ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই একাত্তরে স্বাধীনতা

5465508548_28cf77fb53এডভোকেট জিয়াউর রহিম শাহিন

হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্যতম একটি গর্বিত জাতির উত্তরাধিকার হিসাবে শত বছরের কাক্সিক্ষত বহুল প্রত্যাশিত স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে ভাষা আন্দোলনের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। অযুত শহীদের তাজা রক্তের বিনিময়ে সৃষ্টি হয়েছে আমাদের শস্য শ্যামলা সুন্দর এ বসুন্ধরা। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের সমারোহে এ যেন শান্তির এক ফোয়ারা। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানকে রূপান্তরিত করে বাংলাদেশে। ১৭৫৭ সনের পলাশীর পরাজয়, ১৮৫৭ সনের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, ১৯০৫ সনের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, ১৯২০-২২ সনের খেলাফত আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলন জাতীয় জাগরণে প্রধান ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে ১৯৪২ সনের কুইট ইন্ডিয়া এবং ক্রমাগত হিন্দু মুসলিম বৈষম্য তৎকালীন রাজনৈতিক ধারাকে পরিবর্তিত করে বৃটিশ উপনিবেশিক শোষক গোষ্টির নাগপাশ থেকে ৪৭’র ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগষ্ট স্বাধীন ভারতের সৃষ্টি হয়। ৪৭ পরবর্তী এ অঞ্চলে সুকৌশলে বাংলা ভাষার উপর চললো নানাবিধ আক্রমন। অতঃপর উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সুগভীর চক্রান্তের বিরুদ্ধে ফুসে উঠলো এ ভূখন্ডের আবালবৃদ্ধ বনিতা। পশ্চিম পাকিস্তানের পরিকল্পিত উপনিবেশিক আগ্রাসন ও স্বেচ্ছাচারিতার হিংস্র থাবা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তির লক্ষ্যে ভাষা আন্দোলন একটি মাইল ষ্টোন। বৌদ্ধ ধর্মাশ্রিত চর্যাপদ গুলোতে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রকৃত পক্ষে বাংলা ভাষার চর্চা শুরু হয় ত্রয়োদশ শতকে বঙ্গে মুসলিম বিজয়ের পর থেকেই। আর এ জন্যই মধ্যযুগকে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলে আখ্যায়িত করা হয়। চল্লি¬শের দশকে উর্দুতে কথা বলাটা অনেকের কাছে ছিল বেশ গর্বের আর এ কারনেই মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিম অনেকটা উস্মা প্রকাশ করেই বলেছিলেন, “যেজন বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গ বানী / সেজন জন্ম কাহার নির্ণয় ন জানি”।
ইংরেজদের শাসন শোষণ নির্যাতন পরবর্তী পশ্চিমাদের বিমাতা সুলভ আচরণে এ অঞ্চলের সচেতন জনগোষ্ঠির মাঝে ক্রমেই প্রতিবাদের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানিরা পিচঢালা রাজপথের দুর্বার আন্দোলনে নেমে আসতে বাধ্য হলো। বাংলা ভাষার দাবিতে ঐতিহ্যবাহী সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে সিলেটে সর্ব প্রথম সুধী সমাবেশ হয় ৪৭ সনের ৯ নভেম্বর। আর এই হিসাবে বাংলা ভাষার আন্দোলনে সিলেটই পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্ব প্রথম সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত আন্দোলন শুরু হয় সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের মাধ্যমে ১৯৪৭ সনের শেষের দিকে। উর্দ্দু, এক মাত্র উর্দ্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চাপিয়ে দেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে পূর্ব বাংলা ছাত্র সমাজ ১৯৪৮ সনের ১১ মার্চ প্রদেশ ব্যাপী ধর্মঘট আহবান করে। আন্দোলনের মাত্রা তীব্রতর হতে থাকলে ৪৮ সনের ২১ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষনা দেন টৎফঁ ধহফ ড়হষু টৎফঁ ংযধষষ নব ঃযব ংঃধঃব ষধহমঁধমব ড়ভ চধশরংঃধহ. এ ঘোষনার সাথে সাথেই পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলনের গতিতে ভিন্নরূপ পরিলক্ষিত হলো। পশ্চিমাদের দমন পীড়নে চারিদিকে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের ঝড় বইতে লাগলো- আন্দোলনের তীব্র লেলিহান শিখা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। কালো ধোয়ায় আচ্ছাদিত ঢাকার পাললিক জমিনে ভাষার দাবীতে গঠিত হলো সর্বদলীয় কমিটি- এ ছিল একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
বায়ান্নের ২১শে ফেব্র“য়ারী বা ৮ ফাল্গুন। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্র“য়ারী আমি কি ভুলিতে পারি” হৃদয় স্পর্শী গানটি আলোড়িত করে গোটা জনপদের শিশু থেকে বৃদ্ধকে। আনন্দ এবং প্রাপ্তির উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত এ জনপদের ছাত্র জনতা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে “রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই” শ্লোগানে মুখরিত ঢাকার রাজপথ। বাংলা ভাষার প্রতি হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা জানিয়ে বিক্ষোভে বিক্ষোভে একাকার যেন সকলেই। স্বৈরাচারী জালিমশাহী নির্বিচারে গুলি চালালে মৃত্যুকে স্বাগত জানান-সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ বাংলার সম্ভাবনাময় দামাল সন্তানেরা। বায়ান্নের রাজপথের শ্রেষ্ঠ বীর সেনানীদের আত্মত্যাগ আর বিদ্রোহী সৈনিকদের কাফেলা থেকে উচ্চারিত বজ্রকন্ঠে পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হলো-পশ্চিমাদের ক্ষমতার মসনদে ভূমিকম্প সৃষ্টি করলো। সত্য, সুন্দর এবং জ্যোতির্ময় আলোর কাছে পশ্চিমারা শোচনীয় ভাবে পরাজয় বরন করতে বাধ্য হলো। ৫৬ সনে বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা পেল। ৫২’র ৮ ফাল্গুনের আত্মত্যাগ অমর অক্ষয় আর এতে অবগাহন করে রাষ্ট্রীয় জীবনে আমরা খুঁজে পাই তৃষ্ণার তৃপ্তি। ২১ ফেব্র“য়ারী মহান শহীদ দিবসে আমরা খুঁজে পাই আমাদের শেকড়কে। মূলতঃ এ ঐতিহাসিক এবং প্রাচুর্য মন্ডিত দিনটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য নতুন আঙ্গিকে ভিন্নরূপে বার বার অনুপ্রাণিত করে লক্ষ কোটি জনতাকে। ঐতিহাসিক ফাল্গুন বা ফেব্র“য়ারী মাসটি আমাদের মাঝে ফিরে আসে বার বার। বর্ষ পরিক্রমায় একুশ তার নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে আমাদের শিরায় শিরায় নিত্য বহমান। শহীদ দিবস চির ভাস্বর, চির অম্লান। একুশ একটি সার্বজনীন বিপ্ল¬বী চেতনা। একুশ সংগ্রামী চেতনায় উদীপ্ত এক উজ্জ্বল অবিস্মরণীয় দিন। ৮ ফাল্গুনের সোনালী সকালের কৃষ্ণ চুড়ার পলাশ রাঙা রক্তমাখা বিজয়ই ঐক্যের দুর্ভেদ্য প্রাচীর সৃষ্টি করে আমাদের ইস্পাত কঠিন শপথে বলিয়ান রেখে পর্যায় ক্রমে আমাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম করেছে। ভাষার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে এমন জাতীর অস্তিত্ব পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন সারা পৃথিবীতে বিস্ময় সৃষ্টি করে প্রমাণ করেছে আমরাই বীরের জাতী। আমাদের জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল ভাষা আন্দোলনের পরেই। ভাষা আন্দোলন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হলেও এর সুদূর প্রসারী প্রভাব বাংলাদেশের বর্ণিল রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ম্যাগনাকার্টা।
বায়ান্নের ইতিহাস ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ, অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। আমাদের রক্তাক্ত সংস্কৃতির আভিজাত্য ও মৌলিক চেতনাকে অস্তিত্বহীন করার চক্রান্ত অব্যাহত আছে। বাংলা ভাষার প্রধান শত্র“ হচ্ছে পুঁজিবাদ। আমাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি যাতে ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদের কবলে চলে না যায় সেদিকে কড়া নজর রাখতেই হবে। বায়ান্নের চেতনায় আজও আমরা সমৃদ্ধ হতে পারিনি। দেশে এখনো সম্প্রীতির পূর্ণ সেতুবন্ধন রচিত হয়নি। স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ প্রাপ্তি যেন সুদূর পরাহত। সবুজ শ্যামল এ দেশের চারদিকে আজ লাশ আর বারুদের গন্ধ। গণমাধ্যম অবরুদ্ধ, রক্তেভেজা গণতন্ত্র বিপন্ন-মানবতা ভুলূণ্ঠিত। হীনস্বার্থ চরিতার্থে মহান সংবিধান আজ ক্ষত বিক্ষত। শেয়ার বাজার, হলমার্ক, কুইকরেন্টাল, রেলের কালোবিড়াল কেলেষ্কারী বিশেষতঃ পদ্মা সেতুর দুর্নীতি বিশ্বের দরবারে দেশের মান মর্যাদ কে বেশ ক্ষুন্ন করেছে। গণদাবিতে রাজপথ ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। ২০১৪ সনের ৫ জানুয়ারী অনুষ্টিত জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হন। মূলতঃ প্রশ্নবিদ্ধ এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত আছে। গণগ্রেফতার, পিপার  ¯েপ্র, বার্ণ ইউনিটের করুণ আর্তনাদ, পেট্রোল বোমায় মানুষ হত্যা, বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ড সহ বিভিন্ন ভাবে মানুষ হত্যায় নিষ্ঠুরর ও নির্মম চলমান রাজনৈতিক অবস্থায় বাংলাদেশতো বটেই বহিবিশ্বেও আমাদের মান মর্যাদা চরম ভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। কন্ঠশিল্পী হায়দার হোসেন বেশ কিছুদিন যাবত গেয়েই যাচ্ছেন, তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাকে খুঁজছি। বহির্বিশ্বে ও আমাদের গরিয়ান ইতিহাস ঐতিহ্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। দেশের স্বার্থে জাতীয় পর্যায়ে জাতীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ে ঐক্যের বড়ই প্রয়োজন। সাহিত্য এবং সংস্কৃতির মূলই মানুষের জীবনাচার। মানুষ সংস্কৃতির মাধ্যমে নিজের পরিচয় তুলে ধরে সততার সাথে, বিকাশ ঘটায় সুন্দর ভাবে- শ¬ীলতার মাত্রায়। পবিত্র ইসলাম ধর্মে রয়েছে ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশনা। সালাম বরকতদের তাজা প্রাণ উৎস্বর্গের পর দীর্ঘ ছয় দশক অতিবাহিত হওয়ার পর ও প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের সর্বত্র এখনো বাংলা ভাষা প্রচলনের সুব্যবস্থা হয়নি, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হয়নি যা নিতান্তই দুঃখজনক। বিভিন্ন স্থরে বাংলার উপরে ইংরেজী ও হিন্দির প্রাধান্য বিস্তারের অপচেষ্টা অনেকটা স্পষ্ট। ৮ ফাল্গুনকে ২১ ফেব্র“য়ারীতে বিলীন করার মানষিকতার পরিবর্তন আনা অত্যাবশ্যক। অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে এবং সত্য তথা অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে- লাল সবুজের রক্তিম পতাকা খচিত বাংলাদেশে যুগে যুগে সত্যের জয়গান গেয়ে গেয়েই আত্মাহুতি দিচ্ছেন অসংখ্য বীর সেনানীরা তথাপি শির নীচু করেননি কখনো। বায়ান্নের শহীদদের হৃদয়ের সুপ্ত ভাষনাকে চিন্তায়, কর্মে বাস্তবে রূপায়িত করতেই আমরা অঙ্গিকারাবদ্ধ। বায়ান্নের শহীদদের রক্তের বদৌলতেই একাত্তরের মহান স্বাধীনতা। একাত্তরের মহান স্বাধীনতাই আমাদের গর্ব, এ জাতির  অহংকার। দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সর্বোপরি গণতন্ত্র রক্ষায় ইস্পাত কঠিন ঐক্যের মাধ্যমে আমাদের নিজস্ব সাহিত্য সংস্কৃতি গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিরোধী  সকল অশোভ শক্তিকে ৫২’র চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রূখতে হবে সাহসিকতার সাথে। জালেম, জুলুম, অপশাসন, মানবতা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, ঈমান, আক্বিদা ইত্যাদি সর্ম্পকে আলোক প্রত্যাশি প্রতিটি মানুষের কাছে ৫২ এবং একাত্তরের চেতনা অনুকরনীয়। আর এ জন্যই বলি- “প্রভূ হে, তোমার রাজ্যে অসত্যের দ্রুত লয় হোক/ সভ্যতার নব সূর্য জুড়াক তৃষিত দুটি চোখ”।
ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই মহান স্বাধীনতার শুভ সুচনা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। সে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৪৭ সনে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হলে বাংলাদেশ নামের ভূখন্ডটি পূর্ব পাকিস্তান হিসাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত হয়। এ ছিল আরেক সুদূর প্রসারী ঐতিহাসিক বিজয়। ৪৭’র বিভক্তিই ক্রমান্বয়ে আমাদেরকে ৫২’র অগ্নিঝড়া স্মৃতিময় দিনের দিকে ধাবিত করে। ৫২’র একুশে ফেব্র“য়ারীতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ভাষার দাবিতে আন্দোলন সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই ২২ ফেব্র“য়ারী সারা দেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঢাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শফিউর রহমান, আব্দুল আউয়াল, আব্দুর রহিম প্রমুখ। ২৩ ফেব্র“য়ারী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা সাঈদ হায়দরের নকশা মোতাবেক ১১ ফুট দৈর্ঘ্যরে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। ২৪ ফেব্র“য়ারী শহীদ শফিউরের গর্বিত মাতা ঐ শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশের বাহিরে যত শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে তাতে প্রবাসী সিলেটবাসীর অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্বে ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্থান তৃতীয়তে। অন্যান্য ভাষা জাতীসংঘের দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা পেলেও বাংলা ভাষা কেন জাতিসংঘে দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা পাবে না? বাংলাকে আজ জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেওয়া অপরিহার্য।
বাংলাদেশ। সবুজ শ্যামলীমায় ভরপুর অপরূপ বৈচিত্র্যের এ জনপদ সত্যিই আল্লাহর অপার দান। লাখো লাখো শহীদের শাহাদতের বদৌলতেই সৃষ্টি হয়েছে আমাদের এই প্রানোধ্যান। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের সমারোহে এ যেন জীবন্ত শান্তির এক ফোয়াড়া। ওলি আউলিয়াদের পদচারনায় ওহীরহ পল্লবে এবং পাখিদের কল্লোলে স্বর্গের সন্নিবেশে ধন্য আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শান শওকতের সহিত ভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের আপামর জনগণের দৃঢ় প্রত্যাশায় ৯৯ সনের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ১৮৯ জাতী সমন্বয়ে গঠিত জাতী সংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক ২১ শে ফেব্র“য়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় যা বাংলাদেশকে বিশ্বের ইতিহাসে নতুন ভাবে গৌরবান্বিত করেছে। পৃথিবীতে প্রায় ছয় হাজার ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা পেয়েছে। অনেক আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বে ২১ শে ফেব্র“য়ারী শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আজ দেশ বিদেশের অসংখ্য মানুষের আন্দোলন সংগ্রামের সুতিকাগার হিসাবেই পরিগণিত হচ্ছে। মাতৃভাষাকে ভালবাসার মাধ্যমেই দেশপ্রেম শুরু হয়। বাংলা ভাষা তথা বাংলাদেশের সব কিছুকে হৃদয় দিয়ে ভালবাসতে হবে। আর এ কথাটি আজ কবি সাহিত্যিক ও শিল্পীর কন্ঠে ফুটে উঠেছে এভাবে,
আমি বাংলার গান গাই/ আমি বাংলায় গান গাই
আমি আমার আমাকে/ চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই।