পুরাতন সংবাদ: August 17th, 2018

জিলহজ্ব মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমল সমূহ যা জানা খুবই প্রয়োজন

ডাঃ হাফেজ মাওলানা মোঃ সাইফল্লাহ মানসুর

পবিত্র রমজান মাসের পর গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সময় হলো জিলহজ মাসের প্রথম ১০দিন। এই দিনগুলোর ইবাদত করা আল্লাহ তায়ালার নিকট অতি প্রিয়।সহিহ বোখারির বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ভালো আমলের জন্য আল্লাহর নিকট এই দিনগুলোর চেয়ে প্রিয় কোনো দিন নেই; সাহাবারা প্রশ্ন করলেন ইয়া-রাসুলাল্লাহ (সঃ)- এমনকি আল্লাহর রাহে জিহাদও এই দিনসমূহের ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়? জবাবে ইরশাদ হলো- না, অন্য সময়ে আল্লাহর রাহে জিহাদও এই দশকের ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। অবশ্য যে ব্যক্তি জান ও মাল নিয়ে আল্লাহর রাহে জিহাদ করতে বের হয়েছেন এবং তার কোনোটি নিয়েই ফিরতে পারেননি, তার কথা ভিন্ন।
অতএব যারা কুরবানি করার সামর্থ্য রাখে অথবা সামর্থ রাখে না; তাদের সবার জন্য জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন অতি গুরুত্বের সাথে অতিবাহিত করা প্রয়োজন । কুরবানি করার আগ পর্যন্ত যে বিধি-নিষেধ রয়েছে যা পালন করার মধ্যে রয়েছে অনেক সাওয়াব। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে কোরআন-হাদিসে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া এই ইবাদত সম্পর্কে আমাদের সমাজের খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষই ধারণা রাখেন। চলুন জেনে নিই জিলহজ মাসের প্রথম দশকের উল্লেখযোগ্য ১০টি আমল যথা –
১. সামর্থ্যবান হলে হজ পালন করা। -সূরা আল ইমরান: ৯৭
২. কোরবানি করা। -সূরা কাউসার ও তিরমিজি
৩. অধিক পরিমাণে আল্লাহতায়ালার নামের জিকির করা। -সূরা হজ্ব : ২৮
বর্ণিত আয়াতে অবশ্য নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নামের জিকির করার কথা বর্ণিত হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসিরবিদ উলামায়ে কেরামের অভিমত হলো- ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’ বলতে জিলহজের প্রথম দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে।
৪. বেশি বেশি পরিমাণে নেক আমল করা ও দান-সাদাকাহ করা। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম
৫. সকল ধরনের পাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম
৬. কোরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির এই দশদিন- নখ, চুলসহ শরীর থেকে কোনো কিছু কর্তন না করা। -সহিহ মুসলিম
সেজন্য জিলহজ মাস আসার আগে জিলক্বদ মাসের শেষের দিকে যেমন-
ক.মাথার চুল কাটা কিংবা মাথা ন্যাড়া করা।
খ.হাত ও পায়ের নখ কাটা।
গ.মোচ ছেঁটে ছোট করা ইত্যাদি
৭. বেশি বেশি তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠ করা। যেমন- আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ। – আবু দাউদ
৮. আরাফার দিন ফজর হতে আইয়ামে তাশরিকে (ঈদের দিন ও তার পরে আরো তিন দিন) প্রতি নামাজের পর উল্লেখিত তাকবিরটি পাঠ করা। -আবু দাউদ
৯. আরাফার দিনে রোজা রাখা। সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি মনে করি, তার বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা এক বছর পূর্বের ও এক বছর পরের গুনাহ মাফ করে দিবেন।
আরাফার দিন ছাড়াও ঈদের দিন ছাড়া প্রথম দশকের বাকি দিনগুলোতেও রোজা রাখাকে মোস্তাহাব বলেছেন ইমাম নববি (রহ.)। কেননা নফল রোজাও নেক আমলের শামিল। হাদিসে এই দশকে সাধারণভাবে নেক আমলের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য হাদিসে স্বতন্ত্র নির্দেশ থাকায় আরাফার দিনের রোজা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
১০. ঈদের দিনের যাবতীয় সুন্নতসমূহ পালনে সচেষ্ট হওয়া যেমন-
ক. উত্তমরূপে গোসল করা।
খ. সাধ্যমত নতুন জামা পরে ঈদগাহে আসা।
গ. আতর ও সুরমা লাগানো।
ঘ. তালবিয়া পাঠ করতে করতে ঈদগাহে আসা।
ঙ. আত্মীয় সজনসহ সকলের সাথে কুশল বিনিময় করা।
চ. পশু কুরবানী থাকলে নামাজ শেষে কুরবানী করা।
ছ. খালিমুখে নামাজ পড়তে আসা, নামাজ শেষে কুরবানীর গোসত দিয়ে খাবার শুরু করা।
প্রিয় পাঠক! জিলহজ মাস তো কতোবারই এসেছে আমাদের জীবনে। কিন্তু আমরা কী পেরেছি জিলহজ মাসের এসব আমলসমূহ পালন করতে? কে জানে আগামী জিলহজ মাস আমাদের জীবনে আসবে কি-না? সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিন্তু এখনই। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে জিলহজ মাসের সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রেখে কুরআন- হাদিসের ওপর আমল করা এবং শরীয়তের বিধি-নিষেধগেুলোর প্রতি যতœবান হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ইসলামের আন্তর্জাতিক মানবিক নিরাপত্তার আইন

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

(পূর্ব প্রকাশের পর)
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার লংঘন ও নির্বাসনের একটি সমীক্ষা : মানবাধিকার সংরক্ষণের এক মহান উদ্দেশ্য নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা হলেও বর্তমানে বিশ্বের চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ এর মানবাধিকার বিষয়ক ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জিং অধ্যায় বলে মনে করেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদ আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইতালী ও চীনকে ‘ভেটো’ প্রয়োগের নিরংকুশ ক্ষমতা প্রদান করে নিজেই মানবাধিকার লংঘনের নজীর স্থাপন করেছে। পৃথিবীর পরাশক্তিসমূহ বিশেষতঃ আমেরিকা ও ব্রিটেন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে শাসন-শোষণ ও বঞ্চনার করুণ শিকারে পরিণত করেছে। অথচ এরাই জাতিসংঘ ও মানবাধিকার কমিশন নিয়ন্ত্রণ করে। আর পুতুলসম জাতিসংঘেরও এমন কোন সংস্থা বা মেকানিজম নেই যা দেশে দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে কিংবা আইন দ্বারা তা মানতে বাধ্য করতে পারে। ফলে জাতিসংঘের ছাত্রছায়ায়, কোন কোন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে বৃহৎ শক্তিবর্গ বিশেষত আমেরিকা ও তার মিত্র শক্তি দুর্বল দেশসমূহে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার সনদকে পদতলে পিষ্ট করে আফগাস্তিান ও ইরাকে ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনীর নগ্ন আগ্রাসন, গণহত্যা, স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা হরণ, সিরিয়া, ইরান ও সৌদি আরবের প্রতি মার্কিন হুমকি, বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় সার্ব বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা, ফিলিস্তীনে ইসরাইলী আগ্রাসান ও দমন-পীড়ন, আলবেনিয়ায় গণহত্যা, স্বাধীনতাকামী কাশ্মীর মিন্দানাওয়ে মুসলিম নিধন, মায়ানমারে মুসলিমদের ওপর জেল-জুলুম ও নির্যাতন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি ও কোন কোন দেশে ঘন-ঘন সামরিক শাসন জারী, আমেরিকায় মুসলিম ও নিগ্রোদের প্রতি বৈরী আচরণ, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে নাগরিক অধিকার হরণ, দেশে দেশে বোমাতংক এবং সামাজিক নৈরাজ্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অস্থিতিশীল বিশ্ব পরিস্থিতি আজ জাতিসংঘের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতিকেও আজ বিপর্যয়কর অবস্থার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। ফলে মনে হয়, গুটি কয়েক রাষ্ট্রকে ভেটো প্রয়োগ ক্ষমতা প্রদান করে জাতিসংঘ এসব রাষ্ট্রকে তার সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ হতে ফায়দা লুটার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। পক্ষান্তরে এই ব্যবস্থা বিশ্বের কোটি কোটি শান্তিকামী মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে মুসলিম বিশ্ব ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা, আদর্শিক অসচেতনতা, সামাজিক পশ্চাদপদতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনগ্রসরতা প্রভৃতি সমস্যায় জর্জরিত। সর্বোপরি মুসলিম বিশ্বের মাঝে ঐক্য ও সংহতির অভাব আজ সুস্পষ্ট। ফলে তারা জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ হতে পুরোপুরি ফায়দা উঠাতে পারছে না। এমতাবস্থায় উপরোক্ত দুর্বলতাসমূহ কাটিয়ে উঠে মুসলিম উম্মাহ যদি কেবল মহান আল্লাহ প্রদত্ত এবং মহানবী (সা.) প্রদর্শিত শাশ্বত জীবন ব্যবস্থা ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণ করে এবং মহানবী (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদীনার জনকল্যাণমূলক আদর্শ রাষ্ট্রের মডেলে মানবাধিকারের শিক্ষা ও নীতিমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগে গ্রহণ করে তা হলে বিশ্ববাসীকে মানবাধিকারের গ্যারান্টি দিতে সক্ষম হবে। “আব্দুল কাদের, ড.আ.ক.ম, প্রাগুক্ত, পৃ.৫৬”। সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার এই উদারণ রাসূল (সা.) এর জীবনের শুরু থেকেই আজীবন নানাভাবে দেখা গিয়েছিল। পরবর্তীকালে যখন তিনি গোটা আরব জাহানের নেতা হয়ে উঠলেন তখন তিনি কি সমাজজীবনে, কি পারিবারিক জীবনে, কি রাষ্ট্রীয় তথা নাগরিক জীবনে, কি বিশ্ব নাগরিক হিসাবে- সর্বক্ষেত্রে মানুষের মূল্য-মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকারের যে সর্বজনীন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন আজ পর্যন্ত সারা বিশ্বের ইতিহাসে তা বিরল, অভূতপূর্ব। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নীতি-দর্শনের কয়েকটি দিকের উপর আলোকপাত করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠবে।
মানবাধিকার ও ইসলামী নীতিমালা (ওংষধসরপ চৎরহপরঢ়ষবং)
১। নিরাপদ জীবন-যাপনের অধিকার : মুহাম্মদ (সা.) মানুষের জীবনের অধিকার ও জান-মালের নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। নরহত্যা যেখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল সেখানে নরহত্যাকে জঘন্য অপরাধ হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, “সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ হচ্ছে, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করা এবং মানুষকে হত্যা করা। “আল-হাদী, উদ্ধৃত, গ.ঊৎংযধফঁষ ইধৎর, ঐঁসধহ জরমযঃং রহ ওংষধস রিঃয ঝঢ়বপরধষ জবভবৎহপব ঃড় ডড়সবহ জরমযঃ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঐঁসধহ জরমযঃং রহ ওংষধস শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধ, ১৯৯৪, ঢাকা : পৃ. ১৮”।
মহানবী (সা.) আলো বলেছেনÑ “কোন যিম্মীকে (মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিককে) হত্যাকারী জান্নাতের সুগন্ধ পর্যন্ত পাবে না। যদিও জান্নাতের সুগন্ধ অনেক দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়। “বুখারী, ইমাম, আস-সহীহ, মো. আব্দুল করিম খান সংকলিত, ঢাকা : বাংলাদেশ লাইব্রেরী ১৯৯৬, পৃ. ৩৩০, হাদীস নং ১২৭৭”। বিদায় হজ্বের ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী (সা.Ñ বলেছেন, “হে মানবজাতি! নিশ্চয় তোমাদের জীবন, সম্পদ এবং সম্ভ্রম তোমাদের প্রভুর সম্মুখে উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত পবিত্র”। “আহমদ, মুহাম্মদ শফিক ও মু. রুহুল আমীন, ইসলামে মানবাধিকার : নাগরিক ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, যুক্তসংখ্যা ৪৭, ৪৮, ৪৯, অক্টোবর ৯৩- জুন, পৃ. ১৫৮”। মহানবী (সা.) আত্মহত্যাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং আত্মহত্যাকারী তার নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দেয়ার শাস্তি হিসাবে আত্মহত্যার অনুরূপ পন্থায় দোযখে শাস্তি ভোগ করবে বলে হুঁশিয়ার বার্তা দিয়েছেন। “বুখারী, ইমাম, আস-সহীহ, মো. আব্দুল করিম খান সংকলিত, প্রাগুক্ত, হাদীস নং ১২৫১-১২৫৩”।
২। বিবাহ ও পারিবারিক জীবনযাপনের অধিকার : মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন দর্শনে সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তিকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। ইসলামে বিবাহ সমভাবে একটি অধিকার ও ধর্মীয় দায়িত্ব। রাসূল (সা.) বলেছেÑ “বিবাহ আমার সুন্নত, যে আমার সুন্নতের প্রতি অনাসক্ত সে আমার আদর্শভুক্ত নয়। “প্রাগুক্ত”। কৌমার্যব্রতকে প্রত্যাখান করে তিনি বলেছেন : “ইসলামে সন্ন্যাসবাদ ও বৈরাগ্য প্রথার অনুমোদন নেই। “প্রাগুক্ত”। প্রকৃপক্ষে ইসলামে ‘বিবাহ’ কেবল জৈবিকা চাহিদা পূরণের পন্থাই নয় বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, সমঝোতা, সমবেদনা ও নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। রাসূল (সা.) প্রবর্তিত বিবাহব্যবস্থা এমন একটি সামাজিক চুক্তি যাতে নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্মত বা অসম্মত হবার সমান অধিকার স্বীকৃত। তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যাপারেও ইসলামে নারী ও পুরুষকে সমান অধিকার প্রদান করা হয়েছে। “প্রাগুক্ত”।
বিবাহের পাশাপাশি পারিবারিক জীবনকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যেহেতু স্বামী-স্ত্রীই হল পরিবারের মূল ভিত্তি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের উপরই প্রাথমিকভাবে পারিবারিক জীবনের শান্তি ও সুখ নির্ভরশীল তাই পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক কেমন হবে এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়ে কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছেÑ “তাঁরা (স্ত্রীগণ) তোমাদের (স্বামীদের) ভূষণ আর তোমরা তাদের ভূষণ। “আল-কুরআন, ২ : ১৮৭”।
৩। সম্পদের মালিকানা : রাসূল (সা.) প্রবর্তিত ইসলামী অর্থব্যবস্থা সমাজবাদ বা পুঁজিবাদ কোনটিকেই সমর্থন করে না এখানে সীমিত পরিসরে ব্যক্তির জন্য সম্পত্তির মালিকানা স্বীকৃত। তবে তা এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে, ব্যক্তি এখানে সম্পদ উপার্জনের লাগামহীন স্বাধীনতা লাভ করে না। ইসলামী সমাজে সকল সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আল্লাহর। মানুষ দায়িত্বপ্রাপ্ত (ঞৎঁংঃবব) হিসাবে এর অর্জন, ভোগ ও বণ্টনের অধিকার লাভ করে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- “তাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে”। “আল-কুরআন, ৭০ : ২৪, ২৫”। দান-খয়রাত, সদকা, যাকাত, ফিতরা প্রভৃতির মাধ্যমে বর্ধিত সম্পদের বিলি-বণ্টন করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক অবস্থার কথা কেবল বলাই যায়নি, রাসূল (সা.) তাঁর জীবনে কার্যকরভাবে তা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ইসলামে সমাজে পুঁজিপতি ও শ্রমিকের সম্পর্ক শোষণ বা সংঘর্ষ নির্ভর নয় বরং পারস্পরিক কল্যাণমূলক ও ভ্রাতৃত্বসূলভ। রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে সত্তার হাতে আমার জীবন তার শপথ করে বলছি, কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারে না, যে পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তা অন্য ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করে”। “আহমদ, মুহাম্মদ শফিক ও মুহাম্মদ রুহুল আমীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৫”।
৪। দাসত্বের গোলক ধাঁধা থেকে স্বাধিকার : দাসত্বের পরাধীনতা মানবেতিহাসের এক চরম অমানবিক ও অবমাননাকর অধ্যায়। এর প্রচলন ছিল বিশ্বব্যাপী এবং ১৮৯০ সালে ব্রাসেলসে দাস-ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ কনফারেন্সের আগ পর্যন্ত বিশ্বের কোথাও এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধাচরণ করা হয়নি। “মানব প্রকৃতি অপরিবর্তনীয়”Ñ এ দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে প্লেটো ও এরিস্টোটল থেকে শুরু করে আঠারো শতকের অধিকাংশ দার্শনিক দাসপ্রথাকে সমর্থন করেছেন। দাস প্রথা সম্পর্কে এরিস্টোটলের মতামত উল্লেখ করে অনফঁষষধয কধহহড়ঁস বলেছেন- ”ওহ যরং ড়ঢ়রহরড়হ, সধহশরহফ পড়হংরংঃবফ ড়ভ ঃড়ি পধঃবমড়ৎরবং ঃযব ভৎবব ধহফ ঃযব ংষধাবং ধহফ ঃড় যরস ংড়সব ঢ়বড়ঢ়ষব বিৎব ংষধাবং নু ঃযবরৎ াবৎু হধঃঁৎব. ”কধহহড়ঁস, অনফঁষষধয রংষধস রং ঃযব ভরৎংঃ অহঃর-ঝষধাবৎু জবষরমরড়হং ঝুংঃবস ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ. ঞযব ওংষধসরপ জবারবি ঔড়ঁৎহধষ. ডড়ৎশরহম ঝঁৎাবৎু, ঊহমষধহফ, ঔঁষু-অঁমঁংঃ ১৯৬৬, চ. ৩৭. গ্রীক, রোমান, পারসিক প্রভৃতি প্রাচীন সভ্যতাসমূহে ইহুদী, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও সনাতন হিন্দু ধর্মে এমনকি আধুনিক ইউরোপ ও আমেরিকাতেও প্রথমদিকে দাস প্রথা স্বীকৃত প্রথার মর্যাদা পায়। ‘‘আহমদ, মুহাম্মদ শফিক ও মুহাম্মদ রুহুল আমীন, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০’’ এ থেকে অনুমিত হয় যে, এ প্রথাটির নৈতিকতা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রাথমিক কৃতিত্ব মহানবী সা. এরই প্রাপ্য।
মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মদ (সা.) সেই সপ্তম শতাব্দীতেই এ প্রথার বিরোধিতা ও এর বিলুপ্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। তাঁর দর্শন ছিল, সমগ্র মানব জাতি একজন নারী ও পুরুষ থেকে উদ্ভূত, সুতরাং জন্মগতভাবে সকল মানুষ সমান ও স্বাধীন।
তিনিই সর্বপ্রথম দাসমুক্ত করেন এবং দাসমুক্ত করাকে বিশেষ সওয়াবের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করলে সাহাবীদের মাঝে দাস মুক্তির হিড়িক পড়ে যায়। স্বয়ং নবী (সা.) ৬৭ জন, আবূ বকর (রা.) অসংখ্য, ওমর (রা.) এক হাজার, আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ত্রিশ হাজার দাস-দাসীকে মুক্তি দান করেন। মানুষে মানুষে এই সমতা বিধানের মহত্তম আদর্শ দেখে মুগ্ধ হয়ে উৎ. অযসধফ এড়ষধিংয তাঁর ”ঞযব জবষরমরড়হ ড়ভ ওংষধস” গ্রন্থে বলেন, ”ঊয়ঁধষরঃু ড়ভ ৎরমযঃ ধিং ঃযব ফরংঃরহমঁরংযরহম ভবধঃঁৎব ড়ভ ঃযব ওংষধসরপ ঈড়সসড়হবিধষঃয. অ পড়হাবৎঃ ভৎড়স ধহ যঁসনষব পষধহ বহলড়ুবফ ঃযব ংধসব ৎরমযঃং ধহফ ঢ়ৎরারষবমবং ধং ড়হব যিড়ফ নবষড়হমবফ ঃড় ঃযব হড়নষবংঃ কড়ৎধংরংয. ‘‘রহমান, মুহাম্মদ মতিউর, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯.
বর্তমানে দাসত্ব তথা দাস প্রথা উচ্ছেদ করার কথা সভ্য সমাজ মুখে বললেও এটিকে তারা বাস্তবে জিইয়ে রেখেছে। আমিরিকা তার সভ্যতা বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে, বহুতল বিশিষ্ট অট্টালিকা, সুরম্য জনপদ, প্রশস্ত সড়ক, বিশালাকার শিল্প-কারখানা ইত্যাদি নির্মাণে আফ্রিকা থেকে বহুসংখ্যক দাস আমদানি করে। সে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে এবং কিছুটা ভিন্ন আকারে। ১৭৭৬ সনের ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণার কথা বলতে গিয়ে ঈষধঁফব গ. খরমযঃভড়ড়ফ বলেন- ”ইষধপশ ৎবসধরহবফ ংষধাবং ঁহঃরষ ধনড়ঁঃ ৮০ ুবধৎং ষধঃবৎ, ড়িসবহ ফরফ হড়ঃ ৎবপরবাব ঃযব ৎরমযঃ ঃড় াড়ঃব ঁহরঃষ ১১২ ুবধৎং ষধঃবৎ ধহফ ঃযব ড়িৎশরহম পষধংং ফরফ হড়ঃ মবঃ ঃযব ষবমধষ ৎরমযঃ ঃড় ড়ৎমধহরহংব ধহফ পড়ষষবপঃরাবষু নধৎমধরহ ১৫০ ুবধৎং ষধঃবৎ. ‘‘প্রাগুক্ত’’
প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ইড়ংড়িৎঃয তাঁর ”গড়যধসসবফ ধহফ গড়যধসধফধহরংস” গ্রন্থে বলেন- ”ওঃ ৎবপড়মহরংবফ রহফরারফঁধষ ধহফ ঢ়ঁনষরপ ষরনবৎঃু, ংবপঁৎবফ ঃযব ঢ়বৎংড়হ ধহফ ঢ়ৎড়ঢ়বৎঃু ড়ভ ঃযব ংঁনলবপঃং ধহফ ঢ়ড়ংঃবৎবফ ঃযব মৎড়ঃিয ড়ভ ধষষ পরারপ ারৎঃঁবং. ওঃ পড়সসঁহরপধঃবফ ধষষ ঃযব ঢ়ৎরারষবমবং ড়ভ ঃযব পড়হয়ঁবৎরহম পষধংং ঃড় ঃযড়ংব ড়ভ ঃযব পড়হয়ঁবৎবফ যিড় পড়হভড়ৎসবফ ড়ভ রঃং ৎবষরমরড়হ, ধহফ ধষষ ঃযব ঢ়ৎড়ঃবপঃরড়হ ড়ভ পরঃরুবহংযরঢ় ঃড় ঃযড়ংব যিড় ফরফ হড়ঃ, ওঃ ঢ়ঁঃ ধহবহফ ঃড় ড়ষফ পঁংঃড়সং ঃযধঃ ৎিবৎব ড়ভ রসসড়ৎধষ ধহফ পৎরসরহধষ পযধৎপঃবৎ. ওঃ ধনড়ষরংযবফ ঃযব রহযঁসধহ পড়ংঃড়স ড়ভ নঁৎুরহয ঃযব রহভধহঃ ফধঁমযঃবৎং ধষরাব, ধহফ ঃড়ড়শ বভভবপঃরাব সবধংঁৎবং ভড়ৎ ঃযব ংঁঢ়ঢ়ৎবংংরড়হ ড়ভ ঃযব ংধষাব- ঃৎধভভরপ. ‘‘প্রাগুক্ত’’ (অসমাপ্ত)

নৌ পথে চলাচলে ভোগান্তি

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি শেষ। অনেকেই এরই মধ্যে পরিবার-পরিজন পাঠিয়ে দিলেও মূল ঈদ যাত্রা শুরু হবে শুক্রবার থেকে। এবার ঈদের ছুটির শেষে দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি যোগ হওয়ায় মোট পাঁচ দিনের ছুটি ভোগ করা যাবে। ফলে অনেকেই প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে চাইবেন। ঈদের আনন্দে মানুষের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় ঘরে ফেরার টিকিট। বরাবরের মতো এবারও প্রথম দিনেই শেষ বাসের টিকিট। ট্রেন ও লঞ্চের টিকিট বিক্রিও শেষ হয়েছে। কিন্তু ঘরে ফেরার আনন্দে মানুষের মনে পথের বিড়ম্বনার আশঙ্কা রয়েই গেছে। এবার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঘরমুখো মানুষকে বিড়ম্বনায় ফেলতে পারে দুই ফেরিঘাট। কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌ রুটে নাব্যতা সংকটের কারণে বড় ফেরি চলাচল করতে পারছে না। অন্যদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ রুটে প্রবল স্রোতের কারণে ফেরিগুলোকে চলাচল করতে হচ্ছে নির্দিষ্ট চ্যানেল ছেড়ে অনেকটা ঘুরে। ফলে উভয় ফেরিঘাটে দীর্ঘ হচ্ছে পারাপারের অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের সারি। এ ছাড়া ঈদুল আজহার সময় কোরবানির পশুবাহী ট্রাকের সংখ্যা বাড়ে। নাব্যতা সংকটের কারণে ফেরি পারাপারে সময় লাগছে বেশি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে।
কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌ রুটে নাব্যতা সংকটের কারণে রো রো ফেরি চলাচল বন্ধ রেখে ছোট ছোট কে-টাইপ ফেরিতে যানবাহন পারাপার করছে বিআইডাব্লিউটিসি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, উজান থেকে পলিমিশ্রিত পানি আসার কারণে বিকল্প চ্যানেল ও চ্যানেলমুখে দ্রুত পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নাব্যতা সংকট দেখা দেওয়ায় এই রুটে ছয়টি ডাম্প ফেরি ও তিনটি রো রো ফেরি চলাচল করতে পারছে না। দুটি ভিআইপি ফেরিসহ মোট ৯টি ফেরি ধীরগতিতে চলছে। এ অবস্থায় চ্যানেলমুখে ড্রেজিংয়ের কাজ আরো দ্রুততর করতে হবে। এর পাশাপাশি বিকল্প রুটও খুঁজে বের করতে হবে। তা না হলে এই রুটের যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে। কারণ ঈদ যাত্রা শুরু হলে যানবাহনের চাপ আরো বাড়বে। অন্যদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ রুটে পদ্মায় পানি বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। অব্যাহত রয়েছে প্রবল স্রোত। এ অবস্থায় প্রতিটি ফেরিকেই দুই থেকে তিন কিলোমিটার উজানে গিয়ে নদীপথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে ফেরি পারাপারে সময় লাগছে বেশি। ফেরির ট্রিপের সংখ্যা কমে যাওয়ায় উভয় পারে যানবাহনের চাপ বাড়ছে, দীর্ঘ হচ্ছে সারি। এ অবস্থায় এই নৌ রুটে ফেরির সংখ্যা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে সংকট মোকাবেলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।