কাজির বাজার ডেস্ক
রাজধানীর দিয়াবাড়ী এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় সময়ের সাথে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। আহত ও নিহতদের সর্বশেষ সংখ্যা জানিয়েছে আইএসপিআর। সর্বশেষÑ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সোমবার রাত ৯টা পর্যন্ত মোট ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১৭১ জন। আইএসপিআর জানায়, দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ২ জন, ঢাকা মেডিক্যালে ১ জন, ঢাকা সিএমএইচে ১২ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হসপিটালে ২ জন, উত্তরার লুবনা জেনারেল হাসপাতালে ২ জন ও উত্তরা আধুনিক হসপিটালে ১ জনসহ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এতে আরো জানানো হয়, বর্তমানে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ৮ জন, জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ৭০ জন, ঢাকা মেডিক্যালে ৩ জন, ঢাকা সিএমএইচে ১৭ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হসপিটালে ১ জন, উত্তরার লুবনা জেনারেল হাসপাতালে ১১ জন, উত্তরা আধুনিক হসপিটালে ৬০ জন ও উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ১ জনসহ মোট ১৭১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মাইলস্টোন স্কুলের একটি ভবনের সামনে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। ভবনটি দোতলা। সেখানে পাঠদান করা হয়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিম হাসান সিয়াম বলে, ভবনটির নাম প্রজেক্ট-২। ওই ভবনে দুটি তলা মিলিয়ে মোট ১৬টি ক্লাসরুম আছে। আর ৪টি শিক্ষকদের রুম। প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস হতো এই ভবনে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শ্রেণিকক্ষের সামনে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা আরও জানিয়েছে, ভবনটিতে ছুটির পর ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কোচিং করত।
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনার পরপরই কলেজ ক্যাম্পাসে ভিড় করেছেন শিক্ষার্থীদের মা, বাবা ও স্বজনেরা। তাঁরা তাঁদের সন্তানদের খুঁজছেন। কেউ কেউ সন্তানের খোঁজ পাননি। ঘটনাস্থলে থাকা লাকি আক্তার নামের এক অভিভাবক বেলা তিনটার দিকে বলেন, তাঁর দুই সন্তান মাইলস্টোন স্কুলে পড়ে। তিনি বলেন, ‘বড় সন্তানকে বের করতে পেরেছি। ছোটটাকে খুঁজে পাচ্ছি না।’
বিকেল পৌনে ৫টার দিকে মাইলস্টোনের দুর্ঘটনাকবলিত এলাকা পরিদর্শনের সময় ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, ‘আপনারা সবাই জানেন, বিমানবাহিনীর একটি এফ-সেভেন বিজেআই ফাইটার এয়ারক্র্যাফট আনুমানিক একটার দিকে আমাদের মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উত্তরা শাখার দোতলা স্কুল ভবনে ক্র্যাশ ল্যান্ডিং করেছে। এই দোতলা ভবনের প্রথম তলায় ছিল তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বাচ্চাদের ক্লাস। দ্বিতীয় তলায় ছিল দ্বিতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস। তার সাথে ছিল প্রিন্সিপালের (অধ্যক্ষের) অফিস মিটিং রুম। একটা কোচিংয়ের ক্লাস চলমান ছিল। ক্র্যাশ ল্যান্ডিং যখন হয়, তখন স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল এবং ওই সময় যে জায়গায় টিচার্স রুমের সাথে যে ল্যান্ডিং হয়, আঘাত করে, ওই জায়গায় বাচ্চাকাচ্চারা জড়ো হয়েছিল এবং তাদের সাথে হয়তো কিছু অভিভাবকও ছিল।’
ফায়ার ফার্ভিস আনুমানিক বেলা ১টা ৮ মিনিটে দুর্ঘটনার খবর পায় জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘দ্রæত আমাদের ইউনিট পৌঁছে যায় এবং উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। আমাদের মোট ৯টা ইউনিট এখানে কার্যক্রম করেছে। বর্তমানে আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ অবস্থায় আছে এবং আমরা উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছি।’
হতাহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, এখানে সেনাবাহিনী এবং আমাদের ফায়ার সার্ভিস, পুলিশসহ অন্যান্য সবাই মিলে আমাদের সহযোগিতা করেছে, আমাদের উদ্ধারকাজ চলমান আছে। উদ্ধারকাজ শেষ হলে আমরা টোটাল ক্ষয়ক্ষতির ফিগারটা আপনাদেরকে বলতে পারব।’
মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, ‘যারা নিহত, এখনো তাদের পরিচয় আমরা জানতে পারিনি, সময় লাগবে। আমাদের ধারণা, অধিকাংশই শিশু।’
অগ্নিদগ্ধদের দফায় দফায় জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে আনা হয়। আইএসপিআর বলছে, সেখানে ৭০ জনকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, দগ্ধদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে নিখোঁজ স্কুল শিক্ষার্থীদের বিষয়ে জরুরি যোগাযোগের জন্য কয়েকটি মুঠোফোন নম্বর দিয়েছে। সেগুলো হলোÑমিলিটারি রেস্কিউ ব্রিগেড-০১৭৬৯০২৪২০২, সিএমএইচ বার্ন ইউনিট-০১৭৬৯০১৬০১৯, সিএমএইচ ইমার্জেন্সি ০১৭৬৯০১৩৩১১, মাইলস্টোন স্কুল অ্যাডমিন অফিসার-০১৮১৪৭৭৪১৩২, ভাইস প্রিন্সিপাল-০১৭৭১১১১৭৬৬ এবং জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ (পুলিশের ইমার্জেন্সি সেল থেকে বার্ন ইউনিটগুলোর সঙ্গে সংযোগ করিয়ে দেবে)।
বিমান বিধ্বস্তে নিহতদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। প্রেস উইং এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় শতাধিক আহত হয়েছে। এদের মধ্যে ৮৩ জন রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।
যাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা যাবে না, তাঁদের ডিএনএ পরীক্ষার পর মৃতদেহ হস্তান্তর করা হবে
রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনে প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা যাবে, তাঁদের মৃতদেহ অতিসত্বর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। আর যাঁদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যাবে না, তাঁদের মৃতদেহ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করে পরে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সোমবার সন্ধ্যার পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছে। এতে আরও বলা হয়, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন। চিকিৎসাকাজ নির্বিঘেœ করার স্বার্থে হাসপাতাল এলাকায় অহেতুক ভিড় না করার জন্য সর্বসাধারণকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছে সরকার।
উড্ডয়নের পরে যুদ্ধবিমানটি যান্ত্রিক ত্রæটির সম্মুখীন হয় : আইএসপিআর
বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান আকস্মিক বিধ্বস্তের ঘটনায় একটি বিবৃতি দিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআর। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান নিয়মিত প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সোমবার বেলা ১ টা ০৬ মিনিটে ঢাকার কুর্মিটোলার বিমান বাহিনী ঘাঁটি এ কে খন্দকার থেকে উড্ডয়নের পর যান্ত্রিক ত্রæটির সম্মুখীন হয়। আইএসপিআর বলছে, দুর্ঘটনা মোকাবেলায় এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে উক্ত বিমানের বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোঃ তৌকির ইসলাম বিমানটিকে ঘনবসতি এলাকা থেকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাবার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিমানটি ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল এবং কলেজ এর দোতালা একটি ভবনে অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়েছে। উক্ত অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গভীরভাবে মর্মাহত এবং হতাহতদের সর্বাত্মক চিকিৎসাসহ সার্বিক সহযোগিতায় তৎপর রয়েছে। সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, র্যাব এবং ফায়ার সার্ভিস দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি উত্তরণের সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনের জন্য ইতোমধ্যে বিমান বাহিনীর একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিমান দুর্ঘটনার খবর বিশ্ব গণমাধ্যমে : রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের এ খবর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হয়েছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের খবর জানিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে ফায়ার সার্ভিসের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকার একটি কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি ‘ঢাকায় স্কুলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ১৬’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, বিমান বিধ্বস্তের এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে শিক্ষার্থীও রয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বহরে থাকা চীনের তৈরি একটি এফ-৭ যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণ মহড়া চলাকালীন বিধ্বস্ত হয়েছে। ঢাকার মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের একটি ভবনে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীসহ অনেকে হতাহত হয়েছেন।
মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য স্টার বলেছে, বাংলাদেশে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। ঢাকার একটি কলেজ ক্যাম্পাসে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইংরেজি দৈনিক গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উত্তরে একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে কমপক্ষে ১৯ জন নিহত ও আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এছাড়াও মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজ উইক, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম সানডে এক্সপ্রেস, ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের এ বিমান বিধ্বস্তের খবর গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছে।





