যুদ্ধের ধকল সহ্যের অবস্থায় নেই ইরান-ইসরায়েল

12

কাজির বাজার ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আবার তুঙ্গে। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তপ্ত পরিস্থিতি তথা যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা কোন দিকে যাচ্ছে তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে। এই দুই আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ বেধে গেলে তা কেবল দুই দেশের ওপর নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতির ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি আল-জাজিরা এক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইসরায়েল ও ইরান উভয় দেশের অর্থনীতিই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ টিকিয়ে রাখার মতো অবস্থানে নেই। ইসরায়েলের অর্থনীতি প্রযুক্তি ও সামরিক খাতে বেশ শক্তিশালী হলেও যুদ্ধকালীন স্থায়ী ব্যয় এবং পর্যটন ও রপ্তানি খাতের ধস তাদের মারাত্মক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে পারে। অন্যদিকে, ইরান এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকায় তাদের অর্থনীতি আগেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। নতুন করে যুদ্ধের বোঝা তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে দেখা দিতে পারে।
আল-জাজিরার ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এই যুদ্ধ ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সংঘাতে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষে শুধু গাজা যুদ্ধেই খরচ দাঁড়িয়েছিল ২৫০ বিলিয়ন শেকেল (প্রায় ৬৭.৫ বিলিয়ন ডলার)। ইরানের সঙ্গে মাত্র দুই দিনের ক্রমবর্ধমান সংঘাতেই ৫.৫ বিলিয়ন শেকেল (প্রায় ১.৪৫ বিলিয়ন ডলার) খরচ হয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাজেট ২০২৩ সালে ছিল ৬০ বিলিয়ন শেকেল (১৭ বিলিয়ন ডলার), যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৯৯ বিলিয়ন শেকেল (২৮ বিলিয়ন ডলার), আর ২০২৫ সালের জন্য এটি প্রাক্কলিত ১১৮ বিলিয়ন শেকেল (৩৪ বিলিয়ন ডলার)। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের রপ্তানি প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। অন্যদিকে, এই উত্তেজনার সম্ভাব্য বৈশ্বিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রয়্যাল ডাচ শেলের প্রধান নির্বাহী ওয়েল সাওয়ান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ইসরায়েল-ইরান সংঘাত যদি সরাসরি যুদ্ধের দিকে গড়ায়, তাহলে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি ঝুঁকিতে পড়বে। ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও দেখা দেবে ভয়াবহ অচলাবস্থা।’
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালির কাছে দুটি তেল ট্যাংকারে সংঘর্ষ ও আগুন লেগেছে, যা জাহাজ চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করেছে। সাওয়ান এই পরিস্থিতিকে ‘নেভিগেশন সিগনালস জ্যামিং’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা জাহাজ পরিচালনায় অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর বিশ্বজুড়ে তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৭ ডলার ছাড়িয়েছে। এদিকে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এই পথ আটকে গেলে তা এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের তেল সরবরাহে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এ পরিস্থিতিতে কেবল জ্বালানি খাত নয়, পণ্য পরিবহন ও সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তাও হুমকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি যুদ্ধের সম্ভাব্য খরচ দুই দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে নড়বড়ে করে দিতে পারে। পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এই সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় মারাত্মক মূল্য দিতে পারে।
এ মুহ‚র্তে আন্তর্জাতিক ক‚টনৈতিক প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরে তারা বলছেন, যুদ্ধ এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী একটি গভীর অর্থনৈতিকসংকট দেখা দিতে পারে।
ইসরায়েলে ৩৯টি ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন ঝাঁক ছুড়েছে ইরান : ইসরায়েলের ওপর শুক্রবার (২০ জুন) বিকালে নতুন করে প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এক প্রতিবেদনে মেহের নিউজ এজেন্সি এ খবর জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের মাটিতে বিনা প্ররোচনায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলে তেহরানের কাছে ইরানি জাতি এবং দেশের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অপরাধী জায়নিস্টদের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। এর প্রতিশোধের অংশ হিসেবে ইরান শুক্রবার ফিলিস্তিনের অধিকৃত অঞ্চলগুলিতে বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, নতুন এই ব্যারেজে প্রায় ৩৯টি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলজুড়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। উত্তরে হাইফা এলাকা এবং দক্ষিণে বে’র শিবা এলাকায় প্রভাব পড়ার খবর পাওয়া গেছে। জেরুজালেমেও কমপক্ষে একটি ক্ষেপণাস্ত্র পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
এক সপ্তাহ আগে থেকে ইসরায়েলি সরকার ইরানের মাটিতে শুরু করা বিনা উস্কানিতে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও মিসাইল ও ড্রোনের ঝাঁক ছুড়ছে।
মেহের নিউজ জানিয়েছে, ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে ধংসাত্মক প্রতিক্রিয়া পাওয়ার পর ইসরায়েলি সরকারের কর্মকর্তারা ইরানিদের তাদের শহরগুলো ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিতে শুরু করেছে। শুক্রবার উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিমে ইরানি জাতি জুমার নামাজে অংশ নেন এবং ইসরায়েলি হানাদারদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠানোর জন্য রাস্তায় নেমে আসেন। ইরানি জাতি তাদের মাতৃভ‚মিকে সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করবে এবং তারা কোথাও পালিয়ে যাবে না।
ইরানে আবারও ইসরায়েলি হামলা : ইরানে আবারও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দেশটি ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে।
শুক্রবার (২০ জুন) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের হামলার বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তাদের বাহিনী বর্তমানে পশ্চিম এবং মধ্য ইরানের ‘সামরিক’ অবকাঠামোতে আক্রমণ করছে।
এদিকে ইরান থেকে নতুন করে ড্রোন হামলা চালানোর পর তা আটক করেছে ইসরায়েল। অধিকৃত গোলান হাইটসে এই হামলার পর সাইরেন বাজানো হয়েছে। এ সময় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দ্রæত বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) জানান যে তাদের বাহিনী অধিকৃত গোলান অঞ্চলে বিমান হামলার সাইরেন বাজানোর সময় একটি ড্রোন আটক করেছে।
এদিকে ইরানের তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস এবং সামরিক বাহিনীর এক কমান্ডারকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।
শুক্রবার (২০ জুন) এক বিবৃতিতে আইডিএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে রাজধানী তেহরান এবং অন্যান্য শহরে ১২৫ মিনিটব্যাপী বিমান অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলের বিমান বাহিনী (আইএএফ)। আইএএফের ৫০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান এ অভিযানে অংশ নিয়েছিল।
আইআরজিসির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন খামেনি : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) এর সর্বোচ্চ পরিষদের কাছে যুদ্ধকালীন ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন। একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ইরান ইন্টারন্যাশনাল। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তেহরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লাভিজানের একটি গোপন বাঙ্কারে সপরিবারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে খামেনিকে। তার সঙ্গে তার প্রভাবশালী ছেলে মোজতবা খামেনিও রয়েছেন।
সম্প্রতি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে লিখেছেন, আমরা জানি তথাকথিত ‘সুপ্রিম লিডার’ কোথায় লুকিয়ে আছেন। তিনি সহজ টার্গেট, তবে আপাতত তাকে হত্যা করা হবে না। কিন্তু আমাদের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই না বেসামরিক মানুষ বা আমেরিকান সৈন্যদের দিকে আর কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হোক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষমতা হস্তান্তরের এ পদক্ষেপ একটি সম্ভাব্য ‘প্রি-এম্পটিভ ট্রান্সফার অব অথরিটি’, যার মাধ্যমে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কমান্ড কাঠামো অক্ষুণœ রাখা যাবে, যদি খামেনি নিহত হন।
ইসরাইল-ইরান চলমান সংঘাতের অষ্টম দিনে উভয় পক্ষ একাধিক হামলা ও পাল্টা হামলায় জড়িয়েছে। ইসরাইলের একাধিক আক্রমণে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং এর পাল্টা জবাবে ইরানও ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
শুক্রবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ইসরাইলের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইসরাইল যদি হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে ইরান আগের চেয়ে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট বলেন, আমরা সবসময় শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ অনুসরণ করেছি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্তি কেবল তখনই সম্ভব, যখন জায়নবাদীরা সন্ত্রাসী আগ্রাসন বন্ধ করবে এবং স্থায়ীভাবে তা বন্ধ রাখার গ্যারান্টি দেবে।
ইরানি বিজ্ঞানীদের হত্যার ‘হিট লিস্ট’ ফাঁস : ইরানের পরমাণু কর্মসূচির মূল বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের একটি উচ্চমাত্রার গোপন অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যার কোডনামÑঅপারেশন নার্নিয়া। এ অভিযানের মাধ্যমে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু বিজ্ঞানীদের একে একে হত্যা করেছে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।
এক নজরে পুরো অভিযান
গত শুক্রবার শুরু হওয়া আরেক অভিযান ‘রাইজিং লায়ন’-এর অংশ হিসেবে ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ নেতারা এবং পরমাণু কর্মসূচিতে যুক্ত প্রধান বিজ্ঞানীদের টার্গেট করে হামলা চালায়। এর মূল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা ইউনিট ৮২০০-এর ১২০ জন সদস্য এবং বিমানবাহিনীর সমন্বিত দল।
অভিযান শুরুর আগে ইরানিদের বিজ্ঞানীদের ৪টি স্তরে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়Ñযাদের মধ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছেন সামরিক দক্ষতায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা এবং যাদের পরিবর্তন করা সবচেয়ে কঠিন এমন ব্যক্তিরা। এর ভিত্তিতে তৈরি করা হয় ‘হিট লিস্ট’, যেখানে সবচেয়ে বেশি হুমকি হয়ে ওঠা বিজ্ঞানীদের নাম ছিল শীর্ষে।
নিহত শীর্ষ বিজ্ঞানীরা : অভিযানে নিহত ইরানি বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেনÑ ফেরেইদুন আব্বাসি – পারমাণবিক প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ। মোহাম্মদ মাহদি তাহরানচি – পদার্থবিদ। আকবর মাতলালি জাদে – কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। সাঈদ বেরাজি – উপাদান প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ। আমির হাসান ফাকাহি – পদার্থবিদ। আবদুল হামিদ মিনুশাহর – রিঅ্যাক্টর পদার্থবিদ। মনসুর আসগারি – পদার্থবিদ। আহমদ রেজা দাওলপারকি দরিয়ানি – পারমাণবিক প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ। আলি বাখায়ী কাতেহরেমি – যান্ত্রিক প্রকৌশলী।
‘টার্গেট ব্যাংক’ তৈরির গল্প : অভিযানের পরিকল্পনায় অংশ নেওয়া এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জানান, আমরা একটি লক্ষ্য-ব্যাংক তৈরি করছিলাম। ব্রেকথ্রু আসে যখন একটি গোয়েন্দা ঘাঁটি ও একটি বিমান ঘাঁটি শনাক্ত করি। তারপর শুরু হয় বিভিন্ন দলে ভাগ করে মিশনÑ কে রাডার ধ্বংস করবে, কে কমান্ড সেন্টার, আর কে বিজ্ঞানীদের মারবে।
এই অভিযানের আরেক চমকপ্রদ দিক হলো ইসরায়েলের নতুন কৌশলÑমনস্তাত্তি¡ক যুদ্ধ। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) পক্ষ থেকে ‘পার্সিয়ান ভাষায়’ একটি বার্তা এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করা হয়, যেখানে ইরানি নাগরিকদের মোসাদের সঙ্গে যোগাযোগের আহŸান জানানো হয়।
বার্তায় বলা হয়, ‘আমরা বুঝতে পারি, আপনি কঠিন অবস্থার মধ্যে আছেন। আমাদের প্রিয়জনেরা যারা এই পরিস্থিতির শিকার, তারাও ইসরায়েলকে বার্তা দিচ্ছে যেন ইরানকে গাজা বা লেবাননের মতো ভাগ্য না ভোগ করতে হয়।’ বার্তার শেষে মোসাদের একটি লিংক শেয়ার করে বলা হয়Ñভিপিএন বা এনক্রিপটেড সংযোগ ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মোসাদের এই ‘অপারেশন নার্নিয়া’ কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, এটি ইরানের পরমাণু প্রকল্পে দীর্ঘদিনের দক্ষতাসম্পন্ন বিজ্ঞানীদের সরিয়ে দেওয়ার কৌশলী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ইসরায়েল একদিকে যেমন ইরানের পারমাণবিক অগ্রগতি থামাতে চায়, অন্যদিকে তেহরানের অভ্যন্তরে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
এ অভিযান আগামী দিনগুলোতে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের নতুন মাত্রা যোগ করবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানে ৫ হাসপাতালে হামলা : গত এক সপ্তাহে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের পাঁচটি হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং চিকিৎসাধীন বহু রোগীর সেবা ব্যাহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের জরুরি সেবা বিভাগের প্রধান। শুক্রবার ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি এ তথ্য জানান। এদিকে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন হাসপাতালের রোগীরাও। ইরানে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রধান পিরহোসেইন কোলিভান্দ দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন। কোলিভান্দ বলেন, ‘বিস্ফোরণের ধোঁয়ায় রোগীদের শ্বাসকষ্টের সমস্যাও তৈরি করেছে।’ হাসপাতালে এসব হামলার প্রভাব এবং এর প্রমাণ রেডক্রসসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি। ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার আকাশযুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা ইরানকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরাতে চেষ্টা চালাচ্ছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি জড়াবে কি নাÑসে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে দুই সপ্তাহের মধ্যে।
গত শুক্রবার ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে, দাবি করে যে তারা ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে চায়। জবাবে ইরানও ইসরায়েলে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ইরান বলছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
ইরানের মানবাধিকার কর্মীদের সংবাদ সংস্থা (হারানা) জানায়, ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৬৩৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা, পরমাণু বিজ্ঞানী এবং বেসামরিক নাগরিকরা।
অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা হামলায় অন্তত দুই ডজন ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। তবে কোনো পক্ষের দেওয়া নিহতের সংখ্যা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইসরায়েল মূলত ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানালেও পশ্চিমা ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা মনে করছেন, তারা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সরকার পতনের চেষ্টাও করছে। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা কি ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে চাই? এটা হতে পারে হামলার ফলাফল, তবে এটা নির্ভর করছে ইরানি জনগণের ওপরÑতারা চাইলে স্বাধীনতার জন্য উঠে দাঁড়াতে পারে।’
ইরান দাবি করেছে, তারা শুধু সামরিক ও প্রতিরক্ষা ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে একইসঙ্গে একটি হাসপাতাল ও আরো কিছু বেসামরিক স্থাপনাও ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। দুই পক্ষের এই চলমান সংঘাতে ক্রমেই বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা ও মানবিক সংকট। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন ক‚টনৈতিক সমাধানের দিকে আহŸান জানাচ্ছে।
যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে সিদ্ধান্তহীন ট্রাম্প, হতাশায় ইসরায়েল : ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজের বিশ্লেষক গিডিওন লেভি বলেছেন, ইসরায়েল-ইরান সংঘাত নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এমন ইঙ্গিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার জোট গভীর হতাশায় পড়েছেন। খবর : আলজাজিরা। ট্রাম্পের এমন ইঙ্গিতের বিষয়ে লেভি বলেন, এই বাস্তবতায় ট্রাম্টের দুই সপ্তাহ মানে হচ্ছে অন্তহীন সময়। যদি তিনি সত্যিই দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে চান এবং এটি কৌশলগত কোনো প্রতারণা না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গিডিওন লেভি আরো বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করলেও এবং দেশটির আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় আঘাত হানলেও, ইসরায়েলিরা নিরাপদ থাকবে না। তার ভাষায়, কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না, কারণ ইরান আবারো তার সামর্থ্য ফিরে পাবে।
তিনি আরো বলেন, ইসরায়েলের সামনে গাজাসহ আরো অনেক নিরাপত্তাজনিত সমস্যা রয়েছে, যেগুলো অদূর ভবিষ্যতে দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।