সিটি করপোরেশন নির্বাচন ॥ মাঠে মন্ত্রী-এমপি নির্বিকার ইসি

31

1_130782কাজিরবাজার ডেস্ক :
তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে বিধি লঙ্ঘন করে মাঠে নেমেছেন মন্ত্রী-এমপিরা। সঙ্গে রয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীরাও। সর্বত্র আচরণবিধি লঙ্ঘনের মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসবের প্রতিকার না করে উল্টো নীরবে সমর্থন দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা মামলা-হামলায় কেউ পালিয়ে আবার কেউ জেলের ভাত খাচ্ছেন। বিএনপি এরই মধ্যে সেনা মোতায়েনসহ লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড তৈরির দাবি জানিয়েছে। কমিশন লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টির পদক্ষেপ না নিয়ে বরং রাজনৈতিক মামলা-হামলার শিকার প্রার্থীদের গ্রেফতারের বিষয়টিকে আরও উসকে দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মোঃ শাহ নেওয়াজ। মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে কারও বিরুদ্ধে মামলা কিংবা ওয়ারেন্ট থাকলে ওই ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেফতারে ইসির অনুমতি লাগবে না। এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টি করার দায়িত্ব ইসির। প্রতিদিন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পক্ষে যেভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করা হচ্ছে তা বন্ধ করার দায়িত্বও ইসির। নির্বিকার হয়ে বসে থাকা ইসির কাজ নয় বলেও জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
বুধবার ২০ দল এক বিবৃতিতে বলেছে, তিন সিটি নির্বাচনে সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও সমর্থকদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট অভিযোগ সত্ত্বেও ইসির উদাসিনতায় ভোটার ও নাগরিক সমাজ শঙ্কিত।
এদিকে মঙ্গলবার চট্টগ্রামে এক সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশারফ হোসেন বলেছেন, যে কোনোভাবে জিততে হবে। ওই সভায় তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর পক্ষে নেতাকর্মীদের কাজ করার আহ্বান জানিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি বলেছেন, তিনটি সিটি করপোরেশনে অবশ্যই যে কোনোভাবে হোক আমাদের জিততে হবে। ওই বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, ছয়জন সংসদ সদস্যসহ নগর আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সম্প্রতি এক সভায় বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেছেন, সন্ত্রাসীদের জন্য কোনো লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড হবে না। চলতি সপ্তাহে ঢাকা উত্তরের প্রভাবশালী প্রার্থী কমিউনিটি সেন্টারে মতবিনিময় সভার নামে সমাবেশ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ওই সভায় সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীও অংশ নেন। মঙ্গলবার ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেছেন দক্ষিণের প্রার্থী সাঈদ খোকন। এছাড়া নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারি বাড়িতে বৈঠক করে দলের প্রার্থী পরিচয় করিয়ে দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী সিপিবি নেতা আবদুল্লাহ আল কাফি রতন। তফসিল ঘোষণার পর থেকে সরকারদলীয় পক্ষে এরকম অসংখ্য আচরণবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রহস্যজনকভাবে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না ইসি। শুধু তাই নয়, সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে ইসি ও রিটার্নিং অফিসাররা নীরব ভূমিকা পালন করছে।
মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেয়ার সময় দেখা যায়, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেয়ার সময় রিটার্নিং অফিসারদের সামনে ৫ জনের অতিরিক্ত লোক নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন অনেক প্রভাবশালী প্রার্থী। চলছে অনলাইনে নিয়ম ভেঙে প্রচারণা। এখনও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীদের ফেস্টুন, রাজনৈতিক দলের জন্য তাদের ত্যাগের গুণগান, জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি, দোয়া কামনা এখনও দেখতে পাওয়া যায়। এমনকি রাজধানীতে চলাচলকারী বাসগুলোতেও পোস্টার দেখা যায়। এছাড়াও নির্বাচন উপলক্ষে রাজধানীর অলিগলিতে গড়ে উঠেছে সরকারি দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যালয়। এসব কার্যালয় ঘিরে ইসির চোখের সামনেই চলছে রমরমা নির্বাচনী প্রচারণা। অথচ সম্ভাব্য প্রার্থীদের এসব কর্মকান্ড নির্বাচনী আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থীরা আচরণবিধির তোয়াক্কা করছেন না। সর্বত্র বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও নির্বাচন কমিশন কয়েকজনকে শোকজ করে হাত গুটিয়ে বসে আছে। বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে এ পর্যন্ত তিন সিটিতে মেয়রসহ শতাধিক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটির চেয়ে দক্ষিণে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে বেশি। আর চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ৬ জনকে শোকজ করা হয়েছে। আগাম প্রচারণা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে এ পর্যন্ত শতাধিক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। যার মধ্যে দক্ষিণে ৮১ জন, উত্তরে ২৪ জন এবং সিসিসিতে মাত্র ৫ জন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে সেনা মোতায়েনসহ আট দফা দাবি জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের পক্ষ থেকে এবারের সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। জয়ের জন্য মরিয়া ক্ষমতাসীনরা চাপ প্রয়োগ করে অনেক প্রার্থীকে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদ থেকে হাজী সেলিমকে কীভাবে দূরে রাখা হয়েছে, জাতীয় সংসদেই তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না ইসি। বরং যেসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে তাদের গ্রেফতার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উসকে দিয়েছে ইসি।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম বলেন, এভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন চলতে থাকলে ভোটের দিন ইসির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। নির্বাচনে লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড থাকবে না। তাই এখনই সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্বিকার হয়ে বসে থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, যেখানে সেখানে আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। আইন অনুযায়ী মন্ত্রীরা নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ করতে পারেন না। করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে কমিশন। অন্যদিকে জানিপপের চেয়ারম্যান ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-এমপি বা প্রার্থীকে প্রথমে সতর্ক, পরে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে ইসি। এটি সম্পূর্ণ ইসির সাহস ও স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করছে। শাহ নেওয়াজের বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, যেসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে তাদের গ্রেফতার করতে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উসকে দেয়া হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে কমিশন। আইন লঙ্ঘন করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলেও জানান তিনি। তবে নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজের বক্তব্যের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির রিটার্নিং অফিসার মিহির সারওয়ার মোর্শেদ বলেন, কোথাও বিধি ভঙ্গ করে নির্বাচনী প্রচারে নামলে আইন অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হবে। নির্বাচনী এলাকায় সার্বক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছে বলেও জানান তিনি। উত্তরের রিটার্নিং অফিসার মোঃ শাহ আলম বলেন, আইন সবার জন্যই সমান। নির্বাচনী বিধি ভঙ্গকারীদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। চট্টগ্রামের রিটার্নিং অফিসার মোঃ আবদুল বাতেন বলেন, মন্ত্রী-এমপিদের বৈঠকের বিষয়ে সুস্পষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।