বিভাগ: সম্পাদকীয়

বাজার স্থিতিশীল রাখতে পদক্ষেপ নিন

কোনো একটা ছুতো পেলেই হয়, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে এটাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। হরতাল, বৃষ্টি, বন্যা, যানজট ছুতোরও অভাব হয় না। কখনো কখনো আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতও শোনা যায়। সর্বশেষ যে ছুতোয় তারা দাম বাড়িয়েছে সেটি হলো কুয়াশা। কুয়াশার কারণে পণ্য নিয়ে ট্রাক আসতে সময় বেশি লাগছে, তাই ট্রাকের ভাড়া বেড়ে গেছে। সে কারণেই নাকি তাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। কিন্তু ট্রাকভাড়া কত টাকা বেশি হওয়ায় কেজিপ্রতি তারা কত টাকা দাম বাড়িয়েছে, তা হিসাব করলে দেখা যায় তারা কতটা ন্যায়সংগত আচরণ করছে। বাজারে কুয়াশার অজুহাতে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে শাকসবজি ও তরিতরকারির। আর এটি করছে খুচরা বিক্রেতারাই বেশি।
সভ্য দুনিয়ায় খুচরা পর্যায়ের বাজারেও কিছু নিয়ম-কানুন থাকে। দুর্ভাগ্য, আমাদের তা নেই। বাজার যখন চরমভাবে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, ক্রেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে, তখন আমাদের নীতিনির্ধারকদের নানা রকম অন্তঃসারশূন্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও আশ্বাস দিতে দেখা যায়। তাতে বাজারের কোনো বিশেষ পরিবর্তন হয় না। গত বন্যার পর চালের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে এ রকম অনেক আশ্বাসই দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে চালের দাম খুব একটা কমেনি। কিছুদিন আগে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করে কয়েক গুণ বেড়ে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। মৌসুম শুরু হওয়ায় এখন পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমলেও আগের অবস্থায় আসেনি। ২০-২৫ টাকা দামের পেঁয়াজ এখনো ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মনিটরিংয়ের অভাব বা বাজারে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ কাজ না করার কারণেই ব্যবসায়ীরা এ ধরনের আচরণ করতে পারছে। যখন কোনো পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তখনই তা নির্ধারণ করা গেলে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ব্যবসায়ীদের পক্ষে যেমন খুশি আচরণ করা সম্ভব হতো না।
বাজার স্থিতিশীল রাখা, ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেটি কোন পদ্ধতিতে করা হবে, তা রাষ্ট্রকেই নির্ধারণ করতে হবে। আগে টিসিবির মাধ্যমে বাজারে হস্তক্ষেপের কিছু প্রচেষ্টা থাকলেও এখন তা নেই বললেই চলে। আমরা আশা করি, পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

আন্দোলনের অপসংস্কৃতি বন্ধ হউক

সরকারের শেষ বছর বা নির্বাচনের বছরটি নানা দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষভাবে এ বছর নানা আন্দোলন-কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মাঠ গরম রেখে সরকারি দলকে চাপে রাখতে চায় এবং আসন্ন নির্বাচনে সুবিধা আদায় করতে চায়। আবার বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনও সরকারের শেষ বছরে আদাজল খেয়ে রাস্তায় নেমে যায় বেতন বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের দাবি আদায় করে নিতে। কখনো কখনো বিরোধী দলগুলোও পেছনে থেকে পেশাজীবীদের আন্দোলনকে উৎসাহিত করে। এটা অনেক দিন ধরেই চলে আসছে। সরকারও নিজেদের জনসমর্থন ধরে রাখতে যথাসাধ্য তাদের দাবি মেনে নেয় এবং বর্ধিত রাজস্ব সংগ্রহের জন্য জনগণের কাঁধে করের বোঝা বাড়িয়ে দেয়। এটাই বাংলাদেশে সরকারের শেষ বছর বা নির্বাচনী বছরের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে বেশ কয়েকটি পেশাজীবী সংগঠন আন্দোলনে রয়েছে। আরো বেশ কিছু সংগঠন এ মাসেই তাদের আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে রেখেছে। দেশের প্রায় পাঁচ হাজার ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ১১ দিন লাগাতার অবস্থান ধর্মঘট পালন করার পর গত ৯ জানুয়ারি থেকে আমরণ অনশন চালিয়ে আসছেন। তাঁদের দাবি, মাদরাসাগুলোকে জাতীয় করতে হবে। এর আগে নন-এমপিও শিক্ষকরাও অনশন কর্মসূচি পালন করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাওয়া আশ্বাসের ভিত্তিতে অনশন ত্যাগ করেছেন। বিক্ষোভ-স্মারকলিপির মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু করেছেন বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সাত লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। তাঁদের প্রধান দাবি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি করা। দাবি পূরণ না হলে ২২ থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হবে। ২৮ তারিখে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। অথচ আগামী ২ ফেব্রুয়ারি থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে সমাধান না হলে বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী জিম্মি হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অভিভাবকরা। সরকারি স্বাস্থ্য সহকারীরা দেশব্যাপী কর্মবিরতি পালন করছেন। পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ঘোষিত কর্মসূচিতে গতকাল ও আজ পৌরসভাগুলোতে সেবা বন্ধ রয়েছে। দাবি পূরণ না হলে ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব সেবা বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং শহীদ মিনারের সামনে আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন অধিদপ্তর, দপ্তর ও সরকারি সংস্থায় আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। তবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে আসছে সম্ভবত প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় স্টিয়ারিং কমিটির আন্দোলনের প্রস্তুতি। এ ব্যাপারে শিগগিরই তারা অফিসার্স ক্লাবে বৈঠকে মিলিত হবে বলে জানা গেছে। বছরজুড়েই চলবে এমন আয়োজন।
সরকারের শেষ বছরে দাবি আদায়ে মাঠে নামার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, তা চাইলেই বদলানো যাবে না। আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে পেশাজীবীদের ন্যায্য দাবিদাওয়া মেনে নিতে হবে। এসব আন্দোলনের পেছনে থাকা রাজনৈতিক উসকানি সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। আন্দোলনকারীদেরও দাবিদাওয়া আদায়ের ক্ষেত্রে যথাসাধ্য যৌক্তিক অবস্থান নিতে হবে।

গণতান্ত্রিক চর্চার উন্নয়ন

সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শুক্রবার রেডিও-টেলিভিশনে একযোগে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। ভাষণের শুরুতেই তিনি সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়ায় সহযোগিতার জন্য দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ভাষণে তিনি বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি এটিও জানিয়ে দিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে সময় একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সেই নির্বাচন পরিচালনা করবে এবং নির্বাচনকালীন সরকার তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দল সেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা সুসংহত করবে। রাজনীতিসচেতন অনেকেই মনে করছেন, তাঁর এই বক্তব্য উদার ও গণতান্ত্রিক মন-মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
২০১৪ সালের নির্বাচনে তত্ত্বাববধায়ক সরকারের দাবি পূরণ না হওয়ায় বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল। বিএনপিসহ কিছু দল নির্বাচন প্রতিহত করারও ঘোষণা দিয়েছিল। এতে সারা দেশে এক সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছিল। পরবর্তীকালেও সেই সংঘাত অব্যাহত ছিল। বিএনপি এখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানিয়ে আসছে। পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক নামে না হলেও দলটির নেতারা কোনো না কোনো নামে নির্দলীয় অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের কথা বলে আসছেন। এসব দাবি সত্ত্বেও তাঁরা এখন পর্যন্ত আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদই ব্যক্ত করে আসছেন। সে কারণে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী যে আশ্বাস দিয়েছেন, তা একটি শুভ সংবাদ বলেই মনে করছে অনেকে। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। উদার মনোভাব নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষ যদি একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছতে পারে, তা হবে জাতির জন্য এক মহাপ্রাপ্তি। উভয় পক্ষকে মনে রাখতে হবে, দেশের মানুষ কোনোক্রমেই কোনো ধরনের রাজনৈতিক অশান্তি দেখতে চায় না।
এটা সত্য, দেশ আজ অনেক দূর এগিয়েছে। দরিদ্র দেশের কাতার থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। ১০ বছরে মাথাপিছু জিডিপি তিন গুণ বেড়ে এক হাজার ৬০০ ডলার ছাড়িয়েছে। রিজার্ভ তিন বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুতের উৎপাদন চার গুণ বেড়েছে। আরো উৎপাদন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি হয়েছে ও হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে। দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নেমে এসেছে। এগুলো অবশ্যই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাফল্য হিসেবেই বিবেচিত হবে। কিন্তু এই উন্নয়নকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও চর্চা প্রয়োজন সেখানে আমাদের অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। তাই প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা করা হয়। তেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তা যেকোনো সাফল্য ম্লান করে দেবে। তাই উন্নয়নকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার স্বার্থেই গণতান্ত্রিক চর্চার উন্নয়ন প্রয়োজন। আগামী নির্বাচন যাতে পরিপূর্ণ অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও অবাধ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

নকল ওষুধ তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

বাজারে ভেজাল ও মানহীন ওষুধের ছড়াছড়ি—এমন খবর সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই আসে। অনেক সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এমন অনেক ওষুধ ধরাও পড়ে। ভেজাল ও নকল ওষুধের কারখানা আবিষ্কৃত হয়। অনেকে ধরাও পড়ে। এবার নকল ওষুধ আমদানির একটি চক্রকে চিহ্নিত করেছে সিআইডি। এই চক্রের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এই ডিলারই সারা দেশে ওষুধ সরবরাহ করত। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি জানাচ্ছে, ১০ বছর ধরে নকল ওষুধের ব্যবসায় তিন সিন্ডিকেট জড়িত।
নকল ও ভেজাল ওষুধের কারণে জনস্বাস্থ্য যে হুমকির মুখে পড়তে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ওষুধ জীবন বাঁচাতে ব্যবহৃত হয়। ওষুধের ব্যবসা অন্য দশটি ব্যবসার মতো নয়। ওষুধ জীবন রক্ষাকারী একটি পণ্য। এই পণ্য যদি ভেজাল ও নকল হয়, তার প্রভাব পড়ে মানুষের শরীরে। রোগ থেকে বাঁচার জন্য মানুষকে ওষুধ কিনতে হয়। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ মানুষকে রোগ থেকে মুক্তি দেয় না, বরং মৃত্যু ত্বরান্বিত করে। ওষুধ যদি ভেজাল হয়, জীবাণু মরবে না। রোগী তখন ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে। অতীতে বেশ কিছু কম্পানির বিরুদ্ধে এমন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন নকল ওষুধ আমদানি করা সিন্ডিকেটের সন্ধান পাওয়া গেল। এদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে।
জীবন রক্ষাকারী ওষুধের নকল আনা হচ্ছে বিদেশ থেকে। ক্যান্সারসহ দুরারোগ্য রোগের ওষুধ নকল করা হচ্ছে। কনটেইনারে পণ্য আনার নামে চীন থেকে নকল ওষুধ আনা হতো। ঢাকায় ওষুধ এনে তা ছড়িয়ে দেওয়া হতো সারা দেশে। দেশেও অতীতে নকল ওষুধ আমদানির কারখানা পাওয়া গেছে। নকল ওষুধ প্রস্তুত ও আমদানি দুটিই অপরাধ। যারা এ ব্যবসায় জড়িত, তাদের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নকল ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান চালাতে হবে। সিন্ডিকেটের সন্ধান ও ডিলারের নাম যখন পাওয়া গেছে, তখন সরবরাহকারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নাম-ঠিকানা পাওয়া কঠিন হবে না। আমাদের বিশ্বাস, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গোয়েন্দা সূত্র ব্যবহার করে এদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষায় পদক্ষেপ জরুরী

মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য, জাতির মুক্তির জন্য যাঁরা লড়াই করেন তাঁরা সে দেশের, সে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। এ মূল্যায়ন দেশ-কালের গণ্ডিতে সীমিত নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে এ মূল্যায়ন শাশ্বত। তবু কখনো, কোথাও বিরুদ্ধপক্ষ অন্তঃস্থ বা বাহ্যিক কারণে ক্ষমতাপুষ্ট হলে তাঁরা উপেক্ষা, নিগ্রহের শিকার হন। মানব ইতিহাসে এমন উদাহরণও রয়েছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীদের ক্ষেত্রেও সেসব ঘটেছে। তাঁদের উপেক্ষা-অবজ্ঞার শুরু মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের এক সামরিক শাসকের আমলে। সেই শাসকের দলে হরেক রকমের রাজনীতিকের সমাবেশ ঘটলেও স্বাধীনতাবিরোধীপক্ষের উপস্থিতিই ছিল বেশি। ২১ বছর লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা এ প্রবণতার রাশ টেনে ধরেন। মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেন তিনি। তাঁর রাজনীতি নিয়ে অনেকের ভিন্নমত থাকলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করার বিষয়ে তাঁর উদ্যোগের প্রশংসা বিরুদ্ধপক্ষ ছাড়া সবাই করে। এ উদ্যোগের অনুকূল সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল ২১ বছরের পরিক্রমায়। পরেও কিছু বাধা এসেছে, তবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সম্মানের অভিযাত্রাকে থামানো সম্ভব হয়নি। সরকারের বাইরেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা জানানোর, সহযোগিতা করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। বিভিন্ন সংস্থা স্বাধীনতাসংগ্রামীদের সংবর্ধিত করার, সহযোগিতা করার আয়োজন করে যাচ্ছে।
সম্মাননা পেয়ে তাঁরা আনন্দিত, অভিভূত। উৎসবস্থল সাজানো হয়েছিল তাঁদের ছবি দিয়ে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে যে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধার সংগ্রাম ও বীরত্বের সম্মাননা জানানো হয়েছিল। তাঁরা হলেন পিরোজপুরের হাবিবুর রহমান শিকদার ও আবুল হাশেম হাওলাদার, ময়মনসিংহের আবুল হোসেন মোল্লা ও মো. চান মিয়া, গাজীপুরের মো. হাতেম আলী, নীলফামারীর আলতাফ হোসেন, কুড়িগ্রামের আব্দুল কাদের, খুলনার শেখ ইলিয়াস, দিনাজপুরের মো. জসিম উদ্দিন, শেরপুরের গিয়াস উদ্দিন, চট্টগ্রামের মোস্তফা কামাল পাশা, মেহেরপুরের সিরাজ উদ্দীন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতিলাল বণিক, সুনামগঞ্জের সুশান্ত রঞ্জন ও ফরিদপুরের হেমায়েতউদ্দিন তালুকদার। সংবর্ধনার সময় তাঁদের প্রত্যেককে উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রত্যেকের হাতে ক্রেস্ট ও ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের অবজ্ঞা করার, হেয় করার, লাঞ্ছিত-বঞ্চিত করার সেই সব দিনের অবসান হয়েছে। তবু ওই অপপ্রবণতার, অপমানসিকতার ধারক-বাহক লোকের উপস্থিতি আমাদের সমাজে ও রাষ্ট্রে এখনো রয়ে গেছে। সময় অসূয়াগ্রস্ত এসব লোকের বিচার করবে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের আন্তরিক ভূমিকায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উজ্জ্বলতর হোক; সব মুক্তিযোদ্ধা প্রাপ্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হোন।

 

 

 

উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত

সরকারের শেষ বছরে এসে বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। চলতি বছরের শেষে অনুষ্ঠিত হতে পারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তার আগেই মোটামুটিভাবে সম্পন্ন হতে পারে সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিতব্য পদ্মা সেতুর কাজ। অবশ্য রেলসেবা চালু হতে কিছুটা দেরি হতে পারে। বিশ্বব্যাংক মাঝখানে দুটি বছর নষ্ট না করলে এই সেতুর কাজ আরো আগেই শেষ হতে পারত। পটুয়াখালীর পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। সেখানে দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ হাব নির্মাণের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। পায়রায় মোট ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে চীনা অর্থায়নে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ ৩১ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এর প্রথম ইউনিটটি ২০১৯ সালের এপ্রিলে উৎপাদনে আসতে পারে। রাজধানীর উত্তরা থেকে পল্লবী হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রো রেলের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। জাপানি অর্থায়নে নির্মিতব্য মেট্রো রেলের উত্তরা-আগারগাঁও অংশ ২০১৯ সালেই চালু করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাপানি অর্থায়নে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ হাব তৈরি হতে যাচ্ছে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে। আগামী ২৫ জানুয়ারি এটির মূল নির্মাণকাজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এখানে একটি গভীর সমুদ্রবন্দরও নির্মিত হবে। গত ৩০ নভেম্বর দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মূল নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। পারমাণবিক চুল্লির নির্মাণকাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে রাশিয়া ঋণ দিচ্ছে ৯০ হাজার কোটি টাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহসহ বেশ কয়েকটি মহাসড়ক চার লেন করার কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক চার লেন করার কাজ ৫১ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক চার লেন করার কাজও এগিয়ে চলেছে। এরই মধ্যে মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভার চালু হয়েছে। বিমানবন্দর সড়ক থেকে আশুলিয়া ইপিজেড পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কাজও এগিয়ে চলেছে।

১০টি মেগা প্রকল্পসহ হাতে নেওয়া প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন হলে অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের পশ্চাৎপদতা অনেকটাই ঘুচে যাবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূরণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আসবে। আর তার ফল হবে সুদূরপ্রসারী। শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে। বাড়বে কর্মসংস্থান। একসময় দেশে দেশে রোড শো করেও বাংলাদেশ বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ বা এফডিআই টানতে পারেনি। গত কয়েক বছরে এফডিআই বেড়েছে কয়েক গুণ। অদূর ভবিষ্যতে তার রীতিমতো উল্লম্ফন ঘটবে বলেই আশা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। পদ্মা সেতু, পায়রা বন্দর ও পায়রা বিদ্যুৎ হাবকে কেন্দ্র করে গোটা দক্ষিণবঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হবে। অবহেলিত দক্ষিণবঙ্গ উন্নয়নের নতুন দিগন্তে প্রবেশ করবে। একই সঙ্গে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সৃষ্টির চলমান প্রক্রিয়া সারা দেশের উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করবে।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যে গতি এসেছে, তা অব্যাহত থাকলে উন্নত দেশের কাতারে যাওয়া কোনো অবাস্তব স্বপ্ন নয়। আমরা চাই, উন্নয়নের এই গতি অব্যাহত থাকুক।

বাংলাদেশে আবহাওয়া বিপর্যয়

শীতে কাবু সারা দেশ। সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছে বৃদ্ধ ও শিশুরা। সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ৫০ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। গত সোমবার পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে শীতের প্রতাপ সবচেয়ে বেশি। অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর শীতের কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। গায়ে চট জড়িয়ে বা খড়কুটো পুড়িয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে তারা। তাতেও বিপর্যয়। আগুন পোহাতে গিয়ে দিনাজপুর ও হবিগঞ্জে দগ্ধ হয়েছেন দুই গৃহবধূ।
ঘন কুয়াশার কারণে গত কয়েক দিনে আকাশ, সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। দিনের বেলায়ও যানবাহনকে বিভিন্ন সড়কপথে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে হচ্ছে। মাঝ নদীতে ফেরি আটকা পড়ছে। ফেরি সার্ভিস বন্ধ রাখতে হয়েছে। বিমানবন্দরগুলোতে বিমানের ওঠানামার শিডিউলে বিপর্যয় ঘটেছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। বোরোর বীজতলা এবং সরিষা, মাষকলাই, আলু প্রভৃতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এভাবে যদি আর এক সপ্তাহ কুয়াশা পড়ে তাহলে কিছু ফসলের যে ক্ষতি হবে, তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। তাঁদের মতে, শীতকালীন সবজি ততটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তার পরও কৃষকরা চিন্তিত। অন্যদিকে শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। শিশু ও বৃদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। সাধারণ জ্বর-সর্দি-কাশি ছাড়াও ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও অ্যাজমাসহ শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে; বেশির ভাগ শিশু।
ছিন্নমূল মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই। স্টেশনে, ঘাটে, ফুটপাতে শীতের রাত পার করতে হচ্ছে তাদের। কুয়াশার কারণে সকালে কাজে যেতে পারছে না শ্রমজীবী মানুষ। তাদের জন্য সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সরকারকে দ্রুত এ ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকৃতির অদ্ভুত আচরণ বিশ্বজুড়েই চলছে। আগাম বন্যা, পাহাড়ধস, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত, বজ্রপাতের বর্ধমান হার আরো কত কী! এসবের মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান। ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ আরো বাড়বে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। সরকারকে ফসলসূচিতে পরিবর্তন আনার কথাও ভাবতে হবে।

রোহিঙ্গারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে

বেশ আগেই কিছু রোগ থেকে মুক্ত হয়েছে দেশ। পুরোপুরি মুক্ত না হলেও আরো কিছু রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হয়েছে। সর্বশেষ পোলিও রোগী দেখা গিয়েছিল ২০০৬ সালের নভেম্বরে; যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৪ সালের ২৯ মার্চ বাংলাদেশকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ডিপথেরিয়া নেই। এইডস নিয়ন্ত্রিত, এখন আক্রান্তের সংখ্যা হাতে গোনা। দূর হয়েছে হাম। কলেরা বলতে গেলে নেই। যক্ষ্মাও নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু সম্প্রতি এসব রোগের প্রত্যাবর্তনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার আওতায় এসেছে, তাদের কারো কারো মধ্যে উপর্যুক্ত কোনো না কোনো ব্যাধির উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা যায়, পোলিও, কলেরা-হাম-রুবেলা থেকে রক্ষার জন্য রোহিঙ্গাদের টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। ডিপথেরিয়ার বিষয়টি প্রথমে তাদের নজরে পড়েনি, এখন টিকাদান শুরু হয়েছে। এইডসও ধরা পড়েছে অনেকের মধ্যে। রোহিঙ্গারা স্থানীয় মানুষের মধ্যে বিচরণ করছে, হাট-বাজারে যাওয়া-আসা করছে। ফলে তাদের মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি আছেই। এরই মধ্যে ডিপথেরিয়ায় কমপক্ষে ২৮ জন, এইডসে তিনজন ও হামে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু ডিপথেরিয়া, এইডস, হাম ও যক্ষ্মা নয়, অনেকে আরো অনেক ধরনের রোগে ভুগছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে ডিপথেরিয়ার সংক্রমণ ঘটেছে। তারা পর্যবেক্ষণে রয়েছে। বেশ কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীও এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ৮৫ জন এইডস রোগীকে শনাক্ত করা হয়েছে। এক হাজারের বেশি এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী থাকার কথা। অন্যান্য রোগের উপসর্গও দেখতে পাচ্ছে অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ টিম। শুরুতে পোলিওর আশঙ্কা ব্যাপকভাবে করা হয়েছিল। সবাইকে টিকাও দেওয়া হয়েছে। স্বস্তিজনক বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত কেউ পোলিওতে আক্রান্ত হয়নি। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত লোকেরা দিন-রাত পানিতে ভেসে, বনজঙ্গল ভেঙে ছুটে এসেছে। তাদের শরীরে মশা, পোকা-মাকড় ও পানিবাহিত নানা রোগ দেখা দিতে পারে। ম্যালেরিয়া-ফাইলেরিয়ার মতো রোগও পাওয়া যাচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ। তারা শিশুদের ডিপথেরিয়া ও নিউমোনিয়ার টিকা দিচ্ছে। জনসচেতনতা বাড়াতে স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, প্রচার চালাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তৎপর রয়েছে। তবে আরো সংহত কর্মসূচি দরকার। স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের আক্রান্ত হওয়া সুলক্ষণ নয়। তাদের জন্য আরো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। স্থানীয় মানুষের সচেতনতা ও সতর্কতা খুবই জরুরি। আর্থিক-সামাজিক সংযোগের কারণে তাদেরও সংক্রমিত বা আক্রান্ত হওয়ার ভয় রয়েছে। বিতাড়িত বা নিয়ন্ত্রিত রোগগুলো আবার জেঁকে বসুক, এটা কাম্য হতে পারে না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত হবে না বাংলাদেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে এক করে দেখা।

মুদ্রা পাচার রোধ করতে হবে

বিদেশে অর্থপাচার বাংলাদেশের একটি প্রধান সমস্যা। এর ফলে দেশে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্নীতি উৎসাহিত হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য মতে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ছয় লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। অথচ এর অর্ধেক অর্থও দেশে বিনিয়োগ হলে দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির অনেক উন্নয়ন হতো। সম্প্রতি অর্থপাচারের ক্ষেত্রে আরো ভয়ংকর একটি ধারা সূচিত হয়েছে। আর তাতে প্রধান ভূমিকা রাখছে দেশের অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ব্যাংকিং। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অপব্যবহার রোধ করার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি ও সংস্থাগুলো তাহলে কী করছে?
প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, স্থানীয় বিকাশ এজেন্টদের অনেক কো-এজেন্ট রয়েছে অনেক দেশে, বিশেষ করে যেসব দেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বেশি অর্থ পাঠায়। বিদেশে বিকাশের এজেন্ট বা কো-এজেন্ট নিয়োগ অবৈধ হলেও এরা দিব্যি তা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রবাসীরাও সুলভে ও দ্রুততম সময়ে টাকা পাঠানো যায় বলে এ পথই বেছে নেয়। জানা যায়, কো-এজেন্টরা সেসব দেশে অর্থ নিয়ে শুধু তথ্য পাঠায় দেশের এজেন্টের কাছে। দেশের এজেন্ট পরে নির্দিষ্ট মোবাইল ফোন নম্বরে নির্দিষ্ট অর্থ পাঠায়। অন্যদিকে দেশ থেকে যারা বিদেশে টাকা পাচার করতে চায় তারা দেশীয় এজেন্টকে টাকা দিয়ে বিদেশে সেই অর্থ উঠিয়ে নেয়। এই পদ্ধতিতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছে চোরাচালানিরা। জঙ্গিদের অর্থ লেনদেনেও পদ্ধতিটির ব্যবহার রয়েছে। এ ধরনের হুন্ডি ও মুদ্রাপাচার দ্রুত বন্ধ করা না গেলে দেশ ক্রমেই এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে। কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের প্রবাসী আয় কমছে। তারও একটি প্রধান কারণ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এই অপব্যবহার।
বাংলাদেশের উন্নয়ন বা এগিয়ে চলাকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে এই ছিদ্রপথগুলো দ্রুত বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এমন অপব্যবহার বন্ধ করা খুব কঠিন কাজ নয় বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালা রয়েছে। সেগুলো যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে। আইনের ব্যত্যয়গুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং ব্যত্যয়কারীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এ ব্যাপারে আরো তৎপর হতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকেও যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা যাতে আরো সহজে ও দ্রুত অর্থ পাঠাতে পারে সে ব্যবস্থাও করতে হবে। প্রেরক ও প্রাপক কেউ যেন ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে কিংবা পেতে কোনো ধরনের বিড়ম্বনার শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে উন্নয়নের যে ধারা সূচিত হয়েছে, তা রক্ষা করার জন্যই সব ধরনের মুদ্রাপাচার রোধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি জঙ্গিবাদের অর্থায়ন ঠেকানোর জন্যও এ ধরনের মুদ্রাপাচার রোধ করা জরুরি।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর আইন চাই

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গড়ে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন প্রাণ হারায় সড়ক দুর্ঘটনায়। লাইসেন্সহীন অদক্ষ চালকের হাতে, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া হয়। বহু ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল করে রাস্তায়, যেগুলোর নিয়ন্ত্রণে সমস্যা রয়েছে। বেপরোয়া গতি, প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানো, গাড়ি চালাতে চালাতে মোবাইল ফোনে কথা বলাসহ বহু অনিয়ম ঘটে রাস্তায়। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে মহাসড়কে ডিভাইডার তৈরি করা হয়েছে। শ্লথগতির যানবাহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। অনেক দুর্ঘটনার খবর সংবাদমাধ্যমে আসে না। ব্যবস্থা নেওয়া দূরের কথা, দুর্ঘটনার সব খবর নথিভুক্তও হয় না। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। আবার বৈধ লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে এমন চালকদের ৩১ শতাংশ কোনো অনুমোদিত ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেননি। ফলে চালকদের বেশির ভাগই ট্রাফিক আইন ভালো জানেন না। সড়ক দুর্ঘটনার এটাও একটা কারণ। দেশের সড়ক-মহাসড়কে যেসব যানবাহন চলছে, তার অধিকাংশই চলাচলের অযোগ্য, ফিটনেসবিহীন। অন্যদিকে আমাদের দেশে চালকদের বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকায় তাঁদের অনেকেই আধুনিক সড়ক নির্দেশনা বুঝতে অক্ষম। গাড়িচালকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অন্তত এসএসসি নির্ধারণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল উচ্চ আদালত থেকে। শুক্রবার রাজধানীতে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির আলোচনাসভায় এসব বিষয়ই নতুন করে উঠে এসেছে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১৪ দফা সুপারিশও উত্থাপন করা হয়েছে এই আলোচনাসভায়।
আমরা কোনোমতেই এমন অনিরাপদ সড়ক চাই না। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনের মৃত্যুও কাম্য নয়। এ জন্য সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। আলোচনাসভায় উত্থাপিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেকাংশে কমে আসবে বলে আমরা মনে করি। একই সঙ্গে চালকদের লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। দক্ষ ও যোগ্য চালক ছাড়া কারো হাতে লাইসেন্স তুলে দেওয়া যাবে না। গাড়ির ফিটনেসের ব্যাপারে কোনো আপস করা যাবে না। সড়কে নজরদারি জোরদার করতে হবে। অনিয়মকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। আমরা মনে করি, দুর্ঘটনা নামের হত্যাকাণ্ড রোধে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থাও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর হবে বলে আমরা মনে করি।