ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পেতে আরো ৮ মাস অপেক্ষা

61

কাজিরবাজার ডেস্ক :
৬ জানুয়ারি ২০০৯ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৬২৩ মেগাওয়াট। দুটি সময়ের মধ্যে পার্থক্য ৯ বছর ৮ মাস ১৩ দিনের। আর এই সময়ে নীট উৎপাদন বেড়েছে আট হাজার ৩৫৫ মেগাওয়াট। সরকারী হিসেবে ২০০৯ সালে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৪৭ ভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা পেত আর এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ দশমিক ৫০ ভাগে। সরকার বলছে সব ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে আর আট মাস অপেক্ষা করতে হবে। বিদ্যুতের উৎপাদন আর সুবিধাভোগী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে গিয়ে গত সাড়ে নয় বছরে বাংলাদেশ বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে হাত দিয়েছে মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্পে। আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বাংলাদেশের বড় স্বপ্নগুলোর সফল বাস্তবায়ন ঘটলে বিদ্যুত খাতে বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন আসবে। যদিও শিল্পে গ্রিড সংযুক্ত বিদ্যুতের সরবরাহ না বৃদ্ধি করলে উৎপাদন বৃদ্ধি ভোগাবে গ্রাহককে।
সরকারী তথ্য বলছে, জানুয়ারি ২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত ভারত থেকে আমদানি মোট ১২ হাজার ৪৪৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৪ হাজার ৩৪৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৩৪টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি সই হয়েছে। বর্তমানে ১৩ হাজার ৯৮৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৫৫টি বিদ্যুতকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ চলছে। এখন ২৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন। যার উৎপাদন ক্ষমতা ৫ হাজার ৯৭৩ মেগাওয়াট। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াট। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৫১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ৫২ লাখ সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন ১০ বছর আগে একটি ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতকেন্দ্রের নির্মাণ চুক্তি বা উৎপাদনে আসার ঘটনাকে খুব বড় করে দেখা হতো। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ৫ বছরে টঙ্গীতে ৮০ মেগাওয়াটের মাত্র একটি বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ করেছিল তারা। এর আগেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৫০ বা ১০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র নির্মাণের মধ্যে থাকার চিন্তা করা হতো। কিন্তু এখন দেশে তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করছে। মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ ধারণা বদলে দিয়েছে।
এখন দেশে চারটি মেগা বিদ্যুত প্রকল্প নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে সব থেকে এগিয়ে রয়েছে পায়রা এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট আগামী বছর মার্চে উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। এর বাইরে মাতারবাড়িতে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং বাগেরহাটের রামপালে আরও একটি এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ চলছে। এছাড়া পাবনার রূপপুরে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। কেন্দ্রটি দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। গত ১০ বছর আগে এত বড় স্বপ্ন দেখার সাহসও পেত না বাংলাদেশ। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকল্প উন্নয়নে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে শুরু করে ক্রমেই স্বপ্নের সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করছে বিদ্যুৎ খাত। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় কোম্পানি নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (এনডব্লিউপিজিসিএল) জার্মানির সিমেন্স পাওয়ারের সঙ্গে তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যৌথ উন্নয়ন চুক্তি করেছে। এর বাইরে সিমেন্সের সঙ্গে একই ক্ষমতার আর একটি এলএনজিচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সমঝোতা স্মারক সই করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। শুধু যে দেশের সরকারী খাতই বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তা নয়। বেসরকারী খাতে সামিট পাওয়ার দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট এলএনজিচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সমঝোতা স্মারক সই করেছে সিমেন্স জার্মানির সঙ্গে। দেশের বেসরকারী খাতে এটিই সব থেকে বড় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, আমাদের বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার। বিপুল বিনিয়োগের সংস্থান করা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, আশার কথা হচ্ছে বাংলাদেশের অগ্রগতি দেখে বিশে^র বড় বড় কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চাইছে। আমরা তাদের স্বাগত জানাচ্ছি।
যদিও উৎপাদনের এই ধারায় এখই সরকারী নীতির পরিবর্তনের কথা বলছেন অনেকে। বিদ্যুত সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতির আশ্রয় না নিলে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। আর সেই চাপের ভাগ নিতে ভোক্তাকে অতিরিক্ত দরে বিদ্যুত কিনতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা গ্রিড সংযুক্ত বিদ্যুতকেন্দ্রের ১৭ হাজার ২৮৫ মেগাওয়াট। বিদ্যুত বিভাগ বলছে এর বাইরে আরও দুই হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের ক্যাপটিভ পাওয়ার (শিল্পের নিজস্ব উৎপাদন) রয়েছে। এই দুই হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতকেন্দ্রেও সরকার গ্যাস সরবরাহ করে। সব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার ৮৫ মেগাওয়াট। সেখানে গ্রীষ্মের বিদ্যুৎ চাহিদা ১২ থেকে ১২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ অন্যদিকে শীতের চাহিদা আট হাজার মেগাওয়াটে নেমে আসে। শিল্পের একটি বড় অংশই গ্রিড সংযুক্ত বিদ্যুতের বাইরে থাকায় চাহিদা উৎপাদনের মধ্যে একটি ভারসাম্যহীন অবস্থা বিরাজ করছে। আগামী বছরগুলোতে উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পেলেও শিল্পে ব্যাপক হারে বিদ্যুত সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ার কোন আশা নেই। কারণ সরকার নতুন করে যে গ্যাস সংযোগ দিয়েছে তাতে আরও ৮০০ ক্যাপটিভ পাওয়ারকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে শিল্প কারখানাতে নতুন চাহিদা তৈরি হলেও উদ্যোক্তা নিজেই তা পূরণ করবে। এক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি করলেও চাহিদা তৈরি না হওয়াতে কেন্দ্র চালানো যাবে না। ফলে শিল্প প্রতিষ্ঠানকে গ্রিড থেকে বিদ্যুত নেয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে পৃথক জোন করে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বা শীতের পুরো সরবরাহ গ্রিড থেকে দেয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বিদ্যুত খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বৈঠকে বাংলাদেশ শীতে ভারতে বিদ্যুত রফতানির প্রস্তাব দিয়েছে। শীতে চাহিদা কম থাকায় এখনই বিদ্যুতকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বড় প্রকল্প উৎপাদনে আসলে আগামী তিন থেকে চার বছর পর তা আরও বাড়তে পারে।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, আমাদের এই সঙ্কটের মূল কারণ হচ্ছে শিল্পে গ্রিডের বিদ্যুত কম নেয়া। এ বিষয়টিতে এখনই নজর দেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। এ জন্য একটি পথ বের করা উচিত বলেও জানান তিনি।
শুধু উৎপাদন নয়, সঞ্চালন এবং বিতরণেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। দুই সময়ের পার্থক্যে দেখা যায়, ২০০৯ এ সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ৮ হাজার সার্কিট কিলোমিটার এখন যা বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ১২৩ সার্কিট কিলোমিটার। গ্রিড সাবস্টেশন ক্ষমতা ১৫ হাজার ৮৭০ এমভিএ এখন যা ৩৬ হাজার ৪৬ এমভিএ।
বিতরণ খাতে ১ কোটি ৮ লাখ গ্রাহক বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে তিন কোটি তিন লাখ। বিতরণ লাইন ২ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৫৭ হাজার কিলোমিটার হয়েছে। মাথাপিছু বিদ্যুত উৎপাদন ২২০ থেকে ৪৬৪ কিলোওয়াট আওয়ারে উন্নীত হয়েছে।
এই সময়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুত খাতে সহায়তার অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে। শুরুতে ভারতের সঙ্গে বিদ্যুত বিনিময় এবং কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি হয়। এখন নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণ হতে চলেছে। দক্ষিণ এশিয়াতে বিদ্যুত বিনিময়ের উদ্যোক্তা দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেই বিবেচনা করা হয়। প্রতিবেশী দেশের সম্মতি আদায় এবং বিদ্যুত বিনিময় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ্রহ বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই আগে দেখানো হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোও গত কয়েক বছরে এর অর্থনৈতিক সুফল বুঝতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ট্রাইবুনাল চেয়ারম্যান ড. সেলিম মাহমুদ এ সম্পর্কে বলেন, সন্দেহ নেই আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুত বিনিময়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো লাভবান হবে। এ জন্য দেশগুলো সম্মিলিতভাবে যে উদ্যোগ নিচ্ছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। ভারত, নেপাল, ভুটান এবং মিয়ানমারে যে জলবিদ্যুতের উৎস রয়েছে তা কাজে লাগাতে হবে। এতে কেবল সস্তায় বিদ্যুত উৎপাদনই সম্ভব তা নয় বরং সেই বিদ্যুত ব্যবহার করে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের বড় অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব।