পরিবেশ দূষণে মৃত্যুর হার বাড়ছে

47

চলতি মাসে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশদূষণের কারণে সৃষ্ট রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দুটি গবেষণা সংস্থার যৌথ সমীক্ষায় উঠে আসে দূষণজনিত কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর মৃত্যু হয় এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের। ২০১৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কম হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় মোট মৃত্যুর অনুপাতে এই হার সর্বোচ্চ, প্রায় ২৮ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের পরেই রয়েছে ভারত (২৬.৫), পাকিস্তান (২৫.৮) ও নেপাল (২৫.৫)। এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর অবস্থা আমাদের তুলনায় অনেক ভালো। বাংলাদেশে এই হার কি শুধু বাড়তেই থাকবে? কমিয়ে আনার উদ্যোগ কোথায়?
পরিবেশদূষণজনিত কারণে নানাভাবে মানুষ আক্রান্ত হলেও সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় বায়ুদূষণে। এতে মানুষের যেসব রোগব্যাধি হয় তার মধ্যে রয়েছে শ্বাসনালির সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ, চোখের সমস্যা ইত্যাদি। আর শহরাঞ্চলে বায়ু দূষিত হওয়ার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে—শহরের আশপাশে থাকা ইটভাটা, যথেচ্ছ নির্মাণকাজ, যানবাহন ও কারখানার কালো ধোঁয়া ইত্যাদি। সাধারণভাবে বাতাসে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনেক বস্তুকণা ভাসতে থাকে। এর মধ্যে অতি ক্ষতিকর অনেক বস্তুকণাও থাকে। শ্বাসের সঙ্গে এগুলো ফুসফুসে যায় এবং রক্তের সঙ্গে মিশে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বস্তুকণার ধরন অনুযায়ী শরীরে নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং রোগের সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, বাতাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বস্তুকণা থাকলে তা মানবস্বাস্থ্যের জন্য খুব একটা ঝুঁকিপূর্ণ হয় না। একে বলা হয় বস্তুকণার গ্রহণযোগ্য মাত্রা। বস্তুকণার ধরন অনুযায়ী এই মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১৫ থেকে ৫০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত হয়। গবেষণায় উঠে এসেছে ঢাকার বাতাসে বস্তুকণা রয়েছে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি। কারো পক্ষেই এই মাত্রায় সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। এর পরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু, বৃদ্ধ ও দরিদ্র মানুষ। শিশু ও বৃদ্ধের সহনক্ষমতা কম এবং দরিদ্র মানুষ ঘিঞ্জি ও দূষিত পরিবেশে বেশি সময় থাকতে বাধ্য হয়।
ঢাকার বাতাস সবচেয়ে দূষিত থাকে শীতকালে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত। এ সময়ে ঢাকার আশপাশে হাজারের বেশি ইটভাটায় ইট পোড়ানো হয়। বলা হয়ে থাকে, ঢাকার বাতাস দূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী এসব ইটভাটা। অবিলম্বে এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এগুলো হয় দূষণমুক্ত পদ্ধতিতে ইট উৎপাদন করবে, না হয় বন্ধ হয়ে যাবে। কয়লার পরিবর্তে গ্যাসে ইট পোড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। অধিক দূষণকারী পুরনো যানবাহন কমাতে হবে। সব নির্মাণকাজ ও নির্মাণসামগ্রী পরিবহন পরিবেশসম্মতভাবে করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন আগে, উন্নয়ন পরে। সুস্থ ও সবল জাতি ছাড়া কোনো উন্নয়নই সম্ভব হবে না। তাই জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।