বিভাগ: সম্পাদকীয়

মশক নিধনে সচেতনতা

মশার উপদ্রবে মানুষ অতিষ্ঠ। মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফগার মেশিন নামের কামান দাগানো হচ্ছে। নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হচ্ছে। কিন্তু সব কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মশা বহাল তবিয়তেই আছে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতের যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য অনবরত শক্তি বৃদ্ধি করে যাচ্ছে। তাহলে মশার হাত থেকে নিষ্কৃতির উপায় কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশাবিরোধী যুদ্ধ সঠিকভাবে চালানো হচ্ছে না। মশার ডিম, শুককীট বা লার্ভা, মুককীট বা পিউপা ধ্বংস না করে মশাবিরোধী অভিযানে শুধু পূর্ণাঙ্গ মশাকে টার্গেট করা হচ্ছে। এতে পূর্ণাঙ্গ মশা কিছু পরিমাণে মরলেও নতুন করে জন্মানো মশা সেই স্থান পূরণ করছে। আবার মশার ওষুধের কার্যকারিতা কিংবা সঠিক ওষুধ সঠিক মাত্রায় ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন আছে। নকল-ভেজাল ওষুধ প্রয়োগের অভিযোগও আছে।
মশার বংশবৃদ্ধিতে পানির প্রয়োজন হয়। বাড়ির আশপাশে পরিত্যক্ত পাত্র বা কৌটা, ডাবের খোল, এমনকি ফেলে দেওয়া পলিথিনেও যদি সামান্য পানি জমে থাকে, তাতেও মশার বংশবৃদ্ধি হতে পারে। তা ছাড়া নালা-নর্দমা, খাল ইত্যাদি পরিষ্কার না করায় সেগুলো মশার বংশবৃদ্ধির আদর্শ স্থান হয়ে আছে। এমনকি অনেকের ঘরের ভেতরেও মশার উত্তম প্রজননস্থল থাকে। ফ্রিজের নিচে একটি পাত্রে পানি জমে, তাতেও মশার বংশবৃদ্ধি হয়। বাথরুমে, রান্নাঘরে জমিয়ে রাখা পানিতে মশা প্রজনন করতে পারে। অনেকে ঘরে পানি দিয়ে ছোট গাছ বা ফুল সাজিয়ে রাখে, তাতেও মশা বংশবিস্তার করে। মশার উৎপাত বা সংখ্যা কমাতে হলে প্রথমেই এর বংশবৃদ্ধির উৎসগুলোতে হাত দিতে হবে। এ কাজে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সমানভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাকেও এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিধন করা কখনোই সম্ভব নয়। তদুপরি তাদের লোকবল ও যন্ত্রপাতির অভাব আছে। যেটুকু আছে সেটুকু ব্যবহারেও রয়েছে নানা রকমের ফাঁকিজুকি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও মশার বংশবৃদ্ধি দ্রুততর হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া হলে অদূর ভবিষ্যতে মশাবাহিত বিভিন্ন রোগ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিষয়টি আমাদের নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখা প্রয়োজন। সাধারণত বর্ষায় মশার উপদ্রব চরমে ওঠে। তাই বর্ষা শুরুর আগেই মশা নিধনে ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। নগরীর প্রায় ভেঙে পড়া ড্রেনেজব্যবস্থা ঠিক করতে হবে। বহু সমস্যার কারণ নগরীর খালগুলো দ্রুততম সময়ে সংস্কার করতে হবে। নিয়মিত সঠিক জায়গায় সঠিক ওষুধ সঠিক পরিমাণে ছিটাতে হবে। নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। পানি জমতে পারে এমন পরিত্যক্ত বস্তু বাড়ির আনাচকানাচে থাকলে সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে। ঘরের ভেতরে কোনো পাত্রে যেন কয়েক দিন পানি জমে না থাকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ছোটখাটো খানাখন্দ ভরাট করে ফেলতে হবে। ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। এসব কাজে নাগরিকদের সংগঠিত ও সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে।

সুপেয় পানি রক্ষা জরুরী

শুধু শহর নয়, সারা দেশেই নিরাপদ পানীয় জলের সংকট ক্রমে তীব্র হচ্ছে। আর বড় শহরগুলোতে এই সংকট কখনো কখনো মানবিক দুর্যোগের রূপ নিচ্ছে। প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে; কিন্তু সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুপেয় পানির সংকট মোকাবেলায় এখনই পরিকল্পিত উদ্যোগ না নিলে শিগগিরই তা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এবং সমাধান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।
দেশের নদীব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত। বেশির ভাগ নদীতেই বর্ষার কয়েক মাস ছাড়া পানি থাকে না। বেশির ভাগ জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। বাকিগুলোও ভরাট হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ফলে বর্ষার পানি দেশব্যাপী প্লাবন ঘটিয়ে দ্রুত সাগরে গিয়ে মিশছে, ভূগর্ভে প্রবেশের সুযোগ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে বোরো ধান আবাদের কারণে জমিতে ব্যাপক সেচের প্রয়োজন হয়। এর প্রায় পুরোটাই এখন ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের মাধ্যমে করা হচ্ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক স্থানে এখন গভীর নলকূপেও পানি ওঠে না। এতে মরুকরণ প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত হচ্ছে। বিশেষ করে, উত্তরাঞ্চলে মরুকরণের লক্ষণ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। আবার দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও সুপেয় পানির সংকট ক্রমে তীব্র হচ্ছে। বছরের বেশির ভাগ সময় নদীগুলোতে প্রবাহ না থাকায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নোনা পানির অনুপ্রবেশ ক্রমেই বাড়ছে। এর আগে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যানুযায়ী ভূগর্ভস্থ স্তরে নোনা পানির অনুপ্রবেশ দেশের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত চলে আসছে। উপকূলীয় নদীগুলো দিয়েও নোনা পানি ক্রমে অনেক ভেতরে চলে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও ক্রমে বাড়ছে। সে কারণে উপকূলের বহু পুকুর, জলাশয় সামান্য বেশি জোয়ারেই ডুবে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে নোনা পানি জমিয়ে চিংড়ি চাষের উৎপাত তো আছেই। ফলে বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানির সংকট এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
বড় শহরগুলোর আশপাশের নদীগুলো এতটাই দূষিত যে মানুষ এসব নদীর পানি ব্যবহারের কথা ভাবতেই পারে না। নদীগুলোও আবর্জনার ভাগাড় হয়ে আছে। জলাশয়ের অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। পানির এমন সংকটে মানুষ বাধ্য হয়ে বাণিজ্যিক পানির ওপর ক্রমে বেশি করে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সেখানেও রয়েছে বিপত্তি। পানি সরবরাহ লাভজনক হয়ে ওঠায় অনেক ভুয়া প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যারা বিশুদ্ধ না করেই ওয়াসার পানি বা জলাশয়ের পানি বোতলে ভরে সরবরাহ করছে। না জেনে এসব পানি পান করে বহু মানুষ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় যথাযথ গুরুত্ব না দিলে কোনো উন্নয়ন প্রচেষ্টাই অর্থবহ হবে না। সরকারকে সারা দেশে সুপেয় পানির উৎস রক্ষায় এবং সরবরাহ করা পানির মান রক্ষায় আরো উদ্যোগী হতে হবে।

জনশক্তি সৃষ্টির বিকল্প নেই

স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হয়েছে বাংলাদেশ। এ যোগ্যতা অর্জনের জন্য স্বীকৃতিপত্র দিয়েছে জাতিসংঘ। আর বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণা করেছে। এ সবই সুখবর, কিন্তু উদ্বেগজনক খবরও রয়েছে। দেশের সাড়ে বিস্তারিত

দরিদ্র বিমোচনের বিকল্প নেই

ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এ্যাগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ)-এর ৪১তম পরিচালনা পর্ষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী গিয়েছিলেন ইতালির রোমে। সেখানে মূল বক্তা হিসেবে তিনি দেশের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। দারিদ্র্য বিমোচন তথা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য শুধু শহর-নগর নয়; বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বিনিয়োগ একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা ছাড়া এটি অর্জন করাও সম্ভব নয়। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এবং ইফাদ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ছয়টি জেলার দুস্থ মানুষের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণে ৯২ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার বা ৯১ কোটি ২০ লাখ ৩০ হাজারের একটি ঋণ চুক্তিও সম্পাদন করেছে। এর আওতায় ২০-১৮-২০২৪ পর্যন্ত গৃহীত প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে জেলাগুলোয় ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উপকৃত হবে বলে আশা করা যায়। এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, বর্তমান সরকারের আমলেই উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় দুস্থ ও অভাবগ্রস্ত এলাকায় বহুকথিত ‘মঙ্গা’ দূর করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ২৪ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে গেছে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৪ সালের মধ্যে এই হার ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা। এর আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত উন্নয়ন ফোরামের ২০১৮ সালের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর প্রতি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যথাসময়ে অর্থছাড়সহ সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন, যা হবে জাতিসংঘ নির্দেশিত এসডিজি অর্জনে সহায়ক।
গার্মেন্টস শিল্পে দেশের সুখ্যাতি বিশ্বজোড়া আয়ও অসামান্য। এ খাতে কয়েক লাখ নারীর কর্মসৃজন হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে বিশ্বে। প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কর্মসূচীসহ নারী এবং শিশু মৃত্যুর হার প্রতিরোধেও বাংলাদেশের সাফল্য প্রশংসনীয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ইতোমধ্যে ৭.৫ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। বেড়েছে মাথাপিছু আয়। নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ থেকে ২০২১ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে ধাবমান বাংলাদেশ। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৮ শতাংশ অতিক্রম করা।
জ্ঞান-বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের দিকে নজর দিতে হবে। সর্বোপরি কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য জোর দিতে হবে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের ওপর। বর্তমানে কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে বৈচিত্র্য ও বহুমুখিতা কম। সেক্ষেত্রে ধান-চালের পাশাপাশি কৃষির বহুমুখীকরণ তথা অর্থকরী ফসল উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে। একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরি বর্তমান সময়ের দাবি। পরিহার করতে হবে ধর্মীয় কূপমন্ডূকতা। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জন এবং তা অব্যাহত রাখতে হলে সুশাসনসহ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।

 

সুপেয় পানির অপচয় রোধ

অনেক বিজ্ঞানীই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হলে তা হবে পানি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের কারণে। বিশ্বব্যাপী সুপেয় পানির অভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনসহ পৃথিবীর অনেক বড় শহরেই সুপেয় পানির অভাব চরমে উঠেছিল। আগামী বছরগুলোতে কোথাও কোথাও তা মানবিক দুর্যোগে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। এমন এক পরিস্থিতিতে ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ব পানি সম্মেলন। সম্মেলন উপলক্ষে ১৫টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানসহ বিভিন্ন দেশের নানা স্তরের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ জড়ো হয়েছেন সেখানে। আর তাঁদের পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে পুরো শহরের পানি সরবরাহে রেশনিং শুরু করা হয়েছে। অথচ ব্রাজিল সুপেয় পানির জন্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি দেশ। তাই সুপেয় পানির যে ভয়াবহ সংকট এগিয়ে আসছে, তা নিয়ে সারা দুনিয়ায়ই নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে।
নদী-নালার দেশ বাংলাদেশেও পানির সমস্যা কিছু কম নয়। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকাসহ কয়েকটি বড় শহরে পানির অভাব তীব্র হয়। কোথাও কোথাও তৃষ্ণার্ত মানুষকে ঘটি-বাটি নিয়ে মিছিলে নামতেও দেখা যায়। বরেন্দ্র অঞ্চলসহ অনেক স্থানে পানির অভাবে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। অনেক জায়গায় গভীর নলকূপেও পানি ওঠে না। নদী-নালা-বিল বেশির ভাগই ভরাট হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে সেগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকে। জমিতে সেচ দেওয়ার কোনো উপায় থাকে না। এই সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে এবং আরো তীব্র হবে। কারণ এখন পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন কাজে প্রায় পুরোপুরি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। ভূগর্ভ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। নদী-নালা-খাল-বিলে সারা বছর পানি না থাকায় ভূগর্ভে পানির প্রবেশও কম হচ্ছে। ফলে কোথাও কোথাও পানির স্তর প্রতিবছর দুই থেকে পাঁচ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না। অন্যদিকে আমাদের প্রায় সব নদীর উৎস অন্যান্য দেশে হওয়ায় নদীগুলোতে পানির অভাব হচ্ছে। উজানে থাকা দেশগুলোতে বাঁধ দিয়ে নদীর পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে আমাদের নদীগুলো দ্রুত শুকিয়ে যায়। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশে সুপেয় পানির অভাব শিগগিরই চরমে পৌঁছবে। কিন্তু আমরা কি সেই পরিস্থিতি নিয়ে খুব একটা ভাবনা-চিন্তা করছি? পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতির অভাবই এই প্রশ্নের উত্তর দেয়।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখার জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। দখল, দূষণ ও ভরাটের হাত থেকে নদী ও জলাশয় রক্ষা করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বর্ষার বা বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক কৌশল ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পানিভরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে আন্তর্জাতিক চাপ জরুরী

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারা জানে না, আবার কখনো নিজেদের বাড়িঘরে ফিরে যেতে পারবে কি না। তাদের সামনে জীবনের কোনো লক্ষ্য নেই। ভবিষ্যতের কোনো আশা নেই। এই নির্যাতিত, হতাশ ও জীবন ধারণের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাহীন মানুষ সহজেই আইএস, আল-কায়েদা বা এমনই কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর খপ্পরে চলে যেতে পারে। ইতিমধ্যে তেমন কিছু আলামতও দেখা গেছে। সে ক্ষেত্রে শুধু মিয়ানমার বা বাংলাদেশ নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তা বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত আসিয়ান-অস্ট্রেলিয়া বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে শনিবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকও তেমন আশঙ্কাই ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন কোনোমতেই আর মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান খুঁজতে হবে। তিনি যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলেছেন, সেই মঞ্চে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিও উপস্থিত ছিলেন। সিডনির যে মিলনায়তনে এই সম্মেলন চলছিল, তার কয়েক শ গজ দূরেই শত শত মানুষ সু চিবিরোধী বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিল। শুধু তা-ই নয়, অস্ট্রেলিয়ার একজন সাবেক বিচারকসহ পাঁচজন আইনজীবী শুক্রবার দেশটির আদালতে সু চির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাও করেছেন। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এই নেত্রীর কি এর পরও হুঁশ ফিরবে না?
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য দায়মুক্তি থাকার কারণে অস্ট্রেলিয়ার আদালত সু চির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা কোনো ধরনের সাজার নির্দেশ দিতে পারবেন না। কিন্তু এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে দুনিয়াব্যাপী মানুষের ক্ষোভ-ঘৃণার যে প্রকাশ ঘটেছে, তা কি তিনি অনুভব করতে পারছেন না? মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী যে উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সেটি কি মিয়ানমারের নেত্রী বা তাঁর দেশ উপলব্ধি করতে পারছে না? একই রকম উদ্বেগ এর আগে জাতিসংঘ মহাসচিবসহ অনেক বিশ্বনেতাও প্রকাশ করেছেন। আঞ্চলিকভাবেও এ ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা আশা করব, অং সান সু চিসহ মিয়ানমারের নেতৃবৃন্দ দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে যেকোনো উদ্যোগে তাঁর দেশ সব রকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে। একই রকম আশ্বাস বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও দেওয়া হয়েছে। এখন সম্পূর্ণ বিষয়টি নির্ভর করছে মিয়ানমারের ওপর।
বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি করার পর তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, এখনো প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি; বরং নানাভাবে প্রত্যাবাসন বিঘিœত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে বলেই খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আরো জোরালো ভূমিকা রাখা জরুরি হয়ে উঠেছে।

মাদ্রাসার উন্নয়নে অবকাঠামো

অর্থবছরের শেষার্ধে এসে ৩০০ জন এমপিকে তাঁদের নিজ নিজ এলাকার মাদরাসার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাস হয়ে গেলে সংরক্ষিত নারী আসন বাদে সংসদ সদস্যরা তাঁদের এলাকার ভোটারদের মন জয় করার জন্য সাড়ে ২২ কোটি টাকা পাবেন। এই টাকায় একজন এমপি তাঁর এলাকার ছয়টি মাদরাসা উন্নয়ন করবেন। মাদরাসা যে এলাকায়ই হোক বা সেসব মাদরাসার শিক্ষার্থী সংখ্যা যা-ই হোক না কেন, এসব মাদরাসা ভবন ছয়তলা করা হবে। সংশ্লিষ্টরা এরই মধ্যে এই প্রকল্পে নানা অসংগতি খুঁজে পেয়েছেন। মাদরাসা উন্নয়নের জন্য টাকা বরাদ্দ চাওয়া হলেও প্রকল্প প্রস্তাবে সব মাদরাসার নাম নেই। আবার কোন মাদরাসায় কতজন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেছে, সব মাদরাসার ছয়তলা ভবন প্রয়োজন আছে কি না সে বিষয়টিও ভেবে দেখা হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবার মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে এর কারিকুলাম। কারিকুলাম সময়োপযোগী না করে অবকাঠামো উন্নয়ন মাদরাসা শিক্ষার জন্য কী সাফল্য বয়ে আনবে, তা বলা মুশকিল। অন্যদিকে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের যে ব্যয় ধরা হয়েছে, তা অনেক বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়তলা ভবন নির্মাণে যে ব্যয় হয়েছে, মাদরাসার ভবন নির্মাণের ব্যয় ধরা হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। এ ছাড়া এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশ সফর এবং জিপ ও মোটরসাইকেল কেনার কথাও বলা হয়েছে। ভবন নির্মাণের সঙ্গে বিদেশ সফরের কী সম্পর্ক তা যেমন বোধগম্য নয়, তেমনি জিপ ও মোটরসাইকেল কী কাজে লাগবে, তা বুঝে ওঠা মুশকিল।
ধারণা করা হচ্ছে, মাদরাসা উন্নয়নের নামে এলাকার ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা হিসেবেই সংসদ সদস্যদের এই বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। মাদরাসা উন্নয়নের কাজের পাশাপাশি লুটপাটেরও একটি নতুন পথ খুলে দেওয়া হবে প্রকল্প প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে। যেকোনো অবকাঠামো উন্নয়ন অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার আবশ্যকতা থাকা দরকার। যেখানে শিক্ষা কারিকুলামই আধুনিক নয়, সেখানে অবকাঠামো কী কাজে লাগবে তা আমাদের বোধগম্য নয়। এ ছাড়া দেশের অনেক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নতুন করে তৈরি করা দরকার। কাজেই উন্নয়ন যেন সার্বিকভাবে এলাকার মানুষের কাজে আসে সেদিকেই দৃষ্টি দিতে হবে। কারো পকেট ভারী করার জন্য উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজন নেই।

 

জাতির জনকের শুভ জন্মদিন আজ

 

আজ ১৭ মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। একজন নেতা তাঁর দেশের মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ আত্মপরিচয়ের আলোকে কী অপরিসীম সাহসিকতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন তার উজ্জ্বল উদাহরণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের সর্বস্তরের মানুষের তথা আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার ভালবাসা, হৃদয় উজাড় করা শ্রদ্ধা ও সম্মানে তিনি অভিষিক্ত হয়েছেন। সমগ্র দেশের মানুষ অকৃত্রিম ভালবাসার কারণে, বিশ্বাসের কারণে তাঁর ওপর অর্পণ করে পূর্ণ আস্থা, তাঁকে স্থান দেয় তাদের হৃদয়ে। আজ এই দিনে আমরা পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এই মহান নেতাকে। স্মরণ করি তাঁর কাজ, তাঁর আদর্শকে।
তিনি এ দেশে জন্মেছিলেন, এ দেশের মানুষকে ভালবেসেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, এটা আমাদের সৌভাগ্যের কথা। তিনি নিরলস পরিশ্রম করে চারণের মতো সারাদেশ ঘুরে মানুষকে জাগিয়েছেন, পাকিস্তানী স্বৈরাচারী সামরিক শাসকদের জেলে বছরের পর বছর বন্দী থেকেও অকুতোভয় বীরের মতো নিজ সঙ্কল্পে অটল থেকেছেন, মুক্তির মহামন্ত্রে জাতিকে জাগিয়েছেন এবং স্বাধীনতার পথ ধরে জাতিকে পৌঁছে দিয়েছেন স্বপ্ন পূরণের চূড়ান্ত লক্ষ্যে- এ কৃতিত্ব তাঁরই। কারণ তিনিই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রূপকার এবং প্রতিষ্ঠাতা। দেশের মানুষের স্বার্থের ব্যাপারে তিনি সব সময় ছিলেন আপোসহীন। পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি সব সময় উর্ধে তুলে ধরেছেন দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ, কখনও কোন কিছুর বিনিময় বা প্রলোভনে বা ভয়ে বিন্দুমাত্র নতিস্বীকার করেননি। মাথা নিচু করেননি।
সত্তরের নির্বাচনে জাতির অবিসংবাদিত নেতারূপে তিনি অভিষিক্ত হন, গোটা জাতিকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করেন। শুরু হয় এক অভূতপূর্ব আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন। দেশের মানুষকে তিনি মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করেন। এরই এক পর্যায়ে আসে একাত্তরের ৭ মার্চ। সে দিন ঢাকার ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে তিনি যে ভাষণ দেন, সেটাও হয়ে ওঠে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক মাইলফলক। তিনি ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। তিনিই তাঁর নেতৃত্বের মাধ্যমে জাতিকে পৌঁছে দিয়ে গেছেন স্বাধীনতার স্বর্ণ তোরণে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁর হত্যার বিচার করা যাবে নাÑ এই লক্ষ্যে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে বাদ দেয়াই শুধু নয়, রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যম থেকে তাঁর নাম বা তাঁর কথা প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। এক কথায় মানুষের মন থেকে বঙ্গবন্ধুর কথা, তাঁর স্মৃতি, তাঁর অবদান মুছে ফেলার যাবতীয় চেষ্টা করা হয় সে সময়। কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করা, বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলা, তাঁর ভূমিকা খাটো করে দেখানো ইত্যাদি চেষ্টা যে সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে সেটা সময়ের পরীক্ষায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
আজ সেই মহান নেতার শুভ জন্মদিন। এই দিনটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবেও পালিত হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা গড়ার। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ নীতি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারীরা তাঁর রেখে যাওয়া দলের নেতৃত্বেই বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনা করছে জনগণের সমর্থনে। সরকারের সামনে প্রধান কাজটিই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়া।

সিঙ্গাপুর সফর সফল হউক

নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বাংলাদেশের বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় সিঙ্গাপুর সফর সংক্ষেপ করে দেশে ফিরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফিরে আসার আগে তিনি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত বোটানিক্যাল গার্ডেনের অর্কিড গার্ডেনে তাঁর নামে একটি অর্কিডের উদ্বোধন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সিঙ্গাপুর সফর নানা কারণে উল্লেখযোগ্য। বর্তমান সময়কে ধরে নেওয়া হয় অর্থনৈতিক কূটনীতির সময় হিসেবে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে সিঙ্গাপুরে প্রধানমন্ত্রীর সফরটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এই সফরের সময় চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এগুলো হচ্ছে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ও বিমান চলাচলে সহযোগিতা। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ ও সিঙ্গাপুরের ইন্টারন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজের মধ্যে ডিজিটাল গভর্নমেন্ট ট্রান্সফরমেশন বিষয়ে একটি এবং এফবিসিসিআই ও এমসিসিআইয়ের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের ম্যানুফ্যাকচারিং ফেডারেশনের দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট ভবন ইস্তানায় এক মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর উন্নয়নে ভিন্ন পর্যায়ে অবস্থান করলেও সমৃদ্ধি অর্জনে দুই দেশের শক্তির জায়গাগুলো পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের বিপুল জনশক্তির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। দেশের জনশক্তি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্মানের সঙ্গে কাজ করছে। পরিকল্পিতভাবে সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি সংগ্রহ করলে তা দুই দেশের জন্যই মঙ্গলজনক হবে বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীদের অংশীদার হওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারীদের জন্য চট্টগ্রামে ৫০০ একর জমি দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তিনি তুলে ধরেছেন তা হলো, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফেরত নেওয়ার জন্য মিয়ানমারকে বোঝানোর বিষয়। তিনি সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মানবিক কারণে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও তা যে বাংলাদেশের জন্য বড় বোঝা, সে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে সম্মানের সঙ্গে ফেরত দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
কিন্তু তাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত হচ্ছে। সিঙ্গাপুর সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সিঙ্গাপুর এখন আসিয়ানের চেয়ার। আসিয়ানের অন্য সদস্য দেশ মিয়ানমার। চেয়ার হিসেবে আসিয়ানের সদস্য দেশকে বিষয়টি বোঝানোর দায়িত্ব নিতে পারে সিঙ্গাপুর। সেদিকেই গুরুত্ব আরোপ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা সংকটের একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে সিঙ্গাপুরের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতেই আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
কূটনৈতিকভাবে সব সমস্যার সমাধান যেমন সম্ভব, তেমনি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক দুই দেশের বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় করতে পারে। শেখ হাসিনার সিঙ্গাপুর সফরের ভেতর দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক যেমন দৃঢ় হবে, তেমনি সমস্যা সমাধানেও ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে আন্তর্জাতিক চাপ

মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের আশ্বাস ও চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। এর আগে অনেকেই এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে মিয়ানমার মুখে যা-ই বলুক, কার্যত তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে না। এখন সে আশঙ্কাই যেন সত্য হতে চলেছে। লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে থাকা রোহিঙ্গাদের যে গ্রামগুলো আগে বুলডোজার দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এখন সেখানে সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। হেলিপ্যাড, রাস্তাঘাট বানানো হচ্ছে। তাহলে চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গারা যাবে কোথায়? তারা কি কেউ সেনাঘাঁটির মধ্যে ফিরে যেতে চাইবে?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সিঙ্গাপুরের সহযোগিতা চেয়েছেন। আগেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আসিয়ানভুক্ত অন্যান্য দেশের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। মিয়ানমার আসিয়ানের সদস্য হওয়ায় ধারণা করা হয় যে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এ ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে মিয়ানমারের আচরণে উল্টোটাই লক্ষ করা যাচ্ছে। কিছুদিন আগে মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তে ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ বিপুল সেনা সমাবেশ ঘটানোয় উত্তেজনা বেড়ে গিয়েছিল। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হলেও জানা যায় যে এখনো সীমান্তরেখার কাছেই রয়েছে তাদের সেই সেনা প্রস্তুতি। অনেকেই ধারণা করছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঠেকাতে তারা আবারও যেকোনো সময় উত্তেজনা বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। তাই বাংলাদেশকে যেমন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে হবে, তেমনি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি বহুপক্ষীয় আলোচনায় জোর দিতে হবে। জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে দীর্ঘদিন ধরে ভরণপোষণ করা বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব একটি কাজ। তা ছাড়া কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় তারা যেভাবে বসবাস করছে, তাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আসন্ন বর্ষায় পাহাড়ধসের শিকার হয়ে বহু রোহিঙ্গার প্রাণহানি হতে পারে। তাই তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো বেশি চাপ সৃষ্টি করতে হবে। প্রয়োজনে মিয়ানমারের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে হবে। আসিয়ান দেশগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। তত দিন পর্যন্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে। খাদ্যাভাবে যদি একজন রোহিঙ্গাও মারা যায়, তা হবে সভ্য দুনিয়ার জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর। আমরা আশা করি, মিয়ানমারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়া শুরু করবে এবং রোহিঙ্গাদের নিজস্ব ভূমিতে সামরিক স্থাপনা নির্মাণ অবিলম্বে বন্ধ করবে।