রোমে আওয়ামী লীগের সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী ॥ কারো কাছে ভিক্ষা চাই না

15
ইতালির রাজধানী রোমে আওয়ামী লীগের সংবর্ধনায় বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কাজিরবাজার ডেস্ক :
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ যেকোন দেশের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এখন আমাদের আর কেউই পেছনে টেনে নিতে পারবে না ।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পের শতকরা ৯০ ভাগ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। এখন আর দাতারা আমাদের ভিক্ষা দিতে আসে না। বরং তারা আমাদের তাদের উন্নয়ন সহযোগী অভিহিত করে সহযোগিতা দিতে আসে। কারণ কারও কাছে আমরা ভিক্ষা চাই না।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার রাতে রোমের পার্ক দ্য প্রিনসিপি গ্রান্ড হোটেল এ্যান্ড স্পা’তে আওয়ামী লীগের ইতালি শাখা আয়েজিত এক সংবর্ধনায় প্রদত্ত ভাষণে একথা বলেন।
নিজস্ব অর্থায়নে সরকারের পদ্মাসেতু নির্মাণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোন কাজ যে আমরাই পারি তা আমরা প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছি।’
পদ্মাসেতুকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাংক সরকারকে বদনাম দিতে চেয়েছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করি যে, আমরা নিজস্ব অর্থায়নেই এই সেতু নির্মাণ করব এবং এখন আমরা নিজস্ব অর্থেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতার নেতৃত্বে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে কাজেই আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যখনই আমরা ক্ষমতায় আসি না কেন আমরা দেশটাকে এমনভাবে গড়ে তুলব যাতে করে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে চলতে পারে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা এখন দাবি করতেই পারি বিশ্বে আমরা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে সেই পর্যায়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি।’
অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তুলে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায়ে রেখে যান।’
‘আমাদের সরকার সেখান থেকে দেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত আমাদের এই অবস্থান ধরে রাখতে হবে তাহলেই আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে পারব। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে তিনটি মাপকাঠি রয়েছে তা আমরা ইতোমধ্যেই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি’ বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আর কেউ পেছনে টানতে পারবে না, আমরা এগিয়ে যাব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৭৫-র জাতির পিতাকে হত্যার পর যারাই সক্ষমতায় এসেছিল তারা নিজেদের ভাগ্য বদলে ব্যস্ত ছিল, জনগণের জন্য কিছু করে নাই।’
তিনি বলেন, ‘সে সময় বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস এবং দুর্ভিক্ষের দেশ হিসেবে এবং বিশ্বে বাংলাদেশকে অবহেলার চোখে দেখা হতো, যা আমাদের জন্য লজ্জার এবং বেদনাদায়ক ছিল ।’
শেখ হাসিনা বলেন তার সরকার অতি দারিদ্র্যের হার শতকরা ১০ শতাংশে এবং দারিদ্রের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ইনশাল্লাহ আমরা এ বছরের মধ্যে এই হারকে আরও ২ থেকে ৩ ভাগ নামিয়ে আনতে সক্ষম হব, যে জন্য আমরা বেশ কিছু বিশেষ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই দেশে আর কেউ দরিদ্র থাকবে না এবং কেউ আমাদের সহানুভূতির চোখে দেখবে না। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে এবং বিজয়ী জাতি হিসেবে আমরা মাথা উঁচু করে চলব, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।’
‘দেশে আর কেউ গৃহহীন থাকবে না’-এমন সঙ্কল্প ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে গৃহহীনকে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দিচ্ছে এবং তাদের জন্য গৃহঋণ তহবিলও গঠন করেছে।
‘মুজিববর্ষে একটি লোকও গৃহহীন থাকবে না,’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, নদী ভাঙ্গন কবলিত জনগণের পুনর্বাসনের জন্য বাজেটে পৃথকভাবে এক শ’ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের কল্যাণে তার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সরকার প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে, যাতে করে বিদেশ গমনেচ্ছুদের এজন্য ঘরবাড়ি ভিটে-মাটি বিক্রি করতে না হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার সারাদেশে ৫ হাজার ৮শ’টি ডিজিটাল সেন্টার গড়ে তুলেছে যার মাধ্যমে বিদেশে গমনেচ্ছুরা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে তাদের নাম নিবন্ধন করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যাতে প্রত্যেক উপজেলা থেকে এক হাজার জনকে যেন বিদেশে পাঠাতে পারি সেজন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, আমরা তাদের জন্য স্মার্ট কার্ড দিচ্ছি।’
তার সরকারের ইতোপূর্বে প্রদান করা মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের (এমআরপি) উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন ই-পাসপোর্টের যুগ চলছে এবং আমরা ইতোমধ্যেই এই পাসপোর্ট প্রদানের কর্মসূচী শুরু করেছি। যাতে কেউ জালিয়াতির শিকার না হতে পারে।’
‘বিমানবন্দরে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়’ সেজন্যই এই ব্যবস্থা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা আরও উন্নত যাত্রীসেবা প্রদানের জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ করছি।’
তার সরকার আরও ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কারিগরি শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের জনগণকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’
বিগত ১১ বছরে দেশের চমকপ্রদ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর পেছনে কোন জাদু নেই।
তিনি বলেন, ‘এজন্য দেশকে ভালভাবে জানা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজন, জনগণকে ভালবাসা এবং তাদের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখা এবং তাদের কল্যাণে কাজ করার প্রয়োজন, যা আমাদের বাবা-মা আমাদের শিখিয়েছেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, এই দেশকে নিয়ে জাতির পিতার একটি বিরাট স্বপ্ন ছিল এবং তার সন্তান হিসেবে তার ইচ্ছেটা জানি, যে কারণে তিনি জীবনের সবকিছুই ত্যাগ করেছিলেন। তাই সেই জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই আমি কাজ করে যাচ্ছি এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নেই বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।
রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের একটি অর্থনৈতিক নীতিমালা এবং লক্ষ্য রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েই আমরা এ সম্পর্কে ভুলে যাই না, আমরা প্রতিবছর বাজেট প্রণয়ন করে ইশতেহার বাস্তবায়নের কাজকেও এগিয়ে নিয়ে যাই।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখনও অনেক কাজ বাকি এবং আমরা যে সময় পাব আমি তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে দেশকে দ্রুত উন্নত করার চেষ্টা করব এবং এজন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।’
বিমানের ফ্লাইট চালুর বিষয়ে ইতালি প্রবাসী বাংলাদেশীদের দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে ইতালি সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। আমি ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের বৈঠকেও বিষয়টি উত্থাপন করব।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, আওয়ামী লীগের ইতালি শাখার সভাপতি হাজী মোহাম্মাদ ইদ্রিস ফারাজি ও সাধারণ সম্পাদক হাসান ইকবাল এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের পক্ষে হোসনে আরা বেগম অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
ইতালিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আব্দুস সোবহান সিকদার এবং যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিওসিপ্পে কাঁতে’র আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারদিনের সরকারী সফরে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এখানে এসেছেন।