যৌন হয়রানি-আর্থিক অনিশ্চয়তায় বেড়েছে বাল্যবিয়ে

2

কাজিরবাজার ডেস্ক :
দীর্ঘ দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গ্রামীণ পরিবারে অনিশ্চয়তা, অভিভাবকদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক সংকট, ঘরোয়া আয়োজনে প্রশাসনের নজরদারি এড়ানো এবং লকডাউনে নিকটাত্মীয়দের মাধ্যমে মেয়ে শিশুদের যৌন হয়রানির কারণে করোনাকালে বাল্যবিয়ে বেড়েছে।
মেয়েদের নিরাপত্তা এবং পরিবারগুলো ভারমুক্ত ও নিশ্চিত থাকতে মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিয়েছেন।
করোনাকালীলে বিভিন্ন দেশে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ দেশে ফেরায় তাদের সঙ্গে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ পুলিশের ‘দেশে কৌভিড-১৯ অতিমারিকালীন বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি পাওয়া সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদনে’ এসব চিত্র উঠে এসেছে। পুলিশের প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে তা স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে তা রোববার সব জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়।
করোনাকালীন বাল্যবিয়ে বৃদ্ধির চিত্র
প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি ব্র্যাকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে জরিপ করা কিছু এলাকায় করোনাকালীন বাল্যবিয়ে ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত ২৫ বছরে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে সর্বোচ্চ হার।
ইউএনএফিপিএ, ইউনিসেফ ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় এক জরিপে দেখা যায় যে, ২০২০ সালের মার্চে কোভিড-১৯ শুরুর পর করোনায় প্রথম সাত মাসে দেশের ২১ জেলায় প্রায় ১৪ হাজার বাল্যবিয়ে সংঘটিত হয়েছে, যা অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত চাইল্ড হেল্পলাইন-১০৯৮-এর তথ্যমতে, করোনাকালে বাল্যবিয়ে সংক্রান্ত ফোনকলের সংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের চরাঞ্চল, উপকূলীয় এবং দারিদ্র পীড়িত ও প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে করোনাকালে বাল্যবিয়ের হার ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
করোনাকালে বাল্যবিয়ে বৃদ্ধির কারণ
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গ্রামীণ পরিবারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সস্তানের শিক্ষাজীবন প্রলম্বিত না করতে এবং ভারমুক্ত ও নিশ্চিন্ত থাকতে অনেক অভিভাবকই মেয়ের বাল্যবিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করছেন না।
করোনা অতিমারিকালে বিভিন্ন দেশে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ দেশে ফিরেছেন। কিন্তু ফিরতি ফ্লাইট শিডিউল, ভিসা ও কোয়ারেন্টিন জটিলতায় তাদের কর্মক্ষেত্রে ফিরতে বিলম্ব হচ্ছে। সামাজিক বাস্তবতায় প্রবাসে শ্রমজীবী এসব মানুষের নিজ গ্রামীণ সমাজে বেশ সমাদর থাকায় অনেক অভিভাবক তাদের সঙ্গে অপ্রাপ্ত বয়ন্ত মেয়ের বিয়ে দেওয়াকে সুযোগ হিসেবেই দেখছেন।
করোনায় অনেক পরিবার মেয়েদেরকে বোঝা হিসেবে দেখন। করোনায় অনেকের আয়ের উৎস সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং এই আর্থিক সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে-এমন আশঙ্কায় তারা তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দিয়ে পরিবারের আর্থিক বোঝাতে কমাতে চাইছে। করোনায় জনসমাগম করে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা থাকার অনেকেই অত্যন্ত ঘরোয়াভাবে ও সংক্ষিপ্ত পরিসরে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছেন। ফলে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে প্রশাসনের নজরদারি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে।
করোনাকালে লকডাউনে নিকটাত্মীয়রা মেয়েশিশুকে যৌন হয়রানি করছেন, এমন চিত্র সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে। এমন বাস্তবতায় গবেষকরা এটিকেও বাল্যবিয়ে বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় লকডাউনের কারণে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন কার্যক্রম শ্লথ হয়ে পড়ায় বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাল্যবিয়ে বেড়েই চলেছে, উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের চিত্র
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাল্যবিয়ের হার ২০০৪ সালে ৬৯ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৬৬ শতাংশ, ২০১১ সালে ৬৫ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৫৯ শতাংশ, ২০১৭-২০১৮ সালে ৬০ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে ছিল ৫১ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজ এবং ইউনিসেফের ২০১৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, তুলনামূলক বেশি বাল্যবিয়ে হয় এমন জেলাগুলোর মধ্যে মেহেরপুরে ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪৮ শতাংশ, কুড়িগ্রামে ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ, চুয়াডাঙ্গায় ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং বগুড়ায় ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, কম বাল্যবিয়ে হয় সিলেটে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, মৌলভীবাজারে ১৫, ৫ শতাংশ, সুনামগঞ্জে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং হবিগঞ্জে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বাল্যবিয়ে নিরোধ। বাল্যবিয়ে একটি সামাজিক ব্যাধি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।
সর্বজনীন মানবাধিকারের সনদ ১৯৪৮-এ বিবাহের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায়, পূর্ণ সম্মতিদানের অধিকারকে স্বীকার করে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ব্যক্তিকে অবশ্যই মানসিকভাবে পরিপক্ক হতে হবে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গৃহীত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে ২০৩০ সালের মধ্যে সারা পৃথিবী থেকে বাল্যবিয়ে নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত ওয়ার্লড গার্লস সামিট অনুসারে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশে বাল্যবিয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দশটি বাল্যবিয়ে সমস্যা সংকুল দেশের একটি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বাল্যবিয়ের উচ্চহারে এক নম্বর দেশ। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী অপ্রাপ্ত বয়স্ক অর্থাৎ ২১ বছরের কম বয়স্ক ছেলে এবং ১৮ বছরের কম বয়স্ক মেয়ের মধ্যে বিয়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও দারিদ্র্য, যৌতুক প্রথা, কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা-মার অসহায়ত্ব, নিরক্ষরতা, ধর্মীয় ও সামাজিক চাপ, অঞ্চলভিত্তিক রীতি, কুসংস্কার, লিঙ্গ বৈষম্য ও মেয়ে শিশুর নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি নানা কারণে দেশে বাল্যবিয়ে ঘটে থাকে।
এখন দেশে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বাল্যবিয়ের সংখ্যা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সামাজিক অস্থিরতা, পারিবারিক অশাপ্তি, আত্মহত্যা ও খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে, যা নিয়ন্ত্রণে অনতিবিলম্বে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করার কোনো বিকল্প নেই মর্মে প্রতীয়মান হয়।
সুপারিশ
বাল্যবিয়ে রোধে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাল্যবিয়ে বন্ধে সম্মিলিতভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি ইউএনও, জনপ্রতিনিধি, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, অভিভাবক সর্বোপরি সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক সভা, সমাবেশ, র‌্যালি ইত্যাদির আয়োজন করা।
বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে। বাল্যবিয়ে সংক্রান্ত যেকোনো সংবাদ তাৎক্ষণিকভাবে ৯৯৯, ৩৩৩ অথবা ১০৯৮ নম্বরে জানানোর জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, ২০১৭-এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
মেয়েদের পারিবারিক ও সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হবে। ইভটিজিং, যৌন হয়রানি প্রভৃতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
মেয়ে শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধ নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলে ঝরে পড়া শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনা এবং বাল্যবিয়ে যেন না হয় সে লক্ষ্যে জাতীয়ভাবে প্রচারণা চালানো।
বাল্যবিয়েপ্রবণ জেলাগুলোকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। মাধ্যমিক স্তরের সিলেবাসে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে করোনাকালে বিশেষ আর্থিক সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে, যাতে সন্তানদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত না হয় এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ের মাধ্যমে অভিভাবকরা সাংসারিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগী না হন।
স্বল্প শিক্ষিত, দরিদ্র ও অসহায় নারীদের আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ ও আইটি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রাখা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন সেবাদানকারীদের সংবেদনশীল আচরণ নিশ্চিত করা এবং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) কার্যক্রম ও বিট পুলিশিংকে শক্তিশালী করা।
বাল্যবিয়ে বন্ধের কার্যক্রমে ইমামসহ ধর্মীয় নেতাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, নিয়মিত উঠান বৈঠক আয়োজন এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা।
সরকারি নিবন্ধনপ্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যতীত বিয়ে পড়ানো যে আইনত অবৈধ, তা ব্যাপকভাবে প্রচার এবং সব বিয়ের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে- এসব সুপারিশ করা হয়।
সচিব যা বলছেন
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, আসলে যে তথ্যগুলো আসছে, সেগুলো একেবারে পূর্ণাঙ্গ না। তবে করোনাকালে বাল্যবিয়ে বেড়েছে। অনেকেই বলছে মেয়ে শিশুরা স্কুলে আসছে না। এসব শিশুর তথ্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের কাছে চাওয়া হয়েছে। সেই তথ্য পেলে পরিপূর্ণ তথ্য উঠে আসবে।
সচিব বলেন, বাল্যবিয়ে নিরোধে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কমিটি আছে। এছাড়া কিশোর-কিশোরী ক্লাব আছে, যেখানে ২০ জন মেয়ে শিশু ও ১০ জন ছেলে শিশু সদস্য। করোনার কারণে তাদের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এখন সক্রিয় করা হয়েছে। আমরা ডিসিদের বলেছি, বাল্যবিয়ে রোধে সক্রিয়ভাবে কাজ করার জন্য।
বাল্যবিয়ে থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সারা দেশে উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে জানিয়ে সচিব বলেন, আমরা সারা দেশে মানববন্ধন করব।
পুলিশের প্রতিবেদন এসেছে কি না, তা দেখতে হবে বলে জানান সচিব সায়েদুল ইসলাম।