কাজিরবাজার ডেস্ক :
চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস বিশ্বের ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটারস ডট ইনফোর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় শনিবার পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ২২ লাখ ৬৯ হাজার ৬৩০। এর মধ্যে ১ লাখ ৫৫ হাজার ২০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা গ্রহণের পর সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৫ লাখ ৮২ হাজার ১৯৫ জন। এদিকে করোনায় শনিবার আরও নতুন করে ফ্রান্সে ৭৬১, স্পেনে ৫৬৫ ও ইরানে ৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে আগামী সপ্তাহে করোনার টিকা মানবদেহে প্রয়োগ করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। এছাড়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নাইজিরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদু বুহারির চিফ অব স্টাফ আববা কিয়ারির মৃত্যু হয়েছে।
তৈরি হচ্ছে ১০ লাখ করোনার টিকা, আগামী সপ্তাহে মানবদেহে প্রয়োগ ॥ করোনাভাইরাসে দিশেহারা গোটা বিশ্ব। গৃহবন্দী হয়ে আছে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ। তাদের মনে একটাই প্রশ্ন, কবে আসবে করোনাভাইরাসের টিকা? যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা সেপ্টেম্বরে করোনাভাইরাসের টিকা বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার আগে আগামী সপ্তাহেই যুক্তরাজ্যে মানবদেহে এই টিকা প্রয়োগ করা হবে। পরীক্ষামূলকভাবে যাদের দেহে এই টিকা প্রয়োগ করা হবে তারাও প্রস্তুত আছেন। পরীক্ষার আগেই অবশ্য ঝুঁকি নিয়ে এই টিকার তিন লিটারের ডোজ তৈরি করে রাখা হচ্ছে। যদি ফল ভাল আসে তাহলে প্রাথমিকভাবে সেগুলো বাজারে ছাড়া হবে। যদিও এই ধরনের টিকার ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা আগেই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেন না। কিন্তু করোনাভাইরাসের এই টিকাটি সফল হওয়ার ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা ৮০ শতাংশ আশাবাদী। সে কারণে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তারা ১০ লাখ ডোজ উৎপাদন করবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আদ্রিয়ান হিল এ বিষয়ে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের টিকার জন্য বিশ্ব আর অপেক্ষা করতে পারছে না। কবে তারা শুনতে পাবে যে করোনাভাইরাসের টিকা সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। সেটা মানবদেহে কাজ করেছে। আগামী সপ্তাহেই আমরা মানবদেহে করোনার টিকা প্রয়োগ করব। অবশ্য তার আগেই আমরা উৎপাদন শুরু করেছি। প্রথমে আমরা ৩ লিটারের ডোজ তৈরি করব। এরপর ৫০ লিটার, ১০০ লিটার, ২০০ লিটার এমনকি ২০০০ লিটার উৎপাদন করা হবে।’ ‘প্রাথমিকভাবে যেটা উৎপাদন করছি সেটা অবশ্য আমরা ঝুঁকি নিয়েই করছি। কারণ যদি টিকা মানবদেহে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ না করে তাহলে কেউ কিন্তু এগুলো কিনবে না। তবে আমরা সফলতার ব্যাপারে ৮০ শতাংশ আশাবাদী। টিকা যদি কাজ করে তাহলে আমাদের লক্ষ্য হবে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে মিলিয়ন (১০ লাখ) ডোজ তৈরি করে বাজারজাত করা। তখন অবশ্য এর চাহিদা অনেক বাড়বে। বিশ্বের শত মিলিয়ন ডোজ প্রয়োজন হবে। হয়তো চলতি বছরের শেষ দিকে সেটাও সম্ভব হবে লকডাউন থেকে বিশ্বকে মুক্তি দিতে।’ টিকার ডোজ তৈরির ব্যাপারে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যের তিনটি ও বিভিন্ন দেশের কয়েকটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টির বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা নিরলসভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে টিকাটির উন্নয়নে। এই দলে এমন বিজ্ঞানী ও গবেষক রয়েছেন যারা মার্স ভাইরাসের টিকা তৈরি করেছিলেন। করোনাভাইরাসের এই টিকা তৈরির জন্য যুক্তরাজ্যের সরকার অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীদের ২.২ মিলিয়ন পাউন্ড (২৩৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা) দিয়েছে। যেটার মাধ্যমে তারা টিকা তৈরি, মানবদেহে প্রয়োগ, টিকার উন্নয়ন ও উৎপাদন করছে।
ফ্রান্সে আরও ৭৬১ জনের মৃত্যু ॥ ফ্রান্সে গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন হাসপাতাল ও বৃদ্ধনিবাসে কোভিড-১৯ ভাইরাসে আরও ৭৬১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তবে আশার কথা হচ্ছে নতুন করে করোনাভাইরাস রোগীর মোট সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। ফ্রান্সের শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জারোম সালোমন সংবাদিকদের বলেন, ৭৬১ জনের মধ্যে ৪১৮ জন বিভিন্ন হাসপাতালে এবং ৩৪৩ জন বৃদ্ধনিবাসে মারা যায়। এ নিয়ে দেশটিতে মহামারী করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে মোট ১৮ হাজার ৬৮১ জনে দাঁড়ালো। এদিকে করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলায় চীনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন বলেছেন, ‘এমন অনেক কিছুই ঘটেছে যা আমরা জানি না। চীন এ সঙ্কট ভালভাবে মোকাবেলা করেছে এমন ইঙ্গিত দেয়াটা বোকামি হবে।’ চীনা দূতাবাসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পশ্চিমা দেশগুলো বয়স্কদের বৃদ্ধাশ্রমে মরার জন্য ফেলে রেখেছে। এ অভিযোগে অস্বীকৃতি জানাতে চীনা রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ফ্রান্সে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪১ হাজার কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে।
স্পেনে আরও ৫৬৫ জনের মৃত্যু ॥ স্পেনে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আরও ৫৬৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ নিয়ে দেশটিতে করোনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৪৩ জন। তবে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি বলে অভিযোগ ঠেছে। স্পেনে গত সপ্তাহে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমতে শুরু করলেও এই সপ্তাহে তা বাড়তে শুরু করেছে আবার। গত ২৪ ঘণ্টায় যে পাঁচ শতাধিক মানুষে স্পেনে মারা গেছে তাদের মধ্যে জেসাস ভাকেরো নামে দেশটির একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক রয়েছেন। তিনি মাদ্রিদের পুয়ের্তো ডেল হিয়েরো হাসপাতালের নিউ সার্জারি বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং সার্জারির জন্য তার সুনামও রয়েছে বেশ।
আফ্রিকাজুড়ে ১ হাজার জনের মৃত্যু ॥ করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে আফ্রিকা মহাদেশে এ পর্যন্ত কোভিড-১৯ ভাইরাসে এক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। মহাদেশটির বিভিন্ন দেশের সরকারী সূত্রের বরাত দিয়ে এএফপি এ কথা জানিয়েছে। শুক্রবার গ্রিনিচ মান সময় ২০০০টায় তৈরি করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়ায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে মোট ৩৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এরপর যথাক্রমে মিসরে ২০৫, মরক্কোতে ১৩৫ ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ৫০ জন কোভিড-১৯ ভাইরাসে মারা গেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত আফ্রিকার দেশগুলোতে এ ভাইরাসে মোট ১৯ হাজার ৩৩৪ জন আক্রান্ত হয়েছে।
ইরানে আরও ৭৩ জনের মৃত্যু ॥ ইরানে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আরও ৭৩ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে দেশটিতে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। শনিবার দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কিয়ানুশ জাহানপোর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গত কয়েকদিনের মধ্যে সবচেয়ে কম প্রাণহানি ঘটেছে গত ২৪ ঘণ্টায়। এছাড়া দেশটিতে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৮৬৮ জনে।
নাইজিরিয়ার প্রেসিডেন্টের শীর্ষ সহযোগীর মৃত্যু ॥ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নাইজিরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদু বুহারির চিফ অব স্টাফ আববা কিয়ারির মৃত্যু হয়েছে। শনিবার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, করোনাভাইরাসে আফ্রিকায় এটাই সর্বোচ্চ পদাধিকারী কোন ব্যক্তির মৃত্যু। আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল দেশ নাইজিরিয়া। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সেখানে ৪৯৩ জনের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে আর মারা গেছে ১৭ জন।
ভারতীয় নৌবাহিনীর ২১ নাবিক করোনায় আক্রান্ত ॥ ভারতের সামরিক বাহিনীতেও মহামারী করোনাভাইরাস হানা দিয়েছে। দেশটির নৌবাহিনী শনিবার এক বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, মুম্বাই শহরের উপকূলে অবস্থিত ভারতীয় নৌবাহিনীর ওয়েস্টার্ন কমান্ডের ঘাঁটি আইএনএস আংরেতে ২১ জন নাবিককে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাবিক আক্রান্ত হলেও কোন রণতরি কিংবা সাবমেরিনে থাকা কেউ এখনও করোনায় আক্রান্ত হয়নি। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতে কোভিড-১৯ শনাক্তের সংখ্যা এখন ১১ হাজার ৯০৬, মারা গেছেন ৪৮০ জন।






