সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আয়্যুব বখত জগলুল আর নেই

সুনামগঞ্জ থেকে সংবাদদাতা :
সুনামগঞ্জ পৌরসভার ২ বারের নির্বাচিত মেয়র আলহাজ¦ আয়্যুব বখত জগলুল (৫৩) আর নেই। (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে হঠাৎ করে সুনামগঞ্জ শহর নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। সর্বত্র নেমে এসেছে শোকাবহ পরিবেশ। মরহুমের মৃত্যু সংবাদে তার বাসভবনে তাৎক্ষণিকভাবে ছুটে গেছেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোঃ সাবিরুল ইসলাম, জেলা পুলিশ সুপার মোঃ বরকতুল্লাহ খান, জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ আশুতোষ দাশসহ জেলা আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাসদ, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। আয়্যুব বখত জগলুলের ছোট ভাই ইয়াকুব বখত বহলুল বলেন, ৩০ জানুয়ারী সিলেটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশ থেকেই রাজনৈতিক ও পৌরসভার উন্নয়নমূলক কাজের জন্য তিনি ঢাকা চলে যান। সেখানে কমলাপুর রেলষ্টেশন এলাকার আল ফারুক আবাসিক হোটেলে অবস্থান করছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার ভোরে বুকে ব্যথা অনুভব করলে তিনি ঢাকার ইসলামিয়া হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। সেখানকার কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাকে স্কয়ার হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। হাসপাতালে নেয়ার পথেই তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর খবর শহরে পৌছামাত্র শোকে মুহ্যমাণ হয়ে পড়েন গোটা শহরবাসী। আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্কী, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা দলমত নির্বিশেষে তাঁর আরপিননগরস্থ বাসভবনে ছুটে যান। তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্যানেল মেয়র হোসেন আহমদ রাসেল জানান, হেলিকপ্টারযোগে মরহুম মেয়রের মৃতদেহ সুনামগঞ্জে নিয়ে আসা হবে। শেষ নজর দেখার জন্য তার লাশ রাখা হবে শহরের আরপিননগরস্থ বাসভবনে। বিদেশ থেকে তার ভাই ও ভাতিজারা দেশে পৌছার পর ৩ ফেব্র“য়ারী শনিবার বাদ জোহর সুনামগঞ্জ স্টেডিয়াম মাঠে তার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য আয়্যব বখত জগলুল ১৯৬৫ সালের ১৮ ফেব্র“য়ারী সুনামগঞ্জ মিউনিসিপ্যালটির আরপিননগর মহল্লার বখত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কমরেড হোসেন বখত বাল্যকালে কমিউনিস্ট পার্টি ও গণতন্ত্রী দলের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি কারাভোগ করেন। ১৯৫৭ সালে কমরেড হোসেন বখত আওয়ামীলীগে যোগদানের পর তৎকালীন মাহমুদ আলী মিনিষ্টারের এলাকা হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জে দুর্নীতি দমন মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম রাজনৈতিক ও সরকারী সফরে আসেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে হোসেন বখত এর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল প্রবল। হোসেন বখতের সিদ্ধান্ত ব্যতিত বঙ্গবন্ধু সুনামগঞ্জে কোন কাজ করতেন না। হোসেন বখত সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, মহকুমা আওয়ামীলীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে গুরু দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে টেকেরঘাট সাবসেক্টরের বিভিন্ন রণাঙ্গনে আপন পুত্র আনোয়ার বখত সুবাস, মনোয়ার বখত নেক ও শাহজাহান বখতকে নিয়ে মুক্তি সংগ্রামে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন তিনি। জগলুলের বড় ভাই মনোয়ার বখত নেকও ছিলেন সুনামগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান। আয়ূব বখত জগলুল মহকুমা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক, জেলা যুবলীগের আহবায়ক, জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগে তিনি আওয়ামীলীগের জাতীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। মহকুমা সদরে আওয়ামীলীগ রাজনীতির হাল ধরে রাখার অপরাধে জিয়াউর রহমান ও এরশাদ সরকারের আমলে জগলুল ও তার ভাইদেরকে বারংবার কারাভোগ করতে হয়েছে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সুনামগঞ্জ পৌরবিপণী মার্কেটে একটি দলীয় কর্মসূচিতে আসলে কোন্দল গ্র“পিং এর রাজনীতি নিয়ে তুমুল বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হন জগলুল। এ সময় সামাদ আজাদের রোষানলে পড়ে হেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি আব্দুজ জহুর ও সাধারণ সম্পাদক জগলুলকে পুলিশ এসল্ট মামলার আসামী হয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়। পরে সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের নেতৃত্বে সুনামগঞ্জ জেলায় ত্যাগী বঞ্চিত উপেক্ষিত নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ করে আওয়ামীলীগকে সুসংগঠিত করেন। তিনি সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ও জিএস পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের ১৮ জানুয়ারী তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র পদে পরবর্তীতে ২০১৬ সালে দ্বিতীয় বারের মতো নির্বাচিত হন। সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর তীরে দৃষ্টিনন্দন রিভার ভিউ, আধুনিক কিচেন মার্কেট, মুক্তিযোদ্ধা হোসেন বখত চত্বরসহ ২০০৪ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পৌর এলাকার রাস্তাঘাট সংস্কার ও প্রশ^স্ত করার কাজে সার্বক্ষণিকভাবে নিবেদিত ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি এক পুত্র, ১ কন্যা ও স্ত্রীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী আত্মীয় স্বজন রেখে গেছেন।