কাজিরবাজার ডেস্ক :
অবশেষে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। শনিবার মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ থেকে ইসি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নিয়োগ করা হয়েছে সাবেক আইন ও প্রতিরক্ষা সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালকে। আর ৪ কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ বেগম রাশিদা সুলতানা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহসান হাবীব খান, সাবেক সিনিয়র সচিব মোঃ আলমগীর ও সাবেক সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান। তারা আজ রবিবার প্রধান বিচারপতির কাছে শপথ গ্রহণ শেষে আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
নতুন নির্বাচন কমিশনে সিইসি পদে নিয়োগ পাওয়া সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল একজন সৎ, মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে ২০১৭ সালে অবসর নিয়েছিলেন। অবসরে যাওয়ার আগে তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হলেও সেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে যোগদান করেননি। তিনি বিসিএস ১৯৮১ ব্যাচের কর্মকর্তা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগে তিনি আইন, ধর্ম মন্ত্রণালয় ও সংসদ সচিবালয়ে সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। সরকারী চাকরি থেকে বিদায় নেয়ার পর তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন। চার নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে বেগম রাশিদা সুলতানা জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেন। আহসান হাবীব খান, সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে থাকা অবস্থায় অবসর গ্রহণ করেন। সাবেক সিনিয়র সচিব মোঃ আলমগীর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব ছিলেন। আর সাবেক সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান জ্বালানি ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন।
সার্চ কমিটির কাছ থেকে নতুন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য সুপারিশকৃত ১০ জনের নামের তালিকা পাওয়ার পর থেকেই যাচাই-বাছাই শুরু করেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। ব্যাপক পর্যালোচনা করে সেখান থেকে অধিকতর যোগ্যতা সম্পন্ন ১ জনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও ৪ জনকে কমিশনার নিয়োগ করেন। এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শও নেন। এই ইসি পরবর্তী ৫ বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ সকল নির্বাচন পরিচালনা করবে।
স্বাধীনতার পর দেশে এবারই প্রথম সংবিধান অনুসারে আইন প্রণয়ন করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। আইনের আলোকেই সার্চ কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি এবং এ কমিটি ২৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির কাছে ১০ জনের নামের তালিকা জমা দেয়। এর আগে ইসি নিয়োগের আইন না থাকলেও সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে দুইবার নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। ২০১২ সালে জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে সার্চ কমিটির মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো প্রধান নির্বাচন কমিশনসহ অন্য কমিশনারদের নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর ২০১৭ সালে নিয়োগ দেয়া নির্বাচন কমিশনও সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। ওই সার্চ কমিটির সুপারিশ অনুসারে ২০১৭ সালে ৫ বছরের জন্য গঠিত নির্বাচন কমিশন ওই বছর ১৫ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং মেয়াদ শেষে বিগত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিদায় নেয়।
রাষ্ট্রপতির কাছে নির্বাচন কমিশনের জন্য ১০ জনের নামের তালিকা জমা দেয়ার সময় অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিত ছিলেন সার্চ কমিটির সভাপতি আপীল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। তবে এ সময় উপস্থিত ছিলেন সার্চ কমিটির সদস্য হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান, মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, সরকারী কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন এবং কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক আনোয়ারা সৈয়দ হক। এছাড়া মন্ত্রীপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের জন্য ১০ নাম সুপারিশ করতে ৫ ফেব্রুয়ারি সার্চ কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ আইন-২০২২’ অনুসারে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ আপীল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে সভাপতি করে ৬ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করে গেজেট প্রকাশ করে।
২২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রীমকোর্টের জাজেস লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত সার্চ কমিটির শেষ বৈঠকে ব্যাপক পর্যালোচনার পর ১০ জনের নামের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। তবে এ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। সিলগালা করে কমিটির সভাপতি বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের হেফাজতে রাখা হয়। আনুষ্ঠানিকভাব ২৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেয়া হয়। এর আগে ২০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সার্চ কমিটির বৈঠকে ব্যাপক পর্যালোচনা করে ১২-১৩টি নামের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়।
নতুন নির্বাচন কমিশনের জন্য ২৬ রাজনৈতিক দল, ৬ পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তাব করা ৩২২ নামের মধ্য থেকে ১০ জনের তালিকা ঠিক করতে বেশ ক’দফা দফা বৈঠক করে সার্চ কমিটি। সুপ্রীমকোর্টের জাজেস লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত ২০ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে ১২-১৩ জনের নাম ঠিক করা হয়। এর আগে ১৯ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে প্রস্তাবিত ৩২২ নাম থেকে ২০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে সার্চ কমিটি। তার আগে বৈঠক হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি। ওই বৈঠকে ৩২২ নাম নিয়ে পর্যালোচনা হয়।
গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে সুপ্রীমকোর্টের জাজেস লাউঞ্জে ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম বৈঠক করে সার্চ কমিটি। আর ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে ১২, ১৩ ও ১৬ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে নির্বাচন কমিশন গঠনে বিশিষ্টজনদের মতামত নেয় সার্চ কমিটি। ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশিষ্টজনদের সঙ্গে বৈঠকে পাওয়া প্রস্তাব অনুসারে নির্বাচন কমিশনের জন্য ২৬ রাজনৈতিক দল, ৬ পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তাব করা ৩২২ জনের নামের তালিকা ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করে সার্চ কমিটি।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলকে নাম জমা দেয়ার জন্য চিঠি দিয়েছিল সার্চ কমিটি। বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায় থেকেও ই-মেইলে নাম পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়। এরপর প্রথমে আওয়ামী লীগসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল ও ৬টি পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যক্তিগতভাবে আরও অনেকে নাম প্রস্তাব করে। ১৫টি রাজনৈতিক দল নাম প্রস্তাব না করায় পরে আরও ২ দিন সময় বাড়ানো হয়। পরে ওই ১৫টি দল থেকে আরও ২টি দল নাম জমা দিলেও বিএনপিসহ ১৩টি দল দেয়নি।
১৭ জানুয়ারি ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন-২০২২’ এর খসড়া মন্ত্রীসভায় উত্থাপন ও অনুমোদন করা হয়। এ আইন পাসের উদ্দেশে ২৩ জানুয়ারি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’ উত্থাপণ করেন। ওইদিনই বিলটি যাচাই-বাছাই করে রিপোর্ট পেশ করার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করেন স্পীকার। এরপর ওই কমিটি বিলটি রিপোর্ট আকারে সংসদে উপস্থাপনের পর এর ওপর ১২ জন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ছাঁটাই ও সংশোধনী প্রস্তাব দেন। এরপর কিছু সংশোধনীসহ ২৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলের শিরোনামেও সামান্য সংশোধন হয়। সংশোধনীসহ বিলটি পাস হয় ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’ শিরোনামে। ২৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি এ বিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে এটি আইনে পরিণত হয়। ওইদিনই জাতীয় সংসদ থেকে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন-২০২২’ এর গেজেট প্রকাশ করা হয়।
নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার কারা হতে পারবেন এবং তাদের যোগ্যতা কি হবে সেক্ষেত্রে বলা হয়েছে, তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। বয়স কমপক্ষে ৫০ বছর হতে হবে। কোন গুরুত্বপূর্ণ সরকারী, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারী বা বিচার বিভাগীয় পদে কমপক্ষে ২০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।







