সিন্টু রঞ্জন চন্দ
৬ বছর পর দেশব্যাপী বহুল আলোচিত এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূ গণধর্ষণ মামলায় এক জনের মৃত্যুদÐ (ফাঁসি) ৩ জনের যাবজ্জীবন ও ৪ আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। রায়ের পাশাপাশি সাজাপ্রাপ্ত ৪ আসামিকে অর্থদন্ডেও দন্ডিত করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের বিশেষ দায়রা জজ ও দ্রæত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী রায় পড়া শেষে সকল আসামীদের উপস্থিতিতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ওই আদালতের কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন।
রায় ঘোষণার আগে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে পুলিশ গণধর্ষণ মামলার সকল আসামীদের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে ওই আদালতে হাজির করা হয়।
মৃত্যুদÐপ্রাপ্ত আসামির নাম- সাইফুর রহমান (৩৪)। তিনি সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়া গ্রামের মো. তাহিদ মিয়ার ছেলে।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- হবিগঞ্জ সদর থানার বাগুনীপাড়ার শাহ্ মো. জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ্ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (৩১), সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ (বর্তমানে শান্তিগঞ্জ) উপজেলার উমেদনগর গ্রামের মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে বর্তমানে নগরীর মেজরটিলা দীপিকা আ/এ ৩ তলার ৫ নং বাসার বাসিন্দা তারেকুল ইসলাম উরফে তারেক (৩৪) ও জকিগঞ্জ থানার আটগ্রাম এলাকার মরিচা গ্রামের মৃত অমলেন্দু লস্কর উরফে অনু’র ছেলে বর্তমানে শাহপরাণ থানার ১নং রোডের গ্রাম রাজপাড়ার সুরভী ২১ নং বাসার বাসিন্দা অর্জন লস্কর (৩১)। এবং খালাসপ্রাপ্তরা হলেন- রবিউল হাসান উরফে ইসলাম, মাহফুজুর রহমান, মাহফুজুর রহমান মাসুম ও নগরীর শিবগঞ্জের মো. আইনুদ্দিন উরফে আইনুল ও বিয়ানীবাজারের মিছবাউল ইসলাম রাজন। তারা সবাই ছাত্রলীগের টিলাগড়কেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
আদালতের রায়ের আদেশ থেকে জানা গেছে, মো. সাইফুর রহমানকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ৭ এবং ৯(৩) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাকে ৯ (৩) ধারার অধীনে মৃত্যুদÐ (ফাঁসি) দেয়া হয় এবং অতিরিক্ত ১ লক্ষ টাকা অর্ধদÐ প্রদান করা হয়েছে। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক মৃত্যুদÐ বহাল রাখা সাপেক্ষে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাকে গলায় ফাঁসি দ্বারা ঝুলিয়ে রাখতে হবে। সেই মর্মে সাজা পরোয়ানা ইস্যু করা হউক। এছাড়া আসামিকে ৯ (৩) ধারার অধীনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদÐ প্রদান করায় তাকে পৃথক ভাবে আরও ৭ ধারার অধীনে কোন দÐ আরোপ করা হলো না।
অপর আসামি শাহ্ মো. মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম উরফে তারেক ও অর্জন লস্করকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ৭ এবং ৯ (৩) তৎসহ পঠিত ৩০ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে তাদের প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদÐ এবং প্রত্যেককে ১ লাখ টকা অর্থদÐ এবং ৭ ধারার অধীনে ১৪ বছর সশ্রম কারাদÐ এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদÐ অনাদায়ে আরো ৬ মাসের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়।
রায়ের আদেশে আরো জানা যায়, জরিমানার টাকা ভিকটিম আঁখি আফরিন এর পরিবারের সদস্যরা প্রাপ্ত হবেন। আসামিদের উভয় ধারায় আরোপিত দÐ একই সাথে চলবে এবং আসামিদের ইতিমধ্যে হাজতবাসকালীন সময় সাজা ভোগ করেছে গন্যে আরোপিত দÐ হতে বাদ যাবে।
এদিকে অপর আসামি রবিউল হাসান উরফে ইসলাম, মাহফুজুর রহমান, মাহফুজুর রহমান মাসুম, মো. আইনুদ্দিন উরফে আইনুল ও মিছবাউল ইসলাম রাজন এর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ সমুহ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের প্রত্যেককে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়েছে। তারা অন্য কোন মামলায় আটকাদেশ না থাকলে এই আসামিদেরকে এখনিই অবমুক্ত করা হোক।
এছাড়া মৃত্যুদÐপ্রাপ্ত কয়েদি আসামি মো. সাইফুর রহমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ২৮ ধারা অনুযায়ী অদ্য হতে ৬০ দিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপীল দায়ের করতে পারবেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ঘটে নারকীয় এ ঘটনা। ওইদিন সন্ধ্যায় ছাত্রাবাস এলাকায় ঘুরতে যান এক দম্পতি। সে সময় স্বামীকে আটকে রেখে নববিবাহিত তরুণীকে (২০) গণধর্ষণ করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে স্বামীকে নিয়ে শাহপরাণ মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ আঁখি আফরিন (১৯)। ফেরার সময় তারা গাড়ি থামিয়ে ছিলেন নগরীর টিলাগড় এলাকার এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে। স্ত্রীকে প্রাইভেটকারে রেখে স্বামী পার্শ্ববর্তী দোকানে গিয়েছিলেন। ওই সময় প্রাইভেটকারটি ঘিরে ধরে কয়েকজন তরুণ। প্রাইভেটকারসহ ওই দম্পতিকে তারা নিয়ে যায় বালুচর এলাকার এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ভেতরে। সেখানে স্বামীর সামনেই গাড়ির ভেতর সংঘবদ্ধভাবে গৃহবধূকে ধর্ষণ করে ৬ যুবক। পরে তাদের মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয় ধর্ষকরা। আটকে রাখে তাদের গাড়িও। ঘটনার রাতেই নির্যাতনের শিকার গৃহবধূর স্বামী দক্ষিণ সুরমা জৈনপুর গ্রামের বাসিন্দা মাইদুল ইসলাম বাদী হয়ে এমসি কলেজ ছাত্রলীগের ৬ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে এবং ২/৩ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে শাহপরাণ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। যার নং- ২১ (২৬-০৯-২০২০)। এসময় প্রাইভেটকারটি আটকে রেখে চাঁদাবাজির ঘটনায় আরেকটি মামলা হয়। মামলা দুটি প্রথমে পৃথক চললেও পরে উভয় মামলা একসঙ্গে চলার সিদ্ধান্ত হয়। ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও ৩ দিনের মধ্যে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে সন্দেহভাজন দুজন ও এজাহারনামীয় ৬ জনসহ মোট ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা পরে আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। এছাড়াও ডিএনএ পরীক্ষায় ৮ আসামির ৬ জনের সঙ্গে ধর্ষণের আলামতের মিল পাওয়া যায়।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরাণ থানার পরিদর্শক (ওসি তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য রাজন গ্রেফতারকৃত ৮ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট নং- ১৮৯) দাখিল করেন এবং ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি আদালত এই মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচারকার্য শুরু করেন আদালত। দীর্ঘ শুনানী ও ৫২ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গতকাল মঙ্গলবার আদালত উল্লেখিত এক জনের মৃত্যুদÐ, ৩ জনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদÐ এবং অপর ৪ আসামিকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের পিপি অ্যাডভোকেট মো. আবুল হোসেন ও আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট শাহ মো. মোশাহিদ আলী, অ্যাডভোকেট গোলাম ইয়াহিয়া চৌধুরী, অ্যাডভোকেট মিনহাজ উদ্দিন খাঁন এবং অ্যাডভোকেট সাব্বির আহমদ মামলাটি পরিচালনা করেন।
রায় ঘোষণার পর আসামী পক্ষের আইনজীবী শাহ মো. মোশাহিদ আলী এক প্রতিক্রিয়ায় দৈনিক কাজির বাজারকে বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষী দেয়নি। ভিকটিমও আসামিদের শনাক্ত করেনি। অপরাধ প্রমাণ না হওয়া সত্তে¡ও কয়েকজনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাবো।
এ রায়ের ব্যাপারে সিলেট দ্রæত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. আবুল হোসেন দৈনিক কাজির বাজারকে জানান, আমরা আদালতে আসামীদের অপরাধ প্রমাণে সক্ষম হয়েছি। আদালতের বিচারক এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় একজনের মৃত্যুদন্ড ও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেছেন। এছাড়া ৪ জনকে খালাস দেয়া হয়। এ রায়ে আমরা সন্তষ্ট।





