পিতা-মাতার নৈতিক ও আইনী অধিকার

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
দ্বিতীয়ত, পিতা মাতা যখন বার্ধক্যে উপনীত হন তখন তাদের মেজাজ কিছুটা খিটখিটে হয়ে যেতে পারে এবং বয়সের কারণে তাদের আচরণে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে থাকলে তা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। তাদের কথা খুশীমনে মেনে নেয়া। তাদের কোন কথায় বিরক্ত হয়ে জবাবে উহ্ শব্দটি উচ্চারণ না করা অথবা তাদের সাথে এমন আচরণ না করা যাতে তারা উহ্ শব্দটি উচ্চারণ করেন। ধমকের সুরে বা উচ্চ কণ্ঠে বা কর্কশ ভাষায় তাদের সাথে কথা না বলা। আমাদের শৈশবকালের কথা স্মরণ করা যে, তারা আমাদের প্রতি কীরূপ অনুগ্রহ করেছেন।
তৃতীয়ত: পিতা মাতার মান সম্মানের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। কথা বলার সময় তাদের সম্মানের প্রতি খেয়াল রাখা। বয়সের শেষ পর্যায়ে এসে যখন তারা দুর্বল হয়ে পড়েন তখন তাদের প্রতি বিশেষভাবে নজর দেয়া। বয়সের কারণে তাদের মান অভিমান অনুধাবন করা এবং বিরক্ত হয়ে তাদের সম্মুখে এমন কথা না বলা যা তাদের মান সম্মানের পরিপন্থি হয়।
চতুর্থত: আচার আচরণ ও ব্যবহারে তাদের সাথে বিনয়ী ও কোমল স্বভাবের আচরণ প্রকাশ করতে হবে। আনুগত্যের সাথে মাথা অবনত রাখা, তাদের নির্দেশ মনযোগ দিয়ে শ্রবণ করা এবং পালন করা। বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের খেদমতে নিয়োজিত থাকা; কিন্তু এক্ষেত্রে বিরক্তি, অহমিকা বা অনুগ্রহ প্রকাশ না পাওয়া উচিত। কেননা এ রকম সেবা ও পরিচর্যা আমাদের নিকট তাঁদের প্রাপ্য। তাদের সেবা ও পরিচর্যা করার সুযোগ লাভে আল্লাহর শোকর আদায় করা উচিত।
আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: আর আমি মানুষকে তার পিতা মাতার সাথে সদ্বব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছে। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়। আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে। পিতা মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরীক স্থাপন করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে জ্ঞাত করবো। “আল কুরআন ৩৯:১৪-১৫।”
উপরোক্ত আয়াতের বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, প্রথমত আল্লাহ তা’আলা উক্ত আয়াতে সন্তানের জন্য মায়ের কষ্টের বর্ণনা, বিশেষ করে তাকে কত কষ্টে তার মা গর্ভে ধারণ করেছেন তা বর্ণনা, সন্তানের প্রতি মায়ের অনুগ্রহ, সন্তানকে দুধ পান করানো ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আয়াতে আমার প্রতি ও তোমার পিতা মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও’ দ্বারা আল্লাহর কৃতজ্ঞতার পরপরই পিতা মাতার কৃতজ্ঞাতার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত: আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতা প্রকাশ পায় এমন কোন নির্দেশ পিতা মাতা প্রদান করলে তার আনুগত্য করা যাবে না। তবে পৃথিবীতে তাদের সাথে সদ্ভাব রেখে সহঅবস্থানের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলার নির্দেশিত প্রতিটি কাজের মধ্যেই সওয়াব ও কল্যাণ রয়েছে। আল্লাহর অনুগত্যের মাধ্যমেই তার নৈকট্য অর্জন করা যায়। এত সব আমলের মধ্যে পিতা মাতার প্রতি সদাচরণকে রাসূলুল্লাহ (স.) আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল বলে ঘোষণা করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন আমি নবী (স.) কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বলেন: পিতা মাতার সাথে সদাচার। আমি বললাম তারপর কোনটি? তিনি বললেন: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি আমাকে এসব বিষয়ে বললেন। আমি আরো জিজ্ঞেস করলে তিনি অবশ্যই আমাকে আরো বলতেন। “ইমাম বুখারী, আস-সহীহ (অনুবাদ ও সম্পাদনা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৯৫ ঢাকা) অধ্যায়: শিষ্টাচার, অনুচ্ছেদ: আল বিররি ওয়াস সিলাহ, হাদীস নং-৫৪৩২,খ,৯.পৃ.৩৮৯, ইমাম বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ, প্রাগুক্ত, হাদীস নং ১ পৃ.৩৩।”
পিতা মাতার সাথে কোমল ব্যবহার এবং নম্র ভাষায় বিনয়ী হয়ে কথা বলার নির্দেশ দেওয়ার কারণ হলো বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলে তারা অনেক সময় স্বাভাবিক আচরণ নাও করতে পারেন। তখন তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেতে পারে বা কোন বিষয়ে অধৈর্য হয়ে পড়তে পারেন। সেই অবস্থায়ও সন্তানকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং কোমল ভাষায় কথা বলতে হবে।
তায়সালা ইবনে মায়্যাস রহ. বলেন, আমি যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত ছিলাম। আমি কিছু পাপকাজ করে বসি, যা আমার মতে কবীরা গুনাহর শামিল। আমি তা ইবনে উমার রা. এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, তা কী? আমি বললাম, এই ব্যাপার। তিনি বললেন, এগুলো কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত নয়। কবীরা গুনাহ নয়টি: (১) আল্লাহর সাথে শরীক করা, (২) নরহত্যা, (৩) জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন, (৪) সতী সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে যিনার মিথ্যা অপবাদ রটানো, (৫) সুদ খাওয়া, (৬) ইয়াতীমের মাল আত্মসাৎ করা, (৭) মসজিদে ধর্মদ্রোহী কাজ করা, (৮) ধর্ম নিয়ে উপহাস করা, (৯) সন্তানের অসদাচরণ যা পিতা মাতার কান্নার কারণ হয়। ইবনে উমার রা. আমাকে বলেন, তুমি কি জাহান্নাম থেকে দূরে থাকতে ও জান্নাতে প্রবেশ করতে চাও? আমি বললাম আল্লাহর শপথ! আমি তাই চাই। তিনি বলেন, তোমার পিতা মাতা কি জীবিত আছেন? আমি বললাম, আমার মা জীবিত আছেন। তিনি বলেন আল্লাহর শপথ! তুমি তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বললেও ভরণ পোষণ করলে তুমি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদি করীরা গুনাহসমূহ থেকে বিরত থাকো। “ইমাম বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: পিতা মাতার সাথে নম্র ভাষায় কথা বলা, প্রগুক্ত হাদীস নং ৮পৃ.৩৫।”
পিতা মাতা সন্তানের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমতস্বরূপ। সন্তানের জন্য পিতা মাতার দু’আ কবুল হয়। তাই তাদের দু’আ নিতে হবে এবং বদদু’আ থেকে বাঁচতে হবে। বদদু‘আ থেকে বাঁচার উপায় হলো তাদের প্রতি অসদাচরণ না করা। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: তিনটি দু‘আ অবশ্যই কবুল হয়, এতে কোন সন্দেহ নেই। (১) মজলুম বা নির্যাতিতের দু‘আ, (২) মুসাফিরের দু‘আ এবং (৩) সন্তানের জন্য পিতা মাতার দু‘আ। “ইমাম বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ অনুচ্ছেদ: দা’ওয়াতিল ওয়ালিদাইন, প্রাগুপ্ত হাদীস নং ৩২.পৃ.৪৪।”
ইসলাম পিতা মাতার প্রতি আচরণকে এতই গুরুত্ব প্রদান করেছে যে, তাদের মৃত্যুর পরও তাদের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর তা হলো, তাদের জন্য দু‘আ করা, তাদের বৈধ ওসিয়ত পূর্ণ করা, তাদের বন্ধু-বান্ধবগণের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের দিক থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে এমন আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা।
উসাইদ (রা.) বলেন, আমরা নবী (স.) এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার কোন অবকাশ আছে কি? তিনি বলনে: হ্যাঁ, চারটি উপায় আছে। (১) তাদের জন্য দু‘আ করা, (২) তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, (৩) তাদের প্রতিশ্র“তিসমূহ পূর্ণ করা এবং (৪) তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করা, যারা তাদের মাধ্যমে তোমার আত্মীয়। “ইমাম বুখারী, আল-আদাবুদ মুফরাদ, অনুচ্ছেদ: বিররিল ওয়ালিদাইনি বা‘দা মাওতিহিমা, প্রাগুক্ত, হাদীস নং-৩৫, পৃ. ৪৬”।
ও.আই.সি-এর উদ্যোগে ১৯৯০ সালের ৩১ জুলাই থেকে ৫ আগষ্ট পর্যন্ত ৬ দিন ব্যাপী ও.আই.সি. ভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের পররষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন মিসরের রাজধানী কায়রোতে অনুষ্টিত হয়। সম্মেলনের সর্বশেষ দিন ৫ আগষ্ট ঞযব ঈধরৎড় উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং ওহ ওংষধস” সর্বসম্মত মতের ভিত্তিতে অনুমোদন করা হয়। উক্ত ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ ৭ এ সন্তান ও পিতা-মাতার অধিকার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ: ৭ (ক) জন্ম গ্রহণের প্রাক্কালে, প্রত্যেক শিশুর তার পিতা-মাতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ হতে যথাযথ পরিচর্যা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত যতœ এবং নৈতিক তত্ত্বাবধান পাবার অধিকার রয়েছে। ভ্রƒণ এবং মা অবশ্যই সুরক্ষিত এবং বিশেষ যতেœ থাকবে। (খ) পিতা-মাতার বা দায়িত্বপ্রাপ্তদের অধিকার রয়েছে যে, তাদের ইচ্ছানুযায়ী সন্তানকে শিক্ষা প্রদান এবং ভবিষ্যতের জন্য গঠন করা নৈতিক মূল্যবোধ এবং শরী‘আহ- এর মূলনীতির আলোকে। (গ) পিতা-মাতা উভয়ই সন্তান-এর নিকট হতে অনুরূপ অধিকার রয়েছে এবং আত্মীয়দেরও তাদের পরম্পরের নিকট হতে শরী‘আহ্-এর আলোকে অধিকার রয়েছে।
ও.আই.সি.-ভুক্ত সদস্য রাষ্ট্রসমূহের সম্মেলনে শিশুদের অধিকার বর্ণনা করা হয়েছে এবং সন্তানের পক্ষ থেকে পিতা-মাতার জন্যও অনুরূপ অধিকার রয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শিশুদের জন্য অধিকার রয়েছে তার পিতা-মাতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের করা হয়েছে। শিশুদের জন্য অধিকার রয়েছে তার পিতা-মাতা, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিকট হতে, অনুরূপভাবে পিতা-মাতার জন্যও তাদের নিকট হতে অধিকার রয়েছে। কেননা বিদ্যমান আইনে শুধু আর্থিক দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে পৃথক পৃথক ৬ মাস বা ১ বছর কারাদন্ড অথবা আর্থিকনন্ড কিংবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আইনের ৫নং ধারার (১) উপধারায় “উক্ত অপরাধের জন্য ছয় মাস থেকে এক বছরের কারাদন্ড বা এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবে” সংযুক্ত করা যেতে পারে।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইনটির শিরোনাম “পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ ও সদাচরণ আইন” করা যেতে পারে, সদাচরণ এর সংজ্ঞায় “শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান প্রদর্শন, আনুগত্য করা, শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্ট না দেওয়া, উচ্চ স্বরে ও কর্কশ ভাষায় কথা না বলা, যে কোন কথা বা কাজ দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কষ্ট না দেওয়া, তাদের প্রতি অবহেলা না করা”Ñ যে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
বিদ্যমান আইনের ৩নং ধরার ৪নং উপধারা এর সাথে নিম্নোক্তভাবে সংযুক্ত করা যেতে পারে, ৩ (৪) “অথবা কোন সন্তান তার পিতা-মাতার প্রতি এমন আচরণ করবে না, যাতে পিতা বা মাতা বা উভয়ে স্বেচ্ছায় সন্তানের বাসস্থান থেকে আলাদা হয়ে যেতে বাধ্য হন।” বিদ্যমান আইনের ৩নং ধারায় ৭নং উপধারায় বর্ণিত “সন্তান তার মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হইতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা বা উভয়কে প্রদান করবে” এর সাথে অন্য একটি উপধারা যুক্ত করে ‘যুক্তিসঙ্গত’ পরিমাণ অর্থ এর ব্যাখ্যা দেয়া যায় এভাবে যে, “যা দ্বারা তাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যয় বহনের ন্যূনতম অর্থ সংকুলান হয়”। যে সকল পিতা-মাতার সন্তান নেই বা সন্তানের কর্মসংস্থান নেই বা সন্তান আয় রোজগার করতে অক্ষম বা বিকলাঙ্গ তাদের ভরণÑপোষণের দায়িত্ব সরকার কর্তৃক গ্রহণ করার জন্য বিধি প্রণয়ন করা।
সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার সকল স্তরের পাঠ্যসূচিতে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব, নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণের ধর্মীয় নির্দেশনা, পরকালীন জবাবদিহিতা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং উল্লিখিত বিষয়সমূহ সরকারের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ও বেসরকারি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার করার মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধিকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ। বিদ্যমান আইনের ৬নং ধারার আমলযোগ্যতা, জামিন যোগ্যতা ও আপোষযোগ্যতার ক্ষেত্রে নমনীয়তা পরিহার করে আরো কঠোরতা আরোপ করা এবং বিচারিক আদালতের পরিধি ১ম শ্রেণী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সীমাবদ্ধ না রেখে এর পরিধি বৃদ্ধি করা।
বিদ্যমান আইনের ৩নং ধারার উপধারা (৩) এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ সহায়ক আইন প্রণয়ন করা। যথা: সরকারি স্বায়ত্বশাসিত বা বেসরকারি কর্মক্ষেত্রসমূহের কর্মরতদের মধ্যে ক্ষেত্র অনুযায়ী তাদের পিতা-মাতার সঙ্গে বসবাস বা চিকিৎসার সুবিধার্থে তাদের অনুকূল বিভাগ, জেলা, থানা বা কর্মস্থলে পদায়ন (চড়ংঃরহম)-এর বিধি প্রণয়ন করা।
সন্তানের জন্য পিতা-মাতার হলেন আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহ। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে সন্তানের লালন-পালন ও তাদেরকে প্রকৃত মানুষ হিসাবে গড়ে উঠার ক্ষেত্রে পিতা-মাতার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘পিতা-মাতার গুরুত্ব ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার গুরুত্ব অনেক বেশি। তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা, বিনয়ী আচরণ ও তাদের জন্য ব্যয় করার বিষয়ে ইসলাম দিক নির্দেশনা রয়েছে। বিশেষভাবে বৃদ্ধ বয়সে তাদের প্রতি ভালো আচরণ, সেবা-যতœ, সময় দান করা এবং আল্লাহ্র নিকট তাদের জন্য দু‘আ করার শিক্ষা ইসলাম প্রদান করেছে। তবে ইসলাম তাদের প্রতি সদ্ব্যবহারের জন্য আইন নির্দিষ্ট করে দেয়নি। রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে প্রয়োজন অনুযায়ী পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ বাস্তবায়নের জন্য শরী‘আহ্সম্মত পদ্ধতিতে কুরআন ও সুন্নহ্র ভিত্তিতে বিধান প্রণয়ন করতে পারবে। ইসলামে নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টির মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। মূলত পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ যতটা না আইনগত তার চেয়ে বেশি নৈতিক ও ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্যবোধ-এর সাথে সম্পৃক্ত। মৌলিক অবক্ষয়ে জর্জরিত ও নৈতিক স্খলনে পতিত কোন সমাজে আইন দিয়ে নৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য জনসাধারণকে বাধ্য করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমাজের সর্বস্তরের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অনুশীলন সামাজিক সচেতনতা। তাই আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের নৈতিক, ধমীয় মূল্যবোধ ও জবাবদিহিতার অনুশীলন প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যবস্থার সকল স্তরে বিষয়টি পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্তকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা খুবই জরুরী। পাশাপাশি এ বিষয়ে আইনটি আরো সময়োপযোগী ও কার্যকর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তাহলে সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত হবে, নির্বিঘœ হবে তাদের অধিকার প্রাপ্তি। (সমাপ্ত)