দ্বিতীয় সেমিফাইনাল আজ ॥ ক্রোয়েট গতি বনাম ইংলিশ ঐতিহ্যের লড়াইয়ে জিতবে কে?

স্পোর্টস ডেস্ক :
বিষয়টিকে কাকতালীয় না বলে কোন উপায় নেই। দু’দল এ পর্যন্ত মুখোমুখি হয়েছে সাতটি ম্যাচে। শুনলে অবাক হবেন, ছয়টি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হয়েছে বুধবারে। আরও অবাক হবেন অষ্টম ম্যাচটিও হতে যাচ্ছে বুধবারেই। ভণিতা না করে দল দুটোর নাম বলে ফেলা যাক। একটি হচ্ছে ‘ফুটবলের জনক’ এবং ‘দ্য থ্রি লায়ন্স’ খ্যাত ইংল্যান্ড। অন্যটি হচ্ছে ‘দ্য বে¬জার্স’ খ্যাত ক্রোয়েশিয়া। চলমান রাশিয়া বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত ১২টায় মুখোমুখি হবে দল দুটি। টিম স্পিরিট আর গতির সমন্বয় দিয়ে এ পর্যন্ত উঠে এসেছে ক্রোয়েশিয়া আর নতুন ফর্মেশনে খেলে ৫২ বছর আগের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে এ পর্যন্ত আসা ইংল্যান্ড দলের মধ্যে আজকের লড়াইটি বেশ জমজমাট আর উত্তেজনাকর হবে বলেই মনে করছেন ফুটবলপ্রেমীরা।
দুই দলের ক্ষেত্রেই একটি মিল আছে। উভয় দলই বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনাল খেলতে যাচ্ছে লম্বা সময় পরে। ইংল্যান্ড ২৮ এবং ক্রোয়েশিয়া ২০ বছর পরে। আরও মজার ব্যাপারÑ দুই দলই সেবার শেষ চারের মোকাবেলায় হেরে গিয়েছিল। ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে ৪-৩ (১-১) গোলে ইংল্যান্ড এবং ১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপে স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায় সেবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেয়া ক্রোয়েশিয়া।
ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের দ্বাদশ স্থানে থাকা ইংল্যান্ড এবারের বিশ্বকাপে ছিল ‘জি’ গ্রুপে। নিজেদের প্রথম খেলায় তারা ২-১ গোলে হারায় তিউনিসিয়াকে। দ্বিতীয় ম্যাচে পানামাকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দেয় তারা। তৃতীয় ম্যাচে অবশ্য বেলজিয়ামের কাছে ০-১ গোলে হেরে গ্রুপ রানার্সআপ হয়। ওঠে দ্বিতীয় রাউন্ডে। সেখানে তারা টাইব্রেকারে ৪-৩ (১-১) গোলে হারায় কলম্বিয়াকে। ২০০৬ আসরের পর আবারও ওঠে কোয়ার্টার ফাইনালে। সেখানে তারা সুইডেনকে ২-০ গোলে হারিয়ে নাম লেখায় শেষ চারে।
পক্ষান্তরে ফিফা র‌্যাঙ্কিয়ের বিংশতম স্থানে থাকা ক্রোয়েশিয়া ‘ডি’ গ্রুপে তিন ম্যাচের সবকটিতেই জয়ের স্বাদ পায়। একে একে হারায় নাইজেরিয়াকে ২-০, আর্জেন্টিনাকে ৩-০ এবং আইসল্যান্ডকে ২-১ গোলে। শেষ ষোলোতে ডেনমার্ককে টাইব্রেকারে ৩-২ (১-১) গোলে এবং কোয়ার্টারে স্বাগতিক রাশিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-৩ (২-২) গোলে হারিয়ে নিশ্চিত করে সেমিতে খেলা।
বিশ্বকাপের আসরে ইংল্যান্ডের পারফর্মেন্স খুব একটা উজ্জ্বল নয়। প্রথম তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার সুযোগ থাকলেও তারা ‘অহঙ্কার’ করে অংশ নেয়নি। ১৯৫০ সালে প্রথমবারের মতো খেলে ইংরেজরা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১-০ গোলে অপ্রত্যাশিত হেরে বিদায় নেয় প্রথম রাউন্ড থেকেই। কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে ১৯৬২, ১৯৮৬, ২০০২ ও ২০০৬ সালে। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নেয় ১৯৮২ ও ১৯৯৮ সালে। বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি ১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ১৯৯৪ সালে।
ইংল্যান্ডকে অনায়াসেই বিশ্ব ফুটবলের ‘কাগুজে বাঘ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। ২০টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১৪টিতে মূলপর্বে অংশ নিয়ে মাত্র দু’বার সেমিফাইনাল খেলতে পেরেছে, আর শিরোপা জিততে পেরেছে মাত্র একবার (১৯৬৬ সালে, পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে)। সেই ফাইনালে তাদের জিওফ হার্স্টের একটি গোল ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ১৯৯০ আসরে হয়েছিল চতুর্থ। সর্বশেষ ২০১৪ বিশ্বকাপ আসরে তাদের পারফর্মেন্স ছিল জঘন্য। গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায়ঘণ্টা বেজে গিয়েছিল তাদের। তবে এবার সেই ব্যর্থতার কথা ভুলে গিয়ে শিরোপা জেতার জন্য দৃঢ়প্রত্যয়ী ‘দ্য থ্রি লায়ন্স’ খ্যাত ইংল্যান্ড। সে লক্ষ্যে এবার তারা বদ্ধপরিকর।
তারা যদি কুসংস্কারে বিশ্বাস করে, তাহলে তারা আস্থা রাখতে পারে তুরস্কের রেফারি চুনেত চাকিরের ওপর। কেন? কারণ তার পরিচালনায় এ পর্যন্ত কোন আন্তর্জাতিক ম্যাচে (৫ ম্যাচে) হারেনি ইংল্যান্ড।
১৯৬৬ সালের পর ইংল্যান্ড জিতবে বিশ্বকাপ। ইংলিশদের সর্বশেষ বিশ্বকাপে জয়ের নায়ক জিওফ হার্স্ট মনে করেন, ইংল্যান্ডের ফাইনালে না ওঠাটা হবে অঘটন। বলা হচ্ছে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সেরা দল নিয়েই এবার রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলতে এসেছে ক্রোয়েশিয়ানরা। তাই এটাই হয়তো তাদের জন্য সেরা সময়, বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি প্রথমবারের মতো উঁচু করে ধরার।
ক্রোয়েশিয়ান তারকা স্ট্রাইকার মারিও মানদুকিচ মনে করেনÑ এ রকম সুযোগের অপেক্ষাই দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিল ক্রোয়েশিয়া। সুতরাং এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চান তিনি। একই ধারণা সøাভেন বিলিচয়েরও। ক্রোয়েশিয়ার সাবেক ডিফেন্ডার এবং স্বনামধন্য এই কোচ বলেন, ‘এই ক্ষণটির জন্য আমরা ২০ বছর ধরে অপেক্ষা করছি।’
রাশিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচ জিতে ক্রোয়েশিয়ার তারকা ফুটবলার দোমাগজ ভিদার আপত্তিকর উদযাপনে ক্ষেপেছিল ফিফা। আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল সেমিফাইনাল থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার। তবে সবকিছু পাশ কাটিয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার ছাড়পত্র পেয়েছেন ভিদা।
সেই ১৯৬৬ সালে একবার বিশ্বকাপ জয়। এরপর থেকে ট্রফিটা অধরাই রয়ে গেছে ইংল্যান্ডের। ছেষট্টির নায়করা তাই এখনও অমলিন ইংলিশ ফুটবলপ্রেমীদের মনে। এবার আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের খুব কাছে চলে এসেছে থ্রি লায়ন্সরা। দলের অধিনায়ক হ্যারি কেনও প্রেরণা খুঁজছেন সেই নায়কদের থেকেই।
এখন দেখার বিষয় ক্রোয়াট গতি বনাম ইংলিশ ঐতিহ্যের লড়াইয়ে আজ জিতবে কে?