কাজির বাজার ডেস্ক
গেলো বছর জুলাইয়ে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন ১ হাজার ৫৭১ জন। আর এই বছর ৪৩ হাজার ৮৫৪ জন। এবার জুলাইয়ে রোগী বেশি, প্রায় ২৮ গুণ। বিশেষজ্ঞরা আগেই বলেছিলেন আগস্টে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। আর পরিসংখ্যান সেদিকেই হাঁটছে। আগস্টের ১৩ দিনেই হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছেন ৩৩ হাজার ৫৭৯ জন। প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার রোগী ভর্তি হচ্ছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে। আর সেই হিসাবে আগামী পাঁচ দিনেই হয়তো জুলাইকে ছাড়িয়ে যাবে আগস্ট।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য বলছে, গত বছর সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৬২ হাজার ৩৮২ জন। আর এই বছর এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে ৮৫ হাজার ৪১১ জন।
গত সাত দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ৭ আগস্ট ২ হাজার ৭৫১ জন, ৮ আগস্ট ২ হাজার ৭৪২ জন, ৯ আগস্ট ২ হাজার ৮৪৪ জন, ১০ আগস্ট ২ হাজার ৯৫৯ জন, ১১ আগস্ট ২ হাজার ৪৬ জন, ১২ আগস্ট ২ হাজার ৪৩২ জন এবং ১৩ আগস্ট ২ হাজার ৯০৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালে। এর আগে আগস্টের ছয় দিনে রোগী ভর্তি হয়েছিলেন ১৪ হাজার ৬০০ জন। অর্থাৎ আগস্টে প্রতিদিন ২ হাজার ৫৮৩ জন গড়ে ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে।
গড়ে মৃত্যু ১১ জন : দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বলছে, মৃত্যুর পরিসংখ্যানও ছাড়িয়ে গেছে অতীতের রেকর্ড। ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ছিল সর্বাধিক ১৭৯ জন। সেই রেকর্ড ভেঙে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩৯৮ জন। এরমধ্যে জুলাইয়ে মৃত্যু ছিল ২০৪ জন এবং আগস্টে ১৪৭ জন। বাকি ৪৭ মৃত্যু ছিল জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যবর্তী সময়ে। আগস্টের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন গড়ে ১১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাচ্ছেন।
আক্রান্তদের বেশিরভাগ পুরুষ ও বয়সে তরুণ : এই বছরে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এখন পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৫৫০ জন পুরুষ এবং ৩১ হাজার ৮৬১ জন নারী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশের বয়স ২১ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে, যা ১৬ শতাংশ। এছাড়া ১৬ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ১৩ শতাংশ, ২৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ১৩ শতাংশ, ৩১ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে ৯ শতাংশ, ৩৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ৮ শতাংশ আছে। এছাড়া শূন্য থেকে ৫ এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশু আছে ছয় শতাংশ করে ১২ শতাংশ।
মৃতদের বেশিরভাগ নারী : ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ৩৯৮ জন মারা গেছেন। এর বেশিরভাগ অংশই নারী। মৃতদের মধ্যে ২২৫ জন নারী এবং ১৭৩ জন পুরুষ। এরমধ্যে ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, যারা মারা যাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই হাসপাতালে ভর্তির দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে মারা যাচ্ছেন। চিকিৎসকরা জানান, দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসা মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, জুন মাসের তুলনায় দেশে জুলাইয়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার অনেক বেশি ছিল। এমনকি আগস্ট মাসে এসেও ডেঙ্গু সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে, যা দেশে ডেঙ্গুর অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তের যে পরিস্থিতি, যেহেতু ঢাকার বাইরে রোগী বাড়ছে, সেহেতু আগস্ট মাসে এ হারে যদি সংক্রমণ বাড়ে এবং যদি স্থিতিশীলতা না আসে, তাহলে এ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার অন্যান্য সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি হতে পারে।
মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সারা দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হলেও ঢাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার ডেঙ্গুরোগী ভর্তি রয়েছেন এবং প্রায় ৮২ হাজার মানুষ আক্রান্ত। আর ঢাকায় রোগীদের জন্য প্রায় ৩ হাজার শয্যা রয়েছে। এরমধ্যে ২ হাজারের বেশি রোগী ভর্তি আছে এবং ঢাকার বাহিরে ৫ হাজার শয্যা রয়েছে। আশা করছি রোগীদের জন্য শয্যার সংকট হবে না।
তিনি আরও বলেন, দেশে এখন প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে যেখানে সেখানে পানি জমি যাচ্ছে। ওই জমা পানিতে এডিস মশার জন্ম হচ্ছে। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আজ যে ডেঙ্গু এত বৃদ্ধি পেলো, এটা কিন্তু প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার কারণে। এখানে যে অতি বৃষ্টি হচ্ছে, এটা একটা কারণ ডেঙ্গু বৃদ্ধির। গরম একটি বড় কারণ। বৃষ্টি শেষ হলে গরম। পৃথিবীর সব জায়গায় রেকর্ড পরিমাণ তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, যদি গরম হয়, বৃষ্টি হয় এবং পানি যদি জমে থাকে, ড্রেনেজ সিস্টেম যদি ভালো না হয়, স্প্রে যদি আমরা ভালো না করতে পারি, তাহলে এডিস মশা বাড়বেই। এডিস মশা যদি বাড়ে তাহলে কামড়াবেও বেশি এবং তখন ডেঙ্গুতে আক্রান্তও হবে বেশি। কাজেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য; গাছপালা যদি না রাখতে পারি তাহলে বিভিন্ন ধরনের অসুখ যে হচ্ছে এগুলো বাড়বে।
পিক সিজন নিয়ে পরিসংখ্যান কী বলছে : গত চার বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৯ সালে পিক সিজন (যখন আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি) ছিল আগস্টে, ২০২১ সালে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে, ২০২২ সালে অক্টোবর ও নভেম্বরে। অর্থাৎ পিক সিজন ধীরে ধীরে বছরের শেষভাগে যাচ্ছে, আবার এই শেষভাগে যাওয়ার কারণে পরবর্তী বছরে ডেঙ্গু রোগীর প্রকোপ জানুয়ারি থেকেই দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ৫ হাজার ২৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫৬৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৭ হাজার ৯৭৮ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। অর্থাৎ মৌসুম শুরুর আগেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে গেছে।
সরকারের রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডেঙ্গু চিকিৎসায় রোগী ব্যবস্থাপনা ভালো থাকলে মৃত্যু কম হতে পারে। গত বছর অক্টোবরে ছিল পিক পয়েন্ট। এবার নভেম্বর পর্যন্ত সেটা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। তারপর হয়তো কমতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এখন ডেঙ্গু গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। তাই অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত হয়তো গণহারে ডেঙ্গু রোগী বাড়তেই থাকবে।






