যুদ্ধবিরতির পর সবাই ‘জয়ী’, দাবি সব পক্ষের

5

কাজির বাজার ডেস্ক

ইরানে ইসরায়েলের হামলা, এর পাল্টা জবাব, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে হামলা এবং কাতারে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা আঘাতÑএই উত্তপ্ত সংঘাতের পর যেসব পক্ষ ‘যুদ্ধবিরতি’তে সম্মত হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই নিজেদের ‘বিজয়ী’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। বিষয়টি উঠে এসেছে মঙ্গলবার (২৪ জুন) বিবিসির এক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘর্ষে জড়িত প্রতিটি পক্ষেরই যুদ্ধবিরতিকে সম্মান জানানোর কারণ রয়েছে। তারা সবাই পরিস্থিতিকে নিজেদের সাফল্য হিসেবে দেখছে। ইসরায়েল তাদের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা সফল বলে দাবি করছে। এই অভিযানে ইরানের একাধিক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণু বিজ্ঞানীরা নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসরায়েলের হামলায় ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে, ইসরায়েল সফলভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে হামলায় যুক্ত করতে পেরেছে। যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।
এই যুদ্ধবিরতি ইসরায়েলের জন্য কিছুটা স্বস্তির সুযোগ এনে দিয়েছে। গত দুই বছর ধরে গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া দেশটির সামনে যুদ্ধের অবসান নিয়ে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা এখনো নেই, তবে অর্থনীতিতে এ যুদ্ধবিরতির ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের জন্য এই যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি। টানা বোমাবর্ষণে বিপর্যস্ত দেশটির বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। গত ১২ দিনের সংঘর্ষে ইরানে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে, যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত অবস্থায় এসব ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া ইরানের পক্ষে সহজ হবে না। তবে, এই ‘বিজয়’ দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, ইতিমধ্যে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে এবং দেশটির দুই শীর্ষ মন্ত্রী আবারও হামলার হুমকি দিয়েছেন।
ইরানে নিহত বেড়ে ৬১০, ইসরায়েলে ২৮
১২ দিন যুদ্ধের পর বিরতি টেনেছে ইসরায়েল-ইরান। এবার আসতে শুরু করেছে দুই দেশের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। উভয় দেশের বরাত দিয়ে হতাহতের সর্বশেষ তথ্য জানিয়েছে এএফপি ও দ্য জেরুজালেম পোস্ট।
ইরান মঙ্গলবার জানায়, গত ১৩ জুন ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে অন্তত ৬১০ জন নিহত এবং চার হাজার ৭০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপোর এক্সে (সাবেক টুইটার) বলেন, ‘গত ১২ দিন হাসপাতালগুলো… অত্যন্ত ভয়াবহ পরিস্থিতি পার করেছে। আগে জানানো ৪০০ জন নিহত এবং তিন হাজার ৫৬ জন আহতের তুলনায় এখন হতাহতের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।’ অপরদিকে, ইসরায়েল এখন পর্যন্ত ২৮ জন নিহতের তথ্য দিলেও আইডিএফ (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী) বলছে, নিহতের সংখ্যা কয়েকশ হতে পারে।
গতকাল ভোর ৪টা ৪৫ মিনিট থেকে ৭টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ইসরায়েলে তিন দফা বড়সড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর মধ্যে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র বেয়ারসেবায় নিক্ষেপ করা হয়। ইসরায়েল একটি ঠেকাতে পারলেও অন্যটি একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। এর কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইডিএফ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নয় হাজারেরও বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে স্বাভাবিক হয়েছে বিমান চলাচল
সাময়িক বন্ধ ঘোষণার পর কাতার, দুবাই, কুয়েত ও বাহরাইনের আকাশসীমা পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে বিমান চলাচল কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়েছে। যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইন্স অফিস বা ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের হালনাগাদ সময়সূচি জানতে বলা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবারে প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল যে, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং বাহরাইন চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচলের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছিল। পরবর্তীতে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিবাগত রাত ৩টার (বাংলাদেশ সময়) পর থেকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের আকাশসীমা পুনরায় খুলে দেয়। বর্তমানে দোহা, দুবাই, আবুধাবি, কুয়েত ও বাহরাইন রুটে সকল বাণিজ্যিক ফ্লাইট স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদেরকে নিজ নিজ এয়ারলাইন্স অফিস বা ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের হালনাগাদ সময়সূচি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সম্পর্কে জানতে এবং ভ্রমণ কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে। যাত্রী সাধারণের ধৈর্য, সহানুভ‚তি এবং সহযোগিতার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিমান কর্তৃপক্ষ।
ইসরায়েলের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ইরানে গ্রেপ্তার পাঁচ শতাধিক
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পক্ষে কাজ করার অভিযোগে ইরানে ৫০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১৩ জুন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরানজুড়ে এই গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
নরওয়েভিত্তিক কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ১১ দিনে ইরানজুড়ে ৫৩০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইরানের সরকারি গণমাধ্যমে প্রকাশিত পুলিশের বিবৃতি এবং হেনগাওয়ের নিজস্ব অনুসন্ধান থেকে ধরপাকড়ের এই চিত্র উঠে এসেছে বলে জানায় আল মনিটর।
গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ইরানের কোন প্রদেশে কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে সেই তথ্যও দিয়েছে সংস্থাটি। খুজেস্তান প্রদেশে ৬৭ জন, তেহরানে ৬৪ জন, ফারসে ৫৩ জন, পশ্চিম আজারবাইজানে ৫১ জন, লোরেস্তানে ৪১ জন, হামাদানে ৩০ জন, রাজাভি খোরাসানে ২৪ জন, কমে ২২ জন, সেমনানে ২১ জন এবং কেরমানে ২০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এছাড়াও, অন্যান্য প্রদেশে আরও বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেনগাও জানিয়েছে, আটককৃতদের বিরুদ্ধে মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি, ইসরায়েলের পক্ষে সমর্থন প্রকাশ এবং জনমত প্রভাবিত করার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে বিমান হামলা চালানোর কয়েক দিন পর ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেন মোহসেনি এজেয় ঘোষণা দেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার সন্দেহে গ্রেপ্তারকৃতদের বিচার দ্রæত সম্পন্ন করা হবে। আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম গত ১৬ জুন এজেয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, ‘যদি কেউ জায়নবাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সহযোগিতার জন্য গ্রেপ্তার হয়, তবে তাদের বিচার ও শাস্তি দ্রæত সম্পন্ন করা উচিত এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি বিবেচনায় আইন অনুযায়ী এটা করা উচিত।’
গিলান প্রদেশের পুলিশ সোমবার জানায়, ইসরায়েল গত ১৩ জুন ইরান আক্রমণ করার পর থেকে প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার সন্দেহে অন্তত ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গিলানের আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর কমান্ডার হোসেইন হাসানপুর এক বিবৃতিতে বলেছেন, সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, শত্রæদের সঙ্গে সহযোগিতা করা, সামরিক স্থাপনার কাছে ড্রোন ওড়ানো, অগ্নিসংযোগ, ঘরে বিস্ফোরক তৈরি এবং বিরোধী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে কাজ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। সন্দেহভাজনদের বিচার বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
হাসানপুর জানান, গিলান প্রদেশে অভিযানের সময় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সরঞ্জাম, যার মধ্যে যোগাযোগ ডিভাইস, বিস্ফোরক ডিভাইস এবং স্টারলিংকের রিসিভারও জব্দ করেছে। একই ধরনের অভিযানের খবর পাওয়া গেছে ইরানের অন্যান্য এলাকা থেকেও। যুদ্ধ শুরুর আগে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া দুই জনের মৃত্যুদÐ সোমবার কার্যকর করেছে ইরান।
গত সোমবার মোহাম্মদ-আমিন মাহদাভি শায়েস্তেহ নামে ২৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালে তাকে ইসরায়েলের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। শায়েস্তেহের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের মোসাদ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি সাইবার নেটওয়ার্ক পরিচালনার এবং লন্ডন-ভিত্তিক টিভি চ্যানেল ইরান ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। ইরানের শাসকদের সমালোচক হিসেবে পরিচিত ইরান ইন্টারন্যাশনাল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই দিনে মাজিদ মোসায়েবি নামে এক ব্যক্তিকে গুপ্তচরবৃত্তি এবং ইসরায়েলের মোসাদ গোয়েন্দা সংস্থাকে সংবেদনশীল তথ্য সরবরাহের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।
ইরান-ইসরাইল দুপক্ষই লঙ্ঘন করেছে : ট্রাম্প
ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ‘কার্যকর’ আছে বলে জোর দিয়ে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এয়ার ফোর্স ওয়ান-এ রওনা হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট করে জানিয়েছেন যে ‘যুদ্ধবিরতি কার্যকর আছে।’ ট্রাম্প বলেন, ইসরাইল ইরানে হামলা করবে না। সব বিমান ঘুরিয়ে তারা দেশের দিকে রওনা হবে এবং ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ‘প্লেন ওয়েভ’ করবে। কেউ আঘাত পাবেন না, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে! এই বিষয়ে মনোযোগের জন্য আপনাদের ধন্যবাদ! যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হওয়ার পর ইরান ও ইসরাইল তা লঙ্ঘন করায় অখুশি ছিলেন তিনি। ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরান ও ইসরাইল দুপক্ষই ঘোষিত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তার কথায়, আমি নিশ্চিত নই যে তারা এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে। আজ সকালে ইসরাইলের পদক্ষেপ আমার মোটেও ভালো লাগেনি। আমি দেখছি আমি তা বন্ধ করতে পারি কি না। তিনি আরও বলেছেন, ইরান কখনোই তার পরমাণু সক্ষমতা পুনর্র্নিমাণ করবে না।
ট্রাম্প জানিয়েছেন তিনি ‘ইরানের ব্যাপারেও খুশি নন।’