মোঃ আব্দুল হাছিব
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলেছে লুটপাটের ঘটনা। কখনও বিক্ষোভের সুযোগে কখনও ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ইস্যুকে সামনে রেখে একশ্রেণীর মানুষ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর এমনকি যানবাহনে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে। সর্বশেষ গত সোমবার (৭এপ্রিল) ফিলিস্তিনে ইসরাইলি বর্বতার প্রতিবাদে সিলেট নগরীর আন্তর্জাতিক ফাস্টফুড চেইনশপ কেএফসি, জুতার কোম্পানি বাটার শোরুম, ইউনিমার্ট, এমনকি দেশিয় দোকান ও রেস্তোরাঁয় হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট করেছে বিক্ষুদ্ধ একদল দুর্বৃত্ত। এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে নগরী জুড়ে। প্রশ্ন উঠেছে কারা, কেন এভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে।
এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, লুটপাটকারীদের বিশাল একটি অংশ কিশোর গ্যাং, পাশাপাশি ভাসমান টুকাই ও মাদকাসক্ত শ্রেনি রয়েছে। এছাড়া তৌহিদী জনতার ব্যানারে বেশ কিছু সুযোগ সন্ধানী লোকজন জড়িত রয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবিগুলো ভাইরাল হয়েছে।
যেদিন এসব ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে, সেদিনই ঢাকায় চলছিল আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন ‘ইনভেস্টমেন্ট সামিট’। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ধরনের অস্থিরতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বাটা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের একাধিক আউটলেটে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। এটি শুধু তাদের ব্যবসার জন্য নয়, দেশের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে তারা কাজ করছেন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে একটি চক্র সংঘবদ্ধভাবে লুটপাটে মেতে উঠছে। এর পেছনে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া কিংবা প্রশাসনের দুর্বলতা কাজ করছে কিনা তা এখন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে কারা এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে এবং তাদের এজেন্ডা কী? নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, যে আন্দোলনের নামে ব্যবসায়ী, দোকানদার বা সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার ও প্রশাসনের উচিত এখনই কঠোর বার্তা দিয়ে সব ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা দমন করা। তা না হলে এই সংস্কৃতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সিলেট এর সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা উচিত। ৫ই আগস্ট থেকে এই অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শক্ত হাতে এই অপরাধকে মোকাবেলা করতে হবে। সংগঠক আব্দুল করিম কিম বলেন, সংঘবদ্ধ লুটপাট আমাদের সমাজে নতুন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। নৈতিকতা অধঃপতন ও পারিবারিক শিক্ষার অভাবে এটা হচ্ছে মনে করি। কিশোর থেকে বিভিন্ন বয়সের সুযোগ সন্ধানী লোকজন এই কাজটি অবলীলায় করে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দ বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য একটি দুষ্কৃতকারী চক্র উদ্দেশ্যমূলকভাবে সিলেট নগরীর বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-লুটপাট ও ভাঙচুর করেছে। এটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও নিন্দনীয় বিষয়। নেতৃবৃন্দ সিলেটের সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন- যারা এখনো গ্রেফতার হয়নি সেসব হামলা ও লুটপাটকারীদের ভিডিও ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।
এ ব্যাপারে এসএমপি সিলেটের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, লুটপাটে জড়িত বেশিরভাগ কিশোর এবং ভাসমান শ্রেণির মানুষ। ইতিমধ্যে ২৩জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে সংশ্লিষ্ট জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করা হবে, এলক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এদিকে নগরীর মিরবক্সটুলাস্থ হোটেল রয়েল মার্কসহ নগরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ। অবিলম্বে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তারা বলেন- কতিপয় দুর্বৃত্ত দফায় দফায় রয়েল মার্ক হোটেলে অবস্থিত রেস্টুরেন্ট-কফি শপে ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। হোটেলের রিসিপশনে থাকা কাউন্টার, ডেস্কটপ, ল্যাপটপসহ সকল আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়েছে। এসময় হোটেলের ক্যাশে থাকা ১ লাখ ৮৪ হাজার নগদ টাকা লুট করা হয়েছে। হোটেলের লিফট, জেনারেটর, সাব-স্টেশন, নিচ থেকে ৬ তলা পর্যন্ত গøাস, লাইটিং ভাঙচুর করা হয়েছে। হোটেলে থাকা ‘ছোপড়া’ রেস্টুরেন্টকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়েছে। হোটেলের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ক্রিমস কফি শপেও ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। এছাড়া ইউনিমার্ট, বনফুল, বাটা, উনুনসহ সিলেটের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এমন দুর্বৃত্তপনায় আমরা সিলেটবাসী উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রেজাউল করিমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্টানসমূহ পরিদর্শন করেছেন।






