‘করোনা ভাইরাস’ প্রতিরোধে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

13

কাজিরবাজার ডেস্ক :
চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশে নতুন ‘করোনা ভাইরাস’ সংক্রমণের ফলে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। চীন জানিয়েছে, ‘করোনা ভাইরাসে’ আক্রান্ত হয়ে সেখানে মৃতের সংখ্যা ৮০ জনে পৌঁছেছে। সোমবার (২৭ জানুয়ারি) সকালে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭৪৪ জনে। উহান ছাড়িয়ে এ ভাইরাস ইতোমধ্যে চীনের রাজধানী বেইজিংসহ ২৯টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, নেপাল, ফ্রান্স, সৌদি আরব, কানাডায় এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ‘করোনা ভাইরাস’ আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছে। ফলে সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশও ‘করোনা ভাইরাসের’ ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ‘করোনা ভাইরাস’ ঠেকাতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
এখনও নতুন ‘করোনা ভাইরাস’ আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া না গেলেও বাংলাদেশ যে ঝুঁকিতে রয়েছে সে কথা স্বীকার করছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। সংস্থাটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানিয়েছেন, এটা সত্যি, বাংলাদেশ করোনা ভাইরাসের ঝুঁকিতে রয়েছে। যেহেতু চীনের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ফলে সেখান থেকে করোনা ভাইরাস আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন এই করোনা ভাইরাস (২০১৯-এনসিওভি) দ্রুত ছড়ায়। আর ঢাকাও জনবহুল বা ওভার পপুলেটেড সিটি। এ ধরণের শহরে কোনও ভাইরাল ডিজিজ এলে খুব সহজেই সেটা একজনের মাধ্যমে অন্যজনে ছড়ায়। আর নতুন এই ‘করোনা ভাইরাস’ অন্যান্য ভাইরাসের মতো নয়। এটির ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমও একাধিক (সোর্স)। এ জন্য আরও বেশি সতর্কতা দরকার।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, যে কোনও ভাইরাস কোথাও একবার ঢুকলে তা খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। নতুন এই ভাইরাস জ্যামিতিক হারে ছড়াচ্ছে। এটি এতো দ্রুত ছড়াচ্ছে যে চীন থেকে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কবিরুল বাশার আরও বলেন, ঢাকা ওভার পপুলেটেড সিটি। এ ধরণের শহরে কোনও ভাইরাল ডিজিজ এলে সেটা খুব সহজেই একজনের কাছ থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া করোনা ভাইরাস অন্য ভাইরাসের মতো নয়। এর সোর্স (ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যম) একাধিক।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিনিয়ত অনেক মানুষই নানান কাজে চীনে যাতায়াত করেন। তাদের মাধ্যমে এই ভাইরাস বাংলাদেশে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, চীন থেকে ফিরতে গিয়ে যদি কেউ এই ভাইরাসের জীবাণু নিয়ে আসে তাহলে সেটা আমাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বাদুড় একটি বড় রিজার্ভার। এখন শীতকাল। খেঁজুরের রসের সঙ্গেও একটি সর্ম্পক রয়েছে বাদুড়ের। খেঁজুরের রসের সঙ্গেও জীবাণু ঢুকে যেতে পারে- সবদিক থেকেই বাংলাদেশ ঝুঁকিতে।
তবে ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই আইইডিসিআর সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানান সংস্থাটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্রিনিং শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধকেন্দ্রকে ( ইউএসসিডিসি) সঙ্গে নিয়ে একটি দল করা হয়েছে, যারা প্রতিদিনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তার পরের পদক্ষেপ কী হবে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন। তিনি জানান, আপাতত চীন থেকে আসা সব ফ্লাইটের যাত্রীদের বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। একইসঙ্গে স্থলবন্দরগুলোকে সতর্ক রাখবো। আমরা সবকিছু সতর্কভাবে মনিটর করছি।
এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর রবিবার (২৬ জানুয়ারি) আইইডিসিআর দেশের ৬৪ জেলার সিভিল সার্জন, আট বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ও সকল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক জানিয়ে সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য চিঠি দেয় । পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও সদ্য বিদায়ী রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা, আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাসহ স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্টরা স্পেশাল ভিডিও কনফারেন্স করেন নতুন এই নোভেল করোনা ভাইরাস নিয়ে। ভিডিও কনফারেন্স নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, মূলত ‘অগ্রিম সতর্কতা’ হিসেবে এ ভিডিও কনফারেন্স করা হয়। একইসঙ্গে প্রতিটি স্থল বন্দরগুলোতে ‘বিশেষ নজর’ রাখার জন্য সেসব জেলার সিভিল সার্জনদের বলা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, করোনা ভাইরাস কলকাতাতে এসেছে। যার মানে এটি এখন আমাদের অনেক কাছে। চীনের অনেক নাগরিক যারা বাংলাদেশে থাকে। যারা নববর্ষ উদযাপন করতে চীনে গিয়েছিল। এখন তারা বাংলাদেশে ফিরে এলে তাদের মাধ্যমেও করোনা ভাইরাস আসতে পারে।
করোনা ভাইরাসকে ‘সুপার স্প্রেডার’ অ্যাখ্যা দিয়ে অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ বলেন, ‘সার্স’ ছড়াতে সময় লেগেছিল প্রায় ২ মাস, ‘মার্স’ ছড়াতে সময় লেগেছিল ৪ মাস। কিন্তু নতুন এই ভাইরাস এক মাসেরও কম সময়ে পৃথিবীর অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্রিনিং কতটুকু কার্যকর সেটাও দেখতে হবে। শুধু বিমানবন্দরে নজর দিলেও হবে না। যেহেতু কলকাতাতেও করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী মিলেছে সেক্ষেত্রে এই ভাইরাস বর্ডার দিয়েও বাংলাদেশে ঢুকতে পারে। আবার স্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে যারা জড়িত যেমন চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যরা কতটুকু প্রস্তুত সেটাও একটা বড় বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান ভীষণ জরুরি।