জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন হউক

লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে গিনিপিগ বানিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে এক ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছেন আমাদের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা এমনটাই মনে করেন শিক্ষা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন এমন বিশিষ্টজনরা। আর তার মাসুল দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। দেশের শিক্ষা তার উদ্দেশ্য থেকে শুধু দূরেই সরে যাচ্ছে।
২০০৮ সালে হঠাৎ করেই দেশে সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি চালু করা হয়। আগের শিক্ষাপদ্ধতিকে সনাতনি, মান্ধাতা আমলের শিক্ষা, কেরানি তৈরির শিক্ষা এমন নানা অপবাদ দিয়ে ছুড়ে ফেলা হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে এসেও দেখা যায়, শিক্ষার্থী দূরে থাক, শিক্ষকরাই এই সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারছেন না। রিসার্চ ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব কমপ্লিট এডুকেশন (রেইস)-এর এক জরিপে দেখা যায়, মোট শিক্ষার্থীর দুই-তৃতীয়াংশই প্রশ্ন বুঝতে বিদ্যালয়ের বাইরে আলাদা শিক্ষকের সহায়তা নেয়। ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী গাইড বইনির্ভর। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের সর্বশেষ একাডেমি তদারকি প্রতিবেদন অনুযায়ী ৪০.৮১ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারেন না। কারণ তাঁরা এই পদ্ধতিই এখনো ভালোভাবে বুঝতে পারছেন না। তাহলে তাঁরা ছাত্রদের শেখাবেন কী করে? হঠাৎ করে এমন আমূল পরিবর্তন কেন করা হলো? তার ফল কী হলো? এসব না ভেবেই একের পর এক এমন পরিবর্তন করাই হচ্ছে। এর আগে এমসিকিউ পদ্ধতির প্রশ্ন করা হলো, এখন আবার তা বাতিল করার কথা বলা হচ্ছে। যেকোনো কাজ করার আগে তার ক্ষেত্র প্রস্তুত কি না তা বিবেচনা করতে হয়। তা না করে বীজ বপন করলে তাতে ফলোদয় হয় না, সেটি কি আমাদের বিজ্ঞ নীতিনির্ধারকরা বুঝতে অক্ষম?
২০১০ সালে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু সেই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে আমাদের মনোযোগ আছে কি? শিক্ষানীতিতে কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হবে প্রাথমিক শিক্ষা। এরপর একজন শিক্ষার্থীর কারিগরি শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু তা আমরা কতটুকু করতে পেরেছি? জানা যায়, মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুল-মাদরাসার সংখ্যা ৩২ হাজার এবং প্রতিবছর ভর্তি হয় প্রায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী। অথচ কারিগরি শিক্ষার জন্য আছে মাত্র দুই হাজার ৪০০ প্রতিষ্ঠান। আমরা হুটহাট উন্নত দেশের টুকরো অভিজ্ঞতার অনুকরণ করলেও তাদের মূল শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাবি না। সেখানে শিক্ষার্থীদের মেধা বা আগ্রহ অনুযায়ী কে কোনদিকে যাবে তা নির্ধারণ করা হয়। আমাদের মতো সবাইকে বিএ, এমএ পাস করতে হবে, তারপর শুধুই বেকারের সংখ্যা বাড়াতে হবে এমন ব্যবস্থা সেসব দেশে নেই। সেসব দেশে প্রাথমিক শিক্ষা আমাদের মতো এমন অবহেলিতও নয়। শিক্ষার এমন নৈরাজ্যকর অবস্থা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে।