করোনার ভয়াল থাবায় পরিস্থিতি বেসামাল, গোটা দেশ হটস্পট

7

কাজিরবাজার ডেস্ক :
করোনার হটস্পট হয়ে উঠছে পুরোদেশ। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবা এখন দেশের সবখানেই। ডেল্টা ধরনের অতি সংক্রমণ ক্ষমতায় সীমান্ত এলাকায় শুরু হওয়া করোনার তাণ্ডবে সারাদেশই বিধ্বস্ত। সরকারের কঠোর বিধি-নিষেধ কর্মসূচী ও ব্যাপক কড়াকড়ির মধ্যে প্রতিদিনই সংক্রমণ ও রোগী মৃত্যুর নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কোভিড হাসপাতালে লোকবল ও শয্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। প্রয়োজনে ফিল্ড হাসপাতাল নির্মাণের কথা ভাবা হচ্ছে।
স্ব^াস্থ্য অধিদফতর মনে করছে, চলতি জুলাই মাসে রোগী শনাক্তের হার যেভাবে বাড়ছে সেভাবে আগামীতে বাড়তে থাকলে চিকিৎসা সেবা দিতে স্বাস্থ্য বিভাগকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এমনকি অক্সিজেন সরবরাহেও চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। সরকার ঘোষিত কঠোর বিধি-নিষেধ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বৃদ্ধির পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর যেসব হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে, সেগুলোতে কীভাবে শয্যার সংখ্যা বাড়ানো যায়, জনবল কীভাবে পুনর্বণ্টন করা যায় সেদিকে নজর দিচ্ছে। এর বাইরে ফিল্ড হাসপাতাল করা যায় কিনা সে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ফিল্ড হাসপাতাল করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জুলাই সারাদেশে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৩০১ জন। রোগী শনাক্তের হার ২৬ শতাংশ। ২ জুলাই দেশে ৮ হাজার ৪৮৩ রোগী শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ২৮ শতাংশ। যা দেশে এখন পর্যন্ত শনাক্তের হার বিবেচনায় সর্বোচ্চ। ৩ জুলাই রোগী শনাক্ত হয়েছে মোট ৬ হাজার ২১৪ জন। শনাক্তের হার ২৭ শতাংশ। ৪ জুলাই সারাদেশে ৮ হাজার ৬৬১ জন নতুন আক্রান্ত হয়েছে। নমুনার বিপরীতে শনাক্তের হার ২৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ৫ জুলাই দেশজুড়ে নমুনা সংগ্রহের বিপরীতে ২৯ দশমিক ৩০ শতাংশ হারে রোগী শনাক্ত হয়েছে। মঙ্গলবার সারাদেশে মোট সর্বোচ্চ ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশ হারে রোগী শনাক্ত হয়েছে। বুধবার দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ১৬২ জন।
চলতি মাসের প্রথম দিন ১ জুলাই দেশে ১৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২ জুলাই করোনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১৩২ জন। ৩ জুলাই এই সংখ্যা ছিল ১৩৪ জন। ৪ জুলাই দেশে সর্বোচ্চ ১৫৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে। পরদিন ৫ জুলাই দেশে মোট ১৬৪ জনের মৃত্যু ঘটে। মঙ্গলবার দেশে ১৬৩ জন করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। বুধবার দেশে সর্বোচ্চ ২০১ জনের মৃত্যু ঘটেছে। প্রথমবারের মতো দেশে মৃত্যুর সংখ্যা ২শ’ ছাড়িয়েছে।
বর্তমান করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডাঃ নাজমুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশে করোনা সংক্রমণের যে উর্ধমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেই অনুযায়ী জুলাই মাসের সংক্রমণ দুই মাসকেও ছাড়িয়ে যাবে। তিনি বলেন, জুলাই মাসের শুরুর কয়েকদিনে সংক্রমণের যে পরিস্থিতি আমরা দেখেছি, সপ্তাহের শুরুতে দেশে করোনা সংক্রমণের হার ছিল ২৫ শতাংশের কিছু বেশি। কিন্তু মঙ্গলবার শনাক্তের হার ৩১ দশমিক ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত ২৯ জুন দেশে আট হাজার ৮২২ জনের করোনা শনাক্ত হয়, যেটি সপ্তাহের ব্যবধানে ১১ হাজার ছাড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত জানুয়ারি মাসের শুরু থেকে মাসজুড়ে দেশে ২১ হাজার ৬২৯ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এপ্রিল মাসে সেই সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছিল। জুন মাসে এক লাখ ১২ হাজার ৭১৮ জন এবং জুলাই মাসের এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়দিনে ৫৩ হাজার ১৪৮ রোগীকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। উর্ধমুখী প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিশ্চিতভাবে বলা যায় জুলাইয়ে রোগীর সংখ্যা জুন-এপ্রিল মাসকেও ছাড়িয়ে যাবে।
নামজুল ইসলাম বলেন, এক সপ্তাহ ধরে দেশে করোনায় মৃতের সংখ্যা একশ’র উপরে ঠেকেছে। গত ৩০ জুন দেশে ১১৫ জন মৃত্যুবরণ করেছিল। সেই সংখ্যা গত ১ জুলাই ১৪৩ জন, ২ জুলাই ১৩২ জন, ৩ জুলাই ১৩৩ জন করে ৬ জুলাই এসে ১৬৩ জনে পৌঁছেছে। এর আগের দিনও সোমবার ১৬৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে। সবমিলিয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৩৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কঠোর বিধি-নিষেধ মানা এবং দ্রুত পরীক্ষা করে রোগী শনাক্ত না করার বিকল্প নেই। এছাড়া গ্রামাঞ্চলের মানুষের আরও বেশি স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে করোনার লক্ষণ দেখা দেয়া মাত্রই তাদের পরীক্ষা করা দরকার। চিকিৎসার আওতায় না আনতে পারলে করোনা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ডাঃ মুসতাক হোসেন বলেন, দেশের করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে টিকার বিকল্প নেই। কারণ ডেল্টার কারণে অধিকহারে সংক্রমণ ঘটছে। কোন কোন ক্ষেত্রে এই ধরনটি টিকাকেও ফাঁকি দিচ্ছেন। তাই দ্রুত দেশের মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিমাসে অন্তত ১ কোটি ডোজ করে টিকা দিতে হবে। ব্যাপক আকারে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। তাহলে করোনাকে মোকাবেলা করা সম্ভব। কারণ সামাজিক সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ঘটেছে। এখন আর কোন্ জায়গা থেকে করোনার সংক্রমণ ঘটছে সেটি বোঝা যাচ্ছে না। তবে লকডাউনের মতো কর্মসূচী কিছুটা হলেও কাজে আসছে। না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটত। তিনি মনে করেন, কঠোর বিধি-নিষেধের সুফল পেতে বৈজ্ঞানিকভাবে আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে। এর মধ্যেই যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
হাসপাতালগুলোতে করোনা ও অন্যান্য রোগের সমন্বিত চিকিৎসা এবং রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। একই ছাদের নিচে চিকিৎসার দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতালটি এখন করোনা সংক্রমণের অন্যতম হটস্পটে পরিণত হয়েছে। রাজশাহীর মতো খুলনা, রংপুর, দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল করোনা রোগীতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব হাসপাতালে সমন্বিত চিকিৎসা সেবা ও রোগীর স্বজনদের বিভিন্ন প্রয়োজনে হাসপাতালের বাইরে আসা ও যাওয়ার কারণে করোনা ছড়িয়ে পড়ছে।
মঙ্গলবার মহানগরসহ ঢাকা জেলায় মোট ৩৭১৫ রোগী শনাক্ত হয়েছে। নমুনার বিপরীতে শনাক্তের হার ২৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। দিনটিতে সারাদেশে মোট ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশ হারে রোগী শনাক্ত হয়েছিল। পরিসংখ্যানে ঢাকাতে রোগী শনাক্তের হার কিছুটা কম মনে হলেও এটিই সার্বিকভাবে সারাদেশে মোট সংক্রমণকে প্রভাবিত করেছে। কারণ মঙ্গলবার দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৫২৫ জন, যার মধ্যে ৩২ দশমিক ২৩ শতাংশই ঢাকা জেলায়। এক কথায় বলা যায়, ঢাকাকে ঘিরে ফেলছে করোনা। ঢাকা বিভাগে গত মাস থেকে সবচেয়ে বেশি করোনা শনাক্ত হয়েছিল টাঙ্গাইল জেলায়। মঙ্গলবার জেলাটিতে মোট ৪১৩ রোগী নতুন শনাক্ত হয়েছে, যা শনাক্তের হার ৫৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। ঢাকার প্রবেশমুখে টাঙ্গাইলে করোনা শনাক্তের হার রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতোই।
রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। এদের চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে সংক্রমণের গতিতে দেশের অন্যান্য এলাকাকে ছাড়িয়ে গেছে রাজধানী। সারাদেশের মতো রাজধানীর অনেক হাসপাতালে ইতোমধ্যে খালি নেই আইসিইউ শয্যা। ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের ১০টির মধ্যে একটিও আইসিইউয়ের বেড ফাঁকা নেই। ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে ১৬টি বেডের কোনটাই ফাঁকা নেই। ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট মুগদা জেনারেল হাসপাতালের ২৪টি সিটের মধ্যে একটিও ফাঁকা নেই। রাজধানীর কোভিড ডেডিকেটেড সরকারী হাসপাতালগুলোতে মোট ৩৮৭টি আইসিইউ সিটের বিপরীতে ফাঁকা রয়েছে মাত্র ১০৬টি বেড। এই পরিস্থিতিতে জটিল রোগীকে বাঁচাতে তাদের স্বজনরা আইসিইউর জন্য এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে বেড়াচ্ছেন। সীমান্তবর্তী জেলা-উপজেলার হাসপাতালের চিত্রও ভয়াবহ, খালি নেই শয্যা। তবে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য জেলার রোগীরাও আসছেন। ফলে চাপ বাড়ছে ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর।
ঢাকার বাইরে মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা সদর হাসপাতালগুলো রোগীকে পূর্ণ হয়ে গেছে। বেডে স্থান না পেয়ে মেঝেতে রেখেই চলছে অনেক রোগীর চিকিৎসা। তৃণমূল পর্যায়ে অনেক হাসপাতালে দেখা দিয়েছে অক্সিজেন সঙ্কটও। অক্সিজেনের অভাবে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগও উঠছে। এটি তদন্তে স্থাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঈদের ছুটিতে মানুষের ঢাকা ছেড়ে যাওয়া এবং ডেল্টা ধরনের প্রভাবে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে করোনা। আক্রান্ত হওয়ার পরও অধিকাংশ গ্রামের মানুষ করোনার নমুনা পরীক্ষা করছে না। অথচ তারা জ্বর-কাশিতে ভুগছেন। বেশিরভাগ হাটবাজারে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত। জোর করেও তাদের মাস্ক পরানো যাচ্ছে না। জনসমাগম এড়িয়ে চলার নির্দেশনাও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়েও তেমন কাজ হচ্ছে না।
খুলনা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৯০০ জনের। বিভাগে এখন পর্যন্ত এটাই একদিনে সর্বোচ্চ করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর ঘটনা। বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২৪ ঘণ্টায় আরটি-পিসিআরের মাধ্যমে ২ হাজার ৭২১টি, জিন এক্সপার্ট যন্ত্রে ১৪১টি, র‌্যাপিড এ্যান্টিজেন দিয়ে ২ হাজার ৭৩৯টিসহ মোট ৫ হাজার ৭৯১ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এটাই একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক নমুনা পরীক্ষা। শনাক্তের হার ৩৬ দশমিক ৬০ শতাংশ। আগের ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ছিল ৩৬ দশমিক ৮১ শতাংশ। এখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১ হাজার ১৯৯ করোনা রোগী।