কাজিরবাজার ডেস্ক :
নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে চালক ও শ্রমিকদের অঘোষিত ধর্মঘটের টানা তিনদিন পরও সারাদেশে বাস চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে চতুর্থ দিনের মতো ঢাকাসহ সারাদেশে সড়ক পথের যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কিছু জেলায় স্বল্প পরিসরে বাস চলাচল শুরু হয়। খুলনা, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইলসহ অন্তত কুড়ির বেশি জেলায় বাস চলাচল বন্ধ ছিল। এসব জেলায় দূরপাল্লার কোন বাস ছেড়ে যায়নি। অভ্যন্তরীণ রুটেও বাস চলাচল ছিল কম।
ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিকদের ঘোষণা অনুযায়ী সকাল থেকে সারাদেশে পণ্যবাহী পরিবহন চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও রাজধানীতে খুব বেশি বাস চলতে দেখা যায়নি। কোন কোন বাস কোম্পানি একেবারেই গাড়ি ছাড়েনি। আবার কিছু কোম্পানির বাস স্বল্প পরিসরে রাস্তায় নামাতে দেখা গেছে। এতে বুধবারের মতো বৃহস্পতিবারেও গণপরিবহন সঙ্কট দেখা দেয়। বিকল্প যানে বাড়তি ভাড়ায় চলতে হয়েছে নগরবাসীর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নয় দফা দাবি-দাওয়া ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে কোন অসঙ্গতি থাকলে তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নতুন সড়ক আইন প্রয়োগে অহেতুক বাড়াবাড়ি হবে না। এই আইন নিয়ে শ্রমিকদের ধর্মঘট আর নেই বলেও জানান তিনি। বলেন, আইন বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই।
প্রশ্ন হলো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুইজন মন্ত্রী শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া পূরণের আশ^াস দিয়েছেন। কিছু দাবি-দাওয়া ইতোমধ্যে সময় দিয়ে মেনে নেয়া হয়েছে। পরিবহন মালিকরা বলছেন, তারা ধর্মঘটের বিষয়ে কিছুই জানেন না। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী উভয়ই বলেছেন, গাড়ি না চালানোর বিষয়ে তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে কোন নির্দেশনা নেই। তারা এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। তাহলে বিভিন্ন জেলায় বাস বন্ধ কেন। চারদিনেও সারাদেশে বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। নেপথ্যে কারা কলকাঠি নাড়ছেন? এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের ইচ্ছাতেই কোথাও বাস চলছে, কোথাও চলছে না।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, পরিবহন ধর্মঘট, বাস চলা না চলা সব বিষয়ে নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন মালিক ও শ্রমিক নেতারা। দুই সংগঠনের প্রথম সারির নেতারা নিজেদের আড়ালে রাখতে এবার কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। নইলে গত চারদিনে কোন জেলা সংগঠনের শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা কেন নেয়া হয়নি। তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিক নেতাদের ইশারা ছাড়া বাস চলাচল বন্ধ থাকতে পারে না।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, আমি মনে করি নতুন সড়ক পরিবহন আইনটি যদি কোন মহলের চাপের মুখে ব্যাহত হয় এবং সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হয় তাহলে আমরা যে দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি তা হয়ত আর বাস্তবায়ন হবে না। পূর্বে যা ছিল অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল আর অসহায় পরিবারের কান্না চলতেই থাকবে। তাই আমি মনে করি, এই আইনের সঠিক প্রয়োগে ও বাস্তবায়নে যদি হেরে যাই তাহলে হেরে যাবে বাংলাদেশ।
ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতা রুস্তম আলী বলেন, বুধবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে দাবি-দাওয়া পূরণে যে আশ^াস পেয়েছি তাতে আমরা সন্তুষ্ট। উভয় পক্ষের মধ্যে সফল আলোচনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৈঠকের পর আমরা অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছি। রাত থেকেই সারাদেশে পণ্যবাহী পরিবহন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
একই ইস্যুতে পণ্যবাহী পরিবহন শ্রমিকরা যদি সন্তুষ্ট হয় তাহলে বাস শ্রমিকরা কেন নয় এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আইন সবার জন্য সমান। আমাদের নয় দফা দাবি-দাওয়া যদি পূরণ হয় এর প্রত্যেকটি সুফল পাবেন মোটরযান শ্রমিকদের সবাই। আইনে পরিবহন শ্রমিকদের কোন বিভাজন নেই। তবে বাস শ্রমিকরা কেন পুরোপুরিভাবে মাঠে নামছেন না তা বলার এখতিয়ার আমার নেই। কারণ আমাদের সঙ্গে বাস শ্রমিকরা যুক্ত নয়। এ বিষয়ে যদি শ্রমিক ফেডারেশন বা বাস মালিক সমিতির হস্তক্ষেপ করার এখতিয়ার আছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গাবতলী ও সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার বাস ছাড়লেও সংখ্যায় ছিল কম। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে অর্ধেক বাসও ছাড়েনি। সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, কাল রাত থেকেই বাস চলাচল শুরু হয়েছে। শতভাগ না হলেও পূর্বাঞ্চলের নব্বই শতাংশের বেশি গাড়ি ছেড়ে গেছে বলে দাবি এই নেতার। তবে সায়েদাবাদে অধিকাংশ বাস টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কাউন্টারগুলোতে যাত্রীর সংখ্যাও ছিল কম।




