মোঃ ইয়ামিন রহমানঃ ক্যালেন্ডারের পাতা অনুযায়ী ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচন আসতে এখনও প্রায় ১১ মাস বাকি থাকলেও দেশের রাজনৈতিক আকাশে এমনকি ব্যস্ততম নগরী সিলেট শহরে এখনই ঝড়ের পূর্বাভাস। সারা দেশে একদিকে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর লাগাতার আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করার ব্যাপারে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দৃঢ় অবস্থান। এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের জাঁতাকলে পড়ে দেশের সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন কেমন হবে আগামী ২০২৪ সালের এই নির্বাচন? কিন্তু মাঠের রাজনীতির এই টানাপোড়েনের সমান্তরালে দেখা যাচ্ছে দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে যে ভয়ের সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে, তা গণতন্ত্রের জন্য বিপদের সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সিলেটের সুনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এম.সি কলেজ, সরকারী কলেজ ও মদন মোহন কলেজ সহ দেশের অনেক ক্যাম্পাসজুড়ে ছাত্রলীগের ‘একচ্ছত্র ও সন্ত্রাসী রাজত্ব’। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে এখন আর মুক্তবুদ্ধির চর্চা বা সুস্থ ছাত্র রাজনীতির কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’-এর অলিখিত নিয়ন্ত্রণে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গেস্টরুম নির্যাতন, সিট বাণিজ্য এবং হল থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার ঘটনা এখন নিত্যদিনের খবর। ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার তো নেই-ই, বরং ভিন্নমতের সামান্যতম প্রকাশ ঘটলেই কপালে জুটছে ‘শিবির’ বা ‘দেশদ্রোহী’ ট্যাগ এবং সেই সাথে নির্মম শারীরিক নির্যাতন। বিশ্লেষকদের মতে, এই যে ক্যাম্পাসগুলোকে বিরোধীদলীয় ও স্বাধীন মতাদর্শহীন করে তোলার প্রক্রিয়া, এটি আসলে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এক বিশাল মনস্তাত্তিক ভয়ের রাজত্ব কায়েম করারই অংশ। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে সাধারণ নাগরিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এক গভীর সংশয় ও হতাশা কাজ করছে। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান পর্যালোচনা করলে কয়েকটি সম্ভাব্য দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আরেকটি একতরফা বা প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের মিত্ররা যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ না নেয়, তবে ২০১৪ বা ২০১৮ সালের মতোই আরেকটি একতরফা বা বিতর্কিত নির্বাচন দেখার আশঙ্কা প্রবল। অপর দিকে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের এই একচ্ছত্র আধিপত্য এবং মাঠপর্যায়ে বিরোধী কর্মীদের ওপর মামলা-হামলার যে চিত্র, তা নির্বাচনের সময় ভোটারদের কেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সাধারণ মানুষ যদি মনে করে তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই, তবে ভোটার উপস্থিতির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে।
এবারের নির্বাচন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর নজরদারি রয়েছে। তারা বারবার একটি ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের তাগিদ দিচ্ছে। ফলে সরকার চাইলেও মাঠের পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে বহির্বিশ্বকে সন্তুষ্ট করতে পারবে কি না, তা এক বড় সমীকরণ।
জনগণের প্রত্যাশা ও শেষ কথাঃ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের মূল ভিত্তি হলো সাধারণ মানুষের নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা। কিন্তু যখন দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির কারখানা বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই ভয়ের রাজত্ব চলে, তখন জাতীয় পর্যায়ে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ আশা করা কঠিন। নির্বাচনের আর যে কদিন বাকি আছে, তার মধ্যে সরকার শিক্ষাঙ্গনে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারে কি না এবং সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ তৈরি করতে পারে কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।




