক্রবার সিইসির বক্তব্যেও ঠিক একই কথার পুনরাবৃত্তি হলো। একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এখন যে প্রশ্নটি সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো, বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না। দেখা যাচ্ছে, রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে পরস্পরের দোষারোপ করে যাচ্ছে। বিএনপির অভিযোগ, আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায়। বিএনপির এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির দায়িত্ব। তাদের ভোটে আনা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নয়। আওয়ামী লীগ মনে করে, বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার জন্য টালবাহানা করছে। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, সে প্রসঙ্গে বক্তব্য রেখেছেন। অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে তাদের দাবি থেকে সরে আসেনি। বিএনপির নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাবও গ্রহণযোগ্য নয় বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। ৮ ফেব্রুয়ারি সামনে রেখে বিএনপি বলছে, সাজানো রায় দিয়ে তাদের নেত্রীকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চক্রান্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘বিএনপি একটি বড় দল। তাদের ছাড়া সব দলের অংশগ্রহণ হয় কী করে? বিএনপি ছাড়া নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না।’
গণতন্ত্রে নির্বাচনই শেষ কথা নয়। কিন্তু তার পরও নির্বাচন হতে হবে। কোনোভাবেই তা বিতর্কিত হতে দেওয়া যাবে না। সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য কমিশনকেই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। আমরা আশা করব, নির্বাচন কমিশন যেমন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোও দায়িত্বশীল হবে। সবার সহযোহিতায় একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে।

মাদকমুক্ত শিক্ষাঙ্গন

সর্বনাশা মাদকের ভয়াবহ থাবায় আক্রান্ত সারা দেশ। মাদক কারবারিদের লক্ষ্য অপেক্ষাকৃত তরুণ ও যুবারা। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকের বিস্তার ঘটেছে। গোয়েন্দারা সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে মাদক কারবারে জড়িত শিক্ষার্থীদের তালিকাও করেছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযান চালাতে চেয়েও পারেনি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনীহার কারণে। ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ও আটটি কলেজে ৪২৭ মাদক কারবারির তালিকা করেছে গোয়েন্দারা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের নেতা ও পুলিশের প্রত্যক্ষ মদদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের বেচাকেনা চলে। গোয়েন্দাদের তালিকাভুক্ত অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে যাওয়ার পরও ক্যাম্পাসভিত্তিক মাদক বাণিজ্যে জড়িত। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক মাদক কারবারিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশসহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চানখাঁর পুল, পলাশী, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে মাদক বিক্রি করে থাকে। মাদক বিক্রির কাজে টোকাইদেরও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের নেতাদের নাম ভাঙানোর কারণে কেউ কিছু বলতে সাহস করে না। এই সুযোগে অভিযান না চালিয়ে পুলিশও নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়েছে। হাত বাড়ালেই মিলছে নানা মাদকদ্রব্য।
বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। এখানে উচ্চতর গবেষণা হবে। হবে জ্ঞান সাধনা। সভ্যতার মানদণ্ডে বিশ্বমানের মানুষ এখান থেকে বেরিয়ে আসবে। উন্নত রুচির পরিচয় দিয়ে তারাই জাতির হাল ধরবে। কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি মাদকের আসর বসে, শিক্ষার্থীরাই যদি মাদকের কারবারি হয়ে যায়, তাহলে তো ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হতেই হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট কিংবা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ নয় দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের পাঠান বুকভরা আশা নিয়ে। সেই সন্তান যদি শিক্ষার পরিবর্তে মাদকাসক্ত হয়ে ফিরে আসে, তাহলে সেই পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসাটাই তো স্বাভাবিক। দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধাবীরাই ভর্তির সুযোগ পায়। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়লে তার দায় কে নেবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কি কোনো দায় নেই? মাদকাসক্তরা নিজেদের যেমন ধ্বংস করছে, তেমনি পরিবারকেও ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে মাদকসেবী ও কারবারিদের দ্বারা। মাদক সেবনই শুধু নয়, নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে তারা।
এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকেই ভূমিকা রাখতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যেমন অভিযান চালাতে পারে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেও গোয়েন্দাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো ছাত্রসংগঠন বা ছাত্রনেতার কারণে পুরো প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট হতে পারে না। কয়েকজনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। আমরা আশা করি, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ মাদক দূর করতে ভূমিকা রাখবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় মাদকমুক্ত হবে।

পুঁজিবাজার স্থিতিশীল হউক

নির্বাচনের বছরে এসে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি ঘোষণার পর থেকেই দেশের দুই পুঁজিবাজারে অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। লোকসান কিংবা কম দামে শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগকারীরা সরে যাচ্ছে এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে গণমাধ্যমে। গুজব ছড়ানো হয়েছে ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রায় নিয়েও। বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করার মিথ্যা তথ্য ও গুজবের কারণে এরই মধ্যে বাজারে পতন ঘটেছে। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী মুদ্রানীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দোহাই দিয়ে বাজার প্রভাবিত করতে চাইছে। সাম্প্রতিক দরপতনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ডিএসইর ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বিনিয়োগকারীদের গুজবে কান দিয়ে ভালো শেয়ার বিক্রি না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, সুযোগসন্ধানীরা গুজব ছড়িয়ে বাজার অস্থির করতে চাইছে। এই সুযোগসন্ধানীরাই কম দামে কেনা শেয়ার বেশি দামে বাজারে বিক্রি করবে। উভয় সংগঠনের নেতাদের ভাষ্য মতে, দ্রুতই বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। বাজার বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, মুদ্রানীতিতে এমন নেতিবাচক কোনো কিছু নেই, যার জন্য বাজারের পতন ঘটতে পারে। মুদ্রানীতিতে টাকাপ্রবাহ, মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে নির্দেশনা থাকে। এর প্রভাব শেয়ারবাজারে কেন পড়বে? বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, তাতে পুঁজিবাজার করপোরেট গ্রাহক ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে গ্রহণযোগ্য করবে। তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। ব্যাংকে আমানতের সুদ বাড়লে তাতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কিছুটা কমতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক হওয়াটা স্বাভাবিক; কিন্তু তার ফলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার কথা নয়। মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে বাজার প্রভাবিত করতে ব্যাংকের ঋণ ও আমানত অনুপাতের দোহাই দেওয়া হয়েছে। আগের ব্যাংক কম্পানি অ্যাক্ট অনুযায়ী মোট দায়ের ১০ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সীমা ছিল। বর্তমান ব্যাংক কম্পানি অ্যাক্ট অনুযায়ী রেগুলেটরি ক্যাপিটালের ২৫ শতাংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঘোষিত মুদ্রানীতির কোনো প্রভাব বাজারে পড়বে না এমন পরিস্থিতি দেখার পর ছড়ানো হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতার গুজব।
এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে ডিএসই ও সিএসই বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করে মূল বিষয়টি তাদের অবহিত করা প্রয়োজন। আমরা আশা করব, পুঁজিবাজারের অস্থিরতা কাটাতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাঁচা পাট রফতানি

কাঁচা পাটের রপ্তানি আবার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য অভ্যন্তরীণ চাহিদা, মূলত বিভিন্ন পণ্যের জন্য মোড়ক তৈরির প্রয়োজন মেটাতে সরবরাহ পর্যাপ্ত মাত্রায় রাখা। কাঁচা পাটের রপ্তানি আগেও নিষিদ্ধ হয়েছে। কোনোবারই রপ্তানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি, এবারও হয়নি। তাই তাঁরা ক্ষুব্ধ। তাঁদের আশঙ্কা, এ সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়বে, পাটের দাম কমে যাবে, উৎপাদকরা পাট উৎপাদনে নিরুৎসাহী হবেন। তাঁদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার কারণ স্পষ্ট করেনি সরকার। রপ্তানিকারকরা আগের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে উঠছিলেন মাত্র, তখনই আবার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। এটা তাঁদের জন্য মারাত্মক আঘাত। অনেকের বিদেশি ক্রয়াদেশ আছে, আচমকা নিষেধাজ্ঞায় তাঁদের বড় ক্ষতি হবে। তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ছিল। এ সিদ্ধান্তে পাট উৎপাদকরাও শঙ্কিত।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় গত ১৮ জানুয়ারি তিন ধরনের কাঁচা পাট রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আদেশ জারি করেছে। বলা হয়েছে, নতুন আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাংলা তোষা রিজেকশন (বিটিআর), আনকাট ও বাংলা হোয়াইট রিজেকশন (বিডাব্লিউআর)—এ তিন ধরনের কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ থাকবে; তবে অন্যান্য ধরনের কাঁচা পাট রপ্তানি করা যাবে। বাংলা অঞ্চলে ব্যাপক মাত্রায় পাটের চাষ ও পাটের ব্যবসার শুরু প্রায় ২০০ বছর আগে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিয়ামক ভূমিকার কারণেই পাট সোনালি আঁশ আখ্যা পেয়েছিল। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি আন্তর্জাতিক বাজারে কৃত্রিম সুতার সরবরাহ বাড়ায় পাটের চাহিদায় টান পড়ে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে পাটের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে পাট নিয়ে আমাদের গর্ব চূর্ণ হয়। উৎপাদনে ধস নামে। পরবর্তী সময়ে সরকার পাটের উৎপাদন, বাজার ও গৌরব ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। এতে কিছু কাজ হলেও সোনালি পর্বের প্রত্যাবর্তন এখনো হয়নি।
বাংলাদেশ পর্বে কাঁচা পাটের রপ্তানি বিভিন্ন সময়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ১৯৮৪, ২০১০ বা ২০১৫ সালে রপ্তানি নিষিদ্ধ করার আগে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। ২০১০ সালে পাটদ্রব্য দিয়ে পণ্যের মোড়ক তৈরি বাধ্যতামূলক করা হয়। তখন দেশের পাটকলগুলোর জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এক মাস কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ রাখা হয়েছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলো মূলত পণ্য মোড়কজাত করার জন্য চট বা বস্তা তৈরি করে। আর বেসরকারি মিলগুলো মূলত স্পিনিং অর্থাৎ সুতা তৈরি করে। পাটের দেশি ভোক্তা মূলত তারাই। সরকার অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটাতে রপ্তানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে; তবে উৎপাদক, রপ্তানিকারক, প্রস্তুতকারক সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া উচিত। উৎপাদিত সব পাট যদি অভ্যন্তরীণভাবে কাজে লাগানো না যায়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা ক্ষতিরই কারণ হবে। সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ রক্ষা করে, তাদের মতকে সম্মান দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

তথ্য প্রযুক্তি আইন

তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে একটি বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। এই ধারার কারণে বহু সাংবাদিককে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়েছে। অনেককে কারাগারেও যেতে হয়েছে। বাধ্য হয়ে এই ধারার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো ফলোদয় হয়নি বলেই মনে করছেন নেতৃস্থানীয় সাংবাদিকরা। সোমবার ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’-এর যে খসড়াটি মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে, তার ৩২ ধারা এবং বাতিল হওয়া ৫৭ ধারার মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই বলেই মনে করেন তাঁরা। তাঁদের মতে, ৫৭ ধারার মতোই এই ধারার কারণেও সাংবাদিকদের হয়রানির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং এর ফলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ব্যাহত হবে।
সভ্য দুনিয়ায় গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গণমাধ্যম রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের অসংগতি, অনিয়ম, দুর্নীতি ইত্যাদির তথ্য তুলে ধরে জনগণের অর্থের অপচয় রোধ করে এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে। গণমাধ্যমের সেই কাজগুলো এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার গোপনীয় বা অতিগোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কেউ ধারণ করলে তা হবে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির শামিল। প্রথমবারের অপরাধে শাস্তি হবে ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা। দ্বিতীয়বার কেউ একই অপরাধ করলে শাস্তি হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা। এ অপরাধে গ্রেপ্তার হলে জামিনও পাওয়া যাবে না। এসব সংস্থার প্রায় সব ফাইলেই গোপনীয় বা অতিগোপনীয় কথাটি লেখা থাকে। বিভিন্ন সূত্রে সেসব নথির কপি সংগ্রহ করে তা যাচাই-বাছাইয়ের পর সাংবাদিকরা সাধারণত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করে থাকেন। এখন তাঁকে যদি গুপ্তচরবৃত্তির মতো কঠিন অপরাধের পর্যায়ভুক্ত করা হয় এবং এমন কঠোর দণ্ড দেওয়া হয়, তাহলে কোনো সাংবাদিকই সেই ঝুঁকি নিতে রাজি হবেন না। তাতে লাভ হবে দুর্নীতিকারীদের। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ ও দেশের মানুষ। শুধু সাংবাদিক নয়, অনেক শ্রেণি-পেশার মানুষও এই আইনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। খসড়া আইনে মোট ১৪টি ধারার অপরাধকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আদালতে অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই অনেককে বছরের পর বছর কারাগারে কাটাতে হতে পারে। তাই একে অনেকে মৌলিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি বড় হুমকি হিসেবেও বিবেচনা করছেন।
প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে সংগতি রেখে স্বাধীন সাংবাদিকতাও এগিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল। সে ক্ষেত্রে এমন কোনো আইন প্রণয়ন করা মোটেও কাম্য হবে না, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে কিংবা মানুষের বাক স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে। আমরা মনে করি, সংসদে পাস হওয়ার আগে আইনটি আবার বিবেচনা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে।

নিরাপদ পানির ব্যবস্থা জরুরী

ওয়াসার পানিতে মানুষের আস্থা নেই। তাই অফিসে তো বটেই, বাড়িতেও অনেকে নিরাপদ ভেবে জারের পানি পান করে। কিন্তু সেই পানি কি আসলেই নিরাপদ? গণমাধ্যমে আসা খবরাখবরে বরং ভিন্ন তথ্যই পাওয়া যায়। চাহিদা বাড়ায় ও লাভজনক হওয়ায় অনেকেই এখন ‘বিশুদ্ধ পানি’র ব্যবসায় নেমে গেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর অভিযানে এমন বহু প্রতিষ্ঠান ধরাও পড়েছে, যারা ওয়াসার পানি জারে ভরে বাজারে সরবরাহ করছে। গত রবিবার বিএসটিআই ও র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় থাকা এমন চারটি প্রতিষ্ঠান সিলগালার মাধ্যমে বন্ধ করে দিয়েছেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর দুই লাখ টাকা জরিমানা ও দুই কর্মচারীকে তিন মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে এই মারাত্মক ক্ষতিকর অসাধুতা বন্ধ হবে কি?
ঢাকা সহ সারাদেশে যত প্রতিষ্ঠান বর্তমানে জারে পানি সরবরাহ করে, তার অর্ধেকেরই কোনো লাইসেন্স নেই। যাদের লাইসেন্স আছে, তাদেরও অনেকেই মানসম্মত পানি সরবরাহ করে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে জীবাণুমুক্ত করার মেশিন থাকলেও তারা উৎপাদন খরচ কমিয়ে লাভের অঙ্ক আরো বাড়াতে সেসব মেশিন ব্যবহার করে না। ফলে তাদের পানিও নিরাপদ হয় না। মনুষ্যবর্জ্যে থাকা কলিফর্ম জীবাণু প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় সেসব পানিতে। তাহলে অর্থ খরচ করে এসব পানি কিনে লাভ কী? আর রাস্তার পাশের বা ফুটপাতের দোকানগুলোতে থাকা ‘বিশুদ্ধ পানি’র তো কথাই নেই। অনেককেই দেখা গেছে, আগে দু-একটি পানির জার সংগ্রহ করে, তারপর ওয়াসার পানি দিয়ে সেই জার ভর্তি করে মানুষের কাছে বিক্রি করে। প্রতিদিন এ রকম পানি পান করে বহু মানুষ অসুস্থ হচ্ছে।
ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, নানা রকমের পেটের পীড়া বাংলাদেশের খুব পরিচিত রোগ। এসবের প্রধান কারণ অনিরাপদ পানি। তাই বিশুদ্ধ পানির জন্য মানুষের যে আকুতি, তা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এর সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির প্রতারক। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) ঢাকায় জারের পানি নিয়ে একটি গবেষণা সম্পন্ন করেছে। তাতে জানা গেছে, এসব জারের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে সর্বনিম্ন ১৭ এবং সর্বোচ্চ এক হাজার ৬০০ পর্যন্ত কলিফর্ম জীবাণু রয়েছে। এই পানি পান করলে অসুস্থ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকি কে নিয়ন্ত্রণ করবে? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এবং সামান্য কিছু অর্থদণ্ড এই ঝুঁকি কমাতে পারবে না। এর জন্য চাই কঠোর আইন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। আমরা আশা করি, সরকার এ ব্যাপারে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।

চিকিৎসার মান উন্নয়ন প্রয়োজন

দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা ৮৬ হাজার। এ হিসাব বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬৬ হাজার চিকিৎসক দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে সক্রিয় রয়েছেন। বিভিন্ন সরকারি চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত আছেন ২৩ হাজার, বাকি ৪৩ হাজার বেসরকারি খাতে নিয়োজিত। বেসরকারি খাতে নিয়োজিতদের বেশির ভাগ আবার বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ বা প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা। বিএমডিসির এ হিসাবে অস্বস্তির কারণ নেই, বরং স্বস্তি পাওয়ারই কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মানুষ এখনো সরকারি চিকিৎসকের কাছেই যেতে চায়, বেসরকারি চিকিৎসকের ওপর তাদের আস্থা কম। ফলে একাংশের ওপর প্রবল চাপ এবং অন্য অংশে চিকিৎসাপ্রার্থীর অভাব।
বলা হচ্ছে, মানুষের আস্থা পাচ্ছেন না বিপুলসংখ্যক বেসরকারি চিকিৎসক। নিম্নমানের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকরাই নাকি এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এ কথা ঢালাওভাবে বলে দেওয়া যায় না যে ওই সব প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিধারী সব চিকিৎসকই মানহীন, আর সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা সবাই উচ্চ মানসম্পন্ন। দেশে চিকিৎসকের চাহিদা আছে। না থাকলে বছর বছর বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা বাড়ত না এবং শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতো না। আসলে প্রয়োজনের এ বিষয়টিকে ঠিকমতো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। শিক্ষা বেসরকারি খাতে না যাওয়াই উচিত। গেলেও মান নিশ্চিত করা দরকার। সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির একটি মান ও রীতি আছে, বেসরকারি কলেজে কি তা নেই? তাহলে বিএমডিসির নিবন্ধন মিলছে কী করে! বেসরকারি কলেজে পাঠদানে কি মান রক্ষা করা হচ্ছে না? যদি রক্ষা না-ই করা হয়, তাহলে এর দায় কার? মূল দায় অবশ্যই চিকিৎসা-শিক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃৃপক্ষের। শুধু টাকার দিকে তাকিয়ে পাস করিয়ে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসককে অখ্যাত বা ছোট-মাঝারি পর্যায়ের বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় কেন?
সরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করেও অনেকে বিসিএসে উত্তীর্ণ হন না, আবার বেসরকারি কলেজ থেকে পাস করে কেউ কেউ উত্তীর্ণ হচ্ছেন। আসলে বিসিএস পাস করা চিকিৎসকের মানের নিয়ামক মানদণ্ড হতে পারে না। চিকিৎসকের যোগ্যতার পরিচয় লব্ধ বিদ্যার বাস্তব প্রয়োগে। সেদিকেই বরং নজর দেওয়া উচিত। সরকারি-বেসরকারি সব মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকরাই যাতে সে সুযোগ পান, তার ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎসাপ্রার্থীর মানসিকতায়ও কিছু সমস্যা রয়েছে। তাঁরা সাইনবোর্ডে চোখ রাখছেন বেশি। একসময় বেসরকারি খাতের বা স্বনিয়োজিত চিকিৎসকরা এ দেশে সুনামের সঙ্গে চিকিৎসা করেছেন। এখন সম্ভব হচ্ছে না কেন, ভেবে দেখা উচিত।

নদ-নদী রক্ষার বিকল্প নেই

নদীমাতৃক বাংলাদেশ। মানবদেহে শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে থাকা এর নদী, শাখা নদী, উপনদী, খাল-বিল, জলাশয় বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি নির্ধারিত করেছে। দেশটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আজ সেই নদীগুলোর খুবই করুণ অবস্থা। বহু নদী মরে গেছে। অনেক নদী মরার পথে রয়েছে। প্রবাহ না থাকায় খাল-বিলও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দখলে-দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে। নদীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশও যে ক্রমেই মৃত্যুর পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন অনেক ভূ-প্রকৃতি বিশেষজ্ঞ। কিন্তু দু-একটি নদীতে সামান্য ড্রেজিং করা হলেও বড় নদীগুলোতে ড্রেজিং নেই বললেই চলে। তাহলে বাংলাদেশের মৃত্যুই কি অবধারিত?
নদীগুলোর এই করুণ অবস্থার শুরু ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর থেকেই। ব্রিটিশ আমলে মোটামুটি নিয়মিতভাবে নদীর নাব্যতা রক্ষার জন্য নদী খনন করা হতো। তখন পলি জমে ভরাট হওয়ার প্রক্রিয়াও তুলনামূলক কম ছিল। পাকিস্তান আমলে নদী খননের কোনো প্রক্রিয়াই ছিল না। কোনো ড্রেজারও ছিল না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রথম চারটি ড্রেজার আনিয়ে নদী খনন, বিশেষ করে ফেরিঘাটগুলো সচল রাখার প্রক্রিয়া শুরু করে। এরপর আর কোনো ড্রেজার কেনা হয়নি। সেই চারটি ড্রেজারও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। সর্বশেষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর দুই ডজনের মতো ড্রেজার কেনার উদ্যোগ নেয়। বেশ কয়েকটি ড্রেজার এসে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের নদীগুলোতে বছরে যে পরিমাণ পলি জমে, তাতে সেই পলি সরিয়ে নদীগুলোকে নাব্য করতে কম করে হলেও ১০০ ড্রেজার প্রয়োজন। সেগুলো দিয়ে সার্বক্ষণিক ড্রেজিংয়ের জন্য বিশাল বাজেটেরও প্রয়োজন। সেটি নিঃসন্দেহে খুবই কঠিন কাজ। কিন্তু বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্যই তা করা একান্তভাবে প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয়ে যমুনা-পদ্মা নদীর তীর স্থিরকরণ এবং ভূমি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে প্রস্তাবিত প্রকল্পের রূপরেখা উপস্থাপনসংক্রান্ত অনুষ্ঠানে ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স উভয় ধরনের ডেজিং পরিচালনার কথা বলেছেন। এটি দ্রুততম সময়ে শুরু করা প্রয়োজন।
ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি নদীগুলোর দখল ও দূষণ ঠেকানো খুবই জরুরি। এ রকম অবস্থা সারা দেশেই, বিশেষ করে শহরসংলগ্ন ছোট ছোট নদীগুলোতে। নদী রক্ষায় উচ্চ আদালত থেকেও বারবার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনাগুলোও যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, নদী মরে গেলে স্থানীয় ভূ-প্রকৃতি বদলে যায়, কৃষিতে প্রভাব পড়ে, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, দেশ ক্রমে মরুকরণের দিকে এগিয়ে যায়। দেশের ১৬ কোটি মানুষের জীবনযাত্রা সচল রাখতে হলে, তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে নদী রক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার তা উপলব্ধি করছে এবং সে অনুযায়ী একের পর এক কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাবে।