বিভাগ: সাহিত্য

আমার শিক্ষা জীবন

সুমনা আক্তার সাথী

ক্ষণস্থায়ী এ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই সুখ চায়। শান্তিপূর্ণ জীবন চায়। সুখের পেছনে ছুঁটতে ছুঁটতে এক সময় মানুষ অবশ্যই সুখের দেখা পায়। কারণ সুখ না ছাড়া দুঃখকে যেমন বুঝা যায় না, তদ্রƒপ জীবনে দুঃখ না থাকলে সুখের মূল্যটাও টের পাওয়া যায় না। কিছু কথা অল্প হাসি, জীবন এবং মরণ দুটোরই পাশাপাশি এক টুকরো সুখ আর এক টুকরো দুঃখ সব মিলিয়েই আমাদের জীবন। পৃথিবীতে যখন জন্ম নিয়েছি দুঃখ তো থাকবেই। তাই বলে কী জীবনকে উপভোগ করব না। ঘরের কোণে বসে থাকলে সুখ কখনো আসবে না। সুখ লাভ করার জন্য নিজেকে সামনের দিকে এগুতে হবে। সুখকে ধরতে গিয়ে জীবনে অনেক বড় বড় বিপদ আসবে। দিন রাত হবে। ক্ষমতার পালা বদল হবে। পৃথিবীতে নানা উত্থান পতন হবে তবুও আমার চাওয়া পূরণ করতে চেষ্টা করব। কেননা সুখ আমাকে ধরতেই হবে। আর এই সুখকে আপন করার প্রথম সোপান শিক্ষা অর্জন করা। আমরা জানি মন দিয়ে লেখাপড়া করলে নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো যায়। লেখাপড়া শেষ করে ভালো চাকুরী করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারলে সুখ এবং সম্মান দুটোই আমাদের পেছনে থাকবে। এ আশা লালন করেই একটি মেয়ে ছোটবেলা থেকেই সে লেখাপড়ায় বেশ মনোযোগী হয়। কিভাবে নিজেকে সমাজের সামনে প্রতিষ্ঠিত করতে কিভাবে নিজেকে বড় বানাবে সে চিন্তা মাথায় রেখে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতো।
আজ আমি এমনই একটি মেয়ের শুধু স্কুল জীবন নিয়েই লিখতে বসেছি। যার আত্মকথা শুনলে যে কোনো হৃদয়হীন মানুষেরও চোখ গড়িয়ে অশ্র“ পড়বে। এক আকাশ সম দুঃখের কাহিনী। মেয়েটির নাম ‘ছামিয়া’ সীমিত সৌন্দর্যের অধিকারিনী। বয়স যখন ৫ বছর তখন সর্বপ্রথম জ্ঞান অর্জনের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং এখান থেকেই তার শিক্ষা জীবন শুরু হয়। প্রথম শ্রেণী হতে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। এখানে তাঁর অনেক বন্ধু-বান্ধবী ছিলো। হেসে খেলে জীবন নির্বাহ করতো। তার প্রতিটি দিন কাটতো ফুলের মতো। পড়ালেখায় অসাধারণ মনোযোগী ছিলো বলে শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ তাকে ভীষণ ভালোবাসতো। বাংলা বিষয়ের একজন শিক্ষক নাম আবরুছ। ছামিয়া যখন ৪র্থ শ্রেণীতে পড়তো তখন এ স্যার তাকে সবার তুলনায় বেশি ভালোবাসতেন। যা দেখে অন্য মেয়েরা হিংসা করতো। ছামিয়া খুবই চঞ্চল ছিলো। ক্লাসে বসে বসে তার খুব ভালো দুইজন বান্ধবীকে গান শুনাতো। যা অন্য কেউ শুনতে পারতো না। এমন সময় ছামিয়া ৪র্থ শ্রেণী হতে পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলো। ৫ম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে তার এক বন্ধু নাম তনু। সে ছিলো হিন্দু। স্কুলে গিয়ে ছামিয়াকে বেশ জ্বালাতন করতো। সব সময় তার সাথে লাগালাগি করতো। সে বলতো ছামিয়াকে নাকি সে ভালবাসে। কিন্তু ছামিয়া তাকে সহ্য করতে পারতো না। সে ভালবাসা কি তা বুঝত না। তারপর সবার সামনে একদিন ছামিয়া ও তার বান্ধবীকে কয়েকটি চকলেট এনে দিলো তনু। গোটা স্কুলে ছড়িয়ে পড়লো ছামিয়া এবং তনু একে অপরকে ভালোবাসে। ছামিয়া সরাসরি তার স্যারের কাছে অভিযোগ করলে স্যার তনুকে খুব কঠিন শাস্তি দিলেন। তারপরও তনু ঠিক হয়নি। কিছুদিন পর কি কারণে সে ছামিয়াকে সবার সামনে তার গালে একটি থাপ্পড় মারে। ছামিয়া সহ্য করতে না পেরে স্কুল ছুটির পর পায়ের জুতা খুলে তনুর গালে দুটি বাড়ি দেয়। পেছনে তাকাতেই তনু চায় ছামিয়াকে মারতে। কিন্তু পারেনি, ছামিয়া তার মুখে থু থু দিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে ছুঁটতে ছুঁটতে বাড়িতে এসে পৌঁছায়।
সেদিন তুনুকে জুতা পেটা করার পেছনে ছামিয়াকে তার বান্ধবীরা সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছিলো। সেই থেকে তনু ভালো হয়ে যায়। এমন এক সময় সমাপনী পরীক্ষা এসে যায়। ছামিয়া পরীক্ষায় খুব ভালো ফলাফল করে। প্রাথমিক বিদ্যালয় ছেড়ে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির পালা। ছামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হবে তার কি যে খুশি লাগছে। এমন সময়ও বাঁধা পড়ে গেল। ছামিয়ার ভাই বলে মেয়েদের ক্ষেত্রে পড়ালেখা আসলেই বেমানান। ছমিয়াকে আর অতিরিক্ত লেখাপড়া করানোর দরকার নেই বলে তার পড়ালেখা বন্ধ করে দেয়া হয়। ওই দিন থেকে তার জীবনে দুঃখ শুরু হল। সবাই স্কুলে যায় আর ছামিয়া তাদের দিকে তাকিয়ে শুধু কাঁদে। এভাবে কেটে গেল তার একটি বছর। এক বছর পর যখন স্কুলে ভর্তির সময় আসলো তখন ছামিয়ার আত্মীয়-স্বজন সবাই তার বাবাকে বললেন ছামিয়া বেশ মিষ্টি মেয়ে। লেখাপড়ায় মনোযোগী। ওকে কেন পড়ালেখা থেকে বঞ্চিত করেছো। তাছাড়া এখনো পৃথিবীতে শিক্ষা ছাড়া কোন উপায় নেই। এ মেয়েটির জীবন এভাবে নষ্ট কর না, ওকে স্কুলে ভর্তি করে দাও। এমন কি ছামিয়াও কেঁদে কেঁদে বলছে বাবা তোমরা আমার জীবনটা এভাবে শেষ করে দিও না। আমি পড়ালেখা করে বড় হতে চাই। সবার কথায় ছামিয়ার বাবা তাকে স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করে দিলেন। ছামিয়া রীতিমত স্কুলে আসা যাওয়া করে। আসলে তার বাবাও তাকে খুব বেশি ভালোবাসতেন। ছামিয়াকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন ছিলো। ছামিয়া যখন ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণী পেরিয়ে ৮ম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলো তখন হতেই স্কুলের সবার নিকট পরিচিতি লাভ করল। অন্যান্য ক্লাসের তুলনায় এই ক্লাসে এসে তার অনেক বান্ধবী জুটলো, লেখাপড়ারও অনেক উন্নতি হলো। সবার মতো সেও ফ্যাশন সচেতন ছাত্রী। স্কুলের ৮ম শ্রেণী ছাড়াও ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৯ম ও ১০ম শ্রেণীর অর্ধ শতাধিক মেয়েদের সাথে তার বন্ধুত্ব। ছোট বড় সবার সাথে তার খুব ভালো সম্পর্ক। সবাই তাকে ভীষণ আদর করে।
এদিকে ওই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাও তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির পর ছামিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় অনেকটা শান্ত হয়ে গিয়েছিলো। স্কুলে যাবার বেলায় সোজা রাস্তায় যেত। আবার স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ওই সঠিক রাস্তায়ই বাড়ি ফিরতো। ৮ম শ্রেণীতে থাকাকালীন সময়ে যখন স্কুলের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে রওয়ানা দিতো তখন অনেক বখাটে ফালতু ছেলেরা অনেক কিছু বলতো। ছামিয়া যেন কানে শুনতে পায় না। ওদের কথায় কোনো সাড়া দিতো না। কাউকে গালিও দিতো না। এমন সময় তাদের স্কুলের ১০ম শ্রেণীতে পড়তো একটি ছেলে নাম নুরুল ইসলাম।তার দুটি জমজ বোনও ছামিয়ার সাথে একই ক্লাসে পড়তো। তখন ছিলো রমজান মাস, ৮ম এবং ১০ম শ্রেণীর কোচিং চলছে। এমন সময় সে দেখতে পেল ওই নুরুল নামের ছেলেটি তার দিকে বার বার তাকাচ্ছে এবং কি যেন বলতে চাচ্ছে ও কেন বার বার ছামিয়ার দিকে তাকায় বুঝতে পারছে না। সে ভাবল এ বিষয়টা গোপন থেকে যাক। কিন্তু গোপন রইল না, সব মেয়েরা বলতে শুরু করলো এই ছামিয়া তুই নিশ্চয়ই নুরুলকে ভালোবাসিস তা না হলে ও তোর দিকে এভাবে তাকায় কেন? সবাই ভাবলো ওদের কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে। সবাই ছামিয়াকে ভুল বুঝে অনেক কথাবার্তা বলে। তারপর ছামিয়া একদিন ঐ স্কুলের একজন শিক্ষককে বলে স্যার আমাকে সবাই ভুল বুঝছে। কাকে দিয়ে ওরা আমাকে সন্দেহ করছে। আমি কী করব? উত্তরে স্যার বললেন আমি তোমাদের সবাইকে সাবধান করে দিলাম, তোমরা কখনো ছামিয়াকে কিছু বলবে না। তারপর সবার মুখই বন্ধ হয়ে গেল। একদিন ছামিয়ার এক বান্ধবী তানজিনা এসে জানাল সে শুনে এসেছে নূরুলের দুই বোন মিলে বাড়িতে গিয়ে তাদের মাকে সব খুলে বলেছে। তার মা বলেছেন তুমি আমার আদর্শে গড়ে উঠা সন্তান। আমি তোমার কাছে মন্দ কিছু আশা করি না। নূরুলের মা বোন ভেবে নিয়েছিল নূরুল ছামিয়াকে ভালোবাসে। তাদের ধারণা ভুল ছিলো। ছামিয়া কখনোই ওকে ভালোবাসতো না। কে কাকে ভালোবাসবে ছামিয়ার মনে তখন ভালোবাসার কোনো আবেগ ছিল না বললেই চলে। যাই হোক তারপর আরেকজনের পালা, তার নাম হাবিব। পড়ালেখায় বেশ ভালো ছাত্র। সেও দশম শ্রেণীতে পড়তো। খুব স্মার্ট ছিলো। বেশ সুন্দর। সেও অনেক দিন ছামিয়ার মুখের দিকে তাকাতো। ওকে কাছে ডাকতো। সবকিছু বুঝেও ছামিয়া তার ডাকে সাড়া দিতো না। আসলে সত্যিকার অর্থে ছামিয়া খুবই সুন্দর ও নির্মল চরিত্রের অধিকারী ছিলো। তবুও মেয়েটির ভাগ্যে এতো দুঃখ। ৮ম শ্রেণীতে থাকাকালীন সময়ে ঐ স্কুলের আব্দুল হাই বিএসসি নামের একজন শিক্ষক তাকে খুব ভালোবাসতো। তিনি জানতেন ছামিয়া খুবই দরিদ্র পরিবারের একটি মেয়ে। ঐ স্কুলের আরো একজন শিক্ষক নাম কাওছার আহমেদ। যাকে সবাই ঐ স্কুলের ছোট মাওলানা স্যার বলেই জানতো। ঐ দু’জন শিক্ষক ছামিয়াকে অনেকাংশে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। খুব বেশি আদর করতেন। ৮ম শ্রেণীতে যখন ছামিয়া জে.এস.সি পরীক্ষা দিবে তখন পড়ালেখার বিষয়ে তেমন কোনো প্রস্তুতি ছিল না তার। ঠিক তখনই ওই বিএসসি স্যারই তাকে বেশি অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন। ওই স্যারকে অনেকেই মন্দ বলে আখ্যায়িত করতো। ছামিয়ার সাথে নাকি ঐ স্যারের ভাব আছে সবাই বলতো। এক সময় ছামিয়ার কাছ থেকেই জানা যায়, এক প্রসঙ্গে ছামিয়া বলে শিক্ষক বাবার মতো। শিক্ষকের সাথে কখনো কি প্রেম হয়।         (চলবে)

নারী

ছাদিকুর রহমান

নারী তুমি পবিত্র তুমি সুন্দর
তোমার সঙ্গ পাওয়া জন্য অস্থির সমস্ত নর
নারী তুমি চঞ্চল তুমি ডানপিটে
তোমার হাসিতে যেন ফুল ফুটে
তোমার ইশারার যেন চাঁদ নেমে আসে
কত শত মানুষ ঘুরে তোমার চারপাশে
নারী তুমি বধূ,বোন তুমি মায়ের জাত
সবার আগে ছুটে আসে তোমার মমতাময়ী হাত
নারী তুমি উদাস মনে একটু শান্তির ছোঁয়া
হৃদয়ে দোলা দেয় যখন পাগলা হাওয়া
নারী তুমি অর্ধাঙ্গীনি জনম জনমের সাথী
চিরদিন তুমি একে অন্যয়ের থাকবে পাশাপাশি।

বাংলার মান

আহমদ রেজা চৌধুরী

আমরা বাঙালি
বাংলা ভাষায় কথা বলি।
সত্যের মধ্যে আছে মোদের প্র্রাণ ॥
আমরা যদিও ক্ষুদ্র
ডিঙ্গাই বাধার সমুদ্র।
মুহূর্তেই করতে পারি নব উত্থান ॥
অন্ধকারের আলো
মরুর চেয়ে ভালো।
এর মধ্যেই জেগে উঠে নব প্রাণ ॥
জাগরে ঘুমন্ত
আর হয়োনা অন্ধ।
রাখো সবাই এ বাংলার মান ॥

বেকার কিৎসা

সৌমেন কুমার

আমার স্বপ্ন গুলো বিনাশ
ভুল হয়েছে অংক,
আজ আমি এক জীবন্ত লাশ
হায় সুখের পালঙ্ক।

কর্মহীন জীবন রজনী
নাই ফাস্ট ক্লাসের বড়াই,
অসহ্য আজ এই ধরণী
ভুল ঘর্মাক্ত লড়াই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র
দেখে ঘোর অন্ধকার,
হও এনজিও ক্রেডিট অফিসার
না হয় কোম্পানী এস আর

বাংলা মায়ের মেধাবী সন্তান
ঘোরে যদি পথে,
দেশের মেরুদণ্ড ভাঙবেই
ফিরবে না জয়রথে।

কাবু করল শীতে

মিজানুর রহমান মিজান

এবার শীতে করল বেশ কাবু
বেশী কাপড় পরলে হওয়া যায় না বাবু।
সন্ধ্যার আগেই ঠক ঠকিয়ে কাঁপায়
শীত ধরে না হাত পায়ের মোজায়।
একটু ও শীতের নাই যে শরম
বৃদ্ধ-যুবা সমান তালে নরম।
কাঁথা গায়ে দিয়ে আড়মোড়া
রাতে বেশী জ্বালায় ফাঁক-ফোঁকর ছাড়া।
প্রচুর সবজি ফলে শীতে
ভাল লাগে খেজুর রসে ভাপা পিঠা খেতে।
শিশুরা গোসল করে না শীতের ভয়ে
বয়স্কদের ভীষণ কষ্ট শীত লাগিলে গায়ে।
জুতা-মোজা-টুপি পরা খুব সহজ
সৌদি আরব অধিক গরম যখন হয় হজ্ব।
সবার সনে মিতালী সমান তালে
ঠান্ডা পানি ছুঁতে চায় না কেউ বেতালে।

মরুময় মরীচিকার পানে

নেছার আহমদ নেছার

আমি মরুময় মরীচিকার পানে
ছুটে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালাম,
যেদিকে চোখ যায় অসীম শূন্যতা
জীবনবৃক্ষ ছায়ায় বসে
চোখ মেলে দেখলাম-শুধু শুধু নি:স্তব্ধতা,
এখানে কেবলেই শুধু শুধু নীরবতা-
এক ভুবন নীরব নি:স্তব্ধতা।
পৃথিবীর কোলাহল নেই-
নেই কোন প্রাণের সাড়া
নেই চাওয়া পাওয়ার অনুভব;
শুধু পদচিহ্ন অবলোকন করে ছুটে এসেছি।
পাইনি তারে খুঁজি যারে-
দিগন্তের সীমাহীন মরুময় পথে
কে যেন সাড়া দেয় অনেক সু-দূরে
অস্তাচল রবির আভায় কোন এক মূর্তি
জাগায় স্বপ্নময় স্মৃতি হৃদয়ের আকুতি
মিশে আছে জীবন পথে
পাইনি যারে কেন খুঁজি তারে
শুধু শুধু হারিয়ে যাওয়ার হাহাকারে।

জেসমিন জুঁই ৯

জালাল আহমেদ জয়

ধূলি মেঘ জুড়ে হেমন্তের ঝর্ণা বয়ে
চলে:ফাস্ট টাইপ রিক্সার মতো
ফলের বাগানে
ফুলের ঘ্রাণে ক্ষত-বিক্ষত
হৃদয়ের প্রান্তর।
চাঁষির চোখে আশার প্রদীপ
জ্যোৎস্নার আলোয় সাজে যখন
তার মাটির ভিটাখানি
আমি সেখানেই দেখেছি
তোমার আর আমার হাতে
দরজার খিলি দিয়ে ভেসে
এসেছিলো চাঁদের ঢেউ।
বলেছিলাম চাঁদও ভালোবাসে
এই হাতগুলো
ছেড়ো না ধরে রাখো
যেমন করে চাঁদও ধরে রাখে
জ্যোৎস্নার ছায়া।

শিরিনা তোমার জন্য

জামাল আহমদ জীবন

অক্টোবরের ৮ তারিখ এলে
শিরিনা তোমায় মনে পড়ে
তুমি আমায় ভুলে গেলে
আমি তোমায় ভুলব না।
সে দিনের কথা কি
মনে পড়ে না,
তানিয়া আর আমি
সাথে ছিলে তুমি,
লজ্জা তুমি পেয়েছিলে
মিষ্টি করে হেসেছিলে।
এক বছর একদিন
ভালোবাসার শেষ দিন,
আমাকে তুমি ভুলে গিয়ে
দারাকে বুকে টেনে নাও!

অপরাধী…!

নূরুদ্দীন রাসেল

পাখি উড়ে যায় আকাশে
ডানা মেলে দৃষ্টি খোলে
উড়ে উড়ে গিয়ে বসতে চায়
বটবৃক্ষের ছায়ায়।
আমি তার পানে তাকিয়ে নির্বাক
অন্তর খেয়ে, শূন্য হৃদয়ে অশ্র“ বন্যা
বয়ে যায় নিরবধি।
আমি অসফলতার দায়ে
সারাটি জীবন অপরাধী….!

অগোচরে

মিজানুর রহমান মিজান
১৯৭৬ খ্রীষ্টাব্দের ফেব্র“য়ারী মাসের তীব্র শীতের রাত। নিরব, নিথর, নির্জন পরিবেশ হলেও মাঝে মাঝে দু’একজন পথিকের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। এক বার একজনের গানের উদাস কণ্ঠ বাতাসে ভেসে গ্রামের হয়ত অনেকের কর্ণ কুহরে প্রবেশিল। দশম শ্রেণীতে পড়ি। মনোযোগের সহিত বইয়ের পাতায় চোখ আবদ্ধ। রাত তখন এগারোটা। এ সময় আমারই গ্রামের দু’জন সমবয়সী দরজায় কড়া নাড়েন। দরজা খুলতেই উভয় আমার কক্ষে প্রবেশ করে বসে পড়েন আমার চৌকিতে।
আমি জিজ্ঞেস করি তাদের আগমনের হেতু কি ? কারণ এ সময় সাধারণত: আমার কক্ষে কেহ পদার্পণ করেন না। একটা অলিখিত ও অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার সমপর্যায়ভুক্ত বিবেচনায়। ওরা মুখ খুললেন, “ আজ তোমাকে গানের আসরে নিয়ে যেতে চাই”। তখনকার দিনে পল্লীগ্রামে যাত্রাগান, বাউল গান, কিচ্ছা ইত্যাদির বহুল প্রচলন ছিল। মানুষের কাজকর্মও এ মৌসুমে না থাকায় এ জাতীয় উৎসব, আয়োজনের প্রতি ঝোঁক ছিল অত্যধিক। সব বয়সের মানুষের যাতায়াত ছিল এক প্রকার বাধ্যতার তালিকায় আনন্দ উপভোগের নিমিত্তে। তখন পর্যন্ত আমি এ জাতীয় কোন অনুষ্ঠানে যোগ দেইনি। আমার ক্ষেত্রে অনেক কার্য কারণ ছিল বিদ্যমান। লেখাপড়ার দিক বিবেচনা, বয়স কম হওয়া ইত্যাদি। তদুপরি একেবারে হয়ত শূন্যের কোঠায় উপস্থিতির হার থাকতো না যেহেতু গ্রামেই বসবাস। আমার ক্ষেত্রে বাড়তি অসুবিধার কারণও ছিল যথেষ্ট। আমার পিতা ছিলেন একজন প্রখ্যাত ও জনপ্রিয় বাউল শিল্পী। যে কারণে আমাকে হাটে-মাঠে, ঘাটে লোকে দেখলেই বলতেন, আমি একজন নামী বাউল হবো। কিন্তু জানি না মহান আল্লাহর কি ইচ্ছা ? এ ব্যাপারে কোনদিন আমি ভাবিনি, ছিল অনাগ্রহতা, অনিচ্ছা। ফলে আমি এ সব ক্ষেত্রে উপস্থিত হতে আমার ভয়, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব ও জড়তা ছিল প্রবল। একদিনের উপস্থিতি যে কেহ দেখলেই জনমুখে রটে যাবে ভবিষ্যৎ বাণীর সম্ভাব্যতার শত ভাগ সত্যতা। এমনিতেই আমি এ ব্যাপারে মানসিক যন্ত্রণার ভার বয়ে বেড়াচ্ছিলাম অহরহ। শেষ পর্যন্ত ওরা জানান দিলেন আজ আমাকে ওরা নিয়েই যাবে এ প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ।
অনেকক্ষণ আমার না সূচক জবাব এবং তাদের নিয়ে যাবার সাধাসাধিতে চলে কথোপকথন। দু’জনের সাথে একা পেরে উঠা সম্ভব হচ্ছিল না। আমার বইপত্র, লেপ-তোষক, বালিশ পর্যন্ত গাট্টি বেঁধে আমাকে অসহায় করে ফেলে। কি আর করা।
নিরুপায় হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মত হলাম। তবে আমার কথা ছিল তাদের নিকট আমাকে অত্যন্ত সংগোপনে এবং সতর্কতার সহিত অনুষ্ঠান শুনিয়ে, দেখিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ওরা আমার সকল প্রকার শর্তে একবাক্যে সম্মত। যেহেতু তাদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল আমাকে নেয়া। কিন্তু তাদের এ প্রতিজ্ঞার কথা জানা ছিল না আমার ঘুণাক্ষরে।
কক্ষটি বাহির দিকে তালাবদ্ধ করে জীবনে প্রথম বারের মত চলি মাইল দেড়েক দূরবর্তী গ্রামে কিচ্ছা বলার আসরে। রাস্তায় আরো ও শর্ত ছিল আমার পক্ষ থেকে আরোপিত, কঠোর গোপনীয়তাসহ অনুষ্ঠান শেষ হবার নিদেন পক্ষে ঘণ্টাখানেক পূর্বে রওয়ানা দিয়ে চলে আসার।
অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছেই যা ছিল লক্ষণীয়Ñতাহলো আমার পিতার উপস্থিতি অনুষ্ঠানের কেন্দ্রস্থলে এবং আমার বড় ভাই (চাচাতো) তাঁরা দর্শক সারিতে যত্রতত্র দন্ডায়মান। পরবর্তীতে এলাকার সচেষ্টজনদের উপস্থিতি যা পূর্বেই অনুমেয় ছিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত আমি আত্ম-গোপনের প্রচেষ্টা চালাই সাধ্যমত। অনুষ্ঠান ছিল একটি বাড়ির বড় উঠানে। পূর্বের ভিটায় গৃহ শূন্যতায় পুকুর ঘাটের এলাকা পর্যন্ত ছিল অবারিত। ঘাটের পশ্চিমে ছিল প্রকান্ড কাঁঠাল গাছ তির্যক ভাবে দাঁড়িয়ে। আমি ঐ গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলাম। সঙ্গিরা চলে গেলেন আমার নিরাপদ অবস্থান অনুসন্ধান কার্যে। চল্লিশ মিনিটের মত সময় অতিক্রান্ত। তাদের ফিরে আসার কোন লক্ষণ নেই। বরং আমার দৃষ্টিতে স্পষ্ট ওরা এক স্থানে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠানের দর্শক সেজে নির্বিঘেœ উপভোগে মত্ত। আমি আশার হাল ছাড়িনি। হয়ত এক্ষুনি চলে আসবে এ প্রত্যাশায়। ইতিমধ্যে বাড়ির অপর গৃহের একজন মহিলার দৃষ্টিতে আমার উপস্থিতি ধরা পড়ে যায়। ঐ মহিলা পাম্প লাইটের আলোতে আমাকে দেখে ফেলেন। ছোট একটি কিশোরীকে কুপি বাতি হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দেন আমার কাছে। কিশোরীর আগমন লক্ষ্য করেই আমার মনে ভয়ের উদ্রেক হয়। অনুষ্ঠানের আনন্দ উপভোগে সকলেই মগ্ন হলে ও কিশোরীর আগমনে কেউ না কেউ অবশ্যই লক্ষ্য করবে। আর তা থেকে আমার ধরা পড়া সুনিশ্চিত। তথাপি মনে সাহস সঞ্চার করে অপেক্ষমান থাকি গাছের আড়ালে গুটিশুটি মেরে। কিশোরী নিকটে এসে জিজ্ঞেস করে আপনি কে, কোথায় বাড়ি, এখানে একা কেন বসে আছেন ইত্যাদি।
প্রত্যুত্তরে আমি কিশোরীকে শান্তশিষ্ট ভাবে আমার অসুবিধা বলে বিদায় করতে সক্ষম হই। মহিলার নিকটবর্তী হতেই কি জানি কি বলে আবার আমার কাছে পাঠানো হচ্ছে দেখে ঐ স্থানে বসে থাকা আমার পক্ষে নিরাপদ নয় বলেই দ্রুত স্থান ত্যাগ করি। তাছাড়া এতক্ষণে মশার কামড়ে গায় জ্বালা ধরে গেছে। সব কিছু বিবেচনায় উত্তরমুখী হয়ে হাঁটতে থাকি। কিয়ৎ অগ্রসর হবার পর বিদঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। এক সময় অজানা, অচেনা স্থানের অনুমান বা ঠাহর হচ্ছিল না। পা ফেলতেই ফসকে পড়ে যাই প্রায় ২/৩ হাত নীচু খালে। খালের কাদায় জুতো, কাপড়-চোপড়ের অবস্থা শোচনীয়। কোন মতে আন্দাজে হাঁটতে থাকি পূর্বমুখী হয়ে। অনেক কষ্টে এক সময় পেয়ে যাই পতিত জমি। একটু স্বস্তির নি:শ্বাস নেই এবং পরিষ্কার হবার চেষ্টা করি। অগ্রহায়ণ মাসের ফসল উত্তোলনের পর গ্রামের জমিগুলি থাকে শুষ্ক ও ফাঁকা। যেদিক ইচ্ছা চলাফেরার থাকে অবাধ সুবিধা। সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে চারিদিক থেকে লোক আগমন তখন ও ছিল বিদ্যমান। ২/৩ জনের একটি দল আসার লক্ষণ দেখেই আমি হাঁটতে থাকি বিপরীতমুখী হয়ে তথা আমার গ্রামের দিকে। তাদের প্রত্যেকের হাতে টর্চ লাইটের আলো ফেলে লক্ষ্যস্থলের দিকে এগুচ্ছিল। হঠাৎ একজন আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করে “কে”? আমি চাদর দিয়ে মুখ চেপে জবাব দেই “আমি ” কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালিয়ে। তাদের আবারো জিজ্ঞাসা “আমি কে”? পূর্ণ পরিচিতির নিশ্চয়তা চায়। আমার সকল প্রকার সাধনা ব্যর্থতায় হবে পর্যবেশিত ওরা পরিচয় পেলেই। সুতরাং আমি প্রাণপণে শুরু করি দৌড়। ওরা সকলেই ছুটে ধর ধর বলে আমার দিকে। একটির পর একটি লাইটের আলো আমার উপর পতিত হওয়ায় রাস্তা চলা আমার সহজ হয়ে যায়। এক সময় বিরক্ত হয়ে ওরা দৌড় থামায়। ততক্ষণে আমি গ্রামের নিকট এসে গেছি। নিরাপদ স্থান দেখে বসে বিশ্রাম নেই কিছুক্ষণ। বাড়িতে এসে কাপড় পাল্টিয়ে দেই নির্বিঘেœ ঘুম।
পরদিন বেলা ৯ ঘটিকায় আসে খোঁজ নিতে সঙ্গিদ্বয়। অনেক প্রকার ভনিতার আশ্রয় নেয় আমাকে সন্তুষ্টি প্রদানের। কিন্তু সত্য তার আপন মহিমায় সুপ্রতিষ্ঠিত। যতই ছলচাতুরী, মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হোক না কেন ? হয়ত সময়ের ব্যবধানে হেরফের হতে পারে। সত্যের স্বপদে প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত। অনেকটা প্রশ্নোত্তরে ধরা পড়ায় ওদের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। আমি এ দিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্মৃতির পশরায় জাগ্রতবোধে থাকি বিরত। আর কখনও এ জাতীয় লোকের সঙ্গে চলা থেকে থাকি সদাসচেতনতায় সচেষ্ট। পরবর্তী সময় দু’একদিন এ ধরণের অনুষ্ঠানে যাবার সৌভাগ্যে উপনীত হয়েছি, তবে সঙ্গিবিহীন। একা একা নীরবে হত গমন এবং অনুষ্ঠান শেষ হবার অনেক আগে ফিরে এসেছি সংগোপনে। ঘুণাক্ষরেও কেহ ঠাহর করতে পারেননি বা আমার যাত্রা থেকেছে সকলের অগোচরে, অলক্ষ্যে।