কাজিরবাজার ডেস্ক
চলতি বছরের ডিসেম্বরে হতে পারে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে নানা তৎপরতা। কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ নির্বাচন বন্ধ করতে কিংবা তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে তৎপর রয়েছে। কেউ প্রকাশ্যে, আবার কেউ গোপনে ‘দলীয় কৌশল’ নির্ধারণ করছে।
জানা গেছে, নির্বাচন ঘিরে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলো কৌশল হিসেবে ‘ক‚টনৈতিক পন্থা’র ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নেতারা এরই মধ্যে ‘ক‚টনৈতিক’ মহলে ভিড় করছেন, নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তাদের সঙ্গে গভীর সখ্যতা গড়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতা এ তথ্য জানিয়েছেন।
দলীয় সূত্র মতে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন বেশ কয়েকটি দেশের ক‚টনৈতিক মহল। তারা সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চাচ্ছেন। এটা কীভাবে আরও গ্রহণযোগ্য করা যায় সে বিষয়েও নজর রাখছেন বিদেশি ক‚টনীতিক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে এখনও অনেক সময় বাকি। দেশে অবস্থিত ক‚টনীতিকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করছেন। নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করছেন। শুধু বিদেশি ক‚টনীতিকরা নন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোও আগ বাড়িয়ে সাক্ষাৎ করছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আগামী নির্বাচনের তথ্য আদান-প্রদান করছেন।
নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর দূতাবাস কেন্দ্রিক তৎপরতা, পাশাপাশি দূতাবাসের বিশেষ আগ্রহের বিষয়টি কীভাবে দেখছেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, প্রতিটি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর দূতাবাস কেন্দ্রিক আনাগোনা লক্ষ করা যায়। এটা আসলে নতুন কিছু নয়। দূতাবাসের লোকেরা আমাদের গণতন্ত্র সুসংগঠিত হোক, নির্বাচন ভালো হোক; তার চেয়ে বেশি ইন্টারেস্ট (আগ্রহ) তাদের নিজ নিজ স্বার্থ। প্রত্যেকেরই ব্যবসা-বাণিজ্য আছে, নিজস্ব স্ট্রাটেজি (কৌশল) আছে। যেগুলো তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
‘এজন্য তারা চাইবেন যেন তাদের মতো করে জিনিসটা (নির্বাচন) হয়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র কায়েমের জন্য আমেরিকানদের জীবন চলে যাচ্ছেÑ এমনটা মনে হচ্ছে। তাদের যদি এতই গণতন্ত্র কায়েমের ইচ্ছা থাকে তাহলে সৌদি আরবে গিয়ে করুক। তাদের তো ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বিষয়টা হচ্ছে আমাদের গণতন্ত্রের চেয়ে তাদের যে স্বার্থ; আঞ্চলিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ; সেই স্বার্থে তারা বিভিন্ন লোকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এটা স্বার্থেরই অংশ।’
‘বিদেশিরা বলবে কেন, আমাদের নিজেদের স্বার্থেই একটা ভালো নির্বাচন করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও চাচ্ছেন। ২০১৪ ও ১৮-এর নির্বাচন, এগুলো সেভাবে অংশগ্রহণমূলক হয়নি বা ত্রæটিমুক্ত নির্বাচনও বলা যাবে না। আমরা নিজেরাই একটা ভালো নির্বাচন করব। এটার জন্য বিদেশিদের সুপারিশ অথবা খবরদারির কোনো দরকার নাই। আমাদের যেটা লাগবে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা। যাতে সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের একটা পরিবেশ তৈরি করা যায়। এটা আমাদের রাজনীতিবিদরাই তৈরি করতে পারেন, কোনো দূতাবাস নয়।’
গত ১৫ ফেব্রæয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাউন্সিলর ডেরেক এইচ শোলের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। গণভবনে অনুষ্ঠিত সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আগামী সাধারণ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিলে আওয়ামী লীগ আবারও দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। আমি কখনোই ভোট কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে চাই না। আগামী নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। আমি সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি। আমরা সবসময় জনগণের খাদ্য ও ভোটের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করছি। প্রথমবারের মতো সংসদে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন আইন পাস হয়েছে। সেই আইনের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। ইসি সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন। এর প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা রয়েছে।’
একই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা। পরের দিন অর্থাৎ ১৬ ফেব্রæয়ারি রাজধানীর গুলশানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও ইইউভুক্ত সাতটি দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের একটি বৈঠক হয়। এতে নেতৃত্ব দেন সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমÐলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ ও কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
ওই বৈঠকের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ দেখতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আওয়ামী লীগও চায় একটা ভালো, ত্রæটিমুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন। যদিও নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ভয়ে বিএনপি ক‚ট কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। ২০১৩-১৪ সালের মতো আবারও আগুন সন্ত্রাসের ওপর ভর করে সরকার উৎখাত এবং দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করছে। বিএনপি দূতাবাসে চুপিচুপি আসে, কাউকে জানায় না। অথচ আমন্ত্রণ পেয়ে আওয়ামী লীগ আজ দূতাবাসে এসেছে। সবাইকে জানিয়ে এসেছে। নির্বাচন এবং দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে অর্থপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।’
এদিকে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত বছর থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিভিন্ন দূতাবাসে আসা-যাওয়া শুরু করেছে। তারা ক‚টনীতিকদের সামনে নির্বাচন কেন্দ্রিক নানা অনিয়ম ও অভিযোগ তুলে ধরছেন। অনুষ্ঠিত গত দুই নির্বাচন (২০১৪ ও ২০১৮) নিয়ে তাদের ব্যাপক অভিযোগ। এসব বিষয়ে গত বছরের শেষদিকে ঢাকায় নিযুক্ত নরওয়ে ও সুইডেনের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির নেতারা। এর আগে জার্মানির রাষ্ট্রদূত আখিম ট্রোসটারের সঙ্গে বৈঠক করেন তারা। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জার্মান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং দলের সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ। বৈঠক শেষে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় এবং একান্ত বৈঠকের আলোচনাগুলো নিজেদের মধ্যেই রাখা ভালো। এগুলো নিয়ে বাইরে আলোচনা করার খুব একটা সুযোগ থাকে না। বৈঠকগুলো একান্ত বৈঠক ও দ্বিপক্ষীয়। এগুলো নিজেদের মধ্যে রাখার চেষ্টা করিÑ এটাই ভালো, এটাই প্র্যাকটিস আর কি! এর বাইরে আর কিছু বলার সুযোগ নেই।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাউন্সিলর ডেরেক এইচ শোলে এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা বাংলাদেশ সফর করলেও বিএনপির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি তারা।
নির্বাচন ঘিরে ক‚টনৈতিক মহলে বিশেষ তৎপরতা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন স্বয়ং দলের হাইকমান্ড। এক্ষেত্রে বিএনপি নির্বাচনে আসবে, কি আসবে নাÑ এটা তাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। ক‚টনীতিকরাও চাচ্ছেন একটা সুন্দর নির্বাচন। আমরা তাদের সেই নিশ্চয়তা দিচ্ছি। তবে নির্বাচন কিন্তু এ সরকারের অধীনেই হবে। তৃতীয় মাধ্যমের কোনো প্রয়োজন নেই।
‘বিএনপি বারবার বিদেশি দূতাবাসগুলোতে গিয়ে তাদের কান ভারী করছে। আমরাও চাচ্ছি দূতাবাসের লোকেরা আমাদের কথা শুনুক। তাদেরকে আমরা বিএনপির ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। পাশাপাশি নির্বাচন কেন্দ্রিক বিভিন্ন পরিকল্পনা আমরা হাতে নিয়েছি। ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছি। উঠানে উঠানে বৈঠক করছি। শুধু যে ভোটারদের কাছে যাচ্ছি তা নয়, প্রয়োজনে সব মহলে আমরা যাব। দূতাবাসগুলোর সঙ্গে বেশি বেশি বৈঠক করব। এগুলো আমাদের রুটিন ওয়ার্ক। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে। অতীতের ন্যায় আগামী নির্বাচন ঘিরেও বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো থাকবে’Ñ উল্লেখ করেন দলটির নেতারা।
নির্বাচনের আগে বিদেশি ক‚টনীতিকদের বিশেষ তৎপরতার বিষয়ে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের এক শান্তি সমাবেশে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিদেশি ক‚টনীতিকরা সরকারের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। তারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ইতিবাচক বৈঠক করছেন। বিএনপির সঙ্গে তারা কোনো বৈঠক করছেন না। বিএনপি বন্ধুহীন হয়ে পড়ছে।’






