মোঃ ইয়ামিন রহমানঃ আর মাত্র ৭ দিন। আগামী ২০ নভেম্বর আল বায়েত স্টেডিয়ামে স্বাগতিক কাতার ও ইকুয়েডরের মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মহোৎসব ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২২’-এর। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে এবারই প্রথম বসছে ফুটবলের এই রাজকীয় আসর। তবে মাঠের ফুটবল গড়ানোর আগেই এই বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত এবং একই সাথে সবচেয়ে ব্যয়বহুল আসর হিসেবে নাম লিখিয়ে ফেলেছে। একদিকে লিওনেল মেসি বা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের শেষ বিশ্বকাপ জয়ের রোমান্থ, অন্যদিকে মাঠের বাইরে নানা সমালোচনা। পূর্বভূমি সিলেটের ব্যস্ততম রাস্তার পাশের চায়ের টং দোকানে বসে এক চুমুক চা এর সাথে ফেভারিট দলকে নিয়ে উন্মাদনা।
সাধারণত জুন-জুলাই মাসে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলেও, কাতারের মরুভূমির তীব্র গরম (যা প্রায় ৪৫° সেলসিয়াসের ওপরে চলে যায়) এড়াতে এই প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে। ইউরোপীয় ঘরোয়া লিগগুলোর মাঝপথে আন্তর্জাতিক সূচির এই পরিবর্তনের কারণে ক্লাব ফুটবল কর্তৃপক্ষ এবং ফুটবলারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। মাত্র কয়েকদিনের প্রস্তুতিতে খেলোয়াড়রা সরাসরি বিশ্বকাপে নামছেন, যা ফুটবলারদের ইনজুরির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর বাইরেও কাতার বিশ্বকাপের শুরু থেকেই লেগে আছে নানা বিতর্কের দাগ। স্টেডিয়াম ও অবকাঠামো নির্মাণে নিয়োজিত অভিবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রতিকূল পরিবেশে মৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার রয়েছে। একই সাথে কাতারের কঠোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আইন, সমকামিতা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা এবং স্টেডিয়ামে অ্যালকোহল বিক্রির ওপর কড়াড়ি পশ্চিমা ফুটবল ভক্তদের মধ্যে বড় ধরনের সংস্কৃতির সংঘাত তৈরি করেছে। তবে বিতর্ক যতই থাকুক, আয়োজনের দিক থেকে কাতার কোনো কমতি রাখেনি। ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি খরচ করে তৈরি করা হয়েছে চোখধাঁধানো সব স্টেডিয়াম, নতুন মেট্রো সিস্টেম ও আধুনিক শহর। বিপুল খরচের এই আসরটিকে বলা হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ। প্রতিটি স্টেডিয়ামে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা খেলোয়াড় ও দর্শকদের মরুভূমির গরম থেকে স্বস্তি দেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠের লড়াইয়ে এবার লাতিন আমেরিকার দলগুলোর দাপট দেখার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত থেকে কাতারে পা রাখছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। কোপা আমেরিকা জয়ের পর এই দলটিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে। অন্যদিকে নেইমারের ব্রাজিলের রয়েছে দুর্দান্ত স্কোয়াড গভীরতা, যা তাদের হেফ্লা (যষ্ঠ শিরোপা) মিশনের প্রধান অস্ত্র। ইউরোপীয় পরাশক্তির মধ্যে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ইঞ্জুরি জর্জরিত হলেও কিলিয়ান এমবাপের নৈপুণ্যে তারা অন্যতম ফেভারিট। এছাড়া পেদ্রি-গভীর তরুণ স্পেন এবং থমাস মুলারের জার্মানিও চমক দেখাতে প্রস্তুত। এটিই হতে যাচ্ছে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ, তাই ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য এই বিশ্বকাপ আবেগ এবং রোমাঞ্চের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা।
ফিফা সভাপতি জাম্মি ইনফান্তিনো বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন, “সব বিতর্ক ভুলে এখন শুধু ফুটবলেই মনোযোগ দেওয়া হোক।” কিন্তু মাঠের বাইরের আলোচনা কি আসলেই টাকা পড়ে যাবে মাঠের ফুটবলে? আর মাত্র এক সপ্তাহ পর যখন ফুটবলারদের পায়ের জাদু শুরু হবে, তখন হয়তো বিশ্বাসী মেতে উঠবে শুধুই গোল আর ট্রফির উন্মাদনায়। তবে ইতিহাস কাতার বিশ্বকাপকে কেবল মাঠের ফুটবলের জন্য নয়, বরং ফুটবল রাজনীতির এক নতুন সমীকরণ হিসেবেও মনে রাখবে।




