অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জিম্মি রোগীরা

17

মোঃ ইয়ামিন রহমানঃ সিলেট বিভাগের কোটি মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তবে এই ঐতিহ্যবাহী সরকারি হাসপাতালটি এখন এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী ও দালালের সিন্ডিকেটে জিম্মি হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের সেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন চরমে। টাকা ছাড়া এখানে কোনো সেবা মেলে না—এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের। সিট বাণিজ্য, আইসিইউ সিন্ডিকেট, রোগীদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং ফ্রি ওষুধ গায়েব হওয়াসহ নানা অনিয়মে জর্জরিত হয়ে পড়েছে এই চিকিৎসালয়।

টাকা না দিলে মেলে না সিট, বারান্দাই একমাত্র ভরসা-হাসপাতালটিতে শয্যা সংকট নিত্যদিনের বিষয় হলেও অভিযোগ রয়েছে যে, টাকা না দিলে কোনো রোগীর ভাগ্যেই সিট জোটে না। দূর-দূরান্ত থেকে আসা গরিব ও অসহায় রোগীরা দিনের পর দিন ওয়ার্ডের মেঝে বা নোংরা বারান্দায় পড়ে থাকেন। অথচ নির্দিষ্ট অংকের টাকা বা ‘বখশিস’ দিলেই রাতারাতি ওয়ার্ডের ভেতর ফাঁকা সিট মিলে যায়। আয়া, ওয়ার্ড বয় এবং কিছু অসাধু কর্মচারীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই সিট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

লবিং আর মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়া ‘সোনার হরিণ’ আইসিইউ-হাসপাতালের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিভাগ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) নিয়ে চলছে প্রকাশ্য অনিয়ম। মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে যেখানে দ্রুত আইসিইউ প্রয়োজন, সেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তির বড় ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক লবিং ছাড়া আইসিইউর সিট পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, লবিংয়ের পাশাপাশি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পেছনের দরজা দিয়ে আইসিইউর বেড বরাদ্দ দেওয়া হয়। সাধারণ পরিবারের রোগীরা আইসিইউর জন্য অপেক্ষা করতে করতে হাসপাতালের বারান্দায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছেন, কিন্তু সিন্ডিকেটের মন
গলছে না।

এমনকি ওয়ার্ড বয় ও কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার যেন নিত্যদিনের নিয়ম। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী, বিশেষ করে ওয়ার্ড বয়দের আচরণ অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ এবং অমানবিক। ট্রলিতে রোগী তোলা, এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে নেওয়া, কিংবা স্ট্রেচার ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে ধাপে তাদের টাকা দিতে হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা সামান্য দেরি হলে রোগী এবং তাদের সাথে থাকা স্বজনদের সাথে অত্যন্ত খারাপ ও অবমাননাকর আচরণ করা হয়। এমনকি মাঝেমধ্যে রোগীর স্বজনদের গায়ে হাত তোলার মতো ঘটনাও ঘটছে।

এক ভুক্তভোগী স্বজনের আর্তনাদ: “আমার বাবাকে নিয়ে এসেছিলাম। ওয়ার্ড বয়কে টাকা দিতে একটু দেরি হওয়ায় সে স্ট্রেচার থেকে রোগীকে নামাতে সাহায্য করেনি, উল্টো আমাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেছে। সরকারি হাসপাতালে আমরা কি মানুষ হিসেবে একটু সম্মানও পেতে পারি না?”

হাসপাতালে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বিনামূল্যে বিতরণের ওষুধ বরাদ্দ দিলেও রোগীরা তার সামান্যই পাচ্ছেন। ওয়ান-স্টপ বা জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে ইনডোর—সবখানেই ওষুধের ‘সংকট’ দেখিয়ে ব্যবস্থাপত্র ধরিয়ে দেওয়া হয় বাইরের ফার্মেসি থেকে কেনার জন্য। অথচ হাসপাতালের পেছনের দরজা দিয়ে সরকারি ওষুধ চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে জানা গেছে। গরিব রোগীরা ধারদেনা করে বাইরে থেকে দামি ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, আর সরকারি ওষুধ চলে যাচ্ছে চোরাই বাজারে।

এসব অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দালালের উৎপাত ও কর্মচারীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে নিয়মিত অভিযান ও কঠোর নজরদারি জোরদার করা হবে বলে তারা দাবি করেন। সিলেটের সাধারণ মানুষের দাবি, এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা সেবা কেন্দ্রটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কারণ না হয়ে, প্রকৃত সেবাকেন্দ্রে পরিণত হয়—এটাই এখন সিলেটবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।