ওমিক্রন দ্রুত ছড়াচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন – প্রধানমন্ত্রী

7

কাজিরবাজার ডেস্ক :
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গবেষণালব্ধ জ্ঞান দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তার ওপর সরকার গুরুত্বারোপ করেছে উল্লেখ করে বলেছেন, গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে এই গবেষণালব্ধ জ্ঞান আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটার ওপর আমরা জোর দিচ্ছি। মৌলিক গবেষণার পাশাপাশি প্রায়োগিক গবেষণার ওপরও জোর দিতে হবে। যারা গবেষক তারা নিশ্চয়ই এই বিষয়ে কাজ করবেন। করোনা নতুন ধরন ওমিক্রন যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, এই ভেরিয়েন্টটা দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং একেকটা পরিবারসহ আক্রান্ত হচ্ছে। এখানে আমি সবাইকে বলব যে, স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে চলা এবং আমরা ইতোমধ্যে কিছু নির্দেশনা দিয়েছি- সেই নির্দেশনাগুলো সবাই মেনে চলবেন। যারা টিকা নেননি এখনও, দ্রুত নেবেন। আমরা স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদেরও টিকা দেয়া শুরু করেছি। টিকা নিলে অন্তত জীবনে বেঁচে থাকা যায়- এইটুকু হলো বাস্তব।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নবনির্মিত ‘জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমপ্লেক্স’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের সাহায্যে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশীয় সম্পদ যা আছে, অনেক অমূল্য সম্পদ রয়ে গেছে যা আমরা এখনও ব্যবহার করতে পারিনি বা ধরা ছোঁয়ার বাইরে, সেগুলোও আমাদের খুঁজে বের করতে হবে এবং এর ওপর গবেষণা করে সেগুলোও যাতে দেশের মানুষের কাজে লাগে সে বিষয়ে আমাদের বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বা খাদ্য উৎপাদন বা ইঞ্জিনিয়ারিং বা অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রেই গবেষণা প্রয়োজন। আসলে গবেষণা ছাড়া উৎকর্ষ লাভ করা যায় না। আর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গেলে পড়ে আমাদের গবেষণা একান্তভাবে দরকার। সেজন্য সবার গবেষণার দিকে একটু নজর দেয়া দরকার। আর সারাবিশ্বে প্রযুক্তি ব্যবহারের যে প্রভাব বেড়েছে সেই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে আমাদেরও গবেষণায় সব সময় নজর দিতে হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের মহাপরিচালক মুহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী স্বাগত বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে নবনির্মিত ‘জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমপ্লেক্স’ এর ওপর একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণার উন্নয়নে এবং দেশে যথাযথ জ্ঞানসম্পন্ন বিজ্ঞানী-গবেষক সৃষ্টিতে ‘জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমপ্লেক্স’ বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলেও আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিজ্ঞান ও উন্নত প্রযুক্তির এ যুগে যেসব দেশ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এগিয়ে যাচ্ছে তারাই অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত উন্নতি করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আমাদের স্বাস্থ্য খাতের গবেষণায় পিছিয়ে থাকার বিষয়টিও তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অন্যান্য গবেষণায় এগিয়ে গেলেও আমাদের দেশ স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় পিছিয়ে রয়েছে এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা কম হচ্ছে। এজন্য চিকিৎসকদের অনেককেই রোগীর সেবার পর আর গবেষণায় যুক্ত হতে না পারার প্রসঙ্গও টেনে আনেন তিনি। তার সরকার স্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার সময়ই বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব প্রদান করেন। তথ্য আদান-প্রদান ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ স্থাপনে তার সরকারের সময় অর্থাৎ ১৯৭৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইন্টারন্যাশনাল টেলি-কমিউনিকেশন ইউনিয়নের সদস্য হয় বাংলাদেশ এবং ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বেতবুনিয়ায় স্যাটেলাইট আর্থ স্টেশনের উদ্বোধন করেন তিনি। তার এসব পদক্ষেপ আমাদের জন্য পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে সরকারে এসে তিনি দেখতে পান দেশে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী যেমন কমেছে তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান শিক্ষার আগ্রহও কমে গেছে। তখন তিনি সারাদেশে ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বিজ্ঞান শিক্ষার আগ্রহ কমার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ’৭৫ পরবর্তী অবৈধভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো তাদের অবৈধ ক্ষমতা বৈধ করার জন্য দুর্নীতি সম্পৃক্ত হয়ে যায় এবং মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের নিয়ে একটি এলিট শ্রেণী তৈরির উদ্যোগ নেয়। মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে অর্থ ও অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের ব্যবহার করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল। তখন সাধারণ জনগণের কি প্রয়োজন সেদিকে তাদের কোন খেয়ালই ছিল না। এমনকি ’৯১ পরবর্তী বিএনপি সরকার বিনামূল্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলে সংযুক্ত হবার সুযোগটা পর্যন্ত নিতে ব্যর্থ হয় বলেও সরকারপ্রধান উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য তখন বিএনপি সরকারে এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু সে বলে দিল- এটা করা যাবে না। এটা করলে বাংলাদেশের সব তথ্য বিদেশে চলে যাবে। ফলে প্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের উন্নয়নের সম্ভাবনাটাকে তারা নষ্ট করে দেয়। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে এসে এই খাতের উন্নয়নে নতুন নীতিমালা গ্রহণ করে। সফ্টওয়্যার, ডাটা-এন্ট্রি, ডাটা-প্রসেসিং এর উন্নয়নে আইটি-ভিলেজ এবং হাইটেক-পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। শুল্ক মুক্তভাবে কম্পিউটার, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ এবং সফ্টওয়্যার আমদানির অনুমোদন দেয় এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু সে সময় প্রায় ১০ হাজার স্কুলে বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রদানে তার সরকারের উদ্যোগকেও পরবর্তী বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে নস্যাৎ করে। আন্তর্জাতিক আদালতে ক্রয় চুক্তি ভঙ্গের দায় দেশের অর্থে ক্ষতিপূরণও গুনতে হয় তখন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথমে প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে কম্পিউটার সংগ্রহের চেষ্টার পর ১০ হাজার স্কুলে ১০ হাজার কম্পিউটার প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করি এবং কম্পিউটার কেনার পদক্ষেপ নেই। উন্নয়ন সহযোগীরা এগিয়ে আসে এবং স্কুলগুলোর একটি তালিকা করা হয়। অর্ধেক মূল্যে নেদারল্যান্ড সরকার তাদের কোম্পানির কাছ থেকে কম্পিউটার কেনার প্রস্তাব দিলে আমরা এই ভাল প্রস্তাবে রাজি হয়ে সব ধরনের পদক্ষেপ নেই। তাদের সঙ্গে চুক্তিও হয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নেদারল্যান্ডের যে কোম্পানি থেকে কম্পিউটার নেয়া হচ্ছে. তার নাম ছিল নেদারল্যান্ডের জাতীয় ফুলের নামে ‘টিউলিপ’। তার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকিরও নাম ‘টিউলিপ’ হওয়ায় চুক্তি সম্পাদনের পর সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা বাতিল করে পরবর্তী বিএনপি সরকার। কেননা আমাদের অতি জ্ঞানী তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে কেউ বোঝায় যে, শেখ রেহানার মেয়ের নাম টিউলিপ, কাজেই নেদারল্যান্ডের সেই কোম্পানিটাও টিউলিপের। কাজেই সেটা নেয়া যাবে না এবং সে সেটা বাতিল করে দেয়।
সরকারপ্রধান বলেন, এই হঠাৎ চুক্তি বাতিলের ফলে নেদারল্যান্ডের ওই কোম্পানি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলা করে। এই মামলা মোকাবেলা করতে আইনজীবী ঠিক করা হয় এবং নানা কাজে অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশের সেখানে ক্ষতিপূরণ দিতে হয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। তিনি বলেন, ১০ হাজার কম্পিউটার তো গেলই আরও ৬০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হলো একটা দেশের সরকারপ্রধানের (খালেদা জিয়া) সিদ্ধান্তের কারণে। আর এ ধরনের সরকারপ্রধান থাকলে দেশের উন্নতিটা কিভাবে হবে আপনারা নিজেরাই বুঝে দেখেন।
সরকারে আসার পরই বিএনপির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের মনোপলী ভেঙ্গে মোবাইল টেলিফোনকে বেসরকারী খাতে উন্মুক্ত করে জনগণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা, সারাদেশে ডিজিটাল টেলিফোন চালু, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ এবং সারাদেশে ইন্টারনেট সেবা ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে দেশকে ডিজিটাইজেশনে তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকায় এবং হাতে সময় পাবার ফলে তার সরকারের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে এখন ডিজিটাল ডিভাইস তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ই-গবর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা এবং আইসিটি শিল্পের বিকাশে গত ১৩ বছর ধরে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছি। তিনি বলেন, এসব কাজে তার ছেলে এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সব ধরনের পরামর্শ এবং সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। দেশের মানুষের কল্যাণে, দেশের মানুষের শিক্ষায় সে (জয়) অবৈতনিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী পুনরায় গবেষণার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আমাদের সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান এবং আহরণ বিষয়ে গবেষণা, সুনীল অর্থনীতিকে জাতীয় উন্নয়নে ব্যবহার করার বিষয়ে গবেষণা এবং রফতানি পণ্যের গুনগত মান বজায় রেখে পণ্য রফতানির সনদ প্রদানের ক্ষেত্রেও গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ সময় বিএনপি সরকারের সময় চিংড়ি মাছে লোহা ভরে রফতানি করায় ইউরোপে চিংড়ি রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই রফতানি বাজার পুনরায় চালুর কথাও উল্লেখ করেন।