আফগানদের বিরুদ্ধে আজ বাংলাদেশের মুশকিলের ম্যাচ

27

স্পোর্টস ডেস্ক :
মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিকদের সামনে আজ এক মুশকিলের ম্যাচ। ম্যাচটিতে জিতলে, খুব বেশি আলোড়ন হবে না। অনেক বেশি সাধুবাদ মিলবে না। স্বাভাবিকভাবেই জয়ের কথা, এমনই ধরা হয়। কিন্তু হারলেই রাজ্যের সমালোচনা শুরু হবে। কোনভাবেই যে দলটির বিপক্ষে হারা যাবে না। আজ সেই আফগানিস্তান দলটির বিপক্ষেই খেলা। যে দলটির বিপক্ষে হারা মানে তো অপরাধই ধরা হয়! যে দলটি বাংলাদেশের সামনে পড়া মানেই টাইগারদের আতঙ্ক থাকা। জয় ছাড়া আর কিছু ভাবারই উপায় নেই। সাউদাম্পটনের দ্য রোজ বোলে বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে তিনটায় বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের মধ্যকার বিশ্বকাপের ম্যাচটি শুরু হবে। ম্যাচটিতে আফগান বাধা টপকাতে হবে মাশরাফিদের।
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ছক কষা হয়েছিল। ৯টি ম্যাচকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। দুই ভাগ শেষ। যে দলগুলোকে হারানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তাতে সফল বাংলাদেশ। এবার তৃতীয় ভাগে আফগানিস্তানকে হারানোর ছক আছে। তাহলে তো বাংলাদেশের আরেকটি জয়ের ম্যাচ আজ। এই ম্যাচটিতে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ দলটি হচ্ছে আফগানিস্তান। যে দলটি সবসময়ই বাংলাদেশের বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ ৬ ম্যাচ খেলে ফেলেছে। প্রথম ধাপে দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ডের মধ্যে যে কোন একটি দল, পারলে দুটি দলকে হারানোর পরিকল্পনা ছিল। দ্বিতীয়ভাগে শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে যে কোন দুই দলকে হারানোর ছক ছিল। তৃতীয়ভাগে আফগানিস্তান, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে কোন দুই দলকে হারানোর টার্গেট ছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে প্রথমভাগে সাফল্য মিলেছে। দ্বিতীয়ভাগে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো গেছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জেতার সম্ভাবনাময় ম্যাচ ছিল। জয় হয়ত মিলত। কিন্তু শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ম্যাচটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে জেতার আশায় থাকা ম্যাচটি যদি হতো, আর জয় মিলত; তাহলে বাংলাদেশের এখন ৩ জয়ে ৭ পয়েন্ট থাকত। যা হয়নি তা নিয়েত আর বসে থেকে লাভ নেই। সামনে এগিয়ে যেতে হবে। পরিকল্পনায় বাংলাদেশ ঠিক পথেই আছে। যদি সেমিফাইনালে খেলার হিসাব হয়, তাহলে পথ কঠিন। তবে এখনও অসম্ভব নয়। সেই পথ খোলাই আছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটি বৃষ্টিতে না হওয়াতে পথ কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এখনও সুযোগ আছে। সেই সুযোগ নিতে হলে বাংলাদেশকে সামনের তিন ম্যাচেই জিততে হবে। দুটি জিতলেও হতে পারে। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ছাড়া সেমিফাইনালে ওঠার আশায় থাকা দলগুলো যদি কোন ম্যাচে না জিতে। বাংলাদেশ শেষ তিন ম্যাচের দুটিতে জিতেও শেষ চারে খেলতে পারে। শেষ ধাপের তিন ম্যাচের রেজাল্টের উপরই সব নির্ভর করছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটাররা শেষ চারের হিসাব নিয়ে বসে নেই। তারা সামনের সবকটি ম্যাচই জিততে চায়। সেই তিন ম্যাচ জেতার শুরুটা আফগানিস্তানের বিপক্ষে আজই করতে হবে।
অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাই বলেছেন, ‘এখন প্রতি ম্যাচই জিতবে হবে, এরপরও অন্য ম্যাচের ফলের জন্য হয়তো (সেমিফাইনালে উঠতে) অপেক্ষা করতে হবে। অন্যদের সুবাদে কিছু সমীকরণ তৈরি হতে পারে। তবে আমাদের নিজেদের সেরাটা দিয়ে খেলতে হবে। এখনও বলা যায় না। আপনি কখনই জানেন না কি হবে। আমরা যেটা করতে পারি শেষ তিন ম্যাচে ভাল ক্রিকেট খেলতে পারি। অবশ্যই কঠিন। কিন্তু যদি ম্যাচ তিনটিতে জিততে পারি এবং দেখতে হবে অন্যরা কি করে। আমাদের জন্য আপাতত গুরুত্বপূর্ণ হলো বাকি তিন ম্যাচ একটি একটি করে এগোনো এবং জেতা।’
শেষ ধাপের সেই তিন ম্যাচের শুরুটা আজ করছে বাংলাদেশ। এমন এক দলের বিপক্ষে এবার খেলা, যেই দলটি সবসময়ই বাংলাদেশের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখন এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়ে গেছে, এই দলটি আতঙ্কও তৈরি করে। খুব সাবধানে আফগানদের বিপক্ষে খেলতে হয় টাইগারদের। মোহাম্মদ মিঠুন তাই বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, আরও অনেক সতর্ক থাকতে হবে (আফগানিস্তানের বিপক্ষে)। অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারলে আপনারাও অনেক কিছু গ্রহণ করে নেন। ওরা আমাদের থেকে ওপরের দল। আফগানিস্তানের কাছে হারলে… মানে সবাই আশা করছে আমরা জিতব। প্রতি ম্যাচই সমান আমাদের কাছে। তার পরও এই ম্যাচে (আফগানিস্তানের বিপক্ষে) আরও সতর্ক থাকতে হবে।’
যখন দুই দলের মধ্যকার খেলা হয়, তখন একবার বাংলাদেশ জিতে তো আরেকবার আফগানিস্তান জিতে। দুই দলের মধ্যকার ২০১৪ সালের এশিয়া কাপ থেকে ওয়ানডে খেলা হয়। এ পর্যন্ত ৭ ম্যাচ হয়। ফল বাংলাদেশ ৪-৩ আফগানিস্তান। চারটিতে বাংলাদেশ জিতে। তিনটিতে জিতে আফগানিস্তান। তাতেই বোঝা যাচ্ছে, আফগানরা যে রকম দলই হোক, বাংলাদেশকে পেয়ে যেন অন্যরকম দলে পরিণত হয়ে উঠে। সর্বশেষ এশিয়া কাপেই যেমন প্রথমবার জিতে আফগানিস্তান। দ্বিতীয়বার জিতে বাংলাদেশ।
বিশ্বকাপে দুই দল একবার লড়াই করে। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে। তাতে বাংলাদেশই জিতে। এবার দ্বিতীয়বারের মতো যখন বিশ্বকাপে দুই দল লড়াই করবে, তখন যতই আফগানদের নিয়ে ভাবনা থাক, ফেভারিট দল বাংলাদেশই।
ফেভারিট হওয়ারই কথা। আছেন বিশ্বসেরা ওয়ানডে অলরাউন্ডার। যিনি ফর্মের তুঙ্গে আছেন। আবার খেলাটি হবে সাউদাম্পটনে। যেখানে স্পিনাররা যে কতটা সুবিধা পায়, তা শনিবার ভারত-আফগানিস্তান ম্যাচেও দেখা গেছে। ভারতের পড়া ৮ উইকেটের ৫টিই স্পিনাররা শিকার করেছেন। সাউদাম্পটনে আফগানিস্তান যতই বিশ্বকাপে টানা দুই ম্যাচ খেলার সুবিধা পাক, ২০০৪ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর আর কখনও এই মাঠে বাংলাদেশ যতই না খেলুক, সাকিব ঠিকই নিজ মহিমায় উজ্জ্বলই থাকেন। সেই ঝলক আজও দেখিয়ে দিলেই হলো।
সাকিব ও রশীদের মধ্যে একটা স্পিন যুদ্ধ দেখা যাবে। কিন্তু দুইজনের মধ্যে স্পিনের বাইরে তো ব্যাটিংয়ে সাকিবই এগিয়ে। রশীদকে হটিয়ে বিশ্বসেরা ওয়ানডে অলরাউন্ডারও এখন সাকিব। ম্যাচ জয়ে দুই দলের মধ্যকার এগিয়ে বাংলাদেশও। তাছাড়া শেষ ম্যাচটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যেভাবে খেলেছে বাংলাদেশ, তাতে আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। আত্মবিশ্বাস আফগান শিবিরেও বেড়েছে। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটিতে যে দাপট দেখিয়েছে। কিন্তু জিততে পারেনি। ২২৫ রানের টার্গেট অতিক্রম করতে না পারায় দলের ব্যাটসম্যানদের যে কী করুণ হাল, তাওতো বোঝা যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখানেই মানসিকভাবেও এগিয়ে থাকছে। ফর্মে ফেরা তামিম ইকবাল, একটি বড় ইনিংসের আশায় থাকা সৌম্য সরকার, টানা চার ম্যাচে ৫০ উর্ধ রান ও দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি করা সাকিব, বিশ্বকাপে প্রথমবার সেঞ্চুরি করা মুশফিকুর রহীম, রান পাওয়া মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, ড্যাসিং ব্যাটসম্যান লিটন কুমার দাসের সঙ্গে রবিবার অনুশীলনে মাথায় বল লেগে আঘাত পেয়ে আবার দ্রুত সুস্থ হওয়া মেহেদী হাসান মিরাজ ও কাঁধের চোট কাটিয়ে ফিরলে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত অথবা সাব্বির রহমান রুম্মন ব্যাটিংয়ে আছেন। সেখানে যতই রশীদ খান, মুজিব জাদরান, মোহাম্মদ নবী ও রহমত শাহ স্পিন জাদু দেখান, বাংলাদেশের লম্বা ব্যাটিং লাইনআপকে কী আর ছন্নছাড়া করে দিতে পারবেন? স্পিনটা তো বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানরা আবার ভালও খেলেন। ব্যাট হাতে হযরতউল্লাহ জাজাই, গুলবাদিন নাইব, রহমত, হাসমতুল্লাহ শহীদি, আসগার স্ট্যানিকজাই, নবী, নজিবুল্লাহ জাদরান, ইকরাম আলীখিল, রশীদরা কী আর মুস্তাফিজুর রহমান, মাশরাফি বিন মর্তুজা, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন অথবা রুবেল হোসেন এবং পার্টটাইম বোলার হয়েও দ্যুতি ছড়ানো সৌম্য সরকারের পেস আক্রমণের সঙ্গে সাকিব, মিরাজ ও মোসাদ্দেকের স্পিন দ্যুতির সামনে কুলিয়ে উঠতে পারবেন? সবদিকেই এগিয়ে থাকছে বাংলাদেশই। আর তাই যতই আফগানিস্তানকে নিয়ে উচ্চবাচ্য হোক, বাংলাদেশের যে আজ আরেকটি জয়ের দিন, জয়ের ম্যাচ; তা ধরেই নেয়া হচ্ছে। প্রত্যাশাতেই আছে, আফগান বাধা সহজেই টপকাবে বাংলাদেশ।