দ্বিতীয় ফরাসী বিপ্লব

স্পোর্টস ডেস্ক :
আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো ফ্রান্স। রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ১৯৯৮ সালের পর আবারও ফুটবল বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তুলল ফ্রান্স। ২০ বছর পর আবার ফ্রান্স চ্যাম্পিয়ন হয়। লরিস, গ্রিজম্যান, এমবাপে, পোগবারা আনন্দে ভাসলেন। উচ্ছ্বাসে মাতলেন। ফ্রান্স অধিনায়ক হুগো লরিসের হাতে শিরোপা ধরা দিল। সেই শিরোপা উঁচিয়ে ধরলেন লরিস।
মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের গ্রিজম্যান, পোগবা ও এমবাপে গোল করেন। আরেকটি গোল আত্মঘাতী থেকে পায় ফ্রান্স। ক্রোয়েশিয়ার পেরিসিচ ও মান্দজুকিচ গোল করেন। ১৮ মিনিটে মান্দজুকিচের আত্মঘাতী গোলে এগিয়ে যায় ফ্রান্স। ২৮ মিনিটে পেরিসিচের গোলে সমতা আসে। ২০ মিনিট না যেতেই ৩৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে গ্রিজম্যান ফ্রান্সকে আবার এগিয়ে দেন। ৫৯ মিনিটে পোগবা গোল করে ফ্রান্সকে যেন শান্তি এনে দেন। ৬৫ মিনিটে এমবাপে গোল করে ফ্রান্সের জেতা নিশ্চিতই করে দেন। ক্রোয়েশিয়ার সব আশা শেষ করে দেন। ৬৯ মিনিটে মান্দজুকিচ গোল করে ব্যবধান কিছুটা কমান। প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যে স্বপ্ন দেখেছিল ক্রোয়েশিয়া, রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
রবিবার দুই দলই ৪-২-৩-১ ফরমেশনে খেলে। বোঝাই যায়, সবদিক ঠিক রেখেই খেলতে চেয়েছে দুই দল। রক্ষণদুর্গ, মাঝমাঠ শক্ত রেখে আক্রমণ করার ধ্যানেই মগ্ন। দুর্দান্ত শুরু করে লুকা মডরিচের দল ক্রোয়েশিয়া। আক্রমণের পর আক্রমণ চালাতে থাকে। ফ্রান্স রক্ষণদুর্গের ফুটবলাররা তা সামলাতে থাকেন। প্রথম ১০ মিনিটতো একচেটিয়া ক্রোয়েশিয়া ফুটবলারদের দখলেই থাকে। ধীরে ধীরে ফ্রান্স একটু বল নিয়ন্ত্রণে নেয়। ফ্রান্স এরকমই খেলে। প্রতিপক্ষ শিবির আক্রমণ করতে থাকে। সুযোগ বুঝে কাউন্টার এ্যাটাকে গোল করে ফ্রান্স। ১৮ মিনিটেই সেই কাজটি হয়। তবে আক্রমণে আত্মঘাতী গোলে এগিয়ে যায় ফ্রান্স। ২৫ থেকে ৩০ গজ দূর থেকে এ্যান্টনি গ্রিজম্যানের ফ্রিকিক মাথা দিয়ে নিরাপদে নিতে চান মারিও মান্দজুকিচ। বলটি মাথার স্পর্শে গোল হওয়া থেকে রক্ষা করতে গিয়ে উল্টো বল জালে জড়ান সেমিফাইনালে জয়সূচক গোল করা মান্দজুকিচ (১-০)। বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথম ফুটবলার হিসেবে আত্মঘাতী গোলের দুঃখভরা রেকর্ড গড়ে বসেন মান্দজুকিচ। দুর্ভাগ্য ক্রোয়েশিয়ার।
অবশ্য সেই দুঃখ বেশিক্ষণ পুঁজি করে রাখতে দেননি ক্রোয়েশিয়া ফুটবলাররা। আক্রমণ চালাতেই থাকেন। ২৮ মিনিটেই ইভান পেরিসিচ দুর্দান্ত গোল করে ম্যাচে সমতা আনেন (১-১)। নক আউট পর্বের আগের তিনটি ম্যাচেই আগে গোল খেয়ে জিতেছিল ক্রোয়েশিয়া। এবার পেরিসিচ অসাধারণভাবে গোল করে সমতায় ফেরান। কিন্তু ৩৫ মিনিটেই ক্রোয়েশিয়ার বিপদ আসে।
এমন সময়ে ক্রোয়েশিয়া রক্ষণদুর্গে পেরিসিচের হাতে বল লাগে। রেফারি পেনাল্টি দেন। ক্রোয়েশিয়া ফুটবলাররা ভিএআর দাবি করেন। রেফারি তা মেনে নিয়ে ভিডিও রিপ্লে দেখে পেনাল্টির সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। মাথা ঠান্ডা রেখে পেনাল্টি থেকে ৩৮ মিনিটে গোল করেন গ্রিজম্যান (২-১)। এগিয়ে যায় ফ্রান্স। গোল করার দু’একটি সুযোগ এরপর পায় ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু তা কাজে লাগাতে পারেনি। ফ্রান্সের এগিয়ে থাকার মধ্য দিয়েই প্রথমার্ধ শেষ হয়।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার পর ২ মিনিট না যেতেই ক্রোয়েশিয়ার আন্টে রেবিচ গোল করার সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি। ডিবক্সের ভেতর থেকে গোলমুখে শট নিলে গোলরক্ষক, ফ্রান্সের অধিনায়ক হুগো লরিস তা রুখে দেন। হাতের ছোঁয়ায় বল নিরাপদে নেন। ৫২ মিনিটের সময় কাউন্টার এ্যাটাকে গিয়ে মাঝমাঠ থেকে পল পোগবার বাড়ানো বল পেয়ে দ্রুতগতিতে কিলিয়ান এমবাপে ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণদুর্গে ঢুকে যান। কিন্তু ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তাই জোরালো শট নিতে পারেননি। ক্রোয়েশিয়া গোলরক্ষক সুবাসিচের পায়ে লেগে বল নিরাপদ হয়। দ্বিতীয়ার্ধে চলতে থাকে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ। ক্রোয়েশিয়া আক্রমণ চালায় তো মুহূর্তেই ফ্রান্সও আক্রমণ চালায়। এমন করতে করতে ৫৯ মিনিটে গিয়ে আরেকটি গোল করে ফ্রান্স। এবার পোগবা গোল করে ফ্রান্সকে আরও এগিয়ে দেন (৩-১)। ডিবক্সের ভেতরে এমবাপে বল দেন গ্রিজম্যানকে। গ্রিজম্যান বল দেন পোগবাকে। প্রথম শটে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় শটে বল জালে জড়ান পোগবা। ৬৫ মিনিটে এমবাপে গোল করে ব্যবধান আরও বাড়ান (৪-১)। জয়ের নিশ্চয়তাও যেন মিলে যায়। ৬৯ মিনিটে ফ্রান্স গোলরক্ষক লরিসের ভুলে মান্দজুকিচ গোল করে যেন আত্মঘাতী গোল করার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করলেন (৪-২)। খেলায় তখন কী উত্তেজনা। তখন হাতে থাকে আর ২০ মিনিট। ক্রোয়েশিয়া আক্রমণ চালাবেই। যেভাবেই হোক, গোল করতে চাইবে। চেয়েছেও। সুযোগও মিলে। কিন্তু কাজে লাগানো যাচ্ছিল না। দুই দল এমন খেলাই খেলল, উপভোগ্য একটি ফাইনাল হল। গোল বেশি দিল ফ্রান্স। শেষপর্যন্ত ৪-২ গোলেই খেলার নিষ্পত্তি হয়।
ক্রোয়েশিয়া প্রথমবারের মত ফাইনালে উঠেছে। ইতিহাস গড়েছে। এরআগে চারবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। প্রথমবার ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই সেমিফাইনালে খেলে ক্রোয়েশিয়া। তৃতীয় হয়।
বিশ্বকাপের আগে ফ্রান্সের সঙ্গে কখনই জিততে পারেনি ক্রোয়েশিয়া। যে কোন ধরনের প্রতিযোগিতামূলক খেলাতেই হার হয়েছে। ড্র মিললেও কোন জয় ছিল না ক্রোয়েশিয়ার। পাঁচবার দুই দলের মধ্যকার লড়াইয়ে তিনবার জিতেছে ফ্রান্স। দুই ম্যাচে ড্র হয়েছে। বিশ্বকাপে একবার দুই দল মুখোমুখি হয়। জিতে ফ্রান্স। ১৯৯৮ সালের সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে চ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রান্স। এবার ফাইনালে লড়াই হয় দুই দলের। ক্রোয়েশিয়ার সামনে প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ থাকে। ক্রোয়েশিয়া পারেনি। ফ্রান্সের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের পর্দাও নামে। ১৪ জুন শুরু হয়ে রবিবার (১৫ জুলাই) শেষ হয় বিশ্বকাপ। ৩২ দিন খেলা হয়। ৩২ দল খেলে। ৬৪ ম্যাচ হয়। ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে রানার্সআপের স্বাদ দিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রান্স। বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তুলে নেয় ফ্রান্স। বিশ্বকাপের ২১তম আসরে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রান্স।