চোরাকারবারি ও অনুপ্রবেশকারীদের টার্গেট নরসিংপুর সীমান্ত

16

শাহ্ মাশুক নাঈম, দোয়ারাবাজার

চোরাকারবারিদের নিরাপদ ও অনুপ্রবেশকারীদের টার্গেট এখন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর সীমান্ত রোড। বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে চোরাকারবারিদের সাথে চুক্তিকরে অনুপ্রবেশকারীদের ওপেন প্রবেশ পথ হিসেবে এই এলাকা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নরসিংপুর ইউনিয়নের শ্যামারগাঁও-শ্রিপুর এলাকায় ভারতের অব্যন্তরে তারকাঁটা বেড়া না থাকায় অরক্ষিত এই এলাকা দিয়ে রশুন, মাছ ও সয়াবিন তৈল পাচারে নিরাপদ রোড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই সীমান্ত।
সেই সঙ্গে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশেও এই সীমান্ত ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও স্থানীয় সূত্রে এমন তথ্যে উঠে এসেছে।
এদিকে, অনুপ্রবেশকারীদের সীমান্ত পার করে দেওয়ার এই নতুন ব্যবসায় চোরাকারবারিদের পাশাপাশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে নতুন নতুন মানবপাচারকারী কয়েকটি চক্র। এতে রাতারাতি কোটিপতি হয়েছেন সীমান্তবর্তী এই এলাকার অনেকেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৫ আগষ্টের পর দেশের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলেও সীমান্তে চোরাকারবারের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। সীমান্তের ওইসব চোরাকারবারিরা আগে আওয়ামীলীগের বিভিন্ন সমাবেশে যোগ দিয়ে নিজেদের আওয়ামী রাজনৈতিক কর্মী পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করলেও এখন তারা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে যোগদিয়ে নিজেদের ওইসব দলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মাধ্যমে সীমান্তে চোরাই ব্যবসা চাঙ্গা করে তুলেছেন।
সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের শ্যামারগাঁও – শ্রিপুর সীমান্তবর্তী ভারতের এসব এলাকায় প্রায় ৩ কিলোমিটার জায়গায় ভারতের তারের বেড়া নেই। তারের বেড়া না থাকায় দিনদুপুরেও এই এলাকা দিয়ে মানুষ আসা-যাওয়া করে ভারত-বাংলাদেশে। স্থানীয় প্রশাসনের যোগসাজশে তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় চোরাকারবারি চক্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, উপজেলার কয়েকটি প্রভাবশালী চোরাকারবারি চক্র চোরাই ব্যবসার উপজেলার সবচেয়ে নিরাপদ রোড হিসেবে এখন বেঁচে নিয়েছে সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) অধিনস্থ লাফার্জ ক্যাম্প ও সোনালী চেলা ক্যাম্পের মধ্যবর্তী শ্যামারগাঁও- শ্রিপুর এলাকার (১২৩৯-১২৪০) আন্তর্জাতিক পিলার এলাকা। এখানে কয়েক কিলোমিটার জায়গায় ভারতের সীমান্তের তারের বেড়া না থাকায় দিনরাতে সমান তালে মদ, গাঁজা, হিরোইনসহ ভারতীয় নানা পণ্য ও বাংলাদেশী রশুন, মাছ, সবজিসহ নানান পণ্য পাচার করে থাকে।
বিজিবিকে এসব সংবাদ জানালে বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় চোরাকারবারিদেকে সংবাদ দাতার নাম প্রকাশ করে দেয়। পরবর্তীতে প্রভাবশালী এসব চোরাকারবারিদের কুনজরে পড়তে হয় সোর্সদের। তাই নিজেদের নিরাপত্তার ভয়ে এসব কান্ড দেখেও বলার মতো সাহস পায়না কেউ।
জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে আনা এসব মাছ, রশুন, সবজি ও সয়াবিন তৈল বেশিরভাগ দিনের বেলায় সকাল ও বিকেলে পিকআপভ্যান দিয়ে সীমান্তবর্তী এসব গ্রামের বিভিন্ন জনের বাড়িতে মজুত রাখে। পরবর্তীতে সন্ধা নামার সাথে সাথে সুযোগ বুঝে ভারতে পাচার করে। আর ভারত থেকে আসা মদ, গাঁজা, হিরোইন, চিনি এসব পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করার সাথে সাথেই এসব গ্রামে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়। পরবর্তীতে একি নিয়মে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে মদ, গাঁজা ও হিরোইন বেশিরভাগ দিনের বেলাই মোটরসাইকেল যোগে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যায় কারবারিরা। আর এসব পণ্যের গাড়িতে করে এখন পাচার হচ্ছে মানুষ। গত নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে বহিরাগত মানুষের সমাগম অতিরিক্ত মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একটি গোপন সূত্র জানিয়েছে, গত ৫ আগষ্ট আওয়ামী স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন নেতা শ্যামারগাঁও-শ্রিপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে পালিয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ভ‚মিকা নিয়ে। গত ৫ আগষ্টের পরে চোরাই ব্যবসা দমন অভিযানে পাশবর্তী বাংলাবাজার বিওপি ক্যাম্প বেশ কয়েকটি অভিযানে কয়েক কোটি টাকার চোরাই পণ্য আটক করলেও লাফার্জ ক্যাম্পের কোন অভিযান চোখে পড়েনি।
এবিষয়ে সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ হাফিজুর রহমান, পিএসসি কাজির বাজারকে বলেন, উর্ধ্বতন সদরের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমান্তে নিরাপত্তা রক্ষা ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি’র আভিযানিক কার্যক্রম ও গোয়েন্দা তৎপরতা সর্বোতভাবে অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের সাথে সখ্যতা করেই চোরাচালান দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ও মানবপাচারকারীরা সক্রিয় হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন আইনশৃংখলা বাহিনীর সাথে চোরাকারবারিদের সম্পর্ক রয়েছে সঠিক তথ্য প্রমান ছাড়া সেটা বলা সম্ভব নয়।