বিভাগ: সম্পাদকীয়

শুভ হউক নববর্ষ

জীর্ণ পুরাতন ভেসে যায়। আসে নতুনের আবাহন। ধ্বনিত হয়, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা।’ চিরায়ত বাঙালীর জীবনের এক প্রাণস্পর্শী দিনের শুরু আজ ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। নতুনের কেতন উড়িয়ে বৈশাখ দেয় ডাক, খোলো খোলো দ্বার। বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল সবখানেই চির নতুনের আবাহন জেগে উঠছে ভোরের রাঙা সূর্যালোকে। বিদায় নিয়েছে পুরনো বছর ১৪২৪। এসেছে নতুন বছর ১৪২৫। বাঙালীর নববর্ষ। এবারের নববর্ষ এক নয়া বাস্তবতায় এসেছে। বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করার যে হীন চক্রান্ত চলে বিদায়ী বছরে, তাকে মোকাবেলা করে এগোতে হবে নববর্ষে। নতুন বর্ষ এসেছে ধ্বংসের বিপরীতে সৃজনের গান নিয়ে। নববর্ষের এ দিনটাকে বাঙালী জাতি অর্জন করেছে প্রতিকূল পরিস্থিতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে। আর স্বাধীন স্বদেশে বৈশাখীর আবাহনের অনুষ্ঠানে গ্রেনেড হামলায় বহু মানুষকে হতাহত করেছিল জঙ্গীরা।
স্বাগত নববর্ষ, ১৪২৫। আবহমানকাল ধরে বাঙালীর প্রিয় দিন। নববর্ষ হোক উত্থানের। নতুন বর্ষে জঙ্গীবাদ সন্ত্রাসবাদ হোক নির্মূল। নাশকতা, সহিংসতা হোক বন্ধ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক সম্পন্ন। স্বদেশ হোক নৈরাজ্যমুক্ত। পহেলা বৈশাখ বাঙালীর নববর্ষ। বৈশাখ বাঙালীর জীবনে কী গ্রামে কী শহরে এক নতুন সমারোহ নিয়ে আসে। হালখাতার পাতা খুলে যেমন তার বাণিজ্যের পুণ্যাহ উৎসব, তেমনি সাধারণ জীবনযাত্রায়ও একটা প্রাণচাঞ্চল্যÑ ধ্বনিত হয় ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’
বৈশাখ মানে গ্রীষ্ম ঋতুর শুরু। উজ্জ্বল রৌদ্রময় দিন। তেমনি আবার কালবৈশাখীর ভয়াল রূপ। জীবন সংগ্রামের দীক্ষা লাভের নানা রূপের সংমিশ্রণ নববর্ষের সূচনালগ্ন। এই সূচনালগ্নে নতুন ভাবনা-চিন্তায় কতটা এগিয়েছি আমরা তারও খতিয়ান করা দরকার। নতুন বছরে পদার্পণ। এর অর্থই হলো নতুনের সঙ্গী হওয়া। সামনের দিনগুলোকে বিনির্মাণের তাগিদ। আমাদের উদ্যম, আমাদের অধ্যবসায় সব নিয়োজিত হোক জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে। উৎসবের আনন্দ নতুন সঙ্কল্পে দীক্ষিত জাতির ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় নতুন শক্তির প্রেরণা হোক। এজন্য সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গত বাংলা বছরটিতে দেশ এগিয়েছে নানা ক্ষেত্রে। সব মিলিয়ে বলা যায় সরকার সফলতার একটি বছর পার করল। তবে সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব-নিকাশ করলে ১৪২৪ সালটি সরকারের সফলতার পাল্লাই ভারি।
বাংলা নববর্ষ সুর সঙ্গীতের, মেলা-মিলনের, আনন্দ ও উৎসবের, সাহস ও সঙ্কল্পের প্রেরণা জোগায়। দুঃখ-গ্লানি, অতীতের ব্যর্থতা পেছনে ফেলে তাই এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেয়ার দিনও পহেলা বৈশাখ। দেশের কল্যাণে সবাই এক কাতারে শামিল হয়ে এগিয়ে যাওয়ার অগ্নিশপথ নেয়ার দিনও এটি। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও বৈশাখের চেতনায় সবাই উজ্জীবিত হোক। নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে সবাই উদীপ্ত হোক। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। স্বাগতম ১৪২৫।

 

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন

প্রাণভয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে নিয়ে সত্যিকার অর্থেই বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে বাংলাদেশ। শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে দেশটির সরকার, বিশেষ করে সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নিয়েছিল। গত বছর ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী স্রোতের মতো আসতে থাকে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে বর্বরোচিত হামলা শুরু করে, তা বিশ্ব ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ঘটনা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ঘটনার নিন্দা করেছে। জাতিসংঘ একে ‘জাতিগত নিধনে’র প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অনেক বিশ্বনেতা একে গণহত্যা বলেছেন। বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চেষ্টা করেছে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে। এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের পক্ষ থেকে তেমন ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। সম্প্রতি হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে উঠেছে বিষয়টি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌঁসুলি একটি রুল চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, মিয়ানমার থেকে যেভাবে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে বিতাড়িত করা হয়েছে, তার বিচার করার এখতিয়ার হেগের আদালতের আছে কি না। আইসিসি এই বিচার করার এখতিয়ার রাখে এমন রুল পাওয়া গেলে রোহিঙ্গা বিতাড়নের ঘটনার তদন্ত করার পথ তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করা, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় মিয়ানমারকে বিচারের মুখোমুখি করার পথ খুলবে।
গত বছরের আগস্ট মাস থেকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে তা যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জেনেভা কনভেনশন ও জেনোসাইড কনভেনশন অনুযায়ী গণহত্যা বলতে সমষ্টির বিনাশ ও বিনাশের অভিপ্রায়কে বোঝায়। এই গণহত্যা বলতে বোঝায় এমন কর্মকাণ্ড, যার মাধ্যমে একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয় এবং এ সংক্রান্ত অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়। ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজল্যুশন ২৬০(৩) গণহত্যাকে এমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধ করতে সব রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। সংজ্ঞা অনুযায়ী, গণহত্যা শুধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ ক্ষেত্রে জাতিগত, গোষ্ঠীগত বা ধর্মগত নিধনের উদ্দেশ্যে যদি একটি লোককেও হত্যা করা হয় সেটাও গণহত্যা। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে তা সত্যিকার অর্থেই মানবতাবিরোধী অপরাধ।
এখন বাংলাদেশকে এই অপরাধের বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরবরাহ করতে হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রাখাও প্রয়োজন। সব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে রেখে পদক্ষেপ নিতে হবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা

 

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল-২০১৮’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে সোমবার রাতে। বিল উত্থাপনের আগে বিরোধীদলীয় একজন সদস্য জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিলটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। প্রস্তাবিত এ আইনের বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। সমাজে-সাহিত্য অঙ্গনে-গণমাধ্যমে বিস্তর কথাবার্তা হয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ বিষয়ে বিরূপ সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়। বলা হয়েছিল, ৫৭ ধারার ফাঁড়া যাতে আর না থাকে সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু খসড়ার ৩২ ধারা নিয়ে পুরনো শঙ্কা-সংশয় নতুন করে হাজির হয়। প্রতিবাদও করা হয়েছে। তখন সরকারপক্ষ বলেছিল, পর্যালোচনা করে শঙ্কা-সংশয় দূর করা হবে। কিন্তু সেই ৩২ ধারা রেখেই বিলটি উত্থাপন করা হলো।
৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা তথ্য-প্রযুক্তি আইন থেকে বাদ দেওয়া হলেও সেসব ধারার বিষয়বস্তু আরো বিশদে এ আইনে (৩২ ধারা) যুক্ত করা হয়। এ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করলে বা করতে সহায়তা করলে তিনি কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে অভিযুক্ত হবেন। এ জন্য তিনি অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। এতে বিরূপ সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সাংবাদিক মহল ক্ষুব্ধ হয়। তারা আন্দোলনও করে। পূর্ব অভিজ্ঞতার নিরিখে সবাই আশঙ্কা ব্যক্ত করেন যে এতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হবে। এর অপপ্রয়োগ হবে। বিলে জন-আপত্তির মূল বিষয়টিই রয়ে গেছে। এজাতীয় ধারা বাকবাধীনতা হরণ করার নামান্তর। এটি নাগরিকের ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশার লোকের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। ৩৯/খ ধারা নিয়েও আপত্তি রয়েছে। কয়েকটি অপরাধে জামিন না দেওয়ার বিধি সংযোজিত হয়েছে, যা নাগরিকের আইনি অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ বলেই গণ্য। পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতাবিষয়ক ধারাটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে।
আইনের অপপ্রয়োগের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় ‘বিধিবলে বলীয়ান’ হওয়ার সুযোগ থাকলে নাগরিকদের হেনস্তার হাত থেকে রক্ষার উপায় থাকবে না। ‘৩২’ ধারায় ‘৫৭’ ধারা ঢুকিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য জনবান্ধব হবে বলে আশা করা যায় না। ‘নিরাপত্তা’র জন্য এজাতীয় ধারা আবশ্যক নয়।

কোটা সংস্কার সমস্যা

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রবিবার রাতভর পুলিশের সংঘর্ষের পর সোমবার সকাল থেকে থমথমে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে বেশ কিছুদিন থেকেই সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের আন্দোলন চলছে। গত রবিবার পদযাত্রার কর্মসূচি দিয়ে শাহবাগে অবস্থান নেয় তারা। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখা হয়। রাতে পুলিশ রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাদের উঠিয়ে দেয় বলে সংবাদমাধ্যমের খবর। এরপর বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিতে থাকে। মধ্যরাতের পর আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অবগত আছেন বলে জানান। তাঁর নির্দেশনায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসবেন বলেও জানান তিনি। কিন্তু আন্দোলনকারীরা ক্ষান্ত হয়নি। দফায় দফায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষ চলতে থাকে। মধ্যরাতে একদল আন্দোলনকারী উপাচার্যের বাসভবনে হামলা চালায়। উপাচার্য ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোনো রকমে জীবন রক্ষা করেন। হামলাকারীরা উপাচার্য ভবনের ঘরে ঘরে তাণ্ডব চালায়।
সোমবার সকালে নিজের কার্যালয়ে গিয়ে উপাচার্য জানান, এটা সাধারণ বিক্ষোভকারীদের হামলা ছিল না। প্রশিক্ষিত হামলাকারীরা মুখোশ পরে তাঁর প্রাণনাশের জন্য গিয়েছিল বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে এক ব্রিফিংয়ে দাবি করা হয়েছে, উপাচার্যের বাসায় হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ কাজ করেছে বাইরের সন্ত্রাসীরা। ওই সন্ত্রাসীরা কারা? তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী? এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। ‘উপাচার্যের বাসায় হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই’ আন্দোলনকারীদের এ বক্তব্য সঠিক হলে ধরে নিতে হবে, আন্দোলনে ছদ্মবেশে ভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের লোকজনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকার বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের উত্তাপ বাইরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়েছে। রবিবার রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে। সোমবার ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে রাস্তায় নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিষয়টির যৌক্তিক সমাধান প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সরকারপক্ষ কোটাব্যবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষার আশ্বাস দিয়েছে। এ আশ্বাসে ৭ মে পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। এর আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও বিষয়টি আলোচিত হয়। বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘সরকার চাকরির কোটা পদ্ধতি আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আমরা মনে করি, বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যৌক্তিক ও কার্যকর সমাধান মিলবে। সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের জায়গা হোক, এটা সবাই চায়। কিন্তু আন্দোলনের নামে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবমূল্যায়ন কাম্য হতে পারে না।

লক্কড়ঝক্কড় গাড়ী বন্ধ হউক

দেশের সড়ক-মহাসড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন তুলে দিতে একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ। ১০ বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে রাস্তায় চলাচলের অনুপযোগী যাত্রী ও পণ্যবাহী ৫২ হাজার ৬৭০টি গাড়ির চলতি মাসের মধ্যে ফিটনেস পরীক্ষা না করালে সেগুলোর অস্তিত্ব তালিকা থেকে মুছে ফেলবে তারা। ফিটনেস সনদবিহীন এসব গাড়ি যাতে রাস্তায় চলাচল করতে না পারে, সে জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকেও নির্দেশনা দেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জনের প্রাণহানি ঘটছে। খানাখন্দে ভরা রাস্তা, লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালকরা যেমন এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, তেমনি দায়ী ফিটনেসবিহীন যানবাহন। সারা দেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে চলাচলের অনুপযোগী এসব গাড়ি। ফিটনেসবিহীন গাড়ির তালিকায় আছে যাত্রীবাহী বাস, মিনিবাস ও পণ্যবাহী যানবাহন। রাজধানী সহ সারা দেশে চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের ৮৮ শতাংশই ফিটনেসবিহীন। এসব যানবাহনে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে। লক্কড়ঝক্কড় মার্কা অনেক গাড়িই রাজধানীর পথে চলাচল করছে, যেগুলোর আয়ু শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এসব গাড়ির লুকিং গ্লাস নেই। আসনগুলোও বসার অনুপযুক্ত। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে সংঘটিত দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৬০ হাজার ৬৬১টি গাড়ি ত্রুটিপূর্ণ ছিল।
মোটরসাইকেল ছাড়া অন্য সব যানবাহনের ক্ষেত্রে বিআরটিএ থেকে নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা করিয়ে সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ২০০১ সালে গাড়ির ফিটনেস নেওয়ার পর অনেক মালিকই নতুন করে ফিটনেস সনদ নেননি। অর্থাৎ গাড়ির মালিক হওয়া সত্ত্বেও প্রচলিত আইন অবজ্ঞা করেছেন তাঁরা। ফিটনেস সনদহীন গাড়ির তালিকায় সরকারি গাড়ির সংখ্যাও একেবারে কম নয়। সরকারি সংস্থাগুলো তাদের যানবাহনের ক্ষেত্রে কিভাবে আইন অমান্য করে? অন্যদিকে বিআরটিএ এত বছর এ বিষয়ে কেন নীরব ছিল, তা-ও অজানা। এবার বিআরটিএ যেন সিদ্ধান্তে অটল থাকে। মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। ফিটনেস সনদহীন সব ধরনের যানবাহন রাস্তা থেকে তুলে দিতে হবে। সরকারি গাড়ির ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া চলবে না। নির্ধারিত সময়ের পর কঠোর অভিযান চালাতে হবে। ফিটনেস সনদহীন গাড়ি রাস্তা থেকে তুলে দেওয়া গেলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে।

বৈকালিক সেবা বাড়াতে হবে

দেশে প্রয়োজনের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আরো কম। অথচ দেশের বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেওয়া তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এ অবস্থায় বিদ্যমান সরকারি হাসপাতালগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি অনেক দিনের। তার মধ্যে একটি হচ্ছে বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা। কিন্তু বাস্তব নানা কারণে তা হয়ে উঠছে না। সরকারি হাসপাতালে এই সুযোগটি করা না গেলেও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে বেশ কিছুদিন ধরেই চালু রয়েছে এই বিশেষায়িত সেবা কার্যক্রম। হাসপাতালের ২৫টি বিভাগে মাত্র ২০০ টাকার বিনিময়ে রোগীরা বৈকালিক স্পেশালাইজড আউটডোর সেবা নিতে পারছে। প্রতিদিন অন্তত এক হাজার রোগী এই সেবা পাচ্ছে। এতে রোগীরাও খুশি। সরকারি কিছু হাসপাতালে, বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কয়েকটি হাসপাতালে সীমিত পরিসরে এই সেবা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসকের অভাবে সেগুলো খুব একটা সফল হয়নি। রোগীর আধিক্য ও চিকিৎসক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারকরা কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে ভেবে দেখতে পারেন।
বহু কোটি টাকার বিনিময়ে একেকটি সরকারি হাসপাতাল গড়ে ওঠে এবং আরো কয়েক কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনা হয়। কিন্তু বেশির ভাগ হাসপাতালেই দুপুরের পর সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বহু রোগী সেবা না পেয়েই ফিরে যায়। এটি কোনোভাবেই হাসপাতালগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার নয়। এর নানা কারণ রয়েছে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক নিয়োগ দিলেও দেখা যায় অর্ধেকের বেশি চিকিৎসক কর্মস্থলে থাকেন না। আবার যে পরিমাণ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার কথা, নিয়োগ হয় তার চেয়ে অনেক কম। ফলে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। হাসপাতালগুলোতে যেসব সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়, বাস্তবে দেখা যায় মেয়াদের আগেই সেগুলো অচল হয়ে পড়ে থাকে। অভিযোগ আছে, আশপাশের প্রাইভেট ক্লিনিকের ব্যবসা ঠিক রাখার স্বার্থে ইচ্ছাকৃতভাবেও যন্ত্রপাতি অচল করে রাখা হয়। ফলে স্থানীয় রোগীরা বৈকালিক সেবা তো দূরে থাক, স্বাভাবিক দৈনন্দিন সেবাও পায় না। সরকারি হাসপাতালের এই ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। সেই সঙ্গে চিকিৎসাসংশ্লিষ্টদের মানসিকতার পরিবর্তনও অত্যন্ত জরুরি। যেসব উপজেলা হাসপাতালে বৈকালিক সেবা এখনো কোনো রকমে ধরে রাখা হয়েছে, সেগুলো সম্ভব হয়েছে শুধু সেখানকার সেবাদানকারীদের উন্নত মানসিকতা ও আন্তরিকতার কারণে। এই আন্তরিকতা সারা দেশেই থাকা প্রয়োজন।
চিকিৎসাসেবা এখন বাণিজ্যের বিষয় হয়ে গেছে। সরকারি হাসপাতালের অনেক চিকিৎসকও এই বাণিজ্যিক ধারায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। এমনকি তা করতে গিয়ে কেউ কেউ হাসপাতালের দায়িত্বে অবহেলা করছেন। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমরা চাই, সবার সহযোগিতায় সরকারি হাসপাতালের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হোক।

ক্যান্সার রোধে পদক্ষেপ জরুরী

দূষণ, ভেজাল ও খাদ্যাভ্যাসজনিত নানা কারণেই রোগব্যাধি বাড়ছে। একইভাবে বাড়ছে নানা ধরনের ক্যান্সারও। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তথ্য মতে, ২০১২ সালেও হাসপাতালটির বহির্বিভাগে রোগী ছিল বছরে ৫৯ হাজার। গত বছর এ সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় চার গুণ। হাসপাতালে আসা পুরুষ রোগীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি, নারীদের মধ্যে বেশি স্তন ক্যান্সার। জরায়ুর ক্যান্সারও বাড়ছে খুব বেশি পরিমাণে। এ ছাড়া খাদ্যনালি, মুখ, পরিপাকতন্ত্র ও লিভারের ক্যান্সারও বাড়ছে। এভাবে ক্যান্সার বৃদ্ধির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান, মুখে তামাক গ্রহণ, মারাত্মক পরিবেশদূষণ, খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণ, শাকসবজি-ফলমূলে কীটনাশক প্রয়োগ, নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভের ব্যবহার ইত্যাদি। ক্যান্সারসহ অন্যান্য রোগ সৃষ্টির এই কারণগুলো রোধ করার কার্যকর উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও অনুপস্থিত। চিকিৎসার সুবিধাও খুবই কম। ফলে ক্যান্সারে মৃৎত্যুর হারও দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থা কি চলতেই থাকবে?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেশে এখন ১২ লাখের মতো ক্যান্সার রোগী। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে আরো প্রায় তিন লাখ। তাদের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসার আওতায় আসছে বছরে মাত্র ৫০ হাজার। বাকিরা চিকিৎসার বাইরে থেকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রোগের শেষ ধাপে কাউকে কাউকে হাসপাতালে আনা হলেও কোনো লাভ হয় না। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে নারীরা। রোগের প্রথম দিকে তারা লজ্জায় কাউকে তা বলতে চায় না। এরপর বলা হলেও পরিবারের পুরুষ কর্তা সেটিকে তেমন আমলে নেন না। চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক নারীর চিকিৎসা মাঝপথেও থেমে যায়। এসব ক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্রীয় নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। দরিদ্র নারীদের জন্য চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে অন্তত উপজেলা পর্যায়ে ক্যান্সারের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
ক্যান্সারের দ্রুত প্রসার ঠেকাতে হলে প্রতিরোধের ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। খাদ্যে ভেজাল রোধে কঠোরতর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভেজালকারীদের বিচার দ্রুততর করা এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদনকারীরা শাকসবজি ও ফলমূলে যেন ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশক বা ফরমালিন মেশাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাজারগুলোতে নিয়মিত এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে। মাছ, মাংস, দুধেও ক্ষতিকর রাসায়নিক বা বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তাই এগুলোও পরীক্ষা-নিরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। পরিবেশদূষণের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকা এখন সারা পৃথিবীতেই একটি নিকৃষ্ট শহর। এটিও ফুসফুসের ক্যান্সার বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ। সেই সঙ্গে আছে পানিদূষণ, মাটিদূষণ। এগুলো কমাতে হবে। পাশাপাশি মানুষকে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। ক্যান্সার বৃদ্ধির এই গতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

 

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পদক্ষেপ

উদ্বেগজনক হারে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে বাংলাদেশে। ঘটছে প্রাণহানি। পথে বসছে অনেক পরিবার। দেশের অনেক প্রতিভাবান মানুষের প্রাণ গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়। অনেক পরিবারের আশার আলো যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়েছে। প্রতিদিনই আসছে মর্মান্তিক সব সড়ক বিস্তারিত

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নীতিমালা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) প্রস্তাবের খসড়াটি যাচাই করে দেখছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরিবর্তনের প্রয়োজন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে প্রণীত বিধিমালায় প্রধান শিক্ষক পদে সরাসরি ৩৫ শতাংশ ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে ৬৫ শতাংশ নিয়োগ করার বিধান রয়েছে। ২০১৪ সালে প্রধান শিক্ষক পদ দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হয়। এখন এ পদে নিয়োগ-পদোন্নতি পিএসসির আওতাধীন। ফলে বিধিমালায় পরিবর্তন আবশ্যক। প্রস্তাবে আরো কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান বিধিমালায় পুরুষ ও নারীর জন্য আলাদা শিক্ষাগত যোগ্যতার উল্লেখ রয়েছে। সহকারী শিক্ষক হতে হলে পুরুষদের স্নাতক আর নারীদের উচ্চ মাধ্যমিক পাস হতে হয়। প্রস্তাবে উভয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতাই স্নাতক করতে বলা হয়েছে। অবশ্য নারীদের জন্য ৬০ শতাংশ কোটা থাকছে। সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্নাতক পাস হলেই আবেদন করা যায়। প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে, এ পদের জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাগবে। এখন প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ২৫ থেকে ৩৫ বছর। পিএসসির নীতিমালার সঙ্গে সংগতি রেখে বয়স ২১ থেকে ৩০ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ৬৫ শতাংশ প্রধান শিক্ষকের পদ পদোন্নতির মাধ্যমেই পূরণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলযোগ্য। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখন যেকোনো বিষয়ে পাস প্রার্থীর সমান সুযোগ রয়েছে। গণিত ও বিজ্ঞানের কথা বিবেচনা করে সহকারী শিক্ষক পদে ২০ শতাংশ বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। ক্লাস্টার বা উপজেলাভিত্তিক আর্ট ও সংগীত শিক্ষক রাখতে বলা হয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগ আগের মতোই উপজেলা বা থানাভিত্তিক হবে। তবে কেন্দ্রীয় সহকারী শিক্ষক নির্বাচন কমিটির সুপারিশ লাগবে। বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা না হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে নিয়োগ পাওয়া যাবে না। ওই ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী অথবা বাগদত্ত বা বাগদত্তা, যিনি বাংলাদেশের নাগরিক নন, তিনিও নিয়োগ পাবেন না। শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা যাবে, তবে পিএসসির সুপারিশ দরকার। বর্তমানে শিক্ষক পদে যোগদানের তিন বছরের মধ্যে প্রশিক্ষণ বা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, প্রস্তাবিত বিধিমালায় তা থাকছে না।
নীতিমালা অনড় বিষয় নয়। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আনাই কাম্য। তবে তা যথোচিত হতে হবে। অভিজ্ঞতা বলে, বিদ্যমান বিধিমালায় অস্পষ্টতা তো থাকেই, পরিবর্তনের নামে প্রায়ই সেটিকে আরো জটিল করে তোলা হয়। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সব বিষয় স্পষ্ট করে তবেই প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুমোদন করবে।

মশাবাহিত রোগ

মশার উৎপাতে এরই মধ্যে নগরবাসী অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ছড়িয়ে পড়ছে মশাবাহিত বিভিন্ন রোগ। বর্ষা জেঁকে বসলে অবস্থা কী হবে তা ভাবতেও কষ্ট হয়। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা বড় বড় যন্ত্রে বিকট আওয়াজ তুলে ওষুধ ছিটালেও মশার উৎপাত কমছে না। ফলে ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। গত বছর চিকুনগুনিয়া ব্যাপক আকারে ছড়িয়েছিল। অনেকেরই ধকল কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। তাই চিকুনগুনিয়া এখনো আতঙ্কের কারণ হয়ে আছে। ডেঙ্গুতেও ভুগেছে অনেকে। মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। আছে ডেঙ্গুর ভীতিও। এ বছর এরই মধ্যে কয়েকজন ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বর্ষায় ডেঙ্গু ব্যাপক আকারে ছড়াতে পারে। তাই এখনই মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানি ও মশাবাহিত রোগ বেড়ে যাবে বলে অনেক আগেই জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এখন আমরা তা প্রত্যক্ষ করছি কিন্তু এসব রোগ প্রতিরোধে যা যা করণীয় তা ঠিকমতো করছি না। মশার প্রজননের জন্য পানি প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রজাতির মশা বিভিন্ন ধরনের পানিতে ডিম-বাচ্চা দেয়। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম-বাচ্চা দেয়। পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, যত্রতত্র ফেলে রাখা কৌটা, এমনকি ঘরের ভেতরে কম ব্যবহৃত কোনো পাত্রে জমে থাকা পানিতেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই এই মশার বংশ বৃদ্ধিতে নাগরিক অসচেতনতাকেও একটি বড় কারণ বলে মনে করা হয়। ঢাকার যেসব এলাকায় হাজামজা ডোবা, খাল, বিল বা জলাশয় বেশি সেসব এলাকায় কিউলেক্স মশার উৎপাত বেশি। এগুলোর সংস্কার বা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ওয়াসাসহ যেসব সংস্থার হাতে তারা সেই দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে না। পার্বত্য এলাকাসহ পূর্বাঞ্চলের ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী অ্যানোফিলিস মশার উপস্থিতি বেশি। সারা দুনিয়ায় মশাবাহিত ৯টি রোগের প্রাদুর্ভাব থাকলেও বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ছয়টি রোগের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ও ফাইলেরিয়া (গোদ রোগ) আগে থেকেই আছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকুনগুনিয়া, জাপানিজ অ্যানসেফালাইটিস ও জিকা। দেশে জিকা সংক্রমণের অল্প কয়েকটি ঘটনা জানা গেলেও অনেক দেশে এটি রীতিমতো আতঙ্কের কারণ।
মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য মশা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। আর মশা নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হচ্ছে মশা জন্মানোর উৎসস্থল ধ্বংস করা, সেটা ঘরে হোক কিংবা ঘরের বাইরেই হোক। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংস্থাগুলোকে তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। তাদের কর্মকাণ্ড জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। মশা নিধন ও লার্ভা নিধনে নিয়মিত ওষুধ ছিটাতে হবে। নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। ময়লা ও পরিত্যক্ত দ্রব্যাদি যেখানে সেখানে না ফেলে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে ফেলতে হবে। ফুলের টব, ফুলদানি বা অন্য কোনো পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। মশাবাহিত ভয়ংকর সব রোগের হাত থেকে বাঁচতে সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।